বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
‘খালামণি’ কোনোরকমে বলে ওঠে নেয়াজ।
আবার আরেকটা চড় মেরে রাহনুমা মুখটা বিকৃত করে ফেলেন।
-হতচ্ছাড়া, ঠিক করে বলতো ক’দিন গোসল করিস নি? কী বোঁটকা গন্ধ রে বাবা! আর মুখে কি আমাজনের বন তৈরীর ব্রত নিয়েছিস? আধাঘন্টা সময় দিলাম। এরই মধ্যে যেন জঙ্গল সাফ হয়ে যায়!
-খালা! করুণ চোখে তাকিয়ে দাঁড়ি-গোঁফের ঘন অরণ্যে হাত হাত বোলাতে বোলাতে বলে, ‘ আমার এতদিনের...কেটে ফেলতে হবে?’
-যাবি নাকি আরেকটা চড় খাবি?
-তোমার মারার হাত তো দেখি আগের মতই আছে। সমান তালে মেরে যাচ্ছো! যাচ্ছি, যাচ্ছি বলে পা বাড়ায়।
‘হ্যাঁ যাও যাও। নারকেলের ছোবড়া তৈরী রাখছি-ঘষা-ঘষি করতে হবে না?’ মুখ টিপে হেসে ফোঁড়ন কাটে রিন্তি।
জ্বলন্ত চোখে তাকাতে তাকাতে নেয়াজ বেরিয়ে যায় যার অর্থ করলে দাঁড়ায়, ‘দাঁড়া, ঘুরে আসি। তোর একদিন কি আমার একদিন’ অবশ্য রিন্তি তাতে পাত্তা দিলে তো?
রাহনুমা হাসতে হাসতেই বলেন, ‘ আহ! জ্বালাচ্ছিস কেন? ঝগড়া-ঝাঁটি এখনো আগের মতই করছিস?’
-তুমিও তো আগের মতই করছো! আমি ঠিক জানি তুমি নিজুদাকে আমার থেকে বেশি ভালোবাসো।
-আহারে আমার পাগলী মেয়ে! মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আদর করে দেন। ‘এখন আমাকে একটু চাল বেটে দে দেখি মা, ফিরনি করি... ছেলেটা ফিরনি খেতে কত না ভালোবাসতো!’
-ঐ যে আবার শুরু হলো! গা জ্বলে যায় কথা শুনলে। রাহনুমা মুখে কিছু বলেন না; কেবল হাসতে থাকেন। সেই হাসিতে কোথায় যেন একটা চাপা অপরাধবোধজনিত দুঃখও মিশে থাকে।
সেলনে চুল-দাঁড়ি কাটাতে দিয়ে ভাবনায় তলিয়ে যায় নেয়াজ। এ মুহুর্তে সাধের দাঁড়ি-গোঁফ বিসর্জনের দুঃখ থেকেও একটা বড় দুঃখ-অভিমানের না-শুকানো ক্ষতটা আর্তনাদ করতে থাকে। ছেঁড়া ছেঁড়া ভাবে মনে পড়ে যেতে থাকে সেই ক’বেকার কিছু খণ্ড খণ্ড দৃশ্য...
......রাহনুমা একদৃষ্টে নিজুর দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ নামিয়ে নিলেন। তারপর একটু থেমে থেকে বললেন,
-রিন্তিটা এখনো ছেলেমানুষ। কিছু কিছু সম্পর্কের পরিণাম ওর অবুঝ কিশোরী হৃদয় কিছুতেই যাচাই করতে পারবে না। বাবা, তুই-ই পারিস রিন্তি কে বাঁচাতে...তুই...তুই আর আসিস না...কথা দে আমায়...বলতে বলতে নিজুর হাতটা ধরে অনর্গল কাঁদতে থাকেন।
বজ্রাহতের মত দাঁড়িয়ে থাকে নেয়াজ। এ কী শুনছে সে? এই যে খালামণি...বাপ-মা হীণ নেয়াজের কাছে স্নেহময়ী মা আবার বাবাও...মায়ের মুখ ভালো মনে পড়ে না; মনে করতে গেলেই কেবল রাহনুমার মুখ চলে আসে। কতদিন, কত বছর তার সাধ-আহ্লাদ, আবদার, অভিযোগ, অনুযোগ সবই হাসিমুখে মিটিয়েছেন রাহনুমা। বরাবরের চাপা ক্ষ্যাপা স্বভাবের নিজুর আব্দারের জায়গা তো ঐ একটিই হয়ে এসেছে। সেই মায়ের চেয়েও বেশি মা কিনা আজকে তাকে কী দুঃসহ এক অভিযোগে দণ্ডিত করছেন! তার জন্য রিন্তির জীবন নষ্ট হয়ে যাবে...এই আশংকায় সে তার সবচে’ কাছের মানুষের চোখে জল এনেছে...দুঃখ আর লজ্জার এক অনির্বচনীয় মিশ্র অনুভূতিতে নেয়াজ পাথর হয়ে যায়। তারপর...তারপর কী একটা অভাবনীয় অভিমানে ভারী হয়ে আসে নেয়াজের বুক। আলগোছে একটা দীর্ঘশ্বাস মিলিয়ে দিয়ে বলে,
-ভেবো না খালা! সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু নিজু যে নিজেই বেঠিক হয়ে গেলো!
