বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
WOLF MOUNTAIN
লেখক : জে. আর. পিন্টো
ভাষান্তরে : সুপ্রিয়া বন্দ্যোপাধ্যায়
পর্ব ৪
পরদিন সকাল আট'টার মধ্যেই কোকো তার গাড়িতে গ্রীন'কে নিয়ে হাজির হয়ে গেল তার কাজিন সেইন্ট-ফোর্টের বাড়িতে। যদিও কোকো ওদের সঙ্গে যেতে পারছে না বলে মনে মনে সে একটু ক্ষুন্ন তবু ওদের মুখের ওপর কিছু বলতেও পারল না। গ্রীন ওকে আশ্বস্ত করে শুধু বলেছে, "চিন্তা কোরো না। আমি ঠিকই থাকব"।
কোকো বলেছে, "কিন্তু তুমি তো আগে কখনো সিটেসলেইলের বস্তিতে যাও নি। ওখানকার লোকগুলো কেমন হয়, ধারণাতেও নেই তোমার"।
"....তাতে কি হয়েছে?" বলেছে গ্রীন, "আমার সঙ্গে তো তোমার কাজিন থাকবে"।
কোকো এবার ঘুরে তাকাল ওর কাজিনের দিকে। অসহায় চোখদুটো ভরে উঠেছে জলে। মিনতিভরা গলায় বলল,"তোমার কাছে অনুরোধ রইল, কোনো রকম রিস্ক নিতে যেও না।"
কাঁধ ঝাঁকিয়ে নীরবে কোকো'কে আশ্বস্ত করে সেইন্ট-ফোর্ট তার গাড়ির দরজা খুলে ইশারায় গ্রীন'কে ভেতরে বসতে বলল। গ্রীন ওর গাড়িতে গিয়ে উঠতেই এঞ্জিন স্টার্ট করে দিল সেইন্ট-ফোর্ট। কোকোর কাছে বিদায় নিয়ে ওদের গাড়ি সাঁ করে বেরিয়ে গেল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই শহর এলাকা ছাড়িয়ে বাইরে চলে এলো ওরা।
"....তুমি এর আগে কখনো সিটেসলেইলের বস্তিতে গিয়েছিলে?" প্রশ্ন করল গ্রীন। ওর সিটের জানলার পাশ দিয়ে মাঠ-ঘাট-গাছপালাগুলো সাঁ সাঁ করে দ্রুতবেগে পিছনে চলে যাচ্ছে। আজকের দিনটা বেশ গরম। সেইন্ট-ফোর্টের গাড়িতে কোনো বাতানুকূল যন্ত্রের ব্যবস্থা নেই।
"...দ্বিতীয়বার আমাকে কিডন্যাপ করার আগে পর্যন্ত কখনো যাইনি ওখানে", উইন্ডস্ক্রিনের দিক থেকে চোখ না সরিয়েই বলল সেইন্ট-ফোর্ট।
বিস্মিত হলো গ্রীন ওর কথায়। ঠিক বুঝতে পারল না, কি বোঝাতে চাইল ছেলেটা। তাই বলল, "এক্সকিউজ মী, 'দ্বিতীয়বার কিডন্যাপ হবার আগে পর্যন্ত কখনো যাওনি' - এর মানে?"
গ্রীনের দিকে না তাকিয়েই একটু হাসবার চেষ্টা করল সেইন্ট-ফোর্ট। বলল, "তোমরা আমেরিকানরাই এখানে সসবচেয়ে সুরক্ষিত। কারণ এখানকার গুন্ডা-বদমাশগুলো জানে, খুব ভালো করেই জানে, তোমাদের গায়ে হাত দিলে স্বয়ং তোমাদের প্রেসিডেন্ট কিরকম কড়া হাতে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু আমরা?" বলে নিজের ছাতিতে ঠুকে নিজেকেই দেখিয়ে সেইন্ট-ফোর্ট বলল, "এখানে যারা ধনী হাইতিয়ান আছে, তারা মোটেও সুরক্ষিত নয়। প্রায়ই গুন্ডা-বদমাশগুল
ো কিডন্যাপ করে নিয়ে যায় আর অপহৃতের মা-বাবার কাছে মোটা টাকা মুক্তিপণ চেয়ে বসে। আর ওই গুন্ডা-বদমাশদের ডেরা হচ্ছে ওই সিটেসলেইলের বস্তি"।
অবাক হয়ে ওর কথাগুলো শুনছিল গ্রীন।
একসময় ওদের গাড়ি এসে পৌঁছল সিটেসলেইলের বস্তিতে।
সত্যিই, সেইন্ট-ফোর্টের কথাই সত্য। শহরের বাইরে এ এক বিশাল ঘিঞ্জি বস্তি এলাকা। অগুনতি কংক্রিটের ছোট-বড় বিল্ডিং এবং গিজগিজে ভিড়ে ঠাসা নোংরা রাস্তাঘাট যে কারোর মনে বিরক্তি না জাগিয়ে পারে না। তারই মধ্যে এখানে ওখানে দোকানপাট, আবার কোথাও বা শিশুরা নিজেদের মধ্যে খেলাধুলোয় মেতেছে। শিশুদের মাথার চুলের রঙ কমলা রঙের। সেইন্ট-ফোর্টের কাছে গ্রীন শুনল, দীর্ঘদিন অপুষ্টিতে ভুগে ওদের মাথার চুল কমলাবর্ণ ধারণ করেছে। বেশীরভাগ শিশুর পরনে পোশাকআশাকের কোনও বালাই নেই। একটা জলাধারকে পাশ কাটিয়ে গাড়িটাকে একটা জায়গায় পার্ক করাল সেইন্ট-ফোর্ট। জলাধারটার ধারে দেখা গেল বেশ কয়েকজন যুবতী মেয়ে প্রায়-উলঙ্গ হয়ে স্নান করছে আর নিজেদের মধ্যে খোশগল্প করছে। বোঝাই গেল, ওরা এই বস্তিরই মেয়ে।
গাড়ি থেকে নামতে নামতে গ্রীন মাথায় একটা বড় সাইজের হ্যাট এমনভাবে চাপিয়ে নিল যাতে কারোর নজর ওর ওপর না পড়ে। তাহলেই সাদা চামড়ার মানুষ দেখে ওর পেছনে লেগে যাবে সবাই।
"...সহজ স্বাভাবিকভাবে হাঁটব আমরা", ফিসফিসিয়ে বলে উঠল সেইন্ট-ফোর্ট, "যাতে লোকের নজর আমাদের ওপর না পড়ে"।
ময়লা-আবর্জনার স্তুপের পাশ কাটিয়ে কিছুটা এগোতেই হঠাৎ গ্রীনের চোখের সামনে ধরা দিল নীল ক্যারিবিয়ান সাগর। স্বপ্নের পরীর মতো। অবাক লাগল গ্রীনের। এতক্ষণ একটা নোংরা আবর্জনাময় স্থানের পাশেই যে এত সুন্দর নারকেল বীথিকায় ছাওয়া একটা সোনালি বালুকাময় সমুদ্রতট থাকতে পারে, তা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি গ্রীন। নীল অথৈ সাগরের বুকে শুধু দুটো ট্যাঙ্কারকে নোঙর করে থাকতে দেখা গেল। একটা ছোট নালা বস্তির সঙ্গে যুক্ত করেছে সাগরকে। বস্তির যত আবর্জনা ময়লা সব ভেসে এসে প্রবাহিত হচ্ছে সাগরে। দৃশ্যটা দেখে আপনা থেকেই নাক-মুখ ঘৃণায় বিরক্তিতে কুঞ্চিত হয়ে উঠল।
সমুদ্রের বালুতটের ওপর একখানা মাত্র কাঠের খুপরি ঘর নিঃসঙ্গ অবস্থায় দাঁড়িয়ে। সেইন্ট-ফোর্ট গ্রীন'কে নিয়ে সেই কাঠের ঘরটার সামনে এসে দাঁড়াল। ঘরের দরজাটি বন্ধ। সেইন্ট-ফোর ধীরেধীরে নক করল দরজার গায়ে। কাউকে যেন হাঁক পেড়ে বলল, "বাটু আছো নাকি ভেতরে?"
সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে কেউ যেন হাঁকল, "কে?"
বাইরে দাঁড়িয়েই নিজের পরিচয় দিল সেইন্ট-ফোর্ট। তারপর বলল, "তোমার জন্য খদ্দের এনেছি গো, বাটু খুড়ো। একজন আমেরিকান"।
ধীরেধীরে জীর্ণ দরজাটার কপাট দু-ফাঁক হলো। এক অশীতিপর বৃদ্ধের চেহারা ফুটে উঠল দরজায়। সন্দিগ্ধ চোখে ওদের দুজনকে লক্ষ্য করতে লাগল সে। বিশেষ করে আশার গ্রীন'কে। পরনে তার একটা নোংরা হাওয়াই শার্ট আর মাথায় একটা অদ্ভুত ধরনের খড়ের টুপি। গ্রীনকে কিছুক্ষণ লক্ষ্য করতে করতে সে বলল, "আমেরিকান খদ্দের!" একটু তাচ্ছিল্য ফুটে উঠল ওর গলায়।
"....সব কথা পরে হবে", বলল সেইন্ট-ফোর্ট, "আগে ভেতরে তো বসতে দাও"।
বৃদ্ধ বাটু ওদের আপ্যায়ন করে ভেতরে নিয়ে গিয়ে বসালো। গ্রীন জীবনে কখনো এই ধরনের বাড়িতে প্রবেশ করেনি, তাই এখন একটু অজান্তেই অস্বস্তি অনুভব করতে লাগল। ঘরে ঢুকেই সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বৃদ্ধের ঘর লক্ষ্য করতে লাগল। ঘরে ইলেকট্রিক বাতির বালাই নেই, চেরা বাঁশের ফাঁক দিয়ে বাইরের আলো ঢুকছে, তাতেই যতটুকু আলোকিত হয়ে আছে ঘরটা। বাটু'কেও ভালো করে লক্ষ্য করে বুঝল, বৃদ্ধ হেরোইন প্রভৃতি মাদক সেবন করে আর তাই হয়তো অন্ধকার এবং নিরালা পরিবেশ তার বড় প্রিয়। বৃদ্ধের ছোট্ট ঘরটার দেওয়াল জুড়ে শুধু খ্রীষ্টিয় সন্ন্যাসীদের ছবি। একখানা টেবিল ঘরে আর সেই টেবিলের ওপর দুনিয়ার ছোট-বড় মূর্তি, পুতুল, কাঠের ক্রশ এবং কতগুলো হাড়।
"....কি চাই আপনার? " গ্রীনকে লক্ষ্য করে খানিকট। কর্কশ স্বরে জানতে চাইল বাটু, "কোকেন? না হেরোইন?"
গ্রীন তখনিই কিছু না বলে পকেট থেকে কুড়ি ডলার বের করে বৃদ্ধের হাতে দিতে দিতে বলল, "কয়েকটা ইনফর্মেশন চাই"।
বাটুর মুখখানা সঙ্গে সঙ্গে যেন অন্ধকার হয়ে এলো। ঘৃণা এবং ক্রোধের যুগপৎ প্রতিক্রিয়া ফুটে উঠল ওর মুখে। একটু চুপ করে থেকে সে বলল, "আপনি তাহলে পুলিশের লোক?"
"....জ্বি না", গলায় পেশাদারিত্ব ফুটিয়ে বলল গ্রীন, "আমি CIA, FBI, বা ATF - বা এরকম কোনও 'ল' এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির অফিসার নই। আমি একজন সাধারণ রিপোর্টার। সাংবাদিক। আমি হেনরী ক্রিস্টোফারের ব্যাপারে কিছু ইনফর্মেশন নেবার জন্য এসেছি"।
হেনরী ক্রিস্টোফারের নাম শুনেই চোখদুটো বড় বড় হয়ে উঠল বাটু'র।
"....হেনরী ক্রিস্টোফার...? লেস ডায়াব্লেস?.... সেই ক্রিমিনাল সংস্থা?" অন্যদিকে চেয়ে নিজের মনেই স্বগতোক্তি করল বাটু, তারপরেই যেন সচকিত হয়ে গ্রীনের দিকে চেয়ে ততোধিক কর্কশ গলায় বলল, "না, বলব না। ওই সংস্থার নাম আমার সামনে করবেন না। আপনি বেরিয়ে যান এখান থেকে"।
পকেট থেকে আরও কুড়ি ডলার বের করে বাটু'র দিকে এগিয়ে দিতে দিতে গ্রীন শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, "কেন? ওই এজেন্সির নামে এত ভয় কেন তোমার?"
এই প্রশ্নে খানিকটা যেন থতমত খেয়ে গেল বাটু। তারপর আশেপাশে এমন ভয়ার্ত দৃষ্টিতে চাইতে লাগল যেন সে কোনও খাঁচাবন্দি ভীত জন্তু। ওর চোখদুটো হয়ে উঠেছে বিস্ফারিত, বুকটা ওঠানামা করছে হাপরের মতো। কতক্ষণ পর সামান্য ধাতস্থ হয়ে হঠাৎ গ্রীন'কে এত জোরে ধাক্কা মেরে ঠেলে সরিয়ে দিল যে ওর এই অতর্কিত আক্রমণে টাল সামলাতে না পেরে গ্রীন পড়ে যাচ্ছিল প্রায় কিন্তু একটা টেবিল ওকে বাঁচিয়ে দিল। অপ্রত্যাশিত এই ঘটনার জন্য গ্রীন বা সেইন্ট-ফোর্ট কেউই প্রস্তুত ছিল না। টেবিলের কানাটা ধরে গ্রীন কোনওভাবে নিজের পতন ঠেকালেও ততক্ষণে বাটুর হাতে উঠে এসেছে একটা রাম-দা। সেটা বাগিয়ে ধরে ওকে আক্রমণের জন্য উদ্যত হলো। মূহুর্তের হতবিহ্বল অবস্থাটা কাটিয়ে উঠেই সেইন্ট-ফোর্ট পকেট থেকে বিদ্যুৎবেগে একটা রিভলভার বের করে এনে মেঝের দিকে ধাঁ করে গুলি চালিয়ে দিল। সতর্ক করে দিতে চাইল বাটু'কে। ওকে নিঃশব্দে বোঝাতে চাইল, আর একবার বেয়াদবি করতে এলে এই রিভলভার ওকে শেষ করবে। বদ্ধ ঘরে গুলির আওয়াজটা বড্ড বেশী জোরালো শোনাল। বাইরে থেকে নারীকন্ঠের একটা আর্তনাদ কানে এলো। ব্যস, এই পর্যন্তই। সেইন্ট ফোর্টের হাতে রিভলভার দেখে একটু যেন থমকে গেল বাটু। চরম ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে তাকাল সেইন্ট-ফোর্টের দিকে। ক্রিওল ভাষায় বিড়বিড় করে কি যেন বলল। গ্রীনের মনে হলো, বুড়োটা যেন ওদের অভিশাপ দিচ্ছে।
"...ফেলে দাও ওটা বলছি", কঠিন গলায় বলল সেইন্ট-ফোর্ট, "নইলে এই রিভলবারের গুলি তোমাকে মূহুর্তে এফোঁড়ওফোঁড় করে দেবে"।
খানিকক্ষণ স্থবিরের মতো জায়গাতেই জমে দাঁড়িয়ে রইল বাটু, যদিও মুখেচোখে একইরকম ঘৃণার অভিব্যক্তি খেলা করছে তখনও। নেহাত রিভলবারের ভয়ে আর কোনো সাহস দেখাতে পারল না সে। হাতের রাম-দা'টা পড়ে গেল মেঝেতে। ঠং করে একটা ধাতব শব্দ উঠল। এবার রিভলভারটা ওর দিকে বাগিয়ে ধরে বাটুর দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে ওর মাথায় রিভলবারের বাট দিয়ে জোরে একটা আঘাত করল সেইন্ট-ফোর্ট।
'উঃ' বলে দু'হাতে মাথা চেপে ধরে বসে পড়ল বাটু। যন্ত্রণার কাতর আর্তনাদের সঙ্গে সঙ্গে তখনো ক্রিওল ভাষায় অনবরত প্রলাপ বকার মতো কি যেন বকে চলেছে বাটু। ওর ভাষা না বুঝতে পারলেও অনুমানে গ্রীন বুঝল, এখন আর ও ক্রুদ্ধ অভিশাপ দিয়ে কিছু বলছে না ওদের, এখন ও রিভলবারের বাটের আঘাতের যন্ত্রণায় কিছু অসংলগ্ন প্রলাপ বকছে। গ্রীন লক্ষ্য করল, বাটুর কপালের একদিক দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্তের ধারা। আঘাতটা বেশ মোক্ষমভাবেই লেগেছে ওর।
"....হেনরী ক্রিস্টোফারের ব্যাপারে এবার দয়া করে কিছু বলবে কি?" দু হাতে জামা ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়িয়ে বলল গ্রীন।
"...না! বলব না!" প্রায় চিল-চিৎকার করে বলল বাটু। তখনো দু-হাতে মাথা চেপে ধরে চোখদুটো টিপে বন্ধ করে আছে। ক্রিওল ভাষায় কথা বলছিল বাটু, তাই ওর উত্তরটা বুঝতে পারল না গ্রীন। তাই বলল, "ইংরেজিতে বলো!"
"...আমি বলছ, আমি বলব না!" এবার ইংরেজিতে সোজাসাপটা জবাব দিল বাটু।
সেইন্ট-ফোর্ট এবার বাটুর পিছনে গিয়ে ওর হাতদুটো পেছনদিকে টেনে নিয়ে এসে মুচড়ে ধরল। যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল বাটু।
"...মিথ্যেবাদী কোথাকার! " চেঁচিয়ে বলে উঠল বাটু।
"....সত্যি কথা না বেরোলে এভাবেই আরও ক্যালানি দেব", বাটুর কপালের একদিকে রিভলভার ঠেকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল সেইন্ট-ফোর্ট।
"...ক্ক...কি জানতে চাও বলো?" হাঁফাতে হাঁফাতে প্রশ্ন করল বাটু।
"...হেনরী ক্রিস্টোফার আর লেস ডায়াব্লেসের ব্যাপারে সব খুলে বল...!"
"...বলছি...বলছি", রীতিমতো এবার হাঁফাচ্ছে বাটু। একটু দম নিয়ে সে বলতে লাগল, "..আমরা...আমরা চারজন ছিলাম ওই এজেন্সি'টার সদস্য"।
"....তুমি ছাড়া আরও কে কে কাজ করত ওখানে?"
"...সি..সি...সিডাউ মার্চান্ড", নামটা উচ্চারণ করতে গিয়ে তোতলাতে লাগল বাটু।
"...মারা গিয়েছে সে", বলল গ্রীন, "আর কে কে ছিল?"
"....ম্যা...ম্যা...ম্যাথিউ লন্ড্রি..."।
"...সে'ও গতকাল মাত্র মারা গিয়েছে। তারপর?"
