বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

সিরাজ ভ্রমন ০১

"সাইন্স ফিকশন" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান বাপ্পী (০ পয়েন্ট)

X ১. নাহ্ ! সমস্যা কোথায়? কেন হচ্ছে না, কেন? ধ্যাৎ! নিজের উপর চরম বিরক্ত হয় সে। "শান্ত হও সিরাস, শান্ত হও, তুমি খুব কাছে দিয়ে ঘুরাঘুরি করছো, এই সময় অধৈর্য্য হলে হবে না, "তুমি যদি না পার তাহলে আর কেউই পারবে না" নিজেকে নিজে এভাবেই প্রবোধ দিতে থাকেন মহামান্য নিহেতা সিরাস। কিন্তু আর কত! তিন রাত না ঘুমানোর ক্লান্তি এবার চরমে পৌঁছে আর বিষ্ফোরন ঘটে অকস্মাৎ; ভেঙ্গে যায় সব নিয়ন্ত্রনের বাধ; বিপুল আক্রোশে রাইটিং স্ক্রিনের উপর এলোপাথালি হাত চালিয়ে গত তিনদিন তিনরাত অমানুষিক পরিশ্রম করে দাড় করানো চিত্র, সমীকরন আর সব লেখা এক ঝটকায় মুছে বিছার উপর ধপ করে বসে পড়ে সিরাস চিৎকার শুনে পাশেরঘর থেকে দৌড়ে আসে মিহান। খুব সন্তর্পনে সিরাসের পাশে বসে, আলতো করে কোলের উপর টেনে নেয় তার এলিয়ে দেওয়া মাথাটা। তার এমন আচরনের সাথে ভালো করেই পরিচিত মিহান। খুব যত্ন করে চুলের ভিতর আঙ্গুল চালাতে চালাতে জিজ্ঞেস করে, "ইদানিং কি হয়েছে তোমার? এত অল্পতেই উত্তেজিত হয়ে পড়ছো?" চুলে মিহানের হাত পড়তেই একেবারে অন্য মানুষ হয়ে যায় সিরাস, সব অবসাদ, ক্লান্তি আর ক্ষোভ মুহূর্তে কোথায় উবে যায়! বিড়ালের মত আহ্লাদে গুটিসুটি মেরে যায় একেবারে, একটু লজ্জাও পায় নিজের ছেলেমানুষী আচরনের জন্য, হাত পা গুটিয়ে তার কোলে মাথাটা আর একটু এলিয়ে দিয়ে বলে, "আমি পারছি না কেন?" পারবে, তুমি পারবে। একটু ধৈর্য্য ধর, তুমি পারবে। জানি পারবো; চোখ বন্ধ করলেই সম্পূর্ণ মডেলটা আমার সামনে জলজ্যান্ত ভেসে উঠে, কিন্তু কোন ভাবেই ধারণ করতে পারছি না, আর ধারন না করতে পারলে সমীকরনেও প্রকাশ করা যায় না, কষ্টটা এমন যে কাউকে বোঝাতেও পারছি না। তুমি সবসময় একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্নে চিন্তাকর তাই অনেক সহজ জিনিসও পেঁচিয়ে ফেল। এক কাজ কর; তুমি সহজ ভাষায় আমাকে বোঝানোর চেষ্টা কর, দেখবে বুঝানোর সময় চিন্তার অনেক জট খুলে যাবে, নতুন খোরাক পাবে ভাববার আর এতে আমি কিছু না বুঝলেও তোমার কাছে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। সিরাসের চোখের দ্যুতি ধপ করে জ্বলে উঠলো মিহানের এই প্রস্তাব শুনে; মনে মনে আসলে এটাই চাচ্ছিলো সে। লেকচার দেওয়ার সুযোগ পেয়ে এক লাফে বিছানার উপর উঠে বসে, কোথা থেকে যেন অপার্থীব এক প্রাণশক্তি সঞ্চারিত হয় তার মনে। বিছানার উপর টেনে নিয়ে আসে রাইটিং স্ক্রিন। আঙ্গুলকে কলমের মত ব্যবহার করে দ্রুত কিছু ছবি আঁকে স্ক্রিনের উপরে, তারপর বিপুল উৎসাহে শুরু হয় তার লেকচার। “মনে কর এটা সিরাস কনিকা, এই সিরাস কনিকাই হলো স্ট্রিং-থিউরির স্ট্রিং এর একক। প্রথমদিকে বিজ্ঞানীদের ধারনা ছিলো স্ট্রিংই হলো পরমানুর ক্ষুদ্রতম একক আর, পরে দেখা যায় যে ৯ টি এক মাত্রার সিরাস কনিকা মিলে গঠন করে একটি দুই মাত্রার স্ট্রিং ………” আপাত গুরুত্বপূর্ণ লেকচারের ফাঁকে হঠাৎ অন্যমনষ্ক হয়ে যায় মিহান, কোন কথাই কানে যায় না তার, সিরাসের চোখে তাকিয়ে থেকে চলে যায় আঠার বছর অতীতের সেই ইউনিভার্সিটির ছাত্রজীবনে। ইস! সেই চোখ আর এই চোখ! একদম বদলায়নি এত বছরেও! প্রথম যেদিন ভার্সিটির ক্যাফেটেরিয়ায় সিরাসের চোখে চোখ পড়েছিলো মিহানের, সেদিনই ভিতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠেছিলো কোন এক অপার্থীব সুখানুভূতিতে; মনে হয়েছিলো এই চোখে তাকিয়ে থাকা যায় হাজার বছর; নিষ্পলক। আচ্ছা, সিরাস কি আমাকে এখনো আগের মতই ভালোবাসে? কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার কাছে; আমি নাকি তার গবেষণা? ভার্সিটির তৃতীয় বর্ষে থাকাকালিন সিরাস কী সব একক মাত্রার কনিকা আবিষ্কার করে সারা পৃথিবীতে হৈ চৈ ফেলে দেয়; তারপর থেকে চারদিকে কনিকা পদার্থ বিজ্ঞান ও কোয়ান্টাম মেকানিক্সে শুধু তারই নামডাক। সেই থেকে শুরু, তারপর শুধু সাফল্যের ইতিহাস; একের পর এক পুরস্কার, খেতাব, তার নামে সেই কনিকার নামকরন; সবশেষে সর্বোচ্চ বিজ্ঞান কাউন্সিলের আজীবন সদস্য পদ, আরও কত কী! তারপর থেকেই কেমন যেন হয়ে যায় সে, সারাক্ষণ শুধু গবেষণা, ল্যাব, সেমিনার এইসব হাবিজাবি, ধ্যাৎ! যত্তসব! যদিও তাকে কোনদিন অবজ্ঞা করেনি সে, যেখানে যে সেমিনারে গিয়েছে তাকে নিয়ে গেছে, সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে “মিহান, মাই ওয়ান এন্ড ওনলি, মিহান, দ্যা অনলি থিং ম্যাটার ইন মাই লাইফ ইজ সী, মিহান নেই তো এই সিরাসও নেই”। যতবার মিহানকে এভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে সিরাস, ততবার চোখ ভিজে ভিজে এসেছে তার। অনেক কষ্টে ছলছল চোখকে নিয়ন্ত্রন করতো সে। কতদিন আড়ালে আবডালে চোখ মুছেছে আনন্দে! সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে যখন একটু অন্যমনষ্ক হয়ে যায় মিহান তখন হঠাৎ সিরাস বলে, “তুমি কি আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছো না? একটু চমকে উঠে মুহূর্তেই সামলে নিয়ে বলে, “নাহঃ ! শুনছি তো ! তুমি বলে যাও” মিহানের শুনা বা নাশুনা নিয়ে কোন মাথা ব্যাথা নেই সিরাসের, শুধু লেকচার দিয়ে যেতে পারলেই খুশি সে। আবার শুরু করে সে, “………তৃমাত্রিক সূত্রের সাহায্যে ‘সিরাস-কনিকাগুলোর’ অবস্হান তৃমাত্রিক জগতে খুব সহজেই বের করতে পারার কথা কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তা কিছুতেই করতে পারছি না। তবে সময়কে মাত্রার চতুর্থ একক ধরে চতুরমাত্রিক সূত্রের মাধ্যমে এর অবস্হান বের করার চেষ্টা করে দেখি, মাঝে মাঝে বের করা যাচ্ছে আবার মাঝে মাঝে বের করা যাচ্ছে না। কিন্তু যদি পঞ্চমাত্রিক সূত্র প্রয়োগ করি তাহলে নিঁখুতভাবে এর অবস্হান বের করা যাচ্ছে, আর এটাই হচ্ছে মূল সমস্যা” তাহলে পঞ্চমাত্রিক সূত্র খাটিয়েই এর অবস্হান বের করে ফেল না, সমস্যা কোথায়? মুচকি একটু হাসে সিরাস, যেন সে এমন বোকার মত প্রশ্নই আশা করছিলো। তার মানে বুঝতে পারছো? তার মানে হলো আমার কোথাও ভুল হচ্ছে, কারন আমারা বাস করছি তৃমাত্রিক বিশ্বে, আর