বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রিটার্ন অব ড্রাকুলা
কাহিনী : ফ্রেডা ওয়ারিংটন
অনুবাদক : ইসমাইল আরমান
-------------------------------------
পর্ব ০৮ঃ
( আন্দ্রে কোভাক্সের জার্নাল....)
১২ আগস্ট, সকাল।।
সূর্যোদয়ের সময় এক অপূর্ব দৃশ্য দেখলাম এখানে। কুয়াশায়
ঢেকে থাকা পাহাড়চূড়াগুলো যেন হেসে উঠল, সূর্যের
প্রথম কিরণে, ছায়ায় ঢেকে দিল ঝোপঝাড় আর
গাছপালায় ছাওয়া পাহাড়ি ঢাল'টাকে। সেই ছায়া
গিয়ে মিশল নীচের গভীর উপত্যকায়। ছবি আঁকতে জানলে
আলো - ছায়ার এই খেলাকে নিজের ক্যানভাসে বন্দি
করে রাখতাম। এমিল থাকলে তাই-ই করত।
আমরা এখন অনেকটা ওপরে উঠে এসেছি। কাব্যের ভাষায়
বলা যেতে পারে - সভ্যতাকে পেছনে ফেলে ঠাঁই
নিয়েছি পৃথিবীর ছাদে। এখানে উঠে আসার পথে চোখ
কান খোলা রেখেছি, মিকোলাসকেও বলেছি একই কাজ
করতে। পুরনো কোনও ট্র্যাক থাকলে তার সন্ধান পেতে
চেয়েছি। বলা বাহুল্য, এখনও তেমন কিছু দেখতে পাইনি।
ব্রেকফাস্টের সময় হয়ে গেছে। নাস্তা সেরে আবার পথে
নামব আমরা।
।। ১৩ আগস্ট।।
আরেকটা নিষ্ফল দিন কাটল। খাড়া, রুক্ষ পাহাড়ি ঢাল
পেয়েছি আমরা; তছনছ করেছি ঘন অরন্য...থেমেছি শক্তি
ফুরিয়ে আসার পরে। মাথাই এখন আর কাজ করছে না।
দেখি, ভালমতো একটা ঘুম দিতে পারলে হয়তো বা ঠিক
হয়ে আসবে চিন্তাভাবনা।
উঁচু একটা ক্লিফের তলায় আজ ক্যাম্প করেছি আমরা।
রাতটাকে মনে হচ্ছে অন্যান্য রাতের তুলনায় অনেক
বেশি অন্ধকার। অগ্নিকুণ্ড জ্বেলে রেখেছি, কিন্তু
তাতে দূর হয়নি আলোর অভাব। মিকোলাস ইতিমধ্যে
ঘুমিয়ে পড়েছে, আমিও প্রস্তুতি নিচ্ছি ঘুমোবার।
বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে। দূর থেকে ভেসে আসছে বুনো
নেকড়ের ক্রমাগত বিলাপ। ভৌতিক পরিবেশ। আশপাশের
জঙ্গল যেন আমাদের শত্রু। দিক - টিক ঠিক রাখা দায়। গত
দু'দিনে একই জায়গায় ঘুরে মরেছি কিনা, বোঝা দুঃসাধ্য।
শেষ পর্যন্ত পথ হারালেও অবাক হবার কিছু নেই।
ছি, ছি, এসব কি ভাবছি আমি? মনের দূর্বলতা ছাড়া কিছুই
নয় এটা। পরিবেশ পরিস্থিতির বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয় লোকজনের কুসংস্কার আর ভয় ভীতি কেন বাসা
বেঁধেছে, তা বুঝতে পারছি এবার। না, এসব নিয়ে আর
ভাবব না।
।। ১৪ আগস্ট।।
তল্লাশির এলাকা বড় করে নিয়েছি আজ, এগোচ্ছি
পশ্চিমদিকের একসারি পাহাড় লক্ষ্য করে। ওগুলোকে
দেখে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছে মনে। পাথরে গড়া