যেতে যেতে চোখের কোণে জমে থাকা ব্যথা মুছতে মুছতে ভাবে তার পঁচিশ বসন্তের এই ছন্নছাড়া কাঁটাবনে কোন স্পর্ধায় রিন্তিকে একখানা সাজানো বাগানের স্বপ্ন দেখায়! মন চাইলেও যেটুকু বাস্তববোধ তার উপর আলগা একটা কতৃত্বভাব জারী রেখেছে, সেটি ভয়ানক আস্ফালনে যার যার অবস্থান মনে করিয়ে দেয়। তারপরের সময়টুকু কেমন যেন ভুলে যাওয়া দুঃস্বপ্নের মত...কেবলই ধোঁয়াশার তাল তাল স্তূপ। কার উপর কীসের অভিমানে যেন জীবনটাই বাউন্ডুলেপনায় খরচ হয়ে গেলো...কোথায় গেলো? কী খেলো? কোথায় হলো রাত্রি যাপন? মনে নেই; কিচ্ছু মনে থাকল না! সে রকম এক সময়ে প্রত্যন্ত এক গ্রামে অকস্মাত সুহৃদের সাথে দেখা হয়ে গেলো। সুহৃদ, রাহনুমার একমাত্র ছেলে, রিন্তির দাদা!
গ্রামের পিচ্ছিল কাদাময় রাস্তা দিয়ে সাবধানে যাচ্ছিল সুহৃদ। বিশাল ছাতাটাও সেই ঝুম বৃষ্টি বাগে আনতে পারছিলো না! এক হাতে ছাতা আর অন্য হাতে জুতো জোড়া ধরে বাপান্ত করছিলো বেসরকারি এক সংস্থার বস কে। এই ভয়ানক গ্রামে কেউ কাউকে পাঠায়? হঠাত অদূরে দেখে একটা লোক এক পাল বাচ্চাকাচ্চার সাথে কাদায় আপাদমস্তক মাখামাখি হয়ে ইচ্ছে করেই পিছলে পিছলে পড়ছে! বাচ্চাগুলি কী যে আনন্দ পাচ্ছে সে ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়! পুরো রাস্তাটাই বন্ধ হয়ে আছে তাদের এই হুজ্জতে। দৃশ্যটায় কী যেন ছিল, বিরক্তির মধ্যেও সুহৃদের হাসি পেয়ে গেলো। ভালো করে দেখবার জন্য আরেকটু এগিয়ে গিয়ে তাজ্জব হয়ে গেলো! আরে, এ যে নিজুদা না হয়েই যায় না! কী আশ্চর্য!
-নিজুদা, তুমি এখানে? মাই গড! কোথায় ছিলে এতদিন? প্রতিবারই ভুল ঠিকানা জানিয়ে দু’লাইনের চিঠি লিখে জানিয়েছো ভালো আছো...তোমার শয়তানিটা ক’বে যাবে বলতে পারো?
-আরে সুহৃদ নাকি? দাঁড়া, দাঁড়া পরে বকিস। কেমন আছিস রে? তুই যে রীতিমত চর্বির বস্তা হয়ে গেছিস! মা...মানে খালা কেমন আছে রে? বলেই উদাস হয়ে যায়।
-তুমি তো দিব্যি ভালোই আছো দেখতে পাচ্ছি! ওদিকে মা যে তোমার কথা বলে কত কাঁদেন...সে যদি তুমি বুঝতে? জানি না কেন আর আস না...কোথায় যে হারিয়ে গেলে?? নিজুদা, তোমাকে যখন পেয়েছি তখন বলছি যদি মা কে ভালোবেসে থাকো তবে একটা বারের জন্য হলেও কি...? আর কারো জন্য না হোক, মায়ের জন্য যদি একবার আসতে? মা যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে দিন দিন!
-সে কথা থাক সুহৃদ! আমার যে আর ফেরার পথ নেই...
-এতো হৃদয়হীণ তো তুমি কখনো ছিলে না! কী হয়েছিল সেটা তো বলবে? রিন্তি...রিন্তির কথাও কি একবার...
-সুহৃদ, যেদিকে যাচ্ছিলি যা। বিরক্ত করবিনা। ভালো থাকিস। বলেই হনহন করে হাঁটতে থাকল। হতভম্ব হয়ে সুহৃদ দেখতে পেলো পাগলা ধাঁচের একটা মানুষ কী এক অব্যক্ত অভিমানে চেনাজানা জগতটাকেই যেন নির্মম উপেক্ষায় ভুলে যেতে চাইছে। একে ডাকা এখন বৃথা!
নেয়াজের বুকে কিন্তু একটা প্রচন্ড ঝড় উঠেছে। আজকে হঠাত করে সুহৃদের দেখা হওয়াটা কিছু একটা ওলট পালট করে দেয়; বহুদিনের চাপা পড়া স্মৃতির কাতর ঢেউগুলো যেন ভেঙ্গেচুরে দিচ্ছে সকল অভিমান। বহুদিন তো হয়ে গেলো...রিন্তির বোধকরি এতোদিনে ... এবার ফিরে যাওয়া যায় না?
-কী হইল নইজ্যা দা? ঘুমায় পড়লা নাকি? নাপিত ছেলেটির ডাকে ঘোর থেকে বাস্তবে ফেরত আসে নেয়াজ। হেসে উঠে সে,
-আর ঘুমাতে দিলি কই? নে, বেশি কথা বলিস না। ঘাড়টা একটু দলাই মলাই করে দে দেখি!
বাসায় ফিরতেই একটা রিনরিনে হাসির রোল পড়ে গেলো। যে ভয়ে ভয়ে আসছিল, সেটাই হলো যে
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now