"....বলব...বলব...সব বলব...প্লিজ আগে রিভলভারটা সরাও। তোমরা...তোমরা ওই লেস ডায়াব্লেসের ব্যাপারে অনেক কিছুই জানো না। আগে বোঝো সবকিছু। কিন্তু তার আগে রিভলভারটা সরাও"।
"...ঠিক আছে সরালাম", বলল সেইন্ট ফোর্ট, "তবে একটু বেগড়বাঁই করার চেষ্টা করেছ কি মরবে!"
রিভলভারটা রুমাল দিয়ে একবার মুছে নিজের পকেটে ভরে নিল সেইন্ট-ফোর্ট।
মেঝেতে পড়ে থাকা একটা মলিন শার্ট কুড়িয়ে কপালের একদিকটা মুছে নিয়ে বাটু ধপ করে বসল বিছানার ওপর। তারপর বলল, "আর একজন ছিল...সে ছিল...সে ছিল একটা জানোয়ার। এখনও বেঁচে আছে ও"। একটু থেমে সে ফের বলতে লাগল, "তোমরা...তোমরা এসব বুঝবে না, ইয়ংমেন। এসব ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল টাকা থেকে। হ্যাঁ...টাকা। আমাদের খাওয়াদাওয়ার জন্য দরকার ছিল টাকা...প্রচুর টাকার। কিন্তু... কিন্তু তখন হাইতিতে কোথাও কোনও টাকাপয়সা ছিল না। লেস ডায়াব্লেসে যোগ দিয়ে আমরা টাকা কামাতে লাগলাম। কালো টাকা। ব্ল্যাক মানি। প্রথমে ওর পরিচয়টা আমরা...আমরা কেউ বুঝতে পারিনি। ওর রূপান্তর আমরা স্বচক্ষে দেখেছিলাম"।
বাইরে এখন বেলা অনেক গড়িয়েছে। গরম বাড়ছে। তবুও বাটুকে দেখে মনে হলো, সে যেন কাঁপছে। সেটা কি আতঙ্কে? কে জানে!
"...ও...ও চাইত মানুষের ক্ষতি করতে...তাদের নানাভাবে আঘাত করতে", ফের বলতে আরম্ভ করল বাটু, "যাতে... যাতে কেউ ওর সাথে ঝামেলা পাকাতে না আসে বা ওকে কেউ ধরবার চেষ্টা না করে।"
"...কে ছিল সে?" তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বাটুকে লক্ষ্য করতে করতে প্রশ্ন করল গ্রীন।
"...ওর নাম..ওর নাম ছিল লী ডায়েবেল..." কাঁপতে কাঁপতে বলল বাটু, "ওরই নামে ওই সংস্থা। লেস ডায়াব্লেস।"
মনোযোগ দিয়ে বাটুর প্রত্যেকটা কথা যেন গিলে খাচ্ছিল গ্রীন এবং সেইন্ট ফোর্ট।
"....কিন্তু... কিন্তু ডায়েবেল চাইত আরও অন্যকিছু... আরও বেশীকিছু চাইত সে...সে মানুষকে সুযোগ পেলেই খুন করে ফেলত। খুন করার আগে অকথ্য অত্যাচার চালাত ওদের ওপর। এ ব্যাপারে পুরুষ, নারী, শিশু - কাউকেই রেয়াত করত না। এমনকি এ'ও লক্ষ্য করেছিলাম, ওর টাকার দিকেও মোটেও লক্ষ্য ছিল না...লক্ষ্য ছিল শুধু মানুষ খুন করা। ওর যত আনন্দ মানুষ খুন করায়, সেই অনুপাতে টাকা রোজগারে ওর মোটেও সেরকম আনন্দ ছিল না। আমরা দিনের পর দিন বেআইনী কাজে টাকা কামিয়ে ফুলেফেঁপে উঠছিলাম কিন্তু ডায়েবেলের এদিকে একেবারেই মনোযোগ ছিল না। ওর ধ্যান-জ্ঞান তখন নরহত্যা।"
"....তারপর কি হলো?" জিজ্ঞেস করল গ্রীন।
"...ধীরেধীরে পুলিশের কাছে এইসব খুনের ব্যাপারগুলো অসহ্য হয়ে উঠল। পুলিশে যারা আমাদের লোক ছিল, তারা বলল, আর ওরা কোনওভাবেই এই খুনের কেসগুলোকে হালকাভাবে নেবে না। ওরা উঠেপড়ে লাগল....."
"...এক মিনিট ", হাত তুলে ওকে বাধা দিতে গিয়ে বলল গ্রীন, "পুলিশে তোমাদের লোক যারা ছিল - বলতে? পুলিশের মধ্যেও কি তোমাদের লোক কেউ কেউ আছে নাকি?"
"...হ্যাঁ, পুলিশে এমন একজন আছে, যারা আমাদের লোক। সব দেশে, সব সমাজেই আছে"।
"....তার নাম?"
"....প্রিডেক্স...জিন প্রিডেক্স", বলল বাটু, "সেই জিন প্রিডেক্স-ই একদিন আমাদের বলল, সে আর তার এলাকায় এসব খুন খারাপি অ্যালাউ করবে না। আমাদের সাথে সে একদিন দেখা করে এই কথাই জানিয়েছিল। আমাদের মিটিংয়ে সেদিন আমি ছাড়াও ছিলাম মার্চ্যান্ড, লন্ড্রি আর ম্যালগরি..."।
"...ম্যালগরি কে?" জিজ্ঞেস করল সেইন্ট-ফোর্ট।
"....লুইস ম্যালগরি"।
"....কোথায় আছে ও?"
"....তা জানি না। আমি কিচ্ছু জানি না এখন আর..."।
"...বেশ, এবার বলো সেদিন সেই পুলিশ অফিসার জিন প্রিডেক্স তোমাদের সাথে দেখা করে কি কি বলেছিল?"
"....সে বলেছিল যে ওই ডায়াবেল কিন্তু এবার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এরপর সে ওকে পাকড়াও করতে চায়। কারণ এরপর ওকে পাকড়াও না করলে ওকে ধরা খুব মুশকিল হয়ে যাবে"।
"....তোমরা তখন কি করলে?"
"...আমরা তখন জিন'কে জানালাম, মিয়ামি'তে কারবার চালাবার জন্য খুব শিগগীরই ডায়াবেল কয়েকজন আমেরিকানের সঙ্গে দেখা করবে। ওই মিয়ামি দ্বীপেই। জাহাজঘাটার কাছে। তারপর আমাদের কথামতো পুলিশ মিয়ামি দ্বীপের ডকের কাছে ওঁত পেতে ছিল। এভাবেই...."
"...এভাবেই তোমরা ওকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে সাহায্য করেছিলে এবং বিনিময়ে তোমরা পুলিশের নজর থেকে মুক্ত হয়ে গিয়েছিলে, তাই তো?"
ওপর-নিচে মাথা নাড়ল বাটু।
"...তারপর? "
বাটু কিছুক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে রইল গ্রীনের দিকে। তারপর হঠাৎই পাগলের মতো হাসতে শুরু করে দিল। সে যেন বদ্ধ কোনো উন্মাদের হাসি।
"...হাসছ কেন?"
"...হাসব না? তুমি বলছ, আমরা 'মুক্ত' হয়ে গিয়েছিলাম! হাঃ! মুক্ত! আমাদের দুনিয়ায় কেউ কোথাও ছিল না। না বাড়ি, না পরিবার। সব হারিয়ে আমি এইখানে একটা খুপরি ঘর তুলে বাস করতে শুরু করলাম"।
"...এরপর আর কখনো ডায়াবেলের সাথে তোমার দেখা হয় নি?"
এপাশ ওপাশ মাথা নাড়ল বাটু। না।
"....ঠিক কবে, কতদিন আগে ওর সঙ্গে তোমার লাস্ট দেখা হয়েছিল?"
"...ওর মিয়ামি রওনা হবার আগে", উত্তরে বলল বাটু, "ওর শেষ কথাগুলো এখনও মনে আছে আমার। ও বলেছিল, ও নাকি একজন খুব শক্তিশালী 'বোকর'।"
"...কি?"
"...ও বলেছিল, ও একটা...ও একটা মায়া-নেকড়েকে...একটা ওয়্যারউলফকে পাঠাবে... এখানে..."।
গ্রীন এবং সেইন্ট ফোর্ট নীরবে নিজেদের মধ্যে একবার দৃষ্টিবিনিময় করল। "চলো, এবার যাওয়া যাক", বলল গ্রীন।
"....চলো", সেইন্ট-ফোর্ট'ও রাজি হলো ওর প্রস্তাবে।
দুজনে দরজার দিকে ঘুরে এগিয়ে গেল। পেছন থেকে কানে এলো বৃদ্ধ বাটুর অস্ফুট স্বগতোক্তি - "মরবে...সবাই মরবে!"
ক্ষণিকের জন্য থমকে গেলেও পাত্তা দিল না ওর বাটুর কথায়। হুড়কো খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো দুজনে।
"....বোকর জিনিস'টা কি?" বাইরে এসে সেইন্ট-ফোর্টকে জিজ্ঞেস করল গ্রীন, "বাটু বলছিল..."
"...বোকর মানে হচ্ছে ভুডু বা কালো জাদু জানে এরকম লোক।"
"...মানে ব্ল্যাক ম্যাজিক?"
"...রাইট। বাই দ্য ওয়ে, এখন এরপর কি করবে?"
"...আমি ওই পুলিশ অফিসারের খোঁজ করব..."
"....কার? ওই জীন প্রিডেক্সের?"
কাঁধ ঝাঁকাল গ্রীন।
চোখ বড় বড় হয়ে উঠল সেইন্ট-ফোর্টের। বলল, "তুমি কি পুলিশের সাথে শত্রুতা তৈরি করতে চাও? জানো, এর ফল?"
হাসল গ্রীন। বলল, "আমি যা করব মনে করি, সেটাই করি। এখন আপাতত আমি হোটেলে ফিরব"।
এক ঘন্টার ভেতর গ্রীনকে তার অলফসন হোটেলে ড্রপ করে দিল সেইন্ট ফোর্ট। প্ল্যান যা কিছু করার করে রেখেছিল গ্রীন এবং সেইমতো কাজ এগিয়ে রেখেছিল। আধঘণ্টাটাক পর একটা ফোনের মারফত সে যোগাযোগ করতে পারল ইন্সপেক্টর প্রিডেক্সের সাথে।
"...হ্যালো", ওপ্রান্তে ইন্সপেক্টর প্রিডেক্সের কণ্ঠস্বর কানে আসতে গ্রীন বলল, "আমি হাইতিতে এসেছি, এখানে ভূমিকম্পের পর পোর্ট অফ প্রিন্সে 'ল' এনফোর্সমেন্টের কিছু প্রবলেমের ব্যাপারে। এখানে এসে একটা সোর্স থেকে জানলাম, আপনি একমাত্র বেস্ট হতে পারেন, এ ব্যাপারে ইনফর্মেশন দেওয়ার ব্যাপারে। তাই আমি আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য খুবই উদগ্রীব হয়ে আছি। প্লিজ, যদি দয়া করে বলেন, কখন আপনার সাথে দেখা করতে আসতে পারি?"
"...বেশ, বেশ", ওপ্রান্ত থেকে ইন্সপেক্টর প্রিডেক্সের গলায় হাসির শব্দ শোনা গেল, "আপনি স্টেশনে চলে আসুন। বিকেল পাঁচটার মধ্যে"।
গ্রীন বলল, "তাহলে তো ওইসময় আমার পক্ষে আসা সম্ভব নয়। আমি চাই, আপনার সঙ্গে আমার সাক্ষাতের সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় থাকুক"।
"...তাহলে আমার বাড়িতে আসুন। "
"....ওটাই বেস্ট হবে। কখন আসব আপনার বাড়িতে"।
"...আসুন ন'টা নাগাদ"।
"...ফাইন, ফাইন", এপ্রান্তে খুশি হয়ে উঠল গ্রীন। ফোনেই ইন্সপেক্টরের কাছ থেকে তার বাড়ির ঠিকানা জেনে নিয়ে ফোন রেখে দিল গ্রীন। জীবনে সে এই প্রথমবার পুলিশের এক উচ্চপদস্থ কর্তার বিরুদ্ধে নামতে চলেছে। হাইতি দেশটা দূর্নীতির দিক দিয়ে একনম্বর। ওকে তাই এক্ষেত্রে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করে এগোতে হবে। কে কিভাবে ওকে এখানে জটিল কেসে ফাঁসিয়ে দেবে, তার ঠিক নেই।
সন্ধে উতরে গেছে। নিজের ছোট্ট খুপরি ঘরটার একরত্তি খাটিয়াটায় চিত হয়ে শুয়ে আছে বাটু। একটু আগে ড্রাগ নিয়েছে সে। রোজকার এটাই রুটিন তার। একটা সিরিঞ্জে খানিকটা তরল ড্রাগ নিয়ে সেই সিরিঞ্জ পুশ করেছে নিজের দেহে। অত:পর তার প্রভাব শুরু হবার আগেই খাটিয়ায় টান টান হয়ে শুয়ে পড়েছে বাটু। একই সিরিঞ্জ সে দিনের পর দিন ব্যবহার করে আসছে। তার ক্ষতিকর প্রভাবে তার সারা শরীরে ঘা বেরিয়ে গিয়েছে কিন্তু তবু সে একই কাজ করে চলে দিনের পর দিন। খাটিয়ায় শুয়ে শুয়ে সে ভাবতে লাগল ঘটনার আগাগোড়া সবকিছু। কিভাবে ঘটল আজ এতকিছু? ভূমিকম্পের আগে তো তার দিব্যি সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। তার আন্ডারওয়ার্ল্ডের ব্যবসাও ফুলেফেঁপে উঠেছিল। কিন্তু ওই ভূমিকম্প..ওই একটা ভূমিকম্পই ওর যাবতীয় ব্যবসা চৌপাট করে দিল। ভাবনার মাঝেই ড্রাগের ক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে তার দেহে। ক্রমশ ঝাঁকি খেতে লাগল তার দেহটা। একসময় ধীরেধীরে তার দু'চোখে নেমে এলো একটা গভীর ঘুম। ঘুমের মধ্যে কিছুক্ষণ তার হুঁশই রইল না সে কোথায় রয়েছে। শুধু একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলী ওর চোখের সামনে। কখনো একটু গাঢ়, কখনো বা তরল। একসময় যখন ঘুমটা ভাঙল, তখন ঘরের মধ্যে, খুব কাছেই শোনা গেল কে যেন ওর নাম ধরে ডাকছে। খুব চাপা কণ্ঠস্বর....
"...বাটু...বা...টু..."
