বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আজ খুব বেশি শীত লাগছে মতিন সাহেবের। বাসে বসে শীতে কাপছেন তিনি। অফিস থেকে বাসায় ফিরছেন। শরীরে গরম কাপড় নেই বললেই চলে। শীতের সাথে লড়াই করে শরীর উষ্ণ রাখার কাজটি একমাত্র মাফলারটিই করে যাচ্ছে। কিন্তু মাফলারটির মধ্যে দিয়ে সামান্য ছেঁড়া! আর সেই অংশটুকুই কানের পাশে এসে পড়েছে। ছেঁড়া স্থান দিয়ে হু হু করে বাতাস ঢুকছে। মতিন সাহেব যেই সিটে বসেছেন তার পাশের জানালার কাঁচটাও ভাঙ্গা! তাই বাতাসের পরিমাণও অতিরিক্ত। মাফলারটি খুলে আবার ভালভাবে পড়া উচিত, কিন্তু মতিন সাহেবের তা করতে ইচ্ছে করছে না। কারণ তার মন খারাপ। মন খারাপ থাকলে জরুরি কাজকেও তুচ্ছ মনে হয়।
.
(দুই)
.
মতিন সাহেব ২২০ টাকা খরচ করে একটি সোয়েটার কিনে ফেললেন। আগের বছরের সোয়েটার দিয়ে এই সিজনটা চালিয়ে দেয়ার ইচ্ছে থাকলেও শীতের বাড়াবাড়ি দেখে ভরসা পেলেন না মতিন সাহেব। তাই রাস্তার ধারে ভ্যান নিয়ে বসে থাকা লোকটির কাছ থেকে সোয়েটারটি কিনে ফেললেন।
.
বাড়ি যেতে রিকশার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু বরাবরের মতো এবারও একটা অজুহাত দাড় করিয়ে রিকশাভাড়া বাঁচিয়ে ফেললেন মতিন সাহেব। আজ শীত বেশি, রিকশায় উঠলে আরো বেশি শীত লাগবে। তাই হেটেই বাড়ির দিকে রওনা দিলেন মতিন সাহেব।
.
বাড়ির খুব কাছাকাছি পৌছে যাওয়ার পরে পেছন থেকে ডাক পড়লো মতিন সাহেবের। ডাক দিয়েছে আব্দুর রব, মুদী দোকানদার।
.
- কিহে মতিন ভাই, আজকে দেখি কথা না বলেই চলে যাচ্ছেন??
.
মতিন সাহেব লজ্জিত হলেন। প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার পথে আব্দুর রবের সাথে দু'চারটা কথা বলে তারপরই বাড়ি ফিরেন। আব্দুর রব তার কাছে কিছু বাকি টাকা পান। এখন হয়তো সে ভাববে তাকে ইচ্ছে করে এড়িয়ে যাচ্ছিলেন মতিন সাহেব। কিন্তু আসল ঘটনা হচ্ছে আজ মতিন সাহেবের মন খারাপ, পাশাপাশি চিন্তিতও। আব্দুর রবকে উত্তর দিলেন,
.
- ভাই, আজকে শরীরটা ক্লান্ত।
-- যান ভাই, বাসায় গিয়ে বিশ্রাম নেন।
.
(তিন)
.
মতিন সাহেব স্ত্রী আমেনাকে সোয়েটারটি দেখিয়ে বললেন,
.
- কেমন হয়েছে বলোতো?
-- ভালই তো। কত নিলো?
- তুমি বলোতো অনুমানে।
-- ৫০০ এর কম না।
- জ্বী না, মাত্র ২২০ টাকা।
.
মতিন সাহেব তৃপ্তির হাসি দিলেন। জিনিশটা হয়তো ভালই হয়েছে। তখনই তার মনে পড়লো এইবার আমেনাকে কোন শীতের কাপড় দেয়া হয়নি। আসলে শীতকাল আসলেই মতিন সাহেবের চিন্তা অনেক বেড়ে যায়। মতিন সাহেবের দুই মেয়ে, এক ছেলে। মেয়ে দুজনকেই বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সেই বিয়ে দেয়াই যেনো কাল হয়েছে। আজকাল মেয়ে বিয়ে দিলে তাদের জামাইকে প্রতিষ্ঠিত করে দিতে হয়, বর্তমান সমাজের এইটাই নিয়ম। দুই মেয়ের জামাইকে প্রতিষ্ঠিত করে দিতে মতিন সাহেবের ৫ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। টাকা জোগাড় করতে অফিস থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। সেই ঋণের কাটতিতে বেতনও কমে গিয়েছে।
.
