বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
বাংলা তথা উপমহাদেশের কথাসাহিত্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এক কিংবদন্তী কথাশিল্পী, অবিসংবাদিত উচ্চারণ, দীপ্ত কণ্ঠস্বর ও অক্ষয় নক্ষত্র। কথাসাহিত্য ও ইতিহাসের অপূর্ব সংমিশ্রণ এবং শিল্পনৈপুণ্যের অলৌকিক ক্ষমতায় তিনি সৃষ্টি করেছেন অসাধারণ ও কালজয়ী সব উপন্যাস। ‘সেই সময়’ তাঁর এমনই একটি ইতিহাসধর্মী উপন্যাস। এই উপন্যাসের মূল নায়ক সময়, একটি বিশেষ সময় – যেই সময়ের প্রেক্ষাপটে ঘটনা ও চরিত্রগুলো চিত্রিত। উপন্যাসের ভূমিকাতেই বলা আছে, “একটি বিশেষ সময়ই এই উপন্যাসের মূখ্য চরিত্র।
নাটকের শুরুতে যেমন দেওয়া থাকে পাত্রপাত্রীদের নাম ও পরিচয়, তেমনভাবে যদি গোড়াতেই দেয়া থাকতো এই বিপুল বর্ণাঢ্য উপন্যাসের চরিত্রাবলীর নাম, সত্যিই বিস্ময়কর মনে হত সেই তালিকা। মাইকেল, বিদ্যাসাগর, ডিরোজিও, হেয়ার সাহেব, দেবেন ঠাকুর – কে নেই! সমস্ত ঊনবিংশ শতাব্দীই এই উপন্যাসে যেন নানান চরিত্র হয়ে চোখের সামনে জীবন্ত। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বহু পরিশ্রমে, ধূলিমলিন পৃষ্ঠা ঘেঁটে প্রায় গবেষকের মতোই হাজির করেছেন সেই সময়কে। শুধু যেটুকু তফাৎ তা হল, গবেষকের রচনার মধ্যে প্রাণ থাকে না, তিনি সেই প্রাণটি প্রতিষ্ঠা করেছেন।”
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি (১৮৪০-১৮৭০) সময়কালই এই উপন্যাসের উপজীব্য। ঐ-সময়কালে ইংরেজশাসিত পরাধীন অখণ্ড বাংলাদেশে ও ভারতবর্ষে যে-সমস্ত উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী ঘটেছে, সে-সবের আলোকেই সুনীল ‘সেইসময়’ উপন্যাস রচনা করেছেন। উপন্যাসের ভূমিকাতেই লেখক বলেছেন, “ আমার কাহিনীর পটভূমিকা ১৮৪০ থেকে ১৮৭০ খ্রীস্টাব্দ। এবং এই কাহিনীর মূল নায়কের নাম সময়। শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’ গ্রন্থে ১৮২৫ থেকে ১৮৪৫ খ্রীস্টাব্দ সময়কে বঙ্গের নবযুগ বলেছেন। এই নবযুগেরই পরবর্তীতে নাম হয় ‘বেঙ্গল রেনেশাঁস’। এই রেনেশাঁসের ধারণাটিকেই এই গ্রন্থে নাড়াচাড়া করতে চেয়েছি।”
১৯৮৩ সালে বঙ্কিম-সাহিত্য পুরস্কার এবং ১৯৮৫ সালে আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত দুই খণ্ডে সমাপ্ত সুবিশাল ও বর্ণাঢ্য ‘সেই সময়’ উপন্যাসটি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এক মর্মস্পর্শী ও হৃদয়গ্রাহী সাহিত্য-কীর্তি। কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এই সুদীর্ঘ উপন্যাস রচনা করতে গিয়ে একজন বিদগ্ধ গবেষক ও পাকা ঐতিহাসিকের কাজও যেন করতে চেয়েছেন, সেজন্য তাঁকে যেমন অনেক সময় (প্রায়ই আড়াই বছরেরও অধিক কাল) ব্যয় করতে হয়েছে তেমনি খাটতেও হয়েছে প্রচুর। বইয়ের শেষাংশে তিনি সে-সমস্ত বইয়ের একটি তালিকাও প্রদান করেছেন যাদের সাহায্য তাঁকে অবধারিতভাবে গ্রহণ করতে হয়েছে। ইতিহাসের নির্যাস গ্রহণ করতে গিয়ে তাকে প্রজ্ঞার গহীন সরোবরে বারবার অবগাহন করতে হয়েছে।
