বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
এই ঐতিহাসিক ও ঘটনাবহুল উপন্যাসের শুরু নবীনকুমার সিংহের জন্ম-ঘটনা দিয়ে। মাত্র সাত মাস দশ দিন গর্ভবাসের পর যখন তার জন্ম হয় তখন পিতা বাবু রামকমল সিংহ উড়িষ্যায় মহাল পরিদর্শনে কৃষ্ণকায় বাঈজী কমলাসুন্দরীর আলিঙ্গনে মহানদীর বুকে বজরার ওপর বসে সূর্যাস্তের শোভা দেখছেন। নিঃসন্তান রামকমলের বিশ্বাস ছিল যে সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা তার নেই, তাই বিম্ববতীর সন্তান হতে পারে- এ ছিল তার ধারণার অতীত।
তবু অকস্মাৎ তার গোমস্তা দিবাকর যখন বার্তা নিয়ে হাজির হয়, তখন তার মধ্যে স্ত্রী বিম্ববতীকে নিয়ে এক অজানা আশংকা কাজ করে। তিনদিন পর কলকাতায় ফিরে যখন মুমূর্ষু অবস্থায় স্ত্রী ও নবজাত পুত্রকে দেখেন, তখন শিশুটির প্রতি এক ধরনের তাচ্ছিল্য অনুভব করলেন, বোধ করলেন না প্রথম পিতৃত্ব অর্জনের কোনো রকম সুখানুভূতি। সুন্দরী স্ত্রীকে তিনি মনে-প্রাণে ভালোবাসলেও কালো মেয়েদের মধ্য থেকেই উপপত নির্বাচন করা ছিল তাঁর শখ।
পরবর্তীতে নবীনকুমারের পাঁচ বছর বয়সে যখন রক্ষিতার গৃহে রামকমল সিংহের মৃত্যু হয়, মৃত্যুর ঠিক পূর্বমুহূর্তে তিনি বন্ধু বিধুশেখরের কাছে জানতে চান – আসলে নবীনকুমার কার সন্তান, তার না বিধুশেখরের। কারণ তিনি যত নারীর সাথে মিলিত হয়েছেন কেউ তাকে সন্তান উপহার দিতে পারেনি। বিম্ববতী ও বিধুশেখরের এই গোপন কাহিনি জীবনের শেষ দিনও রামকমল জানতে পারেন নি।
মনে সন্দেহ থাকলেও সাধ্বী স্ত্রীর প্রতি মৃত্যুকালেও ছিল তার অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস।তিন মাস বয়স থেকে নবীনকুমার সব আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটিয়েছে। যেমন তিন মাস বয়সে হামাগুড়ি দেয়া, পাঁচ মাস বয়সে কথা বলতে পারা। নবীনকুমারের পাঁচ বছর বয়সের সময় সরস্বতী পূজোর দিনে সিংহসদনে বেশ ধূমধাম করে নবীনকুমারের হাতেখড়ি হয়। পণ্ডিত দূর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তার মস্তক স্পর্শ করে সংস্কৃত মন্ত্র পড়ে আশীর্বাদ করলেও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কোনো মন্ত্র উচ্চারণ না করেই নবীনকুমারকে কাছে ডেকে কোলে নিয়ে বললেন, তোমার মুক্তার মতো হস্তাক্ষর হোক!
