বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ওরিনের হিমশীতল চোখে

"ওয়েস্টার্ন গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান নাসরুল্লাহ (০ পয়েন্ট)

X গেল তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে কাদার নদী হয়ে গেছে খানাখন্দে ভরা ট্রেইলটা। তেরছা বৃষ্টির ভেতর দিয়ে আধবোঁজা চোখে সামনে তাকাল ওরিন ওসমান, নিজের খামখেয়ালকে দুষছে। যে লোকটাকে বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করেছে সেদিন, আজ তার বাড়িতেই যাচ্ছে তুফান মাথায় করে! ভালো কোনো কিছুই ঘটবে না এ থেকে, সে জানে, তবু এল পাসো থেকে মোগাইওনের দীর্ঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দিচ্ছে শুধু একটি কারণে—তার সঙ্গের টাকাগুলো একজন অল্প বয়সী বিধবা আর তার সন্তানের প্রয়োজনে আসতে পারে। সন্দেহ নেই, বারটেন্ডার বা ওই স্যালুনের খদ্দের, কাউকেই টাকার ব্যাপারে বিশ্বাস করা যেত না। তা ছাড়া, নিছক মজা দেখার জন্যেও কেউ টনটো বেসিনে বিপদের মধ্যে নিজের গলা বাড়াতে রাজি হতো কি না, সে ব্যাপারেও সন্দেহ ছিল। ওরিন ওসমান গোলযোগ-সন্ধানী নয়। ওদের পাঁচ ভাইয়ের কেউই তা না। নানা সময়ে, নানা ধরনের কাজ করেছে সে, বেশির ভাগ হিংসাত্মক। সে জন্মগতভাবে এবং সহজাত প্রবণতায় একজন পশ্চিমের মানুষ। বাফালো শিকার করেছে, প্রসপেক্টিং করেছে, একটা গোল্ড-মাইনিং টাউনের পত্তন করেছিল, যার মার্শালও ছিল সে-ই। পিঠ চাপড়ানো বা পিছিয়ে যাওয়া—কোনোটাই তার ধাতে নেই, ফলে সর্বদা একটা-না-একটা ঝামেলায় জড়িয়ে থাকে। তবে ওর কিছু কিছু সমস্যা অন্য উত্স থেকে সৃষ্টি হয়েছিল। এগুলো জন্ম নিয়েছিল সহিংসার প্রতি একটা গূঢ় এবং তীব্র টান থেকে, যে টান ওর সত্তার গভীরে লুকিয়ে আছে। এই প্রবণতা সমপর্কে ওরিন সচেতন এবং এটাকে সে দাবিয়ে রাখে। কিন্তু কখনো কখনো ফুঁসে ওঠে স্বভাবটা, আর তখন সে সোজা ঝাঁপিয়ে পড়ে বিপদের মধ্যে। ঢ্যাঙ্গা, কর্কশ একটা মানুষ, দেয়ালে পিঠ ঠেকলে ভয়ঙ্কর, লড়াই করে ক্ষিপ্ত ভাইকিংয়ের তেজে, তবে ঠান্ডা মাথায় এবং বুদ্ধি খেলিয়ে। দীর্ঘদেহী পুরুষ ওরিন, দেখে যা মনে হয়, তারচেয়ে বেশি ওজন। উঁচু হনু আর সবুজ চোখ রোদে পোড়া লম্বাটে মুখাবয়বে এক ধরনের আভিজাত্য দান করেছে। ওই চোখগুলো ভীষণ শান্ত এবং সংযত। ঘোড়া আর অস্ত্রের প্রতি তার একটা নাড়ির টান রয়েছে। সে ওদের বোঝে, যেমন ওরা বোঝে তাকে। বন্দুক চালনায় ওর হাতেখড়ি শৈশবে। এটাই রীতি ওদের