বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
।। অলৌকিক জল্লাদ - ১ম পর্ব ।।
লেখকঃ মানবেন্দ্র পাল
।। রহস্যের সূত্রপাত ।।
খুব বেশীদিন না হলেও দেখতে দেখতে
পনেরো বছর হয়ে গেল আমি কলকাতা পুলিশের
কাজ করছি। এই পনেরো বছরে কত চোর
ডাকাত ধরলাম, কত খুনীকে আদালতে পাঠালাম, কত
মারামারি... কত রক্তপাত! ফলে মনটা যেমন
কঠোর তেমনি ভয়শূন্য হয়ে গেছে। সঙ্গে
রিভলভারটা থাকলেই হল।
শুধু চোর-ডাকাত-খুনী নিয়ে কারবার হলে মনে
তেমন দাগ কাটত না। ওসব তো প্রায় সব পুলিশ
অফিসারের জীবনেই ঘটে। কিন্তু আমার সৌভাগ্য বা
দূর্ভাগ্যবশত জীবনে এমন কিছু অবিশ্বাস্য ভয়াবহ
অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে যা কোনওদিন ভুলতে পারব
না। এই ঘটনাগুলো লিখে রাখার জন্যই আপাতত এক
মাসের ছুটি নিয়ে নিরিবিলি দেশের বাড়িতে এসেছি।
জায়গাটা নিরিবিলি। কিন্তু বাড়িটা নিরিবিলি নয়। আমাদের এই
দোতলা বাড়িটা খুবই পুরনো। বাড়ির পেছনে
অনেকদূর পর্যন্ত আমবাগান আর বাঁশঝাড়। এখনও
গভীর রাতে শেয়াল ডাকে, খটাস বনবেড়াল
ঘুরে বেড়ায় নিশ্চিন্তে। বাড়ির পশ্চিমে একটা মজা
পুকুর। তার এদিকে একটা ভাঙা শিবমন্দির।
ছোটবেলায় ঐ পুকুরপাড়ে, আসশ্যাওড়ার
ঝোপে কত চোর পুলিশ খেলেছি। তখন কি
ভেবেছিলাম বড় হয়ে আমাকেই চোর ডাকাত
ধরে বেড়াতে হবে!
বাড়িটার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর বিরাট ছাদ। এই
ছাদে কত ঘুড়ি উড়িয়েছি, ছোটাছুটি দাপাদাপি করেছি।
আজও এ বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েরা ছাদেই
খেলা করে।
এ বাড়িতে পাকাপাকিভাবে থাকে আমার মেজো
আর ছোট ভাই তাদের স্ত্রী, পুত্র-কন্যাদের
নিয়ে। এখন কলকাতা থেকে আমি এক মাসের
জন্য এসেছি স্ত্রী আর বারো বছরের দুষ্টু
নোটনকে নিয়ে। আমার ভাগে যে দুখানি ঘর তা
উত্তর দিকে। একখানি ঘর আমার একেবারে নিজস্ব।
ঐ ঘরে বসে আমি দেশ বিদেশের যত অপরাধ
কাহিনী পড়ি। আর এখন এই ঘরে বসেই লিখছি
আমার জীবনে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি
অলৌকিক ঘটনা।
আমার ঘরের জানলা দিয়ে তাকালে প্রথমেই
চোখে পড়ে আমাদের উঠোনের ওপর
নারকেল গাছটা। সেই ছোটবেলা থেকে
দেখছি গাছটাকে। এখনও দিব্যি আছে। নারকেল
গাছটা যেন আমাদের পরিবারেরই একজন হয়ে
গেছে। গাছটাকে আমরা সবাই ভালবাসি। তারপরেই
চোখে পড়ে সেই বিশাল আমবাগান আর
বাঁশঝাড়ের জঙ্গল। যতদূর দেখা যায় শুধু গাছগাছালির
সবুজ মাথা। যখন সন্ধের অন্ধকার নেমে আসে
তখন ঐ বাগান জঙ্গলকে কেমন রহস্যময় মনে
হয়। কেমন ভয় করে। মনে হয় যেন কোনও
অজানা আতঙ্ক ওৎ পেতে আছে গাছগুলোর
ডালে ডালে।
লেখাটা শুরু করা উচিত ছিল অনেক আগেই। কিন্তু
হঠাৎ নেপালের কাঠমান্ডুতে বেড়াতে যাবার
সুযোগ এসে গেল। এখন বর্ষাকাল। বর্ষাকালে
