বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
পাত্তানীর সবুজ অরন্যে
চ্যাপ্টার- ৪
বাকি অংশ
এই মাত্র বাড়ি এসেছে যয়নব যোবায়দা। মাথার চাদর ও রুমাল এবং গা থেকে বোরখা খুলে পরিচারিকার হাতে দিয়ে ইজি চেয়ারে ধপ করে বসে গা এলিয়ে দিল চেয়ারে।
বাইরে থেকে আসার ক্লান্তি শুধু নয়, একটা বিমর্ষভাবও তার সুন্দর মুখকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
বিশ বছর বয়স যয়নব যোবায়দার। পাঁচ ফিট কয়েক ইঞ্চি লম্বা হবে। সোনা রং গায়ের। চুলও সোনালী। চোখ নীল। গায়ে গাঢ় বাদামী রংয়ের থ্রি পীস।
ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজেছে যয়নব যোবায়দা।
চোখ বোজার পর তার অতীত ও বর্তমান এক হয়ে গেছে। ভবিষ্যতও কালো মেঘের রূপ নিয়ে সামনে হাজির। জাবের জহীর উদ্দিন কোর্ট থেকে পালানো এবং তার নিজের সৈন্য ফাঁড়িতে সন্ত্রাসী হামলার খবর সংবাদপত্রে পড়ে যয়নব যোবায়দা সাংঘাতিকভাবে মুষড়ে পড়েছে। তার ভাই জাবের জহীর উদ্দিন সন্ত্রাসে নামবে, সন্ত্রাসী হবে, এটা তার কাছে অবিশ্বাস্য। এর চেয়েও অবিশ্বাস্য হলো তার ভাই জেল থেকে বেরুবার পর একবারও তার কাছে টেলিফোন করেনি। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। না বুঝতে পেরে আরও আতংকিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে দাদীর পর, তার সবচেয়ে প্রিয়জন ফরহাদ ফরিদ উদ্দিন প্রাণে বাঁচার জন্যে পলাতক জিন্দেগী যাপন করছে। সে মেয়ে মানুষ তার কি করার ক্ষমতা আছে! দাদীর পরামর্শে আল্লাহর নাম নিয়ে বহু আশা করে চিঠি দিয়ে পাতার নৌকা ছেড়েছিল। সে কোন ঠিকানায় পৌছেছে, না সমুদ্রে সলিল সমাধি হয়েছে তা জানারও কোন উপায় নেই। আল্লাহ তাকে কোন সাহায্য করবেন না? চোখের দু’কোণ ভিজে উঠল তার।
খোলা দরজা পথে ঘরে প্রবেশ করল যয়নব যোবায়দার দাদী।
ধীরে ধীরে এসে সে যয়নব যোবায়দার মুখের সামনে দাঁড়াল। একটা হাত রাখল যয়নব যোবায়দার কপালে। স্নেহমাখা কণ্ঠে বলল ‘খুব খারাপ লাগছে বোন?’ যয়নব যোবায়দা চট করে চোখ খুলে উঠে দাঁড়াল ইজি চেয়ার থেকে। দু’হাত ধরে দাদীকে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বলল, ‘না দাদীমা আমার শরীর খারাপ করেনি।’
বলে যয়নব যোবায়দা দাদীর পায়ের কাছে কার্পেটের উপর বসে পড়ল।
‘শরীর খারাপের কথা বলিনি বোন। মন খুব খারাপ করছে কিনা সেটাই জিজ্ঞাসা করেছিলাম। মন খারাপ এটা তোর জন্যে কোন খবর নয়, খুব খারাপ কিনা এটাই খবর।’
‘শুধু আমার কথা বলছ কেন দাদী। তোমার দুঃখের কথা এড়িয়ে যাচ্ছ কেন?’
ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজল দাদী। কিন্তু বুজে যাওয়া চোখের পাতা ভেদ করে দু’চোখ থেকে বেরিয়ে এল অশ্রুর দুটি ধারা। বলল, ‘তোরা তাই মনে করিস। তোরা কিছু না বললেই আমি কিছু দেখি না, শুনি না, বুঝি না। জহীর কোথায় হারিয়ে গেল বলিসনি, পাত্তানীর এত লোক খুন হচ্ছে, সৈনিকরা মরছে কেন, তা তোরা বলিসনি। জহীরের মত তুইও হারিয়ে গেছিস কোন এক সকালে উঠে শুনব। সেদিনও জানব না কি হচ্ছে, এসব কেন হচ্ছে? কিন্তু আমার চোখ বন্ধ নয়, কারও বন্ধ নয়।’
‘কিন্তু তুমিই বল দাদী, এসব কথা শুনতে যতখানি কষ্ট, বলতে কষ্ট তার চেয়ে অনেক বেশি কি-না? তাই চেয়েছি দাদী তোমার ঘাড়েও বেদনার দুঃসহ বোঝা চাপিয়ে নিজের দুঃখ আরও না বাড়াতে।’ বলল যয়নব যোবায়দা। তার কণ্ঠ ভারী।
দাদী যয়নব যোবায়দার মাথাটা কোলে টেনে নিল। বলল, ‘বোকা বোন, দুঃখ ভাগ করে নিতে হয়। তাতে দুঃখের ভার কমে।’
বলে একটু থামল। বোধ হয় একটু ভাবল। তারপর সরাসরি তাকাল যয়নব যোবায়দার দিকে। চোখে চোখ রেখে বলল, ‘সত্যি করে বলতো যোবায়দা, জহীর কি সত্যই অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে?’
