বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সওদা
---------------------
গোধূলি বিশ্বাস সীজন
**
“Mirror Mirror on the wall,
Who is the fairest of them all?”
শুনতে পেল আরশী। পাশের বাসার পিচ্চি মেয়েটা টিভিরুমে এসেছে। বসে “Snow White” দেখছে সে। আরশী খাতা দেখছে। স্কুলে জয়েন করেছে দু’তিন বছর। শিশুদের সংসর্গই ভালো লাগে ওর। টার্ম ড্রয়িং পরীক্ষার বিষয় ছিল “সুন্দর দিন”। এক এক জন এক একরকম ছবি একেছে। একজন এঁকেছে খোলামাঠে ঘুড়ি উড়াচ্ছে একটি ছেলে। আরেকজন এঁকেছে চকোলেটের ডিব্বা, চকলেটের নামও লিখেছে ‘Dairy Milk’, ‘Park’, ‘Sneakers’। দেখে হাসি পেল আরশীর। কিছুক্ষণবাদে সেই পিচ্চি মেয়েটা এল। ওর নাম ক্যান্ডি। ক্যান্ডির বয়স তিন। ক্যান্ডি এসে বসল আরশীর পাশে। আরশী ক্যান্ডির গাল টিপে দিল। ক্যান্ডি বলল, “আন্টি, তুমি Snow White দেখেছো?”
“হুম দেখেছি”
“Snow White আসলেই সবচেয়ে সুন্দরী?”
“হুম”
“আন্টি, কে বেশি সুন্দর Snow White না Repunzel?”
“উম, দুজনেই সুন্দর”
“কে বেশি সুন্দর?”
“ক্যান্ডি সবচেয়ে সুন্দর”বলে ক্যান্ডির গাল টিপে দিল।
ক্যান্ডি খিলখিল করে হাসল। বলল, “কিন্তু আমি তো বরফের মত সাদা না, আমি তো কালো”
“তাতে কি হয়েছে? You’re the fairest of them all”
ক্যান্ডি আবারো খিলখিল করে হাসল। বলল, “আন্টি, তুমিও খুব সুন্দর”
“তাই?”
“হুম”
আরশী ব্যাগ থেকে কিছু ক্যান্ডি বের করে ক্যান্ডিকে দিয়ে বলল, “ক্যান্ডিস ফর ক্যান্ডি ফ্রম ‘ক্যান্ডিআন্টি’”। ক্যান্ডি আরশীর গালে জিহ্বা দিয়ে চাঁটা দিল। ক্যান্ডিকে যখনই বলা হয় “আন্টিকে চুমু দাও” বা “ওকে চুমু দাও”, সে চাঁটা দেয়।
আরশীর ফোন বেজে উঠলো। লাবণী ওপাশ থেকে বলল, “হ্যালো, আরশী, কেমন আছিস?”
“ভালো”
“এতদিন পর আমাকে মনে পড়ল। শেষ কবে ফোন দিয়েছিস মনে আছে?”
“তুইও তো ফোন দিস নি”
“আসলে কাউকেই ওভাবে ফোন দেওয়া হয় না। কিন্তু কোন কারণ ছাড়া তো ফোন দিস নি, তাই না?”
“হুম। আমার বিয়ে। সামনের সপ্তাহ”
“Congratulations. কার্ড দিবি না? শুধু ফোনেই দাওয়াত?”
“দিব, দিব। তুই কখন বাসায় থাকিস আর কখন স্কুলে থাকিস তাতো জানি না”
“হয়েছে। দুলাভাই কি করেন?”
“বিজনেস। পারিবারিক বিজনেস”
“ওয়াও। শেষমেষ ইঞ্জিনিয়ার লাবণী বিয়ে করছে বিজনেসম্যানকে”
“হুম। তুই কবে ফ্রি আছিস?”
