বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অলৌকিক জল্লাদ - ২য় পর্ব

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ।। অলৌকিক জল্লাদ - ২য় পর্ব ।। কাহিনীঃ মানবেন্দ্র পাল ।। ভয়ঙ্কর ঘণ্টাকর্ণ ।। ড্রাইভারকে আমরা অনেক করে বোঝালাম যে, কোনওরকম ভয় নেই। ভূত প্রেত, দানব, অশুভ শক্তি যাই থাকুক না কেন, এই রিভলভারের কাছে সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে বলে কোটের পকেট থেকে রিভলভার বের করে দেখালাম। তাছাড়া আমরা দুজনেই যে কলকাতা পুলিশের অফিসার তাও জানিয়ে দিলাম। তাতেও ও যখন ইতস্তত করছিল তখন একটা পঞ্চাশ টাকার নোট ওর হাতে গুঁজে দিলাম। আমাদের পঞ্চাশ টাকা মানে নেপালিদের পঁচাশি টাকা। এবার কাজ হল। গরীব মানুষ ওরা। টাকা পেলে যমের দুয়ার পর্যন্ত যেতে পারে। অগত্যা বিমর্ষ মনে ও গাড়িতে স্টার্ট দিল। গাড়িতে একটা কালীঠাকুরের ছবি ছিল। ড্রাইভার সেই ছবিতে বার বার মাথা ঠেকাল। তারপর গাড়ি চালাতে লাগল। চারদিকে জঙ্গলভরা পাহাড়। তারই মধ্য দিয়ে খুব সাবধানে জিপটা চালিয়ে নিয়ে চলল ড্রাইভার। গাড়ি কখনো অনেক উঁচুতে উঠছে, কখনো আবার খুব নীচে নামছে। প্রায় ঘন্টাখানেক যাবার পর আমরা একটা ফাঁকা জায়গায় এসে পড়লাম। ডান দিকে আমাদের পশ্চিমবঙ্গের মতোই সবুজ ধানক্ষেত। বাঁ দিকে যে সরু নদীটা ঝিরঝির করে বয়ে যাচ্ছে, ড্রাইভারের কাছ থেকে নাম জেনে নিলাম....বিষ্ণুমতী নদী। ড্রাইভার সেই নদীর উদ্দেশ্যে প্রণাম করল। আবার সামনে পাহাড়। পাহাড়ের পর পাহাড়। পাইন গাছে ঢাকা। হঠাৎ ড্রাইভার জোরে ব্রেক কষল। আমরা ঝাঁকানি খেয়ে চমকে উঠলাম। কি হল? অমন শক্তসমর্থ ড্রাইভার ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল - " বিল্লি!" বিল্লি! বেড়াল! তা একটা বেড়াল দেখে এত ভয় পাবার কি আছে! দেখলাম বনবেড়ালের মতো মস্ত একটা কালো বেড়াল পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে জিপের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে পড়ল এ দেশের সংস্কারের কথা। নেপালে কোথাও বেড়াল দেখা যায় না। এ দেশে বেড়াল কেউ পছন্দ করে না। তাদের মতে, বেড়ালের চেয়ে কুকুর ভাল। বেড়াল কোনও উপকার করে না। বরঞ্চ ক্ষতি করে। সিদ্ধিদাতা গণেশের বাহন যে ইঁদুর, তাদের বেড়াল হত্যা করে। কাজেই বেড়াল গৃহস্থের অকল্যাণ করে। আর যদি কালো বেড়াল হয় তাহলে তো রক্ষে নেই। কেননা, এদের বিশ্বাস, কালো বেড়াল অশুভ আত্মার ছদ্মরূপ। যাই হোক প্রণবেশ গাড়ি থেকে নেমে বেড়ালটাকে তাড়িয়ে দিল। বেড়ালটা ফ্যাঁস করে কামড়াতে এসেছিল কিন্তু দ্বিতীয়বার তাড়া খেয়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল। অনিচ্ছুক ড্রাইভার