যেন অতীতের গর্ভ থেকে কেউ ওর নাম ধরে ডাকছে। কন্ঠস্বরের মালিক খুবই পরিচিত বাটুর। সেই চেনা কণ্ঠস্বর শুনেই বাটুর মনে পড়ে গেল, কে হতে পারে লোকটি। সেই ডায়েবেল! হেনরী লী ডায়েবেল! যার সঙ্গে কাজ করে একদা নিজের ভাগ্য ফিরিয়েছিল বাটু।
"....হেনরী..লী..ডায়াবেল!" অস্ফুটভাবে আপনা থেকেই বাটুর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো নামটা।
"...তুমি...তুমি আজ আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে শেষপর্যন্ত! " ঘরের মধ্যে ফের হিসহিসিয়ে উঠল সেই চাপা কণ্ঠস্বর।
বাটুর ঘুমের ঘোর কেটে গেল নিমেষে। চোখ মেলে তাকাল আর সঙ্গে সঙ্গে দেখতে পেলো, ওর ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে হেনরী ডায়াবেল। ওদের সেই লেস ডায়াব্লেস ক্রিমিনাল এজেন্সির নেতা। কিন্তু এ কি! এ কোন হেনরী! সম্পূর্ণ উলঙ্গ! ঘরের মধ্যে যে একমাত্র বাতিটা জ্বলছিল, তার আলোয় ওর সর্বাঙ্গে ট্যাটু আঁকা দেহের মাংসপেশিগুলো জায়গায় জায়গায় ফুলে উঠেছে। চোখদুটো লাল টকটক করছে, যেন লাল রক্ত ঢেলে দেওয়া হয়েছে চোখের মণিকোটরে। হেনরীর দু হাতের ধাবায় বোধহয় কিছু মাখানো, সে হাতদুটোকে ক্রমাগত নিজের সারা গায়ে বুলিয়ে চলেছে, তেল মাখার মতো। বেশ কিছুক্ষণ তৈল মর্দন করার মতো সারা গায়ে জিনিসটা মাখার পর একসময় থামল হেনরী ডায়াবেল। এবার সোজাসুজি তাকাল খাটিয়ায় তখন হতভম্ব হয়ে বসে ওর দিকে চেয়ে থাকা বাটুর দিকে। ডায়াবেলের দেহটা চকচক করছে, ঠিক তেল মাখলে যেমন গা চকচক করে, হুবহু সেইরকম। একটা সুগন্ধ নাকে এসে লাগল বাটুর। সে বুঝল, এতক্ষণ এই জিনিসটাই গায়ে মাখছিল তাদের একসময়ের কর্তা হেনরী ডায়াবেল। ঘরের বাতির আলোয় একজায়গায় পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল লী ডায়াবেল।
"..ক্ক...কত্তা..." অনেকক্ষণ পর কথা বলতে পারল বাটু, "আ..আ..আমি কোনও অন্যায় করিনি...আমি কাউকে..ক্ক..কিছু বলিনি"।
"....না", একটা গভীর অথচ মোলায়েম পুরুষ কণ্ঠ কানে এলো বাটুর, "আমার শত্রুদের তুমি সাহায্য করেছ, যাতে তারা আমার নাগাল পায়"।
চোখদুটো বিস্ময়ে, উত্তেজনায় সরু হয়ে এলো বাটুর। ওর মনে হতে লাগল, ও যেন জেগে জেগে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে। তবু একবার শেষ চেষ্টা করে দেখবে।
"...ইয়ে...মানে...না...কত্তা...আমি এরকম কিছুই করিনি"।
"...হ্যাঁ....তুমি করেছ", ফের শোনা গেল সেই গমগমে কণ্ঠস্বর।
বাটুর মনে হলো, এই কণ্ঠস্বর যেন ডায়াবেলের দিক থেকে আসছে না, নিজের মগজের ভেতরেই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এই কণ্ঠস্বর।
"....তুমি একটা বিশ্বাসঘাতক, বাটু", গম্ভীর ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতে লাগল ঘরের ভেতর, "আর এর জন্য তোমায় চরম মূল্য চোকাতে হবে"।
বাটু চুপ করে রইল। আর একটা শব্দও ওর মুখে জোগাল না। ওর হতভম্ব, বিমূঢ় চোখদুটোর সামনেই হেনরীর চেহারায় দেখতে দেখতে এক আশ্চর্য রূপান্তর শুরু হলো। ওর হাতদুটো লম্বায় বেড়ে উঠল, মুখটা আরও বিশালাকার ধারণ করে লম্বায় কিছুটা ঝুলে পড়ল, সর্বাঙ্গে গজিয়ে উঠতে লাগল বড় বড় লোম। ঘন লোমের পর্দার আড়ালে ঢেকে গেল ওর গোটা শরীরটা। বাটুর চোখের সামনে একটা কুৎসিত হিংস্র প্রাগৈতিহাসিক জীবে পরিণত হলো হেনরী ডায়াবেল। যখন রূপান্তর সম্পূর্ণ হলো, তখন পেছনের দু'পায়ে ভর দিয়ে সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে দাঁড়াল অপার্থিব জানোয়ারটা। দুটো লাল অগ্নিময় চক্ষু যেন তীরের মতো এসে বিঁধতে লাগল বাটুর বুকে। সেই অপার্থিব মহা অমঙ্গলকর দৃষ্টির সামনে বাটুর যেন সমস্ত চৈতন্য লুপ্ত হলো। একটা হাঁ করল জন্তুটা। বিশাল হাঁ-য়ের ভেতর থেকে ছুরির ফলার মতো তীক্ষ্ণ দাঁতগুলো ঘরের স্বল্প আলোয় ঝিকিয়ে উঠতে লাগল। শোনা গেল একটা চাপা গর্জন। ঘরের ভেতরে জন্তুটা গর্জালেও সেই গর্জন ঘরের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ল অনেকদূর পর্যন্ত। বস্তির অনেকেই শুনল সেই গর্জন। তারপরেই বাটুর কুটিরের ভেতর থেকে ভেসে আসতে লাগল মূহুর্মূহু মরণ চিৎকার। ভয়ানক মৃত্যুযন্ত্রণায় যেন কেউ অস্বাভাবিকভাবে কাতরাচ্ছে, আর্তনাদ করছে। বস্তির সবাই বাইরে বেরিয়ে এলো। শব্দের উৎস অনুসরণ করে বুঝল, এই চিৎকার আসছে বাটুর কুটিরের দিক থেকে। কিন্তু কারোর সাহস হলো না ওখানে গিয়ে দেখে। বাটুর অন্তিম চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে একটা হিংস্র জন্তুর ক্রুদ্ধ গর্জন আর ফোঁসফোঁসানির শব্দও শোনা যেতে লাগল। যেন কোনো অতিকায় ক্রুদ্ধ জন্তুর সঙ্গে একপেশে একটা লড়াই চলছে বাটুর। কুটিরের দরজা বন্ধ কিন্তু দরজার ফাঁকফোকর দিয়ে অদ্ভুত সব আলো বিকীর্ণ হতে লাগল বাইরে। যেন ভেতরে কোনো অলৌকিক কাণ্ডকারখানা চলছে। একসময় সব থেমে গেল। শেষ একটা মরণ আর্তনাদ করে থেমে গেল বাটুর কণ্ঠস্বর। চিরদিনের মতো থেমে গেল।
.......রাত ন'টা বাজার আগেই আশার গ্রীন এবং কোকো গিয়ে উপস্থিত হলো ইন্সপেক্টর প্রিডেক্সের বাড়িতে। পেশনভিলের একটা ঝাঁ চকচকে শহরে তাঁর বাড়ি। গ্রীন লক্ষ্য করল, এখানে রাতের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। ক্যারিফোরের টেন্ট সিটি'র মতো এখানে কারোর মনে কোনো ভয় নেই। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই নির্বিবাদে পথে চলাফেরা করছে। সবাই নৈশবিহারে মজে আছে। এই শহরেরই বুকে ইন্সপেক্টর প্রিডেক্সের বাংলোটা বেশ ছিমছাম এবং মনোলোভা। গেট দিয়ে ঢুকেই তালগাছের সারির মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়েছে চক বাঁধানো ড্রাইভওয়েটা। তার পরেই দোতলা একটা ঝাঁ চকচকে বাংলো। আগাগোড়া মার্বেল পাথরে তৈরি। স্প্যানিশ টাইলস বাঁধানো ছাদ। সামনে বাগানে নানা জাতের দেশী বিদেশী ফুলের মেলা।
"...কি দারুণ জায়গাটা!" মন্তব্য না করে পারল না সরল মনের কোকো।
"...বি কেয়ারফুল", কণ্ঠস্বর কঠিন করে বলল গ্রীন, "লোকটা কিন্তু মোটেও সৎপথে চলা লোক নয়"।
সঙ্গে সঙ্গে যেন ধ্যান ভাঙল কোকোর। সে সচকিত হয়ে উঠে নিজেকে তাড়াতাড়ি সামলে নিল।
ইন্সপেক্টর প্রিডেক্সের বাড়িটা বাসরাস্তা থেকে একটু দূরে হওয়ায় এখানে সবসময় একটা শান্ত, সমাহিত ভাব বিরাজ করছে। শুধু আশপাশের বাগান থেকে ঝিল্লীরব ছাড়া আর কিছু কানে আসছে না। অদ্ভুতরকম শান্ত একটা পরিবেশ। দরজায় লম্বা করে কলিংবেল বাজাতেই একজন মাঝবয়সী লোক দরজা খুলে দিল। বেশ মোটাসোটা চেহারা, পরনের পার্পল কালারের নাইট গাউন জানিয়ে দিচ্ছে, সে-ই এই বাড়ির গৃহকর্তা। ইন্সপেক্টর প্রিডেক্স।
"...মঁসিয়ে গ্রীন?" বলে উঠল লোকটি।
"...জ্বি", হেসে বলল আশার গ্রীন, "আমিই আশার গ্রীন। আর এ হচ্ছে আমার সহকারী মিস বার্নার্ড"।
"...হুমমম", গম্ভীরভাবে বললেন ইন্সপেক্টর প্রিডেক্স, "ভালো লাগছে আপনাদের সাথে পরিচিত হয়ে। আসুন ভেতরে"।
গ্রীন লক্ষ্য করল, প্রিডেক্সের বাম হাতের কবজিতে একটা দামী সোনার ব্যান্ডের রোলেক্স ঘড়ি। গৃহকর্তার মতো এই বাংলোটিও অপূর্ব সব স্থাপত্যের কারুকাজ এবং দামী দামী আসবাবপত্রে সুসজ্জিত। করিডোরের দু'পাশ দিয়ে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকা মূল্যবান স্ট্যাচুগুলোর পাশ দিয়ে যেতে যেতে গ্রীন এবং কোকো দুজনেই লক্ষ্য করছিল পুরো বাংলোটাকে। ওদের একটা সুসজ্জিত ড্রইং রুমের কাছে নিয়ে এলেন ইন্সপেক্টর প্রিডেক্স। ঘরের দেওয়ালে একটা বিশাল স্ক্রিনের দামী wall mount টিভি।
"...আপনাদের আমার পুরো বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাব, " বললেন ইন্সপেক্টর, "আমার ওয়াইফ এই মূহুর্তে বাড়িতে নেই। এটা হলো আমার ড্রয়িংরুম। "
এরপর ওরা প্রিডেক্সের সাথে তাঁর পুরো বাংলোটাই ঘুরে ঘুরে পরিদর্শন করল। সাকুল্যে তিনটে মাস্টার বেডরুম, দুটি মাস্টার বাথরুম, যার একটিতে আবার jacuzzi র ব্যবস্থা আছে। এরপর তাদের নিজের বাগানটাও দেখালেন প্রিডেক্স। কতজাতের ফুল আছে বাগানে, সমস্তকিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিলেন। গ্রীন সবকিছু শুনছিল বটে কিন্তু ওর আর তর সইছিল না। আসল প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা শুরু করার জন্য ও ভেতরে ভেতরে ছটফট করতে লাগল।
"...এবার বলুন, মঁসিয়ে গ্রীন", দুই পকেটে দুই হাত গুঁজে বললেন ইন্সপেক্টর প্রিডেক্স, "আপনি কি ব্যাপারে আমার সঙ্গে আজ দেখা করতে এসেছেন?" তারপরেই গ্রীনকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই তিনি ফের বলে উঠলেন, "আপনি যে 'ল' এনফোর্সমেন্ট নিউজ কভার করার জন্য আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেননি, তা আমি ভালোই বুঝতে পারছি। এবার বলুন, আপনি ঠিক কি কারণে এখানে এসেছেন?"
"...বেশ", একটুও বিচলিত না হয়ে মুখের হাসিটুকু অক্ষুণ্ণ রেখেই বলল গ্রীন,"আমি এখানকার ফর্মার প্রেসিডেন্ট, ডুভেলিয়ারের দেশে প্রত্যাবর্তন নিয়ে নিউজ কভার করছি এবং কাজ ভালোই এগোচ্ছে"।
ইন্সপেক্টর একবার গ্রীনের আপাদমস্তক ভাল করে লক্ষ্য করে নিলেন। চোখদুটো সরু হয়ে উঠল তাঁর। তারপর বললেন," আই সী। তাহলে ডুভেলিয়ারের প্রত্যাবর্তন নিয়েই নিউজ কভার করতে এসেছেন। হাইতির মিস্টিরিয়াস খুন'গুলো নিয়ে নয়?"
মুখে নির্লিপ্ত ভাব বজায় রেখে সামান্য হেসে গ্রীন বলল, "এসব তো পুলিশী ইনভেস্টিগেশনের মধ্যে পড়ে, তাই নয় কি?"
"....আপনি এর মধ্যে কখনওই ইন্সপেক্টর চৌভেটের সাথে দেখা করতে যান'নি, এটা জোর দিয়ে বলতে পারবেন কি?" ওর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে বললেন ইন্সপেক্টর প্রিডেক্স।
"...হ্যাঁ গিয়েছিলাম", দৃপ্ত স্বরে বলল গ্রীন, "হি ইজ পার্ট অফ মাই স্টোরি"।
শীতের রাত হলেও ভেতরে ভেতরে উত্তেজনায় ঘামছিল গ্রীন। বুঝতে পারছে, সে এখন রীতিমতো পুলিশী জেরার মুখে পড়েছে এখন।
"....ম্যাথিউ লন্ড্রি যেখানে মার্ডার হয়ে পড়েছিল, আপনি সেখানে গিয়েছিলেন, তাই না?" আরেকটা প্রশ্নবাণ ছুটে এলো গ্রীনের দিকে।
"...আপনি তো ভালোই জানেন, আমি গিয়েছিলাম", বিন্দুমাত্র অস্বস্তি প্রকাশ না করে বলল গ্রীন।
"...জানি বৈকি", তাচ্ছিল্যের স্বর ফুটে উঠল ইন্সপেক্টরের গলায়, "আর এও জানি, আপনি আজ সকালে সিটেসলেইলের বস্তিতে গিয়েছিলে..."
এবার আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ল গ্রীনের পক্ষে। এই ইন্সপেক্টর প্রিডেক্স এটাও জেনে ফেলেছেন! ওহ শীট! আপন মনেই বলে ফেলল গ্রীন।
"...আমাকে স্পষ্ট করে বলুন, মঁসিয়ে গ্রীন", গমগম করে উঠল ইন্সপেক্টর প্রিডেক্সের কন্ঠস্বর, "আপনি কার কাছ থেকে আমার নাম জানতে পারলেন?" বলতে বলতে ওর দিকে এক পা এগিয়ে এলেন ইন্সপেক্টর।
গ্রীনের কপালে এবার ঘাম দেখা দিল। তবু কোনওরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, "সরি, ইন্সপেক্টর। এটা সম্পূর্ণ কনফিডেনসিয়াল। আমরা এই ব্যাপারে অন্য কাউকে কিছু জানাই না"।
কুটিল ধূর্ত হাসির রেখা ফুটে উঠল ইন্সপেক্টরের মুখে। ওরা বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। বাড়ির ভেতর থেকে আসা অস্ফুট আলোয় বারান্দায় একটা আধো অন্ধকার পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। সেই আধো আলো আর আধো অন্ধকারে ইন্সপেক্টরের দাঁতগুলো যেন ঝিকিয়ে ঝিকিয়ে উঠছে।
"....এখানে এখনও পর্যন্ত কি সবগুলো বাড়ি দেখা হয়ে গেছে আপনার, মঁসিয়ে গ্রীন?"
আশার গ্রীন চমকে একবার তাকাল পাশে দাঁড়ানো কোকোর দিকে। কোকো নীরব। শুধু নিঃশব্দে গ্রীনকে তার দৃষ্টি ফিরিয়ে দিল। ওর মুখেচোখে এখন কেমন একটা ভয়ের ছাপ। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইন্সপেক্টরের অন্তর্ভেদী দৃষ্টি শুধু নীরবে ওদের লক্ষ্য করতে লাগল।
"...না, সবগুলো বাড়ি আমি দেখিনি", জবাবে বলল গ্রীন। রীতিমতো তার এখন নিজেরই নিজেকে 'বোকা-বোকা' মনে হচ্ছে।
"...এটা কিন্তু চমৎকার একটা বাড়ি। আমি নিজের বাড়ি বলে বলছি না", বলতে বলতে নিজের চিবুকে তর্জনীটা ঘষতে লাগলেন ইন্সপেক্টর প্রিডেক্স। তারপর বললেন, "একজন সাধারণ পুলিশ ইন্সপেক্টরের এই বিলাসবহুল বিশাল বাংলো... ব্যাপারটা আপনার কাছে কেমন একটু 'বাড়াবাড়ি' মনে হচ্ছে, তাই না?"
গ্রীন কিছু না বলে শুধু নিঃশব্দে লক্ষ্য করতে লাগল প্রিড়েক্সকে। হঠাৎ ইন্সপেক্টর ফের বলে উঠলেন, "তোমরা আমেরিকানরা নিজেদের খুব চালাক ভাব, তাই না?" এবার সরাসরি 'আপনি' থেকে 'তুমি'তে নেমে এসে ইন্সপেক্টর বলতে লাগলেন, "তোমরা এসেছ আমাদের বিচার করতে! হাইতির জীবনযাত্রা সম্পর্কে তোমাদের কোনো আইডিয়া আছে? তোমরা কি জানো, আমেরিকার একজন সবচেয়ে গরীব লোকও, সিটেসলেইলের সবচেয়ে ধনী মানুষটির চেয়েও বেশী ধনী? আর সেই তোমরা এসেছ আমাদের বিচার করতে? জীবনে ক'টা রাত না খেয়ে কাটিয়েছ, শুনি?"
"...হ্যাঁ, ঠিকই বলছেন", এবার বলে উঠল গ্রীন, "আমার সাবেক স্ত্রী'র সঙ্গে আপনার তো কখনো আলাপ হয়নি", বলতে বলতে ইন্সপেক্টর প্রিডেক্সের দিকে চেয়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে একটা বিদ্রুপের হাসি উপহার দিল গ্রীন, বোধহয় ওঁকে বোঝাতে চাইল যে সে তাঁকে কোনও ভয় দেখাবার চেষ্টা করছে না।
"....তুমি কি ভাবছ, আমি তোমার সঙ্গে মস্করা করছি", তীব্র ব্যঙ্গ ঝরে পড়ল প্রিডেক্সের গলায়, "কারণ তুমি জানো,তুমি তো ক'দিন পর আমেরিকা চলে যাবে আর আমাদের এখানেই পড়ে থাকতে হবে। আমাদের এখানে জীবনধারণের জন্য কিভাবে চলতে হয়, তার কতটুকু জানো তুমি?"
"....মিথ্যে কথা", হঠাৎ এইসময় গ্রীনকে চমকে দিয়ে পাশ থেকে বলে উঠল কোকো, ওকে এখন আর ভয়ার্ত দেখাচ্ছে না, ওকে এখন রীতিমতো ক্রুদ্ধ দেখাচ্ছে। দৃপ্ত গলায় ইন্সপেক্টরকে উদ্দেশ্য করে কোকো বলতে লাগল, "আপনি জাস্ট 'survive' করছেন না, ইন্সপেক্টর প্রিডেক্স...আপনি প্রকৃতই বিলাসবহুল জীবন যাপন করছেন এখন। আপনি একজন প্যারাসাইট - একটা পরজীবি। এখানকার এত লোক প্রত্যেকদিন জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম করছে, দুটো রুটির জন্য। তারা কেউ আপনার মতো নিজের আত্মাকে শয়তানের কাছে বিক্রি করে দেয়নি"।
"...খবর্দার, আর একটা শব্দও যেন আমি না শুনি!" হিংস্র ক্রুদ্ধ গর্জন করে উঠে বললেন ইন্সপেক্টর প্রিডেক্স। কোকো'কে উদ্দেশ্য করে এবার তিনি রীতিমতো হুমকি দেওয়ার মতো করে বলতে লাগলেন, "ভেবো না, তুমি নিজে খুব সুরক্ষিত। আমি তোমার কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারব না। তুমি, তোমার মা-বাবা, তোমার পরিবার এখান থেকে খুব বেশীদূরে থাকে না। সবই আমার নাগালের মধ্যে"।
মা-বাবার বিপদের প্রসঙ্গ এসে পড়ায় কোকো বাধ্য হয়ে এবার চুপ করে গেল। আগের মতো নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কোকোর প্রতি ইন্সপেক্টর প্রিডেক্সের এ হেন উদ্ধত বাচনভঙ্গি ক্ষিপ্ত করে তুলল গ্রীনকে। কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব গম্ভীর করে সে বলল, "মিস বার্নার্ড সঠিক পয়েন্ট ধরেছে। রিপোর্টার হিসেবে আমার জীবনে এমন অনেক পলিটিশিয়ানের সাক্ষাৎ পেয়েছি, যারা আগাগোড়া corrupted কিন্তু একইরকম হাস্যকর এক্সকিউজ দেয় - ঠিক আপনার মতো"
"...দেখো গ্রীন, আমি ঠিক ততটুকুই করি, যতটুকু আমার কর্তব্য", বললেন ইন্সপেক্টর।
গ্রীন সামান্য তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, "আপনার বেডরুমগুলো খুব রাজকীয়, বিলাসবহুল এবং যথেষ্ট সুন্দরও। কিন্তু ওই বেডরুমে আপনার কি প্রত্যেক রাতে ভালো ঘুম হয়, ইন্সপেক্টর প্রিডেক্স? যখন কিনা আপনি জানেন যে আপনি এতগুলো মানুষের হত্যাকারীকে গোপনে বাঁচিয়ে চলেছেন?"
"....হত্যাকারীকে বাঁচিয়ে চলেছি!" এবার বিস্ময় ঝরে পড়ল ইন্সপেক্টরের গলায়, "কি বলছ? আমি এখানে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য যা করণীয়, তাই করে চলেছি। এই হাইতিতে অনেক ক্রিমিনাল আছে, তারা যাতে সিভিলিয়ানদের কোনও ক্ষতি না করতে পারে, আমাকে।সেই ব্যাপারগুলোই দেখতে হয়। হেনরী ক্রিস্টোফার একটা প্রায় পিশাচ ছিল, তাই ও যাতে আর কারোর ক্ষতি না করতে পারে, সেজন্য ওকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম"।
কাঁধ ঝাঁকাল গ্রীন। তারপর বলল, "উই উইল সি!"
