বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
পাত্তানীর সবুজ অরন্যে
চ্যাপ্টার- ৫
৫
রাত তখন ১টা।
আহমদ মুসা তার নতুন একতলা ভাড়া বাড়ির দরজা নিশব্দে লক করে বারান্দা পার হয়ে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামল। তারপর দু’শ গজের জায়গা পেরিয়ে রাস্তায় উঠে এল।
আহমদ মুসা সে মেলার দিনের ঘটনার পরই হোটেল ছেড়ে এই ভাড়া বাড়িতে এসে উঠেছে। বাছির থানমই তার পাড়ায় এই বাড়ি খুঁজে দিয়েছে। আহমদ মুসার সবচেয়ে সুবিধা হলো, এই পাড়া থেকে যয়নব যোবায়দাদের বাড়ি সোজা হিসাবে মাত্র ৫ মিনিটের দূরত্বে। কিন্তু মাঝখানে একটা পাহাড়, দু’টি উপত্যকা থাকায় ৫ মিনিটের জায়গায় আধা-ঘণ্টা সময় লাগে।
ঠিক আধা ঘণ্টাতেই আহমদ মুসা যয়নব যোবায়দার বাড়ি যে পাহাড়ের উপর তার গোড়ায় গিয়ে পৌছল। একটা পাথরের সিঁড়ি আকাবাঁকা হয়ে শাহ বাড়ি পর্যন্ত উঠে গেছে। বাড়িতে গাড়ি নিয়ে উঠার জন্যে পাহাড়ের গা বেয়ে ভিন্ন পাকা রাস্তা রয়েছে।
আহমদ মুসা সিঁড়ি ব্যবহার না করে সিঁড়ি থেকে একটু দূরে ছোট ছোট গাছ-গাছড়ার আড়াল নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পাহাড় বেয়ে উঠতে লাগল।
দূর থেকে দেখলে মনে হয় না, কিন্তু উঠতে গিয়ে দেখল পাহাড় তার ধারণার চেয়ে অনেক উঁচু। শাহ বাড়ির পাশের লনে গিয়ে যখন উঠল, তখন ঘামে নেয়ে উঠেছে আহমদ মুসা।
লনে উঠার পর আহমদ মুসা বাড়ির চারদিক একবার ঘুরে এল। গাড়ি বারান্দা পার হওয়অর সময় দাঁড়ানো দুটি গাড়ির একটি গাড়ি থেকে আসা উত্তাপ অনুভব করল।
আহমদ মুসা গাড়ি দু’টির দিকে এগোলো। স্পর্শ করল দুটি গাড়িই। একটা একেবারেই ঠান্ডা, অন্যটি পুরোপুরি গরম। মনে হচ্ছে দু’চার মিনিট আগে ইঞ্জিনের ষ্টার্ট বন্ধ হয়েছে। দুটি গাড়িই ভালো করে দেখল আহমদ মুসা। গরম গাড়িটায় সাইলেন্সার লাগানো। দ্বিতীয় গাড়িটায় নেই। এই ধরনের সাইলেন্সার যেসব গাড়িতে লাগানো হয়, সেসব গাড়ি কোন গোপন মিশনে যায়। এই রাত ২টায় গোপন মিশনে কে এল এই বাড়িতে? আহমদ মুসা নিশ্চিত ঠান্ডা গাড়িটাই যয়নব যোবায়দাদের হবে। আর গরম গাড়িটা নিশ্চয় কোন আগন্তুকের। এই আগন্তুক কি যয়নব যোবায়দা-পরিবারের বন্ধু, না শত্রু?
সতর্ক হলো আহমদ মুসা।
ধীরে ধীরে বারান্দায় উঠে গেল সে। ভেতরে ঢোকার দরজাটা বন্ধ। দরজার সামনে আসতেই বাতাসে লোহা পোড়ার একটা গন্ধ পেল আহমদ মুসা। এটা নিশ্চয় লেসার বীম দিয়ে লক পোড়ানোর গন্ধ। উদ্বেগ দেখা দিল আহমদ মুসার মনে। তাহলে শত্রুই ভেতরে ঢুকেছে দেখা যায়। কারা হতে পারে? ব্ল্যাক ঈগলরা? তারাই হবে। নিশ্চয় জাবের জহীর উদ্দিনকে হাতে নেয়ার জন্যে যয়নব যোবায়দা তাদের টার্গেট। আজ যয়নব যোবায়দা কি এ বাড়িতে আছে? খোঁজ না নিয়ে এরা আসেনি নিশ্চয়!