আবার গাড়ি চালাতে লাগল। গাড়ি চলেছে ধীরেধীরে পাহাড়ের ওপর ঘুরে ঘুরে। কিছুক্ষণ চলার পর গাড়ি নামতে লাগল। নিচের দিকে তাকালে মাথা ঘুরে যায়। কুয়াশায় ঢাকা পড়ে গেছে পথ। খুব সাবধানে গাড়ি চালাচ্ছে ড্রাইভার। পাশেই গর্ত। স্টিয়ারিং একটু এদিকওদিক হলেই আর রক্ষে নেই। গাড়িটা ডান দিকের আরও সরু পথ ধরল। পাহাড়ের গায়ে অজস্র সললা, চিলোনী, মহুয়া আর বাজ গাছের জটলা। প্রায় দেড়ঘন্টা যাবার পর এক জায়গায় সরু রাস্তাটা তিনদিকে চলে গেছে। হঠাৎ ড্রাইভার সেখানে ব্রেক কষল। আমরা কিছু বুঝে ওঠবার আগেই দেখি রাস্তার দিকে তাকিয়ে ড্রাইভার প্রণাম করছে। কাকে প্রণাম করছে? জানলা থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখি ঠিক মোড়ের মাথায় একটা মস্তবড় খুঁটের ওপর লাল এক টুকরো ন্যাকড়া, ওদেশের একরকম হলদে রঙের জায়ে আর জবার মতো লাল লাল গোলাপ ফুল, সরু সরু ডালসুদ্ধ পাতা। ড্রাইভার সেইগুলোর উদ্দেশ্যেই প্রণাম করছে। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করে যেটুকু জানলাম, বুঝলাম এগুলো হচ্ছে অনেকটা তুক করার মতো। আজকাল অবশ্য তুকতাক বড় একটা দেখা যায় না। কিন্তু ছোটবেলায় গ্রামে দেখেছি। রাস্তার মোড়ে এইরকম মন্ত্রপূত তুক সাজিয়ে রেখে দিত এক শ্রেণীর হিংস্র স্বভাবের মানুষ, লোকের চরম ক্ষতি করার জন্য। এই তুক যে মাড়াবে তার সর্বনাশ হবে। এ'ও সেইরকম তুক। ড্রাইভার জানাল এই তুক করেছে ভয়ঙ্কর স্বভাবের তান্ত্রিক যে এই বিশেষ ঘণ্টাকর্ণ পূজো করে। রাস্তার মোড়ে তুক সাজিয়ে রেখে লোককে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছে... কেউ যদি ভুল করেও এতদূর এসে পড়ে, তারা যেন আর না এগোয়। কাজেই আমাদের ড্রাইভার আর এগোতে নারাজ। অগত্যা আমরা নেমে পড়লাম। জেনে নিলাম এই পাহাড়টা থেকে এক কিলোমিটার নেমে গেলেই বিষ্ণুমতী নদী। সেই নদীর তীরেই....... ড্রাইভার আর কিছু বলতে চাইল না। আমরা নামতেই ও গাড়ি ঘুরিয়ে নিল যাতে দরকার বুঝলেই স্টার্ট নিতে পারে। এমনও বিপদ হতে পারে যখন গাড়ি ঘোরাবার আর সময় থাকবে না। শুধু তাই নয়, গাড়িটা রাখল আরও এগিয়ে নিরাপদ দূরত্বে। আমাদের পরিষ্কার বলে দিল বেশি দেরী হলে সে এখানে গাড়ি নিয়ে থাকবে না। কেননা বেশি দেরী হলে বুঝে নেবে আমরা আর বেঁচে নেই। নিষিদ্ধ পূজো দেখতে যাওয়ার শাস্তি মৃত্যু। কথাটা শুনে আমাদের গা শিউরে উঠল। সত্যিই কি সব জেনেশুনে আমরা মৃত্যুর মুখে এগিয়ে চলেছি? যাই হোক পকেটের ভেতর থেকে রিভলভারটা বের করে, মুঠোর মধ্যে ধরে আমরা নামতে লাগলাম। পাহাড়ি ঢাল পথে আমরা হুড়মুড় করে নেমে চললাম। নিস্তব্ধ পাহাড়ে পথ। দু'পাশে যেন পাথরের আকাশচুম্বী খাড়া প্রাচীর। এখানে মরে পড়ে