‘না দাদীমা, এটা সত্য নয়।’ দ্বিধাহীন দৃঢ় কণ্ঠে বলল যয়নব যোবায়দা।
‘তাহলে কি সত্য?’
‘পাত্তানীর নেতৃস্থানীয় আমাদের এই পরিবারকে সন্ত্রাসী সাজিয়ে পাত্তানীর মুসলমানদের উপর সন্ত্রাসের অভিযোগে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে।’
‘তাহলে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা জহীরকে পুলিশের হাত থেকে মুক্ত করে নিয়ে যাওয়ার ব্যখ্যা কি এবং সেদিন সশস্ত্র হামলায় জহীর নিজে অংশ নেয়া এবং তার রক্তমাখা জামা পাওয়ারই বা ব্যাখ্যা কি?’
সংগে সংগে উত্তর দিল না যয়নব যোবায়দা। তাকে খুবই বিব্রত দেখাল। মুহূর্ত কয়েক পর ধীর কণ্ঠে বলল, ‘এই ব্যাখ্যা আমিও তালাশ করছি দাদীমা। কিন্তু নিশ্চিত করে বলতে পারি দাদীমা, ভাইয়ার নামে যা বলা হচ্ছে সব মিথ্যা, সব ষড়যন্ত্র।’
‘তোর নিশ্চিত হওয়ার কারণ?’
‘কারণ আমি ভাইয়াকে জানি, ভাইয়ার চিন্তাধারা আমি জানি। ইসলাম প্রচারে আল্লাহর রাসুল স. যে পথ অনুসরণ করেছেন, তার বাইরে আর কোন পথ ইসলামী নয়। ইসলাম প্রচারের পথে বাধা এলে তার মোকাবিলা শক্তি বা সন্ত্রাস দিয়ে নয়, যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে করতে হবে। ইসলাম প্রতিটি মানুষকে সংশোধন করতে চায়, কাউকে সংহার নয়। আদর্শিক, সামাজিক ও সামষ্টিক প্রয়েঅজনে অস্ত্র ব্যবহারের অধিকার শুধু রাষ্ট্রের, এমন অনুমতি কেবল রাষ্ট্রের মত অথরিটিই দিতে পারে। এই বিশ্বাস ভাইয়ার মজ্জাগত বলা যা। সুতরাং তিনি সন্ত্রাসী কাজে রত হবেন এটা অবিশ্বাস্য।’ যয়নব যোবায়দা বলল।
‘মানুষের মত তো পরিবর্তন হতে পারে।’ বলল দাদী।
‘দাদী, ভাইয়ার ওটা মত নয়, ওটা তার বিশ্বাস, ঈমান। ঈমান পরিবর্তন করে মুসলমান থাকার প্রশ্ন ওঠে না।’
গম্ভীর হয়ে উঠেছে দাদীর মুখ। বলল, ‘তুমি ঠিক বলেছ যোবায়দা। কিন্তু ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যা তাহলে কি? ষড়যন্ত্র যদি হয়, তাহলে ষড়যন্ত্র কার, কেন? জহীর সে ষড়যন্ত্রের হাতে পুতুল হয়ে গেল কি করে?’
‘পুতুল হয়েছে আমি মনে করি না দাদী। ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যাও আমি জানি না। ভয়াবহ এক সংকট আমাদের গ্রাস করছে, আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু জানি না সে সংকটটা কি? জানাও আমার সাধ্যের অতীত। কি করব তার কোন কূল-কিনারা পাচ্ছি না।’
‘তুই যে আল্লাহর ‘কেয়ার অব’-এ একটা খোলা চিঠি পাঠিয়েছিলি তার কি হলো?’