বিসমিল্লাহ বলে আহমদ মুসা দরজার হাতল ঘোরাল। দরজা খোলা। দরজা খুলে বিড়ালের মত নিঃশব্দে ঘরে প্রবেশ করল আহমদ মুসা। ঘরে আলো নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকার।
পেছনে দরজা বন্ধ করে অনেকক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকল আহমদ মুসা অন্ধকারকে গা সহা করে নেবার জন্য।
আহমদ মুসা দরজার পেছনে সোজা বিপরীত দিকে তাকিয়েছিল। তার ধারণা এ ঘর থেকে ভেতরে যাবার দরজাটা সোজা বিপরীত দিকেই হবে। কিন্তু না, সেদিকে জমাট অন্ধকার। ঘর লম্বালম্বি, ঘরের বাম ও ডান দিকে তাকাল।
ডান দিকে চোখ পড়তেই একটা আলোর রেশ পেল। ওটাই দরজা।
দরজায় পৌছল আহমদ মুসা।
দরজার পরেই একটা করিডোর। করিডোরটা আরও স্বচ্ছ।
করিডোর সোজা সামনে তাকিয়ে দেখল, করিডোরটা একটা বড় বারান্দায় গিয়ে শেষ হয়েছে।
বারান্দা আরও একটু উজ্জ্বল।
কোত্থেকে সরাসরি একটা আলোর রেশ এসে পড়েছে বারান্দায়।
বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
বারান্দাটি বিশাল বৃত্তাকার একটা অংশ। এই বৃত্তাকার বারান্দার মাঝখানে বিশাল উঁচু একটা পাথুরে বেদি। কয়েকশ’ লোক বসতে পারে সে বেদিতে। বেদির ডান প্রান্তে সিংহাসনকৃতির একটা বড় সুদৃশ্য চেয়ার। সে সিংহাসনের পেছনেই বারান্দায় এসে মিশে যাওয়া উপরে উঠার সিঁড়ি। সিঁড়ির মুখে উজ্জ্বল আলো। সে আলোই চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
নিশ্চিত বুঝল আহমদ মুসা, বেদিটি একটা দরবার হল। সুলতান বসতেন সিংহাসনাকৃতির এ চেয়ারে। চেয়ারের দু’পাশ দিয়ে বেদি থেকে সিঁড়ি নেমে গেছে বারান্দায়। সুলতান সিঁড়ি দিয়ে দু’তলা বা তিন তলা থেকে নেমে চেয়ারের পাশের সিঁড়ি দিয়ে এসে সিংহাসনে বসতেন। এই চেয়ারই একদিন ছিল পাত্তানীর শাসনের আসন।
আহমদ মুসা সিঁড়ির দিকে এগোবে এমন সময় ওপর থেকে নারী কণ্ঠের চিৎকার। কান্নাকাটি। তারপরেই গুলীর শব্দ।
চমকে উঠে আহমদ মুসা সিঁড়ির দিকে ছুটল। বেড়ালের মত নিঃশব্দে ছুটে গিয়ে দু’তলায় উঠল।
তখন কান্না, চিৎকার থেমে গেছে।
উৎকর্ণ হলো আহমদ মুসা। কান্নার শব্দ কি দু’তলা থেকে এসেছিল, না তিন তলা থেকে?