থাকলে কাকপক্ষীতেও টের পাবে না। প্রায় দশ মিনিট ধরে নামার পর আমরা নিচে বিষ্ণুমতী নদী দেখতে পেলাম। তবে তো আমরা এসে পড়েছি। পাহাড়ি নদী। জল কম। শীর্ণ। নদীর বুকে ছোট-বড়ো নানারকম নুড়ি। হঠাৎ প্রণবেশ আমার হাতটা চেপে ধরল। ....." কি হল?" আমি বললাম। " ওগুলো কি?" বলে প্রণবেশ নদীর ওপারে আঙুল তুলে দেখাল। যা দেখলাম, মাথার চুলগুলো খাড়া হয়ে উঠল। গোটা পনেরো মাথার খুলি ছড়িয়ে রয়েছে নদীর ধারে। মাথার খুলিগুলো আকারে ছোট। আমরা পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। এত মড়ার মাথার খুলি এল কোথা থেকে? আমরা আরও একটু নামলাম। দশ হাত নিচেই নদী। ওপরে পাহাড়টা আলসের মতো ঝুঁকে রয়েছে। মনে হচ্ছে যেন মস্ত একটা গুহার মুখ। ঐ যে কয়েকজন লোক...কি ভয়ঙ্কর সব চেহারা! কিন্তু কারও মুখে কথা নেই। অথচ যেন খুব ব্যস্ত। সবার গলায় ছোট ছোট পাতার মালা। হঠাৎ দেখি দুজন লোক একটা ছেলেকে ধরে নদীর দিকে আসছে। হৃষ্টপুষ্ট ছেলেটি। ফর্সা রঙ, সুন্দর দেখতে। বয়েস বছর দশেক। খালি গা, শীতে কাঁপছে। গলায় লাল ফুলের মালা। ছেলেটির মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেছে। " কি ব্যাপার?" প্রণবেশকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম। " স্নান করাতে নিয়ে আসছে", প্রণবেশ ফিসফিস করে বলল। " ধরে নিয়ে আসছে কেন? আর ওর গলায় মালাই বা পরা কেন?" প্রনবেশ ম্লান হাসল। বলল, " বুঝতে পারছ না?" এবার আর বুঝতে বাকি রইল না। ঘণ্টাকর্ণ পূজোয় ছেলেটাকে বলি দেবে। বলি এই প্রথম নয়। ঐ যে ছোট খুলিগুলো দেখলাম, ওগুলোও সেইসব হতভাগ্য ছেলেদের। মূহুর্তেই কর্তব্য স্থির করে ফেললাম। বড় পাথরের আড়ালে আড়ালে আমরা শিকারী কুকুরের মতো নিঃশব্দে এগিয়ে চললাম। দুজনেরই হাতে শক্ত মুঠোয় ধরা রিভলভার। ওরা যখন ছেলেটাকে স্নান করিয়ে ফিরছে, আমরাও তখন সাবধানে হেঁটে হেঁটে নদী পার হলাম। এখনো পর্যন্ত ওরা আমাদের দেখতে পায়নি। আমরা যথেষ্ট তফাৎ রেখে এগোচ্ছি। একটু দূরে গিয়ে ওরা থামল। এই সেই ঝুলে পড়া পাহাড়ের মুখ। দেখলাম পাহাড়ের গুহায় অন্ধকারে পাথরের মস্ত একটা পিদিম জ্বলছে। ভেতরে বোধহয় ঘন্টাকর্ণের মূর্তি। মূর্তিটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। সামনে পূজোর আয়োজন। একজন মোটাসোটা লোক পূজো করছে। গায়ে লাল চেলি। গলায় ফুলের মালা। সামনে.... ঐ যে হাঁড়িকাঠ। আর ওটা কি? একটা বেঁটেখাটো মানুষের কঙ্কাল ঝুলছে গুহাটার প্রবেশমুখের বাঁ দিকে। বাতাসে কঙ্কালটা দুলছে। এইভাবে কঙ্কালটা প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে রাখার মানে কি! প্রায় দশ মিনিট পর লোকটা পূজোর আসন থেকে উঠল। এবার লোকটাকে স্পষ্ট দেখতে