বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১
আজ ও একটা খুন হল। রহস্যময় খুন। এই নিয়ে তিন টা
খুন হল। এখনও কেউ এই খুনগুলো যে করেছে
থাকে খুঁজে বের করতে পারে নি। হয়তো
পারবেও না। কারণ এমন ভাবে খুন গুলো করছে যে
তাদের শরীরে কোন ক্লো নাই। সবাইকে এক
এক ভাবে খুন করছে। একজনের হাত কাটা,
একজনের হাতের আঙ্গুল কাটা, একজনের চোখ
গুলো উপরে ফেলা। খুব ভয়ানক ভাবে খুন গুলো
করছে। আর যে তিন জন খুন হয়ছে সবাই না কী
বখাটে অনেক মেয়ের জীবন নষ্ট করেছে।
টাকা থাকার কারণে তাদেরকে পুলিশে কিছু করতে
পারে না। কিছু কিছু পুলিশ আছে যারা টাকা দেখলে
সবকিছু ভুলে যায়। যে খুন গুলো করছে সে
প্রপেশনাল খুনি নয়। সে একজন সাধারণ ছেলে।
ছেলেটি তাঁর আপুর খুনের প্রতিশোধ নিচ্ছে।
ছেলেটির নাম শুভ।
.
নিস্বদ্ধ কবরস্থানে একা একা বসে কাঁদছে শুভ। একটা
কবরের পাশে বসে অঝোর ধরায় কাঁদছে শুভ।
চারিদিকের নীরবতা কারণে তার কন্নার ওয়াজ
কবরস্থানের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। কবরটা
কয়েকমাস আগে দেওয়া নতুন কবর। কবরের ভিতর
খুবই শান্ত ভাবে ঘুমিয়ে আছে শুভ এর বোন মাহমুদা
মিনি।
.
মাহমুদা মিনি শুভের বড় বোন। শুভকে খুব
ভালোবাসতো। শুভও তাঁর আপুকে খুব
ভালোবাসতো। তাঁদের মা বাবা নেয়। অনেক বছর
আগে তাঁদের মা বাবা তাঁদের দুই জনকে একা
রেখে চলে যাই না ফিরার দেশে। হ্যাঁ শুভ এর মা বাবা
একটা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। শুভ এবং তার বোনও ছিল
সেখানে কিন্তু ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় তাঁরা দুই জন।
শুভ নিজ হাতে মাটি দেয় তার মা এবং বাবাকে। শুভ তখন
ছোট ছিল বিদায় বুঝে নি কষ্ট শুধু চোখ দিয়ে পানি
পড়ছিলা তার। আর দেখছিল আপুর কান্না এবং তার চিৎকার।
এটা দেখেয় তপু কেঁদে ছিল। সেদিন মিনি তপুকে
জড়িয়ে ধরে অনেক কেঁদেছিল। তপুও
কেঁদেছিল তার আপুর সাথে। তখন বুঝে নি কষ্ট
কী। কিন্তু এখন তো বুঝে কষ্ট কী। তার
কলিজাকে হারিয়ে সে বুঝেছে কষ্ট কী। হ্যাঁ
মাহমুদা মিনি ছিল শুভর কলিজা। একজন একজনকে না
দেখে থাকতে পারতো না।
.
শুভের বাবা মা মারা যাবার কয়েকদিন পর তাঁদের সমস্ত
সম্পত্তি ব্যাংক নিয়ে নেয়। শুভের বাবা ছিল একজন বড়
ব্যবসায়ী। তাঁদের অনেক সম্পত্তি ছিল। তাঁদের বাবা
মারা যাবার আগে ব্যাংক থেকে অনেক টাকা ঋন নিছিল।
সে গুলা দিতে না পারাই ব্যাংক তাঁদের সব সম্পত্তি নিয়ে
নেয়। যার কারণে তারা দুই ভাই বোন একেবারে
নিশ্ব হয়ে পড়ে। তাঁদের তেমন কোন আত্নীয়
স্বজন ছিল না। যারা ছিল তারাও তাঁদের মা বাবা মারা যাবার পর
শুভ এবং তাঁর বোন মিনিকে আশ্রয় দেই নি। দূর দূর
করে তাড়িয়ে দেই তাঁদের। ভাইটাকে নিয়ে মিনি
কখনও রাস্তার দ্বারে, কখনও বা কারো বারান্দাই,
কখনও কারো ঘরের ছাওনির নিচে, নানা ভাবে তারা
দুইজন রাত কাটিয়েছে। আর খাবার, কখনও বাবা
ডাস্টবিনের পচাঁ বাঁশি খাবার, আবার কখনও হুটেলের
নস্ট হয়ে যাওয়া খাবার গুলো খেয়ে থাকে। বেশির
বাক সময় তারা দুইজন না খেয়ে থাকে। মিনি অনেক
যাইগায় গুরেছে কিন্তু কেউ থাকে চাকরি দেয় না বরং
তাড়িয়ে দেয়েছে।
.
মিনির অনেক ইচ্ছা ছিল একজন ডাক্তার হবে দেশের
মানুষের সেবা করবে। কিন্তু তা আর হলো না একটা
তুপান এসে তার স্বপ্ন কে ভেঙ্গে দিয়ে চলে
যাই। আর কেড়ে নাই তার অর্ধেক পৃথিবী। তার মা
বাবা মারা যাবার পর সে কোন রাত ঘুমাতে পারে নি। সারা
রাত চোখের জ্বল ফেলে কাটিয়ে দিত। আর দিন
হলে মানুষের দর্জায় দর্জায় গুরত। কিন্তু কেউ
তাদের একটু থাকার জায়গা দেয় নি। দেয় নি একটা
চাকরি। এই পৃথিবীতে যার মা বাবা নেয় তার কেউ
নেয়। কিন্তু মিনির আছে একজন। তাকে নিয়ে
বাঁচতে হবে মিনিকে। হ্যাঁ শুভকে নিয়ে মিনি বেঁচে
থাকবে, বেঁচে থাকতে হবে।
.
শুভ কষ্ট কী বুঝত না। শুধু দেখত তার আপুর কন্না,
শুধু দেখতে তার বাবা মা তার পাশে নেয়। শুভ বঞ্চিত
হল তার মায়ের ভালোবাসা থেকে শুভ বঞ্চিত হল তার
মায়ের আদর থেকে। পৃথিবীতে মা বাবার
ভালোবাসার মতো আর কোন ভালোবাসা নাই। মা
বাবার ভালোবাসার কাছে সব ভালোবাসা হার মানে।
তেমনি মিনি শুভকে যতই ভালোবাসোক না কেন মা
বাবার ভালোবাসার যাইগাটা অপূর্ণ রয়ে যাবে। তবুও
মাহমুদা মিনি শুভকে খুব ভালোবাসে।
.
