বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আজও নাসিমার দিনটা শুরু হল থাপ্পড় খেয়ে। থাপ্পড় উর্মিই মারল। সকালবেলায় উর্মির ঘরে চা নিয়ে ঢুকেছিল নাসিমা। চায়ে নাকি চিনি কম হয়েছিল তাই । নাসিমাকে উর্মি প্রায় দিনই উঠতে-বসতে চড়-থাপ্পড় মারে। নাসিমা কী আর করবে। চুপচাপ সহ্য করে যায়। ঢাকা শহরে ভাত যে অত সস্তা না, তা নাসিমা জানে। ওর মতো যারা এই শহরে বেঁচে আছে, তারা কিল গুঁতো খেয়েই বেঁচে আছে।
নাসিমার ওপর বিরক্ত উর্মি। নাসিমা ভারি অলস। তার ওপর কথা শোনে না।
কোনও কাজেরও না। চা-টাও ঠিকমতো বানাতে পারে না। তবে নাসিমার ওপর উর্মির বিরক্ত হওয়ার অন্য একটি কারণ রয়েছে।
নাসিমা আর উর্মি দুজন প্রায় সমবয়েসি। তাছাড়া দুজনের চেহারায় ভারি মিলও আছে।
ওদের দেখলে যমজ বোন বলে মনে হয়। উর্মীর রংটা ওর বাবার মতন। শ্যামলা।
নাসিমার সঙ্গে উর্মির চোখ -নাক -ঠোঁট, এমন কী ঠোঁটের নিচের তিল পর্যন্ত মিল।
দাঁড়ানো কিংবা তাকানোর ভঙ্গিতে মিল আছে । এতে উর্মী অস্বস্তি বোধ করে । ও বোঝে যে এ নিয়ে লোকে আড়ালে কথা বলে।
অথচ এমন হওয়ার কথা নয়। ব্যাপারটা কাকতালীয় ছাড়া আর কি! মাস তিনেক হল এ বাড়িতে কাজে ঢুকেছে নাসিমা। শেরপুরের মেয়ে।
ঝর্নার মা দিয়ে গেছে। র্ঝনার মা এই এরিয়ায় কাজের লোক সাপলাই দেয়।
উর্মী ওর মাকে বলে, মা, নাসিমাকে বিদায় করে দাও। ভারি পাজি মেয়ে। কথাটথা শোনে না।
মা বলে, দেখি।
দেখিটেখি না। ওকে বিদায় করে দিতেই হবে। উর্মি খানিকটা চেঁচিয়েই বলে।
উর্মির মা মোর্শেদা মেয়ের কথা সিরিয়াসলিই নেন। তার কারণ আছে। মোর্শেদার বড় ছেলে আরমান কানাডায় সেটেল করেছে।
যোগাযোগ খুব একটা রাখেও না । ছেলের অবর্তমানে উর্মিই এখন সব …
একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে উর্মি । আনজুম নামে একটা ছেলের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ট সম্পর্কও গড়ে উঠেছে।
আনজুম দেখতে বেশ হ্যান্ডসাম। বলিষ্ট গড়ন। ঘাড় অবধি চুল। ৩২ লাখ টাকার মিৎসুমিসি ইএক্স ল্যান্সার চালায়। আনজুমরা বেশ রিচ।
ওদের তৈরি পোশাক ও আবাসন শিল্পের পারিবারিক ব্যবসা। উর্মীর বাবারও তৈরি পোশাক ও আবাসন শিল্পের ব্যবসা।
তাই আনজুমের সঙ্গে ঘনিষ্ট হতে দ্বিধা করেনি উর্মির।
একদিন বিকেলের দিকে বাড়ি ফিরল উর্মি। বাড়ির সামনে লোকজনের ভিড়। তারা গেটের ওপাশে উকিঁ দিচ্ছে। উর্মি অবাক।
কি ব্যাপার? উর্মি মোবাইল অফ করে রেখেছিল। আজ সারাদিনই উর্মি আনজুমের সঙ্গে ওদেরই একটা নতুন প্রজেক্টের ফাঁকা ফ্ল্যাটে কাটিয়েছে।
এরকম মাঝে-মাঝেই যায় ওরা। তখন মোবাইল বন্ধ রাখে উর্মি।
গেটের কাছে ইদ্রিস দাঁড়িয়ে । ইদ্রিস এ বাড়ির দারোয়ান। উর্মি জিগ্যেস করে, কি ব্যাপার ?
