বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অঙ্কিত চিত্র' (২য় পর্ব) শেষ

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X অঙ্কিত চিত্র' (২য় পর্ব) (ছয়) রাতে দেরী করে ঘুমালেও সূর্যোদয়ের অনেক আগেই উঠে গেলাম আমি। ছোটবেলার অভ্যাস। শীতটা বেশ জাঁকিয়ে ধরেছে ইদানীং। সারাদিনের এই একটা সময়ই আমার মায়ের চেহারাটা মনে পড়ে। যদিও দীর্ঘদিনের পুরনো ছবিটাতে ধূলোবালির আস্তরণ পড়ে গেছে। হয়ত একদিন এটাও মুছে যাবে। আলো ফোটার আগেই প্রয়োজনাদি সেরে হাঁটতে বের হলাম। সকালের এই হাঁটা আমাকে ভাবনার অনেক সুযোগ দেয়। মন ও মাথা ফ্রেশ থাকে তাই ভাবনাটাও ফ্রেশ হয়। আর এই সময়ের ভিতরেই আমি গুছিয়ে ফেলি সারাদিনের রুটিন ওয়ার্ক। গত রাতে ঘুমানোর পূর্বে তিতিকে ফোন দিয়েছিলাম। তিতি জেগেই ছিল। হয়ত এই কলের অপেক্ষায়ই! আমি হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম বন্ধু রুমী ও সরফরাজের বাসায়। ওরা আমার আর মুবিবের মতই এক সাথে থাকে। মুবিব যেহেতু নেই তাই ওরাই ভরসা। বিয়ে করতে হলে অন্তত দু'জন তো সাক্ষি লাগবেই, তাই না? (সাত) বিকাল ০৩.৩৪ আমি বসে আছি জাহাজবাড়ী। ধানমণ্ডি জাহাজবাড়ী। আমার প্রিয় স্থান। গতরাতে তিতিকে চারটায় আসতে বলেছিলাম। কারো সাথে দেখা করতে সময়ের আগেই ওখানটায় পৌঁছে যাওয়া -এটা রীতিমত অভ্যাস আমার। তিতি তো এখনো আসেনি, রুমী আর সরফরাজও আসেনি। অপেক্ষা নাকি মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর! কিন্তু আমার কাছে সেটা মনে হয় না, কেউ তো মৃত্যুর পর ফিরে এসে একথা বলে যায়নি। এজন্য অপেক্ষার মূহুর্তগুলো আমি ভাবনায় ডুবে থাকি। ভেবে ভেবে কল্পনার সূঁতোয় স্বপ্ন বুনি। এভাবেই ভাবতে ভাবতে ওরা যখন এলো। ঘড়ির কাটা তখন চারটা পেরিয়ে ঊনিশ মিনিটে পৌঁছে গেছে। এদিকে তিতির কোন খবর নেই। এসেই ওরা বলল, 'কিরে ও আসেনি?' আমি বললাম, 'দেখতেই তো পারছিস।' সরফরাজ বলল,'আমি ভেবেছি আরেকটু দেরী করেই আসি। বিয়ের আগে না হয় আরেকটু প্রেম করে নিলি।' ওরা হাসতে শুরু করল। সাথে আমিও হাসলাম। বিয়ের দিন বর-কনেদের এমন টিটকারী মূলক কিছু কথা শুনতে হয়। তাছাড়া সরফরাজ ছেলে ভালো। চুপচাপ কবি মানুষ। সাহিত্য জ্ঞানে আমি ওর হাঁটুর সমান। হঠাত্‍ রুমী দাঁড়িয়ে গেল। ওর ডান হাতটা গলার নিচে দিয়ে থুতনিতে হাতের তালুটা রেখে আঙুলগুলোকে ডান গালের উপর রেখে দিল। আর বাম হাতটা দিয়ে পেটের উপর ডানটা চেপে ধরল। ওর চেহারা আর কাজের এক্সপ্রেশন দেখে সরফরাজ হাসিতে গড়িয়ে পড়ল। মনে মনে বললাম, শালায় আমাকে ভেঙাচ্ছে! তবুও আমি