“শুক্রবার তো সারাদিন বাসাতেই থাকি”
লাবণীর বিয়ে আজ। আরশীকে লাবণী প্রায়ই বলত, ওর কপালে বিয়ে নেই। সেই লাবণীর বিয়ে হচ্ছে, যদিও একটু দেরীতে, কিন্তু আরসী এখনো অবিবাহিত। আরশীর জন্মের পর নানী নাম রেখেছিলেন “পরী”। নানীর মৃত্যুর পর নানীর সাথে পরীও হারিয়ে যায়। আরশীর মাকে সবাই বলতো, “ভাবী, আপনার মেয়েকে তুলে না নিয়ে যায়, চাঁদের মত সুন্দর মেয়ে আপনার”
আরশী যখন ক্লাস সিক্সে ওর স্কুলের সামনে ছেলেরা দাঁড়িয়ে থাকতো। আরশী যখন ক্লাস এইটে ওর প্রাইভেট টিউটর বাসায় ওর জন্য বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। এরপর থেকে অহরহ বিয়ের প্রস্তাব আসতেই থাকতো। আরশী মাঝে মাঝেই ভাবে, সেই প্রাইভেট টিউটরকে বিয়ে করলেই পারতো। লোকটা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাথমেটিক্সে পড়ত, এখন একটা নামীদামী বেসরকারী কলেজের লেকচারার। লাবণীকে যে ঈর্ষা করবে সেই উপায়ও নাই, লাবণীর বর একজন মধ্যবয়সী বিপত্নীক লোক। তার আগের ঘরে দুই ছেলে আছে। লাবণী বসে আছে স্টেজে তার বরের পাশে। গাঢ় লাল রঙের শাড়িতে সুন্দর লাগছে লাবণীকে। আরশী মেহমানদের জন্য রাখা সিটে গিয়ে বসল। এমন সময় লাবণীর মামার কল ভেসে উঠল মোবাইলের স্ক্রিনে। মামা বললেন, “আরশী একটু নিচে নামতে পারবা?”
“হ্যা, মামা”
“লাবণীর বরের কাজিন একটা কালোগাড়িতে বসে আছে। ওকে একটু নিয়ে আসবে?”
“আচ্ছা, মামা”
“ওর নাম মঞ্জুরুল হক ইকো”
আরশী নিচে নামল। দেখল, অনেকগুলো কালো গাড়ি পার্ক করা। কোনটায় আছে কে জানে। লোকটাতো দেখতে পারবে আরশীকে কালোকাচের মধ্য দিয়ে। লোকটাই ডাকবে ওকে। কিন্তু সাড়া নেই। কোনটার ড্রাইভিং সিটে কেউ বসে নেই। আরশী ভাবল, চলে গেছে নাকি। গাড়িগুলোর কাছে গিয়ে পেছনের সিটগুলোতে দেখার জন্য দু’হাত কপালের উপর রেখে উঁকি দিতে লাগলো। খুঁজতে খুঁজতে দেখল কালো মার্সিডিজ বেঞ্জের পেছনের সিটে প্রচণ্ড শীর্ণ একজন কোটপ্যান্ট সানগ্লাস পড়ে বসে আছে। আরশী অবাক হল, রাতের বেলা সানগ্লাস! নক করল কাচের গ্লাসে। লোকটা গ্লাস নামাল। আরশী বলল, “আপনি মঞ্জুরুল হক ইকো?”
“জ্বি”
“আপনাকে নিতে এসেছি”
ইকোসাহেব হাসি দিলেন, গাড়ির দরজা খুললেন। প্রথমে যেটি বের করলেন, সেটা হল সাদাছড়ি। আরশী বুঝল, কেন মামা তাকে পাঠিয়েছেন। গাড়ি থেকে নেমেই নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল। আরশী হাত ধরল। ইকোসাহেব বলল, “আপনার নাম কি?”
“আরশী”
“আরশী মানে কি?”
“আয়না। ইকো মানে তো প্রতিধ্বনি?”
“হুম”
“Meaning বুঝেই রাখা হয়েছিল নাকি?”
“না”
“তাহলে?”
