বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
টর্চার সেল
- তানভীর আল আজাদ
এখন দিন না রাত?
ঘরের গুমট ভাবটা ভেঙ্গে দিয়ে একটা শুকনো খসখসে কন্ঠ আমার ধাপা ধরা কানের ধার ছুঁয়ে চলে গেল। আমার আধবোজা ফুলে থাকা চোখটা খুলে দেখার চেষ্টা করলাম। আবছাভাবে দেখতে পেলাম প্রায় তিন ফিট দূরে একটা বস্তার মত জড়সর হয়ে কি যেন পড়ে আছে। আমার ঝাপসা হয়ে আসা দৃষ্টি আবার গুটিয়ে নিলাম।
কিছুক্ষন পর পায়ে একটা স্পর্ষ আসল। তারপর আবার একটা প্রশ্ন, “এখন কী দিন না রাত?” এবার আমি একটু নড়ে উঠার চেষ্টা করলাম। আমার মাথাটা হাল্কা করে তুলতেই বুঝলাম আমি বমির উপর শুয়ে আছি। আমি কথা বলতে গিয়ে অনেক ব্যাথা পেলাম। ঠোঁট ব্যাথায় টনটন করে উঠল। হাত দিতেই ব্যাথায় চোখ কুঁচকে আসল। আর হাতের সাথে বাধল অর্ধতরল পদার্থ। ভাঙ্গা জানালা দিয়ে আসা রোদের ফালিতে হাত নিয়ে যেতেই দেখলাম বমি আর রক্ত। তারপর একটু সামনে তাকালাম। ভালভাবে নজর বুলাতেই দেখলাম একটা মানুষ। মানুষটার চোখ নেই, চোখের জায়গায় লেগে আছে কিছু জমাট বাঁধা রক্ত। আমি একটু কয়েকদিন আগের কথা মনে করার চেষ্টা করলাম। যতদূর মনে পড়ে, ধরা পড়ার পর তিন দিন পর্যন্ত জ্ঞান ছিল। তিন দিনের দিন আর সহ্য হল না। জ্ঞান হারালাম। তারপর কতদিন গেছে জানিনা। এর মাঝেই হয়ত মানুষটাকে রেখে গেছে। আমি অস্পষ্ট ভাবে বললাম, ‘এখন দিন’। আমি একটু হাতরে মানুষটার কাছে যেতেই একটা খুব বাজে গন্ধ নাকে এসে লাগল। শরিরে বিশেষ কোন শক্তি না থাকায় একটু শব্দ করে সেখানেই শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষন পর সেই শুকন খস্খসে কন্ঠ আবার আমার কানে আসল। ‘ব্যথা লাগে? আমার আর লাগে না। অবশ হয়ে গেছে শরীরের নিচের অংশ। ওখন মারলে শুধু থপ্তহপ শব্দ হয় আর রক্ত বের হয় শরীর ফেটে।‘ কিছুক্ষন থেমে আবার কন্ঠটা বলে উঠল, ‘আমার চারুর বিয়েটা যদি রফিকের সাথে দিতে পারতাম তাহলে খুব ভাল হত। খুব ভালবাসা ছিল দুজনের মধ্যে। শুধু লোকে ছি ছি করবে বলে বোনটাকে ঘরে আতকে রাখলাম। কিন্তু লাভটা কী হল! শেষ পর্যন্ত তো ওই মুসল্মানেরাই নিল। আমার চারু আর আমার থাকল না। চারু আমাকে মাফ করে দে রে......’ এ টুকু বলেই গলাটা জমাট বেধে গেল। শুধু মানুষটার ডুকরে কান্নার আওয়াজ।
