বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শুক্রবার। স্কুল ছুটি। তবু সুব্রত একা একা স্কুলে এলো, সকালবেলা। কী যেন এক রহস্যের সন্ধানে। মাঠের দক্ষিণ পাশে পুরনো আমগাছের নিচে দাঁড়াল সে। স্কুলের দারোয়ান ভোলানাথ তাকে একা দেখে বুঝতে পারল ও কী জন্য এসেছে। ভোলানাথকে দেখামাত্র সুব্রত ডাক দেয়, 'কাকা, আমি এসেছি।'
ভোলানাথ এগিয়ে এলো। সুব্রতকে বলল, 'কেমন আছ?'
'ভালো না কাকা। আপনি কী যেন গোপন কথা বলতে চেয়েছিলেন। বলেছিলেন একা আসতে। কী এমন কথা। কথাটা না শোনা পর্যন্ত পড়াশোনায় মনোযোগ বসাতে পারছি না। মনের ভেতর ধুক ধুক করছে।'
সুব্রতর বুকের মধ্যে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উথাল-পাতাল করছে রহস্যটা জানার জন্য।
'এসেছ ভালো করেছ। আজ অমাবস্যা বলা যাবে।'
'কী কথা তাড়াতাড়ি বলেন, আর ধৈর্য ধরতে পারছি না।'
'বলছি তাহলে শোনো, ভয় পাবে না তো!'
'না কাকা, ভয় পাব না, বলেন।'
'ভূতের গল্প পড়তে খুব মজা পাও। এই বয়সে তুমি অনেক ভূতের গল্প পড়েছ। কিন্তু আজ পর্যন্ত ভূতের দেখা পাওনি। সেদিন যে আমাকে বলেছিলে। সেই জন্য তোমাকে আমি ভূত দেখানোর ব্যবস্থা করব। যদি তোমাকে ভূত দেখাই, তাহলে খুশি হবে তো।'
'কী যে বলেন, ভূত দেখা যে আমার কত দিনের ইচ্ছে। আমার মনে হয় ভূতের নাক কুলোর মতো চ্যাপটা। দাঁতগুলো মুলোর মতো লম্বা। আচ্ছা, ওরা কোথায় থাকে? কী খেয়ে বাঁচে? আমার জানতে খুব ইচ্ছে করে। ভূতের সাথে কি সত্যি সত্যি দেখা হবে কাকা?'
'অবশ্যই, তুমি কি জানো, এই স্কুলের পেছনে গাবগাছ আর আমগাছে ভূত থাকে!'
ভূমিকম্পে যেমন ঘরবাড়ি মাটি কেঁপে ওঠে ঠিক তেমনি স্কুলের গাছে ভূতের কথা শুনে সুব্রতর শরীর কেঁপে উঠল। ও ধীরে ধীরে বলল, 'জানি না তো কাকা!'
'আমি স্কুল পাহারা দিই, আমি জানি। শনিবার, মঙ্গলবার ভূতেরা আড্ডা দেয়।'
'তাই কাকা! আমি ভূত দেখতে পারব কীভাবে?'
'তুমি তো রাতে আমার সাথে স্কুলে থাকতে পারবে না। কারণ তোমার বাবা-মা আসতে দেবে না। ভূতের কথা শুনলে আরো আসতে দেবে না। তোমাকে কি করে যে ভূত দেখাই।'
'আপনার কাছে আসার ব্যবস্থা আমি করব কাকা।'
'কিন্তু সমস্যা আছে। ভূতদের থেকে অনুমতি নিতে হবে। তোমার সাথে তারা দেখা করবে কিনা। কারণ তুমি ছোট মানুষ।'
'ভূতের সাথে দেখা করতে অনুমতি নিতে হয়? ছোট ছেলেমেয়েদের সাথে দেখা করে না ওরা?'
'অনুমতি নিতে হয়। এখন পর্যন্ত ওরা ছোটদের সাথে দেখা করে নাই। ভূূতেরা রাতে আমাকে অনেক কিছু দেয়। যদি অনিয়ম হয়, তাহলে আমার ঘাড় মটকে মেরে ফেলবে! আমি যে ভূত দেখি, তা ভূত ছাড়া আর কেউ জানে না। আজ তুমিই জানলে।'
'কাকা, ভূতগুলোকে আমার কথা বলবেন। আমি তাদের গল্প পড়ি আর লেখি। কিন্তু আজো ভূতের সাথে দেখা হয় নাই। তাদের দেখতে খুব ইচ্ছে করে। ভূতের সাথে ছবি ওঠানোর বড় শখ আমার। বন্ধুদের দেখাব, ভূতের দেখা পেলে যে আরো কত কি করব। ইস্ কবে দেখব ভূত।'
'তোমার সব ইচ্ছের কথা খুলে বলব। অনুমতি নিয়ে অবশ্যই তোমাকে জানাব। আজ তুমি চলে যাও।'
সুব্রত বাসায় চলে গেল।
পরের দিন। সুব্রত এসে ভোলানাথ কাকাকে চুপে চুপে বলল, 'গত রাতে কি ভূতের সাথে কথা হয়েছে?'