"....কিন্তু আমি চাই না, তোমরা এই কেসটা নিয়ে আর এগোও", বলতে বলতে ইন্সপেক্টর প্রিডেক্স একটা রিভলভার বের করে আনল নাইট গাউনের পকেট থেকে। সঙ্গে সঙ্গে সজাগ হয়ে উঠল গ্রীন। কোকো'কে আড়াল করে দাঁড়িয়ে বলল, "মেয়েটার এখানে কোনো ভূমিকা নেই। তোমার বোঝাপড়া শুধু আমার সাথে। তাই ওকে আপাতত যেতে দাও"।
তাচ্ছিল্যের হাসি ঝরে পড়ল ইন্সপেক্টরের গলায়। বলল, "সরি মঁসিয়ে গ্রীন, তোমাদের দুজনেরই জীবন আমি নিতে বাধ্য হচ্ছি। আর ওই মেয়েটা? ও তো নেহাতই তুচ্ছ একটা মেয়ে, ওর জীবনের আর মূল্য কতটুকু?"
গ্রীন বলল, "এভাবে কি তুমি বাঁচতে পারবে, ইন্সপেক্টর? লোকে আমার খোঁজ করতে এখানে ঠিকই এসে পড়বে। তখন কোথায় পালাবে তুমি?"
".....হাইতির লোকজন এখন অন্যরকম সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত", ওদের দিকে রিভলভারটা তাক করে ধরে রেখেই বলতে লাগলেন ইন্সপেক্টর প্রিডেক্স, "তোমার নিরুদ্দেশ এখানকার কারোর গোচরেই আসবে না"।
"....ভুল করছ ইন্সপেক্টর ", বলল গ্রীন, "আমার খোঁজে স্বয়ং আমার দেশের সরকার আসবে।"
"....বোকা! একেবারে বোকা তুমি! আমি এমনভাবে কাজ এগিয়ে রাখব যে কেউ তোমার ট্রেস পাবে না"।
গ্রীন বুঝল, এর হাত থেকে নিস্তার নেই। সে একবার অসহায়ভাবে এদিকওদিক দেখার চেষ্টা করল। না, বাগানের বেড়াগুলো বড্ড উঁচু, লাফিয়েও নাগাল পাবে না। কি করে এই ভয়াবহ লোকটাকে নিরস্ত করা যায়, তাই নিয়ে সাতপাঁচ ভাবতে লাগল সে। চেষ্টা করতে লাগল নানা উত্তেজক কথার দ্বারা ওকে উত্তেজিত করে তুলতে যাতে ওর হাত থেকে একসময় রিভলভারটা পড়ে যায়; যদিও গ্রীন জানে, এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ইন্সপেক্টর অত্যন্ত পাকা লোক।
নানারকম কথা বলে ইন্সপেক্টরের মনটা অন্যদিকে ঘোরাতে চেষ্টা করতে লাগল গ্রীন। পিছু হটতে হটতে বাগানের জঙ্গলে নেমে এলো তিনজনে। প্রিডেক্সের হাতের রিভলভার এখনও ওদের দিকেই তাক করা। যখন বেড়া থেকে আর মাত্র কয়েক মিটার দূরত্বে ওরা, ঠিক তখনিই চোখের কোণ দিয়ে পাশের ঝোপে কিছু একটার নড়াচড়া টের পেলো গ্রীন। তারপরেই একটা চাপা গর্জন। এবার তিনজনেই চমকে উঠে সেদিকে তাকাতেই বিশাল একটা লোমশ জন্তুর মুখ আর দুটো অগ্নিময় চক্ষু ফুটে বেরলো ঝোপ ঠেলে। ইন্সপেক্টর প্রিডেক্স তাঁর হাতের রিভলভারটা চকিতে জন্তুটার দিকে ঘুরিয়েছিলেন বটে কিন্তু ততক্ষণে বড্ড দেরী হয়ে গেছে। বিশাল একটা উচ্চ ক্রুদ্ধ গর্জন ছেড়ে বিশালদেহী জন্তুটা ঝাঁপিয়ে পড়ল ইন্সপেক্টর প্রিডেক্সের ওপর। বিশাল জন্তুটা ওঁকে অনায়াসে পেড়ে ফেলল মাটিতে। কোকো'কে একহাতে নিজের বুকের মধ্যে টেনে এনে গ্রীন রুদ্ধশ্বাসে দেখতে লাগল সামনের বীভৎস দৃশ্যটাকে। জন্তুটা ধীরেধীরে মুখ ঘোরাল গ্রীনের দিকে। দুটো লাল চোখ ওকে যেন মুহুর্তে পাথর করে দিল। কোকো তো চোখ খোলার সামর্থ্যই হারিয়ে ফেলেছে, গ্রীনের বুকে মুখ গুঁজে রয়েছে। গ্রীন অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করছিল অদ্ভুত জন্তুটাকে। আশ্চর্য! দেখতে হুবহু জন্তু - না, পুরোপুরি নেকড়ে না পুরোপুরি হায়েনা। যেন দুইয়ের মাঝামাঝি কোনও প্রাণী। আর....আর চোখের ভাষা? সে যেন অনেকটা মানুষের মতো! অথচ যেন মানুষ নয়!
গ্রীনের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে জন্তুটা এবার মনোযোগ দিল প্রিডেক্সের দিকে। ইন্সপেক্টরের তখন যাবতীয় লড়াই থেমে গিয়েছে। হয়তো জীবন আর বেশীক্ষণ নেই, এই ভেবেই সে নিষ্পন্দ হয়ে পড়ে রইল। বিশাল জন্তুটা এবার ইন্সপেক্টর প্রিডেক্সের ঘাড়ে তার লম্বা লম্বা ধারালো দাঁতগুলো দিয়ে কামড় বসাল। এক কামড়েই ওঁর মাথা ধড় থেকে আলাদা হয়ে গেল। এই ভয়াবহ দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে চোখে হাতচাপা দিল গ্রীন। পরক্ষণেই বুঝল, এভাবে এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে ওদেরও জীবন আর বেশীক্ষণ নেই। তাই কোকোকে নিয়ে চোঁচা ছুট লাগাল বাইরে পার্ক করে রাখা ওদের গাড়িটার দিকে। কোকো ঠকঠক করে কাঁপছে, গাড়ি চালানোর মতো অবস্থায় নেই ও। গ্রীনও উত্তেজনায় কাঁপছে কিন্তু কোকোর মতো অবস্থায় নেই।
"...কোকো, চাবিটা দাও, শিগগীর!"
কোনওরকমে পকেটে হাত ঢুকিয়ে চাবিটা বের করে গ্রীনের দিকে ছুঁড়ে দিল কোকো। ইগনিশনে চাবিটা ঘুরিয়ে মোচড় দিতেই গর্জন করে উঠল এঞ্জিনটা।
"...ওটা আসছে!" চিৎকার করে বলে উঠল কোকো, "জলদি! ওটা এবার আমাদের দিকে আসছে!"
আর দেরী না করে গাড়ি ছুটিয়ে দিল গ্রীন। ড্রাইভওয়ে ছেড়ে বেরোবার আগে গাড়ির পেছনের দরজায় একটা ভারী থাবার আঘাত এসে পড়ল। চিৎকার করে উঠল কোকো। ওর মুখ দেখবার মতো বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে।
গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিল গ্রীন। সুনসান পথ ধরে ওদের গাড়িটা নক্ষত্রবেগে ছুটে চলল।
।। টেন্ট সিটি'তে প্রত্যাবর্তন।।
সেইন্ট-ফোর্টের বাড়ির বৈঠকখানায় বসে আছে গ্রীন এবং কোকো। দুজনেই তখনো প্রচণ্ড উত্তেজিত। গ্রীন কিছুতেই এক জায়গায় সুস্থির হয়ে বসতে পারছে না। মাঝেমাঝেই উঠে যাচ্ছে জানলার কাছে। পর্দা সরিয়ে সরিয়ে দেখছে বাইরে কোনো বিভীষিকা ওঁত পেতে নেই তো? কিন্তু শুধু বাগান, গাছ আর নির্জনতা ছাড়া আর কিছু নজরে পড়ছে না।
"...এখনও গোটা ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য লাগছে", বলল গ্রীন, "চোখের সামনে সবকিছু দেখেও বিশ্বাস হচ্ছে না"। বলতে বলতে হাতের ব্যারেল বন্দুকটার গায়ে আনমনাভাবে হাত বোলাতে লাগল।
কোকো এবং সেইন্ট-ফোর্ট একটা সোফায় পাশাপাশি বসেছিল। ওদের চোখেমুখে তখনও লেগে রয়েছে বিস্ময়। কোকোর চোখেমুখে তখনও লেগে রয়েছে আতঙ্কের রেশ।
"...আমি তোমার প্রত্যেকটা কথা বিশ্বাস করছি, গ্রীন", বলে উঠল সেইন্ট ফোর্ট, "আমি জানি, তোমরা যা দেখেছ, ঠিক দেখেছ"।
আধঘণ্টা আগে কোকো'কে নিয়ে গ্রীন এসে উঠেছে সেইন্ট ফোর্টের বাড়িতে। এখনও একটু আগে সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরার চরম স্মৃতির রেশ রয়ে গিয়েছে ওদের মনে। থেকে থেকে শিউরে উঠছে কোকো। গ্রীনের নিজের মনের অবস্থাও ভালো নয়। সেইন্ট ফোর্টের বাড়িতে এসেও এখনও একটুও ধাতস্থ হতে পারেনি ওরা। দরজা-জানলা সব ঠিকমতো ভেতর থেকে লক আছে কিনা, বার বার পরীক্ষা করেও মন থেকে ঠিক নিশ্চিন্ত হতে পারছে না।
"...আমি নিজের চোখে ওটাকে দেখেছি আজ", ঘরের মধ্যে অস্থিরভাবে পায়চারি করতে করতে বলল গ্রীন। হাতে ওর উদ্যত রিভলভার। বার বার সতর্ক দৃষ্টি ঘুরছে ঘরের এদিক থেকে ওদিকে। যেন কোনও কিছুর আশঙ্কা করছে ও। সেইন্ট-ফোর্টকে একটু একটু করে খুলে বলতে লাগল, ইন্সপেক্টর প্রিডেক্সের বাড়িতে কি কি ঘটল, তার মোটামুটি একটা বর্ণনা দিতে লাগল সে।
"....বিশ্বাস করতে পারছি না এখনও", ঘনঘন দুদিকে মাথা নেড়েই চলেছে গ্রীন, "আমেরিকা থেকে মাত্র ছশো মাইল দূরে এরকম আশ্চর্য জিনিস ঘটা সম্ভব... এ যে কল্পনারও অতীত।"
নীরবে বসে রইল সেইন্ট-ফোর্ট এবং কোকো। কোকো এবং গ্রীনের অভিজ্ঞতার কাহিনী শুনে সেইন্ট-ফোর্টেরও মুখ থমথম করছে চাপা উত্তেজনায়।
"....আমরা এখন কি করব?" অনেকক্ষণ পর প্রশ্ন করল সেইন্ট ফোর্ট।
পায়চারির ফাঁকে একটু বিরতি নিলো গ্রীন। দু হাতের তালু রগড়ে কিছু একটা ভাবার চেষ্টা করল। তারপর বলল, "বুঝতে পারছি না", তারপরেই ওদের দিকে সচকিত হয়ে চেয়েয়ে বলল, "আমার মনে হয়, আমাদের সবার এখন আমেরিকা চলে যাওয়া উচিত"।
"...হোয়াট!" অবিশ্বাসের হাসি ফুটে উঠল সেইন্ট ফোর্টের মুখে, "আমেরিকা চলে যাব! কেন?"
"...প্লিজ সেইন্ট-ফোর্ট!" এবার রীতিমতো অধৈর্য হয়ে উঠল গ্রীন, "হাইতির জীবনযাত্রা এখন মোটেও নিরাপদ নয়। তার ওপর... তার ওপর এখানে ভয়ানক একটা পৈশাচিক শক্তির উপস্থিতি ঘটেছে.... এই অবস্থায় তোমরা মোটেও সুরক্ষিত নও...তোমরা... তোমাদের মা-বাবা, পরিবার সবাই আমার সাথে চলো আমেরিকা। ওখানে কোনো ভয় নেই...হ্যাঁ, ওখানে কোনও ভয় নেই।"
এবার হেসে ফেলল সেইন্ট ফোর্ট। বলল, "না ম্যান। তা হয় না। হাইতি ছেড়ে আমরা কোথাও যাব না। এখানেই আমাদের জনম, এখানেই আমাদের মরণ। আর তাছাড়া.... হেনরী ডায়াবেলের সঙ্গে আমাদের তো কোনও সম্পর্ক নেই। সে আমাদের কেন ক্ষতি করতে আসবে? আর যদি সেইরকম মনোভাব তার থাকেও, তো আমেরিকায় গিয়েও যে আমরা সুরক্ষিত থাকব, এমনটা মনে করারও কোনও কারণ নেই"।
কিছুক্ষণ কি যেন ভাবল গ্রীন। তারপর বলল, "এইজন্যই বলছিলাম কারণ ওয়্যারউলফরা শুনেছি সাঁতার কাটতে পারে না। হাইতি আর আমেরিকার মাঝে সমুদ্র পড়ে...তাই ওর পক্ষে আমেরিকা যাওয়া সম্ভবও নয়"।
"....আমি আর জেগে থাকতে পারছি না", হঠাৎ বলে উঠল কোকো, "আমার খুব ঘুম পাচ্ছে"।
"...বেশ, তবে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। কাল সকালে বাকি কথা"।
"....তুমি কি করবে?" গ্রীনকে জিজ্ঞেস করল সেইন্ট ফোর্ট।
"....আমি আপাতত সারা রাত জেগে পাহারা দেব। তোমরা দুজনে ঘুমিয়ে পড়ো "।
কোকো'কে ধরে ধরে বেডরুমের দিকে নিয়ে যেতে লাগল সেইন্ট ফোর্ট। ভাই'কে উদ্দেশ্য করে একসময় কোকো বলল, "তোকে এসব করার দরকার নেই। আজ রাতে মনে হয় না কোনও বিপদ ঘটবে"।
সেইন্ট ফোর্ট কিছু বলার আগেই গ্রীন বলল, "এটা ভাবার আপাতত কোনো কারণ নেই, কোকো। এতটা নিশ্চিত হয়ো না। আজ রাত আমাদের একটু সতর্ক থাকতেই হবে। নইলে যে কোনো সময়ে ওই ওয়্যারউলফ জানলা ভেঙে ঢুকে আমাদের খেয়ে ফেলবে"।
অনেক রাত পর্যন্ত জেগে রইল গ্রীন। ভোরের দিকে যখন চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো, যখন বুঝল বিপদের সম্ভাবনা কেটে গিয়েছে, তখন কাউচের ওপর গা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল। একসময় কখন ঘুম নেমে এলো চোখে, তা নিজেও বুঝতে পারল না। ঘুম ভাঙল সদ্য রান্না করা বেকনের সুগন্ধে। ঘুম ভেঙে দেখল, কিচেনে ব্যস্ত কোকো।
"...গুড মর্নিং!" ঘুমজড়ানো গলায় বলে উঠল গ্রীন।
"....গুড আফটারনুন! " ওকে চমকে দিয়ে বলে উঠল কোকো, "ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দ্যাখো, বেলা বারোটা বেজে গিয়েছে কখন"।
"...অ্যাঁ!" নিজের মনেই বলে উঠল গ্রীন, "বারোটা! এই এতখানি সময় ও ঘুমিয়েছিল, তার মানে!"
আস্তে আস্তে সোফা ছেড়ে উঠে বসল সে। লম্বা একটা হাই তুলে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সত্যিই, বেলা অনেকখানি হয়ে গিয়েছে। আসলে কাল সারাদিন সারারাত একটুও বিছানায় পিঠ ঠেকাতে পারেনি, তাই এই অবস্থা। কোকো'কে লক্ষ্য করছিল গ্রীন। সদ্য স্নান করেছে বোধহয় সে, বেশ তরতাজা লাগছে ওকে। ওর দিকে কোকোর নজর পড়ল এবার। দুজনের দৃষ্টিবিনিময় হলো।
"....এখন খাবে তো?" জিজ্ঞেস করল কোকো।
"...অবশ্যই। খিদে পেয়ে গিয়েছে বেশ"।
"...তবে হাতমুখ ধুয়ে এসে বোসো। আমি টেবিলে খাবার লাগাচ্ছি"।
পাইন অ্যাপেল জ্যুস, বেকন আর ডিম সহযোগে দুপুরের লাঞ্চটা বেশ ভালোই চলতে লাগল গ্রীনের। খাওয়ার মাঝেই সেইন্ট ফোর্ট কোথা থেকে এসে উপস্থিত হলো ড্রয়িংরুমে। সকালে বোধহয় কোথাও গিয়েছিল, এখন ফিরে এসেছে। বাইরে এখন রোদ আর রোদ। প্রখর রৌদ্রকিরণে কোথায় যেন মিলিয়ে গিয়েছে রাতের যাবতীয় বিভীষিকা।
"...হ্যালো ম্যান", ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই গ্রীনকে লক্ষ্য করে বলে উঠল সেইন্ট ফোর্ট, "এখন কেমন লাগছে?"
"..আগের চেয়ে অনেকটাই ভালো", উত্তরে বলল গ্রীন, "ওয়্যারউলফের মুভি আর গল্পবই পড়ে জেনেছি, ওরা দিনের বেলা ক্ষমতাহীন হয়ে থাকে, ভ্যাম্পায়ারের মতো। বাই দ্য ওয়ে, তুমি কোথায় গিয়েছিলে?"
গ্রীনের টেবিলে বিপরীত দিকের একটা চেয়ারে বসে পড়ল সেইন্ট ফোর্ট। ওকে একটু ক্লান্ত দেখাচ্ছে। ইতিমধ্যে কোকো এসে ওরও সামনে এক মগ গরম কফি পরিবেশন করেছে। সেইন্ট ফোর্ট বলল, "খবর নিতে গিয়েছিলাম। ইন্সপেক্টর প্রিডেক্সের ব্যাপারে নিউজ বেরিয়েছে আজকের পেপারে", বলতে বলতে সেইন্ট ফোর্ট একটা ভাঁজ করা নিউজপেপার ওর সামনের টেবিলে রাখল। গ্রীন দেখল, কাগজের প্রথম পাতায় একটা শিরোনাম -
।। নিজের বাড়ির বাগানে বীভৎসভাবে খুন পুলিশ ইন্সপেক্টর।।
অত:পর ইন্সপেক্টর প্রিডেক্সের হত্যাকান্ড নিয়ে বিস্তারিত একটা রিপোর্ট নীচে। তবে খুন'টা কে করেছে, কে বা কারা অমন বীভৎসভাবে ইন্সপেক্টরকে খুন করে গিয়েছে, তা নিয়ে পুলিশ এখনো ধোঁয়াশায়।
খবরটা পড়া শেষ হলে সেইন্ট ফোর্ট আরেকটা জায়গায় আঙুল দেখিয়ে বলল, "আরও বেশ কয়েকটা মার্ডারও হয়েছে...গতরাতে...পড়ো...তাদের মধ্যে একটা সিটেসলেইলে ঘটেছে... .গতকাল যেখানে গেলাম আমরা..."।
কৌতূহলী হয়ে খবরের কিছুটা পড়ামাত্রই গ্রীন চমকে উঠল। উত্তেজিত গলায় বলল, "আরে, বাটু'ও খুন! ওই ব্যাটা, যার সাথে গতকাল মোলাকাত হলো আমাদের!"