কেউ বড়ো একটা পাহাড়ে যায় না। কিন্তু আমারই
সহকর্মী কলকাতার পুলিশ অফিসার প্রণবেশ যাচ্ছে
শুনে আমিও তার সঙ্গ নিলাম। সর্বসাকুল্যে ওখানে
আমরা দশ দিন ছিলাম। ওখানে নানা জায়গায় ঘুরেছি।
বেশ উপভোগও করেছি। কিছু ভয়াবহ অভিজ্ঞতাও
হয়েছে। তা তো হবেই। পুলিশ আর গোয়েন্দা
যেখানেই যায়, তাদের মনোমত একটা কিছু ঘটে
থাকেই। যাই হোক মোটামুটি আনন্দ করে
দেশের বাড়িতে ফিরে এসেছি। একটি লাভ
হয়েছে। একটা নেপালি ছেলে পেয়েছি। বছর
তেরো-চোদ্দ বয়স। খুব কাজের ছেলে। নাম
রাজু সুব্বা। ওকে পেয়ে আমার স্ত্রী আর
নোটন খুব খুশি। রাজু একে নোটনের প্রায়
সমবয়সী, তার ওপর বিদেশী। তাই ওর সঙ্গে
নোটনের যত ভাব তত কৌতূহল ওর বিষয়ে।
এখন সন্ধ্যেবেলা।
একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে। গায়ে একটা হালকা
চাদর জড়িয়ে লিখতে বসেছি। লোডশেডিং বলে
লন্ঠনের আলোয় লিখছি। ভালোই লাগছে।
কেননা এইসব খুনখারাপি, অলৌকিক কাহিনী লিখতে
গেলে এইরকম লন্ঠনের টিমটিমে আলোরই
প্রয়োজন। পরিবেশটা বেশ জমে। বাড়ির বৌ-রা
নিচে রান্নাঘরে রান্না করছে আর গল্প করছে।
আমার ঘরে আমি একা। লিখে চলেছি। ফাটা
দেওয়ালের গায়ে একটা টিকটিকি অবাক হয়ে আমার
লেখার কাজ দেখছে।
হঠাৎ পেছন থেকে নিঃশব্দ পায়ে কেউ এসে
লন্ঠনটা নিভিয়ে দিল। মূহুর্তে ঘর অন্ধকার। সঙ্গে
সঙ্গে একটা বালক কন্ঠের প্রাণখোলা হাসি।
বুঝলাম আমার দুষ্টু ছেলে নোটনের কাজ। ভয়
দেখাবার জন্য আলো নিভিয়েছে। কিন্তু....
ঘরে আরও যেন কেউ রয়েছে।
অন্ধকারেই হাঁকলাম....." কে রে? কে রে?"
কোনও উত্তর নেই। নোটনের হাসিও হঠাৎ
থেমে গেল।
আমি বললাম, " নোটন, তোর সঙ্গে আর কে
আছে রে?"
উত্তর নেই।
হঠাৎ নোটন চিৎকার করে কেঁদে উঠল, " ও
গো মা গো! বাবা গো!"
কি হল! নোটন অমন করে কেঁদে উঠল কেন?
পুরনো বাড়ি। কিছু কামড়ালো নাকি?
অন্ধকারেই আমি চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠলাম।
টেবিলে ধাক্কা লেগে লন্ঠনটা পড়ে গেল।
কেরোসিন তেলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।
অন্ধকারের মধ্য দিয়ে আন্দাজে নোটনের
কাছে যাবার চেষ্টা করলাম। তার আগেই ওর কান্না
শুনে নোটনের মা, ওর কাকা-কাকিমারা আলো
নিয়ে ছুটে এসেছেন। দেখলাম, দেওয়ালের
এক কোণে দাঁড়িয়ে নোটন তখনো কাঁপছে।
...... " কি হয়েছে?" সবাই ঘিরে ধরে
জিজ্ঞেস করল ওকে।
প্রথমে উত্তর দিতে পারছিল না। তারপর শুধু বলল, "
ঘরে কিছু ঢুকেছিল।"
......" ঘরে আবার কে ঢুকবে? কখন ঢুকবে?"
সবার প্রশ্ন?
" আমরা ঢোকার পরই....."
" আমরা!"
এতক্ষণে ঘরের মধ্যে দ্বিতীয়জনকে
দেখতে পেলাম। সেও দেওয়ালে ঠেস দিয়ে
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
" ঘরে কে ঢুকবে? কাকে দেখে অমন ভয়
পেলি?"