পেলাম। জীবনে কখনো তান্ত্রিক বা কাপালিক দেখিনি। এই প্রথম দেখলাম। বড়ো বড়ো হিংস্র ভয়ঙ্কর চোখ। কপালে সিঁদুর লেপা। পেশীবহুল হাতে রুদ্রাক্ষের মালা। লোকটি এগিয়ে আসতেই আরও যে চার-পাঁচজন বসেছিল তারাও উঠে দাঁড়াল। তান্ত্রিক বলিদানের নির্দেশ দিল। এবার ছেলেটাকে ধরে আনা হল। পাছে চেঁচায় তাই মুখটা কালো কাপড় দিয়ে বাঁধা। প্রণবেশ অধৈর্য হয়ে চাপা গলায় বলল, " আর দেরী নয়। অ্যাকশন।" আমি বাধা দিয়ে বললাম, " আর একটু দেখি। হ্যাঁ, শোনো..... তুমি আটকাবে তান্ত্রিকটাকে। আর আমি সামলাব ঐ পাঁচ চেলাকে।" হাঁড়িকাঠে ছেলেটার মাথা আটকে দেওয়া হল। এবার স্বয়ং তান্ত্রিক বিরাট একটা খাঁড়া হাতে নিয়ে এগিয়ে এল। সঙ্গে সঙ্গে পাথরের আড়াল থেকে আমরা দু'জনে দু'দিক থেকে রিভলভার হাতে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। প্রণবেশ একেবারে তান্ত্রিকটার মুখোমুখি। আমি একা বাকি পাঁচজনের সামনে রিভলভার ঘোরাতে লাগলাম। এই অকস্মাৎ আক্রমণে ওরা প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিল। তারপরেই ওরা আমাদের দিকে তেড়ে এল। আমি একটা ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করলাম। পাহাড় কাঁপিয়ে গুলির শব্দটা ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে মিলিয়ে গেল। ওরা ভয়ে পিছিয়ে গেল। তারপর প্রায় পাঁচ মিনিট ওরা আর এগোচ্ছে না। মাথার ওপর গাছের ডালে একটা মস্ত কাক ক্যাঁক ক্যাঁক করে ডেকে উঠল। কাক যে এতবড় হয় তা জানা ছিল না। বোধহয় পাহাড়ি কাক বলেই এত বড়। চকিতে প্রণবেশের দিকে তাকালাম। তান্ত্রিক আর প্রণবেশ পাঁচ হাতের ব্যবধানে মুখোমুখি নিশ্চল দাঁড়িয়ে। তান্ত্রিকের হাতে খাঁড়া। কিন্তু.... এ কি! প্রণবেশ এমন নেতিয়ে পড়ছে কেন? দেখি তান্ত্রিক ভয়ঙ্কর দৃষ্টিতে প্রণবেশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তার দুচোখ থেকে যেন আগুন ঝরছে। বুঝলাম তান্ত্রিক হিপনোটাইজ করছে। আর প্রণবেশের হাত থেকে রিভলভার খসে পড়ছে। তখনিই আমি বাঁ হাতের রিভলভারটা অন্যদিকে তাক করে প্রণবেশকে ঠেলা মেরে সরিয়ে দিলাম। ওর হাত থেকে রিভলবারটা কেড়ে নিলাম। এখন আমি একা। শুধু দু'হাতে দুটো রিভলভার। প্রণবেশ হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে মাটিতে বসে পড়েছে। তান্ত্রিক সেই একইভাবে আমার দিকে তাকাল। কিন্তু প্রণবেশের চেয়ে আমার মনের জোর বোধহয় বেশি। আমি ওর চোখের দিকে না তাকিয়ে হুঙ্কার দিয়ে বললাম, " পিছু হটো।" ওরা শুনল না। তান্ত্রিকও এবার ছুটে এল আমার দিকে। আমি দ্রুত দশ পা পিছিয়ে গেলাম। কাকটা আবার বিকট শব্দে ডেকে আমাদের মাথার ওপর উড়তে লাগল। ওদের ভড়কে দেবার জন্য আমি উড়ন্ত কাকটাকে