“এমনিই রাখা হয়েছিল মনে হয়। তবে ব্যাটম্যান আমার খুব পছন্দের কার্টুন ছিল। বাদুর কিভাবে ইকোর মাধ্যমে জীবনযাপন করে, তার প্রতি আমার ব্যাপক আগ্রহ ছিল”
“ব্যাটম্যানের সাথে ইকোর কোন সম্পর্ক নেই। ইকোকে যে সুপারহিরো ব্যবহার করে সে তো ডেয়ারডেভিল”
ইকোসাহেব হেসে দিল। বলল, “ভালো বলেছেন”
আরশী বলল, “সামনে সিঁড়ি এখন”
ইকোসাহেবকে নিয়ে মেহমানদের বসার জায়গাতে বসালেন। লাবণীর মামা দূর থেকে আসলেন। ইকোসাহেবের সাথে কথাবার্তা সেরে আরশীর কানে বললেন, “ওর সাথে একটু থেকো। বোঝোই তো, মা”
“আচ্ছা, মামা”
ইকোসাহেবের পাশের সিটটাতে বসল আরশী। ইকোসাহেব বলল, “আমার জন্য এখানে আটকে গেলেন? তা আপনি কোন পক্ষ?”
“কনের বান্ধবী”
“বান্ধবীর বিয়েতে এসে আনন্দ করতে পারছেন না আমার জন্য”
“আপনার জন্য না আটকালেও এক কোণায় এসে বসে থাকতাম”
“আপনাকে একটা কথা বলতে চাই”
“বলুন”
“আপনি অনেক সুন্দর”
শুনে অবাক হল আরশী। জিজ্ঞেস করল, “আপনি সিওর?”
মুচকি হেসে ইকোসাহেব বলল, “আপনার হাত ধরে মনে হল”
“মনে হচ্ছে, অনেক মেয়ের হাত ধরেছেন জীবনে”
“উম, অনেক না হলেও নিতান্ত কম না। ব্লাইন্ড হয়ে যাওয়ার সুবাদে ধরেছি হাত। যদিও সে হাত ধরতাম ছেড়ে দেওয়ার জন্যই”
চুপ হয়ে গেল আরশী। কিছুক্ষণ নীরবতায় কাটল। নীরবতা ভেঙ্গে ইকোসাহেবই বলল, “আসলে কি জানেন, Blinds are true beauty-seekers? ব্লাইন্ড হওয়ার আগে অনেক সৌন্দর্য সম্পর্কে কোন আইডিয়া ছিল না। ভোরের গন্ধ, ঘাসে পড়ে থাকা শিশিরফোঁটার স্পর্শ, রোদের স্পর্শ, বৃষ্টির স্পর্শ, বৃষ্টি পড়ার শব্দ অদ্ভুত সুন্দর। আর আপনিও সুন্দর। অনেক সুন্দর আপনি”
“অ-নেকদিন পর কেউ আমাকে সুন্দর বলল। থ্যাঙ্ক ইউ”
“আগে কখনো কেউ বলেনি?”
“অনেক আগে বলতো, আমি নাকি ডানাকাটা পরী, রূপকথার রাজকন্যা, সৌন্দর্যের দেবী, বেহেশ্তের হুর, জাদুকরী, আরো কত কি! এখন আর কেউ বলে না”
“হয়ত আপনার প্রিয়জনের ভয়ে”
“সবার প্রিয়জন থাকে না। বাদ দিন। আপনি বরের চাচাত, ফুফাত না খালাত ভাই?”
“ফুফাত ভাই এবং প্রাক্তন শ্যালক”
“বরের আগের ওয়াইফ আপনার আপু ছিলেন?”
“হুম”
“কিভাবে... হল? আই মিন-”
“কার এক্সিডেন্ট”
আবার কিছুক্ষণ নীরবতা। ইকোসাহেব বলতে লাগলো, “লাভ-ম্যারেজ ছিল। সব কিছুই পারফেক্ট ছিল, কোন ইম্পারফেকশন ছিল না। এক্সিডেন্টটাই সব ওলটপালট করে দিল। আপনার কথা বলুন। বিয়ে করেছেন?”
“না। আপনি?”
“অন্ধর আবার বিয়ে”
“আগে তো অন্ধ ছিলেন না”
“হুম। ছিলাম না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ঐ সময়টাতে বিয়ে হয় নি। কি করবো বলুন? তা আপনি কি করেন?”
“ড্রয়িং টিচার। চারুকলাতে পড়াশুনা করেছি। আপনি?”
