বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
(১)
লোকটার মাথায় অদ্ভুদ ধরনের জট ছিলো।গলায় হরেক রঙের পুথির মালা।কাধে ঝুলন্ত একটা চটের ব্যাগ,হিজিবিজি কাগজে ভর্তি।আর তার দাড়ি?যেন বুড়োশালগাছের শিকড় ও হার মানবে অনায়াসে জবা ফুলের মত টকটকে লাল চোখ।দেখে অনেক সময় ছোটদের পাশাপাশি বড়রাও চমকে উঠে।কিন্তু না;কেউ তাকে কখনো রাগতে দেখেনি।বিড় বিড় করে সারাক্ষন কি যেন বলে।রাত কাটাতো মসজিদের বারান্দায় বা এলাহীখাঁর আস্তানায়।ঘুমের মাঝে চেচিয়ে উঠতো দু একবার।খেতো বিওবানদের উচ্ছিষ্ট খাবার। কখোনো একাকি ফ্যাল-ফেলিয়ে হাসতো।কখনো এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো কারো দিকে।কখনো পাগলের মত কাউকে তাড়া করেছে,একথা কেউ নিশুনেনি।তবুও মানুষের মাঝে ভয় থেকে যায়। বিশেষ করে ছোটদের মাঝে।
বাল্যকাল থেকেই তাকে দেখছে জুয়েল।নদীর পাড় ঘেসে ওদের বাড়ি।ছোটবেলায় বড়দের কোল চেপে নদীর চরে হাওয়া খেতে যেত।ওদের বাড়ি থেকে একটু দূরেই নদী পাড়ে ছিল একটি বট গাছ।মাঝে মাঝে বটগাছের নিচে লোকটাকে দেখা যেত।নিঃসঙ্গভাবে বিড় বিড় করছে,আর নদীতে ঢিল ছুড়ছে।
এক দুপুরের কথা!মায়ের সাথে খেতে বসেছে জুয়েল।পাশে ছোট মামা, এমন সময় ঝড়ের গতিতে ঢুকলো লোকটা।সবার দিকে টকটকে লাল চোখে তাকালো।হাপাতে হাপাতে বলল "ভাক খাবো"।
আগুনের মত ক্ষিপ্ত হয়েগেল ছোটমামা।
:বললেই হলো ভাত খাবো ,একেবারে মামা বাড়ির আবদার।ওকে ঘাড় ধরে বের করে দাও।ছোটমামার কথায় কান দিলনা কেউ।মায়ের নির্দেশে তাকে বসতে দেওয়া হলো।ভাত তরকারি তার সামনে রাখা হলো।খেতে বসে অদ্ভুত এক কাণ্ড করল লোকটা।প্রথমে ভাতের উপর সবটুকু তরকারি ঢেল দিল।তারপর সমানভাবে কয়েকটি অংশে ভাগ করল।শেষমেষ এক অংশ খেয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
তখনো অংকের হিসেব শিখেনি জুয়েল।পরে জানতে পারলো লোকটা কিছু খাওয়ার আগে তের ভাগে ভাগ করে নেয়।তারপর একভাগ খেয়ে বিদায় নেয়।কি অদ্ভুত কাণ্ড।জুয়েলের মা ধার্মিক মানুষ।তার ধারনা হয়ত লোকটা কোন দরবেশ,টরবেশ হবে।সারা দিন জিকির-আজকার করে।জুয়েলের বাবা সরকারী চাকুরিজিবী,ব্যাস্ত মানুষ।সে এসব নিয়ে মাথা ঘামায়না।হ্যা-ও বলেনা না ও বলেনা।কিন্তু ছোটমামা একদম ব্যাতিক্রম।একেবারেই সহ্য করতে পারেনা লোকটাকে।বলো এসব ভণ্ডদের দু-চার ঘা দিলেই ঠিক হয়ে যাবে।প্রতিবেশীরা শুনে তিরস্কার করত।আরে ওরকম বলতে নেই বলাতো যায়না কার মনে কি আছে।
বৈশাখের মাঝামাঝি নদীর পানি ধীরে ধীরে কমতে থাকে।প্রায় কোমর সমান হয়ে আসে।রোদে রাস্তা ঘাট তেতে উঠে।ঝুপের আড়ালে ঘুঘুর গলা নিস্তেজ হয়ে পড়ে।আকাশে উড়ে বেড়ায় নিঃসঙ্গ চিল।জুয়েল সবে মাত্র ভর্তি হয়েছে স্কুলে ওদের স্কুলটা নদীর এপারে।তাই ওপারের ছেলে- মেয়েরা কেউ নৌকায় আবার কেউ ভেলায় চড়ে এপারে আসে।কেউবা আবার অনেক দূর ঘুরে সাঁকো পার হয়ে আসে।কতক বৃদ্ধলোক হেটে হেটে নদী পার হয়।তাদের কাপড় ভিজে জবজবে হয়ে যায়।সেদিন সহপাঠিদের সাথে স্কুলে যাচ্ছিল জুয়েল।পথিমধ্যে হঠাৎ থমকে দড়ায়।অদ্ভুত একটি দৃশ্য চোখে পড়ল।কয়েকজন লোক কোমর পানিতে নদী পেরুচ্ছে।তাদের মাঝে সেই লোকটিও আছে।কিন্তু তার নদী পার হওয়ার পদ্ধতিটা ছিল ভারি অদ্ভুত।ডাঙ্গায় মানুষ যেভাবে চলাচল করে,ঠিক সেভাবে নদী পার হয়ে এপারে চলে এল।লোকটির কাপড়ের দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলল জুয়েল।একেবারে শুকনো।যেন সে পানির ধারে কাছেও যায়নি।তাহলে মা’র কথাই কা ঠিক?সে সাধারন কোন লোক নয়।জুয়েল দেখল অন্য লোকেরাও তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে।তার চোখে রাজ্যের বিস্ময়।লোকটা তখন বিড়বিড় অন্য দিকে পথ ধরেছে।আর সেদিকেই ছিল এলাহীখাঁর মাজার।