বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"রহস্যময় সেই বাড়িটা"
আবুল ফাতাহ মুন্না
--------------------
(পর্ব-৪)
রহস্যের খোঁজে
স্কুলের পুরোটা সময়ই উত্তেজনায় কেটেছে আমাদের তিনজনের।কারণ,ঠিক হয়েছে স্কুল শেষ করেই আমরা আহসান সাহবের বাসায় যাব।
ছুটির ঘন্টা পড়ার সাথে সাথেই আমরা বের হয়ে এলাম।দেরী করা যাবেনা।
স্কুলের গেট দিয়ে বের হব এমন সময় মুহিত পেছন থেকে আমাদের ডাক দিল।‘কী রে খেলতে যাবিনা তোরা আজ?’
‘না আমরা গোয়েন্দাগিরি করতে যাচ্ছি...আউ!’পায়ে ফরহাদের লাথি খেয়ে থেমে গেলাম আমি।তবে ততক্ষণে সর্বনাশ যা হবার হয়ে গেছে।
মুহিত ভ্রু কুঁচকে বলল,‘কী করতে যাচ্ছিস?’
‘আমরা ‘গোদাগাড়ি’ যাচ্ছি!তাড়াতাড়ি করে বলে উঠল ফরহাদ।
‘গোদাগাড়ি?এইটা আবার কী জিনিস?’
‘একটা জায়গার নাম।পিকুলের মামা বাড়ি।আমরা তিনজন বেড়াতে যাচ্ছি সেখানে।’
‘আমি তো জানি পিকুলের কোনও মামা নেই।’
‘আমিও তো সেটাই জানতাম এতদিন!’আমার পাশ থেকে পিকুল ফিসফিস করে বলে উঠল।
‘আপন মামা হতে হবে সেটা কে বলেছে?এটা ওর দুঃসম্পর্কের মামা।তাইনারে পিকুল?’
‘অ্যা...হ্যাঁ,হ্যাঁ।অবশ্যই নকল মামা!’
আমরা আর সেখানে দাড়ালাম না।মুহিতকে ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়ে দিয়ে তড়িঘড়ি করে স্থান ত্যাগ করলাম।
‘তোকে আগ বাড়িয়ে কে কথা বলতে বলেছে?’একটু দূরে এসে ফুঁসে উঠল ফরহাদ।
‘কেন সমস্যা কী?আমরা যে গোয়েন্দা এটা সবাইকে জানানো দরকার না?’
‘বুদ্ধু,সবাই যদি জেনে ফেলে আমরা গোয়েন্দা তাহলে আমরা কাজ করব কিভাবে।সবাই আমাদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকবেনা?বলবে ওই দেখ,বিখ্যাত গোয়েন্দা মির্জা ফরহাদ যায়!’
‘শুধু তোর একার নাম বলতে যাবে কেন?আমরা কী দোষ করলাম?’
‘আমাদের সবার নামই বলবে।এখন প্যাঁচাল না পেড়ে চল।এমনিতেই দেরী হয়ে গেছে।’তাড়া দিল ফরহাদ।
আমরা পা বাড়ালাম আহসান সাহেবদের বাড়ির উদ্দেশ্যে।স্কুল থেকে পাঁচ সাত মিনিট লাগে উনাদের বাড়িতে যেতে।
কিছুক্ষণ পরই আমরা বাঁশঝাড়ে চলে এলাম।জায়গাটা ভরা দুপুরেও অন্ধকার অন্ধকার থাকে।আর এখন তো পড়ন্ত বিকেল।আলো আঁধারিটা আরো বেশি করে খেলা করছে।তারউপর এখানে বাড়িঘর এবং মানুষজন কম থাকায় গা ছম ছমে একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
তিনজনের দলটার মধ্যে আমি আগে আগে ছিলাম।বাঁশঝাড়ে ঢোকার সাথে সাথেই আমি পিছিয়ে এলাম।ফরহাদকে বললাম,‘যা বলার সব কিন্তু তুই বলবি।’
ফরহাদ কিছু না বলে চুপচাপ হাঁটতে লাগল।
আমরা আহসান সাহেবদের বাড়ির সামনে এসে দাড়ালাম।বাড়িটা একতলা।ছোট খাটো ছিমছাম বাসা।রংটাও কেমন অদ্ভুত যেন।নীল রং।চারপাশের গাছগাছালির গাঢ় সবুজের মধ্যে নীল রংটা যেন ঠিক মানায়নি।বাড়ির চারপাশটা ছ’ফুট উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা।দেয়ালের উপরে অবশ্য কাঁটাতার দেয়া নেই।তবে আসল কথা হল,দেয়ালটা না থাকলেও চলত।এই এলাকার কোনো চোরের বোধহয় সাহস নেই এই বাড়ি থেকে কিছু চুরি করে।
