বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
৪.
জান, আমাদের এক্সপেরিমেন্টের সবকিছু প্রায় গুছিয়ে এনেছি, আশা করছি আগামী মাসের প্রথম দিকে চালু করতে পারবো। সে এক বিশাল ব্যাপার স্যাপার!
-হুমম!
কিভাবে দেখতে দেখতে দুইটা বছর চলে গেলো, তাই না?
-হুমম
ভাবছি তোমাকে একদিন আমাদের ল্যাবে নিয়া যাব, নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করবে না! মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর ব্যায়বহুল এক্সপেরিমেন্ট এটা।
-আচ্ছা
এই প্রথম আমরা কৃত্রিমভাবে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উৎপন্ন করবো, প্রায় প্লাংক টেমপারেচারের অর্ধেক। স্টিফেনিয়ামকে এই তাপমাত্রায় উত্তেজিত করে অসীম সংখ্যক সিরাস কনিকা নির্গত করা হবে, তারপর এই সিরাস কনিকাগুলোকে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন তড়িৎ-চুম্বক ক্ষেত্রে টেনে এনে একটা টিউবের চারপাশে ছেড়ে দিয়ে তড়িৎ-চুম্বক বন্ধ করে দিলেই ঐ সিরাস কনিকাগুলো টিউবটিকে সহ সময়ের অন্য এক মাত্রায় চলে যাবে।
-ও, আচ্ছা
টিউবের ভিতরে আমরা একজন মানুষকে পাঠাবো। চিন্তা করতে পারো পৃথিবীর প্রথম সেই মানুষ যে সময়ের ভিন্নস্তরে পরিভ্রমন করবে! কত ভাগ্যবান সেই ব্যক্তি! ও, আচ্ছা বলতে ভুলে গেছি, এই ভ্রমণের নাম রাখা হয়েছে আমার নামে “সিরাস ভ্রমণ”। ইতিহাসের এই প্রথম কোন ভ্রমণের নামকরন করা হয়েছে কোন বিজ্ঞানীর নামে।
-ভালো
তুমি কি কোন কারনে আমার উপর বিরক্ত?
-না বিরক্ত না, তুমি কথা পেঁচাচ্ছ কেন? যে কথা বলার জন্য এতক্ষণ ঘুরঘুর করছ সেটা বলে দিলেই তো হয়, ভয় পাচ্ছ কেন?
একটু থতমত খেয়ে যায় সিরাস, সামলে নিয়ে বলে, আসলে এই ভ্রমণে আমি নিজেই যাচ্ছি। বলেই চুপ মেরে যায় সে, মিহানও চুপ; কোন কথা নেই কারো মুখে। শেষে সিরাসই নিরবতা ভেঙে বলে, “অনেক ভেবে দেখলাম, ভ্রমনের সময় বা অন্য জগতে অনেক অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটতে পারে, তাই এই এক্সপেরিমেন্টের ব্যাপারে যার জ্ঞান তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগতভাবে সবচেয়ে বেশি তার যাওয়াটাই যুক্তিসঙ্গত, এত গুরুত্বপূর্ণ আর ব্যয়বহুল কোন এক্সপেরিমেন্টের ব্যাপারে কোন রকমের রিস্ক নেওয়া ঠিক হবে না।”
-আমি অনেক আগেই জানি তোমার এই পরিকল্পনার কথা, তোমার কম্পিউটার ঘেটে আমি জেনেছি। আমি শুধু অপেক্ষা করছিলাম তুমি নিজের মুখে কবে আমাকে জানাবে। মুখ তুলে সরাসরি সিরাসের চোখে চোখ রেখে তাকায় মিহান।
সিরাসের বুকটা কেঁপে উঠে মৃদু! কি দেখেছে সে মিহানের চোখে? ভালোবাসা? আকুতি? ঘৃণা? না কি শুধুই জল?
হঠাৎ ঝাপিয়ে পড়ে মিহান সিরাসের বুকে, সার্টের কলার চেপে ধরে ঝাকাতে ঝাকাতে বলে তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না, প্লিজ!