নীরবে মাথা নাড়ল সেইন্ট ফোর্ট। ওর চোখমুখ বেশ গম্ভীর।
এবার গভীরভাবে পুরো ব্যাপারটাকে নিয়ে ভাবতে বসল গ্রীন। একইদিনে বাটু এবং পুলিশ ইন্সপেক্টর প্রিডেক্স'কে হত্যা করা হলো! একইভাবে! একইরকম বীভৎসভাবে! তারপর... এক নিরীহ ভদ্রমহিলা এবং তাঁর দুই শিশু...আর...আর একজন আমেরিকান মেরিন...এদের প্রত্যেকেরই শরীর বীভৎসভাবে ফালা ফালা করে চিরে ফেলা হয়েছে এবং আধখাওয়া দেহটাকে ফেলে রেখে গেছে কোনো হিংস্র জানোয়ার! বীভৎস!
খবরগুলো কোকো'ও পড়ছিল। ওকে রীতিমতো ভীত দেখাচ্ছে এখন। চোখদুটো গোল গোল করে বলল, "হয়তো তুমি ঠিকই বলছ, গ্রীন। আমাদের আমেরিকা চলে যাওয়া উচিত"।
গ্রীন অবাক হয়ে চেয়ে রইল কোকোর দিকে। মেয়েটা যে বেশ ভয় পেয়েছে, তা ওকে দেখেই বুঝতে পারল সে। গ্রীন এবার বলল, "হয়তো সেটা করলেই ভালো হয়, কিন্তু এখন পরিস্থিতি যা, আমরা আমেরিকা পালিয়ে গিয়ে হয়তো নিজেদের বাঁচাতে পারব কিন্তু প্রত্যেকদিন মারা পড়বে এখানকার শ'য়ে শ'য়ে নিরীহ মানুষ। এদের বিপদের মধ্যে ফেলে রেখে এভাবে তো চলে যাওয়া যায় না!"
সেইন্ট ফোর্ট এবং কোকো দুজনেই অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিল গ্রীনকে। টেবিলে সজোরে একটা তুড়ি মেরে গ্রীন বলল, "এভাবে চলতে পারে না। ওয়্যারউলফ হোক আর জোম্বিই হোক, ওকে শেষ করতে না পারলে কিছুতেই শান্তিতে দু'চোখের পাতা এক করতে পারব না আমি। কি যেন ওটার নাম বলেছিল, বাটু?"
"....হেনরী লী ডায়াবেল!" বলল সেইন্ট ফোর্ট।
"...ইয়েস, রাইট!" দু হাতে তুরি মেরে বলে উঠল গ্রীন, "হেনরী ক্রিস্টোফার... এই নামেও পরিচিত ছিল সে...ওই হেনরী ডায়াবেল বা হেনরী ক্রিস্টোফারই আজ জলজ্যান্ত একটা নর-বৃকতে পরিণত হয়েছে। এখন চলো, যাওয়া যাক, ইন্সপেক্টর চৌভেটের কাছে। ওর কাছ থেকে কিছু সাহায্য আমরা অবশ্যই পাবো।
"....তুমি খামোখা এত টেনশন করছ কেন?" থানার ওয়েটিংরুমে বসে গ্রীনকে রুমাল দিয়ে ঘন ঘন কপাল মুছতে দেখে জিজ্ঞেস করল কোকো।
"...টেনশনের জন্য নয়", বলল গ্রীন, তারপর জানলা দিয়ে বাইরের গনগনে রোদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বাকিটা ইশারায় বুঝিয়ে দিল। অর্থাৎ টেনশনে নয়, গরমে ঘামছে সে।
একটু পরেই ইন্সপেক্টর চৌভেটের অফিস ঘরে ওদের দুজনের ডাক পড়ল।
"...মঁসিয়ে গ্রীন এবং মিস বার্নার্ড!" দুজনকেই সাদরে অভ্যর্থনা করে বললেন ইন্সপেক্টর চৌভেট, "বলুন, আপনাদের আমি কিভাবে হেল্প করতে পারি?"
"...হেনরী লী ডায়েবেল", গ্রীনের মুখে নাম'টা উচ্চারিত হতেই ভ্রু জোড়া কপালে উঠল ইন্সপেক্টর চৌভেটের। চেয়ারে সোজা হয়ে বসে ওদের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চাইলেন। গলার স্বর সামান্য কঠিন করে বললেন, "এই নাম আপনি কোত্থেকে শুনলেন?"
গ্রীন মূহুর্তের জন্য একবার ইন্সপেক্টরকে ভালো করে জরিপ করে নিল। তারপর বলল, "আমি একটা সোর্স থেকে জানতে পেরেছি"।
"...জানতে পারি, কার কাছ থেকে শুনেছেন?" গলার স্বর খাটো করে জিজ্ঞেস করলেন ইন্সপেক্টর চৌভেট।
"...সরি, বিশেষ কারণে তার নাম গোপন রাখতে হচ্ছে"।
"....মঁসিয়ে গ্রীন", এবার বলে উঠলেন গ্রীন, "আপনি ভুলে যাচ্ছেন যে আপনি এখন আমেরিকায় বাস করছেন না"।
"...জানি, জানি", শান্ত স্বরে বলল গ্রীন, "প্রতি মূহুর্তে আমি এটা স্মরণে রাখি, ইন্সপেক্টর চৌভেট। এক সেকেন্ডের জন্যও ভুলতে পারি না যে আমি কোথায়"।
"....তাহলে বলুন এবার, কার কাছ থেকে এই নামটি শুনলেন?"
"...আমি মনে করি না, এটা জানার খুব প্রয়োজন আছে। আমি যেটা জানতে এখানে এসেছি তা হলো, এই হেনরী লী ডায়াবেলের খোঁজ জানে, সেই লুইস ম্যালগরিকে কোথায় গেলে পাওয়া যাবে? আমি লুইস ম্যালগরীর খোঁজ জানতে এসেছি। হ্যাঁ, লুইস ম্যালগরি...আমি খোঁজ নিয়ে জেনে এসেছি, এই লুইসের কাছেই আছে হেনরী ডায়াবেলের সন্ধান"।
বেশ কিছুক্ষণ কিরকম বোবার মতো ওদের দিকে চেয়ে রইলেন ইন্সপেক্টর চৌভেট। ওঁর দুচোখে বিস্ময়। একসময় বললেন, "লুইসের নামটাও শুনেছেন দেখছি! কার কাছে শুনলেন?"
"...ওই যে বললাম...সোর্সের নাম বলা যাবে না"।
"...আমি মনে করি, যিনিই আপনাকে এই নামটি শুনিয়ে থাকুন না কেন, তিনি যদি আপনাকে এই খবরটি না দেন যে কোথায় গেলে এই লুইস ম্যালগরিকে পাওয়া যাবে, তাহলে বলতে হয়, তিনি আপনার জন্য যথেষ্ট ভালো সোর্স নন"।
"....দেখুন ইন্সপেক্টর চৌভেট", এবার দৃঢ় স্বরে বলে উঠল গ্রীন, "আমার কাছে এটাই জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে এই হেনরী লী ডায়েবেলের খোঁজ জানে, সেই লুইস ম্যালগরি কোথায় আছে। আজ রাত নামার আগেই আমি সেই লোকের ট্রেস পেতে চাই। ব্যস, আপনার কাছে শুধু এটুকুই আমার জিজ্ঞাস্য"।
ভ্রু জোড়া ফের কপালে উঠল ইন্সপেক্টর চৌভেটের। বললেন, "তাই নাকি? তা রাত নামবার আগেই ওকে খুঁজে পেতে চাইছেন কেন?"
গ্রীন উত্তরে একটা ঝুটমুট কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ওর মনে পড়ে গেল গত রাতের দৃশ্যটা। সেই বিশাল সাদা-ধূসর লোমওয়ালা অপার্থিব প্রাণীটা কিভাবে ছিন্নভিন্ন করছিল ইন্সপেক্টর প্রিডেক্সের দেহটাকে। দৃশ্যটার কথা মনে পড়তেই ঘৃণায় মুখ বিকৃত হয়ে উঠল ওর। চৌভেট ওর অবস্থাটা লক্ষ্য করে বললেন, "কি হলো? অমন মুখভঙ্গি করছেন কেন?"
"...সরি...ইয়ে..মানে", আমতা আমতা করে এবার গ্রীন বলল, "আসলে...আসলে আমি ওটাকে কাল স্বচক্ষে দেখেছি। আমি...আমি মিথ্যে বলতে পারি না"।
"...কি...দেখেছেন?"
এ কথায় গ্রীন একবার মূহুর্তের জন্য পাশে বসা কোকো'র দিকে চাইল, তারপর ফের চৌভেটের দিকে চেয়ে বলল, "জে-রাউজ...ওয়্যারউলফ..প্রত্যেক রাতে যে খুনগুলো ঘটছে, ওটাই ঘটাচ্ছে এসব কিছু"।
একটা চাপা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো ওদের মধ্যে। কোকো'র দিকে চেয়ে গ্রীন দেখল, একটা বিহ্বল ভাব ফুটে উঠেছে ওর মুখে।
"...আই সী", বললেন ইন্সপেক্টর চৌভেট, তাঁর ঠোঁটের কোণায় খেলে গেল একটুকরো ব্যঙ্গাত্মক হাসি। বললেন, "দয়া করে আমাদের সবাইকে এবার মেন্টাল অ্যাসাইলামে পাঠাবার ব্যবস্থা করবেন না যেন"। তারপরেই উচ্চ গলায় হেসে উঠলেন। সেই হাসিতে ঝরে পড়ছে ওদের প্রতি তীব্র ব্যঙ্গ।
"...দেখুন..", এবার আসরে নামল কোকো, "উনি আপনার সঙ্গে মস্করা করছেন না বা মিথ্যে কথাও বলছেন না। আমরা দুজনেই ওটা'কে দেখেছি গতকাল"।
"...হুমমম.." এবার কিছুটা গম্ভীর হয়ে নিজের মাথার চুলে তর্জনী বোলাতে লাগলেন ইন্সপেক্টর চৌভেট, "বেশ, মানলাম আপনারা মিথ্যে বলছেন না বা কোনওরকম মস্করা করছেন না। আমিও আপনাদের অবিশ্বাস করছি না। তো আমি এ ব্যাপারে কি করতে পারি আপনাদের?"
"...আপনার একটা সাহায্যের দরকার", বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বলল গ্রীন।
"....কি ব্যাপারে সাহায্য করব? ওই ওয়্যারউলফটাকে মারার ব্যাপারে?" তারপরেই ওদের দিকে ঝুঁকে পড়ে ইন্সপেক্টর বললেন, "দেখুন, যদি সত্যিই কেসটা এরকম হয় তো তাতে আমাদের গায়ে কোনও আঁচ পড়বে না। আর এতে আমাদের করণীয়ও কিছু নেই। কিন্তু আমরা চাই না, আমাদের নিয়ে মিডিয়া হাসাহাসি করুক"।
"...তার মানে, আপনি আমাদের কোনও সাহায্য করছেন না?"
"....আমি বলিনি করব না। তবে এটুকু সাহায্য অবশ্যই করতে পারি যে সেই ম্যালগরি কোথায় আছে, আমি তার ট্রেস আপনাকে দিতে পারি। ম্যালগরি থাকে ওই টেন্ট সিটিতে। সিডাউ ম্যার্চ্যান্ডের মতোই সে লোকজন থেকে অনেক দূরে, নিজেকে স্বতন্ত্র রাখে। ওর তাঁবুটাও বেশ তফাতে
"...ধন্যবাদ ", খুশি হয়ে বলল গ্রীন, "আপাতত এটুকুই জানার ছিল"।
থানা থেকে বেরিয়ে এলো গ্রীন এবং কোকো। উঠে গিয়ে বসল নিজেদের গাড়িতে।
"...কোথায় যাচ্ছ?" জিজ্ঞেস করল কোকো, "ম্যালগরির তাঁবুতে?"
"...না, বাড়িতে"।
"...বাড়িতে!" অবাক হলো কোকো, "কেন? তুমি না বললে, রাত নামার আগেই ম্যালগরিকে খুঁজে পেতে চাও, যে তোমায়.... "
"....আলবাত চাই", ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল গ্রীন, "তবে এ কাজে আমার সঙ্গে যাবে শুধু সেইন্ট ফোর্ট। তোমাকে আমি ওই জায়গায় নিয়ে যাব না"।
"..কি বলছ? তোমাকে আমি কি করে ছেড়ে দেব ওই বিপজ্জনক জায়গায়?"
"....আমি ঠিক থাকতে পারব। তাছাড়া, বিপদ আমার নয়, তোমারই হবার সম্ভাবনা বেশী। মেয়েদের ওখানে যাওয়া ঠিক নয়। তাই চাইছি, সেন্ট ফোর্ট আমার সঙ্গে যাবে শুধু"।
"...কিন্তু... "
"...পাগলামি ছাড়ো, কোকো!" প্রায় চাপা ধমকে বলল গ্রীন, "যেটা বলছি শোনো। তুমি লক্ষ্মী মেয়ের মতো বাড়িতে থাকো। সেন্ট-ফোর্ট'কে নিয়ে আমি যাচ্ছি টেন্ট সিটি'তে। ও.কে.?"
ঘন্টাখানেক পর সেইন্ট ফোর্টকে নিয়ে গ্রীন এলো সেই টেন্ট সিটিতে। ক্যারিফোরের টেন্ট সিটিতে। জায়গাটা এ ক'দিনে ওর কাছে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে। তাঁবুর সারির মাঝখান দিয়ে যেতে যেতে গ্রীন দেখল, ভূমিকম্প এদের মাথার ওপর থেকে ছাদটুকু কেড়ে নিলেও জীবন এদের একই ছন্দে চলছে এখন। অনেকক্ষণ তাঁবুর ভিড়ের মধ্যে এলোমেলো ঘুরল ওরা, অনেককে জিজ্ঞেস করল, লুইস ম্যালগরির তাঁবুটা কোথায়, কিন্তু কেউই সদর্থক কিছু বলতে পারল না। কেউই তেমন ঠিকভাবে ওদের কোনও দিশা দেখাতে পারল না। এমনকি ম্যালগরির নামও এখানকার কেউ শোনেনি।
"...ধ্যুস, কেউই তো দেখছি ওর ব্যাপারে কিছু বলতে পারছে না", বলল সেইন্ট-ফোর্ট, "সন্ধে নামার আগেই যদি ওর খোঁজ না পাই তাহলে কি লাভ হলো শুধুশুধু এখানে এসে?"
কাঁধ ঝাঁকাল গ্রীন। ওরও মুখেচোখে ধীরেধীরে পুঞ্জিভূত হচ্ছে হতাশার মেঘ। ঠিক এইসময় ওর কাঁধে পেছন থেকে কেউ যেন হাত রাখল। ফিরে তাকিয়ে গ্রীন দেখল, ইন্সপেক্টর চৌভেট।
"...মঁসিয়ে গ্রীন, এত সহজে নিরাশ হয়ে পড়ছেন নাকি? "
"...আপনি?" অবাক হলো গ্রীন এবং সেইন্ট ফোর্ট। এইসময় এখানে ইন্সপেক্টর চৌভেটকে দেখবে, স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি ওরা।
"...আপনি এখানে?" হতবাক গ্রীন বলেই ফেলল, "এইসময়? "
"....আমি আসলে বাড়ি ফিরছিলাম", বললেন ইন্সপেক্টর চৌভেট, "ভাবলাম পাহাড়ে পথ ধরে পাঁচ মাইল গাড়িটা ড্রাইভ করে ফিরব। তো এপথে এসেই আপনাদের দেখতে পেলাম"।
"....ভাগ্য ভালো, আপনি এসে পড়েছেন", বলল গ্রীন, "ম্যালগরির তাঁবুটা আমরা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি না। যদি একটু হেল্প করেন...."
এ কথায় চৌভেট আঙুল দেখিয়ে অনেকটা দূরে একটা তাঁবু দেখিয়ে বলল, "ওই... ওই যে...ওর তাঁবু"।
গ্রীন এবং সেইন্ট ফোর্ট দুজনেই ঘুরে তাকিয়ে দেখল, সত্যিই অনেকটা দূরে একটা জায়গায় একটা তাঁবু দেখা যাচ্ছে। তাঁবুটা লোকবসতি থেকে অনেক দূরে। ঘন গাছপালার জটলার আড়ালে থাকায় ওটাকে এতক্ষণ দেখতে পায়নি গ্রীনরা। দূর থেকেও বোঝা যাচ্ছে এখানকার অন্য তাঁবুগুলোর মতো ত্রিপলের তাঁবু নয়, রঙিন কাপড় আর টেবিলক্লথ দিয়ে তৈরি। অনেকটা পুরনো দিনের একটা হরর মুভিতে জিপসিদের যে তাঁবু দেখানো হয়েছিল, ঠিক সেইরকম। গ্রীন এবং সেইন্ট ফোর্ট দুজনেই তাড়াতাড়ি পা চালাল সেই তাঁবুর দিকে। পেছনে ইন্সপেক্টর চৌভেট।
তাঁবুর প্রবেশমুখের কাছে এসে ইন্সপেক্টর চৌভেট ভেতরে কাউকে উদ্দেশ্য করে ডেকে উঠলেন, "কি হে, আছো নাকি?"
