বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১ ম পর্ব( ৩ পর্বের ধারাবাহিক)
তানজিয়া ছিল আমার অভিন্ন হৃদয় বন্ধু।
ছিল বলছি, কারণ ও আজ ইহজগতে নেই। কিন্তু ওর মৃত্যু কিভাবে হলো, তা তখন আমি কাউকে বলতে পারিনি। ঠিক সময়ে সবাইকে কথাটা বললে হয়তো ওকে হারাতে হতো না। হয়তো সেটাই ছিল আমার জীবনে এক মস্ত বড় অপরাধ। কিভাবে সেই ভয়াবহ ঘটনাটা ঘটেছিল, তা আজ এখানে লিখছি।
খুব ছোট বয়স থেকেই তানজিয়া ছিল দারুণ ডানপিটে আর দূর্দান্ত সাহসী। গাছে চড়া, নদীতে সাঁতার কাটা, - সবকিছুতেই ছিল পারদর্শী। চেহারাও ছিল বেশ স্বাস্থ্যবান আর গাট্টাগোট্টা।
আমরা স্কুল থেকে ফিরে প্রতিদিন বিকেলে লুকোচুরি, গুলিডাণ্ডা আর রুমালচোর খেলতাম। আমাদের লোকালয় থেকে একটা বড় ফাঁকা মাঠ, আর সেই মাঠের পরে একটা খুব বড় ঘন জঙ্গল। আমরা রোজ বিকেলে খেলতে খেলতে জঙ্গলের কাছাকাছি চলে যেতাম কিন্তু কখনওই খুব বেশীদূরে যেতাম না।
কিন্তু সেদিন বিকেলে শুধু আমি আর তানজিয়া খেলছিলাম। অন্য বন্ধুরা সেদিন কোনো কারণে আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারে নি।লুকোচুরি খেলার জন্য জঙ্গলটাই ছিল আদর্শ পরিবেশ। খেলতে খেলতে আমরা সেদিন বিকেলে জঙ্গলের অনেকটা ভেতরে চলে গেলাম আর তখনই আমরা সেই ভাঙা বাড়িটাকে প্রথম দেখলাম। জঙ্গলের মধ্যে সেই প্রথম একটা ভাঙা বাড়ি দেখতে পেয়ে আমাদের দু জনের কৌতূহলের সীমা রইল না। কৌতূহলের বশবর্তী হয়েই আমরা এগিয়ে গেলাম বাড়িটার দিকে।
ওটা'কে বাড়ি না বলে বাড়ির ধ্বংসস্তূপ বলাই ভালো। ইঁট বেরিয়ে পড়েছে, জীর্ণ একটা কঙ্কাল যেন। গায়ে গায়ে বট অশ্বত্থের চারা, দরজা জানলার পাল্লা বলে কিছু নেই। জঙ্গলে ভরে আছে প্রবেশ দরজার কাছটা। কিন্তু তা হলেও বাড়িটা বেশ অনেকখানি জায়গা নিয়ে। আমি আর তানজিয়া ঘুরে ঘুরে বাড়িটার আশপাশ দেখছিলাম। হঠাৎ একটা জায়গায় সুড়ঙ্গপথের মতো একটা কিছু দেখতে পেয়ে আমাদের কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। আমরা একরকম দৌড়ে এসে সুড়ঙ্গপথটার কাছাকাছি চলে এলাম।
বাইরে এখনো সূর্যের আলো। কিন্তু সুড়ঙ্গের ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিচে মনে হলো কোনো গুহা-টুহা আছে। আমরা সুড়ঙ্গের ভেতর না ঢুকে বাইরে মুখের কাছটায় দাঁড়িয়ে ইতস্তত করতে লাগলাম। আসলে কে আগে ঢুকব, তা-ই নিয়েই আলোচনা করছিলাম আমরা।
"....বাব্বাঃ! কি অন্ধকার! " ফিসফিস করে বলে উঠল তানজিয়া"ঢুকবি ভেতরে?"