হঠাৎ একটা কণ্ঠ শুনতে পেল সে। ভারী ক্রুব্ধ কণ্ঠ। বলছে, ‘আমরা শুধু যোবায়দাকে নিয়ে যাব। কিন্তু যারা বাধা দেবে সবাইকে হত্যা করব।’
বলে একটু থেমেই কণ্ঠটি চিৎকার করে উঠল, ‘সরে যাও সামনে থেকে।’ পর মুহূর্তেই পরপর দু’টি গুলীর শব্দ। সেই সাথে আর্তচিৎকার।
আহমদ মুসা দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে তিন তলায় উঠল।
দক্ষিণ দিক থেকে শব্দ আসছে। ছুটল সেদিকে।
পৌছল দক্ষিণ প্রান্তে। দেখতে পেল ঘরটি।
কিন্তু ঘরের দরজায় দু’জন দাঁড়িয়ে আছে ষ্টেনগান নিয়ে, ওরা দেখতে পেয়েছে আহমদ মুসাকে। ষ্টেনগান তুলে ধরল ওরা।
উপায়ন্তর না দেখে আহমদ মুসা বাম পাশে নিজেকে মাটির উপর ছুড়ে দিল চোখের পলকে। এক ঝাঁক গুলী উড়ে গেল যেখানে সে দাঁড়িয়েছিল সেখান দিয়ে।
মাটিতে পড়েই আহমদ মুসা পরপর দু’টি গুলী করল দরজার ষ্টেনগানধারী দু’জনকে। ওরা ষ্টেনগানের নতুন লক্ষ্য স্থির করার আগেই গুলী খেয়ে পড়ে গেল।
গুলী করেই আহমদ মুসা গড়িয়ে দরজার সরাসরি সামনের অবস্থান থেকে একপাশে সরে গেল যাতে গুলীর শব্দ শুনে ভেতর থেকে যারা ছুটে আসবে প্রথমেই তাদের চোখে পড়ে না যায় সে। গুলীর শব্দ শুনেই গুলী করতে করতে ভেতর থেকে দু’জন বেরিয়ে এল। সামনে কাউকে না দেখে পাশে খোঁজ করার জন্যে তাকাতে লাগল। এই সময়টায় তাদের গুলী বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এই সময়টুকুই আহমদ মুসার জন্যে যথেষ্ট। তার রিভলবার ওদের তাক করল। শেষ মুর্হর্তে ওরা দেখতে পেয়েছিল আহমদ মুসাকে। কিন্তু ষ্টেনগান সক্রিয় হবার আগেই আহমদ মুসার রিভলবারের দু’টি গুলী ওদের ওপর মোক্ষম আঘাত হানল। ভূমি শয্যা নিল ওরা।
গুলী করেই আবার স্থান পরিবর্তনে এগোলো আহমদ মুসা। ভাবল সে, ভেতরে অস্ত্রধারী যারা আছে, তারা এখন সাবধান হবে। না দেখে শুনে গেটের সামনে দৌড়ে আসবে না। সুতরাং আহমদ মুসাকেই এখন ওদের কাছাকাছি পৌছতে হবে।
আহমদ মুসা ফুটবলের মত দ্রুত গড়িয়ে দরজার পাশে দেয়ালের আড়ালে পৌছে উঠে দাঁড়াল। রিভলবারে নতুন করে গুলী লোড করল। তারপর রিভলবার বাগিয়ে দরজার চৌকাঠের সমান্তরাল হবার জন্যে এগোলো।
চৌকাঠের সমান্তরাল থেকে একটু মুখ বাড়াতেই আরেকজন ষ্টেনগানধারীর একেবারে মুখোমুখি হয়ে গেল। সে দরজার এদিকের দেয়াল ঘেঁষে সামনে আসছিল। তারও ষ্টেনগান উদ্যত ছিল, কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল সামনে। সে ট্রিগার টিপে ষ্টেনগানের মুখ ঘুরাতে গিয়েছিল। তবে তার আগেই আহমদ মুসার প্রস্তুত রিভলবারের গুলী তার মাথা গুড়িয়ে দিল।
গুলীর সাথে সাথেই আহমদ মুসা তার মুখটা দরজায় আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তার চোখের অনুসরণ করে তার রিভলবারের নলও ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
ঘরের ভেতরে চোখ পড়তেই আহমদ মুসা দেখল, প্রায় ছয় ফুটের মত লম্বা বডি বিল্ডার জাতীয় একজন লোকের ভয়ংকর বেল্ট মেশিনগান। তার মেশিনগানটা দরজার দিকে তাক করা থাকলেও তার চোখ এসে পড়েছে আহমদ মুসার ওপর। তার চোখে এক বিমূঢ় ভাব ফুটে উঠেছে। সেটা কাটতেই তার পকেট মেশিনগারে ছোট্ট ব্যারেল আহমদ মুসার দিকে ফেরাতে যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা কঠোর কণ্ঠে। বলল, ‘তোমার মেশিনগানের ব্যারেল সুঁচ পরিমাণ নড়লে আমি গুলী করব। আর আমার গুলী............।’
