বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
নূপুরধ্বনি
- শুভাগত দীপ
.
--১--
মতিন সাহেব একেবারে কাকভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। তারপর চোখমুখে একটু জল দিয়েই বেরিয়ে পড়েন হাঁটতে। না জোরে, না আস্তে এমন ভাবে হাঁটেন কাঁটায় কাঁটায় তিন কিলোমিটার। তারপর বাসায় এসে গোসল করে নতুন পাজামা-পাঞ্জাবী পরে ব্যালকনির ইজিচেয়ারটায় গা এলিয়ে দেন। সে সময়ে তিনি পর পর দুই কাপ চা খেয়ে দিনের প্রথম সিগারেটটা জ্বালান।
এমনটাই হয়ে আসছে গতো পাঁচবছর যাবত। মতিন সাহেব ছিলেন সহকারী বিচারপতি। নিষ্ঠার সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করে রিটায়ার করেছেন। সহকর্মী মহলে উনার সততা নিয়ে নানা গল্প চালু আছে।
মতিন সাহেবের স্ত্রী তাহেরা বানু বদমেজাজি ধরণের মহিলা। ডায়াবেটিস, বাতের ব্যাথা, মাইগ্রেনসহ উনার নানারকম ব্যারাম আছে। শরীর দিনের বেশিরভাগ সময় অসুস্থ্য থাকে বলেই তার মেজাজ চড়া।
মাসে অন্তত ছয় থেকে সাতদিন তাহেরা বানু তাঁর ঘর থেকে বের হতে পারেননা। সে সময় তাঁর মাইগ্রেনের ব্যাথাটা প্রবল হয়ে ওঠে। তখন বাধ্য হয়েই মতিন সাহেবের দেখাশোনার ভার নিতে হয় অলোকের মাকে।
অলোকের মা এই বাড়িতে আছে আজ প্রায় বাইশ বছর। মতিন-তাহেরা দম্পতির দুই ছেলে রাকিব ও আকিবকেও এক অর্থে অলোকের মা-ই মানুষ করেছে কোলেপিঠে করে। রাকিব ও আকিব দুজনেই এখন দেশের বাইরে থাকে। রাকিব করে ইমপোর্ট-এক্সপোর্টের ব্যবসা আর আকিব সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। রাকিব মালয়েশিয়া আর আকিব কানাডা চলে যাবার পর থেকে অলোকের মায়ের কাজ অনেক কমে গেছে। এখন শুধু দুইবেলা রান্নাবান্না আর বুড়োবুড়ির দেখাশোনা।
--২--
আজকে শুক্রবার। অবশ্য মতিন সাহেবের জন্য সপ্তাহের সাত দিনই সমান। রিটায়ারমেন্টের পর সাতদিনের রুটিন সাত রকম না হয়ে একরকম হওয়াটাই স্বাভাবিক আর সেটাই হয়েছে।
হাঁটাহাঁটি করে ক্লান্ত দেহে বাসায় ফিরে গোসলে যাবেন ভাবছেন। এমন সময় বুকের বামপাশটা কেমন যেন চিনচিন করে উঠলো। দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই মতিন সাহেবের মনে হলো তিনি পড়ে যাচ্ছেন। ব্যাথাটা যেন বাড়ছে। চোখমুখে আঁধার ঘনিয়ে আসছে যেন। দেহের নিচের অংশে কোন অনুভূতি পাচ্ছেননা তিনি। মতিন সাহেব বুঝতে পারলেন, পড়ে যাচ্ছেন তিনি। বাতাস খামচে ধরার বৃথা চেষ্টা করে মেঝেতে পড়ে গেলেন তিনি।চোখের সামনে পর্দা নেমে আসার আগে শুনলেন নূপুর বাজছে কোথাও। শব্দটা যেন এগিয়ে আসছে। কার যেন ছায়া দেখা গেলোনা! তারপর সব অন্ধকার।
--৩--
জ্ঞান ফেরার পর মতিন সাহেব নিজেকে আবিষ্কার করলেন হাসপাতালের বেডে। জানালার দিকে তাকিয়ে মনে হয় বেশ রাত হয়ে গেছে। এই ঘরে অন্য কোন বেড দেখা যাচ্ছেনা। বুঝলেন, কেবিন ভাড়া নেয়া হয়েছে তাঁর জন্য। ঘরে কেমন ওষুধ ওষুধ গন্ধ। গা গুলিয়ে উঠলো মতিন সাহেবের। পাশ ফিরে শুতে গিয়ে দেখলেন, কোমরের নিচের অংশ যেভাবে ছিলো, সেভাবেই আছে। সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে গেলো মতিন সাহেবের। তিনি কি প্যারালাইজড হয়ে গেছেন!