কিন্তু তারতো আর ফিরে আসার উপায় নেই! তাদের দুজন মানুষের জীবনের চেয়ে এই এক্সপেরিমেন্ট মানব জাতির জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর সে তো চিরদিনের জন্য যাচ্ছে না, পরীক্ষা সফল হলেই সে দুইদিনের মধ্যে ফেরত আসবে। কিন্তু এই বলে কি আর মিহানের কান্না থামানো যাবে? কাঁদুক বেচারা, কেঁদে বুকটা একটু হালকা করুক।
৫.
আজ সেই মহেন্দ্রক্ষণ! রক্তের মধ্যে উত্তেজনা টের পাচ্ছে সিরাস। যদিও একটু ভয় ভয় লাগছে, বেশি খারাপ লাগছে মিহানের জন্য, বেচারীকে অনেক জোরজবরদস্তি এখানে আনতে পারেনি সে। বারবার চোখ মুছছিলো আর বলছিলো, “মনে হচ্ছে শেষ সময়ে কোন একটা ঝামেলা হবে আর তোমার মারাত্মক কোন ক্ষতি হয়ে যাবে আর চোখে সামনে আমি তা দেখতে পারবো না। তারচেয়ে আমি সারাদিন প্রার্থনা করেই কাটাই”। আপন মনে একটু হেসে উঠলো সিরাস, “ভালোবাসার মানুষের জন্য মানুষের কতই না অযোক্তিক উৎকন্ঠা!” হঠাৎ কি মনে হলো ফোনটা নিয়ে মিহানের নাম্বারটা ডায়েল করা শুরু করলো সে, হয়ত শেষবারের মত কথা বলে নেওয়ার জন্য, কিন্তু একজন ল্যাব ইঞ্জিনিয়ারকে তার দিকে দৌড়িয়ে আসতে দেখে ফোনটা কেটে দিলো।
- মহামতি সিরাস, আপনাকে মহামান্য কোস্ত্রা স্যার এক্ষণি যেতে বলেছেন।
এক্ষণি? আচ্ছা আসছি; বলেই পা বাড়ালো সিরাস, শেষবারের মত আর কথা বলা হলো না মিহানের সাথে।
রুমে ঢুকেই একটু থমকে দাড়ালো সিরাস। বিশ পঁচিশ জনের মত বিজ্ঞানী আর ডাক্তার ভাবলেসহীন মুখে বসে আছে ঘরের মধ্যে, এদের প্রায় কাউকেই সে চিনে না। প্রজেক্টের নিরাপত্তার স্বার্থে উপরের পর্যায়ের চার পাঁচজন বিজ্ঞনীবাদে সবাইকে প্রতি মাসে অন্যত্র বদলি করা হয়, এরা মনে হয় নতুন ব্যাচের হবে সবাই, মনে মনে ভাবে সিরাস। মাহামতি কোস্ত্রা কণ্ঠে জরুরীভাব ফুটিয়ে তুলে বললেন, “কোথায় ছিলে আপনি? আপনাকে অনেক্ষণ ধরে খুঁজছি! আমাদের সিস্টেম লঞ্চ করার কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। আপনাকে কিছুক্ষণের মধ্যে প্রস্তুতি শেষ করতে হবে”
চারদিকে একবার তাকিয়ে, চেপে থাকা নিঃশ্বাসটা ধীরে ধীরে ছেড়ে সিরাস বললো, “আমি প্রস্তুত, স্যার”
