বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
।। অলৌকিক জল্লাদ - ৩য় পর্ব ।।
কাহিনীঃ মানবেন্দ্র পাল
।। অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা ।।
কয়েকটা দিন কেটে গিয়েছে। সুব্বা এ
ক'দিনেই আমাদের বাড়ির একজন হয়ে উঠেছে।
যদিও ও এখন নিয়মিত তেল মেখে সাবান দিয়ে
স্নান করে, নোটনের পুরনো জামাগুলো
পরে, তবু যখনিই ও আমার ঘরে ঢোকে তখনই
হঠাৎ মূহুর্তের জন্য সেই বিশ্রী গন্ধটা পাই।
একদিন স্ত্রী 'কে গন্ধের কথাটা বললাম। স্ত্রী
অবাক হয়ে বলল, " কই না তো!"
আমার স্ত্রী বা বাড়ির অন্য কেউ যখন গন্ধ পায়না
তখন বুঝলাম ওটা আমারই ভুল। প্রথম দিনের সেই
বিশ্রী গন্ধটা এখনও আমার নাকে লেগে
রয়েছে।
নারকেল গাছটা ছিল বহুদিনের। কোন ছোটবেলা
থেকে দেখে এসেছি। এত দিন পর তার মৃত্যু
হল বজ্রাঘাতে আমারই চোখের সামনে।
দেখতে পাই পাতাগুলো কিরকম জ্বলে গেছে।
একটা একটা করে বালদাসুদ্ধ পাতা সশব্দে খসে
পড়ছে। মনটা খারাপ হয়ে যায়।
কিন্তু এসব সামান্য ব্যাপার নিয়ে মন খারাপ করলে
চলবে না। যে জীবনকাহিনীটা লিখতে আরম্ভ
করেছি তাড়াতাড়ি সেটা শেষ করতে হবে। ছুটি
ফুরোতে আর বেশী দিন নেই। আর এও জানি
কলকাতায় গিয়ে কাজের মধ্যে পড়লে লেখা আর
শেষ হবে না।
কিন্তু তাড়াতাড়ি শেষ করব বললেই তো শেষ করা
যায় না। এই যে সেদিন সন্ধেবেলায় ঘটনাটা ঘটল,
যত সামান্যই হোক, তবু তো ভুলতে পারছি না।
কেন সুব্বা চুপিচুপি আমার ঘরে ঢুকেছিল, কেনই বা
আলো নিভিয়ে আমায় ভয় দেখাতে চেয়েছিল,
ঘরের মধ্যে কার জ্বলন্ত চোখ দেখে
নোটন অমন চিৎকার দিয়ে উঠেছিল ভয়ে? যতই
সন্তোষজনক উত্তর পাই না, ততই কৌতূহল বাড়ে,
ততই সুব্বাকে লক্ষ্য করি। ওকে বোঝবার
চেষ্টা করি। ছেলেটা আর ঠিক পাঁচটা ছেলের
মতো নয়। ওর অদ্ভুত কাজকর্মের কিছু নমুনা
নেপালের হোটেলে দেখেছিলাম। অবাক
হয়েছিলাম বটে তবু কেমন অস্বাভাবিক মনে
হয়েছিল। এখানে এসেও একদিন ঐরকম একটা ঘটনা
ঘটিয়ে বসল।
দুপুরবেলা নোটন ছাদে ঘুড়ি ওড়ায়। সুব্বাও খুব
উৎসাহের সঙ্গে নোটনের সঙ্গে ছাদে
দাপাদাপি করে ঘুড়ি ওড়ায়।
সেদিন দুপুরে খেয়েদেয়ে নিজের ঘরে
বসে লিখছিলাম। হঠাৎ বাড়ির পেছনে মড়মড় শব্দ
করে কি যেন ভেঙে পড়ল। চমকে উঠলাম। কি
ভাঙল! কোনও দূর্ঘটনা ঘটেনি তো? ছুটে
গেলাম ছাদে। ততক্ষণে আমার স্ত্রী, ছোট
আর মেজ ভাই আর তাদের স্ত্রী 'রাও ছাদে
উঠে এসেছে। যে অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম তাতে
সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল। আমাদের বাড়ি থেকে বিশ
ত্রিশ হাত দূরে একটা আমগাছ। দেখি তারই একটা ডাল
ধরে সুব্বা ঝুলছে। ঝুলছে নয়, দোল খাচ্ছে।
আর নোটন লাটাই হাতে করে স্তম্ভিত হয়ে
সেদিকে তাকিয়ে আছে।
কি ব্যাপার?