আমরা গেটের সামনে চলে এলাম।গেটটা ধরে আস্তে করে ঠেলা দিতেই মৃদু আওয়াজ করে খুলে গেল।আমরা দুরুদুর বুকে ঢুকে পড়লাম গেট পেরিয়ে।
ভেতরে ছোট্ট একটা বাগান করা হয়েছে।তেমন সমৃদ্ধ না হলেও বাগানটা বাড়ির সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকাংশে।গেট থেকে বাসা পর্যন্ত যেতে ইট বিছিয়ে একটা রাস্তা তৈরি করা হয়েছে।রাস্তার দুপাশেই বাগান।আমরা রাস্তা দিয়ে হেঁটে চললাম।
‘কী বলবি ভেবেছিস কিছু?’পিকুল বলল ফরহাদের উদ্দেশ্যে।
‘চল তো আগে,এরপর অবস্থা বুঝে ব্যাবস্থা।’
বাসার সামনের পিচ্চি বারান্দায় উঠে পড়লাম।দরজার সামনেই কলিং বেল লাগানো আছে।আমি ফিস ফিস করে বললাম,‘কলিংবেলে চাপ দে।’
‘ফিস ফিস করছিস কেন?আমরা কি চুরি করতে এসেছি?’বলে কলিংবেলে দিকে হাত বাড়ালো ফরহাদ।
হঠাত করেই আমার পালস রেট বেড়ে গেল।
দুবার কলিংবেল চাপতেই দরজাটা খুলে গেল।দরজার ফাঁকে আহসান সাহেবের মুখ দেখা গেল।
আহসান সাহেবের বয়স আন্দাজ পঞ্চাশের মত।মাথার চুল কমে গিয়ে কপালের প্রশস্ততা বেড়ে গেছে বেশ খানিকটা।চোখে একটা চশমা।পরনে পাজামা আর গেঞ্জী।আমাদের দিকে সন্দেহ ভরা চোখে তাকিয়ে বললেন,‘কী চাই ?’
‘জী,আমরা আপনার প্রতিবেশী।এইতো পাশেই আমাদের বাসা।’
‘ভালকথা,তা এখানে কী করতে এসেছ?’
বাবারে কী চাছাছোলা কথা!প্রতিবেশী বেড়াতে এলে কেউ এভাবে কথা বলতে পারে বলে আমার ধারণা ছিলনা।ফরহাদেরও বোধহয় ছিলনা।বেচারা কেমন থতমত খেয়ে গেল।ও হয়ত ধারণা করেছিল,প্রতিবেশীর কথা শুনলেই আহসান সাহেব আমাদের ভেতরে ডেকে নিয়ে গিয়ে চা নাস্তা খাওয়াবে!
ফরহাদ সামলে নিয়ে বলল,‘ইয়ে মানে,স্যার,আগামীকাল আমার জন্মদিন।তাই প্রতিবেশীদের দাওয়াত করতে এসেছি।’
এ বয়সী লোকজন ‘স্যার’ শব্দটা শুনতে পছন্দ করেন।‘স্যার’ সম্বোধন করেই অনেক কাজ হাসিল করা যায়।তবে আহসান সাহেব বোধহয় করেননা।তার চেহারায় কোনও পরিবর্তন এলোনা।তিনি শুকনো মুখে জবাব দিলেন,‘ধন্যবাদ,তবে আমরা কোথাও যাইনা।’
‘তাহলে আপনার ছেলে-মেয়েকে যদি পাঠাতেন তাহলে খুব মজা হত।’
‘কতদিন ধরে থাক এখানে?’জানতে চাইলেন আহসান সাহেব।
‘জী,আমার জন্মই এখানে।’
‘এতদিন ধরে এখানে থাক আর এতদিনেও জানোনা যে আমার কোনও সন্তান নেই?’
‘সরি,স্যার।জানতাম না।কিভাবে জানব বলুন?আপনি তো বাইরে তেমন একটা বের হননা।’
‘তোমাদের কথা শেষ হয়েছে?তাহলে এখন যাও,আমার কাজ আছে।’আমাদের তাড়াতে পারলে যেন ভদ্রলোক খানিকটা শান্তি পান।
‘কথা শেষ।তবে আপনি কাল এলে আমরা খুব খুশি হতাম।’
‘ধন্যবাদ,’বলতে বলতে দরজা লাগিয়ে দিল আহসান সাহেব।’
আমরা নেমে এলাম বারান্দা থেকে।বাড়ির সীমানা পেরিয়ে আসতেই পিকুল বলল,‘বাপরে,কী লোক একটা!এভাবে কেউ মেহমানের সাথে কথা বলে?এইলোকটা তার মেহমানকে বলি দিলেও আমি বিন্দুমাত্র অবাক হবনা!!’