মুহূর্তেই তাকে নিয়ে ঘরের মধ্যে হুলুস্থূল পড়ে গেলো, হাজার রকমের যন্ত্রপাতি, রিডার, স্ক্যানারে চারদিক ঘিরে ধরে তাকে, জ্ঞ্যান হারাবার আগে শুধু মনে আছে কে যেন বলছে, “কোয়ান্টাম ঘড়িটা চালু কর ……. রেডি ওয়ান টু থ্রী স্টার্ট”। পিঁপ পিঁপ পিঁপ করে তিনটি শব্দ হয়ে সব নিস্তব্ধ হয়ে যায় সিরাসের কাছে শুধু শেষ এই তিনটি শব্দ গেঁথে যায় তার মস্তিষ্কে, অবচেতন মনে শুনতে থাকে, “পিঁপ পিঁপ পিঁপ”
ল্যাবের শত শত বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়াররা চরম উৎকণ্ঠায় পার করছে শেষের প্রতিটা মুহূর্ত! সবার চোখে মুখে চাপা উত্তেজনার ছাপ, শেষ কয়েক মিনিট আর বাকি, সবাই যার যার স্ক্রিনের সামনে মূর্তির মত বসে আছে, শুধু চোখগুলো বিদ্যুৎ বেগে পড়ে যাচ্ছে নানান রিডিং আর গ্রাফ আর ডাটা। মহামান্য সিরাসকে প্রায় পরম তাপমাত্রার কাছাকাছি তাপমাত্রায় শীতল করে ইন্টেনিয়ামের টিউবে রেখে তা একশ মিটার ব্যাসের একটি বৃত্তের কেন্দ্রে স্হাপন করা হয়েছে আর এই বৃত্তের পরিধি বরাবর বসে আছেন সব টেকনিশিয়ানরা। ইন্টেনিয়ামের টিউবে ঠিক নিচেই ভূপৃষ্ঠের গভীরে বসানো হয়েছে অসীম সংখ্যক সিরাস কনিকা উৎপন্ন করার যন্ত্র।
সবকিছু ঠিক হতেই চিফ সাইন্টিস্ট মহামতি কোস্ত্রার দিকে একবার তাকিয়ে বললেন,“স্যার?”
মহামতি কোস্ত্রা আলতো করে মাথাটা উপর নিচে নেড়ে অনুমতি দিলেন।
সাথে সাথে কম্পিউটারে নারীকণ্ঠে বলে উঠলো “এক্সপেরিমেন্ট ‘ট্রাভেল সিরাস’ ইজ এবাউট টু স্টার্ট, নাইন, এইট, সেভেন, ……… ওয়ান”
কোন পরিবর্তন কারও চোখে ধরা পড়লো না! ইন্টেনিয়ামের টিউবটা শুধু একটু কেঁপে উঠলো বলে মনে হলো, তাও এক সেকেন্ডের লক্ষভাগের একভাগ সময়ের জন্য! আল্ট্রাসনিক সেন্সর ছাড়া এই পরিবর্তন কিছুতেই বুঝা যেত না। বিজ্ঞানীরা একেবারে থ মেরে গেছেন সবাই! এমন তো হবার কথা নয়! ইন্টেনিয়ামের টিউবটাতো এখন সময়ের অন্য স্তরে চলে যাবার কথা! কোথায় গড়মিল হলো? বড় ধরনের কোন ভুল হয়ে গেছে কোথাও নিশ্চয়! কিন্তু সব ডাটা, রিডিং সবকিছু একেবারে ঠিক দেখাচ্ছে! কোথাও কোন বিচ্চুতি, ভুল দেখা যাচ্ছে না! সবাই যতক্ষণে হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি, তখন গমগম কণ্ঠে মহামতি কোস্ত্রা আদেশ দিলেন, “এক্ষণি ইন্টেনিয়ামের টিউবটা খুলে সিরাসকে বের কর, জলদি, রাইট নাও”
৬.
সরি!
কি হয়েছে সিরাসের? কি হয়েছে ওর? নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে কষ্ট হচ্ছে মিহানের, চিৎকার করে যাচ্ছে অনবরত। কোথায় সে এখন? প্লিজ আমাকে একবার ওকে দেখতে দেন, প্লিজ!
