বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
কী পড়া দেয়া ছিলো?’
‘স্যার, কবিতা— ট্রেন। ৮ লাইন, প্রথম ৮ লাইন।’
‘বলো ।’
‘বলছি স্যার—
ট্রেন
শামসুর রাহমান
ঝক্ ঝকা ঝক্ ট্রেন চলেছে
ট্রেন চলেছে ওই,
ট্রেন চলেছে ট্রেন চলেছে
ট্রেনের বাড়ি কই?
একটু জিরোয় ফের ছুটে যায়
মাঠ পেরুলেই বন,
পুলের ওপর বাজনা বাজায়
ঝন্ ঝনা ঝন্ ঝন্।’
.
আমি চোখ দুটো ঘুরিয়ে নিই অন্যদিকে। ভেতরের চোখটাও ফেরে অন্য কোথাও। সে চোখে আমি দেখতে পাই— অগণন কাঠের স্লিপার, সুদীর্ঘ লৌহপাত। একটা চলমান ট্রেন। ঝকঝক। ঝকঝক। ঝকঝক। ...
‘স্যার!’
প্রাইভেট স্টুডেন্টটার ডাকে চোখ জোড়া আমি ফিরিয়ে আনি, ওর দিকে। একটু ইতস্তত করি। তারপর বলি— ‘হুঁ?’
‘বলা শেষ, স্যার।’
‘কখন?’
‘এই তো, স্যার— এই এখন।’
একটুক্ষণ পর, উঠে পড়ি, ওকে পড়া দেখিয়ে দিয়ে, পড়া বুঝিয়ে দিয়ে। হাঁটা শুরু করি, বাড়ির উদ্দেশ্যে। অন্যমনা হয়ে যাই আমি আবার— চলমান ট্রেন। ঝকঝক। ঝকঝক। ঝকঝক। ...
.
হাঁটতে হাঁটতে মুদি দোকানটা পার হয়ে এসেছি মাত্র, এমন সময় কেউ ঠাট্টা করে পেছন থেকে ডাকে আমায়— ‘সান্ত্বনা!’
আমি দাঁড়িয়ে পড়ি হঠাৎ, কিন্তু পিছু ফিরি না। আবার হাঁটা শুরু করি পরক্ষণে।
‘সা—ন্ত্ব—না—!’
সারেগামার মতো সুর করে আবার ডাকে কেউ। আমি এবার দাঁড়াই এবং ঘাড় ফিরিয়ে তাকাই। দেখি, দোকানের বেঞ্চে বসা কয়েকজন বালক, চোখে মুখে কৌতুক নিয়ে হা করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
ওরা আমারই সহপাঠী। আমি ওদের দিকে তাকাতেই ওরা অন্যদিকে তাকিয়ে ‘হা’ ‘হা’ ‘হি’ ‘হি’ করে ফেটে পড়ে হাসিতে। ওদের ‘সান্ত্বনা’ ডাকে আমি ফিরে তাকিয়েছি, এজন্য। অথচ, সান্ত্বনা আমার নাম না— একটা মেয়ের নাম। সেও সহপাঠী আমারই। মেয়েটার সাথে একবার এক ঘটনা ঘটে। ঘটনাটা স্পষ্ট মনে আছে আমার—
.
আমি ক্লাসরুমে ঢুকছি, ও বের হচ্ছে। হঠাৎ যেনো কী একটা হয়ে গেলো, কীসের যেনো একটা প্রচণ্ড আঘাত পেলাম পায়ে, এবং পড়ে গেলাম সঙ্গে সঙ্গে। এবং স্বাভাবিক হতেই লক্ষ্য করলাম, আমি পড়ে আছি উবু হয়ে। পড়ে আছি, তাও আবার একটা মেয়ের সম্মুখ দেহের উপর। হঠাৎ ঘটনায়, বুক থেকে ওড়না-টোড়না সরে গিয়ে, দেহের চাপে নিচে পড়ে আমার শরীরের সাথে বেশ ভালোভাবেই লেপ্টে আছে মেয়েটা— সান্ত্বনা।
ব্যাপারটা আপত্তিকর মনে হতেই ঝট্ করে উঠে দাঁড়ালাম আমি কোনোভাবে। হাত থেকে ছিটকে পড়া বই-পত্র গোছাতে গিয়ে দেখলাম, পায়ের কাছে একটা পাকা কলার খোসা, থেবড়ে পড়ে আছে একেবারে। বুঝলাম, দোষটা আর কারো না— এই কলার খোসাতে পা পড়েই হয়েছে এমনটা। ততোক্ষণে ঠিকঠাক হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে সান্ত্বনা। এবং ততোক্ষণে ব্যাপারটা দেখেও ফেলেছে অনেকে, এবং তারা অবাক তাকিয়ে আমাদেরই দিকে— ছি, কী লজ্জা, মুখ লুকিয়ে মরে যাবার মতো লজ্জা!