ইদ্রিস বলল, নাছিমায় সুইসাইড করছে আফা।
উর্মির বুকটা ধক করে ওঠে। কি … কি ভাবে?
ইদ্রিস গলায় ওড়না প্যাঁচায়।
ওহ্ । কখন?
কইবার পারি না। তিনটার সময় হইব।
চোখেমুখে অন্ধকার দেখে উর্মি। সেই সঙ্গে অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে।
গতকাল রাতেও নাসিমাকে বিদায় করার জন্য মাকে চাপ দিয়েছিল উর্মি।
নাসিমার আত্মহত্যার ব্যাপারটা ধামাচাপা দিতে তেমন বেগ পেতে হয়নি উর্মির বাবা এ কে নাজমূল করিমের।
একে তিনি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী তার ওপর পলিটিক্যাল কানেকশন ভালো।
পুলিশ রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘আত্মহত্যা’ উল্লেখ করা হল । ধর্ষনের আলামত পাওয়া যায়নি বলে পানি বেশি ঘোলা হয়নি।
নাসিমার ব্যাপারটা ভুলে যেতে উর্মির সময় লাগেনি। তবে মনের ভিতরে একটা খচখচানি ছিল।
ঝর্নার মার সঙ্গে কথা বলেছিল উর্মি। নাসিমা মা-বাবাকে হারিয়েছিল ছোটবেলায়।
দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের কাছে লাত্থিগুঁতা খেয়ে মানুষ। গ্রামে কেউ নেই।
চাকরি ছাড়তে হবে শুনে ভীষন ভেঙে পড়েছিল নাসিমা। ঝর্নার মা রাতারাতি অন্য কোথাও কাজ ঠিক করে দিতে পারেনি।
আরও কটা দিন থাকার জন্য উর্মির পায়ে ধরেছিল নাসিমা । উর্মি লাথি মেরেছিল …
…কিন্তু নাসিমার জন্য শোক করার সময় নেই। জীবনের আনন্দিত মুহূর্তগুলি কাটছে উর্মির ।
আনজুম নতুন একটা স্পোটস কার কিনেছে। সেই প্রচন্ড গতির গাড়িতে বসে থাকলে আত্মগ্লানি টের পাওয়া যায় না ।
মাস ছয়েক পরের ঘটনা।
… দিনটা ছিল মেঘলা। আনজুম-এর সঙ্গে ওদেরই প্রোজেক্টের একটা অর্ধ-সমাপ্ত বহুতলে এসেছে উর্মি। আনজুম আজকাল ক্লাসও কম করে।
রিয়েল এসটেট ব্যবসায় সময় দিচ্ছে বেশি। আবাসন শিল্পে নাকি মন্দা চলছে ।
আনজুমের বাবা ঋন-টিন নিয়ে বেশ টেনশনে আছেন। আনজুম ওর বাবাকে হেল্প করছে।
বেশ বড়ো সরো ফ্ল্যাট। বত্রিশ ’শ স্কোয়ার ফিট। ফাঁকা ফ্ল্যাট। পুরো কাজ তখনও শেষ হয়নি। জানালার কাঁচ লাগানো হয়নি।
মেঝেতে টাইলস বসানোর পর ঘঁষাঘঁসি চলছে বোঝা যায়।
উর্মি চুমু খেতে যাবে-আনজুম মুখ সরিয়ে নেয়।
কি হল? উর্মি অবাক।
একটা সিগারেট ধরিয়ে গম্ভীর কন্ঠে আনজুম জিজ্ঞেস করল, ছেলেটা কে?