ব্যাপারটা এই, নোটনের ঘুড়িটা আমগাছে আটকে
গিয়েছিল। কিছুতেই ছাড়াতে পারছিল না। তখন নাকি
সুব্বা ছাদের পাঁচিলে উঠে এক লাফ দিয়ে
আমগাছে গিয়ে পড়ল। ঘুড়িটা খুলে নিচে ফেলে
দিল। আর তার পরেই গোটা ডালটা মড়মড় করে
ভেঙে পড়ল। রাজু ততক্ষণে আবার একটা ডাল
ধরে ঝুলতে লাগল।
আমাদের দেখে একটু যেন হেসে সার্কাসের
খেলোয়াড়ের মতো ডাল থেকে দোল
খেতে খেতে এক ঝাঁকানি দিয়ে ছাদে এসে
পড়ল।
ওর এই তাজ্জব কাণ্ডকারখানা দেখে আমার রাগ
উঠে গেল। চিৎকার করে বললাম, " হতভাগা, তুই
নিজে মরবি, আমাকেও জেলে পাঠাবি?" বলে ঠাস
করে একটা চড় বসিয়ে দিলাম ওর গালে। কিন্তু....
গাল কোথায়? মনে হল যেন শক্ত হাড়ের ওপর
চড় বসালাম!
রাজু এক ফোঁটা চোখের জল ফেলল না। শুধু তার
সেই অদ্ভুত চোখের মণিটা ওপর দিকে ঠেলে
আমার দিকে তাকাল।
বাড়ির সবাই ওর এই দস্যিপনায় বিরক্ত হয়েছিল। তারা
কেউ মুখে কিছু না বলে নেমে গেল। আমি
ফের ধমক দিয়ে বললাম, " ফের এরকম করলে
তোমায় আমি দূর করে দেব, মনে রেখো। "
রাজু সুব্বা কোনও জবাব দেয়নি।
ঘটনাটার কথা ক'দিন পর আর কারও মনে রইল না।
সুব্বা দিব্যি বাড়ির কাজ করতে লাগল। নোটনের
সঙ্গে খেলাধুলাও চলতে লাগল। কিন্তু আমার মন
থেকে কিছুতেই সংশয় ঘুচল না...ঐ রোগাপটকা
হালকা ছেলেটার ভারে আমগাছের শক্ত মোটা
ডালটা ভেঙে পড়ল কি করে? নিজেকেই
বোঝাই...হয়তো ডালটা পলকা ছিল, ভেঙে
পড়তই। রাজু উপলক্ষ মাত্র।
একটা জিনিস লক্ষ্য করছি..যে রাজুকে আমি নিয়ে
এসেছিলাম সুদূর নেপাল থেকে, যার
আদরযত্নের এতটুকু ত্রুটি রাখিনি, সেই রাজু সুব্বার
ওপর আমার কেমন বিতৃষ্ণা জাগছে। কেন জানি না
ওকে আর সহ্য করতে পারি না। মনে হচ্ছে
ওকে না আনলেই হতো। ও চলে গেলেই বাঁচি।
আর আমার ওপরও রাজুর রাগ যে ক্রমশ বাড়ছে তাও
বুঝতে এখন আমার বাকি নেই। সেই বিরাগ এখন চাপা
আগুনের মতো ওর চোখেমুখে ফুটে
উঠেছে। আমাকে একলা পেলে ও ওর
ড্যাবডেবে চোখের সাদা অংশটা এমন বিশ্রী বড়
করে তাকায় যে আমার কেমন ভয় করে। সন্দেহ
হয়....ও কি সত্যিই মানুষের বাচ্চা?