বেদনায় ভারী হয়ে গেল যয়নব যোবায়দার মুখ। বলল, ‘আল্লাহই সেটা জানেন দাদী।’
দাদী কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল। তখন ঘরে প্রবেশ করল পরিচারিকা নূরী। দাদী ও যয়নব যোবায়দাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘দাদী আম্মা, বেগম শাহজাদী আপা, মেলার প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে। চলুন।’
যয়নব যোবায়দা উঠে দাঁড়াল।
‘তোরা যা যোবায়দা, আমার ভাল লাগছে না।’ বলল দাদী।
‘আমারও ভাল লাগছে না। মেলা দেখার মত মনের অবস্থা নেই। তবু দাদী, শাহ দাদুর শুরু করা এই মেলায় অন্তত দেখার মাধ্যমে অংশ নেয়া এই বাড়ির রীতি। আমরা এই রীতির খেলাফ করতে পারি না দাদী।’ যয়নব যোবায়দা বলল।
বলে যয়নব যোবায়দা দাদীকে টেনে ইজি চেয়ার থেকে তুলল। একটা চাদর এনে দাদীর গায়ে জড়িয়ে দিল।
আলমারি থেকে বের করে আনল দু’টি দূরবীন। বলল, ‘চলো দাদী।’
‘বাড়ির সবাই তো চলে যাচ্ছে, এই রীতি কি আর থাকবে?’ বলে হাঁটতে লাগল দাদী।
দাদীর নাম বেগম শরীফুন নেসা। যয়নবের পিতা তাঁর একমাত্র সন্তান। দাদা মারা গেছেন তিরিশ বছর আগে, তখন দাদীর বয়স ৫০ বছর। দাদার মৃত্যুর পর বিশ বছর পর মারা যান যয়নবদের পিতা। যয়নবরা তখন কৈশোরেও পৌছেনি। আর যয়নবদের মা মারা গেছেন পিতার মৃত্যুর এক বছর পরেই। কার্যত তারা শিশুকাল, কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পৌছেছে দাদীর হাতেই।
‘রীতি ঠিক আছে, আমরাই ঠিক থাকতে পারছি না দাদী। এটা আমাদের ব্যর্থতা।’ বলল যয়নব যোবায়দা। ভারী কণ্ঠ তার।
দাদী একটা হাত রাখল যয়নব যোবায়দার পিঠে। সান্তনার সুরে বলল, ‘সময় সমান যায় না, কারণ সব মানুষ সমান হয় না।’
‘তাহলে সময় আবার আমাদের পক্ষে আসবে দাদী?’
‘তার জন্যে একজন মানুষ প্রয়োজন যিনি সময়ের গতি ঘুরিয়ে দেবেন।’
‘ভাইয়া নিজেই বিপদে, কোথায় সে মানুষ?’ বলল যয়নব যোবায়দা।
‘এমন মানুষের ব্যবস্থা আল্লাহই করে থাকেন যোবায়দা।’ তিন তলার প্রশস্ত বারান্দায় পা রাখতে রাখতে বলল দাদী।
তিন তলার এ বারান্দা বাড়ির পশ্চিম দিকে। বারান্দাটি অন্য সব বারান্দার চেয়ে আলাদা। রেলিং থেকে তিনটি প্রশস্ত ষ্টেপ একটির চেয়ে অন্যটি উঁচু হয়ে উপরে উঠে গেছে। তিন সারিতে বসে অনেকগুলো মানুষ এখান থেকে নিচের দৃশ্যাবলি উপভোগ করতে পারে।
নিচেই পাহাড়ের গোড়ায় মেলার মাঠ। এই বারান্দা থেকে শুধু মেলার মাঠটি নয়, মাঠের চারদিকটাও ভালোভাবে দেখা যায়।
মেলায় বিচিত্র পোশাকের প্রচুর লোক। কিন্তু মাঠ বড় বলে কোথাও মানুষের বড় ভীড় সৃষ্টি হয়নি।
মেলার মূল খেলার মাঠের চারদিক ঘিরে প্রশস্ত জায়গা। এই প্রশস্ত জায়গায় প্রচুর দোকান বসে। মাঠের চারদিকে বসে মানুষ খেলাও দেখে। সারাদিনব্যাপী মেলার প্রথম অংশেই নানা রকম খেলা-ধুলার আসর বসে।
বিভিন্ন আইটেমে একের পর এক প্রতিযোগিতা হয়।
তীরন্দাজী দিয়ে খেলা শুরু হয় এবং শেষ হয় ঘোড় দৌড় দিয়ে। তীর নিক্ষেপ মেলার সর্বোচ্চ সম্মানের প্রতিযোগিতা।
টার্গেটে তীর নিক্ষেপ প্রতিযোগিতার আয়োজন চলছে।
যয়নব যোবায়দা ও দাদী বসেছে পাশাপাশি সোফায়। পরিচারিকা ‘নূরী’ বসেছে এক ষ্টেপ পেছনে একটি চেয়ারে।
তিন জনের হাতেই দূরবীন।
যয়নব যোবায়দা ও দাদীর হাতের দূরবীণ দুটি বেশ বড় আকারের। এ দূরবীন দিয়ে তারা মেলার মাঠের ছোট এক খন্ড কাগজের লেখাও পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে। দূরবীন দুটি বিশেষ ধরণের। এ দিয়ে দূরের জিনিস নিখুঁতভাবে দেখা যায় এবং দেখাও যায় স্বাভাবিক আকারে।
যয়নব যোবায়দা ও দাদী দু’জনের চোখেই দূরবীন।
যয়নব যোবায়দার দূরবীনের চোখ একজনের ওপর পড়ে হঠাৎ স্থির হয়ে গেল।
দেখল আহমদ মুসাকে। তার বাড়ির দিকে তাকিয়ে কথা বলছে পাশের এক ছেলের সাথে। আহমদ মুসাকে দেখে চিনতে পারল। তাকেই সে সেদিন রাস্তায় ট্যুরিষ্ট হোটেলের পথ বাতলে দিয়েছিল। আর ছেলেটি ঐ হোটেলেরই বেয়ারার ইউনিফরম পরা।
বিস্মিত হলো যয়নব যোবায়দা, লোকটি কেন তার বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে! কি আলাপ করছে ছেলেটির সাথে?