‘তারমানে আজ রাতের অভিযান ক্যান্সেল।’আমি খুশি খুশি গলায় বললাম।
‘সেটাই তো মনে হচ্ছে।যেহেতু আহসান সাহেবদের বাড়িতে তারা ছাড়া আর কেউ থাকেনা সেহেতু শুধু শুধু এই শীতের মধ্যে বের হবার তো কোনো দরকার নেই।’পিকুল ওর রায় জানিয়ে দিল।
‘দরকার আছে,’গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল ফরহাদ।
‘মানে?’আমরা দুজন সমস্বরে বলে উঠলাম।
‘মানে ওই বাড়িতে আহসান সাহেবরা ছাড়াও আরো কেউ একজন থাকে।আমি নিশ্চিত।’
‘কী বলছিস এসব?’আমরা অবাক।‘কিভাবে নিশ্চিত হলি?’
আমি যখন আহসান সাহেবের সাথে কথা বলছিলাম তখন চেষ্টা করছিলাম বাড়ির ভেতরে নজর দিতে।তিনি যেভাবে দরজা আগলে দাঁড়িয়েছিলেন তাতে ভালমত কিছু দেখা যাচ্ছিলনা,তবে যতটুকুই দেখছি তাতেই আমি নিশ্চিত ওখানে আরো একজন থাকে।’
‘কী দেখেছিস?’
‘গেমসের সিডি,আর এক গাদা কমিকবুক।’
‘এসব দেখেই তুই বুঝে ফেললি ওখানে আরেকজন থাকে?’
‘হুমম।’
‘কেন এগুলো তো আহসানের সাহেবেরও হতে পারে।’
‘তাকে দেখে কী তোর মনে হয় তিনি কম্পিউটারের সামনে বসে বসে ‘কল অফ ডিউটি’ কিংবা ‘ফারক্রাই’ গেম খেলবে?অথবা বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে টিনটিনের কমিকস পড়বে?’
আমি ব্যাপারটা কল্পনা করতে চেষ্টা করলাম।আহসান সাহেব কম্পিউটারের সামনে বসে গেমস খেলছেন আর একটু পর পরই এক একটা শত্রু মেরেই ‘ইয়াহু’ বলে লাফ মারছেন!দৃশটা তেমন মধুর বলে মনে হলনা আমার কাছে!বললাম,‘না তেমনটা অবশ্য মনে হয় না!তবে হতে পারেনা, এগুলো অনেক আগের?সেই আহসান সাহেবের কিশোর বয়সের?’
‘তোকে কি এর আগে কেউ বলেছে তুই একটা গাধা?’
‘হ্যাঁ অনেকেই তো বলেছে!’
‘যারা বলেছে,তাদেরকে আমার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ দিস!গাধা,আহসান সাহেবের কিশোর বয়সে এদেশে কম্পিউটার নামে কোনও বস্তু ছিল?তাছাড়া যেসব গেমসের নাম বললাম,সেগুলো একেবারেই লেটেস্ট।
আমার যতদুর মনে হয় যে ছেলেটাকে বলি দেবার আটকে রাখা হয়েছে সে এগুলো খুব পছন্দ করে।তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে রাখার জন্যই এসব কিনে দিয়েছেন আহসান সাহেব’
‘তাহলে তো চিন্তার বিষয়।আচ্ছা,কিভাবে নিশ্চিত হওয়া যায় বল তো?’পিকুল বলল।
‘একটাই উপায় আছে আজ রাতে অভিযান চালাতে হবে আহসান সাহেবদের বাড়িতে।নিশ্চিত হতে হবে ও বাড়িতে আসলেও তারা ছাড়া আর কেউ থাকে কিনা।আমাদের হাতে সময়ও নেই।তিনদিন পরই অমাবস্যা।যদি সত্যি সত্যি কোনো নিষ্পাপ ছেলেকে বলি দেবার উদ্দেশ্যে বন্দি করে রাখা হয় তাহলে এই সময়ের মধ্যেই তাকে উদ্ধার করতে হবে।’
আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা,আমাদের বয়সী একটা ছেলে কিভাবে নিষ্পাপ হয়!
(চলবে)
---------------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now