এই ঘটনার পর থেকেই আমি ‘সান্ত্বনা’। সবাই আমায় ‘সান্ত্বনা’ বলেই ডাকে, কৌতুক করে মজা পায়।
আমি, প্রথম প্রথম ক্ষেপতাম খুব, গা জ্বলে যেতো রাগে। এখন একেবারে সহজ হয়ে গেছি— রাগ করিই তো না, বরং মনে মনে বেশ আনন্দ পাই, উৎফুল্ল হয়ে উঠি। ভাবি, প্রত্যেক দিনের সবটা সময় যদি কানের কাছে বাজতো নামটা— সান্ত্বনা সান্ত্বনা ... , আমি মরে যেতাম— প্রশান্তিতে, আনন্দে, সুখে।
কী জানি— এই অনুভূতিটাই হয়তো প্রেম। ভালোবাসা।
.
আমি ঘাড় ফিরিয়ে নিই, এবং হাঁটা শুরু করি পরক্ষণেই। আমার বুকের ভিতর থেকে চোখে মুখে উঠে আসে হাসি, প্রোজ্জ্বল হাসি। হ্যাঁ, এটাই প্রেম, ভালোবাসা একেই বলে। নয়তো বন্ধুরা ওর সাথে আমাকে জড়িয়ে ঠাট্টা করবে, কিন্তু আমি উপচে পড়া প্রশান্তিতে মুচকি হাসবো; সবাই ওকে আমাকে এক করে লজ্জা দেবে সামনে পেলেই, তবু আমি মেনে নেবো সাদরে, অনায়াসে; ওর সুশ্রী মুখটা স্রেফ দেখবো দু’চোখে, অথচ বুকটা আমার ভরে যাবে সুখে! কেনো? নিশ্চিত, আমি ভালোবাসি, ভালোবাসি ওকে— সান্ত্বনাকে।
.
বাড়ির উঠোনে এসে পা রাখতেই শুনি ট্রেনের শব্দ— সকাল ৮টায় ছেড়ে আসা খুলনা টু বেনাপোল রুটের ট্রেন। ট্রেনের সে শব্দ মিলিয়ে যেতেই বুকের মধ্যে জেগে ওঠে আরেক সকাল আটটা— নিচে পাথর খণ্ডের স্তুপ। একটার পর একটা সাজানো স্লিপার। দিগন্ত ছোঁয়া লৌহপাত। ঝকঝক। ঝকঝক। ঝকঝক। ...
.
গতকাল সবচেয়ে কাছের বন্ধুটা এসে হসি হাসি মুখে বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, ‘আজ আমার খুব মরতে ইচ্ছে করছে। কেনো জানিস?’
আমি নির্লিপ্তভাবে বন্ধুটার দিকে তাকাই শুধু— বলি না কিছুই।
ও আগের মতোই উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে, ‘কারণ— ও। ওর জন্যে মরে যেতে ইচ্ছে করছে আমার।’
ওর দিকে সেভাবেই তাকিয়ে থাকি আমি— মুখ খুলি না।
ও সামান্য রেগে যায়। আমার দিকে ঝুকে এসে বলে, ‘তুই একটা কিছু জিজ্ঞেস কর— কেনো, কী ঘটেছে— এমন কিছু!’
আমি আগের মতোই নির্লিপ্ত। বলি, ‘কার জন্য?’
‘যাকে ভালোবাসতাম এতোদিন।’
‘কেনো?’
‘আজ ও কি বলেছে জানিস? আমার প্রতিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত ও অপেক্ষা করবে।'
একটু অবাক হলাম আমি। বললাম, ‘তাই নাকি!’
ও বললো, ‘হুঁ। বল, এই উপলক্ষে তুই আমার কাছে কী চাস? তোর সব চাওয়া আজ আমি পূরণ করবো।’
হঠাৎ করেই যেনো সজাগ হয়ে উঠি আমি। যে কথাটা প্রায় দু’বছর ধরে নিজের মাঝেই রেখেছি, বলতে পারিন নি কাউকে, ঝট্ করে বলে ফেলি তা ওকে— ‘আমি— আমি একজনকে খুব ভালোবাসি রে।’
‘কাকে— সান্ত্বনাকে?’