"....না, এখন ঢুকে কাজ নেই!" ফিসফিস করে বলে উঠলাম আমি। আসলে সুড়ঙ্গপথের ভেতরের নিকষ কালো অন্ধকার আমার মনে কেমন একটা ভয় জাগিয়ে তুলেছিল।
কিন্ত তানজিয়ার ততক্ষণে বেশ কৌতূহল জেগে উঠেছে মনে। সে বলল, "নিচে গিয়ে একবার দেখলে হয় ভেতরে কি আছে!"
আমি একটু শিউরে উঠে বললাম, "না, দরকার নেই। কবেকার একটা সুড়ঙ্গ...!"
আমরা ফিসফিস করে এইসব আলোচনা করছি হঠাৎ এক ঝলক ঠাণ্ডা কনকনে হাওয়া ওই সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে উঠে এসে আমাদের গায়ে ঝাপটা মারল আর সেই সঙ্গে কিসের একটা মৃদু ফিসফিস শব্দ আমাদের কানে এসে বাজল। সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়ে উঠল আমার।
".....এই! কে যেন ফিসফিস করল ভেতরে, শুনলি?" হঠাৎ চাপা গলায় বলে উঠল তানজিয়া। বুঝলাম, শব্দটা ওরও কানে গেছে।
আমার কেমন অস্বস্তি হতে লাগল। গভীর জঙ্গলের ভেতরে কবেকার একটা পরিত্যক্ত বাড়ির সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে কে ফিসফিস করবে! আমার কেন যেন ভালো লাগছিল না। তানজিয়া কে তাড়া দিয়ে বললাম, "চল, চল, বাড়ি চল। ভালো লাগছে না এখানে"।
আমরা দুজনেই কথা বলছিলাম ফিসফিস করে। কেন যে আমরা ফিসফিস করে কথা বলছিলাম তা আমি বুঝতে পারছিলাম না। পরিত্যক্ত নির্জন একটা বাড়ির ধ্বংসস্তুপের একটা সুড়ঙ্গের মুখের কাছে দাঁড়িয়ে আমাদের ফিসফিস করে বলা কথাগুলো সেই অন্ধকার চাপা সুড়ঙ্গের নিচের গুহার ভেতরের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে হিসহিস করে আমার কানে এসে বাজছিল। আমার মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছিল। ভালো লাগছিল না আমার। কতক্ষণে এই জায়গা ছেড়ে যাব সেই চিন্তাই আমার মাথায় ঘুরছিল। কিন্তু তানজিয়ার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখতে পেলাম না। বরঞ্চ জায়গাটা নিয়ে তার উতরোত্তর বেশী উৎসাহ আর আগ্রহ দেখতে পেলাম।
মেয়েটা একদিকে কান পেতে বোধহয় সুড়ঙ্গের ভেতরের কিছু শোনার চেষ্টা করতে লাগল। আমার আর তর সইছিল না। তাগাদা লাগালাম, বাড়ি যাবার জন্য। কিন্তু তানজিয়া যেন আমায় পাত্তাই দিল না। হঠাৎ সে আমায় উদ্দেশ্য করে বলে উঠল, "শুনতে পাচ্ছিস, ভেতরে কেউ বোধহয় ফিসফিস করে কিছু বলছে!"
ওর কথায় আবার শিউরে উঠলাম আমি। পরিত্যক্ত এই দুর্গের সুড়ঙ্গের ভেতর কে ফিসফিস করবে! আমি বললাম, "তুই ভুল শুনছিস তানজিয়া কেউ নেই ভেতরে! ওটা অন্য কোনো দিক থেকে বাতাসে ভেসে আসা গাছের পাতার শব্দ!"
"....না!" জোর গলায় বলল তানজিয়া "তুই কান পেতে শোন, ভেতরে বোধহয় কেউ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে!"
