বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

শিকড়ের গল্প

"ছোটদের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Foysal Ahmed (guest) (০ পয়েন্ট)

X শিউলিপুর নামের ছোট্ট এক গ্রাম। চারদিকে সবুজ, কাঁচা রাস্তা, পাখির ডাক, আর মানুষের সহজ-সরল জীবন। সেই গ্রামের এক কোণে বাস করত রায়হান নামে এক কিশোর। তার চোখে ছিল বড় স্বপ্ন—কিছু একটা হওয়ার, নিজের জীবনকে বদলে দেওয়ার। কিন্তু তার একটা বড় সমস্যা ছিল—সে শুরু করতে পারত, কিন্তু শেষ করতে পারত না। একদিন সে পড়াশোনায় মন দিত, আরেকদিন নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করত, আবার কয়েকদিন পর সব ছেড়ে দিত। কোনো কাজেই তার ধারাবাহিকতা ছিল না। ধীরে ধীরে তার ভেতরে একটা ভয় জন্ম নিল—“আমি কি সত্যিই কিছু হতে পারব?” এক বিকেলে সে গ্রামের পাশের পুরোনো বটগাছটার নিচে এসে বসে রইল। সূর্যের আলো তখন মাটিতে নরমভাবে পড়ছে, চারপাশে এক ধরনের নিস্তব্ধতা। সেই সময় গ্রামের এক বৃদ্ধ মালী, হাশেম চাচা, সেখানে এসে বসলেন। রায়হানের মুখ দেখে তিনি বুঝলেন, ছেলেটার ভেতরে অনেক প্রশ্ন, অনেক অস্থিরতা। তিনি মৃদু হেসে বললেন, “কী রে রায়হান, এত চুপচাপ কেন?” রায়হান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “চাচা, আমি কিছুই ঠিকমতো করতে পারি না। সব শুরু করি, কিন্তু শেষ করতে পারি না। মনে হয় আমি ব্যর্থ হয়ে যাব।” হাশেম চাচা মাটির দিকে তাকিয়ে ধীরে বললেন, “চল, তোকে একটা গাছের গল্প বলি।” রায়হান মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল। চাচা বলতে শুরু করলেন— “অনেক বছর আগে আমি একটা ছোট্ট আমগাছ লাগিয়েছিলাম। জায়গাটা ভালো ছিল না—মাটি শক্ত, পানি কম, আর চারপাশে আগাছা। গ্রামের লোকেরা বলেছিল, ‘এই গাছ বাঁচবে না, সময় নষ্ট করো না।’ কিন্তু আমি গাছটা কাটিনি। আমি প্রতিদিন একটু একটু করে যত্ন নিতে শুরু করলাম। মাটি নরম করলাম, পানি দিলাম, আগাছা তুলে ফেললাম। প্রথমে কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছিল না। মনে হতো, সব পরিশ্রম বৃথা যাচ্ছে। তারপর একদিন ঝড় এলো। গাছটার অনেক ডাল ভেঙে গেল। তখন সবাই বলল, ‘এবার শেষ।’ কিন্তু আমি আবার যত্ন নিলাম। ভাঙা ডাল কেটে দিলাম, আবার পানি দিলাম, আবার অপেক্ষা করলাম। বছর পেরিয়ে গেল। একদিন দেখলাম, সেই ছোট্ট গাছটা বড় হয়ে গেছে। এখন সেটা ফল দেয়, ছায়া দেয়। সবাই এখন বলে, ‘কি সুন্দর গাছ!’ কিন্তু কেউ জানে না, এই গাছটার পেছনে কত ধৈর্য আর যত্ন লেগেছে।” রায়হান গভীর মনোযোগ দিয়ে গল্পটা শুনছিল। তার মনে হলো—এই গল্পটা যেন শুধু গাছের না, তার নিজেরও। হাশেম চাচা বললেন, “মানুষের জীবনও ঠিক গাছের মতো। শুধু স্বপ্ন দেখলেই হয় না—সেই স্বপ্নকে যত্ন নিতে হয়, সময় দিতে হয়, ধৈর্য ধরতে হয়। গাছ যেমন একদিনে বড় হয় না, মানুষও একদিনে সফল হয় না।” এই কথাগুলো রায়হানের হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে গেল। পরদিন থেকেই সে নিজের জীবনে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিল। সে ঠিক করল—একসাথে অনেক কিছু না করে, একটা কাজ বেছে নেবে, এবং সেটাতেই নিয়মিত থাকবে। সে পড়াশোনাকে নিজের লক্ষ্য বানাল। প্রথমে তার জন্য এটা খুব কঠিন ছিল। বই খুললে মন বসত না, বারবার মনে হতো—“আজ না পড়লেও হবে।” কিন্তু সে নিজেকে থামাত। হাশেম চাচার কথা মনে করত—“গাছ একদিনে বড় হয় না।” দিন যেতে লাগল। ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারল, সে আগের থেকে অনেক বেশি শিখছে। তার ভিতরে আত্মবিশ্বাস তৈরি হতে লাগল। কিন্তু জীবন কখনো সহজ হয় না। মাঝেমধ্যে সে ব্যর্থ হতো। পরীক্ষায় খারাপ করত, অন্যদের এগিয়ে যেতে দেখত। তখন তার মন ভেঙে যেত। মনে হতো—“সব ছেড়ে দিই।” কিন্তু ঠিক তখনই তার মনে পড়ত— ঝড়ে ডাল ভাঙলেও গাছটা বেঁচে থাকে, যদি যত্ন নেওয়া হয়। সে আবার উঠে দাঁড়াত। একদিন গ্রামের ওপর দিয়ে ভয়ংকর ঝড় বয়ে গেল। অনেক গাছ উপড়ে পড়ল, অনেক ক্ষতি হলো। পরদিন সকালে রায়হান দৌড়ে গেল সেই আমগাছটার কাছে। সে অবাক হয়ে দেখল—গাছটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে! কিছু ডাল ভেঙেছে, পাতা ঝরে গেছে, কিন্তু গাছটা পড়ে যায়নি। সে হাশেম চাচাকে জিজ্ঞেস করল, “চাচা, গাছটা টিকে গেল কেন?” চাচা শান্তভাবে বললেন, “কারণ এর শিকড় শক্ত।” এই একটি বাক্য রায়হানের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। সে বুঝল— জীবনে ঝড় আসবেই—ব্যর্থতা, কষ্ট, মানুষের কথা, নিজের সন্দেহ। কিন্তু যার ভিতরটা শক্ত, তাকে সহজে ভাঙা যায় না। সেই দিন থেকে সে শুধু পড়াশোনা নয়, নিজের চরিত্র গড়ার দিকেও মন দিল। সে সময়ের মূল্য দিতে শিখল, ধৈর্য ধরতে শিখল, নিজের খারাপ অভ্যাসগুলো বদলাতে শুরু করল। সে বুঝে গেল— গাছের শিকড় যেমন মাটির নিচে শক্ত হয়, তেমনি মানুষের চরিত্রও ভিতর থেকে গড়ে ওঠে। বছর পেরিয়ে গেল। রায়হান এখন আর আগের মতো নেই। সে আত্মবিশ্বাসী, ধৈর্যশীল, আর পরিশ্রমী একজন মানুষ হয়ে উঠেছে। গ্রামের মানুষ এখন তাকে সম্মান করে। কিন্তু সে নিজেকে কখনো বড় ভাবেনি। একদিন ভোরে, যখন সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে, সে তার লাগানো একটি নতুন চারাগাছের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিক তখনই একটি ছোট ছেলে—সাইফ—তার কাছে এলো। তার হাতে ছিল একটি শুকিয়ে যাওয়া গাছ। সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “ভাইয়া, আমার গাছটা বাঁচছে না। আমি কি পারব না এটাকে বড় করতে?” রায়হান নিচু হয়ে গাছটার দিকে তাকাল। তারপর মৃদু হেসে বলল, “পারবি—যদি তুই হাল না ছাড়িস।” সে নিজে গাছটা আবার লাগিয়ে দিল, মাটি ঠিক করল, পানি দিল। তারপর বলল, “আজ থেকে আমরা দু’জন মিলে এই গাছটার যত্ন নেবো।” ছেলেটার চোখে আবার আশা ফিরে এলো। সেই মুহূর্তে রায়হান বুঝতে পারল— জীবনের আসল সাফল্য একা বড় হওয়া না, বরং অন্যকে বড় হতে সাহায্য করা। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল, “চাচা, আপনার শিক্ষা এখনো বেঁচে আছে।” তার মনে হলো—হাশেম চাচা হয়তো আর নেই, কিন্তু তার শেখানো শিক্ষা আজও বেঁচে আছে, নতুন মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যাচ্ছে। দিন শেষে, সন্ধ্যার আলো যখন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে, রায়হান সেই বড় গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকে। বাতাসে পাতার শব্দ হয়—যেন নীরবে কিছু বলছে। সে চোখ বন্ধ করে অনুভব করে— এই গাছটা শুধু গাছ না, এটা তার জীবনের প্রতিচ্ছবি। সে বুঝে গেছে— জীবন দ্রুত বড় হওয়ার নাম না, জীবন গভীরভাবে বড় হওয়ার নাম। যে মানুষ ধৈর্য ধরে, নিজের ভিতরটাকে শক্ত করে, নিয়মিত চেষ্টা করে— সে একদিন শুধু নিজেই বড় হয় না, অন্যদের জন্য ছায়া হয়ে দাঁড়ায়। একটা গাছের যত্ন নিলে সে একদিন ছায়া দেয়, আর একটা মানুষের যত্ন নিলে সে একদিন আলো হয়ে যায়।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৫৮ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now