কেবিনের দরজাটা খোলার শব্দ পেয়ে সেদিকে তাকালেন মতিন সাহেব। একজন নার্স ঢুকছে। সাথে অলোকের মা। তিনি ভাবলেন, তাহেরাও হয়তো এসেছে। কিন্তু ওরা দুজন ঢুকে দরজাটা আবারো লাগিয়ে দিলো। মতিন সাহেব নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
নার্স মেয়েটা মতিন সাহেবের দিকে তাকিয়ে আশ্বাসের হাসি হাসলো। বেডের পাশের স্ট্যান্ডে ঝোলানো স্যালাইন পাল্টে দিতে দিতে মতিন সাহেবের সাথে কথা বললো সে।
- আপনার জ্ঞান ফিরেছে দেখে ভালো লাগছে। এখন কেমন বোধ করছেন?
- জি, ভালো। আচ্ছা, আমার কোমরের নিচের অংশে কোন অনুভূতি নেই কেন?
নার্স কোন উত্তর দিলোনা। বিব্রত ভঙ্গিতে বেরিয়ে গেলো। মতিন সাহেব যা বোঝার বুঝে নিলেন। আশ্চর্য ব্যাপার হলো, এতে তিনি খুব একটা কষ্ট পাচ্ছেননা। বেডের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অলোকের মায়ের দিকে তাকালেন তিনি।
- অলোকের মা...
- জি ভাইজান।
- তোমার ভাবিসাহেব আসেনাই?
- না... মানে উনার খুব মাথাব্যথা করতেছিলো। তাই...
- আচ্ছা। রাকিব-আকিবকে জানানো হয়েছে কিছু?
- জি। কিন্তু উনারা দুজনেই খুব ব্যস্ত। আগামী মাসে আসবেন।
- হুম। তুমি এবার যাও। একটু পরে আসো।
মতিন সাহেব চুপ হয়ে গেলেন। পুরোদস্তুর সংসারী মানুষ হয়েও তাঁকে হাসপাতালের এই বেডে পড়ে থাকতে হচ্ছে অভাজনের মতো। পরিবারের কাউকে পাশে পাচ্ছেননা। নিজের প্যারালাইসিসের ব্যাপারটা এখন ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছে। আচ্ছা, বাকি জীবন কি অন্যের ওপর ভর দিয়েই চলতে হবে? ভাবলেন মতিন সাহেব।
--৪--
সকালের দিকে একজন ডাক্তার এলেন। হাসিমুখে মতিন সাহবের শরীরের খোঁজখবর নিলেন। জানালেন, এমন একটা এটাক আসার পর মানুষ মারাও যায়। মতিন সাহেবের হার্ট সেই তুলনায় অনেক শক্ত। 'সামান্য' প্যারালাইসিসের ওপর দিয়ে গেছে। একটু নিয়ম করে চললেই সুস্থ্য হয়ে উঠবেন। অবশ্য আর কখনো হাঁটতে পারবেননা। ওটা ব্যাপার না। হুইলচেয়ার তো আছেই।
ডাক্তারের কথাবার্তা শুনে মতিন সাহেবের গা জ্বলছিলো। ডাক্তারদেরকে সব ক্ষেত্রে পজিটিভ হতে শেখানো হয়। তাই বলে এতোটা! এসব ভাবতে ভাবতে দেখতে পেলেন তাহেরা বানু আর অলোকের মা ঘরে ঢুকছে। ডাক্তার হঠাৎ আরেকটা কল আসায় বেরিয়ে গেলো। তাহেরা বানু এসে মতিন সাহেবের পাশে বসলেন।
- এখন কেমন আছো গো?
- ভালো।
- কোন কষ্ট হচ্ছে?