সেইটাই যদি শেষ হতো তাহলেও হয়তো মতিন সাহেব খুশিমনে মেনে নিতেন। কিন্তু নানান উপলক্ষে যেই খরচটা তার হচ্ছে তা তিনি কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। যেমন, এবারের শীতেই দুই মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে শীতের কাপড় পাঠাতে হবে, শীতের পিঠা পাঠাতে হবে। বাড়ির সব সদস্যকে কাপড় দিতে হবে, তাও ভাল কাপড় হতে হবে। সবাই মিলে বসে বসে কাপড় দেখবে। একটু খুত পেলেই মেয়েকে খোঁটা দিবে।
.
এইসব সামাজিকতা মতিন সাহেব অপছন্দ করেন। কারণ সামর্থ্য তো থাকতে হবে। ধারদেনা করে, আধপেটা খেয়ে সামাজিকতা রক্ষা করা মতিন সাহেবের অপছন্দ। প্রতিবারই অসামাজিক হয়ে উঠার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে বসেন মতিন সাহেব। কিন্তু দুই মেয়ে যখন ফোন দিয়ে করুণ স্বরে সামাজিকতা রক্ষা করার তাগাদা দেয় তখন মতিন সাহেব তার প্রতিজ্ঞা ভুলে টাকা জোগাড় করতে নেমে পড়েন।
.
(চার)
.
আমেনা মাফলার সেলাই করে দিচ্ছে আর মতিন সাহেব পাশে বসে বসে দেখছেন। আমেনা বলল,
.
- এই ছেঁড়া মাফলার আর কত পড়বেন?
-- মাফলারটি ভাল। অনেক গরম।
- মামুনের একটা মাফলার আছে। পড়বেন?
-- ও পড়েনা?
- না। গত বছরের বলে আর হাত দেয়না।
-- দাওতো দেখি।
.
মাফলার হাতে নিয়ে মতিন সাহেব হতাশ হলেন। একে মাফলার বললে মাফলার জাতির অবমাননা করা হবে। বড়জোর স্টাইলের জন্য একে গলায় ঝোলানো যায়, এটি দিয়ে শীত মানানো কোনভাবেই সম্ভব হবেনা। মতিন সাহেবের চেহারার হাবভাব দেখেই আমেনা আবার মাফলার সেলাই করা শুরু করলেন।
.
তখন ছেলে মামুন ঘরে প্রবেশ করলো। সবার প্রথমে তার নজর পড়লো বাবার নতুন সোয়েটারের দিকে। বাবাকে বলল,
.
- আপনি এইবার নতুন সোয়েটার কিনলেন, আমাকে কিনে দিবেন না?
-- গতবছর না জ্যাকেট কিনে দিলাম!
- ওইটা পুরনো হয়ে গেছে। বন্ধুরা সব নতুন নতুন জ্যাকেট কিনছে। ওদের দেখলেই আমার লজ্জা লাগে। মার্কেটে একটা নতুন মডেলের জ্যাকেট দেখে এসেছি। ওইটা কিনে দেন আমাকে।
-- দাম কত??
- বেশি না। ৩,২০০ টাকা।
.
মতিন সাহেব চুপ করে রইলেন। মামুন চলে গেল। কিছুক্ষণ পড়ে আমেনা বলল,
.
- ছেলে শখ করেছে। কিনে দেন।
.
মতিন সাহেব কিছু বললেন না, শুধু দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। আমেনাও আর কিছু বলল না, কারণ তিনি এই দীর্ঘশ্বাসের মর্ম জানেন।
.
(পাচঁ)
.
মামুন আজ ব্যাপক খুশি। কারণ বন্ধুরা ওর মাফলারের প্রশংসা করেছে। প্রতি বছর নতুন নতুন না কিনলে কি চলে! গতবছর যেই মাফলার আর জ্যাকেট পড়ে ফেসবুকে ছবি আপলোড করেছে এইবার সেগুলো পড়ে আপলোড দিলে ইজ্জত চলে যাবে। পাবলিক ফকির ভাববে। বাবাকে বলা হয়ে গেছে। তিনি অবশ্যই কিনে দিবেন। বাবার কাছে চেয়েছে কিন্তু তিনি দেননি এমন কখনো হয়নি।
.
আসলে জ্যাকেটের দাম ২,২০০ টাকা। মামুন এক হাজার বেশি চেয়েছে, কারণ বন্ধুদের সাথে মিলে আগামীকাল শীতের পার্টি দিবে। বাবা কাল টাকাটা দিলেই হয়। নতুন জ্যাকেট পড়ে পার্টিতে গেলে ভাবই হবে অন্যরকম।
.
(ছয়)
.
- একটা কথা বলবো মতিন সাহেব। যদি কিছু মনে না করেন।
.
কথাটা বললেন মতিন সাহেবের বস শাহীন সাহেব। মতিন সাহেব বললেন,
.
- জ্বী স্যার বলেন।
-- আপনার কি শীত করেনা??