কতক্ষন গেল বুঝলাম না। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাত মাথার ভেতর ফুটতে শুরু করল। চারপাশ একবার উচু একবার নিচু হতে লাগল।ঝিম ধরে গেল সবকিছু। জানালাটা দিকে তাকাতেই দেখলাম লাল, নীল, সবুজ তুলার মত কি যেন ঘরের ভেতর লাফিয়ে পড়ছে। সেগুল একবার ছোট হচ্ছে একবার বড় হচ্ছে। একের পর এক আসতে থাকল। একটা দুইটা করে অনেকগুলো হয়ে গেল। তারপ একটা সবুজ শাড়ি পরা মেয়ে। সবুজ শাড়ি আর লাল টিপ। টিপ কপালের যে জায়গায় থার কথা কেন জানি ঠিক সেই জায়গায় নেই। শাড়িটাও আলগোছে করে পড়া। মাথার চুল এলমেলো। একটা গোছা বড় একটা গোছা ছোট। ছবিটা একবার ঝাপ্সা হয়ে আসে একবার পরিষ্কার। মেয়েটা লাল নীল সবুজ তুলার মত জিনিস গুলোকে ধরছে আর ছুড়ে ছুড়ে মারছে।সেগুল দেয়ালে ধাক্কা লেগে লেগে আবার ফিরে ফিরে আসছে। হঠাত করে মেয়েটা বলে উঠল, ‘একটা কুকুর মেরেছি। তিন চারটা ছিল ওখানে। একটাই মারতে পেরেছি। বাকিগুলোর তো অনেক শক্তি। আমার দাদাকে বলবেন, আমি হার মানিনি একদম। আর বলবেন আমি স্বর্গের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। ঠাকুর আমার সাথেই আছেন। আপন মনে বাঁশি বাজাচ্ছেন। দাদা যেন এইপথ ধরেই আসেন। আমি অপেক্ষা করব।‘ আমি কেপে উঠলাম, জোরে জোরে আমার হাত দিয়ে সামনের মানুষটাকে আঘাত করতে লাগলাম।চিৎকার করার চেষ্টা করায় থটে আবার টান লাগল।একটু আওয়াজ এর সাথে ঠোট ফেটে বের হয়ে আসল এক আজলা রক্ত। আমি তাও থামলাম না। সমস্ত শক্তি দিয়ে মানুষটাকে ডাকার চেষ্টা করলাম। আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বুক ফাটিয়ে চিৎকার দেওয়ার চেষ্টা করলাম।কিন্তু মানুষটার কোন সাড়াশব্দ নাই। আমি উঠার চেষ্টা করলাম। মলদ্বারের কাছে তীব্র ব্যাথা অনুভব করায় থমকে গেলাম। চোখ মুখ কুঁচকে বমির উপর পড়ে রইলাম। কান্না আসতে লাগল। কিন্তু চোখে তো আর পানি নেই।অনেক্ষন পড়ে রইলাম এইভাবে।
মাথার ভেতর আবার সেই যন্ত্রনা শুরু হল। আবার ফুটতে লাগল মগজ। আবার জানালা দিয়ে সেই লাল নীল সবুজ তুলার মত জিনিস। লাফাতে থাকল ঘর জুড়ে। শত্রু দেখলে যেমন আমাদের রক্ত লাফিয়ে উঠত ঠিক তেমন করে লাফাচ্ছে ওগুলো। তারপর কন্ঠস্বর শুনা গেল। মিহি হিমশীতল কন্ঠস্বর। আমি কান পেতে থাকলাম। শুনতে পাচ্ছি দুইজন মানুষ কোথাইয় যেন কথা বলছে। ‘দাদা। ও দাদা। এইখানে সবকিছু এত সুন্দর কেন?’ তারপর আরেকটা কন্ঠ, ‘ এইটা যা আমার বাংলাদেশ রে পাগলি। এইটা আমার সোনার বাংলা। এইটা আমার মা, আমার দেশ, আমার স্বর্গ।‘ তারপর কিছুক্ষন থেমে আবার সেই কন্ঠ, ‘আজ তোর বিয়ে, তুই এখন তৈরি না হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস কেন? রফিক তো কিছুক্ষনের মধ্যেই এসে পড়বে।‘
তারপর আবার সব অন্ধকার, নিশ্চুপ। জানালা দিয়ে রোদের ফালির সাথে সাথে লাল নীল সবুজ তুলা গুলো কোথায় যেন চলে গেল। আমি আর বেশিক্ষন জেগে থাকতে পারলাম না। কতদিন ছিলাম এইখানে কিচ্ছু জানি না। কিচ্ছু মনে নেই তারপর।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now