সময়কে একটা মাত্রা ধরলে দাঁড়ায় চৌ-মাত্রা, এটা কোনভাবেই পঞ্চমাত্রার হতে পারে না। আর যদি ধরেও নেই আমাদের ধারনার বাইরে আরও মাত্রা আছে তাহলে সেটা হবে সপ্তমাত্রা, কখনো পঞ্চমাত্রা নয়। কেন? শুধু সপ্তমাত্রাই হতে হবে কেন? আর পঞ্চমাত্রা কেন হতে পারবে না? আমাদের তিনটি মাত্রা হচ্ছে, ‘দৈর্ঘ’, প্রস্হ আর ‘উচ্চতা’ আর একটি মাত্রা হচ্ছে ‘সময়’। সময় যেহেতু একদিকে প্রবাহমান সেহেতু এটা কোন ভাবেই দ্বিমাত্রিক হতে পারে না। এখন যদি ধরে নেই দৈর্ঘের নিজস্ব দুটি মাত্রা আছে তাহলে মোট মাত্রা হলো পাঁচটি, দুটি দৈর্ঘ, একটি প্রস্হ, একটি উচ্চতা আর একটি সময়। কিন্তু দৈর্ঘ, প্রস্হ আর উচ্চতা মূলত একই জিনিস, শুধু বস্তুকে ঘুরিয়ে দিলেই দৈর্ঘ হয়ে যাবে প্রস্হ অথবা উচ্চতা। তাই দৈর্ঘ যদি দ্বিমাত্রিক হয় সাথে সাথে প্রস্হ ও উচ্চতাও দ্বিমাত্রিক হবে। সুতরাং দুটি দৈর্ঘ, দুটি প্রস্হ, দুটি উচ্চতা আর একটি সময় নিয়ে আমাদের বিশ্ব হবে সপ্তমাত্রিক (সেভেন্থ-ডাইমেনশনাল)। তাই আমরা হয় চৌমাত্রিক অথবা সপ্তমাত্রিক বিশ্বে বাস করছি, কিন্তু কোনভাবেই পঞ্চমাত্রিক বিশ্বে নয়। ইস! ভালো সমস্যা পাকিয়েছ তো! তবে ঈশ্বর সহায় হলে তুমি খুব তাড়াতাড়ি এর সমাধান পেয়ে যাবে, আমি তোমার জন্য মনে প্রাণে প্রার্থনা করবো। “উফ! এই মেয়েটি যে কেন এখনো সেই মান্ধাতা আমলের ধ্যানধারনা নিয়ে আছে। আজকালকার দিনে কেউ ঈশ্বর-টিশ্বর বিশ্বাস করে না কী?”, ভাবে সিরাস। বিরক্ত ভাবটা যথাসম্ভব চেপে রেখে বলে, “তোমার ঈশ্বর কখনোই আমার সহায় হবেন না। অতীতে আমরা প্রকৃতির কাছে অসহায় ছিলাম বলে ঈশ্বরের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতাম আর উনি নানা কেরামতি দেখিয়ে আমাদের মন জয় করতেন। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান প্রকৃতিকে প্রায় জয় করে এনেছে তাই ঈশ্বর মহাশয় আজ বেকার, তবে উনাকে সম্মান করে মুকুটহীন সম্রাট বলা যেতে পারে”, বলেই বাচোখটা একটু টিপ দিয়ে ঠোঁটে একটু তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে মিহানের দিকে তাকায় সিরাস। ছিঃ! সিরাস ছিঃ! এভাবে বলে না। ঈশ্বরের কাছে অতীত বর্তমান বলে কিছু নেই, উনি সময়ের উর্ধ্বে, উনাকে নিয়ে এভাবে কথা বলা তোমার একদম ঠিক না, একদম না! আমি তোমার কথায় অনেক বিরক্ত হয়েছি, অনেক বিরক্ত! বলে মাথা ঝাকাতে ঝাকাতে রান্না ঘরে চলে যায় মিহান। ২. “ঈশ্বর সময়ের উর্ধ্বে”, “ঈশ্বর সময়ের উর্ধ্বে” কিছুতেই চিন্তাটা মাথা থেকে বের করতে পারছে না সিরাস, এই কথাটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে অনেক্ষণ ধরে, যেন গ্রামোফোনের পিন আটকে যাবার মত আটকে গেছে মস্তিষ্কের কোন নিউরন । উফ! মাঝে মাঝে মিহানটা এমন বোকার মত কথা বলে না! এখন আর কোন কাজই করা যাবে না। চরম বিরক্তভাব নিয়ে বিছানায় গেলো সিরাস, শরীর চরম ক্লান্ত, মনটাও বিক্ষিপ্ত, আর অবচেন মনে আটকে আছে, “ঈশ্বর সময়ের উর্ধ্বে”, কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে টেরই পায়নি। ঘুমের মধ্যেই আবছা আবছা