নিজেই হাসি আটকাতে পারলাম না। এক চোট হাসাহাসির পরও রুমীর কোন হের ফের নেই। ও অভিনয় বজায় রেখে গম্ভীর গলায় বলল,'বুদ্ধুরাম, বিয়ের আগেই বিপত্নীক হয়ে ভাবনায় বসে গেছে!' এবার সবাই মিলে হো হো করে হেসে উঠলাম। প্রাণখোলা হাসি দিয়ে আপনাতেই মন কিছুটা ভালো হয়ে গেল। আমি মোবাইলটা হাতে নিলাম। নেফারতিতিকে একটা ফোন দিয়ে যাক। পুরনো মডেলের নোকিয়ার ভাঙাচুরা সেটে নাম্বারটা খুঁজে পেতে বেগ পেতে হল না। নেটওয়ারর্কের টানাহেঁছড়া শেষে যখনি কলটা ঢুকতে গেল তখনি যান্ত্রিক কণ্ঠটা বলে উঠল, 'নাম্বারটি ব্যস্ত আছে - দ্য নাম্বার ইজ বিজি নাউ!' কিছু মনে করার কোন কারণ নেই। বিজি তো থাকেতেই পারে। আমাদের তিন বন্ধুর আড্ডা চলতেই লাগল। এভাবেই পাঁচটা বিশ বেজে গেল। অথচ তিতির দেখা নেই। অবশ্য মাঝে আমি বারকয়েক সংযোগের ব্যর্থ্য চেষ্টা করেছি। মনে খানিক উত্‍কণ্ঠা জাগে। কিন্তু কিছু বলিনা আমি। রুমী আর সরফরাজ হয়ত এটা নিয়েই খোঁচাতে শুরু করবে। এমনিতেই ওদের অনেক কানপড়া দিয়ে বুঝিয়ে বিয়েতে সাক্ষী হবার জন্য রাজী করতে হয়েছে। ওরা এখন বিয়ের পর আমার পকেট থেকে কি পরিমাণ খসাবে সে হিসাব করছে। অথচ আমার পকেটে একটা ফুঁটো পয়সাও নেই! বিয়ের খরচটা তিতি দিবে বলেছিল। কথটা শুনে প্রথমে মন খারাপ হয়ে গেছিল আমার। তিতি ব্যপারটা বুঝতে পেরে বলেছিল পরে পরিশোধ করে দিলেই তো হল। এখন বাজে পাঁচটা পঁচিশ। এখান থেকে কাজী অফিসে যেতে পনের মিনিট তো লাগবেই। পৌনে ছয়টায় আবার মাগরিবের আজান। কি যে করি ভেবে কূল কিনারা পাচ্ছিলাম না। মনকে বারবার একথা বলে প্রবোধ দিচ্ছি, 'এই তো এসে যাবে তিতি।' (আট) পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। সূর্য ডুবে সন্ধা ঘনিয়ে এসেছে। এদিক সেদিক হতে আজানের আওয়াজ ভেসে আসছে। কিন্তু তিতির কোন পাত্তা নেই! মনের শঙ্কাটা ধীরে ধীরে ভয়ে রুপান্তরিত হচ্ছে আমার। রুমী ও সরফরাজের হাসাহাসি বন্ধ হয়ে গেছে। দুঃখের একটা বিষাক্ত বাতাস সবাইকে গ্রাস করে নিয়েছে। রুমী আমার কাঁধে হাত রাখল। সান্ত্বনার ছোঁয়া। নিচু স্বরে বলল, 'তুই একবার ওর বাসায় গিয়েছিলি না?' আমি যেন অন্ধকারেও আলোর সন্ধান পেলাম। ওর দিকে তাকিয়ে একটা ম্লান হাসি দিলাম। এটাই ওর পুরস্কার। কিছু না বলে অমি হাঁটতে লাগলাম। নিরবে। ছয়টা তের বাজে। মাগরীবের পর দ্রুত পায়ে লালমাটিয়ায় এসে পৌঁছলাম। মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তিতির ব্যাপারে বাজে কোন চিন্তা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। একবার এটা অন্যবার আরেকটা ভেবে মনকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম। এভাবে ভাবতে ভাবতে লালমাটিয়ার কানা গলিতে উদ্ভ্রান্তের মত ঘুরতে থাকি। রুমী আর সরফরাজও আমার পিছে পিছে ঘুরছে। হয়ত বিরক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কিন্তু বন্ধুত্বের খাতিরে কিছুই বলছে না। হঠাত্‍ আমার মনের মাঝে কেউ বলে উঠল ডানে এসো! আমি ডানে গেলাম। ওরাও আসছে। কিছুদূর সামনে আবারো রাস্তা ডানে-বামে মোড় নিয়েছে। আমি মোড়ে এসে থমকে দাঁড়ালাম। কোনদিকে যাব দিশা পাচ্ছি না। মনে মনে তিতিকে বলছি, 'আমায় পথ দেখিয়ে দাও।' ওর মায়াবী চোখ দুটো আমার চোখে ভেসে উঠে। আমি ওই শীতল মায়ায় ডুব দিয়ে পথ খুঁজতে থাকি। (নয়) 'কিরে এবার কোনদিকে?' রুমীর গলা শুনে সম্বিত্‍ ফিরে পেলাম আমি। অনেকটা বিরক্তি ঝরা কণ্ঠ ওর। সরফরাজ বরাবরের মতোই নিরব। কবি হয়ত আমার অবস্থা কিছুটা বুঝতে পারছে। মুখটা গম্ভীর করে রেখেছে। আমি কিছু না বলে বাম দিকে হাঁটা ধরলাম। এটা কোন সুত্র নয় যে ডানের পরেই তো বাম আসবে। বরং আমার মন বলছে বামে যেতে তাই হাঁটছি। হঠাত্‍ খানিক দূরের গাছে ঢাকা একটা বাড়ি দেখে আমার মনে হল এটাই সেই বাড়ি। আমি আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করে ওদের এগিয়ে যেতে বললাম। নিজের ক্লান্ত শরীরটা বেশ ভারী মনে হচ্ছিল। পা দুটো আটকে যাচ্ছিল পিচ ঢালা রাস্তায়। মন বলছিল,'সামনে আর যাসনে বোকা! যদি সয্য করতে না পারিস।' তবুও আমি এগিয়ে যাচ্ছি সত্য সন্ধানের টানে। মনকে সান্ত্বনা দিয়ে বলছি, 'এইতো আর মাত্র কয়েক সেকেন্ট। তারপরেই আমি প্রিয়তমার সান্যিধ্য পাব।' আমার মুখের রসায়ন নিঃশেষ হয়ে আসে ধীরে ধিরে। তৃষ্ণার্ত ওষ্ঠদ্বয় শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এখন যদি একটুখানি ওর অমৃত পেতাম হয়ত বেঁচে যেতাম। পানি শূন্যতায় মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করতে শুরু করে। কপালের রগ দুটো ফুলো ফেঁপে উঠছে ক্রমান্বয়ে। ওদিন একসিডেন্টের পর থেকেই মাঝে মাঝে এমনটা হয়। রুমী ও সরফরাজ বাড়িটার সামনে পৌঁছে যায়। উঁকি মেরে দেখছে আলো জ্বলছে কিনা। এর মাঝেই আমি ওদের পিছনে পৌঁছে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি। আমার পায়ের আওয়াজ শুনে সরফরাজ পিছনে ফিরে আমাকে বলল,'এটা দেখি নির্মাণাধীন বাড়ি!' কথাটা শুনে যেন শক খেলাম আমি। থরথর করে কেঁপে উঠল আমার সমগ্র সত্বা। সেদিনের কথা আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে! নিজেই নিজের উপর কেমন যেন বিশ্বাস হারালাম। এটা কীভাবে সম্ভব? আকস্মিক