বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

তাহলে থাকছ তুমি. যাচ্ছ না কোথাও

"ওয়েস্টার্ন গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান নাসরুল্লাহ (০ পয়েন্ট)

X দরজা অবধি গিয়ে মুহূর্তের জন্য ছায়ায় দাঁড়াল ওরিন, বাইরের রোদে বেরোনোর আগে চোখ সইয়ে নিচ্ছে। ধূলিধূসর রাস্তা থমথমে, অস্বাভাবিক রকমের নির্জন। রঙহীন তক্তার এবড়োখেবড়ো চেহারার দালানকোঠা নয়তো বালু-রঙা অ্যাডৌবিগুলো রাস্তার ওপাশ এবং উজান থেকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। খাঁ খাঁ করছে হিচ রেইলগুলো। গামলা উপচানো পানির ক্ষীণ একটা ধারা কালচে দাগ সৃষ্টি করছে গামলাটার একপ্রান্তের তলদেশে। রাস্তার উজানে কোথাও, তবে বাড়িঘরের আড়ালে, একটা মুরগি চেঁচিয়ে দুনিয়াকে জানান দিল তার ডিম পাড়ার কথা। নিঃসঙ্গ একখণ্ড মেঘ অলস ঝুলে আছে নীল আকাশে। ওরিন পা রাখল বাইরে। গানবেল্টটা টেনে ঠিক করে নিয়ে পথের দিকে নজর বোলাল। রৌভ ইয়োলো জ্যাকেটেই থাকবে। ময়নিহানের সঙ্গে দেখা করতে হলে রৌভকে মোকাবেলা করতে হবে আগে। এভাবেই ব্যাপারটা সামলাতে চায় সে; একটা কাজ একবারে। ভীষণ নিরুদ্বিগ্ন বোধ করছে সে। অতীতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে কী করেছে, সে কথা ভাবছে। একাই কীভাবে শহরছাড়া করেছিল তিন বিগলো ভাই আর তাদের জনা চল্লিশেক সাঙ্গোপাঙ্গকে, সেটা মনে করল। আরও মনে করল জীবনে প্রথম নরহত্যার কথা, গৃহযুদ্ধের সময়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানর কথা। মৃদু হাওয়ায় উড়ে গেল বোর্ডওয়কের কিনারে পড়ে থাকা একটা ছেঁড়া থলে। রাস্তার আরেকটু উজানে, পানির গামলার অদূরে, একটা ধেড়ে ইঁদুর বেরিয়ে এল একটা দোকানের নিচে থেকে, গুঁটিপায়ে রওনা হলো পানির দিকে। হাঁটতে শুরু করল ওরিন ওসমান, মেইন স্ট্রিটের উজানে। দূরত্বের বিচারে খুব বেশি দূর না হয়তো, কিন্তু বন্দুকবাজের পদক্ষেপের মতো এত দীর্ঘ পদক্ষেপ এবং গুলির আগমুহূর্তের বিরতির মতো এত দীর্ঘ বিরতি আর কোনো কিছুই হয় না। আজ রৌভ নিমেষ বুঝে যাবে, শহরে তার উপস্থিতি কিসের আলামত; ময়নিহানও বুঝবে। প্রিন্স ময়নিহান জুয়াড়ি না। কার্ল রৌভ যত বিশ্বস্তই হোক না কেন, শুধু তার ভরসাতেই থাকবে না সে। আস্তিনের ভাঁজে রাখা তাস সব সময়ই কাজে দেয়। সন্দেহ নেই, প্রিন্স একটা তুরুপের তাস ঠিকই লুকিয়ে রাখবে কোথাও না কোথাও। কিন্তু কোথায় রাখবে? কে হতে পারে