বিদ্যাসাগর শ্লেটের ওপর পেন্সিল দিয়ে ‘ক’ লিখে বলতেই নবীনকুমার সাথে সাথেই বলল, ক! এবং না দেখেও ক লিখে ফেলল। তারপর বিদ্যাসাগর ইংরেজি এ ও বি লিখে মুছে দিয়ে লিখতে বলল এবং সে সাথে সাথে তাও লিখে ফেলল। দু’জন গুরু স্তম্ভিত হয়ে বললেন, এ-তো দেখি দৃষ্টি শ্র“তিধর। নবীনকুমারের আরো কিছু কীর্তি দেখে বিদ্যাসাগর সত্যিই অবাক হলেন এবং বুঝে গেলেন – এ শিশু কালে এক অসাধারণ ব্যক্তি হবে।
আট বছর বয়সে নবীনকুমার আশ্চর্য স্মৃতিশক্তির পরিচয় দিয়েছে – সে মহাভারতের কঠিন কঠিন শ্লোক কণ্ঠস্থ করে ফেলেছে। তাঁর মেধা দেখে সকলেই চমৎকৃত। সংস্কৃত কলেজ ও হিন্দু কলেজের বাছাই করা তিনজন ছাত্র নবীনের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হয়ে তাকে সংস্কৃত, ইংরেজি ও অংক শিক্ষা দিতে লাগল। সঙ্গীতের প্রতি তার আগ্রহ লক্ষ্য করে এক ওস্তাদজীকে কণ্ঠ সঙ্গীতের তালিমের জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে। ভিখারি-বৈরাগীদের গান শুনলেই নবীনকুমার ঠিকঠিক তা শিখে নেয়, যে-সব গানের কথার অর্থ তার একেবারেই বোঝার কথা নয়, সেগুলিও সে বেশ ভাব দিয়ে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে গায়।
দ্বাদশ বছর বয়সে নবীনকুমার হয়ে উঠেছে এক অনিন্দ্যকান্তি বালক, মুখ-মণ্ডলে প্রতিভার জ্যোতি, চক্ষু দুটি অত্যুজ্জ্বল, এ বালক যে অন্য সকলের থেকে আলাদা তা তার মুখের পানে একবার তাকালেই বোঝা যায়। একই সাথে নবীনকুমারের মধ্যে অনেক নিষ্ঠুরতাও পরিলক্ষিত হয়। কর্তব্যচ্যুতি ঘটলেই সে দাস-দাসীদের অসম্ভব কটু ভাষায় গালিগালাজ করে এবং তাদের মানুষ বলেই গণ্য করে না। তার স্নানের জলের উত্তাপ কম বা বেশি হলে সে বয়স্ক ভৃত্যকে চড় মারতেও দ্বিধা করে না।
জুতা পরার সময় সে নবাবপুত্রদের মত আরাম কেদারায় পা ছড়িয়ে বসে ভৃত্যের নাম ধরে ডাকে, তৎক্ষণাৎ সে ভৃত্যটি এসে তার পায়ে জুতা পরিয়ে দেয়। সংস্কৃত পণ্ডিতদের সে গুরু বলে মান্যই করে না, প্রায়ই দুষ্টমি করে পণ্ডিতদের শিখা ধরে টানাটানি করে। এমনকি এক পণ্ডিতের টিকি পর্যন্ত সে কেটে নিয়েছে, কারণ ব্রাহ্মণটি তাকে দান করা গরু কসাইয়ের কাছে বিক্রি করেছিল। প্রতিভা ও কাণ্ডকীর্তি দেখে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা গঙ্গানারায়ণ তার প্রতিভাবান বন্ধু মধুসূদন দত্তের সাথে নবীনের মিল খুঁজে পায়।