ছেলেটা কে মানে? উর্মি অবাক। সতেরো তলার ওপর হুহু বাতাসে ওর চুল উড়ছিল।
যার সঙ্গে গতকাল বিকেলে প্রিন্স প্লাজায় ঘুরছিলে? আনজুম এর কন্ঠস্বর কী রকম শীতল শোনায়।
উর্মি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, কি আশ্চর্য! গতকাল বিকেলে আমি আমার কাজিন, মানে মুনমুনদের বাড়িতে ছিলাম।
ওর বার্থডে ছিল। তোমাকে আগেই বলেছি।
মিথ্যাকথা! বলে উর্মির গালে থাপ্পড় মারে আনজুম।
থাপ্পড় টলে ওঠে উর্মীর।শ্যামলা মুখে আঙুলের লাল ছোপ পড়ে। মাথার ভিতরে বিদ্যুতের রেখা বয়ে গেল যেন। তারপরও নিজেকে সামলে উর্মি বলল,
বিশ্বাস না হয় তো মুনমুনকে ফোন …কথা শেষ হল না। দ্বিতীয় চড়টা উর্মির গালে ওপর ফাটল।
উর্মি আতঙ্কে নীল হয়ে যায়। আমাকে মারার জন্য আনজুম আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে?
এখন যদি খোলা জানালা দিয়ে আমাকে নীচে ফেলে দেয়। কিন্তু কেন?
আমি তো কাল বিকেলে মুনমুনদের বাড়িতে ছিলাম। আনজুম তাহলে প্রিন্স প্লাজায় কাকে দেখল? ওর শরীরে শীলত স্রোত বয়ে যায়।
উর্মি দৌড় দেয়। ফ্ল্যাটের দরজা লাগানো হয়নি । সেই ফাঁকা জায়গায় উর্মির চুলের মুঠি ধরে ফেলে আনজুম। উর্মি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। ভাগ্য ভালো …
আনজুম তখনই টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যায়। উর্মি করিডোরে বেরিয়ে আসে। করিডোরে শ্রমিকরা কাজ করছিল। কাঠের কাজ। গ্রিলের কাজ।
কিছুটা রক্তাক্ত হয়ে বাড়ি ফিরতে পারে উর্মি।
অনেকটা সময় বাথরুমে কাটায়। রক্ত পরিস্কার করে। বাথটাবে শুয়ে থাকে।
কাঁদে। শরীরে কোষে কোষে আনজুমের প্রতি ঘৃনা টের পায় । আর ভয় পায়। কে ছিল প্রিন্স প্লাজায়?