আমার চতুর্পাশে ঘূর্ণিঝড় উঠে। পৃথিবী ঘোলাটে হয়ে উঠে আমার দু'চোখে। হাঁটু কাঁপতে থাকে থরথর করে। রুমী আমার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে গেল। আর আমি ঢলে পড়লাম জমিনের বুকে। দু'চোখ বন্ধ হয়ে মাটিতে পড়ার সময় শুনতে পেলাম রুমীর মুখের কয়েকটি শব্দ, 'শালা! এটা দেখি তোর নিজের নাম্বার!' আমার দুচোখে ভেসে উঠে মনের গহীনে অঙ্কিত সেই চিত্রের বর্ণনা, 'দো-হাড়া গড়ন। চিকন কটিদেশ। তাতে ঘন কালো দীর্ঘ চুল।...' (দশ) ধবধবে সাদা একটা রুমে শুয়ে আছি। রুমের প্রতিটি কোণে মৃত্যুর শীতলতা বিরাজ করছে যেন। এমন একটা রুমেই সর্বপ্রথম নেফারতিতির দেখা পেয়ে ছিলাম আমি। রুমের প্রতিটি জিনিষেই মেডিনোভা মেডিকেলের লোগো সিল করা। চোখ খোলার পর শিয়রে বসা এক শুভ্রকেশী বৃদ্ধকে দেখতে পেলাম। চোখে ভারি ফ্রেমের চশমা পরা। আগেরবার ইনার কাছেই চিকিত্‍সা নিয়ে ছিলাম আমি। ডা. শিবলী নোমানী। ভদ্রলোক যথেষ্ট স্নেহ করেন আমাকে। উনি তাঁর হাত দিয়ে আমার কপাল মুছে দিচ্ছিলেন। মুখে প্রশ্রয় আর ভরসামাখা হাসির মিশ্রন। হয়ত বিশ্রী ব্যপারটা উনি জেনে গেছেন। তবুও আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসা প্রথম কথা ছিল, 'নেফারতিতি কি এসেছে?' উনি আমার হাতে মৃদু চাপ দিয়ে সান্ত্বনা দেন। এবং বলেন, 'তোমার কি ওর চেহারার কথা স্পষ্ট মনে আছে?' মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠে আমার। নিরব সম্মতিতে মাথা নাড়লাম আমি। আর মনে মনে বললাম, 'এই চিত্র যে মুছে যাবার নয়।' উনি এক নার্সকে ইশারা করলেন। নার্স একজন লোককে ডেকে আনল। আবারো মুখটা উজ্জ্বল হয়ে হাসি ফুটে উঠল আমার ঠোঁটের ফাঁকে। এবার দুচোখ বন্ধ করে কিছুটা উচ্চ আওয়াজে আমি বিড় বিড় করতে লাগলাম, 'দো-হাড়া গড়ন। চিকন কটিদেশ। তাতে ঘন কালো দীর্ঘ চুল।...' তিন ঘন্টা পর- ডা. শিবলী নোমানীর রুমে বসে আছে রুমী ও সরফরাজ। দীর্ঘক্ষণ ওদের রুমে বসিয়ে রেখে মাত্র ফিরে এলেন তিনি। তাঁর সামনে একটা ফাইল রাখা। ফাইলের পরিচয়ের ঘরে ছোট্ট করে লেখা একটা শব্দ। তিনি ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন শব্দটা, 'ধ্রুব...।' দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি। তার সামনে বসা রুমী ও সরফরাজের দিকে তাকালেন তিনি। চিন্তিত উভয়ের চেহারা। উত্‍কণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষায় আছে তার মুখ থেকে কিছু শুনার জন্য। ডা. শিবলী তাঁর ভারী ফ্রেমের চশমাটা সামান্য নাড়িয়ে প্রশ্ন করলেন, 'তোমরা ওর বন্ধু?' রুমী আর সরফরাজ উভয়ের