“এখন কিছুই করি না অনেকদিন হল। ব্রেইল শেখার চেষ্টা করছি। ফটোগ্রাফী করতাম। বিয়ে, গায়ে হলুদ, আকদ, এঙ্গেজমেন্ট কভার করতাম”
“ও। আপনি জেরিন মির্জার নাম শুনেছেন? ওনার ‘বিভাবরী বাতায়ন’ ও ‘রঙিন বাতি’ বইদুটোর প্রচ্ছদ আমার। দুঃখের বিষয় কি জানেন? ব্রেইলে ছবি না ফটো প্রকাশ করা যায় না”
“মানুষের জীবনে কখন কি হয় ঠিক নেই”
“কিছু মনে করবেন না, লাবণীর মত মেয়ের ভাগ্যে এমন হবে ভাবিনি”
“মানে?”
“যথেষ্ট যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিয়ে হচ্ছে দুসন্তানের পিতা বিপত্নীক মধ্যবয়সী একজন লোকের সাথে। কখনো ভেবেছিলাম কি? ও ওর রঙ নিয়ে শঙ্কায় থাকতো। শঙ্কাই আজ পরিণতি। কতোবার রিজেক্ট হয়েছে ঠিক নেই। গিফট দেয়ার মত সামর্থ্যও নেই ওর পরিবারের। তাই শেষমেশ-”
“বিয়ে তো হয়েছে। দুলাভাই অনেক ভালো মানুষ”
“একজন ৩২বয়সী মেয়ের বিয়ে হচ্ছে একজন ৪৮বয়সী বিপত্নীকের সাথে। আর আপনি বলছেন, বিয়ে তো হয়েছে! বাহ! শিক্ষা, যোগ্যতা, স্বভাব, চরিত্র থেকে রঙ গুরুত্বপূর্ণ আমাদের সমাজে!” ইকোসাহেব মাথা নিচু করল। কিছুক্ষণ পর বলল, “আমি যদি ব্লাইন্ড না হতাম, ঐ সমাজেরই অংশ হতাম সত্যি বলতে। চোখই মানুষকে অন্ধ করে অনেক সময়। পুরুষের কল্পনার জগতে মাদাম কুরীর জায়গা নেই, জগতটা ক্লিওপেট্রা-হেলেনদের দখলে”
“আপনি খেতে বসবেন না? তিন বৈঠক হয়ে গেছে”
“নিয়ে চলুন আমাকে” বলে হাত এগিয়ে দিল ইকোসাহেব। আরশী হাত ধরল। বলল, “আপনি কাদের সাথে বসবেন?”
“আব্বু-আম্মু কেউ আসেনি। এক জায়গায় বসলেই হল। এমনিও রুচি নেই মুখে। তাও কেউ একজন মরিচ দেখিয়ে দিলেই চলবে”
আরশী পাশে বসল। কিছুক্ষণ যেতেই লক্ষ করল, ইকোসাহেব জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে আর ‘আহ’ করছে। আরশী পানির গ্লাসটা হাতের কাছে এগিয়ে দিল। মিনিটের মধ্যেই ইকোসাহেবের ফর্সা গালদুটো লাল হয়ে গেল, ঠোঁটটাও লাল হয়ে গেল। আরশীর হাসি পেল। জরদা থেকে মিষ্টি তুলে নিয়ে বলল, “হা করুন”।
ইকোসাহেব হা করতেই জরদার মিষ্টি গোটাদশেক পুরে দিল মুখে। আরশী বলল, “ঝাল সহ্য করতে পারেন না বুঝি?”
“না”
আরশী লক্ষ করল, গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। ইকোসাহেব বলল, “ দু’হাতই এঁটো করে ফেলেছি। গাল একটু মুছে দেবেন?”
আরশী চশমা নামিয়ে রাখল টেবিলে। চোখের দিকে তাকিয়ে দেখল, দুচোখেই মণির কিছুটা অংশের রঙ ভীষণ অদ্ভুত। টিস্যুপেপার দিয়ে গাল মুছে দিল আরশী।
খাওয়াশেষে আরশী বলল, “চলুন, আপনাকে গাড়িতে রেখে আসি”
“না। আমি আরো কিছুক্ষণ থাকবো। আপনার দেরী হয়ে গেলে মামাকে একটু ফোন দিয়ে জানান প্লীজ”
“না না। দেরী হচ্ছে না। ঠিক আছে”
ইকোসাহেবের ঠোঁটের কোণায় মৃদু হাসি খেলে গেল। আবার মেহমানদের সিটে গিয়ে বসল দু’জন। ইকোসাহেব বলল, “একটা প্রশ্ন করতে পারি?”
