বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শ্রীমঙ্গলের একবারে শেষ প্রান্তে, ত্রিপুরা সীমান্তের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে কালানাগি চা-বাগান। সাধারণ পর্যটকরা যেখানে গিয়ে ছবি তোলে, এটা তার থেকেও অনেক গভীরে। সেখানে চারপাশটা এত ঘন আর থমথমে যে ভরদুপুরেও সূর্যের আলো মাটির ছোঁয়া পায় না। এই বাগানের ১২ নম্বর সেকশনের একেবারে শেষ মাথায় একটা পরিত্যক্ত পুরোনো বাংলো আছে, যাকে স্থানীয় চা-শ্রমিকেরা ডাকে ‘সাহেবকুঠি’।
এই গল্পটা তিন বন্ধুর—রাশেদ, শাওন আর অন্তু। ঢাকার ধুলোবালি আর যান্ত্রিক জীবন থেকে বাঁচতে তারা ক্যাম্পিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে। রাশেদ একটু সাহসী আর যুক্তিবাদী, শাওন ভীতু প্রকৃতির কিন্তু কৌতূহলী, আর অন্তু হলো সেই দলের মানুষ যে সবেতেই একটু রোমাঞ্চ খোঁজে।
⚪ সন্ধ্যার আগমন ও গা-ছমছমে পরিবেশ-
তখন বিকেল ফুরিয়ে সাঁঝের আলো সবে নামছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকটা কেমন যেন কানফাটানো চিৎকারের মতো শোনাল। গাইড হরিপদ বাবু তাদের কুঠির কাছাকাছি এনে হাতজোড় করে বলল,
"দাদাবাবু, এইহানেই আলো থাকতে থাকতে তাবু খাটাও। এর বেশি আগে বাড়ন যাইব না। আইজ অমাবস্যা। রাইত বিরাইতে এই ১২ নম্বর সেকশনে 'হাওয়ার ছা' (অপদেবতা) নামে। বাতাসে কাঁচা রক্তের গন্ধ পাইলে কিন্তু রক্ষে নাই!"
রাশেদ হেসেই উড়িয়ে দিল, "আরে হরিপদ দা, এই যুগে ভূত-প্রেত বলে কিছু নেই। আপনি টাকাটা রাখুন, আর কাল সকালে এসে আমাদের নিয়ে যাবেন।"
হরিপদ বাবু আর একটা কথাও বলল না। শূন্য চোখে একবার বাংলোটার দিকে তাকিয়ে হনহন করে উল্টো পথে হেঁটে চলে গেল। অল্প সময়ের মধ্যেই চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল। জঙ্গল থেকে ভেসে আসতে লাগল নিশাচর পাখিদের অদ্ভুত সব ডাক।
⚪ মধ্যরাতের বিভীষিকা-
রাত তখন আনুমানিক বারোটা। কুয়াশার একটা চাদর চারপাশটা ঢেকে ফেলেছে। তাবু থেকে ফুট দশেক দূরে একটা মরা জোনাকিও জ্বলছে না। হঠাৎ করেই চারপাশের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক এক নিমেষে বন্ধ হয়ে গেল। চারদিক একদম ঝাঁ-ঝাঁ করতে লাগল।
শাওন হঠাৎ ধড়ফড় করে উঠে বসল। তার কপালে তখন বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে রাশেদের হাতটা খপ করে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল, "রাশেদ... একটু শুনবি? বাংলোটার ভেতর থেকে কেমন যেন শব্দ আসছে।"
রাশেদ আর অন্তুও জেগে গেল। কান পাততেই তাদের বুকের ভেতরটা দড়াম করে উঠল। পরিত্যক্ত, ভাঙা বাংলোটার ভেতর থেকে ভেসে আসছে কাঠের মেঝেতে বুটের খটখট শব্দ। আর তার সাথে মিশে আছে একটা খসখসে, অতিপ্রাকৃতিক কণ্ঠের বিলাপ। কেউ একজন ভাঙা ভাঙা বাংলায়, অথচ সাহেবদের টানে ডুকরে ডুকরে কাঁদছে আর বলছে:
"উইলিয়াম... তুমি আমারে ছাইড়া গেলা... এই চরের মাটিতে আমার হাড়গোড় পইড়া রইল..."