একদিন রাতে শুভ আর মাহমুদা মিনি রাস্তার দ্বারে বসা
ছিল। তারা সারা দিন কিছু খাই নি। পেটের ভিতর খোদাই
প্রচন্ড ব্যাথা করছে যা সহ্য করার নয়। তখন রাত প্রায়
৮.০০ টা বাজে। তাদের সামনে একটা বৃদ্ধ লোক
এসে দাঁড়াই। লোকটি অদ্ভুত ভাবে তাদের দুই
জনের দিকে কিছুক্ষন থাকিয়ে থাকে। তারপর খুবই
শান্ত কন্ঠে বলে,
-- কে তোমরা?(লোকটি)
-- আমরা দুই ভাই বোন আজ কিছু খাই নি, স্যার যদি আপনি
আমাদের একটু থাকার জায়গা দিতেন তাইলে খুব উপকার
হতো(মিনি)
লোকটি কিছুক্ষন কী যেন ভাবল তারপর তাদের
দুইজনকে নিয়ে গেল একটা বাড়িতে। বাড়িটা বেশ
পুরানো। দেখে মনে হয় কোন বড় লোকের
বাড়ি। বাড়িটা দুই তালা। মিনি এর কিছুই বুঝতে পারে না।
অবাক হয়ে কিছুক্ষন বাড়ি টার দিকে থাকাই, আবার
কিছুক্ষন লোকটার দিকে থাকাই। তা দেখে লোকটি
একটু মুচকি হেঁসে বলে,
-- অবাক হবার কিছু নেয়, বাড়িটা আমার আজ থেকে
তোমরা দুইজন আমার সাথে এই বাড়িতে থাকবে।
(লোকটি)
ওনার কথা শুনে মিনি কিছুটা অবাক হয়। অবাক হবারি কথা,
আজ অনেক দিন তারা দুইজন বাইরে বাইরে ঘুরে রাত
কাটিয়েছে, কত মানুষের কাছে গেছি, কিন্তু কেউ
তাদের যাইগা দেয় নি। আর আজ একটা লোক এসে
নিজ থেকে থাকার জায়গা দিছে, তাও আবার কোন
ধনীর বাড়িতে। মিনি ভাবছে সত্যি এই পৃথিবীতে এই
রকম মানুষ এখন অনেক কম। খুব কম এই রকম দয়ালু
মানুষ। মিনি শুভ এবং লোকটি বাড়িতে প্রবেশ করে।
মিনি বাড়ির ভিতর ডোকে আর বেশি অবাক হয়, কারণ
বাড়িটার ভিতরে খুব সুন্দর। মিনি আর শুভ অবাক হয়ে
বাড়িটা দেখছে। হঠাৎ লোকটি বলে ওঠল,
-- যা কথা পরে হবে, তোমাদের এখন খিদে
পেয়েছে খেয়ে তারপর গল্প করবো, যাও যাও
ফ্রেস হয়ে আসো।
তারপর তাঁরা ফ্রেস হয়ে এসে খেতে আসল। যা
দেখল মিনি এবং শুভ দুই জনে খুব অবাক। কারণ খাবার
টেবিলে রয়েছে নানা ধরনের খাবার। মিনি ভেবে
পাচ্ছে না এত খাবার তিনি কিছু সময়ে কেমন করে
করল। তাদের দুইজনকে অবাক হয়ে থাকতে
দেখে লোকটি বলল,
-- অবাক হবার কিছু নেয়, এগুলা কাজের লোক করে
দিয়ে গেছে। বস বস,
তারা দুইজন খেতে বসল, এত দিনে ভালো খাবার
দেখে তারা দুইজনে খুব তাড়াহুড়া করে খেল। কত
দিন পর তারা ভালো খাবার খাচ্ছে, খুব তৃপ্তি সহকারে
তারা দুই জন খাবার খাচ্ছে।
.
২
এভাবে খেতে দেখে লোকটির চোখে পানি
চলে আসল। শুভ আর মিনি খাবার খাওয়া শেষ করে
লোকটির দিখে থাকাল, তারা দেখল লোকটির
চোখে পানি, তা দেখে মিনি জিজ্ঞেস করল,
-- আপনি কাঁদছেন কেন?(মিনি)
তার কথা শুনে লোকটির চোখের জল মুছে
ফেলে,
-- আজ তোমাদের দেখে আমার ছেলে
মেয়ের কথা খুব মনে পড়ছে,(লোকটি)
-- তারা এখন কোথায়,(মিনি)
-- ওরা এখন না ফেরার দেশে চলে গেছে
আমাকে একা রেখে,( এই বলে লোকটির
চোখে আবারও পানি চলে আসে)
মিনির চোখেও পানি চলে আসে কারণ তার বাবা মাও
যে তাদের দুইজনকে একা রেখে চলে গেছে।
খুব কষ্টে মিনি লোকটিকে জিজ্ঞেস করে..