আহমদ মুসা সরে গেল ক্যামেরার লেন্স থেকে।
যয়নব যোবায়দার দূরবীনের চোখ ফিরে এল তীর নিক্ষেপ প্রতিযোগিতার দৃশ্যে।
তীর নিক্ষেপ প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল।
প্রতিযোগীর প্রত্যেকেই টার্গেটে তিনটি তীর নিক্ষেপ করবে। নির্দিষ্ট দূরত্বে একটি রাবার বোর্ডে একটি সাদা বৃত্ত আঁকা আছে। বৃত্তের কেন্দ্রে আরেকটা লাল বৃত্ত। লাল বৃত্তের মাঝখানে একটি চোখ আঁকা। চোখের ভেতর চোখের কাল মণিও আঁকা। তীর যদি চোখের মণি বিদ্ধ করে তাহলে তিন পয়েন্ট, চোখের মণির বাইরে লাল বৃত্তের মধ্যে কোথাও আঘাত করলে ২ পয়েন্ট আর লাল বৃত্তের বাইরে সাদা বৃত্তের কোথাও আঘাত করলে ১ পয়েন্ট এবং সর্বোচ্চ নাম্বারের তিনজনকে ফাষ্ট, সেকেন্ড, থার্ড করা হবে। কেউ যদি সর্বোচ্চ নয় পয়েন্ট অর্থাৎ তিন তীরই যদি টার্গেটের চোখের মণিতে লাগাতে পারে তাহলে সে মেলার চ্যাম্পিয়ন ঘোষিত হয়। আর যে সর্বোচ্চ সংখ্যক খেলায় জেতে, তাকে গেমস চ্যাম্পিয়ন খেতাব দেয়া হয়।
যয়নব যোবায়দারা তীর নিক্ষেপ প্রতিযোগিতা দেখছিল। কেউ ভাল করছে না। ঘোষক মাইকে জানাল মাত্র একজন প্রতিযোগী আর বাকি। তখন পর্যন্ত একজনই সর্বোচ্চ ৫ পয়েন্ট পেয়েছে। শেষ প্রতিযোগী এল। সে আহমদ মুসা। যয়নব যোবায়দা বিস্ময়ের সাথে দেখল আহমদ মুসার তিনটি তীরই চোখের মণিকে বিদ্ধ করল।
এই সময় একজন পরিচারিকা বারান্দায় প্রবেশ করল। যয়নব যোবায়দাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘শাহজাদী আপা, ম্যাডাম আয়েশা শহর থেকে এসেছেন।’
‘হ্যাঁ, ওঁকে আসতে বলেছি। আজই এসে গেলেন! ঠিক আছে, যাও তুমি ওঁকে বসিয়ে চা-নাস্তার ব্যবস্থা কর। আমি আসছি।’
পরিচারিকা চলে গেল।
‘দাদী, ম্যাডাম আয়েশা কয়েকদিন হলো ব্যাংকক থেকে এসেছে। উনি জেদ্দাভিত্তিক একটা মানবাধিকার সংস্থার উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা। ওআইসির একটা অংগ সংগঠন এটা। আমি এখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে ওঁকে কিছু জানিয়েছি। আর কিছু কথা বলতে চাই।’ যয়নব যোবায়দা বলল।
‘চেষ্টা কর বোন। কোন চেষ্টা কখন কাজে লেগে যায়, কে বলতে পারে!’ বলল দাদী।
‘তাহলে তুমি বস দাদী। ওঁর সাথে কথা বলে আসি আমি।’
‘ঠিক আছে বোন।’ বলল দাদী।
যয়নব যোবায়দা চলে গেল ভেতরে।
যয়নব যোবায়দা ড্রইংরুমে ঢুকতেই ম্যাডাম আয়েশা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘মিস যোবায়দা, আজ রাতেই চলে যাব, তাই বিনা নোটিশে হঠাৎ করে চলে এলাম। অসুবিধা করলাম না তো!’