আর ঠিক তখনিই গভীর গুহার অন্ধকার অতল থেকে ভেসে এল আবার সেই ফিসফিস শব্দ। আঁতকে উঠে আমি লাফিয়ে উঠে জাপটে ধরলাম তানজিয়া'কে।
তানজিয়া বিরক্ত হয়ে বলল, "কি মেয়েদের মতো করছিস? চল, একবার ভেতরে নেমে দেখাই যাক না, কে রয়েছে ওখানে!" বলেই আবার সেই সুড়ঙ্গপথের দিকে কান পেতে সেইরকম কিছু শোনার চেষ্টা করতে লাগল। দু-তিন মিনিট পর আবার উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "ঠিক যা ভেবেছি, বোধহয় একটা কুকুর পা হড়কে ওখানে পড়ে গিয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে!"
তানজিয়ার কথাটাকে আমি ঠিক গ্রহণ করতে পারলাম না। মন বারবার বলতে লাগল, একটু আগে শোনা ফিসফিস শব্দটা যে শুনলাম, ওটা কোনো কুকুরের শব্দ নয়। তাই বললাম, "তানজিয়া, তোর ভুল হচ্ছে, ওখানে কোনো কুকুর নেই। চল, ফিরে যাই"।
বলে ওর হাত ধরে টানতে গেলাম, কিন্তু এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে তানজিয়া বলল, "একটা কুকুর অসহায়ভাবে ওখানে পড়ে পড়ে কাতরাবে, না খেয়ে খেয়ে মরবে, তা-ই কি তুই চাস? ঠিক আছে, তোর ভয় করছে, তাহলে আমি একাই নামছি"।
বলে সে পাতালপুরীর অন্ধকার সিঁড়ির পথে পা বাড়িয়ে দিল।
আমার মন কু-ডাক ডেকে উঠল। খালি মনে হতে লাগল, ভেতরে ওই পাতালপুরীর ঘন অন্ধকারে যে-ই থাকুক,সে অন্তত মানুষ বা অন্য কোনো জীবিত প্রাণী নয়। আমার পা চলতে চাইছিল না, তবু তানজিয়া জোর করায় কোনোরকমে ওকে অনুসরণ করতে লাগলাম। ও আগে আগে অন্ধকার পাতালপুরীর সিঁড়ি দিয়ে পা টিপে টিপে নামতে লাগল আর ওকে অনুসরণ করে নামতে লাগলাম আমি। অন্ধকারে ভালো করে দৃষ্টি চলে না, নিচে কি আছে কিছুই দেখার উপায় নেই এমনই তরল ঘন অন্ধকার। সিঁড়ির ধাপগুলোকে স্পষ্ট দেখাও যাচ্ছে না। কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ ভেতরে। সিঁড়িতে পুরু ধুলোর চাদর টের পাচ্ছি। বোঝাই যাচ্ছে, এ পথে বহুদিন কেউ ওঠানামা করেনি। থেকে থেকে আমার বুকের ভেতরটা ছাঁৎ ছাঁৎ করছিল কিরকম একটা অমঙ্গলের আশঙ্কায়। শুধু মনে হচ্ছিল, কাজ নেই আর নেমে কিন্তু পাছে তানজিয়া আমায় 'কাপুরুষ' ভাবে তাই বাধ্য হয়ে ওকে অনুসরণ করতে হচ্ছিল আমায়।
একসময় সিঁড়ির ধাপ শেষ হল। আমরা একটা ঘরের মতো জায়গায় গিয়ে উপস্থিত হলাম। ঘন অন্ধকারে দৃষ্টি একেবারেই চলে না, তাই সামনে কি আছে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। অনেকক্ষণ পর অন্ধকারে দৃষ্টি সয়ে এলে মনে হল, ঘরের দেওয়ালের এদিকওদিক কিছু পুরনো আসবাব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমি আর তানজিয়া অন্ধকারেই চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো ঘরটা দেখতে লাগলাম। হঠাৎ মেঝের দিকে একটা জায়গায় মনে হলো, লম্বা কালো মতো একটা কিছু পড়ে রয়েছে। আমার আর তানজিয়ার সেদিকে দৃষ্টি পড়তেই আবার ফিসফিস করে উঠল ওটা। যন্ত্রণায় ককিয়ে ওঠার শব্দ নয়, বাতাসে অন্য কোনো দিক থেকে ভেসে আসা গাছের পাতার শব্দও নয় - ঘন রসালো চাপা ফিসফিসানির শব্দ।