তের বছর বয়সে বেশ জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাগবাজারের মেয়ে কৃষ্ণভামিনীর সাথে নবীনকুমারের বিয়ে দেন অভিভাবক বিধুশেখর ও তার মা বিম্ববতী। বিয়ের অনুষ্ঠান এত আড়ম্বরপূর্ণ হয়েছিল যে সাম্প্রতিককালের কলকাতা শহরের মানুষ এমন জৌলুস আর কোনো বিবাহ অনুষ্ঠানে দেখেনি। বিধুশেখর ও বিম্ববতী একেবারে সকলকে টেক্কা মেরে গেলেন। বালিকা স্ত্রীকে সে খেলার সাথী হিসেবে গ্রহণ করল এবং বিয়েটা বিষয়কে মনে করল রাধা-কৃষ্ণের প্রণয় উৎসব। গঙ্গানারায়ণ ছোট ভাইয়ের এই বাল্যবিবাহে আপত্তি তুললেও বিধুশেখরের সিদ্ধান্তের কাছে মাথা নোয়াতে হল। বিধুশেখর নবীনকুমারের কলেজে পড়ার বায়নাকে ধুলিসাৎ করার জন্য বিয়ের চালটা চালল এবং এ চালের কাছে নবীনের কলেজে পড়ার বাসনা বিসর্জিত হলো।
পঞ্চদশবর্ষীয় তরুণ নবীনকুমারের জীবন-যাপন প্রণালী হয়ে ওঠে আরো ব্যতিক্রম, আরো হেয়ালিপূর্ণ । সেকালের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের অন্যতম বসন্তকালীন বিনোদন আয়োজন বুলবুলির লড়াই দেখতে এসে হাতের হীরক অঙ্গুরি বিক্রি করে খাঁচাশুদ্ধ সব পাখি কিনে সে বুলবুলি পাখিগুলিকে অবমুক্ত করে দেয়। এমনকি টাকা শেষ হয়ে গেলে সে পাখি-বিক্রেতাদের সিংহবাড়িতে এসে টাকা নিতে বলে । বুলবুলির লড়াই দেখতে আসা লোকজন লড়াই দেখা বাদ দিয়ে পরম আনন্দের সাথে বুলবুলি-মুক্তি উপভোগ করতে লাগল। এ-সময় আরো একটি মহান ইচ্ছে তাকে প্রবলভাবে আলোড়িত করলো। হিন্দু কলেজের পাঠ শেষ করার আগেই সে কলেজ ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে ‘বিদ্যোৎসাহিনী সভা’ নামে একটি জ্ঞানচর্চাকেন্দ্র স্থাপন করেছে। সেখানে বিশিষ্ট জ্ঞানী, গুণী ও চিন্তাবিদেরা এসে দেশ, কাল, সমাজ ও সাহিত্য সম্পর্কে বক্তৃতা করেন।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস ‘আলালের ঘরের দুলাল’ এর রচয়িতা প্যারীচাঁদ মিত্র ছাড়াও রাধানাথ সিকদার, কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য, হরীশ মুখার্জী, কৃষ্ণদাস পালের মতো প্রকৃত উৎসাহী যুবকদের সাথে ইংরেজ পণ্ডিত ও শিক্ষকরাও এই সভায় যোগদান করেন। কলেজী শিক্ষকদের বাঁধা-ধরা লেকচারের বদলে এসব জ্ঞানগর্ভ ও শিক্ষাপ্রদ আলোচনাতেই তার বেশি উৎসাহ। এরই মধ্যে প্রথম স্ত্রী কৃষ্ণাভামিনীর মৃত্যুর দেড় বছর পর নবীনকুমার দ্বিতীয়বার দার-পরিগ্রহ করেছে। প্রথম স্ত্রীকে সে খেলার সাথী হিসেবে নিলেও দ্বিতীয় স্ত্রী সরোজনীকে সে আর ঐভাবে নিতে পারেনি। বরং তখন সে ‘বিদ্যোৎসাহিনী সভা’ নিয়েই ভীষণ মশগুল হয়ে পড়ে। একই সাথে এই সভার সদস্যদের নিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করা নিয়েও সে ব্যস্ততার মধ্যে জড়িয়ে যায়। ইংরেজি নাটকের অনুকরণে মঞ্চ তৈরি করে ‘বেণীসংহার’ নাটকটি মঞ্চস্থ করার পর চারদিকে তার নামে জয়ধ্বনি বাজতে লাগলো। ক্রমান্বয়ে অন্য ধনীরাও মঞ্চ নাটকের দিকে ঝুঁকলে সে এ-ব্যাপারে সকল আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