মিষ্টি হেসে যয়নব যোবায়দা বলল, ‘না ম্যাডাম। আমিই তো আপনার সাথে কথা বলতে চেয়েছিলাম। প্লিজ বসুন।’
দু’জনে বসল।
‘মিস যোবায়দা, আপনার সব কথা নিয়ে অনেক ভেবেছি। যতই ভেবেছি, ততই বিষয়টা জটিল হয়ে উঠেছে। এমন জটিলতার ওপর কাজ করা মানবাধিকার সংস্থার স্কোপের মধ্যে পড়ে না।’ বলল ম্যাডাম আয়েশা।
‘কেমন জটিলতা দেখছেন ম্যাডাম?’ বলল যয়নব যোবায়দা।
‘থাই সরকার দৃঢ়ভাবে মনে করে যে, আপনার ভাই জাবের জহীর উদ্দিন পাত্তানী অঞ্চলের সাম্প্রতিক সন্ত্রাসের মধ্যমণি। কিন্তু আপনারা বলছেন থাই সরকার ভুল করছে। তৃতীয় একটি পক্ষের এটা ষড়যন্ত্র পাত্তানীর মানুষকে শিকার বানাবার জন্যে। এই তৃতীয় পক্ষের কিন্তু আপনারা নাম বলতে পারছেন না এবং চিনেনও না। আর থাই সরকার এমন কিছু বিশ্বাস করে না। এটাই হলো জটিলতা। সন্ত্রাস অব্যাহত থাকা এই জটিলতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই অবস্থায় আমাদের মানবাধিকার সংস্থার জন্যে কিছু করার কোন সুযোগ আমি দেখছি না।’ ম্যাডাম আয়েশা বলল।
হতাশায় ভরে গেল যয়নব যোবায়দার মুখ। বলল, ‘ম্যাডাম আপনি কি বিশ্বাস করেন জাবের জহীর উদ্দিন বা আমরা এই সন্ত্রাস করছি?’
‘না, আমি বিশ্বাস করি না। ব্যাংকক ও পাত্তানীতে এসে আমার অনুসন্ধান থেকেও আমি এটা জেনেছি। কিন্তু এই মতের পক্ষে থাই সরকারকে আমি কোন প্রমাণ দিতে পারছি না!’
‘এটা আমাদেরও সমস্যা। এখন আমরা কি করব?’ কান্না জড়িত কণ্ঠে বলল যয়নব যোবায়দা।
বেদনায় ভরে গেল ম্যাডাম আয়েশার মুখও। ম্যাডাম উঠে এসে যয়নব যোবায়দার পাশে বসল। একটা হাত তার কাঁধে রেখে সান্তনার সুরে বলল, ‘ধৈর্য ধরুন মিস যোবায়দা, আল্লাহই সাহায্য করবেন।’
‘আল্লাহর সাহায্যেরই অপেক্ষা করছি। কিন্তু সব তো শেষ হয়ে গেল। ষড়যন্ত্রকেই আরও পাকাপোক্ত হতে দেখছি।’ ওড়নার প্রান্ত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল যয়নব যোবায়দা।
‘এই বিপদে আমার একজনের কথাই শুধু মনে পড়ছে। তিনি আহমদ মুসা। মুসলমানদের এমন বহু বিপদে তিনি এগিয়ে এসেছেন। আল্লাহ ছাড়া এমন সংকট উত্তরণে তার বিকল্প আর কেউ নেই। তিনি আল্লাহর মূর্তিমান এক সাহায্য।’
প্রবল আগ্রহ ফুটে উঠল যয়নব যোবায়দার চোখে-মুখে। মনে হলো তার ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া নতুন রক্তে প্রবাহ এলো। বলল, ‘আমি তাঁর নাম শুনেছি। অনেক পড়েছি তাঁর সম্পর্কে। কিন্তু তিনি তো ধরা-ছোঁয়ার বাইরের এক ফেরেশতা-মানুষ। তাঁকে কোথায় পাব আমরা!’
‘তাঁকে কেউ খুঁজে পায় না মিস যয়নব। তিনিই খোঁজ নিয়ে জাতির সংকট কবলিত মানুষদের কাছে হাজির হন। সর্বশেষ তিনি আন্দামানে এসেছিলেন। আন্দামানের মুসলমানদের মহাসংকট কেটে গেছে।’ বলল ম্যাডাম আয়েশা।
‘আন্দামানে? এই তো কাছেই। কোনোভাবে তাঁকে কিছু জানাবার পথ নেই?’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে ব্যাকুলভাবে বলল যয়নব যোবায়দা।
‘তিনি আন্দামান আছেন, না চলে গেছেন জানি না। এখানে আসার আগে জেদ্দায় ওআইসির মুসলিম সংখ্যালঘু সংক্রান্ত এক গোপন রিপোর্টে আমি আন্দামানে তাঁর মিশন এবং মিশন সফল হওয়া সম্পর্কে জেনেছি।’ ম্যাডাম আয়েশা বলল।
‘ওআইসি’কে অনুরোধ করলে তারা আহমদ মুসার সাথে কোন যোগাযোগ করে দিতে পারে না?’