"....এই তো বেচারা, আহারে!" বলেই অসীম সাহসের সঙ্গে তানজিয়া এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল বস্তুটার দিকে।
হঠাৎ কি হলো, আমি আর দাঁড়াতে পারলাম না সেখানে। ওই পাতালপুরীর অন্ধকারে আমি যেন হাঁফিয়ে উঠেছিলাম। আমি দৌড়তে দৌড়তে সিঁড়ি দিয়ে উঠে যেতে লাগলাম। সেই মূহুর্তে সূর্যালোক আর বাইরের টাটকা হাওয়া ছাড়া আমার মাথায় আর অন্য কিছু ছিল না। তানজিয়া অন্ধকার পাতালের ঘরটায় ওই ফিসফিসে বস্তুটার সঙ্গে রয়েছে ভেবেই আমার গা শিউরে উঠতে লাগল। আমি আরও জোরে জোরে কয়েকটা করে সিঁড়ির ধাপ একসঙ্গে উঠতে লাগলাম।
......কতক্ষণ পর বাইরে মুক্ত প্রকৃতির রাজ্যে এসে আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। বুক ভরে শ্বাস নিলাম টাটকা সতেজ বাতাস। গুহামুখের কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি হাঁফাতে লাগলাম। অপেক্ষা করতে লাগলাম তানজিয়ার জন্য।
কিন্তু মিনিটের পর মিনিট কেটে যেতে লাগল, ও আর আসে না। আধঘণ্টা কেটে গেল, তবু ওর ফেরার নাম নেই। আমি এবার বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। মেয়েটা এতক্ষণ ওই অন্ধকারের রাজ্যে করছে-টা কি? কোনো বিপদ আপদ হলো না তো ওর? মনের মধ্যে একটা দুশ্চিন্তা এলেও আর আমার ইচ্ছে হলো না নিচের ওই পাতালকুঠরিতে আরেকবার নামি। আমার দম যেন বন্ধ হয়ে এসেছিল ওখানে। কি ভয়ঙ্কর অন্ধকার নিচে! ওই অন্ধকার গহ্বরে কোনো প্রাণী থাকতে পারে! কিন্তু তানজিয়ার ব্যাপারখানা কি? ও যে সেই ওখানে রয়েছে তো রয়েছেই! বাড়িও ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না, ওকে এখানে একলা ফেলে যাই কি করে! আবার নিচে গিয়ে যে দেখব, সে সাহসও হচ্ছে না।
.....কি করব যখন ভেবে দোনামনা করছি তখন পাতালগুহা'র সিঁড়ি তানজিয়ার পদধ্বনি শুনতে পেলাম। একটু পরেই ওকে গুহামুখের কাছে দেখতে পেলাম। ও বাইরে আসতেই লক্ষ্য করলাম ওর মুখের চামড়া বেশ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ভাবলাম - যাক, ওর তবে ভয়ডর আছে। হয়তো পাতালকুঠরির অন্ধকারে এতক্ষণ থাকার জন্য ওর মুখ অমন ফ্যাকাসে লাগছে।
সে কিন্তু ফিরে এসেই আমায় একচোট নিল। বলল, "পালিয়ে এলি কেন? ভীতু কোথাকার! যা ভেবেছি, ঠিক তাই। একটা কুকুর ওখানে পা ভেঙে পড়ে আছে!"
তানজিয়ার যে কথাটা মোটেও সত্যি বলল না, কিছু একটা যে আমার কাছে গোপন করল, তা আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম। ভয়ে আমার বুক কেঁপে উঠল। কিন্তু তখন আর কিছু না বলে চুপ করে রইলাম। এই চুপ করে থাকার মাশুলই আমাকে পরে গুণতে হয়েছিল।
এরপর আমাদের আর কোনো কথা হলো না। চুপচাপ বাড়ির পথ ধরলাম। কিন্তু পাতালকুঠরির ওই বস্তুটা যে কি, কেন-ই বা অমন ফিসফিস করছিল - তা বুঝতে পারলাম না।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now