আমার মতো দেখতে। কেন? ওর শরীর শিরশির করে।
রাতে অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখে উর্মি । দেখে ফাঁকা একটা ঘর। কাঠের মেঝে। ঠিক মাঝখানে সোফা।
কে যেন মুখ ঘুরিয়ে বসে রয়েছে। উর্মি জানে কে … ঘরে একটাই দরজা। উর্মি জানে দরজা খুললে কাকে দেখতে পাবে …
ইউনিভার্সিটি আর যায় না উর্মি। সারাদিন ঘরে থাকে। বাড়িতেও ভালো লাগে না। মনে হয় কেউ ওকে দেখছে।
বাথরুমে গেলে শরীর শিরশির করে। একরাতে। রাতে ঘুম আসছিল না। বিছানায় শুয়ে ছটফট করছিল।
আলো জ্বেলে দেখে রাত দুটো বাজে। চা বানাতে কিচেনে গেল । কিচেনে আলো জ্বলছিল। নাসিমাকে চা বানাতে দেখে ছিটকে বেরিয়ে এসেছে। …
তারপর থেকেই আতঙ্ক গ্রাস করেছে ওকে। এ বাড়ি থেকে আমাকে পালাতে হবে। উর্মি মনে মনে বলে।
রাতে ঘুম হয়নি।
সকালে মা বলে, তোর সঙ্গে কথা ছিল।
বল।
মা বলল, জানিসই তো, তোর বাবার শরীর ভালো না। তোর বাবার তোর জন্য একটা ছেলে পছন্দ করেছে।
উর্মি দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মুক্তি এত সহজে মিলবে কে জানত। উর্মি বলে, তুমি বাবাকে বলো, বিয়েতে আমি রাজি মা।
পাত্রের নাম মাহাতাব আহমেদ পল্লব। বুয়েট থেকে পাস করা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ।
বড় একটি রিয়েল এসটেট ফার্মে চাকরি করে। অফিস গুলশান। থাকে উত্তরা।
… বিয়ে হয়ে গেল।
বিয়ের পর ধানমন্ডিতে আলাদা ফ্ল্যাট নিল মাহাতাব । পড়াশোনা আর কনটিনিউ করল না উর্মি ।
বিয়ের পর শরীরজুড়ে কেমন এক আলস্য ভর করল। মাহাতাব সারাদিন অফিসে থাকে।
রান্নাবান্না আর শপিং করে কখন উর্মির সময় কেটে যায় । টেলিফোনে মার সঙ্গে কথা হয়। মাঝে-মাঝে উর্মির দেওর –
ননদরা সব আসে। ওদের সঙ্গে কথা বলেও সময় কাটে।
উর্মির শাশুড়ি একটা কাজের মেয়ে পাঠিয়েছিলেন। কালো করে শুকনো মতন ষোল-সতেরো বছর বয়েস। মেয়েটির নাম ‘নাসিমা’
শুনে চমকে উঠেছিল উর্মি। বলল, না মা থাক। আমার এখন কাজের লোকের দরকার নেই। পরে যখন লাগবে তখন আপনাকে বলব।
বিয়ের তিন মাস পর উর্মির বাবা মারা গেলেন।
স্ট্রোক …
তার ঠিক ছ’মাস পর উর্মির মা ।
উর্মিদের কলাবাগানের বাড়িটা শূন্য আর ফাঁকা হয়ে গেল।
বিষন্ন শোকগ্রস্থ উর্মিকে আগলে রাখল মাহাতাব ।
পৃথিবীতে উর্মির যে আর কেউ রইল না, তা বুঝতে দিল না। মালয়েশিয়া নিয়ে গেল।
সপ্তাহ খানেক পেনাং ছিল। তেলুক বাহাং বিচে অনেক রাত অবধি জেগে থেকে মাবাবা মৃত্যুর শোক ভোলার চেষ্টা করেছে উর্মি।
রিডাং আইল্যান্ডে ঘুরে বেড়াল। পমপম আর মাবুল আইল্যান্ডেও গেল।
বিয়ের পরপরই উর্মি বুঝেছিল- মাহাতাব দারুণ কোমল মনের একটা ছেলে ।
দারুন সফিসটিকেডে। রবীন্দ্রসংগীত শোনে। বই পড়ে। ভালো ভালো মুভি দেখে।
আর ক্রিকেট পাগল। রান্নাবান্নার ব্যাপারেও মাহাতাবের প্রবল উৎসাহ আছে। রান্নার সময় সাহায্য করে উর্মিকে ।
এক সন্ধ্যায় মাহাতাব ঘরে ফিরে এল। মুখ ভীষণ গম্ভীর।
উর্মির বুক ছ্যাঁত করে ওঠে। কিছু হয়েছে? কাঁপা কাঁপা কন্ঠে জিজ্ঞেস করে উর্মি।
মাহাতাব গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, ছেলেটা কে?