সম্মতিতে মাথা নাড়ল। তিনি তাঁর পেশাগত গাম্ভীর্য্যে ফিরে এসে বলতে শুরু করেন, 'দেখ, কেউ যখন প্রেমে পড়ে তখন তার ব্রেইনে প্রচুর পরিমাণে 'ডোপামিন' এবং 'নর-ইপিনেফ্রিন' তৈরি হয়, যে কারণে নেশাগ্রস্তের মত অনুভূতি হয়। শুধু মানুষ নয় অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রেও এমনটা দেখা যায়। একটি উদাহরণ দিলে তোমাদের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। যেমন ইঁদুর জাতীয় প্রেইরি ভোলের কথা বলছি। এদের স্ত্রী প্রেইরি ভোলকে আকৃষ্ট করার জন্য প্রেমের শুরুতে পুরুষ প্রেইরি ভোল তার প্রস্রাবের গন্ধ শোকায়। এতে স্ত্রী প্রেইরি ভোলের ব্রেইনে 'ডোপামিন' এবং 'নর-ইপিনেফ্রিন'র মাত্রা বেড়ে যায়। ফলে স্ত্রী প্রেইরি ভোল পুরুষ প্রেইরি ভোলের প্রতি আকৃষ্ট হয়। অবশ্য পশুদের ক্ষেত্রে এই নেশার ঘোর মিলিত হবার পর কেটে গেলেও মানুষের ক্ষেত্রে এটা মাসের পর মাস-বছরের পর বছর এমন কি অনেক ক্ষেত্রে আজীবনও থেকে যায়। এজন্যে দেখবে দীর্ঘদিন প্রেম করার পরও যারা বিয়ে করে তাদের অধিকাংশ বেশিদিন সংসার করতে পারে না। এর অন্যতম কারণ হল ওই নেশার ঘোরটা কেটে যাওয়া।' 'কিন্তু স্যার...?' ডা. শিবলী নোমানী চুপ করার পর পরই প্রশ্ন করে রুমী, 'ওর সাথে এসবের কি সম্পর্ক?' ডা. শিবলী মুচকি হাসি দিয়ে স্নেহসূলভ গলায় বলেন,'বত্‍স, আগে আমার কথাগুলো মন দিয়ে শুনো। দেখবে আপনাতেই বুঝে আসবে।' সরফরাজ তো এমনিতেই চুপ ছিল। ডাক্তারের কথা শুনে রুমীও চুপ হয়ে যায়। সায়েন্সের এসব গাঁজাখুরি গল্প ওর ভালো না লাগলেও মন দিয়ে শুনতে থাকে। আর ডা. শিবলী নোমানী আবারো লেকচার দেওয়া শুরু করেন, 'প্রোফেসর র্যামিরেজ অহিও। যিনি আমেরিকার স্টেট ইউনিভর্সিটির একজন গবেষক। তিনি বলেছিলেন, কারও সাথে আমাদের সাক্ষাত হওয়া বা কারো চিত্র আমাদের মনস্পটে ভেসে উঠা মাত্রই আমাস্ন্যাপ জাজমেন্টের মাধ্যমে মানুষ বুঝতে পারে তার সাথে কি ধরনের সম্পর্ক হতে যাচ্ছে। ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমাজিং’র মাধ্যমে ব্রেইন স্ক্যান করে তিনি দেখেন যে প্রিয় বন্ধু এবং প্রেমিক কিং প্রেমিকার মধ্যে ব্রেইনের প্রতিক্রিয়ার ভিন্নতা আছে। প্রেমিক কিংবা প্রেমিকার ছবি দেখলে ব্রেইনের উভয় পার্শ্বের মিডিয়াল ইনসুলা, এন্টেরিয়র সিংগুলেট করটেক্স, কডেট নিউক্লিয়াস এবং পুটামেন সক্রিয় হয়। অক্রিয়তা দেখা যায় পোস্টেরিয়র সিংগুলেট জাইরাস, এমিগডালা এবং ডান পার্শ্বের প্রি-ফ্রন্টাল, প্যারাইটাল ও মিডল- টেম্পোরাল করটেক্সে। ব্রেইন স্ক্যানে আরও দেখা যায় যারা