লোকটার বেশ ভুষাও ছিল অদ্ভুদ ধরনের।এবং দেখতে কিছুটা বেমানান।পরনে ছেড়া লুঙ্গি,সেই সাথে ছিল বহুকাল আগের জীর্ণশীর্ণ তালি দেয়া জ্যাকেট।দূর্গন্ধে আশেপাশের বাতাস ভারি হয়ে থাকে।জুয়েলদের বাড়ির উত্তরে একটি পাকা মসজিদ,প্রায়ই মসজিদের বারান্দায় শুয়ে থাকত লোকটা।মাঝে মধ্যে দু একজন পথচারিও আশ্রয় নেয় সেখানে।কেউ তাকে কিছুই বলেনা।আপত্তি করেনা।কিন্তু খেতে বসেই সমান তেরভাগে ভাগ করে মাত্র একভাগ খেয়ে উঠে চলে যায়।অন্যরা একান্ড দেখে শুধু একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে।কানো মুখে কোন কথা থাকেনা।
(২)
সেদিন রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি ছিল।থেকেথেকেই মেঘ গর্জন করছিল।পানিতে রাস্তা ঘাট ভেসে যাচ্ছিল।বিকেল থেকেই লোকটা গুটি শুটি মেরে বসেছিল জুয়েলদের বৈঠকখানায়।নড়াচড়ার কোন নাম গন্ধও নেই।বিড় বিড় করে কি যেন বলে আর খানিক বাদেই চেচিয়ে উঠে।বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে কাকে যেন অভিশাপ দেয়।রাতে বৈঠক খানাতেই লোকটার থাকার ব্যবস্থা হলো।বৈঠক খানায় একটি মাত্র খাট ছিল।যেটাতে ছোটমামা থাকেন।মামার পাশেই মেঝেতে চাটাই পেতে লোকটার থাকার ব্যস্থা হলো।
:মমা শুনেতো মহা খাপ্পা।
:ওই পাগলটার সাথে থাকব আমি।তোমরাওকি সবাই পাগল হয়ে গেলে নাকি।
:মা মামাকে বুঝানোর চেষ্ঠা করলো।একরাতের জন্য না হয় একটু কষ্ট করলি।এই প্রচণ্ড বৃষ্টিতে সে কোথায় যবে বল।
:জাহান্নামে যাক তাতে আমার কি।
:ছিঃ ওরকম করিসনা,মাঝেমাঝে একটু মানুষের উপকার করতে হয়।তুইতো খাটের উপর থাকছিস।আর সতো থাকবে নিচে।তাতে অসুবিধাটা কোথায়।
:তর্ক করা বৃথা বুঝতে পেরে গজ গজ করতে করতে ছোট মামা শুতে গেলেন।
রাতে মায়ের কাছেই ঘুমায় জুয়েল।এরপর যা হলো সে জানেনা।বাকিটা পরের দিন মামার কাছ থেকে শুনেছিল।
অনেক রাতে আচমকা ঘুম ভেঙ্গে যায় ছোটমামার।রুমের ভিতর নিকশ অন্ধকার।অদূরে একটি হারিকেন জ্বলছে ,বাতাসেনর ঝাপটায় তাও নিভে গেল।বাহিরে ঝড়ের প্রকোপ আরো বেড়েছে।বাজ পড়লো দূরে কোথাও। হুড়মুর করে ভেঙ্গে পড়ল পেছনর তেতুল গাছটা।মেঘের গর্জনে পুরা ঘরটাই যেন কেঁপেউঠছে বারবার।বাহিরে প্রচণ্ড গততিতে ঝড় বইছে।গভীর রাতে মামার ঘুম ভেঙে যায়।একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে গিয়েও নিস্তব্ধ হয়ে শুয়ে রইলেন।উঁহ!নিশ্চই কিছু একটা ঘটছে তাও আবার এই বৈঠক খানাতেই।তাহলে তা কি?এসব প্রশ্ন উঁকি দিল মামার মনে।
অবশ্য একটু পরই পুরা বোঝা গেল।একটা শব্দ কানে এল ছোট মামার।শব্দটা আসছে খাটের নিচ থেকেই।কান খাড়া করলো ছোটমামা।হ্যা পাগলটা কথা বলছে।ঘুমের মধ্যে কথা বলছে,কখনো আস্তে আবার কখনো জোরে।
ঘুমের ভিতর কথা বলা কোন আশ্চর্যের কিছুনা।এধরনের অভ্যাস অনেকেরই আছে।ছোটমামার নিজেরও আছে কি না কে জানে?কাজেই ঘুমিয়ে কথা বললে তাতে অবাক হবার কিছু নেই।কিন্তু ঐরাতে ছোটমামার ঘুম হারাম হয়েগেল।সারা রাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি।ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ার আগেই বিছানা ছড়লেন ছোটমামা।চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে।
দুপুরের আগেই খবরটা ছড়িয়ে পড়ল সারা গায়ে।সারাগ্রাম স্তব্ধ হয়ে গেলো।হাটে,ঘাটে,মাঠে বাজারে যে যেখানে ছিল সেখানেই বাকশুন্য হয়ে পাষান বনে গেলো।প্রথমে ফিস ফিস তারপর কানাকানি সর্বশেষ জানাজানি।হাত কড়া লাগিয়ে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।যার যা সংশয় ছিল তখন তাও দূরিভূত হয়েগেলো।তবুও দু-একজন এগিয়ে এলো।
:কি ব্যপার লোকটাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছেন কেন?সেতো পাগল।
:পাগল! কাকে পাগল বলছেন?ওতো....