ইতিহাসের উপাদান গ্রহণ করলেও তিনি পুরোপুরি ইতিহাস-নির্ভর না হয়ে ঐতিহাসিক ঘটনা ও চরিত্রগুলোর সাথে নিজের কল্পনার হরগৌরি মিশ্রণ ঘটিয়ে এক অনন্য সাহিত্য সৃষ্টি করার প্রয়াস চালিয়েছেন। কারণ তা না হলে এটি নিছক একটি ইতিহাস বা গবেষণালদ্ধ বই হতো পাঠকদের কাছে, কোনোভাবেই মহৎ সাহিত্যকর্ম হিসেবে স্থান পেতো না সাহিত্য-প্রেমিকদের মনের মণিকোঠায়।
এখানেই সুনীলের পটুত্ব, পারঙ্গমতা ও শিল্পবোধের সাবলীল উপস্থাপনা। বাংলা সাহিত্যের অপরাপর কথাসাহিত্যিকদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে সুনীল একটি নিজস্ব বলয় তৈরি করেছেন যা অন্যদের নিকট থেকে তাঁকে সম্পূর্ণ আলাদা সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।উত্তর কলকাতার বিশাল বিশাল অট্টালিকা ও প্রাসাদবিশিষ্ট জোড়াসাঁকো অঞ্চলটিকে তখন অভিজাত বাঙালিদের, বিশেষত জমিদারদের এলাকা বলে বিবেচনা করা হতো। ঠাকুরবাড়ি ও সিংহবাড়ি পাশাপাশি অবস্থিত দুই বিখ্যাত জমিদারের আবাসস্থল যাদের জমিদারি ছড়িয়ে আছে সারা বাংলায় ও বাংলার আশেপাশের প্রদেশে।
ঠাকুরবাড়ির সন্তান রবীন্দ্রনাথের পিতামহ ও পিতা যথাক্রমে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিভিন্ন কারণে ঐ-সময়কালের প্রধান আলোচিত-আলোকিত ব্যক্তিত্ব এবং উপন্যাসটিতে স্থান পেলেও সুনীল তাঁদের মধ্য থেকে প্রধান চরিত্র নির্বাচন করেন নি। বরং সিংহবাড়ির রামকমল সিংহ ও সেই ধারাবাহিকতায় তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র নবীনকুমার সিংহকেই তিনি প্রধান চরিত্র বলে গ্রহণ করেছেন। ‘নবীনকুমার সিংহ’ এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হলেও সুনীল তাকে সেই সময়ের প্রতীক বলেই অভিহিত করেছেন।
সময়কে রক্তে-মাংসে জীবিত করা ও উপন্যাসটিতে প্রাণ সৃষ্টি করার জন্যই তিনি এই প্রতীক চরিত্রটি গ্রহণ করেছেন। নবীনকুমার চরিত্রটি এক অকাল-মৃত অসাধারণ ঐতিহাসিক যুবকের আদলে চিত্রিত। যাকে অবলম্বন করে নবীনকুমারকে গড়া হয়েছে তাঁর কয়েকটি কীর্তিচিহ্ন ছাড়া আর কিছু সুনীল নিজেও জানতেন না। কীর্তিচিহ্নগুলো চরিত্রটিকে আমাদের বিখ্যাত সাহিত্যিক ও কীর্তিমান পুরুষ ‘কালীপ্রসন্ন সিংহ’, যার ছদ্মনাম ‘হুতোমপ্যাঁচা’ তার সাথে মিলিয়ে দেয়। কীর্তিচিহ্নগুলোর মধ্যে ‘হুতোমপ্যাঁচার নকশা’ ও ‘মহাভারতের বঙ্গানুবাদ’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া সুনীল ‘সেইসময় দ্বিতীয়
খণ্ড’ ‘কালীপ্রসন্ন সিংহ’ কেই উৎসর্গ করেন যা আমাদের কাছে বিষয়টিকে আরো নিশ্চিত করে। তবে লেখক এই দুই চরিত্রকে এক করে না দেখে নবীনকুমারকে সেই সময়ের প্রতীক বলে অভিহিত করার পক্ষপাতী। এখানে সুনীলের সরল স্বীকারোক্তি,‘নবীনকুমারের চরিত্রে যে আমি স্বকল্পিত বহু উপাদান সংযোজন করেছি, সেজন্য অনেকের সঙ্গে মতভেদ হতে পারে। হওয়াই স্বাভাবিক। সেই সময় সম্পর্কে যদি আমি আমার নিজস্ব কিছু ব্যাখ্যা না দিতে চাইব, তা হলে আর আমি এত বড় একটি গ্রন্থ রচনা করলাম কেন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now