মুহূর্তেই জমে যায় উর্মি । সেই সঙ্গে প্রবল এক আতঙ্ক গ্রাস করতে থাকে। কোনওমতে বলে, ছেলেটা কে মানে?
আজ দুপুরে যার সঙ্গে বসুন্ধরায় ঘুরছিলে?
ফ্ল্যাটে যেন বজ্রপাত হল!
উর্মি কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে, কি বলছ তুমি? আশ্চর্য! আমি তো আজ সারাদিনই ঘরে ছিলাম।
তোমার জন্য পিকিং ডাক রান্না করছিলাম। ওই দ্যাখো ওভেনে এখনও আছে। বারোটা দিকে তোমার সঙ্গে একবার কথা হল। কেন তোমার মনে নেই?
আমি সাড়ে তিনটের দিকে ফোন করেছিলাম। তখন ফোন ধরনি কেন? মাহাতাবের কন্ঠস্বর কেমন শীতল শোনালো।
ফোন করেছিলে? কখন? মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছিল। হুমায়ুন আহমেদের একটা বই পড়ছিলাম …
মাহাতাব আরও কাছে এগিয়ে আসে। ওর চোখমুখ কেমন কঠোর দেখায় । চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
বিয়ের আগে তোমার সঙ্গে কারও সম্পর্ক ছিল উর্মি?
উর্মি কি উত্তর দেবে? ওর সারা মুখে নোনতা ঘাম পড়েছে । মুখটা তিতা লাগছে। জিভ ভারী। নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে।
মাহাতাব বলে, বিয়ের আগে ভালোবাসার সম্পর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু তাই বলে বিয়ের পরও কনটিনিউ করা …ছিঃ … আমি তোমাকে বিশ্বাস করতাম …
উর্মির সারা শরীর কেঁপে ওঠে। উর্মি জানে মাহাতাব আনজুম-এর মতো রাফ না। ওর গায়ে হাত তুলবে না। তবে মাহাতাব আর একসঙ্গে থাকবে না।
মুহূর্তেই অনেক কিছু পরিস্কার হয়ে ওঠে।
হয়তো … হয়তো উর্মিক ” নাহ! ওদের হাত থেকে আমরা বোধহয় কখনোই বাচঁবো না”
এভাবেই নিজের রাগ প্রকাশ করছিলো আনিকা হোস্টেলে নতুন আসা মেয়ে নিতুর কাছে। আনিকা পড়ে ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার এ।
কলেজের হোস্টেলে থাকে ও। হঠাৎ করে বাসার সবাইকে ছেড়ে এখানে একা একা থাকতে ওর প্রথম প্রথম বেশ খারাপ লাগতো।
এখন সবার সাথে মানিয়ে নিয়েছে ও নিজেকে।বাসার কথা খুব বেশি মনে পড়ে না এখন। আর তাছাড়া এখানে সবাই ওর মতো একা থাকে,
কারোর বাবা মাই সাথে থাকে না।তাই ওরা থাকতে পারলে ও কেন পারবে না।এভাবেই নিজেকে দিনের পর স্বান্তনা দিয়েছে আনিকা।
হোস্টেলে থাকতে ভালোই লাগে এখন। সকালে সবাই একসাথে কলেজে যায়। ক্লাস শেষে রুমে ফিরেই আড্ডা।
আবার মাঝে মাঝে সবাই মিলে ঘুরতে যায় বিকালে।এভাবেই প্রতিটা দিন কেটে যাচ্ছে আনিকা ও তার বান্ধবীদের।