বন্ধু হরিশ মুখুজ্যে ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ নামক দেশপ্রেম-উদ্দীপনামূলক ইংরেজি পত্রিকার মাধ্যমে চারদিকে সাড়া ফেললে নবীনকুমার হরিশের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ে। ধনীর দুলাল হওয়াতে জীবন-সংগ্রামী হরিশ তাকে বিভিন্ন বিষয়ে ইয়ার্কি করলে সে হরিশের প্রতি আরো বেশি ঝুঁকতে থাকে। কারণ হরিশের মত তার মুখের ওপর কেউ ওভাবে তাকে কিছু বলতে পারে না। প্রতিভাবান হরিশের মদ ও নারীতে আসক্তি নবীনের ভালো না লাগলেও হরিশ তাকে চুম্বকের মত টানতো এবং প্রতিদিন সন্ধ্যায় হিন্দু পেট্রিয়টের অফিসে গিয়ে হরিশের সাথে আলাপ করার জন্য বসে থাকতো। একদিন হরিশের কথার বাণে বিদ্ধ হয়ে নবীন মদ খাওয়া শুরু করে, এমনকি হরিশের সাথে মুলুকচাঁদের আখড়ায়ও বারবণিতাদের নাচ দেখতে যাওয়া শুরু করে।
মুলুকচাঁদের আখড়া থেকে চাটুকার রাইমোহন নবীনকে এক রাতে তার পিতার রক্ষিতা কমলাসুন্দরীর জানবাজারের বাড়িতে নিয়ে আসলে তার পর দিন নবীনকুমারের আত্মোপলদ্ধি ঘটে। সে ঐ অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসার বাসনায় তার গুরু বিদ্যাসাগরের কাছে গিয়ে পাপমুক্ত হতে চায়। বিদ্যাসাগর তাকে প্রথমে বকাঝকা করলেও নবীনকুমারের ‘মহাভারত’ বঙ্গানুবাদ করার প্রতিজ্ঞা বিদ্যাসাগরকে অষ্টাদশবর্ষীয় যুবকটির প্রতি সহানুভূতিশীল করে। যদিও বিধবা বিবাহের জন্য এক হাজার করে টাকা দেয়ার কথা থাকলেও নবীনকুমারের তা পরে মনেও ছিল না। তবে শেষ পর্যন্ত সে বিদ্যাসাগর কর্তৃক নিযুক্ত পণ্ডিতদের সহযোগিতায় ১৩ খণ্ডের মহাভারত বাংলায় অনুবাদ করতে সমর্থ হয়েছিল এবং তা মানুষের মধ্যে বিনা পয়সায় বিলি করেছিল। গীতা ও রামায়ণ একইভাবে অনুবাদের কথা থাকলেও সে এই বিষয়ে পরে আর উৎসাহ পায়নি।
হরিশ মুখুজ্যের মৃত্যুর পর তার ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে নবীনকুমার এগিয়ে আসে এবং তার পৃষ্ঠপোষকতায় তা চলতে থাকে। তাছাড়া দেশপ্রেমিক ও জনদরদী বন্ধু হরিশের স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য সে ‘হরিশ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’ গঠন করে বিভিন্ন জনসেবামূলক কাজের পদক্ষেপ নেয়। ‘পরিদর্শক’ নামে একটি বাংলা পত্রিকা অর্থাভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে নবীনকুমার সে পত্রিকার সত্ব কিনে সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং একে দৈনিক বাংলা কাগজে রূপান্তর করে। পাঠকের অভাবে পত্রিকাটি শেষ পর্যন্ত বন্ধ করতে সে বাধ্য হয় এবং এজন্য দীর্ঘদিন এ পরাজয়ের গ্লানি তাকে দহন করতে থাকে। এমনকি একটি উর্দু পত্রিকা বন্ধ হওয়াও তার অর্থানুকূল্যে রক্ষা পায়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now