পাগলপ্রায় ভালোবাসে তাদের ব্রেইনের উত্তেজিত অংশ এবং কোকেইনে আসক্তদের উত্তেজিত অংশ একই। অর্থাৎ উভয় ক্ষেত্রে ব্রেইনের একই জায়গা উত্তেজিত হয়।' লেকচারটা থামিয়ে একটু স্বস্তির শ্বাস ছাড়েন ডা. শিবলী নোমানী। এই বয়সে এমন লেকচার না দিলেও হত। কিন্তু ওর বন্ধুদের বিষয়গুলো বুঝিয়ে না দিলে ওরা কিছুই বুঝবে না। তাই শুরু যেহেতু করেছেন শেষ তাকে করতেই হবে। অসম্পূর্ণ কাজ আবার তিনি মোটেই পছন্দ করেন না। টেবিলে রাখা গ্লাস হাতে নিয়ে তিনি পানি পানে মনযোগী হলেন। আর এই নতিদীর্ঘ লেকচার শুনে সরফরাজের কেমন লাগছে রুমীর জানা নেই। কিন্তু সায়েন্সে ভর্তি না হওয়ার জন্য মনে মনে নিজের পিট নিজেই চাপড়ে দিচ্ছিল। আর সরফরাজের কাছে এসব ভালো লাগা বা না লাগা কোন ফ্যক্ট না। সাহিত্য ও সংবাদিকতা নিয়েই ওর কাজ। ও কেবল শুনে যাচ্ছে। দেখলে মনে হবে ও একনিষ্ঠ শ্রোতা! টেবলে গ্লাস রাখার শব্দে উভয়ে ডাক্তারের লেকচারের দিকে মনোনিবেশ করে। আর ডা. শিবলী পানি দিয়ে ঠোঁট দুটো ভিজিয়ে আবারো বলা শুরু করেন, 'দেখ, তোমাদের দু'জনকে এতক্ষণ যে বিষয়টা বুঝানোর জন্য এত কথা বলা সেটা হল, এই প্রেম বলো আর ভালবাসা বল এটা উভয় পক্ষের একসাথে হলে ভালো, একটি সুন্দর সম্পর্কের সূচনা হয়। না হলে যে প্রেমে পড়ে তার জন্য শুরু হয় এক কষ্টকর জীবন। কথায় বলে প্রেমরোগ বড় রোগ।' এই কথা বলে ডা. শিবলী মুচকি হেসে ওদের একটা চোখ টিপ দিলেন। এরপর আবার বলা শুরু করেন, 'বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ডরোথি টিনভ এধরনের মানসিক প্রতিক্রিয়ার নাম দিয়েছেন লিমিরেন্ট রিঅ্যাকশন। আর যার প্রেমে পড়া হয় তার নাম দিয়েছেন লিমিরেন্ট অবজেক্ট। লিমিরেন্ট অবজেক্টকে নিয়ে লিমিরেন্ট রিঅ্যাকশনের মনে ইনট্রুসিভ চিন্তা আসতে থাকে। ইনট্রুসিভ চিন্তা হলো মনের বিরুদ্ধে চিন্তা আসা। আর এই চিন্তার ফলে সে অমনোযোগী হয়ে পড়ে। পড়াশুনা, কাজে-কর্মে মনোনিবেশ করতে কষ্ট হয়। কখনো কখনো ব্যর্থও হয়। আর যেরকম অনুভূতি তার মধ্যে হচ্ছে, সেরকম অনুভূতি যেন লিমিরেন্ট অবজেক্টের মধ্যেও হয় এমনটা প্রত্যাশা করতে থাকে তীব্রভাবে। যদি লিমিরেন্ট অবজেক্টের মধ্যে সামান্য কোনো প্রতিক্রিয়াও সে দেখতে পায় তাহলে ভীষণ আনন্দিত হয়। আর তাই সব চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি, কাজ-কর্ম লিমিরেন্ট অবজেক্টের প্রতি লক্ষ্য করে চলতে থাকে লিমিরেন্ট রিঅ্যাকশনের। এমনকি সে লিমিরেন্ট অবজেক্টের নেতিবাচক দিকগুলি দেখতে পায় না। ডিল্যুশন পর্যায়ের এক ভ্রান্ত বিশ্বাসের ফলে সে বিশ্বাস করে লিমিরেন্ট