গুলি করলাম। দু'পাক ঘুরে কালো ডানায় রক্ত মেখে কাকটা এসে পড়ল তান্ত্রিকের মাথায়। চমকে উঠে লোকটা দু পা পিছিয়ে গেল। আমি লাফিয়ে গিয়ে ওর বুকে রিভলভার ঠেকালাম। অন্যরা ভয়ে পালাতে লাগল। মূহুর্তে পাহাড়ের আড়ালে কে যে কোথায় গা ঢাকা দিল আর তাদের দেখা গেল না। প্রণবেশ ততক্ষণে সামলে উঠেছে। তখন উদ্যত রিভলভারের সামনে তান্ত্রিক আর ছেলেটাকে নিয়ে আমরা ওপরে উঠে এলাম। রিভলভারের সামনে তান্ত্রিক বাবাজি আর মেজাজ দেখাল না। তান্ত্রিকের এই হাল দেখে আমাদের ড্রাইভার ভয়ে বিস্ময়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর হঠাৎ তার পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। বোধহয় বোঝাতে চাইল তার দোষ নেই। সে নিরুপায়। তার ওপর যেন তাঁর ক্রোধ না পড়ে। ড্রাইভারকে বললাম, " সোজা থানায় চলো।" কিন্তু.... লিখতে লজ্জা করছে, শেষ রক্ষা হয়নি। মাঝপথে হঠাৎই আমাদের অপ্রত্যাশিতভাবে ঢুলুনি এসেছিল। তন্দ্রা কাটলে দেখি জিপের মধ্যে ছেলেটা রয়েছে। কিন্তু তান্ত্রিক নেই। তাকে আমাদের দুজনের মাঝখানে বসিয়ে রেখেছিলাম। তবু কি করে যে পালাল বুঝতে পারলাম না। থানায় গিয়ে নিজেদের পরিচয় দিয়ে সব বললাম। পুলিশকর্তা আমাদের সাহসের জন্য ধন্যবাদ দিলেন। প্রতিশ্রুতি দিলেন খোঁজখবর নিয়ে ছেলেটিকে ওর বাপ মায়ের কাছে পৌঁছে দেবেন। হোটেলে ফিরে জং বাহাদুরকে সব ঘটনা বললাম। আশ্চর্য! সে মোটেও খুশি হল না। মুখের ওপর রীতিমতো ক্রোধের ছায়া নেমে এল। যেন ওখানে গিয়ে আর ছেলেটাকে বাঁচিয়ে আমরা অন্যায় করে ফেলেছি। শুধু থমথমে গলায় বলল, " কাজটা ভাল করলেন না স্যার। ফল পাবেন" বলেই চলে গেল সে। পরের দিন আমাদের ঘরে জল দিতে এল একজন বয়স্ক লোক। বাহাদুরের কথা জিজ্ঞেস করায় ও জানাল, ও দু'দিনের ছুটি নিয়ে ও কোথায় গেছে। মরুক গে। যে কেউ একজন আমাদের দেখাশোনা করলেই হল। দুদিন পর জং বাহাদুর ফিরে এল। দেখি কপালে ওর সিঁদুরের লম্বা তিলক। বুঝলাম কোনও ঠাকুর দেবতার মন্দিরে গিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ এমন কি ঘটল যার জন্য ছুটি নিয়ে মন্দিরে যেতে হল? তখনই....কেন জানি না সন্দেহ হল সেই তান্ত্রিকের আখড়ায় যায় নি তো? যাই হোক ওকে আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। যাবার আগের দিন সন্ধেবেলা হোটেলে ঢুকছি, দেখি একটা রোগাপটকা ছেলে দরজার কাছে বসে আছে। জিজ্ঞেস করায় সে ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে বলল, সে বাড়ির কাজ খুঁজছে। যদি দরকার হয় তাহলে আমাদের সঙ্গে কলকাতায় যেতে পারে। জং বাহাদুরকে ডাকলাম। শুনে বলল, " আপনি তো কাজের ছেলে খুঁজছিলেন। তা এ যখন না ডাকতেই এসে পড়েছে তখন নিয়ে যান।" ওর