"...কে?" ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। একটা ভারিক্কী কন্ঠস্বর। তারপরেই শোনা গেল "আসুন, ভেতরে আসুন"। বোধহয় ভেতরের লোকটি দেখতে পেয়েছে ইন্সপেক্টর চৌভেটকে। গ্রীন এবং সেইন্ট ফোর্টের দিকে একবার তাকিয়ে নীরবে কিছু একটা ইশারা করলেন চৌভেট, তারপর প্রবেশ করলেন ভেতরে। ওঁকে অনুসরণ করে ওরাও ঢুকল ভেতরে। তাঁবুর ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে গেল ওরা। পেরিফোরের অন্য তাঁবুগুলোয় ওরা দেখেছে, একটা ছন্নছাড়া অবস্থা। কিন্তু ম্যালগরির তাঁবুর ভেতরে সবকিছুই বেশ সাজানো গোছানো যেন এখানেই স্থায়ীভাবে সংসার পেতে বসেছে লোকটি। টেবিলে 'হোলি সেইন্ট'দের মূর্তি। বিভিন্নরকম ছোট বড় সুদৃশ্য মূর্তি দিয়ে সাজানো টেবিলটা। বিভিন্ন রঙিন কাপড় দিয়ে টেন্ট বানানো হয়েছে, বাইরের অস্তগামী সূর্যের আলো সেই রঙবেরঙ কাপড় ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করে বিভিন্ন রঙিন আলোকিত এক পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। কাছেই একটা চেয়ারে বসে আছে ম্যালগরি। ওদের দিকে পেছন করে বসে একটা ভেজা কাপড় দিয়ে নিজের গা ঘষে চলেছে সে।
"...হ্যালো লুইস!" ওকে সম্ভাষণ করে বলে উঠলেন ইন্সপেক্টর চৌভেট।
"...শুভ সন্ধ্যা, ইন্সপেক্টর! " পরিষ্কার ইংরেজিতে বলে উঠল ম্যালগরি, "আমার ঘরে আপনাকে দেখে খুবই ভালো লাগছে আমার"।
"...তোমার সঙ্গে আমাদের কিছু কথা আছে, ম্যালগরি"।
"...ডায়াবেলের ব্যাপারে?" হঠাৎ নিজে থেকেই বলে উঠল লুইস ম্যালগরি।
গ্রীন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করছিল ম্যালগরিকে। ওর কথাবার্তার ধরন গ্রীনের একটুও ভালো লাগছিল না। ওর কথা বলার ধরনটা কেমন যেন যান্ত্রিক মনে হচ্ছিল ওর কাছে।
"...হ্যাঁ, এইজন্যই কথা বলতে চাইছি কারণ আমরা বুঝতে পারছি, তোমার জীবন বিপন্ন। তোমার পুরনো বন্ধুদের কি পরিণতি হয়েছে, তা আশা করি শুনেছ? খবরগুলো নিশ্চয়ই তোমার কানেও গেছে?"
গা মোছার কাজ থেমে গেল ম্যালগরির। ফিরল ওদের দিকে। এতক্ষণে গ্রীন ভালো করে দেখার সুযোগ পেল। যে কাপড়টা দিয়ে নিজের গা মুছছিল ম্যালগরি, সেটা কোনো জলে ভেজা কাপড় নয়, তেলজাতীয় কিছুতে ভিজিয়ে গা মুছছিল লোকটি। ওর সারা গা তেলতেলে, বাইরে থেকে আসা সামান্য আলোয় চকচক করছে ম্যালগরির সর্বাঙ্গ।
"...কাদের কথা বলছেন, ইন্সপেক্টর? " বলে উঠল ম্যালগরি, "লন্ড্রি আর মার্চ্যান্ড?"
"...হ্যাঁ", এবার বলে উঠল গ্রীন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই ওকে থেমে যেতে হলো। একটা উগ্র গন্ধ কোথা থেকে ওর নাকে এসে ঢুকল। গন্ধটা এত তীব্র যে বলার নয়। অনেকটা এলাচের গন্ধের মতো। নাক টেনে গন্ধটা নিতে লাগল গ্রীন। পরমূহুর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে ম্যালগরির দিকে চেয়ে বলল, "আমরা মনে করছি, ওদের শিকার করেছে হেনরী ডায়াবেল। আর... আর এখন ও তোমায় শিকার করবে। যে কোনও সময়ে"। শেষের কথাটা বলার সময় টেবিলের দিকে চোখ পড়ল গ্রীনের। ছোট একটা কাঠের তৈরি নেকড়ের মূর্তি দেখতে পেল সে।
"...ও আমার কাছে ইতিমধ্যে একবার এসেছিল, কথাও বলেছিল", বলে উঠল ম্যালগরি, "প্রথমে ও সিডাউ মার্চ্যান্ডের কাছে গিয়েছিল, পরে আমার কাছে এসেছিল। ও বলেছিল, আমাদের সে আরেকটা সুযোগ দিতে চায়, ওকে সাহায্য করার, ওর সেবা করে বেঁচেবর্তে থাকার। সিডাউ মার্চ্যান্ড ওর কথা কানে তোলেনি তাই ওকে মরতে হয়েছে"। একটু থেমে ম্যালগরি এবার গড়গড় করে অনেক কথাই বলতে লাগল, যা শুনে গ্রীন এবং সেইন্ট ফোর্ট তো বটেই, ইন্সপেক্টর চৌভেটও হতভম্ব, বিস্ময়ে পাথর হয়ে বসে রইল। ম্যালগরি বলতে লাগল,, "আমি হেনরীর ওই প্রস্তাবে রাজি ছিলাম না। আমি চাই নি, আমার দ্বারা কোনো নরহত্যা হোক। আমার দ্বারা টেন্ট সিটি'র নিরীহ মহিলা এবং শিশুদের কোনও ক্ষতি হোক, আমি মনেপ্রাণে চাইনি। তাই লোকজন থেকে যতটা সম্ভব দূরে এই তাঁবু বানিয়ে বাস করতে লাগলাম। কিন্তু যে অভিশাপ ও আমার ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে গিয়েছিল, তার থেকে রেহাই পেলাম কই। দিন দুই আগে এক সন্ধ্যায় সঙ্গমরত এক আমেরিকান পুরুষ আর তার প্রেয়সীকে দেখে নিজেকে সামলাতে পারলাম না। মানুষের কাঁচা রক্ত আর মাংসের জন্য খিদে জেগে উঠল আমার মধ্যে। তারপর ওদের সাথে আমি কি করেছিলাম, আমার মনে নেই। পরে জেনেছিলাম, কি করেছিলাম"।
ম্যালগরির কথা শেষ হতে তাঁবুর মধ্যে একটা অকাট্য নীরবতা নেমে এলো। কারোর মুখে কোনও কথা নেই। একটা সূঁচ পড়লেও বুঝি তার শব্দ শোনা যাবে। ওদের সামনে বসে জলজ্যান্ত একটা ওয়্যারউলফ!
গ্রীন লক্ষ্য করল, ম্যালগরির দাঁতগুলো ঠোঁটের খানিকটা বাইরে এসে ঝুলছে। গা-টা অজান্তেই শিরশির করে উঠল ওর।
"....এখন আমাকে একমাত্র হেল্প করতে পারে হেনরী ডায়াবেল", ধীরেধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল লুইস ম্যালগরি। ওর কথাগুলো কেমন যেন জড়িয়ে আসতে লাগল। গ্রীন লক্ষ্য করল, ইতিমধ্যে ম্যালগরির দেহে রূপান্তর শুরু হয়ে গিয়েছে। বাইরে অন্ধকার যত পা টিপে টিপে নেমে আসছে, তাঁবুর ভেতরে ছায়া যত ঘনাচ্ছে, ম্যালগরির চোখদুটো ধীরেধীরে লাল রক্তবর্ণ হয়ে উঠছে। সারা গায়ে গজিয়ে উঠছে অসংখ্য বড় বড় লোম। কানদুটো ক্রমশ সূঁচালো হয়ে উঠছে। মুখের চোয়ালটা আকারে লম্বাটে হয়ে ঝুলে পড়ল। দেহটা লম্বায়-চওড়ায় বেড়ে গিয়ে সামনের দিকে খানিকটা ঝুঁকে পড়ল। হাত ও পায়ের ডগায় নখগুলো তীক্ষ্ণ এবং লম্বাটে হয়ে ঝুলে পড়ল।
গোটা ব্যাপারটা তিনজনের কাছেই এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে করণীয় ভুলে ওরা হাঁ করে ম্যালগরির দিকে চেয়ে দেখতে লাগল তার এই আশ্চর্য রূপান্তর। তিনজনেরই মুখ বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গিয়েছে। তিনজোড়া চোখ যেন এখুনি কোটর ছেড়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসবে।
......এদিকে, ধীরেধীরে মাথা তুলল ম্যালগরি। না, ম্যালগরি নয়, একটা বিশাল লোমশ মুখ। ওটার দুই চোখের কোটরে ধকধক করে জ্বলছে লাল আগুন। তারপরেই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে একটা ভয়ঙ্কর গর্জন করে উঠল সে।
হাউলিং!
হাউলিং এর শব্দটায় ওদের যেন শাপে বর হলো। বিমূঢ় অবস্থা থেকে সচকিত হয়ে উঠল তিনজনেই। গ্রীন এবং সেইন্ট ফোর্ট এক লাফে উঠে দাঁড়াল। ইন্সপেক্টর চৌভেটের হাত ধরেও একখানা সজোরে টান মারল। ওর টানে চৌভেটও যেন সম্বিৎ ফিরে পেলেন এতক্ষণে।
"....এক্ষুণি পালাও সবাই!! " চেঁচিয়ে বলে উঠল গ্রীন।
আর বলার অপেক্ষা করল না কেউ। তিনজনেই চকিতে ম্যালগরির তাঁবু ছেড়ে বাইরে এসে পড়ল। তারপরেই মার দৌড়!
সবার আগে ছুটছে সেইন্ট ফোর্ট। তার পেছনে গ্রীন এবং সবার শেষে ইন্সপেক্টর চৌভেট। গ্রীন এবং সেইন্ট ফোর্ট দুজনেরই অয়্যাথলেটিক চেহারা, তাই ওদের দৌড়তে কোনো সমস্যা হচ্ছিল না কিন্তু ভারী শরীরের চৌভেটের ছুটতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। তার ওপর পাহাড়ি রাস্তায় প্রায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ছুটতে হচ্ছে ওঁকে। একবার তো একটা পাথরে হোঁচট খেয়ে প্রায় উপুড় হয়ে পড়ে গেলেন হুমড়ি খেয়ে। গ্রীন এগিয়ে এসে ওঁর একটা হাত ধরে ওঁকে তুলে ধরতে সাহায্য করল। তারপর ফের শুরু হলো ছোটা। ছুটতে ছুটতে গ্রীন একবার পেছন ফিরে দেখল, পেছনে...ওদের বেশ অনেকটা পেছনে একটা কালো বিভীষিকা লরির গতিতে ছুটে আসছে। তাই উপায়ান্তর না দেখে গ্রীন এবার সাহায্যের জন্য চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিল যাতে টেন্ট সিটির লোকের কানে যায়। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে ফের 'হাউলিং' করে উঠল ওয়্যারউলফটা। মূহুর্তে তাঁবুগুলোর মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। সবাই বেরিয়ে এলো বাইরে। চোখেমুখে ওদের উত্তেজনা। হাউলিংয়ের শব্দ সবার কানে গিয়েছে। তারপরেই ওরা দেখতে পেলো, তিন-তিনজন মানুষ উদভ্রান্তের মতো ছুটে আসছে পাহাড়ি পথ ধরে আর ওদের পেছনে বিশাল লোমশ ভয়াবহ কুৎসিত দর্শন একটা জন্তু। এবার আতঙ্কিত হয়ে পড়ল টেন্ট সিটি'র লোকজন। প্রাণ বাঁচাতে সবাই ছোটাছুটি শুরু করে দিল। মূহুর্তে হৈহল্লা শুরু হয়ে গেল লোকালয়ের মধ্যে। ইতিমধ্যে ওরা টেন্ট সিটির ভেতর ঢুকে পড়ল। তবু দাঁড়াল না। একটাই সুবিধে, এত লোকজনের হৈ হল্লায় ওয়্যারউলফটা হয়তো একটু হকচকিয়ে যাবে, ওদের আর টার্গেট করতে পারবে না। প্রাণপণ ছুটতে লাগল গ্রীন এবং সেইন্ট ফোর্ট। লক্ষ্য এখন টেন্ট সিটির বাইরে পার্ক করে রাখা গাড়িটার দিকে। গাড়ি বলতে একটা বড়সড় ভ্যান। ইচ্ছে করেই আজ নিজের ভ্যানটাকে নিয়ে এসেছে সেইন্ট ফোর্ট। কারণ নিজেও জানে না। পেছনে ইন্সপেক্টর চৌভেট আসছে কিনা, খেয়াল নেই কারোরই।
কোনওরকমে গাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ে গাড়ির দরজা ভেতর থেকে লক করে দিল গ্রীন এবং সেইন্ট ফোর্ট দুজনেই। অনেকক্ষণ ছুটেছে তারা। হাঁফাচ্ছে এখন রীতিমতো। বড় বড় শ্বাস পড়ছে দুজনেরই। কতক্ষণ পর ধাতস্থ হবার পর এবার দুজনেরই খেয়াল হলো, আরে ইন্সপেক্টর চৌভেট কোথায়? তাই তো, এতক্ষণ তো ওদের খেয়ালই ছিল না এদিকে।
বাইরে ওদিকে লোকজনের হৈহল্লা তুমুল আকার ধারণ করেছে। হুড়োহুড়ি, হুটোপুটি চরম আকার নিয়েছে। 'জে-রাউজ'..'জে-
রাউজ' চিৎকারে এখানকার আকাশ বাতাস মুখরিত এখন।
"...ইন্সপেক্টর চৌভেট হঠাৎ গেলেন কোথায়?" জানলা দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল সেইন্ট ফোর্ট।
"...খেয়াল করিনি। আমার পেছনেই তো আসছিলেন, তারপর হঠাৎ কোথায় চলে গেলেন?" বলতে বলতে গ্রীনের উৎসুক চোখদুটো লোকজনের ভিড়ের মধ্যে ব্যাকুলভাবে খুঁজতে লাগল চৌভেটকে। তারপরেই একটা তাঁবুর পেছনে চোখ পড়তেই ওর দৃষ্টি সচকিত হয়ে উঠল। আরে, ওই তো ইন্সপেক্টর চৌভেট! উনিও সম্ভবত গ্রীনদের দেখতে পেয়েছেন। ওঁর ভারী ক্লান্ত দেহটা ধীরেধীরে এগিয়ে আসতে লাগল এদিকেই, কিন্তু তারপরে যা হলো....
একটা বিশাল লোমশ থাবা হঠাৎ কোথা থেকে যেন এসে পড়ল ইন্সপেক্টর চৌভেটের ঘাড়ে। যন্ত্রণায় আর্তচিৎকার করে উঠলেন চৌভেট। লাফিয়ে গাড়ি থেকে নেমে এলো গ্রীন। ছুটে যেতে চাইল ওঁকে সাহায্য করতে কিন্তু ততক্ষণে বড্ড দেরী হয়ে গিয়েছে। সেইন্ট ফোর্ট শক্ত করে চেপে ধরল গ্রীনকে। ওকে নীরবে নিরস্ত করল, ওকে বোঝাতে চাইল, এখন আর ওখানে গিয়ে কোনো লাভ হবে না। এখন নিজেদের বাঁচাবার সময়। এক টানে গ্রীনকে ভেতরে টেনে নিল সেইন্ট ফোর্ট। মূহুর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে ভ্যানের এঞ্জিনে স্টার্ট দিয়ে দিল সেইন্ট ফোর্ট। পেছনে উইন্ডস্ক্রিনের মধ্য দিয়ে দেখল, চৌভেটকে ততক্ষণে চিবিয়ে চিবিয়ে খেতে শুরু করে দিয়েছে ভয়াবহ নর-বৃকটা। লোকজনও ছুটে পালিয়ে গিয়েছে অন্যত্র। দূর থেকে শোনা যাচ্ছে ওদের সম্মিলিত স্বরে ভীষণ হৈ হট্টগোল। হঠাৎ এক কান্ড করে বসল সেইন্ট ফোর্ট। ভ্যানটা এক পাক ঘুরিয়ে নিয়ে সজোরে সেইদিকে ভ্যানটাকে চালিয়ে দিল সে। মুখ তুলল ওয়্যারউলফটা। রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে ওটার মুখটা। ভ্যানটাকে এগিয়ে আসতে দেখে হিংস্র গর্জন করে উঠল ওটা। চোখের পলকে ভ্যানটা ভয়াবহ জন্তুটার ওপর সোজা চালিয়ে দিল সেইন্ট ফোর্ট। ইন্সপেক্টর চৌভেটের নিথর দেহ এবং ওয়্যারউলফটার ওপর দিয়ে সজোরে ভ্যানটা চালিয়ে অন্যপাশে চলে গিয়ে গাড়িটাকে ঘুরিয়ে দিল সেন্ট ফোর্ট। তারপর সোজা চালিয়ে চলে গেল।
"...ওটা কি মারা পড়ল?" জিজ্ঞেস করল উদ্বিগ্ন গ্রীন।
"...জানি না", বলল সেন্ট ফোর্ট, "তবে সম্ভবত না"।
সেইন্ট ফোর্টের বাড়িতে এসে যখন ওরা এসে পৌঁছল তখন রাত প্রায় সোয়া ন'টা বেজে গিয়েছে। বাড়ি পৌঁছে ওরা দেখল, কোকো'র গাড়িটা গ্যারেজে পার্ক করা নেই। স্তম্ভিত হয়ে গেল গ্রীন। গাড়ি নেই মানে কোকোও নেই। কোথায় গেল মেয়েটা গাড়ি নিয়ে? উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল।ভেতরে ভেতরে সে। দুজনে বাড়ির ভেতর এসে ঢুকল। গ্রীনের মনের অবস্থা বুঝতে পারছে সেইন্ট ফোর্ট। আসলে কোকোর জন্য ভেতরে ভেতরে উদ্বিগ্ন হয়ে আছে গ্রীন। সেইন্ট ফোর্ট একটা সিগারেট নিয়ে গ্রীনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, "শান্ত হও তো। এসো, একটু স্মোক করা যাক। "
মাথা নাড়ল গ্রীন। বলল, "না, মুড নেই গো এখন"।
কাঁধ ঝাঁকাল সেইন্ট ফোর্ট। নিজেই একটা সিগারেট ধরিয়ে টানতে লাগ্ল অন্যমনস্কভাবে। আজকের ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে লাগল ওরা।
সেইন্ট ফোর্ট বলল, "বুঝতে পারছি না, কি করে এরকম একটা ঘটনা ঘটা সম্ভব হলো? ওই লুইস ম্যালগরি লোকটাকে কি করে ওয়্যারউলফ বানাল হেনরী ডায়েবেলে?"
গ্রীনের আতঙ্কিত উদ্বিগ্ন চোখজোড়া জানলার বাইরের দিকে। ক্রমাগত লক্ষ্য রাখছে। কোথাও একটা গাছের পাতা নড়ে উঠলেও সচকিত হয়ে সেদিকে দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে তাকাচ্ছে। ওদিকে চেয়ে থেকেই বলল, "ভাগ্য ভালো, ওটা আমাদের পিছু ধাওয়া করে আসেনি! "
"...চৌভেট ছাড়াও ওটা কি আমাদেরও হত্যা করতে পারত? আমাদের যে কাউকে বা আমাদের দুজনকেই?"