আমার জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে যে অলৌকিক
উপন্যাসখানা লিখছি তার মধ্যে রাজু সুব্বার কথা লিখব
কিনা ভাবছি। ভাবছি এইজন্য যে, হয়তো সুব্বার ব্যাপার
স্যাপারগুলো অলৌকিক নয়। হতে পারে অস্বাভাবিক,
তাও অসম্ভব কিছু না। কেননা সুব্বা এদেশের
ছেলে নয়। কোথায় হিমালয়ের কোলে পাহাড়
পর্বত জঙ্গলঘেরা নেপালে ওর জন্ম। ওখানেই
তার ছেলেবেলা কেটেছে। হয়তো ওর মা
নেই, বাবা নেই, আত্মীয়স্বজন নেই। নিতান্ত
পেটের দায়ে আমার সাথে এতদূরে এসেছে।
কাজেই ও যদি লাফ দিয়ে ত্রিশ হাত দূরের গাছের
ডাল ধরে ঝোলে কিংবা অস্বাভাবিক তাড়াতাড়ি কাজ
করে তাহলে অবাক হবার কিছু নেই। নোটনের
মতো বাঙালি আদুরে ঘরের ছেলের সাথে
ওকে মেলাতে গেলে ভুল হবে। এও মনে
রাখতে হবে ছেলেটা আর যাই হোক, চোর
নয়, টাকাপয়সার দিকে বা খাওয়ার দিকে লোভ নেই।
সবচেয়ে বড় কথা নোটনের সাথে ওর খুব ভাব।
কাজেই ছেলেটার মধ্যে কিছু অস্বাভাবিকতা
থাকলেও ভয় পাবার মতো অলৌকিক কোনো
ব্যাপার নেই। তবু আমার ডায়েরিতে ওর প্রতিদিনের
আচার আচরণ লিখে রাখছি।
এই যেমন সেদিন সন্ধেবেলা.... আমার ভাই'রা
এক নেমন্তন্ন বাড়ি গেছে। আমার স্ত্রী আর
দুই ভাইয়ের বৌ নিচে রান্নাঘরে। নোটন বাইরের
ঘরে পড়ছে। আমি আমার ঘরে বসে লিখছি।
পল্লীগ্রাম। এর মধ্যেই যেন নিশুতি হয়ে
গেছে। রাস্তায় লোকচলাচল বিশেষ নেই। বাড়ির
পেছনে দীর্ঘ আমগাছের বাগানটা অন্ধকারে গা
মিশিয়ে যেন কোনও কিছুর জন্য অপেক্ষা
করছে।
আমি একমনে লিখছি। হঠাৎ পেছনের দরজার কাছ
থেকে ছোট বৌমার উত্তেজিত গলা শোনা
গেল...." সুব্বা, কি করছ?"
চমকে পেছন ফিরে দেখি আমার ঠিক পেছনে
রাজু দাঁড়িয়ে দু হাত বাড়িয়ে। ওর চোখের কটা
রঙের মণিদুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে
আসছে। মুখের ওপর একটা হিংস্র ভাব যা আগে
কখনো দেখিনি।
" কি চাই?" ধমকে উঠলাম।
সুব্বা শান্তগলায় শুধু বলল, " মাচিস।"
মাচিস অর্থাৎ দেশলাইটা চায়।
" দেশলাই নিয়ে কি করবে?", রাগত স্বরে
জানতে চাইলাম।
উত্তরে ও জানাল, ওর ঘরে নাকি আলো নিভে
গেছে। মোম জ্বালবে।
ততক্ষণে ছোট বৌমা ঘরের ভেতর এসে
দাঁড়িয়েছে। সুব্বাকে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, "
কখন আলো নিভল? এই তো দেখলাম আলো
জ্বলছে।"
আমি কিরকম ভয় পেলাম। একটা ফয়সালা আজ
করতেই হয়। চেয়ার থেকে উঠে বললাম, " চল
তো দেখি কেমন আলো নিভেছে?"