ভাষাটায় যেন এক অদ্ভুত, আদিম গ্রামীণ সুর, অথচ গলার আওয়াজটা মানুষের নয়—একেবারে অতিপ্রাকৃতিক, ফাঁপা এবং হিমশীতল।
অন্তু সাহস দেখানোর জন্য টর্চটা জ্বালাতেই সেটার আলো দপ করে নিভে গেল। এই ঘন অন্ধকারে তারা টের পেল, কুঠির চারপাশের বাতাসটা হঠাৎ করেই ভীষণ ভারী আর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে। সেই ঠান্ডায় নিঃশ্বাস ফেলাও কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল।
হঠাৎ করেই তাবুর কাপড়ের গায়ে বাইরে থেকে একটা হাতের ছাপ ভেসে উঠল। না, মানুষের হাত নয়। সেই হাতের আঙুলগুলো অস্বাভাবিক লম্বা, আর নখগুলো তীরের মতো সূক্ষ্ম।
শাওনের গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোচ্ছিল না, সে কেবল ‘হাঁ’ করে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দুটো ভয়ে কোটর থেকে ঠিকরে বেরোনোর উপক্রম। অন্তু আর রাশেদ একে অপরের হাত জড়িয়ে ধরে থরথর করে কাঁপতে লাগল। তাদের মনে হচ্ছিল, শরীরের সমস্ত রক্ত যেন এক মুহূর্তে জমাট বেঁধে বরফ হয়ে গেছে। একেই বলে খাঁটি বাঙালি ভয়—যেখানে শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমস্রোত নেমে যায় এবং মুখ দিয়ে ‘আল্লাহ’ বা ‘ভগবান’ ছাড়া আর কোনো শব্দ বের হয় না।
বাইরে থেকে এবার স্পষ্ট একটা নাকের ফোঁসফোঁসানি শব্দ শোনা গেল, ঠিক যেন কোনো হিংস্র পশু শিকারের গন্ধ শুঁকছে। সাথে সাথে বাতাসে ভেসে এল তীব্র পচা রক্তের আর বাসি চামড়ার গন্ধ।
বাংলোর ভেতর থেকে সেই বুট জুতো পরা ছায়াটা এবার ধীরে ধীরে তাবুর দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। প্রতিটা পদক্ষেপের সাথে সাথে মাটিতে শুকনো পাতা মচকে যাওয়ার শব্দ হচ্ছিল—কড়াত, কড়াত!
রাশেদ কোনোমতে তার পকেট থেকে দিয়াশলাই বের করে একটা কাঠি জ্বালাতেই দেখল, তাবুর ঠিক বাইরে একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখটা মানুষের মতো নয়, চামড়াগুলো ঝুলে পড়েছে, আর চোখ দুটো জ্বলন্ত কয়লার মতো লাল।
সত্তাটি তাবুর কাপড়ে মুখ ঠেকিয়ে এক্কেবারে খাঁটি গ্রামীণ বাংলায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলল:
"শহরের বাবুরা আইছত? আমারে একটু রক্ত দিবি? বড় তিয়াস (তৃষ্ণা) লাগছে রে..."
সেই কর্কশ এবং পৈশাচিক আওয়াজ শুনে শাওন গোঙানি দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। রাশেদ আর অন্তু আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। ভয় যখন চরমসীমায় পৌঁছায়, তখন মানুষের ভেতর এক আদিম বেঁচে থাকার শক্তি জাগ্রত হয়। তারা তাবু ছিঁড়ে, শাওনকে চ্যাংদোলা করে ধরে অন্ধের মতো দৌড়াতে শুরু করল।
পেছনে তখন সেই পৈশাচিক হাসির শব্দ—"হাঃ হাঃ হাঃ! পালাইবি কই? এই তল্লাট তো আমার!"
গাছের ডালপালা তাদের মুখ-হাত কেটে রক্তারক্তি করে দিল, কিন্তু তারা থামল না। কতবার আছাড় খেল, কতবার কাদার মধ্যে পড়ে গেল, তার কোনো হিসাব নেই। কেবল পেছনের সেই হাড় কাঁপানো ঠান্ডা হাওয়া আর পায়ের আওয়াজটা তাদের তাড়া করে বেড়াতে লাগল।
⚪ শেষ পরিণতি-
পরদিন সকালে যখন স্থানীয় চা-শ্রমিকেরা বাগানে কাজে যাচ্ছিল, তারা মেইন রোডের কালভার্টের ওপর তিন যুবককে রক্তাক্ত এবং অর্ধচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে।
তাদের উদ্ধার করে যখন জ্ঞান ফেরানো হলো, রাশেদ কিংবা অন্তু কেউই আর একটা কথাও বলতে পারল না। তাদের চোখ দুটো তখনো অপলক, ভয়ে পাথর হয়ে গেছে। আর শাওন? শাওন শুধু ফ্যালফ্যাল করে বাগানের ভেতরের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করতে লাগল—"বড় তিয়াস... বড় তিয়াস..."
কালানাগি চা-বাগানের সেই ১২ নম্বর সেকশনে আজও পূর্ণিমা বা অমাবস্যার রাতে কোনো মানুষ একা যাওয়ার সাহস পায় না। কারণ স্থানীয়রা জানে, ওখানে গেলে আজও সেই মেমসাহেবের অতৃপ্ত আত্মা আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা জীবন্ত মানুষের রক্তের গন্ধ খুঁজে বেড়ায়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now