ওদের হোস্টেল জীবনটা পুরোপুরি সুখের হতো যদি হোস্টেলে শুধু ওরা,কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের মেয়েরা থাকতো।
কলেজের হোস্টেল ১টা হওয়ায় ফার্স্ট ও সেকেন্ড ইয়ার একসাথে থাকে।
সেকেন্ড ইয়ারের মেয়েরা ফার্স্ট ইয়ার কে কখনোই বেশি পাত্তা দিতে চায় না এবং যখন-তখন অপমান করে বসে।
বিশেষ করে হোস্টেলের দোতালার ২৩০ নং রুমে থাকা সেকেন্ড ইয়ারের রুমকি,কনক ও মিতুল খুব বেশি জ্বালায় ফার্স্ট ইয়ারের মেয়েদের।
আর যদি হোস্টেলে নতুন কোন মেয়ে আসে তাহলে তো কথাই নাই।অন্ততঃ ১ সপ্তাহ তার পিছনে লেগে থাকে ওরা।
আনিকারা মাঝে মাঝে ভাবে ১টা মেয়ে কিভাবে অন্য মেয়েদের এতো বিরক্ত করে।
মাত্র ২ দিন হলো নীতু হোস্টেলে এসেছে আর ওরাও যথারীতি নীতুকে নাজেহাল করে ছাড়ছে।১ম দিন ডাইনিং এ যে অপমান করলো ওরা নীতুকে;
বেচারী শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো আনিকার দিকে আর আনিকা দাঁত কিড়মিড় করে বলল “ওদের হাত থেকে আমরা বোধহয় আর কখনোই বাচঁবো না।
” ওদের কটুক্তি থেকে বাচঁতে তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে রুমে এসে দরজা লক করলো ওরা ৪জন- শ্রাবণ,সৌমি,আনিকা ও নীতু।
কিন্তু একটু পরেই দরজায় নক করা শুনে বুঝলো বজ্জাত ৩টা এসেছে। অনিচ্ছা স্বত্তেও দরজা খুলল শ্রাবণ। রমে ঢুকেই কনক বলল “ইহ!
গন্ধে তোদের রুমে ঢোকা যাচ্ছে না,তোরা কি বিছানায় হাগু করিস নাকি? “রাগে শ্রাবণ কিছু বলতে পারলো না। তবে সৌমি বেশ রাগেই বলল
“কনক আপু আমাদের পরীক্ষা কাল,আমরা এখন পড়বো।”এক ধমকে সৌমিকে চুপ করিয়ে দিলো কনক তারপর কিছুক্ষণ নীতুকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করে চলে গেলো।
নীতুর হোস্টেলের ১ম রাতটা কাটলো কান্না কাটি করে। এধরনের যন্ত্রণা তবুও মেয়েরা সহজে মেনে নিতো,
কিন্তু কনকদের ভয় দেখানো টাইপ জ্বালাতন হজম করতে মেয়েদের বেশ কষ্ট হতো।। কনক কলেজের ১ ম্যাডামের কাছ থেকে জেনেছিলো যে অনেক বছর আগে
হোস্টেলের ছাদ থেকে পড়ে ১টা মেয়ে মারা গিয়েছিলো;হোস্টেলের সিঁড়িতে মেয়েটির রক্তাক্ত দেহ পাওয়া গিয়েছিলো। এটা স্রেফ ১টা দূর্ঘটনা ছিলো কিন্তু কনকরা
হোস্টেলের মেয়েদের বলতো যে ঐ মেয়েটির আত্মা নাকি রাতে হোস্টেলের করিডর ধরে হাটাহাটি করে। যদিও কেউ কোনদিন এমন কিছুই দেখেনি কিন্তু কনকদের মুখে
এই কথা শুনে ভয় সবাই ঠিকই পেতো।আর মাঝে মাঝে তো কনকরা কোন কোন মেয়েকে করিডরে দাড় করিয়ে রাখতো।। কোন ১ সন্ধায় রুমকি ও মিতুল এমন কিছু করে মজা