"....শুধু আমাদের কেন", বলল গ্রীন, "ওখানে যাকেই সামনে পেতো, তাকেই মেরে ফেলত। আমার তো মনে হয়, ইতিমধ্যে ও হয়তো টেন্ট সিটি'র বেশ কিছু লোককে মেরে খেয়েছে"।
গ্রীনের কথা শেষ হতে না হতেই হঠাৎ ওর ফোনটা বেজে উঠল। ফোনের শব্দে সচকিত হয়ে প্রায় লাফিয়ে উঠল গ্রীন। সত্যিই, এইসময় এমন একটা আতঙ্ক আর আশঙ্কার মধ্যে রয়েছে ও যে ফোনের আওয়াজটা ওকে রীতিমত চমকে দিয়েছিল। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে পর্দার দিকে চেয়ে একটা স্বস্তির নিশ্বাস বেরিয়ে এলো ওর মুখ দিয়ে। কানে লাগিয়ে বলল, "থ্যাঙ্ক গড, তুমি ফোন করেছ। আমি তো তোমার জন্য চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। ওঃ, তুমি জানো না, একটু আগে আমরা কি ভীষণ অবস্থা কাটিয়ে এসেছি। মনে হয় প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছি"।
বলতে বলতে গ্রীনের মুখটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে উঠল। ওর মনে হলো, কোথাও একটা কিছু ঠিক গোলমাল হচ্ছে। ফোনের ওপ্রান্তে একটা পিনপতন নীরবতা। একটা অস্বস্তিকর নীরবতা। অথচ কোকো'র সাথে এর আগেও কত কথা বলেছে, কখনো তো এমন হয় নি। গ্রীনের ভাবনার মাঝেই ওপ্রান্ত থেকে একটা ঠাণ্ডা হিমশীতল গলা কানে এলো ওর। একটা অচেনা পুরুষকন্ঠ শুনতে পেল গ্রীন। সঙ্গে সঙ্গে সচকিত হয়ে উঠল গ্রীন। কে? কে এ? কোকোর ফোন থেকে এ কার গলা ভেসে আসছে?
"...মঁসিয়ে গ্রীন", ওপার থেকে বলতে লাগল সেই অচেনা রহস্যময় পুরুষকন্ঠ, "আমি জানি, আপনি কি অবস্থা থেকে কাটিয়ে এসেছেন...!"
"...কে কথা বলছেন আপনি?" কঠিন হয়ে উঠল গ্রীনের কণ্ঠস্বর।
ওপ্রান্তে সেই কণ্ঠস্বর বলতে লাগল, "ওহহো, আমি ভেবেছিলাম, আপনি আমায় চিনতে পারবেন। অবশ্য যদিও আমরা এখনও পর্যন্ত কেউ কারোর মুখোমুখি হইনি"।
হতভম্ব আশার গ্রীন বোধহয় আরও কিছু বলতে যেতো,কিন্তু ওপ্রান্ত থেকে সেই পুরুষকন্ঠ একটু হেসে বলতে লাগল, "আমার উপস্থিতি যদিও আপনি এর আগেও টের পেয়েছেন, আমাকে দেখেওছেন কিন্তু আপনি আমার এই মুখটাকে এর আগে কখনো দেখেননি। আপনার তো মাত্র একটা মুখ কিন্তু আমার আসলে অনেকগুলো মুখ আছে। " বলেই হাসতে লাগল সেই পুরুষকন্ঠ। নিষ্ঠুর সেই হাসি যে শুনলে যে কারোর বুকের রক্ত জল হয়ে যাবে মূহুর্তে।
"...কোকো কোথায়?" হঠাৎ জলদগম্ভীর স্বরে জিজ্ঞাসা করে বসল গ্রীন, "ও এখনও বেঁচে আছে তো?"
"...আছে...বেঁচে আছে", ওকে এমনভাবে আদুরে গলায় স্বান্তনা দিয়ে বলল সেই পুরুষকন্ঠ যেন কোনো কচি শিশুকে ভোলাবার জন্য বলছে। একটু থেমে সেই পুরুষকন্ঠ ফের বলল, "আসলে ও কতক্ষণ বেঁচে থাকবে না থাকবে, সেটা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আপনার ওপর"।
"....তুমি আমায় এখন কি করতে বলো? " 'আপনি' থেকে সরাসরি 'তুমি'তে নেমে এলো গ্রীন, "কি চাও তুমি আমার কাছে, বলো?"
গ্রীনকে চাপা উত্তেজনায় থমথম করতে দেখে সেইন্ট ফোর্ট'ও সোফা ছেড়ে উঠে এসে দাঁড়িয়েছে ওর পাশে। গ্রীনের অবশ্য তখন সেদিকে খেয়াল নেই।
ওপ্রান্ত থেকে খুকখুক করে আবার একটা নিষ্ঠুর হাসি শোনা গেল। হাসি থামিয়ে ফের সেই পুরুষকন্ঠ বলতে লাগল, "কি চাই? চাই, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাও। হাইতিতে কি ঘটছে না ঘটছে, এসব নিয়ে তোমার মাথা ঘামাবার কোনও প্রয়োজন নেই। তোমরা আমেরিকানরা হলে কৃত্রিম জগতের বাসিন্দা, নকলি জীবন উপভোগ করতেই বেশী ভালোবাসো। বারে গিয়ে নাচা, শৌখিন রেস্তরাঁয় গিয়ে খাওয়া, টিভি দেখা, ভিডিও গেম খেলা - এইগুলোই তো তোমাদের জীবন, তাই না? যাও, তাই-ই এনজয় করো। এখানকার সত্যিকারের জীবন নিয়ে আগ্রহ তোমাদের দেখাবার দরকার নেই। শিকার আর শিকারীর জীবনে নাক গলাতে এসো না। আমার কথা যদি শোনো তাহলে মেয়েটাকে ছেড়ে দেব; আর যদি আমার কথা না শোনো, তাহলে আমিই তোমায় বুঝিয়ে দেব, সত্যিকারের জীবন কাকে বলে"।
কথা শেষ হতেই ফোনটা ওপ্রান্ত থেকে কেটে গেল। ভ্যাবলার মতো শূন্য দৃষ্টিতে গ্রীন চেয়ে রইল ফোনের স্ক্রিনটার দিকে। মাথার ভেতরটা হঠাৎ কিরকম ফাঁকা ফাঁকা মনে হতে লাগল ওর। মনে হলো, পুরো ঘরটা যেন ওর চোখের সামনে ঘুরছে বনবন করে।
"...কি হয়েছে?" ওর পাশে দাঁড়িয়ে খানিক উদ্বিগ্ন মুখে জিজ্ঞাসা করল সেইন্ট ফোর্ট, "কার ফোন ছিল?"
"...কোকো ওর কব্জায় আছে", কাছেই একটা সোফায় ধপ করে বসে পড়ে বলল গ্রীন, "বলছিল, যদি আমি দেশে ফিরে যাই তবেই নাকি কোকো'কে ছাড়বে, নইলে ওকে শেষ করে দেবে"।
সেইন্ট ফোর্টের মুখে যেন অন্ধকার নেমে এলো। চাচাতো বোনের আসন্ন বিপদের গুরুত্ব চিন্তা করে শঙ্কিত হয়ে উঠল ও। চরম উত্তেজনায় হঠাৎ ঘরের ভেতরেই পায়চারি শুরু করল। জোরে জোরে দু পাশে মাথা নাড়ছে আর নিজের মনে বিড়বিড় করে কি যেন বলছে। ক্রিওল ভাষায় বলছে বলে ওর কথাগুলোর একবিন্দু বুঝতে পারছে না গ্রীন। শুধু এটুকু বুঝতে পারছে, সাময়িক মানসিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে ওর মধ্যে।
"....তোমার কি সত্যি সত্যিই মনে হচ্ছে যে কোকো এখনও বেঁচে আছে?" পায়চারি থামিয়ে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল সেইন্ট ফোর্ট।
মাথা নাড়ল গ্রীন। বলল, "জানি না। ও আদৌ বেঁচে আছে কিনা জানি না। তবে এটুকু জানি, আমি যদি দেশে ফিরেও যাই, তাহলেও ওই নেকড়ে-মানুষটা কিছুতেই ওকে মুক্তি দেবে না।" বলে চরম হতাশায় জোরে জোরে মাথা নাড়তে লাগল গ্রীন। তারপরেই হঠাৎ কি মনে হতে একরকম ছুটে এলো সেইন্ট ফোর্টের কাছে। ওর হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে চরম উত্তেজিত গলায় বলল, "আমি এইমাত্র এমন একজনের সাথে কথা বলেছি যে কিনা একটা ওয়্যারউলফ। সে আমার প্রেমিকাকে হত্যা করতে চলেছে। কিভাবে আমি শান্তি পেতে পারি মনে? বলেছে, আমি যদি হাইতি ছেড়ে না চলে যাই, ও ওকে মেরে খেয়ে ফেলবে। এইসব কথা শোনার পর কিভাবে আমি এখনও সুস্থ আছি, সেটাই বুঝতে পারছি না। আমি যদি আমেরিকা ফিরেও যাই, কিছুদিনের মধ্যে আমি হয়তো পাগলই হয়ে যাব"।
"...শান্ত হও", বলল সেইন্ট ফোর্ট, "এত উত্তেজিত হলে কাজের কাজ কিছুই হবে না, শুধু শুধু বিপদই বাড়বে তাতে"।
"...কি ভাবব? এই মূহুর্তে কোথায় গেলে ওদের পাব? ওর কবল থেকে কোকো'কে উদ্ধার করতেই হবে, যে কোনওভাবে"।
"...সে তো পরের কথা", শান্ত গলায় বলল সেইন্ট ফোর্ট। শান্ত স্বরে কথাটা বললেও ওকেও বেশ উত্তেজিত আর বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে ভেতরে। সে বলল, "আগে তো জানতে হবে, কোকো'কে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা তো জানিই না যে ও ওকে ধরে নিয়ে গিয়ে কোথায় রেখেছে।"
"...আমাদের কারোর না কারোর সাহায্য নিতেই হবে", অধৈর্য দেখাচ্ছে গ্রীনকে, "ধরো আমরা যদি পুলিশ ফোর্স নিয়ে..."
"....মারাত্মক ভুল করব তাহলে", গ্রীনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল সেইন্ট ফোর্ট, "আমাদের কাউকেই তা হলে আর বেঁচে ফিরতে হবে না"।
"....তাহলে অন্য কোনো উপায়? এই যেমন কোনো তান্ত্রিক বা পুরোহিত...বা ব্ল্যাক ম্যাজিক জানে এরকম কেউ..."
"....রাইট", খুশি খুশি হয়ে উঠল সেইন্ট ফোর্টের মুখখানা, "ভুডু।"
"...ভুডু!" অবাক হলো গ্রীন, "মানে ওই কালাজাদুবিদ্যে?"
"....হ্যাঁ। ভুডু জানে এরকম একজনকে দরকার আমাদের সঙ্গে"।
"...কিন্তু এরকম কাকে পাব?"
একটা দেঁতোহাসি ফুটে উঠল সেইন্ট ফোর্টের মুখে। বলল, "আছে। আমার চেনাশোনা একজন আছে। অহংগান। সে একজন ভুডু প্রিস্ট। ওকে গিয়ে সব জানাব আমরা"।
"....কিন্তু সে কি ওয়্যারউলফের ব্যাপারে আমাদের হেল্প করতে পারবে? ওয়্যারউলফ সন্মন্ধে ওর পর্যাপ্ত জ্ঞান আছে কি?"
"....নিশ্চয়ই থাকবে। অন্তত থাকা তো উচিত"।
"....তবে দেরী কোরো না, চলো, আমরা বেরিয়ে পড়ি এখনই", উত্তেজনায় জোরে জোরে শ্বাস পড়ছে গ্রীনের।
"....অত তাড়াহুড়ো করছ কেন?" বলল সেইন্ট ফোর্ট, "একটু রেস্ট নাও। আজ সারাদিন তো বলতে গেলে বিছানায় পিঠ দাওনি"।
"....না, আমি এখনই যেতে চাই", আকুতি ঝরে পড়ল গ্রীনের গলায়।
"....দেখো আশার, তাড়াহুড়ো করে কোনো লাভ হবে না, ক্ষতিই হবে তাতে। তুমি এখন ঘুমাও, কাল সকালে আমরা বেরবো। না ঘুমোলে ফ্রেশ হয়ে কাল থেকে কাজে নামবে কি করে!"
সেইন্ট ফোর্টের চাপের মুখে অবশেষে নতিস্বীকার করতে হলো গ্রীনকে। সামান্য কিছু মুখে দিয়ে কাউচের ওপরেই শুয়ে পড়ল।
পাক্কা ন'ঘন্টা ঘুমোল গ্রীন। যখন ঘুম ভাঙল, জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখল, আকাশটা ইতিমধ্যে ঘন মেঘে ছেয়ে এসেছে। দিনটাও কেমন যেন ম্লান আর অনুজ্জ্বল। গাছপালার ছায়ায় পুরো শহরটাকে কেমন যেন গাঢ় সবুজ দেখাচ্ছে। এখানে সাধারণত প্রায় প্রতি রাতেই বৃষ্টি হয় কিন্তু পরদিন সকালেই ঝকঝকে রোদ ওঠে; কিন্তু আজ কেন এমন মেঘলা কে জানে! ঘন কালো জলভরা মেঘের ছায়ায় দূরের পাহাড়টাকে কিরকম যেন আশ্চর্যরকম ভৌতিক মনে হচ্ছে।
আধঘন্টার মধ্যে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়ল ওরা। গতকালের মতোই ভ্যান নিয়ে বেরলো ওরা। পোর্ট অফ প্রিন্স ছাড়িয়ে সেইন্ট ফোর্ট মোলের অভিমুখে রাস্তায় গাড়ি ঘুরিয়ে দিল। আজ আর ট্রাফিক জ্যাম নেই পথে। ব্যাপারটা গ্রীনের ভালো লাগল না। ওর কাছে সবকিছু কেমন যেন অস্বাভাবিক ঠেকছিল। একসময় ঘন মেঘের বুক চিরে ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হলো। ভ্যানের উইন্ডস্ক্রিনের কাঁচটা ভরে উঠল বিন্দু বিন্দু জলকণায়। ওয়াইপার অন করে দিল সেইন্ট ফোর্ট। সামনের রাস্তার ওপর সতর্ক দৃষ্টি রেখে অনেকক্ষণ চলার পর একটা ছোট খুপরি ঘরের সামনে এসে ভ্যানটাকে পার্ক করালে সেইন্ট ফোর্ট। গাড়ি থেকে নামতে নামতেই অবাক হয়ে জায়গাটা দেখতে লাগল গ্রীন। আশেপাশে কোনও বাড়িঘর নেই। এমনকি পুরো জায়গাটায় কোনো জীবনের স্পন্দন আছে বলে মনে হলো না। সেইন্ট ফোর্টকে অনুসরণ করে গ্রীন এগিয়ে গেল সেই খুপরি ঘরটার দরজার দিকে। নক করল দরজায়। বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না ওদের। দরজা খুলে গেল কয়েক মূহুর্ত পরেই। একজন অশীতিপর বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে দরজায়। পরনে পরিষ্কার সাদা জোব্বার মতো পোশাক আর চোখে সরু মেটাল ফ্রেমের চশমা। গ্রীন লক্ষ্য করল, বৃদ্ধের বাঁ হাতটা খানিকটা যেন বাঁকানো।
"...কি খবর?" ওদের দুজনকে হেসে সম্ভাষণ করে বলল বৃদ্ধ লোকটি। গ্রীন বুঝল, এই লোকটি অহংগান। ভুডু পুরোহিত।
"হ্যালো", এবার বলে উঠল সেইন্ট ফোর্ট। তারপর পাশে গ্রীনকে দেখিয়ে বলল, "আশার গ্রীন। আমার বন্ধু। আমেরিকান জার্নালিস্ট"।
গ্রীনের দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিল বৃদ্ধ অহংগান। বলল, "আমার আসল নাম মাইকেল"।
"...হ্যালো", প্রত্যুত্তরে বলল গ্রীন।
"...এসো, ভেতরে এসো। তোমাদের অপেক্ষাতেই ছিলাম"।
বৃদ্ধ ঘরের ভেতর চলে গেল। গ্রীন একবার ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল সেইন্ট ফোর্টের দিকে। বোধহয় বৃদ্ধের শেষ কথাটির অর্থ জানতে চাইল। সেইন্ট ফোর্ট নীরবে ওকে ইশারা করল ঘরের ভেতর ঢুকতে। ভেতরে প্রবেশ করে অবাক হয়ে গেল গ্রীন। বাইরে দেখতে ঘরটা দেখতে যতখানি বেঢপ মনে হয়েছিল, ভেতরটা যেন একটা ছোটখাটো মন্দিরের মতো। সিলিংটা ক্রমশ উঁচু হয়ে উঠে গিয়েছে গম্বুজের মতো। ঘরের দেয়ালে দেয়ালে ঝোলানো রয়েছে সন্ন্যাসীদের ছবি। ঘরের মাঝখানে বিশাল একটা ড্রাম রাখা রয়েছে। চারদিকে একটা কেমন শান্ত, সমাহিত ভাব। ঘরের পরিবেশে একটা শীতল ভাব। অনেক উঁচুতে সিলিং থেকে ঝুলছে একমাত্র একটা বাতি। তার আলোয় ঘরটা মোটামুটি আলোকিত। গ্রীন'কে অবাক হয়ে চতুর্দিকে চাইতে দেখে ওর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে সেইন্ট ফোর্ট বলল, "ভুডু মন্দিরের আদলে বানানো হয়েছে ঘরটাকে"।
ওদের দুজনকে একটা কাউচের ওপর বসাল। মুখের হাসিটুকু অক্ষুণ্ণ রেখেই বৃদ্ধ মাইকেল ওদের উদ্দেশ্য করে বলল, "তো শেষপর্যন্ত তোমাদের আমার কাছে আসতেই হলো...জে-রাউজের ব্যাপারে.."।
গ্রীনের বিস্ময় আরও এক ডিগ্রি চড়ল। চকিতে একবার সেইন্ট ফোর্টের সঙ্গে দৃষ্টিবিনিময় করে নিয়ে বলল, "আপনি কি করে জানলেন?"
বৃদ্ধ মাইকেল মুচকি হাসল এবার। বলল, "এটা তো এখন আর কোনও সিক্রেট ব্যাপার নয়, তাই না? বিশেষ করে গত রাতের পর থেকে?"