গম্ভীর হলো ম্যাডাম আয়েশার মুখ। বলল, ‘আহমদ মুসা আল্লাহর অনন্য এক বান্দাহ। এক আল্লাহ ছাড়া কারও অধীনে তিনি নন। তার নিজস্ব কোন চাওয়া, অভিলাষ নেই। নিজেকে নিয়ে তিনি কোন স্বপ্ন দেখেন না, তাই তিনি জগতের কারো মুখাপেক্ষেও নন। ওআইসি সব সময় তার খোঁজও জানতে পারে না। সুতরাং নির্দেশ দেয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না।’
‘তাঁর কোন ঠিকানা, বাড়ি নেই?’ আশায় উচ্চকিত যয়নব যোবায়দার কণ্ঠ।
‘ঠিকানা, বাড়ি বলতে যা বুঝায় তা তাঁর নেই। সব মুসলিম দেশের তিনি নাগরিক। এমন কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্সও তাঁকে নাগরিকত্ব দিয়ে সম্মানিত করেছে। তবে তাঁর স্ত্রী একটি বাচ্চা নিয়ে থাকেন মদিনায়।’
‘তাদের সাহায্য নেয়া যায় না।’
‘তাঁকে আমি দেখিনি। তার স্ত্রী ও ছেলেকে দেখা আমার এক আবেগময় স্বপ্ন। কিন্তু পারিনি। সৌদি আরবের রাষ্ট্র প্রধানকে ঘিরে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সে রকমই নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে থাকেন তারা। সৌদি আরবের শীর্ষ পর্যায়ের অনুমতি ছাড়া বাইরের কেউ তাদের সাথে দেখা করতে পারে না। অন্য কোন যোগাযোগের মাধ্যম কাউকে জানানো হয় না।’
‘তাহলে?’ বলল যয়নব যোবায়দা। তার কণ্ঠে চরম হতাশার সুর।
‘একটু ধৈর্য ধরুন মিস যোবায়দা। আমি জেদ্দায় ফিরে এখানকার রিপোর্ট ওআইসির মানবাধিকার কমিশনকে দেব। তার সাথে অনুরোধ করব এখানকার ভয়াবহ অবস্থার কথা আহমদ মুসাকে জানানো যায় কিনা। তাছাড়াও মদিনায় যোগাযাগের একটা উদ্যোগ নেব। আমি কথা দিলাম।’
যয়নব যোবায়দা ম্যাডাম আয়েশার দু’টি হাত নিজের দু’হাতের মুঠোয় নিয়ে মুখে চেপে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল। বলল, ‘আপনার এই কথা মনে যে আশা জাগাচ্ছে, তা কল্পনাও করিনি। আল্লাহর ওয়াস্তে আমাদের সাহায্য করুন।’
ম্যাডাম আয়েশা তাকে দু’হাত দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘বোন এমন ভেঙে পড়ো না। আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করব। সবচেয়ে বেশি আল্লাহকে বলো। সব ঠিক হয়ে যাবে।’
নাস্তা করার পর বিদায় নিল ম্যাডাম আয়েশা।
গাড়ি পর্যন্ত বিদায় দিয়ে যয়নব যোবায়দা ফিরে এসে নিজের দেহটাকে সোফায় ছেড়ে দিল। ম্যাডাম আয়েশাকে সব কথা বলতে পেরে ও তার কথা শুনে ভাল লাগছে। সবচেয়ে ভাল লাগছে আহমদ মুসার বিষয়টি। আহমদ মুসা সম্পর্কে অনেক কিছু জানে সে, কিন্তু তাকে এমনভাবে জানত না। তাহলে এমন মানুষও দুনিয়ায় আছে। কেমন হবেন তিনি দেখতে! কেমন হবে চেহারা! কেমনভাবে তিনি কথা বলেন! এমন ফেরেশতাতুল্য মানুষ তো তার দু’চোখ কখনও দেখেনি। মনটা ছুটে গেল আল্লাহর দিকে। একমাত্র তিনিই পারেন সাহায্য করতে। আহমদ মুসা তো তাঁরই বান্দাহ, তাঁরই মুখাপেক্ষী। অতএব তিনি পারেন আহমদ মুসাকে যে কোন সময় এখানে আনতে। একমুখী এই চিন্তায় ডুবে গিয়ে কখন যেন চোখ ধরে এসেছিল ঘুমে।
যয়নব যোবায়দার ব্যক্তিগত পরিচারিকা নূরীর উচ্চকণ্ঠে ঘুম ভেঙে গেল যয়নব যোবায়দার। চোখ খুলেই বলল, ‘কি নূরী, হৈ চৈ করছিস কেন? কি হয়েছে?’