- না।
- ইয়ে.. তোমার জন্য হুইলচেয়ার আনবে রাকিব আগামী সপ্তাহে। অটোমেটিক চেয়ার।চালাতে তোমার কোন কষ্টই হবেনা।
- হুম।
তাহেরা কি অবলীলায় হুইল চেয়ারের কথাটা বললো। অবশ্য আরেকটা ব্যাপারেও মতিন সাহেব বিস্মিত হচ্ছিলেন। তা হলো, তাঁর স্ত্রী তাঁর সাথে এতো নরম স্বরে কখনোই কোন কথা বলেনি। হার্ট এটাকটা তাহলে এই একটা উপকার করছে। স্ত্রীর কাছে ভালো ব্যবহার অন্তত পাওয়া যাচ্ছে। মুচকি হাসি ফুটে উঠলো মতিন সাহেবের মুখে।
স্বামীকে চুপ করে থাকতে দেখে নিজেও চুপ করে গেলেন তাহেরা বানু। অলোকের মাকে বাইরে পাঠিয়ে দিলেন। নীরবতা অসহ্য মনে হওয়ায় অগত্যা আবারো কথা বলে উঠলেন তাহেরা।
- মেয়েটাকে আর পেলামনা, জানো?
- কোন মেয়েটা?
- ঐযে, যে মেয়েটা আমাকে বললো তুমি মেঝেতে পড়ে আছো...
- তুমি কার কথা বলছো আমি বুঝতে পারছিনা। আমি, তুমি আর অলোকের মা ছাড়া বাড়িতে তো আর কেউ থাকেনা। মেয়ে আসলো কোত্থেকে?
- তা জানিনা। মাইগ্রেনের ব্যথা নিয়ে পড়ে ছিলাম, হঠাৎ শুনি নূপুর পায়ে কেউ দৌড়ে আসছে। উঠে বসে দেখি একটা চৌদ্দ-পনেরো বছরের মেয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে হাঁফাচ্ছে। ওভাবেই আমাকে বললো, তাড়াতাড়ি ওঠো, মতিন পড়ে আছে মেঝেতে। ওকে হাসপাতালে নিতে হবে। বলেই মেয়েটা দৌড়ে চলে গেলো। তারপর আমি আর অলোকের মা ট্যাক্সি ডেকে তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে এলাম।
মতিন সাহেব অবাক হয়ে গেলেন। আসলেই তো, তিনি জ্ঞান হারানোর আগে নূপুরধ্বনি শুনতে পেয়েছিলেন। কে মেয়েটা? নূপুরধ্বনিও তাঁর কেমন যেন চেনাচেনা ঠেকছিলো। বিভ্রান্ত বোধ করলেন তিনি।
- তাহেরা...
- হুম...
- আচ্ছা, ঐটুকু একটা মেয়ে তোমাকে 'তুমি' আর আমাকে নাম ধরে ডাকলো?
- সেটাই তো। সামনাসামনি আবার দেখা হলে এই বেয়াদবির কারন জিজ্ঞেস করবো। অবশ্য আমিও ওকে চিনে রেখেছি। মেয়েটার চোখদুটো কটা আর বামগালে একটা বড় তিল ছিলো। দেখলেই চিনতে পারবো।
তাহেরার কথা শুনে মতিন সাহেব চমকে উঠলেন। ঘামতে লাগলো তাঁর শরীর। মনে পড়ে গেলো তাঁর শৈশবের কথা। মীরা আপার কথা।
--শৈশবের ঘটনা--
মতিন আর মীরা কাসুন্দি দিয়ে কাঁচা আম মাখানো খাচ্ছিলো পুকুরপাড়ে বসে। তারা ভাইবোন। মীরা বড়, মতিন ছোট। মীরা সবসময়ই মতিনকে মায়ের মতো আগলে নিয়ে থাকে। মতিনকে ছাড়া সে আরেকটা জিনিসের প্রতি দুর্বল। সেটা হলো তার পুতুল জাফরানি। পুতুলটাকে সে খুবই ভালোবাসে।
মীরা দেখতে শ্যামলা হলেও মিষ্টি। চেহারার মিষ্টতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে তার বাম গালের তিল। গ্রামের অন্য সমবয়সী মেয়েরা অবশ্য আড়ালে মীরাকে পেত্নী বলে ডাকে। কারন তার চোখদুটো কটা। সে অবশ্য এসব ধর্তব্যের মধ্যেই আনেনা।সে তার বেশিরভাগ সময় কাটায় ছোট্ট মতিন আর জাফরানির সাথে।