-- ওরা কী ভাবে মারা গেছে?(মিনি)
-- একটা কঠিন রুগে আমার স্ত্রী, ছেলে মেয়ে
সবাই মারা যাই শুধু বেঁচে যাই আমি। এখন আমি বেঁচে
মরার মতো হয়ে আছে, এই পৃথিবীতে একা
জীবন খুব কষ্টের।(লোকটি কন্না জড়িত কন্ঠে
বলে)
-- কেন আপনি তাদের চিকিৎসা করান নি?(মিনি)
-- কী ভাবে করাবো, এই রুগের চিকিৎসা এখনও
আবিস্কার করা হয় নি। তাই বীনা চিকিৎসায়, তারা মারা যাই।
(লোকটি)
-- আচ্ছা আমরা তো আপনার নাম জানি না, আমরা
আপনাকে কী বলে ডাকব?(পাশ থেকে শুভ বলে
উঠে, তার চোখেও পানি, তবে সে কষ্টে
কাঁদছে না তাঁর আপুর কন্না দেখে কাঁদছে, তার আপুর
কন্না দেখলে সহ্য করতে পারে না)
-- আমার নাম রাসেদ চৌধুরী তোমরা আমাকে বাবা
বলেই ডাকবে কেমন।(লোকটি)
-- আচ্ছা(শুভ এবং মিনি এক সাথে জবাব দিল)
মিনি ভাবছে এই রকম ভালোমানুষ এখনও পৃথিবীতে
আছে.! এই রকম মানুষ সত্যি এখন পৃথিবীতে পাওয়া
খুব কঠিন। ভাগ্য ভালো থাকলে পাওয়া যায়। হয়তো শুভ
আর মিনির ভাগ্য ভালো ছিল তাই তারা এই রকম একজন
মানুষের দেখা পেয়েছে। লোকটিকে দেখে
তার বাবার কথা খুব মনে পড়ছে, আর বাবার কথা মনে
হলে তার মনের ভিতর এক ধরনের তুপান প্রবাহিত হয়।
যে তুপান পুরানো সব সৃতিকে নাড়া দেয়। মিনির মন
খারাপ রাসেদ চৌধুরী হয়তো বুঝতে পেরেছে।
তাই তিনি তাদের বললেন,
-- যাও তোমরা রুমে গিয়ে শুয়ে পড়, আমি রহিমকে
(ওনার কাজের লোক) বলে দিচ্ছি ও তোমাদের
রুম দেখিয়ে দেবে।(রাসেদ চৌধুরী)
এই বলে ওনি রহিমকে উদ্দ্যেশ্য করে বললেন,
-- রহিম ওদের উপরের ঘরে যে রুমটাতে আমার
ছেলে মেয়ারা থাকত ওই রুমে নিয়ে যাও।
মিনি দেখল একটা বৃদ্ধ লোক তাদের দিকে এগিয়ে
আসছে, মনে হয় এটাই রহিম।
লোকটি এসে বলল,
-- আমি রহিম তোমরা আমাকে চাচা বলেই ডাকবে আর
চল আমার সাথে,
এই বলে লোকটি সিড়ি বেয়ে উঠতে লাগল, আর
পিছন পিছন মিনি এবং শুভও আসছে। লোকটি হঠাৎ একটা
বড় রুমের সামনে এসে থামল, তারপর শুভ আর
মিনিকে উদ্দ্যেশ্য করে বলল, এটাই তোমাদের
রুম। এই বলে লোকটি চলে গেল। শুভ আর মিনি
কিছুক্ষন লোকটির চলে যাওয়ার দিকে থাকিয়ে রয়ল।
তারপর আস্তে আস্তে রুমটির ভিতর ডোকে
গেল। রুমটি বেশ বড় এবং সাজানো, এক পাশে একটা
জালনা রয়েছে যেটা দিয়ে আকাশের চাঁদ দেখা
যাবে। শুভ আর মিনি রুমটি দেখছে, আর চোখের
জল ফেলছে। হঠাৎ শুভ বলে উঠল,
-- আপুনি আমার বিষন ঘুম পাচ্ছে, আমি ঘুমাব
-- ঠিক আছে তোই শুয়ে পর, আমি তোর মাথায় হাত
বুলিয়ে দিচ্ছি।
তাদের মা বাবা মারা যাবার পর থেকে প্রতি রাতে মিনি
শুভকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিত।
শুভ শুয়ে পড়ল, মিনি তার মথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর
ভাবছে রাসেদ চৌধুরীর কথা, "লোকটি কত ভালো,
আজ এত দিন আমরা রাস্তাই রাস্তাই ঘুরছি কেউ
আমাদের একটু থাকায় যায়গা দেয় নি, এমন কী কারো
বারান্দায় ঘুমালে মাঝ রাতে তাড়িয়ে দিত আর এই
লোকটি আমাদের রাস্তা থেকে তুলে এনে
নিজের সন্তানের যায়গা দিয়ে দিল" এই সব ভাবতে
ভাবতে মিনিও ঘুমের দেশে চলে গেল।
.
ঘুম ভাঙ্গল শুভ এর ডাকে,,,
-- এই আপুনি উঠ, বাবা আমাদের ডাকছে নাস্তা করতে,
মিনি তাড়াতাড়ি ওঠে বসল। রাসেদ চৌধুরীর কথা ভাবতে
ভাবতে কখন ঘুমিয়ে গেছে সে নিজেও জানে না।
আজ অনেক দিন পর সে রাতে ভালোভাবে
ঘুমোতে পেরেছে।
-- ঠিক আছে তোই যা আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি,(মিনি)
এই বলে মিনি ফ্রেশ হতে চলে গেল।
.
ফ্রেশ হয়ে নিচে গিয়ে দেখল শুভ এবং রাসেদ
চৌধুরী হাসি খুসিতে গল্প করছে এবং নাস্তা করছে।
আর মিনি ভাবছে কত দিন পর আজ তাঁর ছোট ভাইটার
মুখে হাসি দেখছে সে। রাসেদ চৌধুরী মিনিকে
আসতে দেখে বলল, ঘুম ভেঙ্গেছে আমার
মামুনির। ওনার কথা শুনে মিনি অবাক হয়ে যাই। রাসেদ
সাহেব মনে হয় তা বুঝতে পেরেছে তাই তিনি
বললেন,
-- অবাক হবার কিছু নেয় আজ থেকে তোমরাই
আমার শন্তান, নাস্তা করতে আস। মিনি ভাবছে কী
ভাবে লোকটি তার মনের কথা বুঝতে পারে..? এর
উত্তর তার কাছে নেয়। সে আস্তে আস্তে
হেঁটে গেল টেবিলের দিকে। একাট চিয়ারে গিয়ে
বসল। মিনি বসে নাস্তার দিকে থাকিয়ে ভাবছে আজ
কত দিন পর এই রকম নাস্তা করছে সে। এই ভাবে
বসে থাকতে দেকে রাসেদ সাহেব বলে উঠল,
-- কী হল বসে আছ কেন? নাস্তা করবে না?
ওনার কথা শুনে মিনি নাস্তা করাই মন দিল। খুব তৃপ্তি
সহকারে নাস্তা করছে। আর ভাবছে রাসেদ
সাহেবের কথা। ওনি আবার বলে উঠলেন,
-- তোমাদের বাবা মা কী ভাবে মারা গেছে তা তো
বললে না?