সেই তুরুপ? কখন খেলবে হাতটা? শেষেরটা অনুমান করা কঠিন না। ঠিক গোলাগুলির মুহূর্তে। ত্রিশ গজও যায়নি সে, যখন ক্যাঁচ করে উঠল একটা দরজা এবং একজন লোক রাস্তায় পা রাখল। ওরিনকে না দেখার ভান করল সে, ঝটিতি হেঁটে রাস্তার ঠিক মাঝখানে গিয়ে থামল, তারপর এভাবে ঘুরল চকিতে, যেন কুচকাওয়াজের ড্রিল মাস্টার। কার্ল রৌভ। আজ রঙ-জলা নীল একটা শার্ট পরেছে সে। ওর চওড়া, অস্থিসার কাঁধ কামড়ে ধরেছে শার্টটা, অলসভাবে পড়ে আছে বুকের ভাঁজ আর সমতল পেটের ওপর। এত দূর থেকে দেখা যাচ্ছে না লোকটার চোখ, তবে ওরিন ওসমান নিশ্চিত, ওগুলো দেখতে কেমন। পাতলা, ছুঁচোল মুখ; সজারুর কাঁটার মতো গোঁফ; উঁচু চোয়ালের হাড়; লম্বা, চঞ্চল আঙুল। লোকটার নিতম্ব সরু, শরীরের কোথাও বাড়তি মেদ নেই। চোখ তুলল কার্ল রৌভ, সামনে তাকাল। শুকনো লাগছে তার ঠোঁটজোড়া, কিন্তু স্নায়ু টানটান। নিজেকে ভীষণ হালকা মনে হয় তার এবং অনুভতিটাকে সে উপভোগ করে। ঠিক ওই মুহূর্তে ওরিনের প্রতি এক ধরনের মায়া বোধ করে রৌভ। লোকটা খেলার সব নিয়মকানুন জানে। ঠিক যেভাবে এগিয়ে আসা উচিত, সেভাবেই আসছে। প্রতিটি পদক্ষেপে ঠিকরে বেরোচ্ছে আত্মবিশ্বাস আর সতর্কতা। গুমোট পরিবেশ। সামান্যতম শব্দ নেই কোথাও যা নৈশব্দ্যের স্বচ্ছ পেয়ালা খানখান করতে পারে। তপ্ত হাওয়া এতই নিশ্চল, যেন রাস্তার নাটক দেখার জন্য থমকে দাঁড়িয়েছে। ওরিন টের পেল, ওর হ্যাটব্যান্ডের নিচে ঘামের একটা চিকন ধারা গড়িয়ে নামছে আস্তে আস্তে। সতর্ক ভঙ্গিতে হাঁটছে সে, প্রতিটা পা ফেলছে যত্নের সঙ্গে এবং হিসেব করে। কার্ল রৌভই থামল আগে, আনুমানিক ষাট গজ দূরে। ‘ওসমান, দেখা হলোই তাহলে শেষমেশ। অবশ্য আমরা দুজনই জানতাম, দেখা হচ্ছে।’ ‘নিশ্চয়ই।’ ওরিনও দাঁড়িয়ে পড়েছে, পা ফাঁক, হাত দুটো ঝুলছে দুপাশ থেকে, কনুইয়ের কাছে ইষত্ বাঁকা, আঙুলগুলো ছড়ানো। ‘তুমি ভুল দলে যোগ দিয়েছ, কার্ল।’ ‘তার পরও দেখা হয়েছে আমাদের।’ রৌভ সামনে দাঁড়ানো দীর্ঘদেহী লোকটার দিকে তাকাল। পাথরে খোদাই করা মুখ, চোয়াল শক্ত এবং তৈরি। কোনো বন্দুকবাজকে ভয় করে না রৌভ। যদিও বন্দুকবাজের গুলিতে মরণই তার কপালের লিখন। হঠাত্ তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটল। হ্যাঁ, তার মরণ বন্দুকের গুলিতেই, তবে আজ নয়। কেঁপে উঠল তার হাত, মুহূর্তে সঙ্কেত পৌঁছে গেল সমস্ত পেশিতে, ড্র করার ভঙ্গিতে ঝলসে উঠল থাবা দুটো। আবছা একটা নড়াচড়ার চেয়ে বেশি কিছু মনে হলো