নোটন বলল, " আমি স্পষ্ট দেখেছি দুটো
জ্বলজ্বলে চোখ দরজার কাছে।"
এই অসম্ভব অবাস্তব ব্যাপার নিয়ে আমরা আর মাথা
ঘামালাম না। দোতলার এই ঘরে জ্বলন্ত
চোখবিশিষ্ট জন্তু জানোয়ারের ঢোকা সম্ভব
নয়। সদর দরজা সন্ধ্যে হতেই বন্ধ হয়ে যায়।
এবার রাজু সুব্বার দিকে তাকালাম। সে একে রোগা
ডিগডিগে, কম কথা বলে, তার ওপর এইসব
চেঁচামেচিতে কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে।
ওর চোখের স্বাভাবিক চাউনিটাও একটু অদ্ভুত
রকমের। ছোট ছোট সরু চোখ। চোখের
মণিদুটো একটু বেশি ওপর দিকে থাকায় সাদা অংশটাই
বেশী দেখা যায়। মনে হয় যেন চোখ উলটে
আছে। ওর চোখের দিকে তাকালে বোঝাই
যাবে না যে সে রেগে আছে না ভয়
পেয়েছে না খুশী হয়েছে।
রোগা রোগা সরু হাত, দেহের তুলনায়
নারকেলের মতো লম্বাটে মাথাটা বেশ বড়।
রোঁয়া রোঁয়া পাতলা চুল। খালি গা হলে বুকের
পাঁজরাগুলো একটা একটা করে গোণা যায়। কন্ঠার
হাড় বেরিয়ে আছে। মনে হয় যেন একটু ঠেলা
দিলেই পড়ে যাবে। কিন্তু এই শরীর নিয়ে সে
যে কি অসম্ভব তাড়াতাড়ি কাজ করতে পারে তা না
দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না।
সুব্বা বাংলা বলতে না পারলেও বাংলা মোটামুটি
বোঝে। খুব কম কথা বলে। যেটুকু বলে ভাঙা
ভাঙা হিন্দিতে। মাঝেমাঝে সে নেপালি ভাষাও বলে
ফেলে। যেমন 'চা' কে বলে চিয়া,
কমলালেবুকে বলে ' সনতালা'।
একটা জিনিস লক্ষ্য করছি, যদিও আমিই ওকে নেপাল
থেকে এখানে নিয়ে এসেছি তবু ও কেন যেন
আমায় সহ্য করতে পারে না। ডাকলে চট করে
আসে না, সাড়াও দেয় না, যেন শুনতেই পায়নি।
কেন এমন ব্যবহার করে বুঝতে পারি না। তবে
নোটনের সাথে ওর খুব ভাব। দুজনে গল্প
করে, খেলা করে। নোটন কখনো ওকে
ডাকে ' রাজু' বলে, কখনো ওর পদবী ধরে
ডাকে.....' সুব্বা'।
এই ক'দিনে আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি, ও
আমায় জব্দ করতে চায়। একটা ঘটনা বলি। প্রায়ই
আমার মাথার যন্ত্রণা হয়। এজন্য সবসময় কাছে ওষুধ
রেখে দিই। যন্ত্রণাটা এবার অনেক দিন হয়নি। কিন্তু
নেপাল থেকে ফিরে এসে উপরি উপরি তিনদিন
যন্ত্রণা হল। প্রথম দুদিন ওষুধ খাবার জন্য সুব্বাকে
জল দিতে বলেছিলাম। কিন্তু তৃতীয় দিন ও জল
এনে দিল না। ধমক দিলেও এমন একটা ভান করল
যেন শুনতেই পায়নি। আরও আশ্চর্য, সেদিন
থেকে ওষুধের প্যাকেটটাকেও আর খুঁজে
পেলাম না। ওষুধ খাওয়া হল না। সারারাত মাথার যন্ত্রণায়
ছটপট করলাম। পরদিন দেখলাম ওষুধের প্যাকেটটা
পেছনের জঙ্গলে পড়ে আছে। সবাইকে
ডেকে দেখালাম। কিন্তু কে ফেলেছে কেউ
বলতে পারল না। নোটন আড়ালে সুব্বাকে
জিজ্ঞেস করেছিল। সুব্বা উত্তরে মাথা নেড়ে
বলেছিল...." নেহি"। তবুও আমি বুঝতে
পেরেছিলাম ওষুধটা ও-ই ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু
কেন? ও তো নিতান্ত শিশুটি নয়।
আরও আশ্চর্যের কথা, পরে জেনেছিলাম
সেদিন সুব্বাই চুপি চুপি একা আমার ঘরে ঢুকে
আলোটা নিভিয়ে দিয়েছিল। নোটন যে ওকে
চুপিচুপি ঘরে ঢুকতে দেখে কৌতূহলের বশেই
ওর পিছু নিয়ে ঘরে ঢুকেছিল, সুব্বা তা টের পায়নি।
তারপর ঘর অন্ধকার করে সুব্বা আমায় ভয় দেখাতে
চাইছে ভেবে নোটন খুব জোরে হেসে
উঠেছিল।
কিন্তু যে ছেলেটা আমার কথা শুনতে চায় না,
ডাকলে সাড়া দেয় না, কাছে ঘেঁষে না, সে
কেন ঘর অন্ধকার করে আমার সঙ্গে মজা
করতে এল?