লোটার হামলা চালায় আনিকাদের রুমে। রুমে ঢুকেই আনিকাকে বলল “যা করিডরে গিয়ে দাড়িয়ে থাক,যতক্ষণ না আমরা তোকে ভিতরে আসতে বলি”।
বুকের ভিতর শুরু হওয়া সাইক্লোনকে পাত্তা না দিয়ে আনিকা করিডরে চলে এলো।
হোস্টেলটা অনেক আগের বলে করিডরটা চওড়ায় অনেক বড়।করিডরের এক মাথায় নিচে নামার সিঁড়ি আর অন্য মাথায় সারি দিয়ে বাথরুম।
হেমন্তের হালকা শীতে সন্ধা হলেও হোস্টেলের মেয়েরা যে যার রুমে দরজা লক করে হয়ত পড়ছে বা গল্প করছে। আর বাইরে নিস্তব্ধ পরিবেশে নিরেট অন্ধকারে একা দাড়িয়ে আছে আনিকা।
অন্ধকার এতো গাড়ো কেন তা ভাবতেই আনিকার মনে পড়লো আজ অমাবস্যা।।হঠাৎ এক ঝটকা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেলো করিডরে।
আনিকা দাড়িয়ে আছে ঠিক ওদের রুমের সামনে,করিডরের মাঝামাঝি। মনে হলো হাওয়াটা আসলো আনিকার ডানদিক অর্থাৎ সিঁড়ির দিক থেকে।
আচমকা বয়ে যাওয়া হাওয়ার দিকে তাকিয়ে প্রায় আত্কে উঠলো আনিকা। অমাবস্যার রাত তবুও ষ্পস্ট দেখলো সিঁড়িতে কেউ দাড়িয়ে আছে।
কে ওখানে ভবতেই একটুখানি আলো জ্বলে আবার নিভে গেলো।সেই আলোতে যা দেখল আনিকা তাতে তার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা ভয়ের স্রোত বয়ে গেলো এবং
কান ফাটানো চিৎকার দিয়ে সে পড়ে গেলো মেঝেতে। ওদিকে সিঁড়িতে দাড়িয়ে থাকা কনক জোরে হাসতে যেয়ে থেমে গেলো।
মুখে সস মেখে একটা ছোটো টর্চ ঠিক মুখের সামনে রেখে একবার অন করেই অফ করে দিয়েছিলো সে।
রক্তাক্ত ১টা মুখ দেখেছে ভেবে ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে করিডরে পড়ে আছে আনিকা। এতটা করতে চায়নি কনক।
দৌড়ে আনিকার কাছে গেলো সে।অন্য দিকে হোস্টেলের প্রায় সব মেয়ে করিডরে এসে হাজির। রুমে নিয়ে গিয়ে মুখে পানি দিয়ে জ্ঞান ফেরানো হলো আনিকার।
হোস্টেল সুপারের ঝাঁড়ি খেয়ে চুপচাপ এক কোণায় দাড়িয়ে আছে কনক,মিতুল ও রুমকি।এতে অবশ্য ওদের কিছুই হয়নি। তবে কনককে দেখে মনে হচ্ছে সে কিছুটা লজ্জিত।
সে নিজে থেকেই আনিকাকে সরি বলে আসল ঘটনা খুলে বলল এবং ওরা ৩জনই বলল এ ধরনের ফাজলামি তারা আর করবে না।
আনিকা স্বাভাবিক হওয়ার পর যে যার রুমে চলে গেলো। কনকরা রুমে গিয়ে ঢুকলো তখন প্রায় রাত ১১টা বেজে গেছে।এত তাড়াতাড়ি ওরা ঘুমায় না তাই ৩জনে আড্ডা দিতে বসলো।
গল্পে গল্পে যে কখন রাত ১টা বেজে গেছে ওরা টেরই পায়নি ।