না ওটা, পরক্ষণে থেমে গেল নড়াচড়াটা এবং ঢাকনা খোলা হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করতে করতে সে দেখল একটা সিক্স শুটারের কালো, গোমড়া মুখ তার দিকে তাকিয়ে। হেরে গেছে সে; ড্রতে হেরে গেছে। বিস্ময়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলল রৌভ; নিশানা ঠিক না করেই টিপে দিল ট্রিগারটা এবং লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। ওরিন ওসমান ধেয়ে আসছে তার দিকে, দেখল সে। তেড়ে আসছে লোকটা, পিস্তল উদ্যত অথচ গুলি করছে না! আতঙ্কে দিশাহারা রৌভ দেখল ব্যবধান কমে আসছে ওদের মাঝে। দ্রুত ট্রিগার টানল সে, বজ্রনির্ঘোষের মতো আওয়াজ করে তিনটি গুলি উগরাল ওর পিস্তল। চতুর্থ গুলির জন্য হাতুড়িটা পড়ছে, এমন সময়ে আরেকটা বন্দুকের গর্জন শুনল সে। কিন্তু কোথায় গর্জেছে ওটা? ওরিনের গান মাজলে আগুনের ঝলক দেখা যায়নি কোনো। দৌড়াচ্ছে একহারা গড়নের ঢ্যাঙ্গা লোকটা, দ্রুত চলমান এক টার্গেট। আর সে, রৌভ, তাড়াহুড়ো করে ফেলেছে বেশি ড্রয়ে পরাস্ত হয়েছে, এই উপলব্ধির আতঙ্কে বুদ্ধি হারিয়ে। ডান হাতের পিস্তলটা উঁচু করল সে, মাছিতে নিশানা করছে ওরিনের খুলি। কিন্তু আচমকা থমকে দাঁড়িয়েছে ওরিন; আগুন ঝরাচ্ছে তার সিক্স শুটার। মাজল থেকে লাফিয়ে আগে বাড়ল আগুন, ঝটকা মারল রৌভকে। কেঁপে উঠল সে, বুলেটটা বেরিয়ে গেছে শরীরের এক পাশ ঝলসে দিয়ে। হাত বদলাল সে, কিন্তু পরক্ষণে বুকে জোর ধাক্কা খেল একটা, কী ঘটেছে মস্তিষ্কে, সে খবর পৌঁছানোর আগেই লুটিয়ে পড়ল ধুলোয়। রহস্যময় গুলির আওয়াজটা ওরিনও শুনতে পেয়েছিল, কিন্তু আমলে নিল না। এখন অপেক্ষা করতে পারে না সে; মনোযোগ ফেরানোর সময় না এটা। রৌভকে পড়ে যেতে দেখল সে, তবে শুধু হাঁটু অবধি। এখনো পাঁচটা গুলি আছে পিস্তলবাজের কাছে, আর ওদের দূরত্বটা এ মুহূর্তে পনেরো গজও হবে না। উঁচু হলো রৌভের পিস্তল। ফের গুলি করল ওরিন। তড়াক করে শূন্যে লাফিয়ে উঠল রৌভ, যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তারপর হুড়মুড় করে পড়ে গেল শক্ত মাটিতে, ডাঙায় তোলা মাছের মতো খাবি খেতে লাগল। আবার শব্দ হলো গুলির। ওরিনের পায়ের কাছে পথের ধুলো ওড়াল একটা বুলেট। পাঁই করে বন্দুক ঘোরাল ওরিন, দোতলার একটা খোলা জানাল লক্ষ করে গুলি ছুড়ল। স্যালুনের দরজার উদ্দেশে পা বাড়াচ্ছিল সে, কিন্তু পেছনে একটা কাতর শব্দ শুনে থেমে গেল। ‘ওরিন ওসমান?’ রৌভ। বস্ফািরিত চোখ, মনে হচ্ছে এখুনি কোটর থেকে ছিটকে পড়বে। একটু দ্বিধা করল ওরিন, তাকাল ডাইনে-বাঁয়ে, তারপর নিস্তব্ধ রাস্তায় বসে পড়ল হাঁটুর ভরে। ‘কী, কার্ল? তোমার জন্য কিছু করতে পারি?’ ‘পেছনে… ডেস্কের… পেছনে… তু… তুমি…।’ অসপষ্ট হয়ে এল ওর ছেঁড়া ছেঁড়া কথা। তারপর মনে হয়, অনেক কষ্টে সমস্ত শক্তি একত্র করে পলক তুলল সে। ‘দারুণ, ইয়ার! বিজলি… বিজলি!’ পরমুহূর্তে হিমশীতল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল কার্ল রৌভ। হ্যাটটা সামান্য উঁচু করে অনন্তের পথযাত্রীকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করল ওরিন। ঠিক, লোকটা এক মুহূর্ত আগেও তার দুশমন ছিল এবং ওর হাত আরেকটু চালু হলে সে-ই এখন পড়ে থাকত ধুলোয়। কিন্তু এখন ওই লোক মৃত, সমস্ত তর্কবিতর্কের ঊর্ধ্বে। ওরিন নিশ্চিত, তার জায়গায় থাকলে, রৌভও তাকে সম্মান জানাতে কসুর করত না। উঠে দাঁড়াল ওরিন ওসমান, হাত দিয়ে জামাকাপড়ের ধুলো ঝেড়ে এগোল ইয়োলো জ্যাকেটের দিকে, বাদুড়-ডানা ঠেলে পা রাখল ভেতরে। দোতলার কামরাটা ফাঁকা; সিঁড়ি ফাঁকা; কেউ নেই আশেপাশে। নিচে নেমে এল ওরিন, দেখল বারের পেছনে ড্যানি দাঁড়িয়ে। ওর মুখ ভয়ে শুকনো, পাণ্ডুর। স্থির, শীতল চোখে ওরিন তাকাল ওর দিকে। ‘কে নেমেছে ওই সিঁড়ি দিয়ে?’ ঠোঁট ভেজাল ড্যানি। বিষম খেল সে, তারপর ফিসফিস করে বল, ‘কেউ না… তবে পেছনে… পেছনে আরেকটা সিঁড়ি আছে।’ গোড়ালির ভরে লাট্টুর মতো ঘুরে দাঁড়াল ওরিন, বুড়ো আঙুল দিয়ে পিস্তলে গুলি ভরতে ভরতে দীর্ঘ অথচ অনায়াস পদক্ষেপে এগোল কামরার পেছনের দিকে। খোলাই ছিল অফিসের দরজাটা; চৌকাঠের ওপর তার ছায়া পড়তেই তাকাল প্রিন্স ময়নিহান। কিছু একটা লিখছিল সে। ডেস্কময় ছড়ানো-ছিটানো কাগজ, ব্যস্ত মানুষের যেমন থাকে। অদূরে একটা লিকারের বোতল, পাশেই একটা ভরা গ্লাস। কলমটা নামিয়ে রাখল ময়নিহান। ‘ওকে হারিয়ে দিয়েছ তাহলে? আমিও আন্দাজ করেছিলাম, তুমিই জিতবে।’ ‘তাই?’ ওরিনের দৃষ্টি শীতল। লোকটা যদি সটকে পড়ার ফিকির করেও থাকে, তা তার জন্য করাটাই স্বাভাবিক, চেহারায় সেসবের বিন্দুমাত্র ছাপ নেই। ‘তোমার আরেকটু ফাস্টগান ভাড়া করা উচিত, প্রিন্স।’ ‘একটু আগে পর্যন্ত,’ কাঁধ ঝাঁকাল ময়নিহান, ‘কার্ল-ই ছিল সবচেয়ে ফাস্ট। তবে এটা আমার মাথাব্যথা না। ও প্যালেন্সের জন্য কাজ করছিল।’ কামরার ভেতরে একটা পা রাখল ওরিন, হাত দুটো মুক্ত রাখছে, চোখ প্রিন্স ময়নিহানের চোখের ওপর স্থির। প্রিন্সও লক্ষ করছে ওকে, দৃষ্টি সতর্ক, কৌতূহলী। ‘আমার সঙ্গে ওসব চালাকি চলবে না,’ বলল ওরিন। ‘প্যালেন্স একটা ভাঁড়, আস্ত ভাঁড়। কোনো সুবিধা করতে পাররে না সে। তুমি যে পসি পাঠিয়েছ, তাদেরও অনেকেই ফিরবে না।’ পসির উল্লেখে আড়ষ্ট হয়ে গেল ময়নিহানের চোখের পাতা। ‘থাক ওসব।’ যেন কিছুই হয়নি—এভাবে হাত নাচাল রাঞ্চার। ‘বস আরাম করে, গলা ভেজাও। ভালো জিনিস আছে। দ্যাখ, ওসমান, আমরা কেউই কচি খোকা নই। সবাই সাবালক। আপসে নিজেদের বিবাদ মেটাতে পারি। আমি কখনোই খুনখারাপি পছন্দ করি না।’ ‘মানে নিজের হাত নোংরা করতে চাও না, এটাই বলছ তো?’ যেখানে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল ওরিন। ‘কী ব্যাপার, প্রিন্স? ভয় পাচ্ছ? ভয় পাও নিজে খুন করতে?’ শক্ত হয়ে গেল ময়নিহানের চোয়াল, চোখ বড় বড়। ‘এটা তুমি ঠিক করলে না, ওসমান। আমাকে ভিতু বলাটা তোমার উচিত হয়নি।’ ‘তাহলে উঠে দাঁড়াও। আমি, বসে আছে এমন লোককে গুলি করতে চাই না।’ ‘আহ, মাথা ঠান্ডা কর, ওসমান। ড্রিংক নাও একটা। এস, আপসে রফা করি।’ ‘নিশ্চয়ই।’ ন্যাকা সাজল ওরিন। ‘তুমিও নাও একটা।’ আগে থেকেই ভরে রাখা গ্লাসটার দিকে হাত বাড়াল সে, কিন্তু ময়নিহানের দৃষ্টি ভাবলেশহীন। হাত বদল করল ওরিন, অন্য গ্লাসটা মুঠোয় নিল। আর ঠিক তখনি ছোবল দেওয়া সাপের মতো, ময়নিহান জাপটে ধরল ওর ডান হাতটা, সামনে হ্যাঁচকা টানে ভারসাম্য নষ্ট করে দিল। একই সময়ে, বাঁ-পাশে উঁচু করে বাঁধা হোলস্টারের দিকে বিজলিগতিতে ছুটে গেল ময়নিহানের হাত, সামনে ফেরানো বাঁট আঁকড়ে ধরে এক ঝাঁকিতে বের করে আনল পিস্তলটা। আর ওরিন ডান হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য চেষ্টা করার পরিবর্তে, আপসে শরীরটা ছেড়ে দিল সামনে, ময়নিহানের ওপর গিয়ে পড়ল। দুজনের ভার সইতে পারল না চেয়ারটা, উল্টে পড়ল পেছনে। উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করল ময়নিহান, কিন্তু ওরিন কাঁধে তুলে নিল তাকে, দেয়ালে আছড়ে ফেলে নিজেকে মুক্ত করল। পিস্তল উঁচু করল ময়নিহান। কিন্তু নিশানা করতে পারার আগেই ওরিনের বাঁ হাতের রদ্দায় নলটা সরে গেল এক পাশে। রাঞ্চারের কব্জি চেপে ধরল ওরিন, গান ব্যারেলের নিচে থেকে ডান হাতটা ওপরে ওঠাল আপার কাটের ভঙ্গিতে, হ্যাঁচকা টানে কেড়ে নিল পিস্তলটা। এবার লোকটাকে ধাক্কা মারল সে, পিস্তল ফেলে দিয়ে খোলা হাতে সজোরে একটা চড় কষাল ওর মুখে। তীক্ষ আওয়াজ হলো একটা, যেন চাবুক