‘কি হয়নি শাহজাদী আপা? আপনি দেখলেন না। এমন ঘটনা এখানকার মেলায় কোন সময় ঘটেনি। তীরন্দাজীতে যাঁকে আপনি প্রথম হতে দেখেছেন, তিনিই ‘মেলায় চ্যাম্পিয়ন’ হয়েছেন, আবার গেমসেরও চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন।’ বলল নূরী উৎসাহের সাথে।
‘কি বলছিস? আর কয়টি খেলায় উনি জিতেছেন?’ বিস্ময়ে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে যয়নব যোবায়দার।
‘ঘোড় দৌড়ে জিতেছেন, কুস্তিতে জিতেছেন এবং লাঠি-বাজিতেও জিতেছেন। তিনি চারটি খেলায় অংশ নিয়ে চারটি খেলাতেই প্রথম হয়েছেন।’ বলল নূরী।
‘কে তিনি? জানা গেল? তিনি তো পাত্তানী নন।’ জিজ্ঞাসা যয়নব যোবায়দার।
‘তাকে ‘ট্যুরিষ্ট’ বলে পরিচয় দেয়া হয়েছে।’ বলল পরিচারিকা নূরী।
হঠাৎ নিচে মাঠের দিক থেকে গুলীর শব্দ ভেসে এল। অনেকগুলো গুলীর শব্দ।
যয়নব যোবায়দা এবং নূরী দৌড় দিল পশ্চিমের সেই বারান্দার দিকে।
দাদী বারান্দাতেই বসে আছে। তার চোখে দূরবীন।
‘কি হয়েছে দাদী?’ জিজ্ঞেস করল যয়নব যোবায়দা। তার চোখে-মুখে উদ্বেগ। আবার কোন সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটল নাকি!
‘দেখ মাঠের দিকে।’ বলল দাদী। তার চোখ দূরবীনে। মনোযোগ দিল মাঠের ঘটনার দিকে।
দূরবীনসহ চোখ তুলে দ্রুত যয়নব যোবায়দা মাঠের দিকে তাকাল। দেখল বিক্ষেপ্তভাবে চারটি গুলীবিদ্ধ লাশ পড়ে আছে। আর দেখতে পেল আহমদ মুসার হাতে রিভলবার। সে দাঁড়িয়ে আছে। তার দিকে পুলিশ এগিয়ে আসছে। মাঠের সব লোক চারদিকে দাঁড়িয়ে আছে সবার চোখে ভীতি।
যয়নব যোবায়দা দেখল আহমদ মুসার শান্ত, সরল মুখ। একটা ঠিকরে পড়া জ্যোতি সে মুখে। এতবড় হত্যার ঘটনা ঘটেছে, তার কোন প্রতিচ্ছবি তার চোখে-মুখে নেই। যয়নব যোবায়দা বুঝতে পারছে আহমদ মুসার রিভলবারের গুলীতেই ওরা চারজন মরেছে। কিন্তু কোন ভীতি, দুশ্চিন্তা আহমদ মুসার মধ্যে নেই।
পুলিশ এলে আহমদ মুসার সাথে কথা শুরু হলো। যয়নব যোবায়দা দেখল, আহমদ মুসা একটা আইডেনটিটি কার্ড, একটা লাইসেন্স জাতীয় কাগজ ও পাসপোর্ট পুলিশকে দেখাল। পুলিশরা আহমদ মুসাকে একটা স্যালুট দিয়ে পিছনে সরে গেল এবং পরে লাশ নিয়ে তারা চলে গেল।
পুলিশ চলে গেলে মেলার লোকজন সবাই ছুটে এসে আহমদ মুসাকে ঘিরে ধরল ও আনন্দ করতে লাগল।
‘পুলিশ লোকটিকে স্যালুট করল কেনরে বোন? সেও কি পুলিশের লোক? না কি বড় কোন কেউ?’ দাদী জিজ্ঞেস করল যয়নব যোবায়দার দিকে মুখ ফিরিয়ে।
‘না দাদী, সে পুলিশের লোক নয়, এদেশেরও বড় কেউ নয়। এদেশের হলে সে পাসপোর্ট দেখাতো না। যখন সে আইডেনটিটি কার্ড দেখাল, তখন তার নিশ্চয় বড় পরিচয় আছে। হতে পারে আইডেনটিটি এদেশ থেকেই তাকে সাময়িকভাবে দেয়া হয়েছে। পুলিশ চিনেছে বলেই তাকে স্যালুট দিয়েছে। আর লাইসেন্সের মত যে কাগজ দেখাল, সেটা নিশ্চয় রিভলবারের লাইসেন্স। রিভলবারের বৈধ না হলে লোকটিকে পুলিশ নিশ্চয় ছাড়তো না।’
‘তাই হবে বোন। যা হোক, লোকটি কিন্তু বাজের মত ক্ষীপ্র এবং অত্যন্ত কুশলী। না হলে তাকেই মরতে হতো। সে তো নিজেকে বাঁচাবার জন্যে গুলী করেছে।’ বলল দাদী।