- স্যার, আমার শার্টের নিচে সোয়েটার আছে আর গলায় মাফলারও আছে। আমার শীতও কম লাগে।
-- এত শীতে এগুলো কিছুই না। আমার একটি পুরনো কোট আছে। আপনাকে দিবো, আপনি পড়বেন? যদি কিছু মনে না করেন।
- আপনি দিলে অবশ্যই নিবো। কিন্তু এই চাকরি করে কোট পড়লে মানানসই লাগে না।
-- কথাটা আপনি খারাপও বলেননি। আচ্ছা, আপনি এই টাকাটা রাখেন। আমি ব্যক্তিগত ভাবে আপনাকে খুবই পছন্দ করি এইজন্য দিলাম। কিছু মনে নিবেন না।
- না স্যার। অনেক ধন্যবাদ।
.
বসের কাছ থেকে ৫০০ টাকার নোটটি নিলেন মতিন সাহেব। না নেয়ারও কোন কারণ ছিলো না। আব্দুর রব তার কাছ থেকে কিছু টাকা পায়, দুই মেয়ের বাড়িতে শীত উপলক্ষে জিনিশপত্র পাঠিয়ে সামাজিকতা রক্ষা করতে হবে, ছেলের মন রক্ষা করতে টাকা দিতে হবে। মতিন সাহেবের টাকার দরকার, অনেক টাকা!
.
(সাত)
.
মতিন সাহেব ছেলেকে টাকাটা দিলেন। মামুন বলল,
.
- আপনি এমনভাবে টাকা দিচ্ছেন যেনো আমি জোর করে নিচ্ছি। হাসিমুখে দেন।
.
মতিন সাহেব হাসিমুখ করতে পারলেন না। টিভিতে নাটক দেখতে ভাল লাগে, বাস্তব জীবনে নাটক দেখতে ভাল লাগেনা। মামুন এমন নাটক প্রতিবারই করে। টাকা না দিলে খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেয়, দেরিতে বাড়ি ফেরে। আর টাকা নেয়ার সময় এইসব ডায়লগ দেয়। পাশের বাড়ির রহিমের ছেলে নাকি টিউশনি করে নিজের খরচ নিজে চালায়। বাবার কাছ থেকে কোন টাকা নেয়না। এমনকি মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ বিলও দিয়ে দেয়। মতিন সাহেবের কাছে এইসব ঘটনাকে রুপকথার গল্প মনে হয়।
.
মামুন জানিয়ে গেল সে রাতে বাসায় খাবে না। বাসায় ফিরবেও না। বন্ধুদের সাথে পার্টি দিবে।
.
মতিন সাহেব আমেনাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, চলো ছাদে চলো।
.
আমেনা মুচকি করে হাসলো। মতিন সাহেবের এমন কথার সাথে আমেনা পরিচিত। লোকটার ছাদে বসে থাকতে ভাল লাগে, কিন্তু পাশে অবশ্যই আমেনা থাকতে হবে। সমাজের নিষ্ঠুরতায় জর্জরিত লোকটির স্ত্রী-প্রীতি এক বিন্দুও কমেনি।
.
(আট)
.
ছাদে বসে আছে মতিন সাহেব ও আমেনা। আজ প্রচণ্ড শীত। শীতকালটা মতিন সাহেবের অনেক পছন্দ শীত সহ্য হয়না, তবুও শীতের সৌন্দর্য অনেক পছন্দ মতিন সাহেবের। নিরবতা ভাঙ্গিয়ে আমেনা বলল,
.
- গ্রামে শীতের জন্য কিছু পাঠাতে হবে। মনে আছেতো?
-- হু।
- টাকাপয়সা কিছু আছে আপনার কাছে?
-- যা আছে হবেনা। ধার করতে হবে।
- আমার কাছে কিছু আছে। ওগুলো নিয়েন, ধার করতে হবেনা।
.
প্রসঙ্গ পাল্টাতে মতিন সাহেব বললেন,
.
-- এইবার তোমার জন্য কোন কাপড়ও কেনা হয়নি।
- আমার দরকারও নেই। শাল দিয়েই আমার শীত মানিয়ে যায়। আমিতো তেমন ঘর থেকে বের হই না!
আপনি দেখি শীতে কাপছেন। চলেন ঘরে চলে যাই।
-- না।
- তাহলে আমার শালের নিচে আসেন।
-- হু।
.
মতিন সাহেব চিন্তিত। এবারের চিন্তা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়ে। বিয়ের এত বছর হয়ে গেছে কিন্তু আমেনাকে কখনো কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাননি মতিন সাহেব। কোনদিন আমেনা বায়না না করলেও আজকের "আমিতো তেমন ঘর থেকে বের হইনা" কথাটার মাধ্যমে নিজের আক্ষেপ হয়তো প্রকাশ করে ফেললো আমেনা। সেটা ভেবেই মন খারাপ যাচ্ছে মতিন সাহেবের। আমেনা বলল,
.
- আজ শৈত্যপ্রবাহ!
.
মতিন সাহেবের ছোট্ট উত্তর, হু!
.
হু ছোট্ট শব্দ হলেও মতিন সাহেবের একটি হু মানে একটি ইতিহাস!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now