ভীমদর্শন এক একেকটা চূড়া, জঙ্গলের মাঝ দিয়ে
দূর্গপ্রাচীরের মতো মাথা তুলে রেখেছে। দূর্গম পথ।
গভীর একটা গিরিখাতে নেমে এগোবার রাস্তা খুঁজেছি
আমরা, চেষ্টা করছি একপাশ দিয়ে পাহাড়সারিকে
অতিক্রম করতে, কিন্তু সফল হইনি। হরিণের পায়ের ছাপ
অনুসরণ করে কয়েক দফা এগিয়েছি, কিন্তু পথের অবস্থা
দেখে প্রতিবারই উলটো পথে ঘুরতে হয়েছে। ফিরে
আসতে হয়েছে গিরিখাতে। ম্যাপটা কোনও কাজে
আসছে না, মিকোলাসও বেশ বিরক্ত হয়ে পড়েছে, কিন্তু
হাল ছাড়ছি না আমি। কেন যেন মনে হচ্ছে পাহাড়সারির
ওপাশে রয়েছে আমাদের পরম আরাধ্য সেই গন্তব্য।
যেভাবে হোক, আমাদের যেতেই হবে ওপাশে। যত বাধা
পাচ্ছি, তত জেদ চেপে যাচ্ছে আমার মধ্যে।
মিকোলাসকে দেখে মনে হচ্ছে যেন বেদনা বা
আতঙ্কের
মধ্যে আছে। ওর সেই হাসিখুশী ভাব মিলিয়ে গেছে।
বেশীরভাগ সময় চুপচাপ রয়েছে, কিছু যেন ভাবছে গম্ভীর
হয়ে। কিছু জিজ্ঞেস করলেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ছে। হাঁটার
সময় পেছনে ওর বিড়বিড়ানি শুনেছি। কি বলছিল বুঝতে
পারিনি, তবে কয়েক দফা ' ড্রাগন ' শব্দটা কানে এসেছে।
বলতে দ্বিধা নেই, বেশ বিরক্ত হয়েছি ওর বিড়বিড়ানি
শুনে। উলটো একবার বলেছিলামও সে কথা, কিন্তু
ব্যাপারটা সরাসরি অস্বীকার করল ও। বলল, মুখই নাকি
খোলেনি!
।। ১৫ আগস্ট।।
আজ আমরা পাহাড়সারি অতিক্রম করেছি। ঈশ্বর, এখনো
হাত কাঁপছে আমার, কলম ধরে রাখাই কষ্টসাধ্য। বন্ধু ভ্যান
হেলসিং, আশা করি আমার এই কাঁপা কাঁপা হাতের
লেখা তুমি পড়তে পারবে। কারণ, এখুনি আজকের ঘটনা
লিখতে বসেছি আমি।
আজ ভোরবেলায় গিরিখাত থেকে বেরিয়ে আসি আমরা,
কয়েকবারের চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত খুঁজে পাই পাহাড়
টপকানোর কঠিন এক রাস্তা। চূড়ায় পৌঁছনোর পর দেখি
নীচে মাঝারি আকারের এক উপত্যকা - ঘন অরণ্যে
ছাওয়া ; সেটাকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে
পাহাড়ি প্রাচীর। রীতিমতো সুরক্ষিত একটা জায়গা।
স্কলোম্যান্সে'র জন্য একেবারে আদর্শ অবস্থান বলে
মনে হলো উপত্যকাটিকে, যদিও গাছগাছালির প্রাচুর্যের
জন্য কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কথাটা বলার জন্য
মিকোলাসের দিকে ফিরলাম, থমকে গেলাম ওর
চেহারায় চাপা আতঙ্ক দেখে।
" ও....ওখানে কি নামতে হবে আমাদেরকে?" ভয়ার্ত গলায়
জিজ্ঞেস করল আমার ছাত্রটি।
" তা তো বটেই", ভ্রু কুঁচকে বললাম, " মিকোলাস....কি
হয়েছে?"