‘দাদী তুমি এভাবে বলো না, পুরো ঘটনা বলো।’ যয়নব যোবায়দা বলল।
‘ঐ যে লোকটি দুই পর্বেই চ্যাম্পিয়ন হলো, সে পুরষ্কারের মোট পঞ্চাশ হাজার টাকা মেলা কমিটির হাতে ফেরত দিয়ে অনুরোধ করেছে, আগামী বছর থেকে এই মেলায় শিশু-কিশোরদের দেশ সম্পর্কিত জ্ঞানের, বিশ্ব সম্পর্কিত জ্ঞানের এবং স্রষ্টা সম্পর্কিত জ্ঞানের প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করতে হবে। মেলা কমিটির পক্ষ থেকে এই ঘোষণা আসার পর লোকটি এবং একটি ছেলে মেলা থেকে বের হয়ে আসতে যাচ্ছিল, এই সময় রিভলবারধারী চারজন লোক তাদেরকে ঘিরে ফেলে। অবাক কান্ড, লোকটি চোখের পলকে একজনকে আঘাত করে তাকে পেছন থেকে বুকের সাথে সেঁটে ধরে। বাকি তিনজন লোকটিকে লক্ষ্য করে গুলী করেছিল, কিন্তু তিনটি গুলীই গিয়ে লোকটির সামনে ঢাল হিসেবে ধরে রাখা তাদের লোককেই বিদ্ধ করল। এই সুযোগে লোকটি তার পকেট থেকে রিভলবার বের করে নিয়েছে এবং বিদ্যুত গতিতে তার রিভলবার ঘুরে গেল ঐ তিনজনের ওপর দিয়ে। তিনজনই গুলী খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। এই হলো ঘটনা। তার পরের ঘটনা তোদের দেখা।’ থামল দাদী।
‘লোকটি অদ্ভুত দাদী। খেলাতেও চ্যাম্পিয়ন। সংঘাতেও চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু মেলা কমিটিকে যে পরার্ম তিনি দিলেন তা এসবের বিপরীত। তিনি শিশু-কিশোরদেরকে দেশ, বিশ্ব ও ধর্মজ্ঞানে গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন। অথচ সংঘাতে তিনিই চ্যাম্পিয়ন হলেন।’ বলল যয়নব যোবায়দা।
‘না বোন, সংঘাতের চ্যাম্পিয়নের অর্থ ভিন্ন। সে তো সংঘাতের চ্যাম্পিয়ন নয়। সে আত্মরক্ষা করেছে মাত্র। নিজেকে রক্ষা করা প্রতিটি মানুষের অধিকার এবং দায়িত্ব। নিজের প্রতি এই দায়িত্বই সে পালন করেছে। তার মত যদি আমরা সবাই আমাদের রক্ষা করতে পারতাম, তাহলে আমাদের এই বিপর্যয় ঘটত না, অপরাধীদের দৌরাত্ম সর্বগ্রাসী হয়ে উঠত না। খেলা-ধুলা, তীরন্দাজী ইত্যাদির সাথে শিশু-কিশোরদের দেশ, বিশ্ব ও ধর্মজ্ঞান চর্চার কথা বলে সে শুধু জীবনকে ভারসাম্য করা নয়, বিনোদন ও অস্ত্রবাজীকে মানব জ্ঞান ও নৈতিকতার অধীনে আনতে বলেছে। আজকের জন্য এর চেয়ে ভাল কথা আর কি আছে?’
‘ধন্যবাদ দাদী, তুমি যে অপরূপ ব্যাখ্যা দিলে, সে ব্যাখ্যঅ তারও নিশ্চয় জানা নেই। তবে যাই হোক দাদী, লোকটির প্রতিভা ও যোগ্যতা অসাধারণ মাপের। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, তিনি এদেশের নন, কিন্তু পুলিশ তার কি পরিচয়পত্র দেখে তাকে স্যালুট করতে বাধ্য হলো।’ বলল যয়নব যোবায়দা।
‘এই প্রশ্নের জবাব তোর কাছে যেমন নেই, আমার কাছেও নেই। এর উত্তর পাওয়া ভবিষ্যতের জন্যে তুলে রেখে চলো এখন যাই। খাওয়া-দাওয়া করতে হবে। মেলাও আবার দেখতে হবে।’ বলল উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে।
সবাই উঠে দাঁড়াল এবং বারান্দা থেকে পা বাড়াল ভেতরে যাওয়ার জন্যে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now