আহমদ মুসা কথা শেষ করতে পারল না। বেপরোয়া লোকটির মেশিনগানের ব্যারেল ঘুরে আসছিল। কথার মাঝখানেই আহমদ মুসার তর্জনি রিভলবারের ট্রিগার টিপে দিয়েছিল।
গুলী গিয়ে বিদ্ধ করল তার হাতকে। মেশিনগান পড়ে গেল তার হাত থেকে।
তার সামনেই পড়েছিল একজন তরুণীর লাশ। সেই লাশের ওদিকে পালংকের খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে আছে অভিজাত চেহারার অপরূপ একটি মেয়ে। কিন্তু অসীম আতংকে মুষড়ে গেছে তার চেহারা। মেয়েটিকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন তরুণী। তার মধ্যে রুখে দাঁড়ানো ভাব। আর পালংকের ওপ্রান্তে পালংকের খুঁটিতে ঠেশ দিয়ে আছে এক স্বর্গীয় চেহারার বৃদ্ধা। কিন্তু তার চোখ-মুখে বিপর্যস্ত-বিহবল দৃষ্টি।
হাতে গুলী খেয়েই ছয় ফুট দৈর্ঘ্যের বডি বিল্ডার লোকটি ঝড়ের গতিতে এগোলো মেয়ে দু’টির দিকে। সে বাম হাত দিয়ে পকেট থেকে আরেকটি রিভলবার বের করে নিয়েছিল।
আহমদ মুসা তার মতলব বুঝে ফেলল। সে মেয়ে দু’টিকে ঢাল বানিয়ে নতুন আক্রমণের পথ করতে চাচ্ছে।
‘দাড়াও।’ আহমদ মুসা তীব্র কণ্ঠে বলল।
কিন্তু তার দাঁড়ানোর কোন লক্ষণ নেই। সে প্রায় মেয়েদের পেছনে চলে গিয়েছিল। মেয়ে দু’টিকে সামনে টেনে নেবার জন্য সে হাতও বাড়িয়েছিল।
আহমদ মুসার তর্জনি আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তার রিভলবারের গুলী সামনের মেয়েটির কানের পাশ দিয়ে গিয়ে বিদ্ধ করল লোকটির বুকের বাম পাশ।
লোকটির দেহ টলে উঠে ছিটকে পড়ে গেল উল্টো দিকে।
আহমদ মুসার মুখে একটা বেদনার ছায়া নামল। মুখটা তার একটু উপর উঠল। তার মুখ থেকে স্বগত বেরিয়ে এল, ‘উঃ স্যরি। এই লোকটিকে মারতে চাইনি। এ জন্যেই প্রথম গুলীটা হাতে করেছিলাম। কিন্তু মারতেই হলো। বাঁচানো গেলে তার কাছ থেকে অনেক কথা আদায় করা যেত।’
বলেই আহমদ মুসা মাটিতে পড়ে থাকা গুলীবিদ্ধ মেয়েটার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তার আহত স্থানের রক্তে তখনও কাপড় ভিজে উঠতে দেখা যাচ্ছিল। এটা তার বেঁচে থাকার লক্ষণ।
আহমদ মুসা মেয়েটির গলার শা-রগে হাত রেখে দেখল তার নাড়ী সচল। বেঁচে আছে মেয়েটি।
আহমদ মুসা ঘরে ঢুকেই বুঝতে পেরেছে তরুণী মেয়েটার পেছনে পালংকের খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে থাকা অভিজাত সুন্দর মেয়েটিই যয়নব যোবায়দা। আর ওপাশের বয়স্কা মহিলাই যয়নব যোবায়দার দাদী। বাছির থানম বলেছিল যয়নব যোবায়দারা এ বাড়িতেই সময় সময় থাকে। অন্যদিকে যয়নব যোবায়দার সামনের তরুণীটি এবং গুলীবিদ্ধ মেয়েটি বাড়ির পরিচারিকা হবে তা দেখেই বুঝতে পেরেছে আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা দাদীর দিকে চেয়ে বলল, ‘দাদীমা, মেয়েটি এখনও বেঁচে আছে।’
বলেই আহমদ মুসা তাকাল যয়নব যোবায়দার দিকে। তারপর সামনে দাঁড়ানো মেয়েটিকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তুমি এসো। এর আহত জায়গার জামা ছিঁড়ে ফেল। ওখানকার রক্ত মুছে দাও।’
যয়নব যোবায়দা, দাদী এবং পরিচারিকা নূরী রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে ছিল আহমদ মুসার দিকে। যেন আকাশ থেকে পড়ল মেলার মাঠের চ্যাম্পিয়ন সেই লোকটিকে দেখে! সে কি করে এল এখানে? নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে কেন বাঁচাচ্ছে সে তাদেরকে?