ঘড়ির দিকে চোখ পড়া মাত্রই শুয়ে পড়লো মিতুল ও রুমকি আর বাথরুমে যাবে বলে বের হলো।পুরা হোস্টল তখন ঘুমিয়ে পড়েছে।
কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা বাথরুমে এসে ঢুকলো কনক। হাসি ঠাট্টায় এতক্ষণ মনে ছিলো না সন্ধার কথা;
এখন মনে পড়লো এবং মনে মনে অনুতপ্ত হলো কনক।হঠাৎই মৃদু শব্দ করে বাথরুমের লাইটটা নিভে গেলো।
কনক এতটা ভীতু না হলেও এত রাতে হঠাৎ আলো নিভে যাওয়ার গাঁ ছমছম করে উঠলো ওর।
হাতড়ে পাতড়ে বাথরুমের দেয়াল ধরে ধরে দরজা খুঁজতে লাগলো কনক।
কারো নিঃশ্বাস ওর ঘাড়ে অনুভব করা মাত্রই পিছনে তাকালো কনক। কিন্তু তাকিয়ে লাভ কি;ঘুটঘুটে অন্ধকারে কিছুই দেখতে পেলো না ও।
অথচ নিজের ঘাড়ে কারো নিঃস্বাশ ফেলার মত গরম হাওয়া সে অনুভব করেছে;কিন্তু বাথরুমে তো আর কেউ নেই।দৌড়ে ওখান থেকে চলে যেতে ইচ্ছা হলো কনকের।
আরো দ্রুত দরজা খুঁজতে লাগলো সে।
দরজার ছিটকানিতে হাত ঠেকা মাত্রই দরজা খুলে দৌড়ানো শুরু করলো কনক।দৌড়ে ৪-৫ কদম আসার পর কিছুতে ধাক্কা খেয়ে দাড়িয়ে যাওয়ার মত থামলো কনক।
স্পষ্ট দেখলো কেউ দাড়িয়ে আছে সিঁড়িতে।
শুধু দাড়িয়েই আছে না আস্তে আস্তে সামনে আসতে শুরু করেছে।আর তখনি হঠাৎ কোথা থেকে একটুখানি আলো জ্বলে আবার নিভে গেলো।
সেই আলোতে কনক দেখলো রক্তাক্ত বীভৎস একটা মেয়ের মুখ।তীব্র চিৎকার দিতে চাইলো কনক কিন্তু মুখ হা করলেও গলা দিয়ে কোন শব্দই বের হলো না।
এবার সে অনুভব করলো ঠিক তার পিছনেই কেউ দাড়িয়ে আছে। চিন্তাটা মাথায় আসায় পিছনে তাকাতেই আবারো আত্কে উঠলো কনক।
ঠিক তার পিছনেই দাড়িয়ে আছে একটু আগে সিঁড়িতে দেখা রক্তাক্ত মেয়েটি,যার বীভৎস পঁচা গলা মুখটি কনকের ঠিক ১হাত সামনে। পঁচা মাংসের গন্ধে বমি এসে গেলো কনকের।
তখনি মেয়েটি ১হাত বাড়িয়ে দিলো কনকের দিকে।এবার কনকের মুখ দিয়ে বিকট শব্দ বের হলো এবং সে জ্ঞান হারালো। আর্শ্চয্যজনকভাবে তখনি বাথরুমের লাইটটা জ্বলে উঠলো। ।
কনকের জ্ঞান ফেরেনি আর কখনো,তাই সেদিন কি ঘটেছিলো কেউ জ্বানলো না কখনো।
আনিকার সাথে কনক যা করেছিলো সেদিন সন্ধায়,ঠিক ১২ বছর আগে কোন এক সন্ধায় একই ঘটনা ঘটেছিলো ফার্স্ট ইয়ারের মেয়ে তাহিয়ার সাথে।
আনিকা স্বাভাবিক হলেও তাহিয়া স্বাভাবিক হতে পারে নাই তাই অন্যমনষ্ক হয়ে ছাদে হাটাহাটি করার সময় নিচে পড়ে মারা যায় সে।
হয়ত ১২ বছর পর প্রতিশোধ নিতে ফিরে এসেছিলো সে।। ( সমাপ্ত )
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now