চালিয়েছে কেউ। সাদা হয়ে গেল ময়নিহানের মুখ, চোখে সর্ষের ফুল দেখতে শুরু করল সে। খ্যাপা ষাঁড়ের মতো ছুটে এল পিএম আউটফিটের মালিক, এলোপাতাড়ি ঘুসি ছুড়ছে। আস্তে করে এক পাশে সরে দাঁড়াল ওরিন, একটা হাঁটু উঠিয়ে প্রিন্সের তলপেটে আঘাত করল। তারপর পিস্টনের মতো কনুই চালাল মুখে, ধাক্কা মেরে ফেলে দিল মাটিতে। হাঁচড়-পাচড় করে উঠে দাঁড়াল ময়নিহান, নাক-মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। আচমকা সামনে ঝাঁপ দিল সে, তবে ওরিনকে লক্ষ্য করে নয়, টেবলের বিক্ষিপ্ত কাগজপত্রের ভেতর থেকে একটা বুলডগ .৪১ বের করে আনল। হাতটা ছুটে যাচ্ছে কাগজপত্রের দিকে, দেখল ওরিন, একটা .৪১ বেরিয়ে আসছে। ইতোমধ্যে তার পিস্তলও উঠে এসেছে হাতে। বদ্ধ ঘরে বোমা ফাটল যেন। সে-ই গুলি করল আগে, মাত্র চার ফুট দূরত্বে পরপর তিনটে। আড়ষ্ট হয়ে গেল প্রিন্স ময়নিহান, উঁচু হলো পায়ের পাতার ওপর, তারপর ডেস্কের ওপর পড়ে গেল উল্টে, ছড়ানো-ছিটানো কাগজপত্র আর ভাঙা কাচের মধ্যে মুখ গুঁজে নিশ্চল পড়ে থাকল। মাতালের মতো টলছে ওরিন। আবছা মনে পড়ছে ডেস্কটার ব্যাপারে কিছু একটা বলেছিল রৌভ। কিনার ধরে ডেস্কটার এক পাশে হ্যাঁচকা টান মারল সে, দেয়াল থেকে খসিয়ে আনল। হাতলযুক্ত ছোট্ট একটা প্যানেল বেরোল ওটার পেছনে, তালা দেওয়া। গুলি করে তালাটা ভাঙল সে, প্যানেলের ডালা খুলল টান মেরে। এক তোড়া নোট, স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি ছোট একটা থলে আর কিছু দলিলপত্র। এক নজরই যথেষ্ট হলো। এগুলোই সেই দলিল, যার কথা জনি বলেছিল। মোটা পার্চমেন্টে জমির আসল দলিল, সাথে কোলাসোর নকলটা। হঠাত্ বেশ কয়েকটি ঘোড়া ছুটে আসার আওয়াজ পেয়ে সচকিত হয়ে উঠল ওরিন। দলিলগুলো দ্রুত চালান করল শার্টের নিচে। থমকে গেল সে, তাকাল। শার্টটা রক্তে ভিজে গেছে। কাঁপা কাঁপা হাতে কাগজগুলো পকেটে ঢোকাল ওরিন। তারপর নিজের দিকে নজর ফেরাল। রৌভ ঠিকই গুলি লাগিয়েছিল। আশ্চর্য, একটুও টের পায়নি সে। স্রেফ একটা ঝাঁকুনি, আর সামান্য অসাড় বোধ করেছিল শুধু। এখন প্যালেন্স ফিরে আসছে। এপাশ-ওপাশ চোখ বুলিয়ে একটা কাটা শটগান দেখতে পেল সে, চট করে বন্দুকটা তুলে নিয়ে পা বাড়াল দরজার উদ্দেশে, মাতালের মতো টলছে। দরজা অবধি পৌঁছাতেও পারল না। ধাবমান ঘোড়ার খুরের আওয়াজই কেবল ঝমঝম করে ওর মাথার ভেতর, ধাবমান ঘোড়া এবং তারপর ক্ষীণ একটা গন্ধ। চেনা মনে হয় গন্ধটা; ওটা তাকে গৃহযুদ্ধের