বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নাগরিক দাম্পত্য-৫

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X সু, এই সু! সু, এই সু!’ সারাদিন গাধার খাটনি খেটে এসে একটু যে আরাম করে ঘুমোবে— সে উপায় আছে? দেখা যাবে প্রায়ই মধ্যরাতে সুশানকে ধরে ধাক্কাচ্ছে নীহা, এবং কাতর হয়ে ডেকে চলেছে— সু, এই সু! সু, এই সু...! নিয়মিত ঘটনায় আমাদের ভেতর একধরণের অভ্যস্ততা তৈরি হয়। কিন্তু সুশানের বেলায় কথাটা একদমই মেলে না— নীহার অনেক আচরণেই আজ অব্দি সে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারে নি। প্রায়কার নীহার মধ্যরাতের আচরণটা তাই সুশানকে নিয়মিতই ইতস্তত করে চলে। আচমকা ঘুম ভেঙে গিয়ে নিজের অজান্তেই সে বিরক্ত হয়ে ওঠে। একটু চোখ মেলে কথা বলবার ইচ্ছেও তার যেনো কাজ করে না— সে চোখ বুজেই কথা চালিয়ে যায়। ‘কী হয়েছে ?’ ‘ওঠো না একটু!’ ‘কেনো— কী হয়েছে?’ ‘আমার খুব খিদে লেগেছে।’ ‘খিদে লেগেছে তা আমি কী করবো? আমি উঠলে কি খিদে চলে যাবে? খিদে লেগেছে— ওঠো, উঠে কিছু খেয়ে এসে ঘুমোও, ব্যাস্। আমি উঠে কী করবো?’ ‘তুমি একটু ওঠো না, প্লীজ!’ শেষমেষ সুশানকে উঠতেই হয়— তার কোনো এক্সকিউজই টেকে না। এবং বেড থেকে নেমে নীহা তাকে নিয়ে যায় খাবার ঘরে। ‘এখানে আসলে কেনো?’ ‘আমি ভাত খাবো— ভাতের খিদে লেগেছে।’ ‘আচ্ছা খাও, খেয়ে চলো। কী ব্যাপার— দাঁড়িয়ে থাকলে কেনো? প্লেটে ভাত নাও!’ সুশান আরো একটু বিরক্ত হয়ে উঠলো। এই সময় নীহা কিছু বললো না— করুণ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো সুশানের দিকে। এই দৃষ্টির মানে সুশান জানে— এখন তাকেই সব করতে হবে। সে বিরক্ত হয়ে বললো, ‘তুমি যা জ্বালাতন করো না! অসহ্য!’ নীহা সেই করুণ দৃষ্টিতেই সুশানের দিকে চেয়ে রইলো— কোনো কথা বললো না। সুশান বললো, ‘আচ্ছা প্লেটে অন্তত ভাতটা বাড়ো, তারপর না হয় আমি মেখে দিচ্ছি।’ চিরাচরিত নিয়মে সেটাও নীহা করলো না— স্রেফ একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়লো। সুশানের বিরক্তিটা আরো একটু বেড়ে গেলো। সে বিড়বিড় করে বকতে বকতে প্লেট ধুলো, ভাত বাড়লো, তারপর তা মেখে নিয়ে বললো— ‘নাও, এবার খাও। খেয়ে আমাকে উদ্ধার করো। হাত তো লাগাবা না জানি— এই নাও চামচ।’ সুশান যতো বিরক্ত হয়, নীহার যেনো ছেলেমানুষীটা ততো বাড়ে। সে বললো, ‘না, চামচ দিয়ে খাবো না— হাত দিয়ে খাবো।’ ‘আচ্ছা ঠিক আছে। এই যে চামচ উঠিয়ে রাখলাম। খাও— তুমি হাত দিয়েই খাও। কী হলো— চুপ করে বসে রইলে কেনো? খাও!’ ‘তোমার হাত দিয়ে খাবো।’ ‘মানে?’ ‘মানে তুমি আমাকে খাইয়ে দেবে। আমার হাতে ভাত লাগাতে ইচ্ছে করছে না।’ সুশান কিছু বললো না— শীতল চোখে নীহার দিকে তাকালো শুধু। নীহার ভেতর কোনো বিকার দেখা গেলো না। সে স্বাভাবিক স্বরেই বললো, ‘তুমি তো হাতে ভাত লাগিয়েছো— একেবারে আমাকে খাইয়ে দিয়েই হাতটা ধুয়ে ফেলো। সুশান সেভাবেই তাকিয়ে রইলো নীহার দিকে। নীহা ঠোঁট প্রসারিত করে একটা নিঃশব্দ হাসি দিয়ে আবার বললো, ‘হুঁ, আমাকে খাইয়ে দিয়েই হাতটা ধুয়ে ফেলবে। ব্যাস্। সুশান এবার রীতিমতো রেগে উঠলো। চোখ গরম করে বললো, ‘বাবা তুমি কি দিন দিন ছোটো হচ্ছো নাকি? আমার সাথে বিয়ে না হয়ে যদি কোনো গেয়ো লোকের সাথে বিয়ে হতো— এতোদিন মিনিমাম তিনটা বাচ্চার মা হয়ে যেতে। তাদের একটা থাকতো ন্যাদা। তার পায়খানা-পিশাব সাফ করা লাগতো দো’বেলা। বুক খুলে দুধ খাওয়ানো লাগতো যখন-তখন। দেখি, এদিকে সরে এসো— দেখি হা করো।’ নীহা আর সুশান। তাদের বিয়ের বয়স দু’ বছরের কাছাকাছি। প্রায় দু’ বছর। ‘প্রায় দু’ বছর’-এর দম্পতির ঘরে কী করে তিনটা বাচ্চা পয়দা হয়— সে প্রশ্নে না গিয়ে নীহা বললো, ‘দাও। আ।’ . ভাত খেতে খেতে নীহা কি চুপ করে থাকবে? না। সে একবার করে ভাত মুখে নেবে, সেগুলো চিবোবে আর গল্প করবে। যার সবই অতীতের গল্প। স্মৃতির গল্প। ‘জানো সু, এই যে রাতে আমার খিদে পায় না? এটা আমার সেই ছোটোবেলার খিদে। আমি যখন অনেক ছোটো— আব্বু আর আম্মুর মাঝখানে ঘুমোই— প্রতিদিন রাতেই আমার খিদে পেতো। আমি আম্মুকে ধাক্কা দিয়ে জাগাতাম। আর আম্মু কী করতো জানো? দাও— গালের ভাত শেষ হয়ে গেছে— দাও— আ।’ সুশান নীহার গালে আরো একবার ভাত তুলে দিয়ে চুপ করে থাকলো। ‘আম্মু করতো কী— আমার আম্মুটা কী যে কুঁড়ে ছিলো— শুয়ে শুয়েই বকা-ঝকা শুরু করতো— এই তোর খিদে পাওয়ার আর সময় পায় না? যত্তোসব! এখন খেতে হবে না। ঘুমো চুপচাপ। আর সেই বক-বকানী কানে গিয়ে আব্বুর ঘুম ভেঙে যেতো। আব্বু শুরু করতো আম্মুকে বকতে— মেয়ে খিদেয় কষ্ট পাচ্ছে, আর উনি নাক ডেকে ঘুমোচ্ছেন! মেয়ের খিদের কষ্ট দূর করার চে’ উনার ঘুমটা বড়ো হয়ে গেলো! তারপর আম্মু কী করতো জানো? ভাত ফুরিয়ে গেছে। দাও। আ।’ দু’ জন মানুষের ভেতর একজন যখন অনর্গল গল্প করে যায়, অপর জনকে তখন গল্পের মাঝে একটু হলেও ডুবতে হয়। সুশান তার গালে ভাত তুলে দিয়ে বললো, ‘আম্মু কী করতো?’ নীহা হেসে বললো, ‘আম্মু ঠিকই উঠে বসতো। তারপর রেগে রেগে বলতো— চল। আর আব্বু তখন আরো রেগে বলতো— না, তুমি ঘুমোও। আমার মেয়েকে আমিই যাই— খাইয়ে নিয়ে আসি। তারপর আব্বু আমাকে বিছানা থেকে নামিয়ে বলতো— চল, মা। খেয়ে এসে দেখতাম আম্মু সেইভাবেই বিছানার উপর বসে আছে— রাগ কর— আব্বুর উপর— ওই যে, আব্বু বকেছে না? তাই। দাও— আ।’ সুশান এবার নীহার মুখে ভাত তুলে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘তারপর?’ নীহা বললো, ‘তারপর আমি আর আব্বু শুয়ে পড়তাম, আম্মু সেভাবেই বসে থাকতো। আব্বু বলতো— কী হলো— তুমি কি বসে বসে ঘুমোবা? তুমি তো দেখছি ঊনঘোড়া হয়ে গেছো— ঘোড়া দাঁড়িয়ে ঘুমোয়, আর তুমি বসে বসে ঘুমোবে। আমি ঘোড়া চিনতাম, কিন্তু ‘ঊনঘোড়া’ কী জিনিস বুঝতাম না। শুধু দেখতাম আম্মু আব্বুর কথা শুনে আরো রেগে গেছে। আম্মু কিছু বলতো না। ধাম করে শুয়ে পড়তো। তখন আব্বু আম্মুকে ক্ষেপানোর উদ্দেশ্যে বলতো— এইমাত্র বিছানার উপর কী পড়লো জানিস, মা? কলাগাছ। কলাগাছের গোড়া থেকে কেটে দিলে ঠিক এইভাবে পড়ে।’ সুশান হেসে উঠলো। নীহা আর কিছু বললো না। সুশান খেয়াল করলো নীহা হঠাৎ চুপ হয়ে গেছে। গালের ভাত শেষ হয়ে গেছে, তবু বলছে না— দাও— আ। সুশান জানে— তার কান্নার সময় হয়ে এসেছে। এখনই তার চোখে পানি চলে আসবে। সুশান ভাতের মুঠো এগিয়ে নিয়ে বললো, ‘এই নাও।’ নীহা ভাত নিলো না। তার চোখ ভিজে এসেছে। আক্ষেপ করে বললো, ‘আমার সেই আব্বু— আজ পাথর হয়ে গেছে! আজ কতোগুলো দিন হয়ে গেলো— ফোন দিয়েও একটাবার জিজ্ঞেস করলো না— মা, তুই ভালো আছিস তো?’ অন্য হাত দিয়ে সুশান তার চোখ মুছে দিয়ে বললো, ‘তুমি কেঁদো না, নী— সব ঠিক হয়ে যাবে।’ নীহা কাঁদতে কাঁদতেই বললো, ‘আচ্ছা সু, আমি তো ভুল কিছু করি নি। তুমি তো খারাপ ছেলে না। তারপরেও আব্বু কেনো…?’ কথা শেষ করতে না দিয়েই সুশান বললো, ‘একদিন উনি অবশ্যই আমাদেরকে মেনে নেবেন। তুমি দেখে নিয়ো— একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন তুমি খেয়ে নাও। দেখি— হা করো।’ নীহা বললো, ‘কিচ্ছু ঠিক হবে না, সু। কিচ্ছু ঠিক হবে না। দাও— আ।’ . নীহাকে খাইয়ে দিতে দিতে সুশানের রাগ কখন যে পানি হয়ে গেছে! ঠিক এই মুহূর্তে কী যে মায়া লাগছে নীহার প্রতি! এই মেয়ে সংসারের এতো জটিলতা নেবে কীভাবে? যতোই দিন যাচ্ছে, ততোই যেনো সে বাচ্চা হয়ে যাচ্ছে। যেনো সুশান তার স্বামী না— সুশান তার বাবা। প্রতিদিন রাতে হঠাৎ তার যখন খিদে পায়, তখন স্নেহ করে নীহাকে ভাত মেখে গালে তুলে খাইয়ে দেয়া তার দায়িত্ব। . . আমাদের এই জটিল সংসারে বিয়ের পর একটা মেয়ে তার সবচে’ প্রিয় মানুষ— তার বাবাকে ছেড়ে এসে পড়ে থাকে কতো দূরে! প্রিয় বাবাকে ছেড়ে আসা সেই মেয়েটা স্বামীর ভালোবাসার মাঝে যদি পিতৃস্নেহের খোঁজ করে— তাতে তাকে দোষ দেয়া যায় না। . -------------------------------


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৬৩ জন


এ জাতীয় গল্প

→ নাগরিক দাম্পত্য-৫

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now