মনে হলো, কে যেন গায়ে চাদরটা টেনে দিয়ে গেলো আর কপালে হালকা চুমুও দিয়ে গেলো একটা। “ঈশ্বর সময়ের উর্ধ্বে”, “ঈশ্বর সময়ের উর্ধ্বে” কে যেন কানের কাছে ফিসফিস করছে, ভয়ানক চমকে উঠে ঘুম ভেঙ্গে যায় সিরাসের, ঘেমে একাকার অবস্হা, পাশে তাকিয়ে দেখে গভীর ঘুমে অচেতন মিহান, কিছুক্ষণ সময় নেয় ধাতস্হ হতে। তারপর সন্তর্পণে বিছানায় উঠে বসে সিরাস। ধীর ধীরে রাইটিং স্ক্রিনটার দিকে এগিয়ে যায়, কাঁপা কাঁপা হাতে পাওয়ার অন করে স্ক্রিনটার। খুব দ্রুতবেগে কি সব লিখে যাচ্ছে আঙ্গুল দিয়ে রাইটিংস্ক্রিনটার উপর, আশেপাশে কোন খেয়াল নেই তার, একের পর এক সমীকরন লিখে যাচ্ছে, একের পর এক চিত্র এঁকে যাচ্ছে, যেন চাবি দেওয়া কোন রবোট; অভিব্যক্তি হিসাবে মুখের কঠোর ভাবটা কঠোরতর হচ্ছে আর চোখের জ্বলজ্বল ভাবটা আরো উজ্বলতর হচ্ছে। গতকাল অনেক রাতে ঘুমিয়েছে তাই দেরি করে ঘুম ভাঙ্গে মিহানের। ঘুম থেকে উঠেই দেখে সিরাস রাইটিংস্ক্রিনে ভাবলেশহীন ভাবে লিখে যাচ্ছে তো লিখেই যাচ্ছে। ওকে বিরক্ত না করে মুখ হাত ধুয়ে টেবিলে নাস্তা দিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে মিহান, তারপর একাই খেয়ে নেয়। রাইটিংস্ক্রিনে তখনো লিখে যাচ্ছে সিরাস, ক্রমাগত। সিরাসের পাশে এসে বসে মিহান, রাইটিংস্ক্রিনে লেখা সমীকরন, চিত্রগুলোর মাথামুন্ডু কিছুই তার বুঝে আসে না, শুধু অবাক হয়ে সিরাসের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে আর মনেমনে ভাবে, “আমি তোমাকে এত ভালোবাসি কেন? আচ্ছা, তোমার ভালোবাসাও কি আমার মতই তীব্র? তোমার পাশে আমি এসে বসলাম আর তুমি একবারও তাকিয়ে দেখলে না?” হালকা ঈর্ষা অনুভব করতে থাকে সে রাইটিংস্ক্রিনটার উপর, “ইস, যদি এই স্ক্রিনটা হতাম আমাকে দিনে কতবার ছুঁয়ে দেখতে তুমি?” হঠাৎ লেখা থামিয়ে মিহানের দিকে তাকায় সিরাস, কেমন ঘোর লাগা দৃষ্টি! যেন মিহানের ভিতর দিয়ে অনেক দুরের কোথাও তাকিয়ে আছে। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে, “আমি সমাধান পেয়ে গেছি, মিহান; আমি সমাধান পেয়ে গেছি।” ৩. মিঘুয়েল কোস্ত্রা, বিজ্ঞান কাউন্সিলের মহাপরিচালক, বয়স হলেও চোখে তীক্ষ্ণতা একচুল কমেনি, ভ্রু কুচকে মহাবিরক্ত নিয়ে সিরাসের দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি। বিজ্ঞানী সিরাসকে তিনি অসম্ভব পছন্দ করলেও হাবভাবে কখনো তা প্রকাশ করেন না, পাছে তার দূর্বলতা সবার সামনে ধরা পড়ে যায়। দুই বছর আগে সিরাস নিজের মত করে কাজ করার কারন দেখিয়ে বিজ্ঞান কাউন্সিল থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিলেও মহামান্য কোস্ত্রার নির্দেশে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দাবাহিনী তাকে সার্বক্ষণিক চোখে চোখে রেখেছে। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ এই বিজ্ঞানীকে কোনভাবেই চোখের আড়াল করতে নারাজ বিজ্ঞান কাউন্সিলের এই মহাপরিচালক। বলা নেই কওয়া নেই গতরাতে হঠাৎ সিরাস ফোন করে যখন বললো আজ সকালে যেন জরুরী ভিক্তিতে কাউন্সিল মিটিং ডাকা হয়, তখনই তিনি বুঝতে পেরেছেন এই পাগল বিজ্ঞানী কোন এলাহীকান্ড ঘটিয়েছে আবার। উত্তেজনা ঢাকতে না পেয়ে উনি প্রায় চিৎকার করেই বলে উঠলেন, “মহামতি সিরাস, আপনি বলতে চাচ্ছেন প্যারালাল বিশ্ব অস্তিত্বমান?” স্যার, সাইন্সফিকশন মুভিগুলোতে যেভাবে প্যারালাল বিশ্ব দেখা যায় ঠিক সে রকম প্যারালাল বিশ্ব বললে ভুল হবে। বলতে পারেন সময়ের অন্য স্তরে অন্য বিশ্বগুলো বিদ্যমান। আপনি কি একটু সহজে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করবেন? “আসলে আমরা এতদিন ধরে নিয়েছিলাম সময় একদিকে প্রবাহমান, অতীত থেকে ভবিষ্যৎ, এই ধারনা ভুল ছিলো। আমি প্রমাণ পেয়েছি, সময় নিজেই আসলে দ্বিমাত্রিক। একটা মাত্রা আমরা অনুভব করতে পারছি, যেটা অতীত থেকে ভবিষ্যতে ধাবিত হচ্ছে এটা অনুভূমিক, আর একটা মাত্রা এর লম্ব বরাবর প্রবাহিত হচ্ছে। যেমন ধরুন, আমি এই ভবন এর বারান্দা দিয়ে হেঁটে যাই তাহলে যে গতিপথ হবে সেটাকে যদি অনুভূমিক ধরি তাহলে আমার ঠিক নিচের তলা দিয়ে যে লোকটি হেঁটে যাচ্ছে তার গতিপথও অনুভূমিক তবে সে আমার সাথে একটা নির্দিষ্ট লম্ব দূরত্ব রেখে হেঁটে যাচ্ছে। এভাবেই সময়ের লম্ব বরাবর অসীম সংখ্যক বিশ্ব পাশাপাশি প্রবাহিত হচ্ছে। আর সিরাস কনিকাগুলো পঞ্চমাত্রার এই বিশ্বে অসীম সংখ্যক চৌ-মাত্রিক জগতে প্রতিনিয়ত ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে” এতটুকু বলেই থামলো সিরাস। ঘরের মধ্যে সবাই রীতিমত ঘামছে, কারও মুখে কোন কথা নেই, নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তাদের, কিন্তু কিছুই করার নেই, সমীকরনতো আর মিথ্যা বলবে না! তাদের সামনে সিরাস চিত্রসহ সব প্রমান পেশ করেছে। অবশেষে নিরবতা ভাঙ্গলেন মহামান্য কোস্ত্রা, “মহামতি সিরাস, এখন আপনার পরামর্শ কি, আপনি কি করতে চান?” আমার পরামর্শ হলো, এখন এই থিউরীর যথার্থতা শুধু মাত্র এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমেই প্রমান করা সম্ভব, তাই এই আবিষ্কারের গুরুত্ব অনুধাবন করে যথাসম্ভব দ্রুত এক্সপেরিমেন্টের ব্যবস্হা করা দরকার। মহামান্য কোস্ত্রা আবিষ্কারের গুরুত্ব ঠিকমতই অনুধাবন করতে পারছেন, বছর তিনেক পর তিনি অবসরে যাছেন, জীবনের শেষ সময়ে এসে এমন কোন এক কালজয়ী এক্সপেরিমেন্টের সাথে যুক্ত হতে পারাটা ভাগ্যের ব্যপার। কিন্তু বিশাল ব্যয়বহুল এই এক্সপেরিমেন্টের জন্য বাজেট পাওয়া যাবে কি না সেটা ভেবে উনি একটু উদ্বিগ্ন। শেষে বললেন, “আমি আমার তরফ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো এই এক্সপেরিমেন্ট চালানোর জন্য, বাকী সরকারের সদিচ্ছা”। মহামান্য কোস্ত্রার অসাধ্য কিছুই নেই, উনার তরফ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টার আশ্বাস পাওয়া মানে শতভাগ নিশ্চয়তা। মৃদু হেসে সিরাস বললো, “মহামান্য কোস্ত্রা, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ”


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ সিরাজ ভ্রমন ০৩(শেষ)
→ সিরাজ ভ্রমন ০২
→ সিরাজ ভ্রমন ০১

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now