চেহারা দেখে বললাম, " এর শরীর তো এই। ও কি কাজ করতে পারবে?" এ কথা শুনেই ছেলেটা অদ্ভুত কান্ড করে বসল। ঐ প্রবল শীতে জামা খুলে ফেলে বার কতক ভল্ট খেল। দু'বার দুমদাম করে বড় বালতিটা নিয়ে পাঁই পাঁই করে নিচে নেমে গেল। আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে এক বালতি জল নিয়ে দৌড়ে এসে পড়ল। আশ্চর্য! এক ফোঁটা জল চলকে পড়েনি। দেখে যত না খুশি হলাম, তার চেয়ে অবাক হলাম বেশি। ছেলেটা কি ম্যাজিক জানে, না পাহাড়ি ছেলে বলেই এই গোপন শক্তি? ইতস্তত করছি দেখে জং বাহাদুর বলল, " ভাবছেন কি, নিয়ে যান একে। এর কাজ দেখবেন।" ওকে নিয়ে যখন গাড়িতে উঠছি, দেখি বাহাদুর দূরে দাঁড়িয়ে হাসছে। সে হাসিটা যেন কিরকম! ঠিক বিদায়ের হাসি নয়।। ।। অশুভ সঙ্কেত ।। আমার বন্ধু প্রণবেশ নেপাল থেকে ফিরে কলকাতাতেই থেকে গেল। আমি রাজু সুব্বাকে নিয়ে চলে এলাম দেশের বাড়িতে। প্রণবেশকে ছুটির মধ্যে অতি অবশ্য একবার দেশের বাড়িতে বেড়াতে আসতে বলেছি। ও আসবে বলেছে। যদিও জুলাই মাস। বৃষ্টির সময়। আকাশ মেঘলা কিন্তু ঝড়ের সময় নয়। আশ্চর্য! স্টেশনে নেমে সুব্বাকে নিয়ে রিকশা করে অর্ধেক পথ যেতেই হঠাৎ ঝড় উঠল। সে কি ঝড়! সঙ্গে মেঘের তর্জন গর্জন। স্টেশনে ফিরে যাবার উপায় নেই। ঐ ঝড়ের মধ্যেই রিকশার পর্দা দু হাতে চেপে ধরে আমরা এগোতে লাগলাম। কিছুক্ষণ ধরেই কিরকম একটা পচা ভ্যাপসা গন্ধ পাচ্ছিলাম। এখন বুঝতে পারছি গন্ধটা আসছে সুব্বার গা থেকে। আমার ভেতরটা কিরকম যেন গুলিয়ে উঠছিল। কিন্তু উপায় কি? গরীবের ঘরের ছেলে। নোংরা। ভাল করে সাবান মেখে স্নান করতে পারে না। গন্ধ তো হবেই। তাছাড়া ওর গায়ের জ্যাকেটটাও জঘন্য। যাই হোক রিকশাটা যখন ঝড়ের মধ্যেই বাড়ির কাছে এসেছে তখন হঠাৎ আকাশের বুক চিড়ে বিদ্যুৎ ঝলকে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে কানের পর্দা ফাটিয়ে প্রচণ্ড শব্দে কাছেই কোথাও বাজ পড়ল। বাজটা একটা আগুনের গোলা হয়ে প্রথমে আমাদেরই বাড়ির নারকেল গাছটার ওপর পড়ল। তারপর বাড়ির আলসে ভেঙে বেরিয়ে গেল। চারিদিকে ভয়ার্ত চিৎকারের মধ্য দিয়ে আমাদের রিকশাটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। আমি বিহ্বল.... সন্ত্রস্ত। শেষ পর্যন্ত আমাদের বাড়িতেই বজ্রপাত! কিন্তু... আশ্চর্য, সুব্বার কোনও ভাবান্তর নেই। সে তার ড্যাবডেবে সাদা চোখ নিয়ে শুধু আমার দিকে তাকিয়ে আছে। যেন প্রতিটা মূহুর্ত ও আমায় ওর লক্ষ্যের মধ্যে রাখতে চাইছে। এইভাবেই বিশ্রী একটা দূর্ঘটনার মধ্য দিয়ে রাজু সুব্বা আমাদের বাড়ি ঢুকল। ' ঢুকল' না বলে বরঞ্চ বলি আমাদের বাড়িতে নিজের অধিকার পাকা করে নিল। এখানে এসে প্রথম ক'দিন আমার চেনাজানা