পরিবারে। শরীরে এর ভার বহনের সামর্থ্য হওয়ার পরপরই রাইফেল ছোড়া শেখে ওরা। জীবনে প্রথম যখন শিকার করে সে, তখন তার বয়স নয় বছরও হয়নি। একটা কুগর মেরেছিল; ওদের শুয়োরের খোঁয়াড়ে হানা দিয়েছিল ওটা। তের বছর বয়সে হত্যা করে এক প্রতিবেশীকে, যার সঙ্গে ওদের তখন জাতি-বিবাদ চলছিল। লোকটা রাইফেল তাক করেছিল ওর বাবার দিকে, আর তাতেই ওরিনের মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছিল। খুব অল্প বয়সে বাড়ি ছাড়ে সে, ন্যাচেজ ট্রেইল ধরে নিউঅর্লিন্স চলে যায়। এর কিছুদিন পর যখন গৃহযুদ্ধ শুরু হল তখন সে-ও যোগ দিল যুদ্ধে। তবে কনফেডারেটদের দলে নয়, সে নাম লিখিয়েছিল ইউনিয়ন আর্মির পক্ষে, স্বাধীন দেশটাকে একসুতোয় বেঁধে গড়বার আশায়। যুদ্ধের পর প্রসপেক্টিং থেকে শুরু করে রাঞ্চিং, নানা ধরনের কাজ করেছে, বিদেশেও ছিল কিছু দিন। ইয়ুরোপ আর আফ্রিকার অনেক দেশ ঘুরেছে। কিন্তু কেন যেন কোথাও কোনো কিছুতেই মন বসাতে পারেনি। কয়েকটা মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও হয়েছিল কিন্তু ভাগ্যের ফেরে সেগুলোও টেকসই হয়নি। শেষমেশ একদিন টেক্সাসে ফিরে আসে সে, মোরায় ছোটভাই ওরিনের রাঞ্চে দিন কয়েক কাটিয়ে আবার পথে নামে, যাযাবরের মতো ঘুরতে ঘুরতে এসে হাজির হয় এল পাসোয়। আর সেখানেই এক বারে, টনি কার্টিসের সঙ্গে বচসা হয় ওর। কার্টিস মিথ্যুক বলেছিল ওকে, পিস্তলের দিকে হাত বাড়িয়েছিল। বিজলির গতিতে ড্র করে ওরিন, প্রতিপক্ষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে ধরাশায়ী করে। এর এক ঘণ্টা বাদে, মুমূর্ষুর বিবর্ণ হোটেল কামরায় তার ডাক পড়ে। ভাঁজ করা একটা কম্বলের ওপর মাথা এলিয়ে শুয়ে ছিল টনি কার্টিস, কালো চুলগুলো এলোমেলো, মুখ মড়ার মতো ফ্যাকাসে। মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিল লোকটা। দরজার বাইরেই তাকে বলা হয়েছিল কার্টিস বড় জোর আর এক থেকে দেড় ঘণ্টা বাঁচতে পারে। ঋজু ভঙ্গিতে কামরার ভেতর ঢুকল ওসমান, মৃতুপথযাত্রীর বিছানার পাশে নীরবে গিয়ে দাঁড়াল। অয়েলস্কিনে মোড়ানো একটা প্যাকেট বাড়িয়ে ধরল কার্টিস। ‘পাঁচ হাজার ডলার আছে এতে,’ অস্ফুটে বলল। ‘আমার স্ত্রীর কাছে নিয়ে যাও এটা…মোনার কাছে, পিভটরকে, মোগাইওনে। ও খুব…খুব…বিপদে আছে।’ যে লোকটা তাকে হত্যা করেছে, বিশ্বাস করে তারই হাতে এত টাকা তুলে দিচ্ছে, ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত বৈকি! ওসমান চোখ নামিয়ে তাকাল ওর দিকে, ভুরু কোঁচকানো। ‘আমাকে কেন?’ শুধাল সে। ‘আমাকে বিশ্বাস করছ টাকা দিয়ে? আর তা ছাড়া, আমিই বা করতে যাব কেন কাজটা?’ ‘তুমি… তুমি সত্ লোক। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তুমি মোনাকে সাহায্য করবে। করবে না? আ…আমি আসলে মাথা গরম, বোকা। দুশ্চিন্তায় ছিলাম…অধৈর্য হয়ে পড়েছিলাম। তোমার কোনো দোষ ছিল না।’ নীল চোখজোড়া থেকে অনেক আগেই চলে গিয়েছিল বেপরোয়া আলোটা আর যেটুকু আলো অবিশষ্ট ছিল, তা-ও এখন নিভে আসছিল। ‘আমি কাজটা করব, কার্টিস। তোমাকে কথা দিচ্ছি… ওরিন ওসমান তোমার কাছে ওয়াদা করছে।’ মুহূর্তের জন্য ঝিকিয়ে উঠল নীল চোখ দুটো, সেখানে পরিচিতির ছায়া। ‘তু… তুমিই… ওসমান?’ মাথা ঝাঁকাল ওরিন, কিন্তু আলোটা তখন নিভে গেছে। টনি কার্টিস যাত্রা করেছে চিরশান্তির দেশে। দীর্ঘ, বন্ধুর যাত্রা, তবে আরও খানিকটা বাকি আছে। এল পাসোর পশ্চিমে লুটেরা অ্যাপাচিদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। সিলভার সিটিতে, পরিচিত চেহারার দুজন রাইডার ওকে অনুসরণ করে একটা সালুনে গিয়ে ঢোকে, মারামারি শুরু করে। ওরিন পোড়খাওয়া মানুষ, তস্করদের চালাকি দেখলেই ধরতে পারে, তাই পা দেয়নি ফাঁদে। গুলি করে নিভিয়ে দিয়েছে সালুনের বাতিগুলো, অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে নিঃশব্দে সরে পড়েছে। রৌনটা হঠাত্ পা হড়কাল কাদামাখা ট্রেইলে উঠল হাঁচড়ে-পাচড়ে, গাছপালার ভেতর দিয়ে এগোল। সহসা, বৃষ্টি-ধূসরিত সন্ধ্যার মাঝে, একটা বাতি নজরে এল, তারপর আরেকটা। ‘ইয়োলো জ্যাকেট,’ স্বস্তির স্বরে বলল ওরিন। ‘এর মানে আমাদের জন্য ভালো বিছানা, বেটা। ভালো বিছানা আর ভালো খাবার।’ ইয়োলো জ্যাকেট একটা যাত্রা-বিরতির জায়গা। একটা স্টেজ স্টেশন, একটা স্যালুন, একটা লিভারি স্টেইবল আর একটা জরাজীর্ণ হোটেল রয়েছে। আর আছে রোদেপোড়া ইটের একগুচ্ছ বাড়িঘর আর কিছু ফলস-ফ্রন্টেড স্টোর। কপার ক্রিকের এক কোণে গড়ে উঠেছে শহরটা। এটা জ্যাক প্যালেন্সের শহর। প্যালেন্স ইয়োলো জ্যাকেট স্যালুন এবং লিংকন মাইনের মালিক। টমাস হার্ডি টাউন মার্শাল; মূলত প্যালেন্সের তল্পিবাহক। প্যালেন্স যেখানেই যায়, ছায়ার মতো তার সঙ্গে থাকে কার্ল রৌভ। দুর্মুখেরা বলে থাকে, বাইরে যা-ই মনে হোক না কেন, ইয়োলো জ্যাক টাউনের সব কিছুর নাটের গুরু আসলে প্রিন্স ময়নিহান, টনটো বেসিন অঞ্চলের বড় আউটফিট পিএম ব্র্যান্ডের মালিক। ঘোড়া স্টেইবল করে ঢালু কাঁধের লিভারিম্যানের দিকে ফিরল ওরিন ওসমান। ‘ওকে এক বাটি ভূট্টা খেতে দিয়ো এখন। আর সকালে আরেক বাটি।’ ‘ভূট্টা?’ এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়াল লিভারিম্যান জনি। ‘ভূট্টা হবে না। নাই।’ ‘মালগাড়ির স্টক আর স্টেজ হর্সগুলোর জন্য ভূট্টা আছে। আমার ঘোড়াকে ওখান থেকেই দেবে।’ ওরিনের কণ্ঠে কর্তৃত্বের ঝাঁজ পুরোপুরি বুঝে ওঠার আগেই, দম দেওয়া পুতুলের মতো উঠে দাঁড়াল জনি, বিশাল রৌনটাকে ভূট্টা খাওয়াতে শুরু করল। অচিরেই নবাগতের কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বরের কথা তার স্মরণ হলো তার এবং বিষয়টা নিয়ে ভাবল সে, দেখল লোকটা চলে যাচ্ছে। ঋজু, দীর্ঘ পদক্ষেপে, সহজ এবং স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিতে, পায়ের পাতার ভরে, দীর্ঘদেহী অশ্বারোহী দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। ওর কোমরে নিচু করে বাঁধা জোড়া পিস্তল ঝুলছে নিতম্বের কাছে। অপলকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল জনি, তারপর কাঁধ উঁচু-নিচু করল। ‘জাত বিচ্ছু,’ বিড়বিড় করল সে, ‘হারামি টমাস হার্ডিকে এ ব্যাটা নিকেশ করলে ওর ঘোড়াটাকে আমি সারা জীবন মুফতে ভূট্টা খাওয়াতে রাজি।’ বাদুড়-ডানা দোর ঠেলে ইয়োলো জ্যাকেটে প্রবেশ করল ওরিন, স্যাডল ব্যাগগুলো ধপাস করে মেঝেয় রেখে, গটগট করে হেঁটে গেল বারে। ‘তোমার কাছে গলা ভেজানোর জন্য ভালো কী আছে, মিস্টার? রাই বাদে?’ ‘ব্যাপার কী? রাই পছন্দ হয় না?’ খেঁকিয়ে উঠল বারটেন্ডার। লোকটার নাম ড্যানিয়েল, সংক্ষেপে ড্যানি। রোজ দুখানা পায়ের ওপর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ওর মেজাজ সর্বদা সপ্তমে চড়ে থাকে। ‘ব্র্যান্ডি আছে? বা কোনো আয়রিশ হুইস্কি?’ কটমট করে তাকাল ড্যানি। ‘মিস্টার, তুমি কোথায় এসেছ মনে, করছ? নিউইয়র্কে?’ ‘ব্যাস, কর ড্যান। যে লোক জানে সে কী চায়, আমি তাকে পছন্দ করি। আমার কনিয়াক থেকেই ওকে দাও কিছুটা।’ ঘুরে বক্তার দিকে তাকাল ওরিন। বেশ লম্বা গড়ন, পরনে কালো রঙের দামি ব্রড ক্লথের স্যুট। ঈষত্ ঢেউ খেলানো সোনালি চুল, গায়ের রঙ হালকা গোলাপি। বয়স ত্রিশ বা কিছু বেশি। বাম কোমরে একটা হোলস্টার, উঁচু করে বাঁধা, পিস্তলের বাঁটটা সামনে ফেরানো। ‘ধন্যবাদ,’ সংক্ষেপে বলল ওরিন। ‘বৃষ্টির রাতে কনিয়াকের চেয়ে ভালো কিছু আর হয় না।’ ‘আমার নাম ময়নিহান। পিএম আউটফিটটা আমি চালাই। এখান থেকে পুবে। সঠিক করে বললে, উত্তর-পুবে।’ মাথা ঝাঁকাল ওরিন। ‘আমি ওসমান। কোনো আউটফিট চালাই না, তবে খুঁজছি একটা। পিভটরক কোথায় জান?’ সবাই বলে তুখোড় পোকার খেলোয়াড় সে। বন্দুক ব্যবহার করতে করতে নজরও তীক্ষ। প্রিন্স ময়নিহানের চোখের তারায় চকিত ঝিলিক আর সতর্কতা তাই ওর দৃষ্টি এড়াল না। ‘পিভটরক? কেন, ওটা মোগাইওন অঞ্চলের একটা ঝরনা। একটা আউটফিটও অবশ্যি আছে ওদিক। এক-ঘোড়ার মামলা। কেন জিজ্ঞেস করছ?’ ওরিন শুরুতেই থামিয়ে দিল ময়নিহানকে। ‘দরকার আছে।’ ‘অ। একাই যেতে হবে তোমাকে। কী একটা ঝামেলা চলছে ওখানে, মানে ক্যাটল ওয়র।’ পানীয়ের স্বাদ নিল ওরিন। কনিয়াকটা ভালো। বলতে কি, সেরা, নিউঅর্লিন্সের পশ্চিমে এত সরেস জিনিস সে এর আগে পান করেনি। কী যেন নিজের নাম বলল লোকটা? হ্যাঁ, ময়নিহান। আপাতদৃষ্টিতে যা মনে হয়, তার চেয়ে বেশি জানে লোকটা। কার্টিস তার বিধবা স্ত্রীকে সাহায্য করতে অনুরোধ করেছিল। পিভটরক আউটফিট কোনো বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে কি? ওরিন ঠিক করল ময়নিহানকে কিছু জিজ্ঞেস করবে না। নির্দোষ সব বিষয়, বৃষ্টি, গরু, কনিয়াক—এগুলো নিয়ে ওরা গল্প করল আরও কিছুক্ষণ। ‘পশ্চিমে কেউ কনিয়াকের স্বাদ বোঝে না। কোথায় শিখেছ?’ ‘প্যারি,’ যেন গুরুত্বহীন একটা ব্যাপার এভাবে কাঁধ ঝাঁকিয়ে জবাব দিল ওরিন, ‘মার্সেই, ফেজ, মারাকেশ।’ ‘হুম, অনেক দেশ ঘুরেছ তাহলে। অবশ্য এটা এমন নতুন কিছু না।’ আঙুলের ইশারায় ভারী কাঁধের এক যুবককে দেখাল সোনালি-চুল। দু-হাতের ভাঁজে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে লোকটা। ‘ওই ছোকরাকে দেখছ? ওর নাম কেভিন পিটার্সন। কেমব্রিজ থেকে পাস করেছে, মদ খাওয়ার সময়ে কথায় কথায় ক্লাসিক্স থেকে উদ্ধৃতি দেয়… বলা যায়, অর্ধেক দিনই মাতাল থাকে… কিন্তু যখন সুস্থ থাকে, ওর মতো কাউহ্যান্ড দুটি পাবে কি না, সন্দেহ। তারপর কিথ, পিয়ানো বাজাচ্ছে যে, ভাইমারে লেখাপড়া করেছে, ভিয়েনায় স্ট্রসকে চিনত, লোকটা ‘দি ব্লু দানুব’ লেখার আগেই। পশ্চিমে সব ধরনের লোক পাবে, খেতাবধারী জমিদার থেকে ভবঘুরে মিসকিন, দুনিয়ার নানান কোণ থেকে এসেছে। কয়েক হপ্তা থাকে এখানে, অল্পদিনেই রপ্ত করে ফেলে ভাষাটা, এতটাই, যে মনে হবে এখানেই জন্ম। পশ্চিমের অনেক বড় রাঞ্চ আছে, যেগুলোর মালিক ইংরেজ।’ আরও খানিকক্ষণ খোশগল্প করেও প্রিন্স ময়নিহান কিছুই আদায় করতে পারল না ওরিনের থেকে। এমন নয় যে ওরিন এড়িয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু নিজের সমপর্কে কোনো তথ্য বা এখানে কেন এসেছে—এগুলোর কিছুই বলল না। চিন্তিত চেহারায় সরে গেল ময়নিহান। পরে, ওরিন ওসমান যখন বিদায় নিয়েছে, মার্শাল হার্ডি এল সেখানে। ‘ওসমান?’ মাথা নাড়ল হার্ডি। ‘চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু মনে করতে পারছি না। কিথ জানতে পারে। ও সবাইকে চেনে। পিভটরকে কী চায় ব্যাটা?’ বিছানায় চিত্ হয়ে শুয়ে, অন্ধকারের ভেতর তাকিয়ে ওরিন জানালায় আর ছাতে বৃষ্টির শব্দ শুনছে। বেশ জোরে পড়ছে, বর্শার ফলার মতো বিঁধছে জানালায়। অস্বস্তিভরে পাশ ফিরল সে, খানিক আগে প্রিন্স ময়নিহানের চোখে ফুটে ওঠা সতর্ক দৃষ্টির কথা মনে পড়তে ভুরু কোঁচকাল। ময়নিহান লোকটা কে? কী জানে সে? কার্টিস অনুরোধ করেছিল, সে যেন তার স্ত্রীকে সাহায্য করে। এটা কি নিছক একজন মৃত্যুপথযাত্রীর অনুরোধ ছিল, নাকি সত্যিই সাহায্য প্রয়োজন ওদের? এখানে কি কোনো ঘাপলা আছে? টাকাটা যথাস্থানে পৌঁছে দিয়েই সে নিজের পথ ধরবে, মনে মনে এই অঙ্গীকার করে ঘুমোতে গেল ওরিন। অবশ্য শেষবারের মতো চোখ বন্ধ করার সময়ে সে এ-ও জানত, কোনো ঝামেলা দেখলে তার মত বদলাবে। ওরিনের যখন ঘুম ভাঙল, তখনো বৃষ্টি পড়ছে; তবে আগের মতো মুষলধারে নয়। দ্রুত পোশাক বদলে তৈরি হয়ে নিল সে, পিস্তল দুটো পরখ করল, মনে মনে ঝালাই করছে গত রাতের সমস্যাগুলোর কথা। কেভিন পিটার্সন টলতে টলতে ওরিনের পেছন পেছন সিঁড়ি ভেঙে নেমে গেল নিচে। মাত্রা ছাড়া মদ্যপান আর ঘুমের কারণে টসটসে হয়ে আছে কেমব্র্রিজে পড়া লোকটার মুখ। ওরিনের দিকে তাকিয়ে করুণ হাসল সে। ‘রাতে মাত্রাটা একটু বেশিই হয়ে গেছিল মনে হয়,’ বলল। ‘আমার আসলে এই শহর ত্যাগ করা দরকার।’ একসঙ্গে নাস্তা খেল ওরা। পিটার্সনের চোখ সহসা ধারালো হয়ে উঠল যখন ওরিন পিভটরকে যাওয়ার রাস্তা জিজ্ঞেস করল তাকে। ‘তোমার ওখানে যাওয়া ঠিক হবে না। কার্টিস পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে, ওদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। ওদের দিন শেষ! রাঞ্চটা শেষ পর্যন্ত জ্যাক প্যালেন্সরই হতে যাচ্ছে।’ ‘সমস্যাটা কী?’ ‘প্যালেন্স পিভটরকের মালিকানা দাবি করছে। টনি কার্টিসের বাপ জায়গাটা কিনেছিলেন এক মেক্সিকানের কাছ থেকে। ওই লোক জমিটা পেয়েছিল একটা ল্যান্ড গ্র্যান্টের সুবাদে। বুড়ো কার্টিস এরপর অ্যাপাচিদের সঙ্গে একটা রফা করেন, ফলে তার মালিকানা আরও মজবুত হয়। সমস্যা হচ্ছে, জ্যাক প্যালেন্স আরও পুরোনো একটা ক্লেইম দেখাচ্ছে। বলছে, আলভঅরেজের কোনো গ্র্যান্ট ছিল না। সেটা ছিল ওর বাপ কোলাসোর এবং তার থেকেই সে রাঞ্চটা খরিদ করেছে। বুড়ো কার্টিস বাকবোর্ড থেকে ছিটকে পড়ে নিহত হয়, আর ওর ছেলে, বিলি, ধাক্কা সামলাতে পারেনি। কার্ল রৌভ ওকে চ্যালেঞ্জ করতেই শহর ছেড়ে পালিয়েছে।’ ‘আর ওর বউ?’ মাথা ঝাঁকাল পিটার্সন, তারপর শ্রাগ করল। ওর চেহারায় সন্দেহ আর শঙ্কার আনাগোনা। ‘চমত্কার মেয়ে মোনা কার্টিস। শান্ত কিন্তু শক্ত। ভাঙবে কিন্তু মচকাবে না। আফসোস, কার্টিসের যদি ওর সাহসের দশ ভাগের এক ভাগও থাকত!’ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ল পিটার্সন। ‘মোনা থাকবে, কসম খেয়েছে লড়াই করবে।’ ‘কর্মচারী আছে?’ ‘দুজন। একজন অনেক পুরোনো, ওর শ্বশুরের আমলের। আর অপরজন এক দোআঁশলা অ্যাপাচি, নাম সিলভানাটো, সংক্ষেপে নাটো।’ কথাগুলো মনের ভেতর উল্টেপাল্টে দেখল ওরিন। বুঝতে পারছে, অনেক কিছু এখনো অব্যাখ্যাত রয়ে গেছে। পাঁচ হাজার ডলার এল কোত্থেকে—এটা একটা বিরাট প্রশ্ন। বিলি কি সত্যি পালিয়ে ছিল, নাকি লড়বার জন্য টাকার জোগাড়ে গিয়েছিল? কীভাবে পেল টাকা? ‘আমি যাচ্ছি।’ উঠে দাঁড়াল ওরিন। ‘মোনার সঙ্গে কথা বলতে হবে।’ ‘ওখানে কাজ নিয়ো না। ওর কোনো সম্ভাবনা নাই,’ গম্ভীর গলায় বলল পিটার্সন। ‘তুমি সরে থাকলেই বরং ভালো করবে।’ ‘আমি দুর্বলের পক্ষে লড়তে পছন্দ করি,’ হাল্কা চালে জবাব দিল ওরিন। ‘কে জানে, চাকরিও চাইতে পারি। মানুষকে তো এক সময় না এক সময় মরতে হবেই। সব কিছু যখন তার বিপক্ষে, তখনকার চেয়ে মরার জন্য ভালো সময় আর কোনটা?’ ‘আমি, বাপু, জিততে পছন্দ করি,’ সোজাসাপ্টা উত্তর পিটার্সনের। ‘অন্তত সুযোগ চাই একটা।’ টেবিলের ওপর সামনে ঝুঁকল ওরিন; সচেতন, পিটার্সনের পেছনে দাঁড়িয়ে প্রিন্স ময়নিহান কথা শুনছে। ওর পাশেই আরেক বিশালদেহী, তার জামার বুকে তারা। ‘আমি যদি ঠিক করি ওর পক্ষে কাজ করব,’ ওরিনের গলা সহজ, আত্মবিশ্বাসী, ‘তুমি আমাদের সঙ্গে যোগ দিলে ভালো করবে। কারণ আমরাই জিতব।’ ‘অ্যাই, তুমি!’ টিনের তারাখচিত লোকটা, টমাস হার্ডি, সামনে এগোল। ‘তুমি হয় শহরে থাক, নয়তো রাস্তা মাপ! এমনিতেই মোগাইওনে অনেক ঝামেলা। তুমি এর বাইরে থাক।’ চোখ তুলল ওরিন। ‘আমাকে বলছ?’ চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল ওর গলা। ‘তুমি টাউন মার্শাল, ইউনাইটেড স্টেটস মার্শাল বা শেরিফ নও। আর যদি শেরিফ হতেও, তাহলেও কিছু যেত-আসত না। ঝামেলাটা এই কাউন্টির বাইরে, তোমার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। এবার সর; আর, হ্যাঁ, কেউ না ডাকলে কখনো অন্যের ব্যাপারে নাক গলাতে এস না। বোঝা গেছে?’ মাথা হেট করল হার্ডি, মুখ লাল। টেবলের কোনা ঘুরল সে, চোখজোড়া ছোট আর বুনো হয়ে উঠেছে। ‘শোন!’ ওর কণ্ঠস্বর ক্রোধে ফ্যাঁসফেঁসে। ‘একটা দু-পয়সার রাখালের এত বড় সপর্ধা আমাকে…’ ‘হার্ডি,’ শহর মার্শালকে থামিয়ে দিয়ে অবিচল কণ্ঠে ওরিন বলল, ‘তুমি কিন্তু সাধ করে ঝামেলা বাড়াচ্ছ। তোমার আওকাতের মধ্যে থাকছ না। তুমি টাউন মার্শাল, এই পরিচয় কিন্তু তোমাকে রক্ষা করবে না।’ ‘আমাকে রক্ষা করবে?’ ক্রোধে বিস্ফোরিত হলো হার্ডি। ‘আমাকে? তবে রে, আজ তোর একদিন কি…!’ লাফিয়ে আগে বাড়ল হার্ডি। কিন্তু চট করে এক পাশে সরে গেল ওরিন, লাথি মেরে একটা চেয়ার ঠেলে দিল মার্শালের পথের ওপর। উন্মত্ত হার্ডি সুযোগই পেল না ওটা এড়ানোর, পড়ে গেল হুমড়ি খেয়ে, কাঠের মেঝের ঘষায় তার হাতের তালু ছড়ে গেল। লাথি মেরে চেয়ারটা সরিয়ে দিল সে, উঠে দাঁড়াল এক লাফে। ওরিন দাঁড়িয়ে ওর মুখোমুখি, ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের হাসি। কেভিন পিটার্সনের হাসি দু-কান ছুঁয়েছে, আর ড্যানিয়েল বারে ঠেস দিয়ে উপভোগ করছে ব্যাপারটা। হার্ডি একবার দেখল নিজের ক্ষতবিক্ষত হাতের তালু দুটো, তারপর ওরিনের চোখে চোখ রাখল। এক পা সামনে এগোল সে, পরক্ষণে,আচমকা, হাত বাড়াল পিস্তলের দিকে। ড্র করল ওরিন, গুলি করল। স্তম্ভিত টমাস হার্ডি চেয়ে রইল তার অবশ হাতের দিকে। গুলির ঝটকায় ছিটকে পড়েছে পিস্তল, গরম .৪৪ সিসা ট্রিগার গার্ডে আঘাত করে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে ওর কড়ে আঙুলের ডগা উড়িয়ে নিয়ে গেছে। হার্ডি বোকার মতো দেখতে থাকে ক্ষীণ রক্তের একটা ধারা মেঝেয় পড়ছে ফোঁটায় ফোঁটায়। আরও দুজন তাকিয়ে ছিল, তবে মার্শালের দিকে নয়। প্রিন্স ময়নিহান এবং পিটার্সন তীক্ষ দৃষ্টিতে ওরিনকে পযর্বেক্ষণ করছিল। ‘তোমার হাত তো খুব চালু,’ বলল ময়নিহান। ‘কে তুমি? এই তল্লাটে এমন ফাস্ট গান ছয়জন আছে কি না, সন্দেহ। আমি বেশির ভাগেরই চেহারা চিনি।’ ওরিনের হিমশীতল চোখে কৌতুকের ঝিলিক। ‘তাই? বেশ, এখন তবে আর একজনকে জানলে। সাতজন হলো।’ গোড়ালির ভরে ঘুরল সে, গটগট করে বেরিয়ে গেল কামরা থেকে। সবার চোখ তাকে অনুসরণ করল।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ওরিনের হিমশীতল চোখে

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now