ওনার কথা শুনে মিনির মনটা খারাপ হয়ে গেল এবং
চোখের কোণে জল এসে বীড় করছে। কন্না
জড়িত কন্ঠে মিনি তাঁর বাবা মারা যাবার কাহিনী টা বলল। মিনি
রাসেদ সাহেবের দিকে থাকাল দেখল ওনার
চোখেও পানি, হয়তো ছেলে মেয়ের কথা
মনে পড়ছে তাই কাঁদছে। মিনি স্বাভাবিক হতে চেস্টা
করল। লোকটিও স্বাভাবিক হয়ে বলল,
-- দুঃখ করো না আজ থেকে আমি তোমাদের
সন্তানের আদর দিয়ে বড় করে তুলব, তোমাদের
আবার স্কুলে ভর্তি করাব, আচ্ছা তোমরা কোন
ক্লাস পর্যন্ত পড়েছ?
মিনি স্বাভাবিক হয়ে বলল,
-- আমি নবম শ্রেণীতে, আর শুভ পঞ্চম
শ্রেণীতে পড়ি, আমার না খুব ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা
কিন্তু.....
মিনিকে আর বলতে না দিয়ে রাসেদ সাহেব
বললেন,
-- কোন কিন্তু না ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা তো ডাক্তার
হবে, তারপর শুভ এর দিকে থাকিয়ে বললেন,
-- তুমি কী হবে?
.
৩
শুভ খুশী হয়ে বলে আমি আর্মি হতে চাই দেশের
জন্য কিছু করতে চাই।
শুভ এর কথা শুনে রাসেদ সাহেব খুব খুশি হয়। তিনি
তাদেরকে সেদিন একটা স্কুলে ভর্তি করিয়ে
দেই। শুভ এবং মিনি খুব খুশী কারণ তারা তাদের স্বপ্ন
পূরণ করতে পারবে। সবচেয়ে বড় কথা হল শুভ এবং
মিনি আর একজন বাবা ফেল।
.
নিস্তব্ধ রাতে বসে মিনি ভাবছে এই বাড়ির মানুষ গুলো
কত ভালো, খুব সহজেই দুজন অপরিচিত মানুষকে খুব
আপন করে নিয়েছে। এতই আপন করে নিয়েছে
যে মনে হয় এই বাড়ির মালিক শুধু দুইজনি। রাসেদ
সাহেব ও শুভ এবং মিনিকে নিজের ছেলে মেয়ের
মতো আদর করে ভালোবাসে। মিনি এবং শুভ ও
রাসেদ সাহেব কে বাবার মতো ভালোবাসে। মিনি
ভাবছে তারা এখন একা নয় তাদের রয়েছে একজন
স্বপ্ন দেখানোর মানুষ, তাদের রয়েছে একজন
আদর করার মানুষ, তাদের রয়েছে একজন
ভালোবাসার মানুষ।
.
রাসেদ সাহেব হলেন একজন অনেক বড়
ব্যবসায়ী। সারা দিন অফিসে থাকে। আর রাতে বাসাই
আসলে তিনজনে মিলে গল্পকরে। আর ছোটির
দিন হলে তিনজনে মিলে নানা জায়গাই ঘুরে বেড়ায়।
সবমিলিয়ে খুব ভাল ভাবেই কাটছে তাদের দিন। মাঝে
মাঝে মিনির মনটা খারাপ হয়ে যাই, তার বাবা মায়ের কথা
মনে পড়লে। যেদিন মনে পড়ে সে দিন সারা রাত
ঘুমাতে পারে না। সারা রাত চোখের জল ফেলে
কাটিয়ে দেয়। আস্তে আস্তে কাটতে থাকে
তাদের ভালো লাগার দিনগুলি। কিন্তু ভালো লাগার দিন
গুলি যে খুব তারা তারি শেষ হয়ে যাই। একদিন তাদের
দুইজনকে ছেড়ে রাসেদ সাহেবও চলে যান না
ফিরার দেশে। আবারও তারা দুইজন একা হয়ে গেল।
হারালো তাদের আর একজন আপন জনকে। হারল
তাদের আর একটা বাবাকে। ওনাকে হারিয়ে শুভও
অনেক কষ্ট পাই, যে মানুষটি তাদের এত
ভালোবেসেছে, এত আদর করেছে তারা কোন
দিন ভাবে নি সে মানুষটিকে হারাতে হবে। ওনাকে
হারিয়ে মিনির আবার মনে পড়ে গেল তার বাবা মার কথা,
এত দিন রাসেদ সাহেব ছিলেন তাই তার বাবা মার কথা
তেমন মনে পড়ে নি। কিন্তু আজ, তিনিও নেই। বাবা
মার কথা মনে পড়তেই দুচোখ ভরে যায় জলে। তার
বাবা মা এবং রাসেদ সাহেবের কথা মনে পড়তেই মিনির
হৃদয়টা হাহাকার করে উঠে।
.
মিনি এক নীরব রাতে, বারান্দায় বসে বাইরের নীল
আকাশের চাঁদ এবং তাঁরা গুলোকে দেখছে আর
চোখের জল ফেলছে নীরবে। আজ তার খুব
মনে পড়ছে সেই মানুষটির কথা যে তাদের
দুইজনকে রাস্তা থেকে তোলে এনে নিজের
ছেলে মেয়ের মতো আদর ভালোবাসা দিয়ে
মানুষ করার চেস্টা করেছে, মনে পড়ছে সেই
মানুষটির কথা যে তাদের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, মনে
পড়ছে সেই মানুষটির কথা যে তাদের দুইজনকে
থাকার যায়গা দিয়েছে, খুব মনে পড়ছে তার। ওনি মারা
গেছে কয়েকদিন হয়ে গেছে, কিন্তু মিনি মেনে
নিতে পারছে না যে রাসেদ সাহেব তাদের পাশে
নেয়। মিনি মনে করে ওনি তাদের সাথেই আছেন,
এবং তাদের সাথে বসে গল্প করছেন। কিন্তু মিনি
জানে না এগুলা শুধু কল্পনা বাস্তব নয়।
.
মিনি মন খারাপ করে বসে আছে। হঠাৎ কলিং বেলটা
বেজে ওঠল। কাজের লোক গিয়ে দরজা খুলে
দিল। মিনি একি ভাবে বসে আছে,
-- আপা একজন লোক আইছে, ওনি আপনারে
খুঁজছেন।
কাজের লোকের কথায় সে বাস্তবে ফিরে এল,
এতক্ষন সে তার বাবা মার সাথে কাটানো, রাসেদ
সাহেবের সাথে কাটানো সময়টা মনে করছে।
-- আচ্ছা ঠিক আছে তুমি যাও আমি আসছি।
এই বলে মিনি উঠে দাঁড়াল। ডাইনিং রুমে গিয়ে দেখল
এক কালো কোড পরা একজন লোক বসে
আছে, হাতে একটা ব্যাগ। মিনিকে দেখে লোকটি
বলল,
-- আমি ওকিল আরমান, আপনার সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ
কথা বলতে এসেছি।
মিনি গিয়ে আর একটা জায়গাই বসল, তারপর শান্ত কন্ঠে
বলল,
-- জ্বি বলুন, কী বলবেন?