এসব নিয়ে বাড়িতে কারোর সঙ্গে আলোচনা
করলাম না। নিজের কাছেও সদুত্তর পাইনি। তাছাড়া
অন্ধকার ঘরে কেন কি দেখে নোটন অমন ভয়
পেয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিল তাও ঠিক আমার কাছে
পরিষ্কার নয়। সত্যিই ও ঘরের মধ্যে জ্বলন্ত
চোখ দেখেছিল কিনা কিংবা কার চোখ তাও
অমীমাংসিত থেকে গেছে।
* * * * * * ভয়ঙ্কর ঘণ্টাকর্ণ * * * * *
এই সুব্বাকে পাবার পেছনে একটা ঘটনা আছে।
নেপালের কাঠমান্ডুতে যে হোটেলে আমি
আর প্রণবেশ উঠেছিলাম, সে হোটেলটি
একেবারে শহরের মধ্যে। হোটেলে বেশ
কয়েকজন অল্পবয়সী ছোকরা কাজ করত।
আমাদের যে দেখাশোনা করত সেই ছেলেটি
নেপালি হলেও বাংলা বুঝত আর মোটামুটি বলতেও
পারত। সে বলত...এখানে বাঙালিবাবুরাই বেশি
বেড়াতে আসে। তাদের সঙ্গে কথা বলতে
বলতে বাংলা শিখে গেছি।
ছেলেটির নাম ছিল জং বাহাদুর। ও বাংলা জানায় খুব
সহজেই ওর সঙ্গে আলাপ জমিয়ে নিলাম। শুনে
কষ্ট হল ওদের মতো যারা হোটেলে কাজ
করে তারা খুবই গরীব। তাই এখানকার অল্পবয়সী
ছেলেরাও কাজের খোঁজে ইন্ডিয়া চলে যায়।
শিলিগুড়ি, কলকাতাই তাদের লক্ষ্য।
আমার তখনিই মনে হল কলকাতায় আমার বাসার জন্য
ঐরকম একটা কাজের ছেলে দরকার। কলকাতায়
তো চট করে কাজের ছেলে পাওয়া যায় না। তাই
জং বাহাদুরকে বলেছিলাম - তোমার মতো একটা
কাজের ছেলে পেলে আমিও নিয়ে যাই।
জং বাহাদুর বলেছিল, " দেখব।"
এরপর আমি ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, "
কাঠমান্ডুতে কি কি দেখবার আছে, বাহাদুর? "
ও এক নিশ্বাসে অনেকগুলো জায়গার নাম করে
গেল, " বুড়ো নীলকণ্ঠ, স্বয়ম্ভু মন্দির,
দক্ষিণাকালী বাড়ি, গুর্জেশ্বরী মন্দির, দেবী
কুমারী আর পশুপতিনাথ মন্দির....তো আছেই।"
জিজ্ঞেস করলাম, " এখানে কি কি উৎসব হয়?"
ও চটপট উত্তর দিয়েছিল, " ত্রিবেণী মেলা,
শ্রীপঞ্চমী, মাঘী পূর্ণিমা, মহাশিবরাত্রি, হোলি,
নববর্ষ...... "
বাধা দিয়ে বললাম, " তা তো বুঝলাম। কিন্তু এইসময়
কোনও উৎসব হয় কি?"
....... " হয় বৈকি।" খুব উৎসাহের সঙ্গে ও উত্তর
দিয়েছিল, " নাগপঞ্চমী, ঘণ্টাকর্ণ। "
জিজ্ঞেস করলাম, " ঘণ্টাকর্ণ কি?"