:কি বলতে চান আপনি?একজন রুখে দাড়ালো।সে পাগল নয়?
:থানায় আসুন,সব জানতে পারবেন।বলেই হাটতে শুরু করলেন ও-সি সাহেব।
(৩)
বিকেলে নদীর পারে হাওয়া খেতে বেড়িয়েছে মামা ভাগ্নে।রোদের তেজ এখনো কিছুটা কড়া।পানির উপর উড়াল দাচ্ছে মাছরাঙা।লেজে তার সূর্যের প্রতিফলন।চুপচাপ কি যেন ভাবছিলেন ছোটমামা।জুয়েলের কথায় চমক ভাঙলো।
:মামা তুমি লোকটার ব্যপারে এতকিছু।জানলে কি করে?
:প্রথম থেকেই ওকে সন্দেহ করছিলাম।যখন তোর কাছে ওর নদী পার হওয়ার কেরামতির কথা শুনলাম।একদিন নদীর পারে দাড়িয়ে ব্যটার কারসাজি ধরে ফেলি।আসলে ব্যটা যখন নদীতে নামে,তখন ধীরে ধীরে একটু একটু করে লুঙ্গি উপরে তুলতে থাকে।আর দেখলে মনে হয় সে যেন লুঙ্গি না তুলেই পার হজ্ছে।তারপর তীরের কাছাকাছি আসার সময় ঠিক তেমনিভাবে সাবধানের সাথে লুঙ্গি নিচের দিকে ছাড়তে থাকে।কেউ কিছু বুঝতেও পারেনা।তখন বুঝলাম ব্যটা বাহিরে ফিটফাট,ভিতরে সদর ঘাট।ওকে আমার একটুও সহ্য হতনা।তাই আমি ওর সাথে একঘরে।ঘুমাতে চাইনি।ভাগ্যভাল বুবু,আমা্য় রাজি করিয়েছিল।না হয় ব্যটাকে হাতেনাতে ধরার সুযোগটা হারাতাম।
:কি ঘটেছিল রাতের বেলা মামা।
:ঘুমের মধ্যে কথা বলার অভ্যাস আছো ওর।গভীর রাতে ওর কথা বলার আওয়াজে আমার ঘুম ভঙ্গে যায়।প্রথমে তেমন গুরুত্ব দেইনি,পরে হঠাৎ চমকে উঠি।ঘুমের মধ্যে সে তার সঙ্গীদের নাম ধরে ডাকছিলো।যাদের নাম ধরে ডাকছিল, তাদের কয়েকজনকে আমি চিনি ওরা এ অঞ্চলের কুখ্যাত ডাকাত।তখন আমার ফেরারি রফিক উল্লার কথা মনে পরলো।মনে পড়ল ওদের একটা সংঘবদ্ধ দল ছিল।বিভিন্ন অঞ্চলে হত্যা ,ডাককাতি,ছিনতাই রাহাজানি ওদের প্রতিনিয়ত কাজ ছিল।পুলিশ কয়েকবার অভিযান চালিয়ে দলের সবকটাকে ধরতে পারলেও,দলের সরদার এই রফিক উল্লাহ গা ঢাকা দেয়।পরবর্তী এগারো বছর তার কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি।বুঝতেই পারছো ব্যটা কেমন ফন্দি এঁটেছিল।
:যাই বল মামা,লোকটার প্রতিভা আছে সিনেমায় আসলে ভাল করত।
:তা পারত,কিন্তু খেয়ল করেছ,হাতকড়া লাগানোর সময় কেমন বোকা বোকা লাগছিল।
:পুলিশের সামনে গেলে এমনিতেই প্যাদানি ছুটে যায়।
বলেই অট্র হাসিতে ফেটে পরল দুজন।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now