প্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা করলাম। হেরম্ব ভট্টাচার্যের কথা মনে ছিল না আমার। তিনি বৃদ্ধ মানুষ। সারাজীবন ঠিকুজিকোষ্ঠী, কররেখা গণনা করেই কাটালেন। ভালো জ্যোতিষী বলে ওঁর খুব নামডাক ছিল। আমি এসবে বিশ্বাসী কোনওদিনই ছিলাম না। তাই তাঁর কাছে যেতে ইচ্ছে করত না। কিন্তু উনি আমায় ছেলেবেলা থেকেই চেনেন। বাবার সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব ছিল। সেদিন সকালে বাজার করে ফিরছি, দেখি হেরম্ব জ্যাঠা রাস্তার ধারে ইজিচেয়ারে শুয়ে পাঁজি দেখছেন। আমায় দেখে সোজা হয়ে বসে জিজ্ঞেস করলেন, " সুশান্ত না? কবে এলে?" অগত্যা বারান্দায় উঠতে হল। প্রণাম করলাম। উনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমার কাজকর্মের কথা জিজ্ঞেস করলেন। একসময় আমি ওঁকে খুশি করার জন্য ভান করে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, " দেখুন তো আমার সামনে কোনও বিপদ আপদের যোগ আছে কিনা।" তিনি খুশী হওয়া দূর অস্ত, যেন একটু বিরক্তই হলেন। বুঝলেন, আমি মজা মারছি। আমার হাতের দিকে তো তাকালেনই না, শুধু চোখের দিকে মিনিট দুয়েক তাকিয়ে থেকে বললেন, " ভবিষ্যৎবাণী করাটা ছেলেখেলা নয় সুশান্ত। অন্য কেউ হলে উত্তরই দিতাম না। তুমি বলেই বলছি.....জীবন সংশয়ের সম্ভাবনা অতি সন্নিকট। " আমি হেসেই বললাম, " কবে?" হেরম্ব জ্যাঠা গম্ভীরভাবে বললেন, " এক মাসের মধ্যে।" আমি আবার হাসলাম। জিজ্ঞেস করলাম, " বাঁচার উপায়?" এইসময় বাড়ির ভেতর থেকে তাঁর ডাক পড়ল। স্নানের সময় হয়েছে ওনার। তিনি ঘরে যেতে যেতে বললেন, " এক মাসের মধ্যে কখনো একা থেকো না।" বলেই তিনি ঘরে ঢুকে গেলেন। হেরম্ব জ্যাঠার কথাটা উড়িয়ে দিয়েছিলাম তবু প্রথম ক'দিন মাঝেমাঝেই চিন্তা করতাম, উনি কেন এরকম ভবিষ্যতবাণী করলেন! তিনি কেন মিছিমিছি ভয় দেখাবেন আমায়? তাহলে কি সত্যিই এক মাসের মধ্যে এমন কোনও বিপদ আসছে যাতে আমার মৃত্যু হতে পারে? যদিও নিশ্চিন্ত ছিলাম যে একমাসের মধ্যে একা থাকার সম্ভাবনা নেই। এখানে আমায় চোর ডাকাত ধরার জন্যও ছুটতে হবে না। তাহলে এখানে এই কটা দিনের মধ্যে আমার মৃত্যুর সম্ভাবনা কোথায়? আশঙ্কার কাঁটাটা মাঝেমাঝে খচখচ করতে লাগল আমার মধ্যে। যাই হোক দিন দুয়েকের মধ্যেই আমার মন থেকে হেরম্ব জ্যাঠার সাবধানবাণী দূর হয়ে গেল।। -চলবে।।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৮ জন


এ জাতীয় গল্প

→ অলৌকিক জল্লাদ - পর্ব ৬ -শেষ পর্ব
→ অলৌকিক জল্লাদ - ৫ম পর্ব
→ অলৌকিক জল্লাদ - ৪র্থ পর্ব
→ অলৌকিক জল্লাদ - ৩য় পর্ব
→ অলৌকিক জল্লাদ - ২য় পর্ব
→ অলৌকিক জল্লাদ - ১ম পর্ব

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now