"...না, তা অবশ্যই নয়"।
"....হাইতি জায়গাটাও ছোট আর গতকাল টেন্ট সিটির লোকজন ওটাকে স্বচক্ষে দেখেছে..দাবানলের মতো আশেপাশে ছড়িয়ে গিয়েছে খবরটা। আমার কানেও গতরাতে এসেছে হাউলিংয়ের শব্দ"।
গ্রীন এবার সরাসরি জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, আপনি বলতে পারেন এই 'জে রাউজ' বা ওয়্যারউলফ আসলে কে? দু'দিন আগে মাত্র আমি জানতে পেরেছি হেনরী ক্রিস্টোফার ডায়াবেল,যে ছিল এক ক্রিমিনাল সংস্থার কর্ণধার, সমস্তরকম বদ কর্মকান্ডের হোতা, সে-ই এখন ওয়্যারউলফ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আবার যদিও গতকাল.... "
গ্রীনের কথার মাঝেই কাঁধ ঝাঁকাল বৃদ্ধ মাইকেল। বলল, "এজন্যই আগে ওকে ধ্বংস করা দরকার। খুব শীঘ্র দরকার। তোমরা যদি আজ আমার কাছে না আসতে, তাহলে নিরুপায় হয়ে আমাকেই যেতে হতো তোমাদের কাছে"।
"...তার সন্মন্ধে আপনার কতটা ধারণা আছে?" এবার জিজ্ঞেস করল সেইন্ট ফোর্ট।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল বৃদ্ধ মাইকেল। বলল, "একটা গোপন ডাকিনীবিদ্যা চর্চার কেন্দ্রের সদস্য ছিল ওই হেনরী ক্রিস্টোফার। ওখানেই সর্বপ্রথম কোনও মানুষকে নর-বৃক বা ওয়্যারউলফ বানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। হেনরী জেল থেকে পালানোর পর ওদের গোপন আখড়ায় যোগ দেয় আর তারপরেই ওরা ওর ওপর কালাজাদুর প্রভাব খাটিয়ে ওকে ওয়্যারউলফ বানিয়ে দেয়। ওখানকার প্রত্যেক পূর্ণবয়স্ক সদস্যই ওয়্যারউলফ"।
"...ও গড!" প্রায় আর্তনাদ করে উঠে বলল গ্রীন, "তাহলে আমরা এখন কি করব?"
কিছুক্ষণ নিচের দিকে আনমনাভাবে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল বৃদ্ধ। যেন গভীরভাবে কিছু চিন্তা করছে। একসময় ওদের দিকে মুখ তুলে বলল, "তোমরা কফি খাবে?"
"...জ্বি না, ধন্যবাদ " বলে উঠল গ্রীন। আসলে তখন ওর আর তর সইছে না।
"...খাও না.." জোর দিয়ে বলল বৃদ্ধ।
অগত্যা ওদের রাজি হতে হলো।
স্টোভে কফির জল চাপিয়ে দিল মাইকেল। তারপর বলতে লাগল, "যখন আমি খুব ছোট ছিলাম, সেইসময় থেকেই প্রায় প্রতি রাতে আমি হাউলিং এর শব্দ শুনতে পেতাম। আমি তখন থাকতাম ওই দূরে পর্বতের গভীরে, এখান থেকে অনেকটা দূরে একটা গ্রামে। তার আগে পর্যন্ত হাইতিতে কখনো কোনওদিন মায়ানেকড়ে বা নর-বৃক'র ডাক বা উপদ্রবের কথা শোনা যায়নি। মায়ানেকড়ে তো দূর, একটা সাধারণ নেকড়ে বা হায়েনাও কখনো দেখা যায়নি। সেবার পরপর তিন রাত আমি হাউলিং'য়ের শব্দ শুনেছিলাম। পূর্ণিমার রাতে শুনতে পেয়েছিলাম হাউলিং! তারপর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরের বার যখন আবার পূর্ণিমা এলো, ফের শোনা গেল সেই হাউলিং! কিন্তু এবার শুধু হাউলিং নয়, সেইসঙ্গে ভেসে এলো একটি কচি মেয়ের কাতর আর্তনাদ। পরদিন দেখা গেল, আমাদের গ্রামের একটি ছোট মেয়েকে পাওয়া যাচ্ছে না। পরে অনেক খোঁজাখুঁজির পর যখন পাওয়া গেল, তখন তাকে নয়, পাওয়া গেল তার দেহাবশেষ। " বলেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল মাইকেল, "ওই মেয়েটি...ওই মেয়েটি ছিল আমার ছোটবেলার খেলার সাথী। কিন্তু তাকে ওই অবস্থায় দেখে আমার কি অবস্থা হয়েছিল, একবার অনুমান করতে পারো? "
চুপ করে বসে বৃদ্ধের কথাগুলো শুনতে লাগল গ্রীন এবং সেইন্ট ফোর্ট।
"...পরের রাতে গ্রামের সমস্ত পুরুষের দল একত্র হয়ে সেই রহস্যময় ঘাতকের খোঁজে বের হয়েছিল। ওরা কাউকেই খুঁজে পায়নি কিন্তু শোনা গিয়েছিল একটি বন্দুকের ফায়ারিংয়ের শব্দ। একটা জায়গায় ওরা রক্তের সরু রেখা দেখতে পেয়েছিল যদিও কোনো মৃতদেহ দেখতে পায়নি। ওরা ভাবল, শত্রুর নিকেশ হলো। আসলে তা ছিল ওদের আন্দাজমাত্র"।
নিজের হাতে কফি বানিয়ে মাইকেল দুটি কাপে ঢেলে পরিবেশন করল গ্রীন এবং সেইন্ট ফোর্টকে। তারপর বলতে লাগল, "তার পরের রাতে আর কোনো হাউলিং শোনা গেল না। আমরা যে যার বিছানা আশ্রয় করে ঘুমিয়ে পড়লাম। বাবাকে দেখলাম, এই জিনিসটা নিজের মাথার বালিশের পাশে রেখে শুয়েছেন। " বলতে বলতে একটা ছোট কাঠের বাক্সের ডালা খুলে গ্রীন এবং সেইন্ট ফোর্টের সামনে মেলে ধরল মাইকেল। ওরা ঝুঁকে পড়ে দেখল, ভেতরে রয়েছে আগাগোড়া রূপোর তৈরি একটি হাতলযুক্ত ক্ষুরধার মুখওয়ালা ছুরি। জিনিসটা যে খাঁটি রূপোর তৈরি তা দেখলেই বোঝা যায়। সিলিংয়ের উজ্জ্বল বাতির আলো ওটার ওপর পড়তেই ঝিকিয়ে ঝিকিয়ে উঠতে লাগল জিনিসটা।
"....এ যে দেখছি খাঁটি সিলভারের তৈরি!" বলেই ফেলল বিস্ময়াবিষ্ট গ্রীন।
"....এই যে রূপোর ছুরিটা দেখছ, এটা আমার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া", বাক্সের ডালাটা বন্ধ করতে করতে বলল মাইকেল, "পৈত্রিক সম্পত্তি বলতে পারো। আমাদের বংশে এটা কবে থেকে রয়েছে কেউ জানে না। তবে এর মূল্য আমার কাছে অপরিসীম। শুনেছি, ফ্রান্সে একটা জায়গায় বাগান খোঁড়াখুঁড়ির সময় মাটির তলা থেকে পাওয়া গিয়েছে এটা"।
বাক্সটা একপাশে রেখে বুড়ো মাইকেল ফের বলতে লাগল, "সে রাতে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম কিন্তু অনেক রাতে আমার ঘুমটা ভেঙে গিয়েছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম না কিসে আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছিল কিন্তু জেগে উঠে আমার হঠাৎ খুব ভয় ভয় করতে লাগল। পাশেই আমার মা-বাবা ঘুমোচ্ছিলেন। জানলা দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকেছে ঘরে আর তখনিই আমি ওটাকে দেখতে পেলাম"। বলতে বলতে চোখ থেকে চশমাটা খুলে নিয়ে অন্যমনস্কভাবে কাপড় দিয়ে মুছতে মুছতে মাইকেল বলতে লাগল, "আমার মনে হলো, জানলার বাইরে কিছু যেন একটা রয়েছে। নড়াচড়া করছে। ব্যাপারটা গোচরে আসতেই আমি জায়গাতেই জমে গেলাম। আমি স্থির নিষ্পলক চোখে চেয়ে রইলাম সেদিকে। এখনও মনে আছে, কম্বলটা নাক পর্যন্ত টেনে আমি সেদিকে চেয়ে বসে রইলাম। কতক্ষণ পর একটা বিশাল জন্তুর লোমশ মাথা জানলার সামনে উঠে এলো। বিশাল একটা ভয়াবহ কুৎসিত জন্তু। ওটার জ্বলন্ত লাল চোখজোড়া স্থির আমার দিকেই। আমায় দেখেই ওটা বিশাল একটা হাঁ করল। সুতীক্ষ্ণ দাঁতগুলো অস্ফুট চাঁদের আলোয় ঝিকঝিক করে উঠল। ওটা জানলা দিয়ে ওর বিশাল মাথাটা খানিকটা ঢুকিয়ে দিল ভেতরে। আমি ভয়ে বিছানায় বসেই প্যান্ট ভিজিয়ে ফেললাম"।
এই পর্যন্ত বলে একটু থামল বুড়ো গ্রীন। চোখদুটো বন্ধ করে ঠোঁট টিপে কিছু একটা আপ্রাণ ভাবার চেষ্টা করল। তারপর বলতে লাগল, "আমি তখন নিতান্তই বালক। জানলায় গরাদ ছিল না। ভয়াবহ সেই জে-রাউজ'টা খোলা জানলা দিয়ে তার অর্ধেক শরীর ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। একটা পা রাখল ঘরের ভেতরে। ওর একখানা পায়ের চাপেই পুরো বাড়িটা কেঁপে উঠল ভূমিকম্পের মতো।"
"...তারপর? " রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল গ্রীন।
"....তারপর আমার বাবার ঘুম ভেঙে গেল। ওয়্যারউলফটা প্রায় ঘরে ঢুকে পড়েছে দেখে বাবা বালিশের পাশে রাখা রূপোর এই ছুরিটা সটান ওটাকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারলেন। সঙ্গে সঙ্গে এক ভয়ঙ্কর গর্জন করে ওটা লাফিয়ে জানলা দিয়ে নেমে পালিয়ে গেল।" এই পর্যন্ত বলার পর একটু বিরতি নিল বুড়ো মাইকেল। তারপর বলতে লাগল, "পরদিন বাইরে বেরিয়ে আমরা রক্তের একটা সরু ট্রেইল দেখতে পেলাম, যেটা আমাদের জানলার নিচ থেকে শুরু হয়ে চলে গিয়েছে ক্রমশ অন্যদিকে। আমরা সেই ট্রেল অনুসরণ করে এগিয়ে চললাম, ক্রমে একটা বাড়ির সামনে এসে পড়লাম। বাড়িটা যার সে আমাদের প্রতিবেশী। দেখি, রক্তের ট্রেল'টা ওখানেই শেষ হয়েছে। বাড়ির ভেতর ঢুকে দেখি, লোকটি পড়ে রয়েছে ঘরের মেঝেতে। মৃত। আর...আর ওর পিঠে তখনো বিঁধে রয়েছে এই ছুরিটা যেটা গতরাতে বাবা নেকড়েটাকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মেরেছিলেন। "
বুড়ো মাইকেল তার কাহিনী শেষ করল।
দু মিনিট কেউ কোনও কথা বলল না। একসময় গ্রীনই নীরবতা ভঙ্গ করল। বলল, "তাহলে সিলভার বুলেট নিয়ে যে গল্পটা পড়েছিলাম, সেটা তাহলে দেখছি মিথ্যে নয়! " তারপর মাইকেলের দিকে ফিরে বলল, "সত্যি করেই রূপো নির্মিত অস্ত্র দিয়ে ওয়্যারউলফ বধ করা যায়?"
"...ইয়েস", দৃঢ় স্বরে বলল মাইকেল, "রূপোর বুলেট অথবা রূপোর ছুরি বা যে কোনও অস্ত্র দিয়ে ওকে ধ্বংস করা যায়। যে অস্ত্রই ব্যবহার করো না কেন, সেটা খাঁটি রূপোর তৈরি হতে হবে। ওয়্যারউলফকে মারার কাজটা কঠিন তবে একেবারে অসম্ভব নয়"।
তারপর সেইন্ট ফোর্টের দিকে চেয়ে মাইকেল বলল, "শুনেছি, তুমি গতকাল একটা ওয়্যারউলফকে তোমার গাড়িতে পিষে মেরেছ! কিন্তু জেনে রেখো, এদের নিধন করার একমাত্র নিশ্চিত উপায় হচ্ছে রূপোর তৈরি যে কোনও অস্ত্র।"
এই বলে ফের বাক্সের ডালাটা খুলে মাইকেল ভেতরে রাখা রূপোর ক্ষুরধার ছুরিটা সযত্নে গ্রীনের হাতে তুলে দিতে দিতে বলল, "তুমি তো জানো, মঁসিয়ে গ্রীন, হাইতিতে সিলভার বুলেট ব্যবহারের এক লম্বা ঐতিহ্য আছে। এখানকার যিনি 'রাজা' ছিলেন সেই হেনরী ক্রিস্টোফার নিজেকে শেষ করেছিলেন সিলভার বুলেটের সাহায্যে। তবে এখন এই সিলভার আপনাকে ব্যবহার করতে হবে ওয়্যারউলফ নিধনের কাজে। কারণ একমাত্র সিলভার দিয়েই ওয়্যারউলফ বধ সম্ভব। কিন্তু তোমরা হলে আজকালকার ছেলে। তোমরা ব্যবহার করবে সিলভার বুলেট"।
"...তার মানে এটাকে গলিয়ে বুলেট বানাতে হবে?" বলল সেইন্ট ফোর্ট।
"...ডিয়ার বয়েজ", এবার শান্ত স্বরে বলল বুড়ো মাইকেল, "অত টেনশন নিচ্ছ কেন? এখানে এরকম বেশ কয়েকটা অস্ত্র কারখানা আছে, যেখানে তুমি অনায়াসে এটাকে গলিয়ে নিয়ে বুলেট বানাতে পারো"।
"....বেশ, তা না হয় পারব", বলল গ্রীন, "কিন্তু আমাকেও দেখতে হবে আমার কাছে যে রিভলভারটা আছে, তাতে সিলভার বুলেট ভরলে কাজ দেবে কিনা..." বলতে বলতে পকেট থেকে রিভলভারটা টেনে বের করে আনল গ্রীন। মাইকেল সেটা হাতে নিয়ে তার ওজন পরীক্ষা করতে লাগল। বলল, "তোমার কি মনে হয়, এই রিভলভারে সিলভার বুলেট ভরলে তা কাজে দেবে?" তারপরেই স্বগতোক্তি করার মতো করে বললেন, "রিভলভার দিয়ে যতদূর মনে হয় কাজ হবে না। আমার মনে হয় ওয়্যারউলফ নিধনের কাজে এই ছুরিটা ডায়রেক্ট ব্যবহার করলেই ভালো হয়।"
"....কিন্তু ছুরির ব্যবহারে আমার হাত মোটেও পাকা নয়", আমতা আমতা করে বলল গ্রীন, "ওকে এই ছুরিটা দিয়ে আঘাত করার আগেই ও আমাদের শেষ করে ফেলবে। তবে একটা উপায় আছে। ও যখন মানুষের রূপে থাকবে, তখনই ওকে আমি এই ছুরি দিয়ে শেষ করতে পারি। আর সেটা করতে হবে দিনের বেলায় যখন কিনা ও কোনওভাবেই ওয়্যারউলফে রূপান্তরিত হতে পারবে না"।
"...শুধু দিনে কেন?" বলল সেইন্ট ফোর্ট, "আমরা আজকের রাতটাকেও ব্যবহার করতে পারি। কারণ ওয়্যারউলফরা একমাত্র সেইসব রাতে সক্রিয় থাকে যখনি আকাশে চাঁদ থাকে। চাঁদই ওদের শক্তির উৎস। আজ তো আকাশে চাঁদ থাকবে না। চাঁদহীন আকাশ থাকলে ও চাইলেও ওয়্যারউলফ হতে পারবে না। সুতরাং আজকেই চান্স নিলে ক্ষতি কি?"
ওর যুক্তিটা গ্রীনেরও মনে ধরল। কিন্তু ওর মনে পড়ল গতকালের কথা। ম্যালগরি ওয়্যারউলফে রূপান্তরিত হবার আগে গায়ে কিসব তেল মাখছিল। এলাচের মতো গন্ধযুক্ত তেল। তারপরেই তার রূপান্তর শুরু হয়েছিল। এখন যার মোকাবিলা করতে যাচ্ছে, সে'ও যদি ওর মতো গায়ে তেল মেখে ওয়্যারউলফে রূপান্তরিত হয়? অনেক সময় আকাশে চাঁদ থাকতেই হবে এমন কোনও কথা নেই। বেশী শক্তিশালী ওয়্যারউলফরা অমাবস্যা রাতেও সক্রিয় থাকতে পারে। কিন্তু যাই হোক, হেনরী'কে আজ রাতেই বধ করতে হবে। ওকে বধ করলেই অভিশাপ কেটে যাবে এই শহরের ওপর থেকে। কিন্তু ও যে কোথায় আছে, তা-ই তো ওদের জানা নেই। যাবে'টা কোথায়? মনের প্রশ্নটা প্রকাশই করে ফেলল গ্রীন।
"...লেস ডায়াব্লেসেই থাকবে", সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল সেইন্ট ফোর্ট, "ওর সেই ক্রিমিনাল সংস্থা। "
"...সেটা'ই বা কোথায়?"
"...উলফ মাউন্টেনে - নেকড়ে পাহাড়ের বুকের ভেতর"।
খুশি হয়ে উঠল এবার বুড়ো মাইকেলও। বলল, "জয়ী হও তোমরা, এই কামনা করি। আমিও তোমাদের সঙ্গে যাব"।
ঘোর আপত্তি শুরু করল গ্রীন এবং সেইন্ট ফোর্ট। হাজার হোক, মাইকেল বৃদ্ধ ব্যক্তি, ওর পক্ষে ওই পাহাড় জঙ্গলে যাওয়া মোটেও সোজা হবে না। ওর অভিজ্ঞতা যদিও ওদের কাজে আসতে পারে কিন্তু তবুও ওই দূর্গম বনেজঙ্গলে ওকে নিয়ে যাওয়াটা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাই তারা জোর আপত্তি তুলল। কিন্তু শেষমেশ মাইকেলের জেদের কাছে ওদের নতি স্বীকার করতে হলো। মাইকেল বলল, "ওখানে তোমরা পদে পদে এমন সব বিপদের সম্মুখীন হতে পারো, যা তোমাদের কল্পনারও বাইরে। কিন্ত সেইসব বিপদ আমার কাছে অজানা নয়। আমি তোমাদের সেইসব বিপদ থেকে আগাম সতর্ক করব, রক্ষা করব। এসব বিপজ্জনক কাজে শুধু তারুণ্য আর উদ্দীপনাটাই সব নয়, অভিজ্ঞতাটাও খুব প্রয়োজন হয়। অভিজ্ঞতার সাহায্য না পেলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে তোমাদের। তাই হটকারির মতো কিছু কোরো না। আমার কথা শোনো। আমি তোমাদের সাথে যাব।তোমাদের বিপদে আমি প্রাচীর হয়ে দাঁড়াব"।
গ্রীন এবং সেইন্ট ফোর্ট দুজনেই মাইকেলের কথার যথার্থতা বুঝল, তাই আর আপত্তি করল না। গ্রীন বলল, "বেশ। আমরা এখন থেকে একটা টিম হিসেবে কাজ করব"।
Copy
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now