‘হ্যাঁ।’
ও স্বাভাবিক হয়ে যায়— ‘বল— আমাকে কি করতে হবে?’
‘ভালোবাসি, কিন্তু আজ অব্দি কথাটা ওকে বলতে পারি নি।’
‘বুঝেছি— কথাটা ওকে পোষ্ট করে দিতে হবে, এই তো?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ।’ আমিও যেনো উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছি, আস্তে আস্তে।
‘আচ্ছা ঠিক আছে।’
বন্ধুটার কথা শেষ হবার সাথে সাথে, আমার ভেতরটায় প্রচণ্ড এক ঝড় বয়ে যায়। মুহূর্তে বুকটা হাল্কা হয়ে যায় একেবারে। বন্ধু জানে না— সে কতো বড়ো একটা উপকার করতে যাচ্ছে আমার।
.
টেবিলের উপর বই খোলা। পড়ছি না— একটা করে পৃষ্ঠা উল্টোচ্ছি, আর ভাবছি সান্ত্বনাকে। বারংবার মনে পড়ছে বন্ধুর কালকের সে প্রতিশ্রুতির কথা। বন্ধুটা ভালোবাসাকে পাবার নিশ্চয়তা পেয়েছে, তাই তার মরে যেতে ইচ্ছে করেছে— শুধু ইচ্ছে। আর আমি— পাই নি কিছুই, কিন্তু হাজারবার মরেছি ইতোমধ্যে!
হঠাৎ কোথা থেকে ছুটে এসে ঘরে ঢোকে ভাতিজাটা। বলে, ‘তাতু— তাতু—!’
আমি বলি— ‘জ্বী চাচু।’
ও কাছে সরে আসে, আহ্লাদে মাথাটা এলিয়ে দেয় আমার উরুর উপর। তারপর অল্প অল্প কথা শেখা কণ্ঠে বলে, ‘তাতু— আমি না— এ্যাত্তা দল্প থিতেথি—!’
‘গল্প শিখেছো?’
‘হ্যাঁ— দল্প থিতেথি!’
‘বলো তো, শুনি— কী গল্প শিখেছো।’
‘ধত্ ধতা ধত্ ত্লেন তলেথে
ত্লেন তলেথে ওই
ত্লেন তলেথে ত্লেন তলেথে
ত্লেনেল বালি তই?’
আমি মুখটা ঘুরিয়ে নিই অন্য দিকে, মনটাও— একটা চলমান ট্রেন। ঝকঝক। ঝকঝক। ঝকঝক। ভেতরে তার একটাই বার্তা, একটাই সংবাদ— ভালোবাসি। গন্তব্য— সান্তনা। ঝকঝক। ঝকঝক। ঝকঝক। ...
.
মাঠের ঠিক মধ্যখানটায় বসে আছি আমি— একা, নিঃসঙ্গ। বিকেলের রোদ মরে এসেছে। মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে বাতাসে, বারংবার।
একসময় ট্রেনের হুইসেল শুনে মাথা উঁচু করে তাকাই আমি— দূরে ট্রেন লাইন। একটা চলমান ট্রেন। ঝকঝক। ঝকঝক। ঝকঝক। এবং একসময়, মিলিয়ে যায় দূরে কোথাও— ট্রেনের চিহ্ন, ট্রেনের শব্দ। কিন্তু চোখ ফিরোই না আমি। শুধু মন ফেরে অন্যথা— ঝকঝক। ঝকঝক। ঝকঝক। চলমান ট্রেন, নিচে তার বুকের পাঁজরে গড়া পাত। তারপর স্লিপার, সে স্লিপার পায়ে পিষে এগিয়ে চলেছে ট্রেন...।
.
এখন আমার চোখে জল, বুকের মধ্য থেকে উপচে পড়ছে সে জল, উঠে আসছে চোখে, অশ্রু হয়ে, গড়িয়ে পড়ছে তা, চুইয়ে চুইয়ে, দু’গাল বেয়ে, ...।
চলমান ট্রেন। ঝকঝক। ঝকঝক। ঝকঝক। নিচে তার পাঁজর-পাত। তারও নিচে স্লিপার— সে বক্ষ-স্লিপার। চিতার আগুনে পোড়া শরীরের মতো ক্রমশ দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে সে স্লিপার— কষ্টে, অসহ্য যন্ত্রণায় ।
.
.
কাল বরপক্ষ তুলে নিয়ে গেছে সান্ত্বনাকে!
.
---------------------------------------------
প্রেম-অপ্রেমের গল্প—
অপমৃত্যু । সুপণ শাহরিয়ার
১৩ এবং ১৪ মে, ২০০২
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now