সময়ে তার একবার অস্থায়ী সামরিক হাসপাতালে শুয়ে থাকার স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। পিটপিট করে চোখ খুলল সে। প্রথমেই নজরে পড়ল কামরার দেয়ালে টাঙানো একটা ছবি—গম্ভীর মুখে ওর দিকে তাকিয়ে এক ভদ্রলোক, তাঁর নাকের নিচে এক জোড়া ঝাঁটা গোঁফ, চোখে চশমা। বুড়োর দৃষ্টি অসম্ভব অন্তর্ভেদী, যেন ওর অন্তস্তল অবধি দেখে নিচ্ছেন। ঘাড় ফেরাল সে। দেখল, মোনা কার্টিস লক্ষ করছে তাকে। ‘বাব্বা! ঘুম ভাঙল তাহলে! তুমি অলস হয়ে যাচ্ছ, ওরিন। সরি, মিস্টার ওসমান। রাঞ্চে তুমিই সবার আগে উঠতে।’ মেয়েটার দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকল সে। আগে কখনো এত সুন্দর মনে হয়নি ওকে। খারাপ লক্ষণ, মনে মনে নিজেকে বলল ওরিন। খারাপ, কেননা এবার তার সময় হয়েছে বিদায় নেওয়ার, ঘোড়ার পিঠে চড়ে। ‘আমি কদ্দিন হলো এখানে?’ ‘দেড় দিনের মতো? অনেক রক্ত হারিয়েছ।’ ‘রাঞ্চে কী হয়েছিল? কিথ পৌঁছেছিল সময়মতো?’ ‘হ্যাঁ। আমি রাঞ্চেই থেকে গেছিলাম। অন্যরা তখনই রওনা হয়ে যায়।’ ‘তুমি থেকে গিয়েছিলে মানে?’ ‘অন্যরা,’ মোনা বলল শান্তকণ্ঠে, ‘ট্রেইলের ভাটিতে মাইল দুয়েক দূরের একটা জায়গায় গিয়ে ওঁত পাতে। ওই দলে ছিল কেভিন পিটার্সন, জিম ডেভিডসন, আলভিতো ও কিথ; এবং নাটো, অবশ্যই। ওরা চলে যাওয়ার পর, আমি রাঞ্চের উঠানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এমন জায়গায়, যাতে প্যালেন্সরা দেখতে পায় আমাকে, মনে করে আমি একা। বুদ্ধিটা নাটোর, কিছু ইন্ডিয়ান রক্ত আছে তো! নিখুঁত হয়েছিল অ্যামবুশটা।’ ‘লড়াই জমেনি, তার মানে?’ ‘একদম না,’ ঝিকিয়ে উঠল মোনার সামনের পাটির দাঁতগুলো। ‘এত অবাক হয়েছিল ওরা, কিছু বুঝে ওঠার আগেই চমপট দিয়েছে। শুধু তিনজন পারেনি। আর চারজন মারাত্মক আহত হয়েছে।’ ‘প্যালেন্স, হার্ডি, ওরা? মার্শাল?’ ‘শহরে ফেরার সাহস হয়নি, পাছে লিঞ্চ মবের পাল্লায় পড়ে। দুজনই পালিয়েছে। মার্শাল শহরেই আছেন। তোমার অবস্থা একটু ভালো হলেই দেখা করতে আসবেন। উনি বুঝতে পেরেছেন সবকিছু। এখন আর কোনো জটিলতা নেই।’ ‘কাগজগুলো পেয়েছ?’ দলিলগুলোর কথা হঠাত্ মনে পড়ায় সচকিত সে জিজ্ঞেস করল। ‘ময়নিহান পাঁচ হাজার ডলার পাঠিয়েছিল এল পাসোয়, সেটার রসিদও ছিল? সব নোটে চিহ্ন দিয়ে রেখেছিল।’ ‘হ্যাঁ,’ সংক্ষেপে বলল মোনা। ‘পেয়েছি। ওর মতলব ছিল টনিকে চুরির দায়ে ফাঁসিয়ে দেওয়া। আর যদি সেটা ব্যর্থ হয়, তাহলে পেছনে লোক লাগিয়ে মেরে ফেলা। কিন্তু মাঝখানে তুমি এসে পড়ায় সব ভন্ডুল হয়ে যায়।’ ‘তাই?’ নিজের হাত দুটো পযর্বেক্ষণ করে ওরিন। ভীষণ ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে ওগুলো। ‘ময়নিহানের হিসেবের মধ্যে আমি ছিলাম না।’ অবসান হয়েছে সবকিছুর। রাঞ্চের মালিকানা পেয়েছে মেয়েটা; এখন সে স্বাধীন, কেউ আর ঘাঁটাবে না। শুধু একটা কাজ বাকি রয়েছে এখনো। কথাটা তার জানাতে হবে ওকে। বলতে হবে, সে-ই ওর স্বামীর হত্যাকারী। বালিশে পাশ ফিরল ওরিন। ‘আরেকটা কথা,’ শুরু করল সে, ‘আমি…’ ‘এখন না। এখন তোমার বিশ্রাম দরকার।’ ‘দাঁড়াও। তোমাকে এটা বলতে হবে আমার। এটা… এটা টনির সমপর্কে।’ ‘মানে এটাই তো… যে তুমিই হচ্ছ সেই লোক, যে…?’ ‘হ্যাঁ, আমিই…’ খানিক ইতস্তত করে স্বীকার করল ওরিন। ‘আমি জানি। প্রথম দিন থেকেই জানি, ওরিন। একদম শুরু থেকেই, তুমি না বললেও।’ ‘ঘোরের মধ্যে প্রলাপ বকেছি?’ ‘সামান্য। তবে এটা তারও আগের কথা। ওই যে তুমি যখন বললে পিস্তল বের করার সময় কেমন দেখাচ্ছিল ওর চোখ, তখনই জানি। কার পক্ষে জানা সম্ভব এটা, যে তাকে গুলি করেছে সে ছাড়া?’ ‘বুঝেছি,’ ম্লান শোনাল ওরিনের গলা, মুখ খড়িমাটি। ‘তাহলে আমি বরং একটু আরাম করি। আবার রাস্তায় নামতে হবে।’ ওর পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল মোনা, এবার বসে পড়ল মাথার কাছে। ‘রাস্তায় নামতে হবে? তোমাকে কি যেতেই হবে, ওরিন? কাল রাতে তুমি যেসব কথা বলেছ, আমি ভেবেছিলাম… ভেবেছিলাম’ মোনার চেহারায় লজ্জা, ‘হয়তো তুমি আর পথে নামতে চাও না। আমাদের কাছেই থেকে যাও, ওরিন। আমরা খুশি হব তুমি থাকলে। আর তা ছাড়া, জুনিয়রও জিজ্ঞেস করছিল তোমার কথা। জিজ্ঞেস করছিল ওর সপার কোথায়।’ একটু সময় নীরব রইল ঢ্যাঙ্গা লোকটা, ভাবল কী যেন, তারপর ধীরে ধীরে বলল: ‘হ্যাঁ, আমার বোধ হয় থেকে যাওয়াই উচিত হবে। এক জোড়া সপারের ব্যবস্থা করতে হবে ওর জন্যে। ছোটদের কথা দিলে সেটা রাখতে হয়।’ ‘তাহলে থাকছ তুমি? যাচ্ছ না কোথাও?’ ওরিন পলকহীন তাকাল মেয়েটির দিকে। ‘থাকছি,’ বলল মৃদুকণ্ঠে। ‘যত দিন না তুমি তাড়িয়ে দিচ্ছ।’ স্বর্গীয় হাসিতে উদ্ভাসিত হলো মোনার চেহারা, ওরিনের চুলে সে হাত বোলাল। ‘তাহলে তুমি অনেক দিন এখানে থাকছ, ওরিন ওসমান, অনেক… অনেক দিন।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ তাহলে থাকছ তুমি. যাচ্ছ না কোথাও

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now