'ভোলানাথ ধীরে ধীরে বলল, 'এখন স্কুুলের সময়। কথাটা বলতে গেলে যদি কেউ টের পেয়ে যায়, তাহলে মহাবিপদ হতে পারে। স্কুল ছুটির পর তোমাকে বলব, তুমি আমগাছের নিচে থেকো।'
'আচ্ছা কাকা, থাকব।'
সুব্রত আর ভোলানাথের আসাটা দূর থেকে লক্ষ্য করছে রণক। ক্লাসরুমের বেঞ্চে বসে সুব্রতকে রণক জিজ্ঞেস করল, 'কী রে সুব্রত, ভোলানাথ কাকার সাথে চুপে চুপে কি আলাপ করছিলি? রাতে কি স্কুল থেকে ডাব চুরি করতে আসবি? সে জন্য ভোলানাথ কাকাকে হাত করলি বুঝি?'
'না রে, তুই যে কি বলিস, আমাদের গাছে অনেক ডাব আছে। আর ডাব চুরি করতে আসলে কি একা আসা যাবে? তোকেও সঙ্গে করে নিয়ে আসতে হবে।'
'সুব্রত বলল, 'কাউকে বলবি না তো?'
'না, বলব না। তুই কথাটা বলেই দেখ না।'
'তাহলে শোন, ভোলানাথ কাকার ছেলের জন্য আমার পুরাতন কিছু শার্ট, প্যান্ট, গেঞ্জি কাকাকে দেব। সেই কথাটাই বলছিলাম, বুঝেছিস। তুই কি দিবি তোর পুরাতন শার্ট, প্যান্ট, গেঞ্জি?'
কথাটা সত্য মনে করে রণক বলল, 'ও, এই কথা?'
'হ্যাঁ, কাউকে আবার বলিস না।'
দুজন আবার ক্লাসরুমে চলে এলো।
স্কুল ছুটি। সবাই বাড়ির দিকে রওনা হলো। কিন্তু সুব্রত আমগাছতলায় দাঁড়াল। রণক দূর থেকে তাকে লক্ষ্য করছে।
ভোলানাথ কাকার সাথে সুব্রত কথা বলছে।
সুব্রত বলল, 'কাকা, ভূতের সাথে কী আমার বিষয়ে কথা হয়েছে?'
ভোলানাথ বলল, 'কথা হয়েছে, তবে কিছু শর্ত দিয়েছে।'
'কী শর্ত?'
'তুমি যে ভূতের গল্প পড়েছ, তার প্রমাণের জন্য বইগুলো নিয়ে আসতে হবে। ভূতেরা বইগুলো দেখবে। ভূতেরা জানে না যে তাদের নিয়ে গল্প, উপন্যাস, ছড়া ও কবিতা লেখা হয়। তা সত্যি কিনা, তাই দেখতে চেয়েছে তারা।'
'অবশ্যই নিয়ে আসব। বলেন কবে, কখন, কোথায় নিয়ে আসতে হবে।'
'তুমি আগামীকাল বৃহসপতিবার সন্ধ্যায় বইগুলো স্কুলে নিয়ে আসবে।'
সুব্রত ভূত দেখার আনন্দ নিয়ে বাড়ি চলে গেল।
পরদিন স্কুলে এসে ভোলানাথ কাকাকে সুব্রত বলল, 'কাকা কী অবস্থা? ভূতের দেখা কি হবে না?'
'এত ধৈর্য হারালে হয় সুব্রত? একটু ধৈর্য ধরো, ভূতদের ঠিক দেখতে পাবে।'
'কিন্তু আমি যে আর ধৈর্য ধরতে পারছি না। কাকা, আমি তো জানি ভূতেরা বনে-জঙ্গলে আড্ডা দেয়। এখনকার ভূতেরা কি আধুনিক? স্কুলে আড্ডা দেয়া শুরু করেছে?'
কাকা মৃদু হেসে বললেন, 'ভূতগুলো পড়াশোনা জানে না। শিক্ষিত হওয়ার জন্য স্কুলে এসে আড্ডা দেয়া শুরু করেছে। তোমরা ক্লাস করো, ওরা সেটা লক্ষ্য করে। একজন শিক্ষিত ভূত এসে রাতে ওদের ক্লাস করায় তোমাদের ক্লাস রুমে।'
সুব্রত মুচকি হাসি দিয়ে বলল, 'ভূতদের মধ্যে আবার শিক্ষিত, অশিক্ষিত আছে! ভূতেরা শিক্ষিত হয়ে কী করবে?'