উত্তরে জং বাহাদুর হঠাৎ চোখ বুজে হাতজোড়
করে কারোর উদ্দেশ্যে প্রণাম জানাল। তারপর যা
বলল, তার মানে হল...ঐ পূজোটা হচ্ছে দানব আর
অশুভ আত্মাদের সন্তুষ্ট করার পূজো। এই জুলাই
অগস্ট মাসে নেপালের পাহাড়ে পাহাড়ে অশুভ
শক্তিরা ঘুরে বেড়ায় দানবের মূর্তি ধরে। তাদের
সামনে পড়লে, মানুষ হোক, জীবজন্তু হোক,
কারোর রক্ষা নেই। তাদের আটকাবার ক্ষমতাও
কারোর নেই। তাই সেই দানব দেবতাদের
পূজো দিয়ে সন্তুষ্ট করে সসন্মানে বিদেয়
করার চেষ্টা। এই জন্যেই ঘণ্টাকর্ণ পূজো।
এইসব অশুভ আত্মা, দানব দেবতার কথা শুনে
ঘণ্টাকর্ণ পূজো দেখবার খুব ইচ্ছে হল
আমাদের। জং বাহাদুরকে একথা বলাতে ও খুব উৎসাহ
নিয়ে কোথা দিয়ে কেমন করে যেতে হবে
তার হদিশ বলে দিল। শেষে গলার স্বর নিচু করে
বলল, " এখানে যাবেন যান। কিন্তু কেউ বললেও
যেন দক্ষিণের ঐ উঁচু পাহাড়টার নীচে যাবেন
না।"
জিজ্ঞেস করলাম, " কেন? ওখানে কি আছে?"
ও একটু চুপ করে থেকে বলল, " ঐ পাহাড়ের
নিচে একটা নদী আছে। সেই নদীর ধারে
একটা গুহায় ঘন্টাকর্ণের এক ভয়ঙ্কর মূর্তি আছে।
ওখানেও ঘন্টাকর্ণের পূজো হয়। কিন্তু সে
পূজো খুব গোপন। বাইরের লোক তো
দূরের কথা.....সব নেপালিরাও ওখানে যেতে
পারে না। গেলে আর তাদের ফেরা হয় না।"
প্রণবেশ ব্যাপারটা আমায় বুঝিয়ে বলল যে, "
আমাদের দেশে যেমন নির্জন জায়গায় তান্ত্রিক,
কাপালিকরা গোপনে কালীপূজো করে, এ'ও
সেইরকম। তান্ত্রিক, কাপালিকরা যেমন ভয়ঙ্কর
প্রকৃতির লোক হয়, ঐ পাহাড়ের নীচে গুহার
লোকগুলোও সম্ভবত সেইরকম। "
যাই হোক, দিন তিনেক পর জং বাহাদুরই একটা
জিপের ব্যবস্থা করে দিল। ড্রাইভার আমাদের
কাছাকাছি দু'তিন জায়গার ঘণ্টাকর্ণ পূজো দেখিয়ে
আনবে।
বেঁটেখাটো ফর্সা ধবধবে নেপালি ড্রাইভার। ঠিক
যেন একটা মেশিন। চমৎকার ড্রাইভ করে নিয়ে
গেল পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে।
দু জায়গায় ঘণ্টাকর্ণ পূজো দেখলাম। পাহাড়ের
নিচে খানিকটা সমতল জায়গায় বেশ লোকের ভিড়।
সেখানে মাদলের মতো একরকম বাজনা বাজছে
দ্রিম দ্রিম করে। সারা গায়ে কালো কাপড় জড়িয়ে
মুখে ভয়ঙ্কর একটা মুখোশ এঁটে একটা মূর্তি
তেড়ে তেড়ে যাচ্ছে আর একজন
পুরোহিতের মতো লোক ফুল ছুড়ে ছুড়ে
তাকে মারছে। জানলাম এইরকম করেই নাকি
পূজোর মধ্যে দিয়ে অশুভ শক্তির দানবকে
তাড়ানো হয়। ঘণ্টাকর্ণের নকল ভয়ঙ্কর মূর্তি ছাড়া
আর কিছুই তেমন মনে দাগ কাটল না।
এবার হঠাৎ আমাদের মনে ইচ্ছে জাগল সেই
পাহাড়ের নিচে গুহার নিষিদ্ধ পূজোটা দেখার। কিন্তু
ড্রাইভার রাজি হল না। ওখানকার কথা তুলতেই ভয়ে
ওর মুখ শুকিয়ে গেল।
-চলবে।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now