“জ্বি বলুন”
“যাদের কাছে আপনি রূপকথার রাজকন্যা ছিলেন, ডানাকাটা পরী ছিলেন, তারা কোথায়?”
“প্রত্যেকেই আছে নিজের জীবন নিয়ে। একজন তো রোজ আমাকে দেখবার জন্য গাজীপুর থেকে আসতো বেলীফুলের মালা নিয়ে আমার খোঁপায় বাঁধবে বলে। একজন রোজ দাঁড়িয়ে থাকতো আমার বারান্দার সামনে, আমি কখন কাপড় রোদে মেলতে যাবো সেই অপেক্ষায়। একজন বলেছিল, পুরো পৃথিবীও যদি আমার বিপরীতে থাকে, সে আমার পাশে থাকবে। সবচেয়ে ধোঁকাবাজ ও স্বার্থপর হল মানুষ। আমি একজন ক’জনের মন রক্ষা করবো? যারা আমাকে কখনো না ভুলে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিল, তারাই ভুলল সবার আগে। আসলে ভালবাসা বলে কিছু নেই। সবই হল ‘বিজনেস’, সওদা। সুন্দরী মেয়ের পরিবার সৌন্দর্যের সাথে অর্থের সওদা করে কোটিপতির সাথে বিয়ে দেয়। বিয়ে হল সওদা”
“যদি কখনো বিয়ের সুযোগ আসে ভালো কাউকে, তখনো করবেন না নাকি?”
“সুযোগ আসবে না জানি”
“কেন?”
“আমরা কি টপিকটা বদলাতে পারি না?”
“কি নিয়ে কথা বলা যায় তাহলে? উম, আপনার পছন্দের হিন্দি সিরিয়াল বা মুভির কথা বলুন”
“আপনার মাথায় আর কিছু এল না! এল হিন্দি সিরিয়াল! সিরিয়ালগুলোতে কি দেখায়? মূর্খ মেয়ে সহজ সরল এবং নায়িকা। আর শিক্ষিত মেয়েরা ভিলেনী আর সব কূটচাল চালে। আরো দেখায় পাগল বা অটিস্টিক ছেলের সাথে নায়িকার বিয়ে, নায়িকার ভালবাসায় সে সুস্থ হয়। এধরনের সিরিয়াল মানুষকে উস্কানি দেয় নিজের বদ্ধপাগল ছেলের সাথে সুস্থ মেয়ের বিয়ে দিতে না জানিয়ে। পাগলকে সুস্থ করতে সাইক্রিয়াট্রিস্ট দরকার, বউ না। নয়ত দেখাবে গরীব ঘরের ভালো ছেলের সাথে নায়িকার বিয়ে। কখনো দেখলাম না, পাগলী নায়িকার সাথে সুস্থ নায়কের বিয়ে। আর পাগলী থাকলেও সেটা হবে নায়কের আগের বউ। নায়কের হাজারটা অবৈধ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও সে ভালো...”
“I think, this topic should be changed. একটু পরে বলবেন, অন্ধ ছেলের সাথে সুস্থ স্বাভাবিক মেয়ের বিয়ে”
আরশী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “অন্ধ মেয়েকে কি আপনি বিয়ে করতেন যখন আপনি সুস্থ ছিলেন? ছেলেদের ব্যাপারে মানবিকতার সীমা নেই সমাজে। কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে...”
“খুব বিদ্বেষ সমাজের বিরুদ্ধে আপনার”
সেলফোন বেজে উঠল ইকোসাহেবের। কথাশেষে ফোন কেটে বলল, “আগে স্মারটফোন ব্যবহার করতাম, এখন বাটনওয়ালা। হুহ...উঠবো এখন”
“চলুন”বলে আরশী হাত ধরল। গাড়িতে উঠে বসার পর ইকোসাহেব বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ। আরেকটা কথা”
“কি?”