-- আমি আসলে আপনাদের জায়গা সম্পত্তি বুঝায় দিতে
আসছি।
-- মানে?
-- মানে হচ্ছে আপনার বাবা মৃত্যুর আগে আমার কাছে
গেছিলেন। আমাকে গিয়ে বললেন একটা ওইল
করতে, আমিও ওনার কথা মতো ওইল করলাম, ওনি তাঁর
সব সম্পত্তি আপনার এবং আপনার ভাই শুভ এর নামে
লিখে দিয়ে গেছেন। আমি এখন আসছি আপনাকে
আপনার দলিল দিতে।
এই বলে লোকটি তার ব্যাগ থেকে একটা কাগজ
বের করে মিনিকে দিল।
-- এই নিন আপনার দলিল এখন আমি যাই।
মিনি বসে থাকল অবাক হয়ে। তার দুচোখো অশ্রু।
সে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না, রাসেদ সাহেব
সব সম্পত্তি তাদের দিয়ে যাবে। যে মানুষটা তাদের
রাস্তা থেকে এনে আশ্রায় দিছিল সে তার সব
সম্পত্তি তাদের নামে দিয়ে চলে গেল। মিনির
দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। খুব কষ্ট
হচ্ছে বিশ্বাস করতে। কারণ তাঁর মতো লোক এই
পৃথিবীতে খুব কম আছে। আর যারা আছে তাঁরা এই
রকম নিজের সব সম্পত্তি দুজন এতিম ছেলেক দিয়ে
দিবে না। দিলেও অনেক কম মানুষে দিবে।
পৃথিবীতে এই রকম কিছু মানুষ বেঁচে আছে বলে
পৃথিবীটা এখন ও টিকে আছে। তা না হলে অনেক
আগে পৃথিবীটা ধংশ হয়ে যেতো। এই সব ভেবে
মিনির চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। কষ্টে
তার বুকটা ফেটে যাচ্ছে।
.
৪
আজ অনেক দিন হল রাসেদ সাহেব মারা গেছেন।
কিন্তু মিনি বিশ্বাস করছে না যে রাসেদ সাহেব তাদের
পাশে নেই। তাঁর জন্য শুভের মনটা ও খারাপ। কত সময়
শুভ ওনার সাথে বসে আড্ডা দিছেন। কত সময় শুভ
ওনার সাথে মঝার মঝার গল্প করেছেন। কিন্তু তিনি
আজ নেই। তাদের ছেড়ে চলে গেছেন
অনেক দূর যেমন ভাবে চলে গেছিল শুভ এর বাবা
মা। ওনি মারা যাবার পর শুভ এবং মিনি খুব ভেঙ্গে পড়ে।
এত দিন যিনি বাবার মতো ভালোবেসেছিল তিনি আজ
নেই, এত দিন যিনি বাবার মতো শাষণ করেছিল তিনি
আজ নেই, এত দিন যিনি বাবার মতো স্বপ্ন
দেখিয়েছেন তিনি আজ নেই। খুব কষ্ট হচ্ছে মিনি
এবং শুভর ওনাকে ছাড়া থাকতে। কিন্তু কষ্ট হলেও
যে থাকতে হবে। তবুও তারা বেঁচে থাকবে ওনার
কথা মনে করে।
.
রাসেদ সাহেব মারা গেছে প্রায় একবছর হয়ে
গেল। তবুও মিনি এবং শুভ ভুলতে পারছে না ওনাকে।
কী করে ভুলবে যে মানুষটি খোলা আকাশের নিচ
থেকে এনে বদ্ধ ঘরে জায়গা দিছিল সে মানুষকে
কী করে ভুলবে। যখন তাদের কেউ খাবার দিচ্ছে
না তখন যে মানুষটি তাদের ভালো ভালো খাবার
আজীবন খাবার ব্যাবস্তা করে দিছিল সে মানুষকে
কী করে ভুলবে। সে মানুষকে তো ভুলা যায় না।
তাকে শুধু যুগ যুগ ধরে মনে রাখা যায়, তার কথা মনে
করে শুধু চোখের জল ফেলা যায়। প্রতি রাতে মিনি
রাসেদ সাহেব এবং তার বাবা মার কথা মনে করে
নীরবে চোখের জল ফেলে। নীল আকাশের
তারা বলতে পারবে মিনির চোখের জলের কথা,
মায়াবী চাঁদটি বলতে পারবে তার চোখ থেকে কত
টুকু জল পড়েছে। প্রতিটি রাত বলতে পারবে মিনির
জেগে থাকার কথা। প্রতিটি জোঁনাকি বলতে পারবে
মিনির অন্ধকার রাত্রে নীরবে বসে থাকার কথা।
প্রতিটি সময় বলতে পারবে মিনির মন খারাপের কথা। মিনি
বসে বসে নীরবে কাঁদে যাতে শুভ দেখতে না
পাই। মিনি মন খারাপ করলেও শুভ এর সামনে হাসি খুশি
থাকার চেস্টা করে যাতে শুভ বুঝতে না পারে তার
আপুর মন খারাপ।
.
এই ভাবে ভালো খারাপ দিয়ে চলে যাই, অনেকটা
বছর। মিনির চোখ দিয়ে এখন জল গড়িয়ে পড়ে না।
হয়তো কাঁদতে কাঁদতে তার চোখের জল শুখিয়ে
গেছে। মিনির মন এখন আর খারাপ হয় না কারণ সে
যেনে গেছে কীভাবে কষ্টের মাঝে সুখি
থাকতে হয়। মিনি এখন তার স্বপ্ন পূরণ করতে
পেরেছে। সে এখন একজন দেশের নাম করা
ডাক্তার, তার ইচ্ছা আজ পূর্ণ হয়ছে। তবে তার মনে
একটাই দুঃখ। যে মানুষটি থাকে এত দূর আসতে সাহায্য
করেছে সে মানুষটি আজ তার পাশে নাই, যে মানুষটি
সেই পথ শিশু মিনিকে আজ এত বড় ডাক্তার হতে
অনুপ্রেণা দিছে সে মানুষটি আজ তার পাশে নাই।
তবুও মিনি এই ভেবে একটু শান্তি পাই যে, সে
মানুষটির আসা তো পূরণ করতে পেরেছে। আর
শুভ অনার্স লাস্ট ইয়ারে পড়ে। সে ছোট্র শুভটি
এখন অনেক বড় হয়ছে। কয়েকদিন পর সেও তার
স্বপ্ন পূরণ করতে যাবে।
.