দাদীকে উদ্দেশ্য করে আহমদ মুসার কথা এবং পরিচারিকাকে কাজের জন্যে আহবান করা থেকে তারা সম্বিত ফিরে পেল।
আহমদ মুসার নির্দেশ শুনে পরিচারিকা নূরী তাকাল যয়নব যোবায়দার মুখের দিকে।
‘তাড়াতাড়ি যাও, উনি যা বলছেন তা কর।’ বলল যয়নব যোবায়দা। তার বিমূঢ় দৃষ্টি আবার ফিরে গেল আহমদ মুসার দিকে। কে এই লোক? কেমন করে সে বুঝল আজ এই সময় আমি আক্রান্ত হবো? গতকাল এই লোকটিও আক্রান্ত হয়েছিল। তাঁকে আক্রমণ করেছিল যারা এবং আমাকে আক্রমণকারী এরা কি একই গ্রুপের? তা কি করে হয়? আমাকে যারা কিডন্যাপ করতে এসেছিল, তারা নিশ্চয় ভাইয়া ও আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী। এ ষড়যন্ত্রকারীরা তার বিরুদ্ধে যাবে কেন? হাজারো চিন্তা যয়নব যোবায়দার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল।
পরিচারিকা নূরী গিয়ে মেয়েটির গুলীবিদ্ধ স্থানের জামা ছিঁড়ে ফেলল। তারপর নিজের ওড়নার অংশবিশেষ ছিঁড়ে আস্তে আস্তে যত্নের সাথে রক্ত মুছে ফেলল।
আহমদ মুসা একটু ঝুঁকে পড়ে আহত জায়গাটা পরীক্ষা করল। আহমদ মুসা পরিচারিকা নূরীকে মেয়েটির বাম কাঁধটা একটু উঁচু করতে বলল। কাঁধটা উঁচু করলে আহমদ মুসা নিচের দিকটাও পরীক্ষা করল। মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার। মুখ তুলে বলল, ‘দাদীমা, মিস যয়নব যোবায়দা এর আঘাত সিরিয়াস নয়। গুলীটা হার্টের অনেক বাইরে দিয়ে কোনাকুণিভাবে এগিয়ে কাঁধের নিচে পাঁজরের প্রান্তে চলে এসেছে। সামান্য অপারেশনেই গুলীটা বের করা যাবে। আর মেয়েটা আঘাতের কারণে ভয়ে সংগা হারিয়েছে।’
‘ধন্যবাদ জনাব। তাহলে তো এখনই ডাক্তার ডাকতে হয়?’ বলল যয়নব যোবায়দা।
‘আপনাদের বিশ্বস্ত কোন ডাক্তার আছে?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
সংগে সংগে উত্তর দিল না যয়নব যোবায়দা।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘বুঝেছি। ডাক্তার ডাকার দরকার নেই। ডাক্তার বিশ্বস্ত না হলে অহেতুক পুলিশের ঝামেলায় পড়তে হবে। আপনারা রাজি হলে গুলীটি আমিই বের করতে পারি।’
দাদী অনেক আগেই এসে আহত মেয়েটির পাশে দাঁড়িয়েছিল। বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘তুমি কেমন ছেলে ভাই, তুমি আমাদের সবাইকে বাঁচালে, এখন আরেকজনকে বাঁচার জন্য অনুমতি চাইছ!’