ও দোতলার সিঁড়ির ঘরে থাকে। গিয়ে দেখি সত্যিই
ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার।
ছোট বৌমা বলল, " অবাক কান্ড! সুব্বা এ ঘরে
যখন ঢোকে আমি তারপরে সিঁড়ি দিয়ে উঠে
এসেছি। দেখেছি ওর ঘরে আলো জ্বলছে।"
বললাম, " তার পরেই হয়তো আলো নিভে
গেছে।"
ছোট বৌমা কঠিন স্বরে বলল, " না, সুব্বা বলছে
আলো নিভে গেছে বলেই দেশলাই চাইতে
এসেছিল। মিথ্যে কথা। আবার বলছি ও যখন এঘরে
এসে আপনার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল, আমি
দেখেছি তখনও আলো জ্বলছিল।"
আমি আর কিছু বললাম না। রাজুর হাতে দেশলাই দিয়ে
ওকে চলে যেতে বললাম।
পরের দিন ছোট বৌমা আমার ঘরে এসে চুপি চুপি
বলল, " দাদা, রাজুর ব্যাপার স্যাপার আমার ভাল
ঠেকছে না। ও দেশলাই নিতে আসেনি। আমি
স্পষ্ট দেখেছি ও আপনার গলা টিপে মেরে
ফেলতে এসেছিল।"
হেসে বললাম, " না, না, তাই কখনো পারে?
কেনই বা আমায় মারবে? তাছাড়া ঐ তো দুখানা হাড়
বের করা চেহারা.... "
ছোট বৌমা বলল, " ঐ দুখানা হাড়েই ও কিন্তু ভেল্কি
দেখায় ভুলবেন না। যাই হোক আমার বিবেচনায়
ওকে যত শিগগীর পারেন বিদেয় করুন। "
বলে চলে যাচ্ছিল, ফিরে দাঁড়িয়ে আবার বলল, " এ
কথা আর কাউকে না বলাই ভাল। শুধু আপনি একটু
সাবধানে থাকবেন"
বলেই চলে গেল ছোট বৌমা।
এই একটা নতুন ভাবনা শুরু হল আমার। সুব্বা কি সত্যিই
আমায় মেরে ফেলতে চায়? কিন্তু কেন? ওকে
সেদিন মেরেছিলাম বলে? ওর এত বড়ো সাহস
হবে বাড়িতে এত জনের মধ্যে আমায় মারার? তা
হতে পারে না। ও হয়ত সেদিনের মতোই ভয়
দেখাতে এসেছিল। ছোট বৌমা দেখে ফেলায়
ধরা পড়ে গেছে।
এর ঠিক তিন দিন পর ছোট ভাইয়ের কাছে চিঠি এল,
সামনের সপ্তাহে ছোট বৌমার বোনের বিয়ের
দিন ঠিক হয়েছে। দিন দশেকের জন্য ওরা যেন
চলে আসে।
ছোট বৌমা তো মহা আনন্দে ছোট ভাইয়ের
সাথে বাপের বাড়ি চলে গেল। যাবার সময় আমায়
গম্ভীর মুখে বলে গেল, " রাজুকে তো
সরাবেন না। ওর কাছ থেকে সাবধান থাকবেন।"
আমিও চাই রাজুকে সরিয়ে দিতে। কিন্তু সরাবার
তো স্পষ্ট কারণ থাকা চাই। তাছাড়া ও যাবেটাই বা
কোথায়? নেপালের সেই কাঠমান্ডুতে? ওখানে
কি ও একা যেতে পারে? তাহলে ওকে একা
কোথায় তাড়িয়ে দেব?
ছোট বৌমা আমায় সাবধানে থাকতে বলল। কিন্তু
নিজের বাড়িতে সবার মাঝখানে আর কি এমন সাবধান
হতে পারি?
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now