একদিন মিনি বাসাই আসছিল রিক্সা করে। হঠাৎ সে খিয়াল
করল তার পিছনে কয়েকটা ছেলে রিক্সা দিয়ে
আসছে এবং উকি দিয়ে মিনিকে দেখার চেস্টা
করছে। মিনি তা বুঝতে পেরে রিক্সাওয়ালাকে বলল,
-- একটু তাড়াতাড়ি চালান,
মিনির কথা শুনে রিক্সাওয়ালাও রিক্সার গতি বাড়িয়ে দিল। মিনি
তার বাসার সামনে আসার সাথে সাথে রিক্সাওয়ালাকে
ভাড়া দিয়ে ভিতরে ঢোকতে যাবে এমন সময় একটা
ছেলে তার সামনে এসে দাঁড়ায়। সে চিন্তে পারে
ছেলেটিকে, ছেলেটি এলাকার একজন বখাটে
ছেলে। এবং মিনি জানে ছেলেটি অনেক মেয়ের
জীবন নষ্ট করেছে। মিনি ছেলেটির দিকে না
তাকিয়ে বলল,
-- সারেন আমি বাসাই যাবো।
ছেলেটি একিভাবে দাঁড়িয়ে থাকে এবং মিনির দিকে
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। এটা দেখে মিনি
রেগে যাই।
-- সরে দাঁড়াবেন না কী তাপ্পর খাওয়ার ইচ্ছা আছে?
এরপর ছেলেটি একটা ফুল বের করে মিনির সামনে
বাড়িয়ে বলে,
-- আমি তোমাকে ভালোবাসি,
তার কথা শুনে মিনি যতটা না অবাক তার চেয়ে বেশি
রেগে যাই। রাগে ছেলেটির গালে একটা থাপ্পড়
বসিয়ে দেয়। তারপর বলে
-- সাহস তো কম নয়, তুর মতো একটা বখাটে
ছেলেকে আমি ভালোবাসবো প্রশ্নই আসে না।
তারপর মিনি থাকে পাশ কাটিয়ে চলে আসে সেখান
থেকে। তারপর বাসাই এসে দেখে শুভ বসে
আছে। হয়তো তার জন্য অপেক্ষা করছে। শুভ তার
আপুকে দেখে বলল,
-- আপুনি আজ এত ধেরি হল যে?
-- আজ রুগী একটু বেশি ছিল, তাই ধেরি হল।
-- আচ্ছা বাদ দাও আপুনি খুব খিদে পেয়েছে, চল
খাবো,
-- কী তোই এখনও খাস নি?
-- আপুনি এটা কী রকম কথা? আমি তোমাকে ছাড়া
কখনও খেয়েছি?
-- আচ্ছা ঠিক আছে চল, আমারো খুব খিদে
পেয়েছে।
তারপর তারা খেতে বসল। খেতে খেতে শুভ
বলে উঠল,
-- আপুনি আজ আব্বু আম্মুর কথা খুব মনে পড়ছে
আজ বিকালে একটু আব্বু আম্মু কবরে যাবো, তুমি
যাবে?
-- ঠিক আছে যাবো।
-- ঠিক আছে।
এই বলে আবার খাওয়াই মন দিল শুভ এবং মিনি। খেয়ে
একটা ঘুম দিল। তারপর বিকাল হলে চলে গেল বাবা মার
কবরে। মিনি কবর থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে। কারণ
কবরস্থানে না কী মেয়েদের যাওয়া যায় না। আর
শুভ তার বাবা মার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
দুইজনের চোখে জল কিন্তু তা গড়িয়ে পড়ছে না।
.
৫
তারা কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে হাটা দিল বাসার দিকে।
বাসাই আসতে আসতে সন্ধা হয়ে গেল। তারা বাসাই
এসে ফ্রেস হয়ে নাস্তা করতে বসল। নাস্তা করতে
করতে দুইজনে গল্প করছে,
-- আপুনি আমাকে না কী একটা মেয়ে ভালোবাসে,
শুভ এর এমন কথা শুনে মিনি কিছুটা অবাক হয়। শুভ এবং মিনি
দুজনে খুব ভালো বন্ধুর মত। সব কথা শেয়ার করে।
সারাদিন কী হয়ছে না হয়ছে তা দুজনে মিলে
সন্ধাবেলায় বলে।
-- ওমা তাই না কী, তো মেয়েটা কে?(মিনি)
-- আমার ইউনিভার্সিটির ফ্রেন্ড।(শুভ)
-- তুই ও কী ওকে ভালোবাসিস?(মিনি
)
-- আমি কী কোন কিছু আমার আপুনির কাজ থেকে
না জিজ্ঞেস করে করেছি?(শুভ)
-- হুম তো মেয়েটা কেমন শুনি?(মিনি)
-- মেয়েটা দেখতে ভালো, আচরণও ভালো, তুমি
চাইলে একদিন কথা বলতে পার।(শুভ)
-- আচ্ছা বলব ওকে একদিন বাসাই আনিস, (মিনি)
-- আচ্ছা (শুভ)
-- আজ কী হয়ছে জানিস?(মিনি)
-- না বললে কীভাবে জানবো?(শুভ)
তারপর মিনি বখাটে ছেলের সাথে ঘটা সব ঘটনা বলল।
তার কথা শুনে শুভ এর মনটা খারাপ হয়ে গেল। শুভ মন
খারাপ করে বলল,
-- আপুনি ওরা খুব খারাপ ছেলে। যদি ওরা তোমার কিছু
করে। আমি কীভাবে থাকবো তোমাকে ছাড়া।
-- পাগল ছেলে তোকে ছেড়ে আমি কোথায়
যাবো? আর ওরা কীভাবে করবে আমার ভাই আছে
না।
-- তবুও আপুনি ভয় হয়।
-- এত ভয় করলে তো চলে না।
তারপর আর কথা হয় না তদের মধ্যে নাস্তা করে যে
যার রুমে চলে গেল। মিনি ভাবছে সে যদি চলে যাই
তাইলে তো শুভ একা হয়ে যাবে। তাকে দেখার
কেউ থাকবে না। দূর এই সব কী ভাবছি আমি আমার
আবার কী হবে। আমি আমার ভাই টিকে ছেড়ে
কোথায় যাবো না।
.