ভাইবোনের কাঁচা আম খাওয়ায় ছেদ পড়লো অনতিদূর থেকে ভেসে আসা লোকজনের হইচইয়ে। খাওয়া বাদ দিয়ে দুজনেই সেদিকে তাকালো। শেষ বিকালের আকাশের পটভূমিতে ওদিকটা লাল হয়ে আছে। দুজনেই বুঝলো, আগুন লেগেছে কোথাও। খাওয়া ফেলে ছোট্ট মতিনের হাত ধরে সেদিকে ছুটলো মীরা।
মীরাদের বাড়ি জ্বলছে। দাউদাউ করে জ্বলছে। ওদের বাবা-মা আর গ্রামের কিছু লোকজন বালতি নিয়ে ছোটাছুটি করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে। কোন কাজই হচ্ছেনা।
মীরা আর মতিন হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ মতিনের হাতটা ছেড়ে দিয়ে 'আমার জাফরানি' বলেই মীরা জ্বলন্ত বাড়িটার দিকে দৌড় দিলো। কেউ ওকে ধরার আগেই ঢুকে গেলো ভেতরে। তখনো বাড়িটার কাঠামো ভেঙ্গে পড়েনি।
মা চিৎকার করে উঠলেন। তিনিও ছুট দিতে চাইলেন সেদিকে। মাকে দুহাতে ধরে রেখে বাবা 'মীরামা! মীরামা!' করে ডাকতে লাগলেন। দেবতার অভিশাপের মতো হঠাৎ করেই বাড়ির পুরো কাঠামোটা ভেঙ্গে পড়লো। আরো লকলকে হয়ে উঠলো আগুন।
জ্বলন্ত বাড়ির ভেতর থেকে মীরার আর্ত চিৎকার ভেসে এলো। উপস্থিত সবাই দেখলো এক রোমহর্ষক দৃশ্য। জ্বলন্ত শরীরে মীরা বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে, তার কোলে ধরা পুতুল জাফরানিও জ্বলছে। দৌড়াতে দৌড়াতেই সিলিং থেকে খসে পড়া জ্বলন্ত কড়িকাঠে পা বেধে পড়ে যায় মীরা। বিভৎসভাবে চিৎকার করছে সে। তার পা দুটো দাপাচ্ছে যন্ত্রণায়। দুই পায়ের নূপুর সৃষ্টি করেছে ভয়াবহ নূপুরধ্বনি!
--৫--
- এই, তোমার কি হয়েছে? ঘামছো কেন? শরীর খারাপ লাগছে?
- পানি...
তাহেরা বানু স্বামীকে পানি এনে দিলেন। পানিটুকু খেয়ে মতিন সাহেব যেন একটু সুস্থির হলেন। তাহেরা যার বর্ণনা দিলো সে মীরা আপা ছাড়া আর কেউ হতে পারেনা। কিন্তু তাই বা কি করে সম্ভব! মীরা আপা তো আগুনে পুড়ে মারা গেছে অনেকদিন আগে। মৃত মানুষ ফিরে আসেনা। ফিরে আসতে পারেনা। মতিন সাহেব হঠাৎ খুব ক্লান্ত বোধ করতে লাগলেন।
--৬--
বাসায় আনা হয়েছে মতিন সাহেবকে। সার্বক্ষণিক একজন আয়া দেখাশোনা করছে তাঁকে। বিপদ এখন আর নেই বললেই চলে, জানিয়েছেন ডাক্তার। তাহেরা বানু এখন অনেকটাই নিশ্চিন্ত।
গভীর রাতে হঠাৎ মতিন সাহেবের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। দরজার ওপাশে নূপুর বাজছে কি! সারা শরীর শিহরিত হয়ে উঠলো মতিন সাহেবের। বিছানার পাশে একটা ছোট ঘন্টা রাখা আছে। ওটা বাজালেই আয়া মেয়েটা চলে আসবে। বাজাবেন কিনা ভাবছেন মতিন সাহেব।
হঠাৎ-ই যেন নূপুরধ্বনি বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠলো। সেইসাথে কিশোরী মেয়ের খিলখিল হাসি। আলো আঁধারিয়া ঘরে মতিন সাহেব প্রবল ভয় পেতে লাগলেন।
ঘরের দরজা একটু ফাঁক হলো। কেউ রিনরিনে গলায় ডেকে উঠলো -
- মতিন...