মিসেস. নিহেতা, আপনি শান্ত হোন। মহামান্য সিরাসের ভালোর জন্যই আপনাকে এখন শক্ত হতে হবে।
আপনারা কিছু বলছেন না কেন? কি হয়েছে ওর? মনের মধ্যে নানান আশংঙ্কা উকি ঝুকি মারছে, খুব কষ্ট হচ্ছে তার।
আসলে কি হয়েছে আমরা এখনো ঠিক ধরতে পারিনি, তবে আমাদের এক্সপেরিমেন্ট ব্যর্থ হয়েছে, আর কোন এক বিচিত্র কারনে মহামান্য সিরাসের বয়স বেড়ে নব্বই হয়ে গেছে।
নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না মিহান, পাগলের মত এসব কি বলছে এই লোক! ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে কেবিনে ঢুকে যায় সে। থ! এই অতিশয়পর বৃদ্ধ লোকটা সিরাস! নাকে অক্সিজেনের পাইপ, কুচকানো হাতের চামড়া, মুখের চামড়া কুচকে কালো হ্য়ে গেছে, চুল সব সাদা! এটা কি আসলেই সিরাস? ঠিক, সিরাসই তো! আমি কি ওকে দেখে না চিনে থাকতে পারি! ওহ! সিরাস! তোমার একি হয়েছে? বুকের ওপর প্রায় ঝাপিয়ে পড়লো সে। সিরাসে দূর্বল হাতটা তুলে নিয়ে চুমু খায়, চোখের পানি মুছে তার হাত দিয়ে, তারপর মাথা নিচু করে বছানায় মুখ ঢেকে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে মিহান।
কে মিহান? এসেছো? আমার এক্সপেরিমেন্ট ‘সিরাস-ভ্রমণ’ ফেইল করেছে! আমার এক্সপেরিমেন্ট ফেইল করেছে! আর এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আমার বয়স বাড়িয়ে দিয়েছে দ্বিগুণ! এটা নিয়ে আমার কোন আক্ষেপ নেই, কিন্তু আমি এত দূর্বল হয়ে গেছি যে আর গবেষণা করতে পারবো না, আর বের করতে পারবো না কোথায় ভুল হয়েছে আমার, এ আক্ষেপ নিয়ে আমাকে বাঁচতে হবে!
কোন মানুষ এই রকম পরিস+হিতিতে এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে আক্ষেপ করতে পারে! নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না মিহান। অতঃপর তার কথায় সায় দিয়ে বলে, দুঃখ করো না, ঈশ্বর চাইলে সব ঠিক করে দিবেন। আসলে কি হয়েছিলো? তোমার কিছু মনে আছে?
এক্সপেরিমেন্টের শুরুদিকে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো, আর ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখি আমার বয়স দ্বিগুণ! মাঝখানে আর কিছু মনে নেই আমার।
বিছানা থেকে মাথা তুলে তাকায় মিহান, চোখ পড়ে সিরাসের চোখে, থমকে যায় সে মুহূর্তের জন্য, সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠে তার, হাজার ভোল্টের কারেন্টের শক খেয়েছে যেন! চিৎকার করে উঠে, “কে তুমি, কে? তুমি তো সিরাস নও, না, না ! তুমি সিরাস না! কোথায় আমার সিরাস?”
চিৎকার শুনে ডাক্তার নার্স ছুটে এসে ধরে মিহানকে, আর সে অনবরত চিৎকার করে যাচ্ছে “এ আমার সিরাস নয়, এ আমার সিরাস নয়, এ আমার সিরাস নয়”
অনেক দূর্বল লাগছে সিরাসে, অনেক ঘুম পাচ্ছে তার। ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে সে
শুনতে থাকে ডাক্তাররা পাশের রুমে মিহানকে বুঝাচ্ছে আর বলছে, “আমরা ব্লাড টেস্ট, ফিঙ্গার প্রিন্ট, চোখের আইরিশ চেক করে দেখেছি, এমন কি ডি.এন.এ টেস্ট পর্যন্ত করেছি, আমরা শতভাগ নিশ্চিত উনিই সিরাস”
ঘুমানোর ঠিক আগে কোন এক বিচিত্র কারনে তার কানে অদ্ভুত একটা শব্দ আসতে থাকে, “পিঁপ, পিঁপ, পিঁপ”। এটা কি সে ঠিক ঠিক শুনতে পাচ্ছে, না কি তার অবচেতন মন থেকে আসছে এই শব্দ? ভাবার আর অবকাশ পেল না সিরাস, ঘুমিয়ে পড়লো।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now