'আধুনিক ভূত বলে কথা, শিক্ষিত না হলে চলে? তাদের কত কিছু করতে হয়।'
'কী করতে হয় কাকা?'
'শোনো_ সাপ্তাহিক মিটিং, কে, কোন এলাকাতে কত ক্ষমতা নিয়ে থাকব। কে মজা দেখাবে। কে অসহায় ছিন্নমূল মানুষের পাশে দাঁড়াবে। নানা বিষয় নিয়ে মন্ত্রিসভার মতো তাদেরও বৈঠক হয়।'
'কিন্তু কাকা, ভূত তো মানুষকে ভয় দেখায়। মানুষের উপকারের কথা তো শুনিনি কোনো দিন!'
'মানুষ মানুষের ক্ষতি করে। উপকার করতে চায় না। আধুনিক ভূতগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা মানুষকে আর ভয় দেখাবে না, এখন থেকে উপকার করবে। আর যারা মানুষ হয়ে মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টা করবে তাদের ভয় দেখাবে।'
'তাই কাকা, ভূতেরা তো ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে।'
'হ্যাঁ, তার প্রমাণ তুমি দেখতে পাবে।'
এদিকে রণক দেখতে পেল আজো সুব্রত কথা বলছে ভোলানাথ কাকার সাথে।
সুব্রত ক্লাসে এলো। রণক কিছু বলছে না। সুব্রতের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ও।
সন্ধ্যায় সুব্রত আবার এলো স্কুলে। ভোলানাথ কাকার কাছে এসেই বলল, 'কাকা আজ তো ভূত দেখা যাবে?'
'দেখি, চেষ্টা করি মন দিয়ে মন্ত্রপাঠ করি।'
ভোলানাথ কাকা ধ্যানে বসে গেলেন। একটু পর বললেন, 'সুব্রত আজ হবে না। ভূতেরা তাদের বিভাগীয় সম্মেলনে গেছে।'
'আমরা কয়েক বন্ধু মিলে ভূত সাজব। তারপর কৌশলে ভোলানাথ কাকাকে ভয় দেখাব।'
'ঠিক বলেছিস আমাকে ঘুরানোর শাস্তি পেতেই হবে তাকে।'
'চল, সব বন্ধুকে বিষয়টা খুলে বলি। সবাই ভূত সাজব। আগামীকাল কাকাকে ভয় দেখাব।'
পরদিন রাতে সবাই এক জায়গায় জড়ো হলো। পরনে তাদের সাদা পোশাক। মুখে কালো কালি মেখে আমগাছে উঠল সবাই। কিছু সময় পর নাকি সুরে তারা একসঙ্গে বলল, 'ওঁ ভোঁলাঁনাঁথঁ, ওঁ ভোঁলাঁনাঁথঁ তুঁইঁ কোঁথাঁয়ঁ? গাঁছেঁরঁ নিঁচেঁ আঁয়ঁ।'
ভোলানাথ আমগাছের নিচে এসে দেখে কেউ নেই। একটু পর গাছের ওপর থেকে ভোলানাথের শরীরে ঢিল পড়তে লাগল। গাছের দিকে তাকিয়ে সে দেখতে পেল অনেক ভূত তাকে ঢিল মারছে। ভোলানাথ ওদের দেখে জোরে চিৎকার করে দৌড় দিতে দিতে বলল, 'আজ সত্যি সত্যি স্কুলে ভূতের আড্ডা বসেছে। আমি আর স্কুল পাহারা দেব না। কে কোথায় আছ, আমাকে রক্ষা করো। তোমরা ভূত দেখে যাও। সুব্রত তুমি কোথায়? ভূত এসে স্কুলে আড্ডা দিচ্ছে। তুমি দেখে যাও।'
ভোলানাথ স্কুল থেকে দৌড়ে গ্রামের ভেতর ঢুকে পড়ল।
গাছের ওপর থেকে সুব্রত, সুফল, সুজন, রণক, মাসুদ ও রাজু একসঙ্গে হেসে ওঠে। পরে সবাই গাছ থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ে।
রণক বলল, 'আমরা সবাই এ যুগের আধুনিক মানুষ ভূত।'
সুজন বলল, 'চল, স্কুল থেকে তাড়াতাড়ি পালাই। ভোলানাথ কাকা যেভাবে চিৎকার করেছে গ্রামে মানুষজন এসে হাজির হলো বলে।'
সবাই একসঙ্গে মাথা নাড়াল।
একটু পর ওরা সবাই স্কুল থেকে দৌড়ে পালিয়ে গেল।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now