এযে মীরা আপার কণ্ঠ! কিভাবে সম্ভব! তাঁর কি মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটেছে! মতিন সাহেব ঘন্টাটা নেয়ার জন্য হাত বাড়ালেন। কণ্ঠটা আবারো বলে উঠলো -
- মতিন, ওটা বাজাসনা। আমার অসুবিধা হয়।
- আপা...
- ভয় পাচ্ছিস কেন বোকারাম? আমি তো তোকে আদর করতে এসেছি।
- আপা...
মতিন সাহেব হঠাৎ-ই ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন। অকস্মাৎ উনার ভয় চলে গেলো। মীরা আপাকে হারানোর সেই পুরোনো কষ্টটা আবারো যেন ফিরে এলো। অস্ফুট স্বরে 'আপা আপা' করে ডাকতে ডাকতে কাঁদতে লাগলেন তিনি। খেয়াল করলেন কেউ একজন পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মৃদু গুনগুন করতে করতে তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে পড়লেন মতিন সাহেব।
--৭--
মতিন সাহেবকে নিয়ে বাসার সবাই ইদানীং চিন্তিত। কেমন যেন শিশুর মতো হয়ে গেছেন মানুষটা। কারো সাথে কথাবার্তা বলেননা, সারাদিন ঘরে একা থাকতে চান। টুকটাক যা-ও কথা হয় তাও আয়ার সাথে। বেশিরভাগ সময়ই একা একা থাকেন।
দুই ছেলে রাকিব ও আকিব বিদেশ থেকে আসার পর ওদের সাথেও কথা বলেননি মতিন সাহেব। ছেলেরা অনেক চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়েছে। আবার যে যার জায়গায় ফেরার তোরজোড় শুরু করেছে।
তাহেরা বানু ইদানীং প্রবল অপরাধবোধের কারনে ঘুমাতে পারেননা। সারাক্ষণই মনে হয় মানুষটাকে স্বামীর যোগ্য মর্যাদা কখনো দিতে পারেননি। ইদানীং তাঁর সাথে সময় কাটাতে খুব ইচ্ছা করে। কিন্তু মতিন সাহেব তাঁকে দেখলেই কেমন যেন বরফের মতো নির্লিপ্ত হয়ে যান, একেবারের মুখ খোলেননা।মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কেঁদেই নিজের সান্ত্বনা খোঁজেন তাহেরা বানু।
--পরিশিষ্ট--
রাত প্রায় দুটো। ঘুম আসছেনা তাহেরা বানুর। আজ তাঁর কোন শারীরিক সমস্যা নেই, কিন্তু কেন যেন খুব অস্থির লাগছে। মতিন সাহেবকে দেখতে যাওয়ার কথা ভেবে সেদিকে এগোলেন তিনি।
মতিন সাহেবের ঘরের দরজা ভেজানো। ওপাশ থেকে হাসাহাসির চাপা শব্দ পেলেন তাহেরা বানু। কি ভেবে দরজাটা খুললেননা। ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরেই থেমে গেলেন তিনি।
এ কি! এ যে একটা কিশোরী কণ্ঠের হাসির শব্দ! সাথে তাঁর স্বামীয় হাসছেন! ঝট করে ঘুরে দরজাটা মেলে ধরলেন তাহেরা বানু। দেখলেন, মতিন সাহেব আধশোয়া হয়ে তাঁর দিকে রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। সেই চোখে রাগ ছাড়াও আছে অভিমান, অভিযোগ আর ঘৃণা। ঘরে মতিন সাহেব ছাড়া অন্য কেউ নেই,থাকার কথাও না। তাহলে? তাহলে তিনি কার হাসির শব্দ শুনলেন?
হঠাৎ তাহেরা বানুর কানে এলো একটা নূপুরধ্বনি, যা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now