অবজেক্টও তাকে ভালবাসে! এক পর্যায়ে সে জেনারালাইজড অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার, প্যানিক ডিসওর্ডার, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার ইত্যাদি মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়। আর যে প্রেমে পড়ে অর্থাত্‍ লিমিরেন্ট রিঅ্যাকশন যদি লিমিরেন্ট অবজেক্টের মধ্যে ভালবাসা দেখতে না পায তখন অনেকেই দুশ্চিন্তা জনিত সমস্যায় পড়ে। যেমন- ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার, অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিসঅর্ডার ইত্যাদি রোগের সম্ভাবনা দেখা দেয়। এবার তোমাদের বন্ধুর প্রসঙ্গে আসি-' এ পর্যন্ত বলেই টেবিলে রাখা গ্লাস থেকে তিন চুমুক পানি পান করেন ডা. শিবলী নোমানী। ওদেরকে মন দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে তিনি বলতে শুরু করেন, 'তোমাদের বন্ধু ছোটবেলা থেকেই মায়া-মমতা ও স্নেহের ছিঁটেফোটাও পায়নি। এটা আমার চেয়ে তোমরাই ভালো জানো। এছাড়া ও টুকটাক গল্প-উপন্যাস লেখত সেটা মুবিব শেখ আমাকে বলেছিল। ও সাধারণত কয়েকটা চরিত্রকে ঘিরেই লেখালেখি করত। এর মাঝে ছেলে চরিত্র কয়েকটা থাকলেও মেয়ে চরিত্র ছিল মাত্র একটা। যেই চরিত্রের ও নাম দিয়েছিল নেফারতিতি। এই নেফারতিতি মূলত মিশরের এক রাণীর নাম। নেফারতিতির সঙ্গে রাজা তৃতীয় অ্যামেনহোটেপের ছেলে চতুর্থ অ্যামেনহোটেপের (আখেনাটেন) বিয়ে হয়েছিল, নেফারতিতি ও আখেনাটেন খ্রিষ্টপূর্ব ১৩৫৩ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ১৩৩৬ সাল পর্যন্ত যৌথভাবে মিশর শাসন করেন। তাদের ছয় কন্যা ছিল। অনেক ইতিহাসবিদের দাবি, তাদের একটি ছেলেও ছিল। এই নেফারতিতি ছিল সৌন্দর্ষের রাণী। তাই নেফারতিতির উপর ওর কিছু দূর্বলতা ছিল। কিন্তু নেফারতিতির কয়েকটি মূর্তি থাকলেও কোন ছবি কোথাও নেই। এজন্য তোমাদের বন্ধু মনে মনে নেফারতিতির একটা চিত্র এঁকে নিয়েছিল। এরপরের ঘটনা এক মাস পূর্বেকার। আমাদের হাসপাতালের নিকটেই ও একটা দূর্ঘটনার শিকার হয়। শরীরের কোথাও তেমন আঘাত না পেলেও মাথার আঘাতটা বেশ গুরুতর ছিল। আর ঘটনার সময় ও নেফারতিতিকে নিয়েই ভাবছিল। ফলে ওই চিত্রটা ওর মাথায় নিখুঁত ভাবে গেঁথে যায়। যার ফল স্বরুপ এই স্কেচ।' এই বলে তিনি রুমী ও সরফরাজের হাতে কিছুক্ষণ পূর্বে আঁকা একটা স্কেচ তুলে দেন। ধ্রুবের বর্ণনা অনুযায়ী একজন আর্টিস্ট যে স্কেচ এঁকেছিলেন। রুমী ও সরফরাজ স্কেচটা হাতে নিয়ে দেখতে থাকে। ডা. শিবলী নোমানী আবার বলতে শুরু করেন, 'দূর্ঘটনার আগ থেকেই ও পূর্বে উল্লেখিত অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার নামক মানসিক রোগে আক্রান্ত ছিল। এই রোগটা একদিনে হয় না বরং ধীরে ধীরে এই রোগটা রুগীকে গ্রাস করে নেয়। ও ভাবত ওর মনে আঁকা চিত্রের মেয়েটাও ওকে ভালবাসে। কিন্ত দূর্ঘটনার পর রোগটা আরো মারাত্মক রুপ নেয়। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হয় ও। যাকে সিজোফেন্সনিয়া ও বলা হয়। ব্রেনের জৈব-রসায়নিকের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা ও অসামঞ্জস্যতার কারণে যার উত্‍পত্তি হয়। ১৮৮৭ সালে জার্মান মনোবিদ এমিল ক্রেপলিন প্রথম এই রোগের সন্ধান পান। বর্তমানে এই রোগকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয় - এক, ইনসিডিয়াল সিজোফ্রেনিয়া, দুই, একিউট বা ক্রাইসিস সিজোফ্রেনিয়া তিন, ক্রনিক সিজোফ্রেনিয়া। এখন দেখার বিষয় ওর রোগটা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এজন্য এ বিষয়ে আমাকে সাহায্য করার জন্য আমি আমার পরিচিত ও স্নেহধন্য সাইকলোজিস্ট হাসান সাব্বিরকে ওর ব্যাপারে জানিয়েছি।' ডা. শিবলী নোমানীর বক্তব্য শেষ। সরফরাজ লেকচারের প্রভাবটা দ্রুত কাটিয়েই প্রশ্ন করল, 'স্যার, এখন আমরা কী করব?' কিছুক্ষণ ভাবলেন তিনি। এরপর বললেন,'তোমরা ওকে ওর রোগের ব্যপারে কিছু বলবে না। বরং ওকে ওর মত থাকতে দাও। আমরা দেখি কি করতে পারি।' ওরা উঠে দাঁড়াল ডা. শিবলীর রুম ছেড়ে বের হবার জন্য। (এগারো) জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছি আমি। নেফারতিতির দেখা আজও পাইনি আমি। রুমী আর সরফরাজ ওকে নাকি খুঁজে বেড়াচ্ছে। ডা. শিবলী ওদেরকে সাহায্য করছেন। তিনি আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন যে নেফারতিতিকে খুঁজে আমার সামনে নিয়ে আসবেন। আমি বলেছিলাম আমাকে যেন হাসপাতাল থেকে রিলিজ দেওয়া হয় তাহলে আমিই ওকে খুঁজে বের করব। কিন্তু কেউ রাজি হচ্ছে না। আমিতো সুস্থ তবুও আমাকে কেন আটকে রাখা হচ্ছে! সন্দেহ ঢুকে পড়ে আমার মনে। আমার মন বলছে নেফারতিতি নিশ্চিত কোন বিপদে পড়ছে নচেত্‍ এতদিন পর্যন্ত ও আমাকে ছেড়ে থাকতে পারত না। এজন্য আজ ঘুম থেকে উঠেই আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পালিয়ে যাব আমি হাসপাতাল ছেড়ে। বিপদ থেকে উদ্ধার করব আমার তিতিকে। জানালার দুটো গ্রিল শক্ত করে ধরে দুচোখ বন্ধ করে স্বগতোক্তি করলাম আমি, 'নেফারতিতি আমি আসছি!' (সমাপ্ত)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭২ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now