শুভ ও বসে বসে ভাবছে তার আপুটির কথা। সবাই
তো তাকে ছেড়ে চলে গেছে যদি তার আপুটিও
চলে যাই তাইলে সে বাঁচবে কী নিয়ে। শুভ সব
হারিয়ে পেয়েছে তার আপুর আদর ভালোবাসা, আর
সেই আপুকে কিছুতেই তার জীবন থেকে
হারাতে দিবে না সে। পরদিন থেকে শুভ বখাটে
ছেলে গুলার প্রতি নজর রাখে যাতে তারা তার
আপুকে কিছু করতে না পারে। কিন্তু শুভ বিশেক্ষন
নজর রাখতে পারলো না।
.
মিনি প্রতিদিনের মতো সেদিন বাইরে থেকে
আসছিল। কিন্তু মাঝ রাস্তায় এসে কয়েকজন ছেলে
তার রিক্সা থামিয়ে দেয়। মিনি ছেলে গুলোকে
চিনতে পারে। এরা সেই ছেলে যাদের মধ্য
একজন মিনিকে ভালোবাসি কথাটা বলে ছিল। মিনি
বুঝতে পারে তারা মিনির ক্ষতি করবে। তাই মিনি রিক্সা
থেকে নেমে ওলটা দিকে দৌড় দিল।
ছেলেগুলোও মিনির পিছন পিছন দৌড়াচ্ছে। এর
মধ্যে মিনি শুভকে কল করে বলে দিয়েছে
ছেলেগুলো তার ক্ষতি করার জন্য এসেছে। শুভও
আসছে।
.
মিনি দৌড়াচ্ছে আর দৌড়াচ্ছে। একসময় সে হাপিয়ে
উঠল আর দৌড়াতে পারছে না। আর দাঁড়াতেও পারছে না
সে মাটিতে বসে পরল। নিশ্বাস নিতে পারছে না সে।
কিছু দূরে দেখল ছেলেগুলোও খুব নিকটে
চলে এসছে। এক সময় মিনি বেশি দৌড়ানোর কারণে
অজ্ঞান হয়ে গেল। যখন জ্ঞান ফিরল, সে আবিষ্কার
করল একটা আব্ধ রুমে। রুমটা অন্ধকার যার কারণে
সে কিছু দেখতে পারছে না। মিনি তারা তারি মোবাইল
বের করল শুভকে জানানোর জন্য, কিন্তু দেখল
তার মোবাইল তার কাছে নেই হয়তো
ছেলেগুলো নিয়ে নিছে। কিছুক্ষন পর দরজা
খোলার আওয়াজ আসল। হঠাৎ লাইটটা জ্বলে উঠল।
রুমটা অন্ধকার থেকে আলোতে পরিণত হল।
আলোতে মিনি দেখতে ফেল সেই ছেলেটি
তার সামনে দাঁড়িয়ে যে মিনিকে সে দিন রাস্তায়
প্রপোজ করেছিল। ছেলেটি ঝাঁঝালো কন্ঠে
বলতে লাগল,
-- তোর খুব অহংকার তাই না। সে দিন তোকে আমার
ভালোবাসার কথা বলেছিলাম কিন্তু তোই আমার
ভালোবাসা গ্রহণ করিস নি, আজ তোর সব অহংকার
মাটিতে মিশে ফেলব।
এই বলে ছেলেটি আস্তে আস্তে মিনির দিকে
আসতে লাগল, আর তার পিছন পিছন কয়েকটা
ছেলেও আসতে লাগল। মিনি কী করবে বুঝে
উঠতে পারছে না সে বার বার বলছে থাকে
ছেড়ে দেবার জন্য কিন্তু তারা তা না শুনে আসতে
লাগল মিনির দিকে। মিনি কাঁদছে আর তাদের বলছে,
-- আমাকে ছেড়ে দেন, আমি আমার ভাই এর কাছে
যাবো আমি ছাড়া যে ওর আর কেউ নেই,
তবুও তারা শুনছে না এগিয়ে আসছে তার দিকে। হঠাৎ
সে দেখতে ফেল তার পিছনে একটা জানলা
আছে। সে ভাবল মরব যখন ইজ্জত হারিয়ে মরবো
না। সে মনে মনে বলল,
-- ভাই তোই আমাকে ক্ষমা করে দিস, তোকে
ছেড়ে বাবা মার মতো আমিও চলে যাচ্ছি,
মিনি তাকাল ছেলেগুলোর দিকে দেখল তার আরো
দূরে আছে। সে আস্তে আস্তে গেল জানলার
পাশে। গিয়ে পিছন ফিরে থাকাল দেখল
ছেলেগুলো দৌড়ে আসছে তার দিকে। মিনি আর
দেরী না করে একটা লাফ দিল, গিয়ে পড়ল মাটিতে।
মাটি তার রক্তে লালে লাল হয়ে যাচ্ছে। আর
ছেলে গুলো তার এই ভাবে মৃত্যু দেখে
চলেগেল। মিনি শেষবারের মতো শুভ এর মুখটা
মনে করতে চাইল, কিন্তু পারল না। চোখ খোলে
একবার এই রঙিন পৃথিবীকে দেখতে চাইল কিন্তু
পারল না, তার চোখ দুটি আসতে আসতে বন্ধ হয়ে
আসছে। এক সময় বন্ধ হয়ে গেল তার চোখ দুটি,
বন্ধ হয়ে গেল তার নিশ্বাস।
.