‘ধন্যবাদ দাদী মা। এখনই অপারেশন হবে।’ বলে পরিচারিকা নূরীকে বলল মেয়েটিকে কাত করে শুইয়ে দিতে।
মেয়েটিকে কাত করে শুইয়ে দিল পরিচারিকা।
আহমদ মুসা জ্যাকেটের কলারের একটা গোপন বোতাম খুলে ভেতর থেকে দেড় ইঞ্চি লম্বা ও কোয়ার্টার ইঞ্চি প্রস্তের একটা ছুরি বের করল। ছুরির এ্যান্সিসেপটিক কভার খুলে ছুরিটি আনফোল্ড করে যয়নব যোবায়দার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার ফাষ্ট এইড বক্স আছে নিশ্চয়। আনিয়ে দিন প্লিজ।’
‘আছে জনাব। নূরী ওঁকে সাহায্য কর। আমি নিয়ে আসছি।’
বলে যয়নব যোবায়দা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মিনিট খানেকের মধ্যে ফাষ্ট এইড বক্স নিয়ে হাজির হলো।
আহমদ মুসা সংগে সংগে কাজে লেগে গেল।
বুক ও বাহুসন্ধির মাঝামাঝি জায়গায় গুলীটি আটকে আছে।
জায়গাটায় স্পিরিট ক্লিন করে ছুরি চালাবার আগে নূরীকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তুমি এর সামনে হাঁটু গেরে বস। এর দেহটাকে তোমার উপর ঠেস দিয়ে রাখ। মাথা ও দেহটাকে শক্ত করে ধরবে। আঘাত পেলে জেগে যাবার সম্ভাবনা আছে। দেখ যেন না নড়ে। এঁকে ক্লোরোফরম করলাম না। কারণ এ রক্ত ক্ষরণে দূর্বল হয়ে পড়েছে।’
যয়নব যোবায়দা মেয়েটির মাথার কাছে বসে পড়ে বলল, ‘নূরী আমি এর মাথা ধরছি, তুই এর শরীরকে তোর সাথে সেঁটে নিয়ে শক্ত করে ধর।’
আহমদ মুসা দ্রুত ও নিমর্মভাবে ছুরি চালার। মেয়েটি সংগা ফিরে পেয়ে চিৎকার করে উঠল, তখন আহমদ মুসা বুলেটটি বের করে ফেলেছে।
আহমদ মুসা দ্রুত ব্যান্ডেজ করে দিল মেয়েটির অপারেশন করা ও গুলীবিদ্ধ স্থানটি।
যয়নব যোবায়দা, দাদী, নূরী সবাই অপার বিস্ময়ের সাথে আহমদ মুসার কাজ দেখছিল। আর মাঝে মাঝেই তাকাচ্ছিল আহমদ মুসার ভাবলেশহীন, সরল, সুন্দর মুখের দিকে।
ব্যান্ডেজ হয়ে গেলে যয়নব যোবায়দার মুখ ফুঁড়েই যেন বেরিয়ে এল, ‘ধন্যবাদ জনাব। আপনি কি ডাক্তারও।’
‘না, ডাক্তার নই। যা দেখলেন এসব আমি দেখে শিখেছি। আমার দেহেও এমন অপারেশন অনেক হয়েছে তো!’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা নূরীকে বলল, ‘তুমি মেয়েটার সামনেটা ধর, আমি পায়ের দিকটা ধরছি। চলো একে এর বিছানায় শুইয়ে দিই।’
‘স্যার একটু দাঁড়ান। আমি এর বিছানাটা ঠিক করে আসি।’
বলে দৌড় দিল পরিচারিকা নূরী।
‘তুমি কে ভাই, আল্লাহর ফেরেশতার মত এভাবে হাজির হলে? তোমাকে ধন্যবাদ দেবার মত উপযুক্ত ভাষা দুনিয়ায় তৈরি হয়নি ভাই।’ নূরী বেরিয়ে যেতেই বলল দাদী।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘দাদীমা আমাদের এই ক্ষুদ্র কাজকে ধন্যবাদ দেবার মত ভাষা যদি না থাকে, তাহলে যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, আমাকে এই জ্ঞান ও যোগ্যতা দান করেছেন, অপার বিস্ময়ের এই বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন তাঁকে ধন্যবাদ কিভাবে দেবেন!’