“আপনি ভীষণ সুন্দর”
“ভালো থাকবেন”
মাসখানেক বাদে লাবণীর বাসায় ঘুরতে গেল আরশী। লাবণী ওকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে বলল, “কিছুক্ষণ থাক। আসছি”
আরশী অপেক্ষা করতে লাগল। পাশের রুম থেকে সাদাছড়ি হাতে শীর্ণকায় ফর্সা সানগ্লাস চোখে লোকটি ঢুকল। বলল, “মিস আরশী, কেমন আছেন?”
“ভালো। আপনি?”
“ভালো” বলে হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে আরশীর বিপরীতে সোফায় বসল। বসে বলল, “সেদিন আমাকে কম্পেনি দিয়েছিলেন। আজ আমি দেব”। মুচকি হাসল ইকোসাহেব।
আরশী বলল, “মনে হচ্ছে, আগের থেকে শুকিয়ে গেছেন”
“হয়ত আরো শুকিয়ে যাবো। খুব বেশি আগ্লি হয়ে গেছি নাকি?”
সাথে সাথে আরশী বলল, “ না না, এখনো অনেক হ্যান্ডসাম আছেন”
“বাঁচা গেল। তাহলে তো আমাদের নিয়ে মুভি হতে পারে ‘Blind & The Beauty’, কি বলেন?”
আরশী কি উত্তর দিবে বুঝল না। ইকোসাহেবই আবার বলল, “আমার সাথে সওদা করবেন?”
“সওদা!”
“হুম”
“কিসের সওদা?”
“আমার মা-বাবার আমিই এখন একমাত্র সন্তান। টাকা-পয়সা অনেক আছে। কিন্তু ভোগ করার কেউ নেই”
“আপনি?”
সানগ্লাসটা নামিয়ে রাখল ইকোসাহেব। বলল, “Uveal Melanoma. চোখের খুব রেয়ার ধরনের ক্যান্সার। চোখ থেকে অনেক জায়গাতেই ছড়িয়ে গেছে। ৬মাস কি ১ বছর। জানি না, কবে বাজবে মৃত্যুঘন্টি। বিয়ে করবেন? বংশের প্রদীপ না পেলেও ফেমিলিকে দেখার জন্য কাউকে চাই”
“আমাকে বলছেন কেন? পেপারে বিজ্ঞাপন দিন”
“কারণ আপনাকে আমার ভালো লেগেছে”
“আপনি হয়ত জানেন না-”
“জানি” বলে উঠে দাঁড়াল ইকোসাহেব। হাতড়ে হাতড়ে আরশীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আলতো করে হাত স্পর্শ করল আরশীর মুখে। মুখের ডানপাশ থেকে গলার দিকে হাত স্পর্শ করে বলল, “আমি জানি... কতদিন আর মন বন্দী থাকবে কাঁচের কারাগারে?”
“কবে জানলেন যে আমি এসিড ভিক্টিম?”
“সেদিনই”
“কিভাব?”
“Blinds have sharp ears”
“সেজন্যই খোঁচা মেরে বলেছিলেন, ‘আপনি অনেক সুন্দর’?”
“উহু। আপনাকে ভালো লেগেছিল, তাই বলেছিলাম। তখনো জানতাম না। কিছুক্ষণ পর শুনেছি”
“ও। সিম্প্যাথি অনুভব করছেন?”
“কেন? আপনি কি আমার জন্য সিম্প্যাথি অনুভব করছেন?”
“হুম, করছি”
“তাহলে, সিম্প্যাথির সওদা হোক, কি বলেন? যতদিন বেঁচে আছি, দুজন দুজনের জন্য সিম্প্যাথি ফিল করব, দুজন দুজনের সব ইচ্ছে পূরণ করবো। পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চড়ে আসতে না পারলেও, ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে আসতে পারব”
হেসে দিল আরশী। হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে আরশীর চিবুক তুলে ইকোসাহেব বলল, “বালিকা, করবে আমার সাথে ভালবাসার সওদা?”
-----------------------------------------------------------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now