শুভ তার আপুকে পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছে।
কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না। বার বার মোবাইলে কল
দিচ্ছে কিন্তু বার বার একি কথা আসছে "এই মুহুর্তে
সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না"। তার খুব ভয় হচ্ছে
যদি তার আপুও তার বাবা মার মতো রাসেদ চৌধুরীর
মতো তাকে ছেড়ে চলে যাই তাইলে সে বাঁচবে
কী করে। না সে আর ভাবতে পারছে না। তার আপু
তাকে যেখানে আসতে বলেছে সে সেখানে
গিয়ে দেখল রাস্তার পাশ দিয়ে ছোট্র একটা গলি
গেছে শুভ সে গলি দিয়ে হাটতে লাগল। কিছুদূর
গিয়ে দেখতে ফেল। বেশ পোরানো একটা বাড়ি।
বাড়িটার চারদিকে গাছ লতাপতাই ঘিরা। দেখে মনে হয়
এখানে কেউ আসে না। শুভ বাড়িটার দিকে পাঁ বাড়াল।
বাড়াটার পাশে আসতেই সে থমকে দাঁড়াল। তার
পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে গেল। চার দিকে শুন্যতাই
গ্রাস করছে। তার ভিতরে একটা তুপান প্রবাহিত হচ্ছে।
সামনে যাওয়ার শক্তি খুঁজে পাচ্ছে না। চিৎকার কারার
শক্তি হারিয়ে ফেলছে সে। সে যেন তার
চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। কারণ তার
সামনে পড়ে আছে মিনির নিস্তর দেহ। চারিদিকে
রক্ত। হঠাৎ শুভ মিনির নিস্তর দেহকে জড়িয়ে ধরে
কাঁদতে লাগল। তার চোখ দিয়ে অবিরাম অশ্রু গড়িয়ে
পড়ছে। মিনির শরীরে রক্ত শুভর শরীরে
লেগে লাল হয়ে যাচ্ছে। শুভ কিছুক্ষন এদিক
যাচ্ছে, কিছুক্ষন অদিক যাচ্ছে মানুষ খুঁজার জন্য। সে
খুঁজছে আর কান্না করছে। অনেকক্ষন খুঁজেও
সে কোন মানুষের দেখা ফেলো না। সে একাই
তার আপুর নিস্তর দেহটা একটা ঘাড়ি করে তাদের বাসা
পর্যন্ত নিয়ে আসল। বাড়িতে এসে সে চিৎকার
লরতে লাগল আর কাঁদতে লাগল। তার চিৎকার শুনে
রাহিম সহ আরো কয়েকজন আসল। এসে দেখে
মিনির নিস্তর দেহ পড়ে আছে। তা দেখে তারাও
কাঁদতে লাগল। তারা কখনও ভাবে নি যে মাহমুদা মিনি
তাদের সবাইকে ছেড়ে চলে যাবে। সবাই মিলে
মিনির দাফনের ব্যাবস্তা করল। শুভ সহ আরো
অনেকে মিনিকে নিজ হাতে মাটিতে শুয়ে দিল। শুভ
এর চোখ দিয়ে শুধু জল গড়িয়ে পড়ছে। কবর
দেওয়া শেষ হলে সবাই চলে গেল কিন্তু থেকে
গেল শুভ, কীভাবে যাবে সে তার আপুকে
রেখে তো সে কোথায় যেতে পারবে না। তার
আপুর সাথে কথা না বললে তো সে থাকতে
পারবে না। অবশ্য কয়েকবার রহিম চাচা থাকে চলে
আসতে বলছিল কিন্তু সে যাই নি।
.
৬
মিনির কবরের পাশে বসে কাঁদছে আর বলছে আপু
তোমাকে বাঁচাতে পারলাম না। তুমি ও আজ আমাকে
ছেড়ে চলে গেছো একবার ও ভাবলে না আপুনি
তোমার এই ভাই এর কথা। তোমি জান না তোমাকে না
দেখে আমি থাকতে পারি না, তোমি জান না
তোমাকে ছাড়া আমি খেতে পারি না, প্লিজ আপুনি তুমি
ফিরে এস। তোমাকে ছাড়া থাকবো কী করে,
প্লিজ আপুনি ফিরে এস প্লিজ। এই সব বলছে আর
কবরটা জারিয়ে ধরে কাঁদছে। সারা রাত সে ঘুমাই নি, তার
আপুর কবরের পাশে বসে কেঁদেছে। সকালে
থাকে নিতে আসে রহিম চাচা।
-- শুভ বাবা চল আর কত বসে থাকবে চল সারা রাত কিছুই
খাও নি, এভাবে কাঁদলে তো তোমার আপুর আত্না
কষ্ট পাবে চল বাবা।
-- না চাচা আমি আমার আপুনিকে ছেড়ে কোথাও
যাবো না, আপনি যান চাচা আমি এখানেই থাকব।
-- পাগলামি করো না বাবা চল খেতে চল।
অনেক কষ্টে শুভকে বাড়িতে নিয়ে গেল। বাড়িটা
কেমন যেন শুন্য লাগছে। বাড়িতে ঢুকতে ইচ্ছা
করছে না তার। তবুও ঢুকল। রহিম চাচা তার জন্য খাবার
রেডি করছে আর শুভ বসে আছে মন খারাপ করে।
হঠাৎ রহিম চাচা বললেন,
-- শুভ বাবা খেতে আস,
-- চাচা আমি কার সাথে খাব, আমি তো আপুনিকে ছাড়া
খেতে পারি না।
শুভ এর কথা শুনে রহিম চাচার চোখে পানি চলে
আসে। শুভ কিছুতেই খেতে চাইছে না, তবুও রহিম
চাচা ঝোর করে খাওয়াল। খাবার খেয়ে সে তার
আপুর রুমে গেল। রুমে গিয়ে অঝোর ধরায়
কাঁদতে লাগল। কাঁদছে আর ভাবছে আমার পৃথিবীটা
আধার, আমার পৃথিবীতে কোন আলো নেই,
আমার পৃথিবীতে অন্ধকারের মাঝে কেউ প্রদিব
জ্বালালে তা কিছু সময় পর আবার নিভে যাই। বাবা মা কে
হারিয়ে আমার পৃথিবীর আলো নিভে গেছিল, আবার
সেই আলো ফিরে পাই রাসেদ চৌধুরীকে
পেয়ে, কিন্তু কিছুদিন পর সেই আলোও নিভে যাই,
তখন আমার আলো ছিল আমার আপুনি, কিন্তু এখন...!
এখন সেই আলোও নিভে গেল, এখন আর কেউ
আমার পৃথিবীতে প্রদিব জ্বালাতে পারবে না। প্রদিব
জ্বালানোর মানুষ এখন নাই। এই সব ভাবে আর
চোখের জল ফেলে শুভ। হঠাৎ চিৎকার করে
বলতে লাগল,
-- আপুনি প্লিজ ফিরে আস, তোমাকে ছাড়া আমার
পৃথিবীটা অন্ধ।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now