‘তুমি মুসলমান ভাই?’ প্রশ্ন দাদীমার। তার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
‘হ্যাঁ, আমি এটা দাবী করি দাদীমা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আলহামদুলিল্লাহ। কাল মেলার মাঠে যখন খেললে, চ্যাম্পিয়ন হলে, তখন তোমাকে বিদেশী ট্যুরিষ্ট বলা হয়েছিল। তবে আমি তোমার অন্য কোন পরিচয় আছে ভেবেছিলাম।’ বলল দাদীমা।
‘জনাব, কালকে মাঠে যারা আপনাকে আক্রমণ করেছিল, তারা এবং এই আক্রমণকারীরা কি এক?’ দাদী থামতেই প্রশ্ন করল যয়নব যোবায়দা।
আহমদ মুসা মূহূর্তের জন্যে মুখ তুলল যয়নব যোবায়দার দিকে। তারপর মুখ নামিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ আমি এক মনে করি। আপনারা কি কাল মেলায় ছিলেন?’
‘না জনাব। আমরা সব সময়ের মত গতকালও বাসায় বসে দূরবীনে খেলা দেখেছি।’
কথা শেষ করে যোবায়দা আবার সংগে সংগেই বলে উঠল, ‘আক্রমণকারীরা কারা?’
‘এরা ব্ল্যাক ঈগল’-এর লোক।
‘ব্ল্যাক ঈগল কারা?’
‘এরাই থাইল্যান্ডে মুসলমানদের নামে সন্ত্রাস করে মুসলমানদের সন্ত্রাসী সাজাবার কাজ করেছে। বিভ্রান্ত পুতুল কিছু মুসলমানকেও তারা তৈরি করেছে তাদের জন্যে।’
অপার বিস্ময়ের এক সয়লাব এসে আছড়ে পড়েছে যয়নব যোবায়দার চোখে-মুখে। সে সংগে সংগে কথা বলতে পারল না। এই বিস্ময় তার বুকটাকেও যেন কাঁপাচ্ছে। গোটা শরীরকে এই বিস্ময় যেন ওজনহীন অনুভূতিহীন করে দিচ্ছে। যে কথা তারা শত চেষ্টাতেও জানতে পারেনি, যার অস্তিত্ব পুলিশও বিশ্বাস করে না, সে বিষয়টা ইনি এমন অবলিলাক্রমে বলে দিলেন?
নূরী এসে পড়েছে। বলল আহমদ মুসাকে, ‘সব ঠিক-ঠাক, চলুন স্যার।’
আহমদ মুসা ও নূরী ধরাধরি করে মেয়েটির দেহ চ্যাং দোলা করে নিয়ে চলল।
চলে গেল তারা ঘরের বাইরে পরিচারিকাটির ঘরের দিকে্
ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই যয়নব যোবায়দা ধপ করে পালংকের উপর বসে পড়ল।
দাদীও তার কাছে এসে বসল। বলল, ‘আল্লাহর হাজার, লাখো শোকর। তিনিই এই ভাইকে অসহায়দের সাহায্যে পাঠিয়েছেন।’
যয়নব যোবায়দার সম্বিত হারা ভাব কেটে গেল। বলল, ‘কে এই লোক দাদী? আল্লাহর ফেরেশতা নয় তো! সব যোগ্যতা তিনি রাখেন, সব কথা তিনি জানেন। কোন লোকের পক্ষে এটা কি করে সত্য হতে পারে!’
‘আমার বিস্ময় লাগছে, তার কলারের ভেতর অপারেশন করার ছুরিও ছিল। তাহলে কি নেই তার কাছে? সত্যি বলেছিস বোন, ও অবিশ্বাস্য এক মানুষ।’ বলল দাদী।
‘বিশেষ করে মুসলমানদের মধ্যে এমন লোক একজনই আছেন। কিন্তু তিনি তো..........।’
কথা শেষ করতে পারলো না যয়নব যোবায়দা। ঘরে ঢুকল আহমদ মুসা ও পরিচারিকা নূরী।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now