" কিছু না স্যার", তাড়াতাড়ি বলল মিকোলাস।
বললাম, " তোমায় ক্লান্ত দেখাচ্ছে। যদি চাও তো ক্যাম্প
করে পাহাড়ের ওপরেই থেকে যেতে পারো। উপত্যকায়
তল্লাশি আমি একা চালাতে পারব"।
" না স্যার", বলল মিকোলাস, " আপনাকে একা যেতে দেব
না আমি"।
ওর কন্ঠের আতঙ্ক আমাকেও স্পর্শ করল। বিরক্ত হলাম
নিজের ওপর। এভাবে ভয় পাওয়া সাজে না আমার।
নিঃশব্দে পাহাড়ি ঢাল ধরে নামতে শুরু করলাম দুজনে।
খুব শীঘ্রই ঘন অরণ্য ঘিরে ধরল আমাদের। চারদিকে
থমথমে নীরবতা, আমাদের পায়ের আওয়াজ ছাড়া আর
কোথাও কোনও শব্দ নেই। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর
হঠাৎ গাছের ফাঁকে আলোর আভা দেখতে পেলাম। পা
চালালাম দ্রুত,একটু পরেই জঙ্গল ভেদ করে ছোট একটা
হ্রদের ধারে এসে পড়লাম। হ্রদ'টিকে ওপর থেকে দেখা
যায় নি। অদ্ভুত এক উত্তেজনা অনুভব করলাম জলাশয়টির
দিকে তাকিয়ে। হ্রদের পানির রঙ নীলচে সবুজ। হ্রদটা
চওড়ায় বড়জোর একশো ফুট হলেও পানিটা মনে হচ্ছে যেন
অতল গভীর। চারদিকে সবুজ বনানী, তার পেছনে উঁকি
দিচ্ছে পাহাড়ি প্রাচীর। পানির সোঁদা গন্ধ আর পাইনের
সুবাসে ভরে আছে বাতাস।সবকিছু স্থির..... নড়ছে কেবল
হ্রদের উপরিভাগে পাক খেতে থাকা কুয়াশা। কেঁপে
উঠলাম আমি।
" এটা নিশ্চয়ই সেই জায়গা", মিকোলাসের বাহু ধরে ফিসফিসিয়ে
উঠলাম আমি, " এই হ্রদটাই খুঁজছি আমরা - যার নাম ' ইয়াডু ড্রাকুলুজ'....
মানে 'ড্রাগনের পানপাত্র '। এর আরেকটা অর্থ আছে, '
শয়তানের জলাশয় '। স্কলোম্যান্স যদি থেকে থাকে, কাছাকাছিই
আছে!" ভয়ার্ত দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাল মিকোলাস। আতঙ্কের
ছাপ আরও প্রকট হয়েছে ওর চেহারায়। সেটা না দেখার ভান
করে আমি বলে চললাম, " স্থানীয় লোকজনের ধারণা, এই
হ্রদের পানি উঠে এসেছে পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল
থেকে.....এর তলায় নাকি একটা ড্রাগন ঘুমোচ্ছে, নরকের দরজা
পাহারা দিচ্ছে সে। হ্রদের পানিতে পাথর ছুঁড়লে ঘুম ভাঙবে
ড্রাগনের, জেগে উঠে প্রলয় ঘটিয়ে দেবে!" কথা শেষ
করে একটা পাথর কুড়িয়ে নিলাম, এগোলাম ওটা পানিতে ছুঁড়বার
জন্য। খপ করে আমার কবজি ধরে ফেলল মিকোলাস।
চেঁচিয়ে বলল, " না, স্যার! ছুঁড়বেন না ওটা!" পাহাড়ের গায়ে গায়ে
বাড়ি খেয়ে প্রতিধ্বনি তুলল ওর কন্ঠ। একটু খারাপই লাগল ওর জন্য।
ক্ষুব্ধও হলাম নিজের ওপর। ছেলেটা ভয় পাচ্ছে, আর আমি কিনা
ওকে স্বান্তনা না দিয়ে ভয় আরও বাড়িয়ে চলেছি? পাথরটা
ফেলে দিলাম হাত থেকে। শান্ত গলায় বললাম, " মিকোলাস,
অযথাই ভয় পাচ্ছ। শুনে খুশি হবে, আমাদের অভিযান প্রায় শেষ।
আজ আমরা এই উপত্যকায় তল্লাশি চালাব, কিছু পাই না পাই, আগামীকাল
রওনা হব বাড়ির পথে। ঠিক আছে?"
মাথা ঝাঁকাল মিকোলাস, স্বস্তি ফুটল ওর চেহারায়। বলল, " কিছু মনে
করবেন না স্যার। কি যে হয়েছে আমার, নিজেও বুঝতে পারছি
না। এখানে আসার সঙ্গে সঙ্গে এমন এক ভয় পেয়ে বসল..."
" ও কিছু না", বললাম আমি, " মনকে শক্ত করো, সব ঠিক হয়ে
যাবে"।
দিনভর পুরো উপত্যকা আর পাহাড়ি ঢালে তল্লাশি চালালাম আমরা, কিন্তু
এমন কোনও নিদর্শন পেলাম না, যা থেকে মনে হতে পারে,
এখানে কোনওকালে কোনও ধরনের স্থাপনা ছিল। যখন সন্ধ্যা
নামল, তখন দুজনেই ক্লান্ত; হতাশ হয়ে আবার ফিরে এলাম সেই
হ্রদের ধারে। " একটা কথা ঠিক", বললাম আমি, " এইসব
স্কলোম্যান্সের ধারণা গল্পকথা হলেও হতে পারে। কিন্তু যে
কোন গল্প বা কুসংস্কারের পেছনে একটা সত্য থাকে। সেটা
কেন খুঁজে পাচ্ছি না, সেটাই বুঝতে পারছি না।" " ধ্যাত! " সখেদে
বলল মিকোলাস, " কোনও মানে হয় না এসবের। এখানে
শয়তানও নেই, ড্রাগনও নেই। খামোখাই ভয় পেয়েছি আমি!"
বলতে বলতে হাতে নুড়িপাথর নিয়ে খেলছিল ও, বিরক্তির বশে
ওটা ছুঁড়ে মারল হ্রদের পানিতে।
টুপ করে পানিতে পড়ল পাথরটা। নিস্তরঙ্গ হ্রদের বুকে সৃষ্টি
হলো ছোট ছোট ঢেউয়ের। আর তখুনি দূর থেকে
ভেসে এল একটা কেমন গুমগুম আওয়াজ! চমকে উঠে
আকাশের দিকে তাকালাম, পরক্ষণেই বুঝতে পেরে হেসে
ফেললাম। মেঘ ডাকছে, বৃষ্টিবাদল হবে বোধহয়। অযথাই
চমকে উঠেছি।
" এসো, ক্যাম্প করি আজ রাতের মতো ", মিকোলাসকে
বললাম, " কাল সকালে ফিরে যাব এখান থেকে"। হ্রদের ধারে
আমরা অগ্নিকুণ্ড জ্বালতে না জ্বালতেই নেমে এল নিকষ
অন্ধকার, শোঁ শোঁ করে বইতে শুরু করল হিমেল হাওয়া। কড়
কড় কড়াৎ করে বাজ পড়ল কোথাও, আকাশ হয়ে উঠল
আলোকিত। উপরদিকে চোখ তুলতেই আকাশে ঘন কালো
মেঘ পাক খেতে দেখলাম। ক্ষণেক্ষণে বিজলি চমকাচ্ছে
মেঘের ঘর্ষণে। শুরু হলো অবিরাম বজ্রপাত, সেই আওয়াজে
কানে তালা লেগে যাবার জোগাড়।
দু'হাতে কান চেপে ধরে মাটিতে শুয়ে পড়লাম আমি আর
মিকোলাস। তারপরই শুরু হলো প্রলয়ঙ্করী ঝড়। ঝমঝম করে
বৃষ্টি নামল। বিদ্যুৎচমক আর বজ্রনিনাদে চোখ আর কান - দুইয়েরই
ঝালাপালা হবার যোগাড়। হ্রদের পানি দেখে মনে হলো যেন
টাইফুন সৃষ্টি হয়েছে, শরীরের নীচে মাটি কাঁপছে
ভূমিকম্পের মতো। আমাদের অগ্নিকুণ্ড নিভে গেছে বৃষ্টির
প্রথম ঝাপটাতেই। বুঝলাম, খোলা জায়গায় এইমূহুর্তে নিরাপদ নয়।
তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে গোছাতে শুরু করলাম জিনিসপত্র।
মিকোলাসকে ডাকতে গিয়ে দেখি, ঊর্ধশ্বাসে ও ততক্ষণে
ছুট লাগিয়েছে বনের দিকে। আমার চেঁচান যেন শুনতেই
পেল না। নিজের ন্যাপস্যাকটা পিঠে ঝুলিয়ে আমিও ছুটলাম ওর পিছু
পিছু। মিকোলাসকে ধাওয়া করে উপত্যকার সীমানা পর্যন্ত চলে
গেলাম আমি। আর তখনিই বিদ্যুৎচমকের আলোয় চোখে পড়ল
ঢালের গায়ে হাঁ করে আছে একটা প্রকাণ্ড গুহা - তল্লাশির সময়
কিভাবে যেন মিস করেছি ওটা। মিকোলাসকে কিছু বলার
প্রয়োজন মনে করলাম না। দেখি, ও সেই গুহার দিকেই ছুটছে।
আমিও সেদিকেই ছুটলাম।
ক্রমশ
অশুভ আত্মা
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now