বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১.
আমার নাম মিষ্টি।কিন্তু নামের সার্থকতা আমার আচার আচরণে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারেনি।কিভাবে ফেলবে?আমি মেয়েটা ছোটবেলা থেকেই অনেক মারদাঙ্গা প্রকৃতির।কেউ আমার সাথে তেড়িবেড়ি করেছে আর আমি তাকে দু’চারটা কিল ঘুষি ছাড়াই ছেড়ে দিয়েছি এমন অভিযোগ কেউ করতে পারবে না!এমনিতে কিন্তু আমি মাই ডিয়ার টাইপ মানুষ।কতিপয় উল্লুকের দল যারা আমার সাথে লাগতে আসে ওদেরকেই শুধু আমি একটু সিস্টেম করে থাকি!
একটু বড় হওয়ার পর যখন প্রেম ভালবাসা নামক জটিলতার সাথে আলাপ হল তখন আমি একটা জিনিস ঠিক করে ফেললাম।প্রেম আমি করব না।যদি ভুলেভালে কারো প্রেমে পড়েও যাই তাহলে তাকে সরাসরি বিয়ে করে ফেলব।যদি রাজি না হয় তাহলে পিটিয়ে রাজি করাব।মাইরের উপর বড় ওষুধ নাই।হাত ধরাধরি,কারণ ছাড়াই হাসাহাসি,ঘন্টার পর ঘন্টা ফোনালাপ,ন্যাকামার্কা কথা-এইসব পুতুপুতু টাইপ প্রেম করাকরি আমার দুই চোখের বিষ।
প্রেম সংক্রান্ত আমার এই ধরনের চিন্তা ভাবনা আর ছেলেদের প্রতি চরম আক্রোশের কারণেই আমার বাইশ বছরের জীবনে কোন ছেলে আমাকে প্রেম নিবেদন করেনি। কার আর সেধে কোন মেয়ের কাছে পিটুনি খাওয়ার ইচ্ছা থাকে!আমারও কোন ছেলেকে পছন্দ হয় নি।প্রেম তো আমি করবই না তাই বিয়ে করার জন্য ঐরকম ছেলে পাইনি।ছেলে যেমনই হোক অতিরিক্ত ধীরস্থির আর লাজুক না হলেই চলবে!এরকম মানুষের সঙ্গ আমার খুবই অপছন্দ।শুধু সঙ্গ না পুরো মানুষটাই অপছন্দ।
২.
কিন্তু কপাল বলে একটা ব্যাপার আছে যেটাকে আমি পাত্তাই দেইনি।তাই সুযোগ বুঝে সে তার অস্তিত্ত আমাকে বেশ ভালভাবে টের পাইয়ে দিল।
ঘটনার শুরু কয়েক মাস আগে।আমি আমার ছোট চাচার কাছে মানুষ।বাবা মা বহু আগেই মারা গেছেন আর আমি আমার ছোট চাচার ঘাড়ে ঝুলে আছি গত বিশ বছর ধরে! চাচা নিতান্তই ভালো মানুষ তাই আমাকে সহ্য করেছেন। আমি নিজেও যদি চাচার জায়গায় থাকতাম তাহলে কবে ছুড়ে ফেলে দিতাম!কিন্তু এখন নাকি আমার বিয়ের বয়স হয়ে গেছে।তাই আমার জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে খুঁজে পেতে অনেক ছেলে আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আমাকে পছন্দ করেনি অথবা কাউকে আমার চাচা আর অন্যান্যদের পছন্দ হয়নি।
শেষমেষ এক সপ্তাহ আগে জনৈক এক ভদ্রলোক (নাম জানতাম কিন্তু এখন ভুলে গেছি) চাচার কাছে তার ভাগ্নের কথা বললেন।এইরকম ছেলে নাকি লাখে একটাও পাওয়া যাবে না।অতি নম্র ভদ্র শান্তশিষ্ট।শুনে আমি খানিকটা ভয়ই পেয়ে গেলাম।এই ধরনের ছেলেরা সাধারণত অনেক ‘ম্যান্দামার্কা’ হয়। যেটা আমার সহ্যই হয় না।তাই ছেলে যেদিন আমাকে দেখতে আর নিজেকে দেখাতে এল সেদিন আমি একটু দুশ্চিন্তিত হয়ে থাকলাম।যদি ভুল করেও আমাকে পছন্দ করে ফেলে তাহলে কার কপালে খারাবি আছে ঐটা একটু ভেবে দেখতে হবে।
দেখাদেখির পর্ব শেষ।ছেলে দেখতে মোটামুটি।আমার চেহারাও তেমন আহামরি কিছু না। কিন্তু সমস্যা আমার অন্য জায়গায়।ছেলে যে চরম ভালমানুষ টাইপ ঐটা চেহারা দেখলেই বোঝা যায়।বসে বসে লাজুক হাসি দিচ্ছিল আর আমার মেজাজটা কারণ ছাড়াই খারাপ হয়ে যাচ্ছিল।কিছু কিছু মানুষকে আমার অযথাই দেখতে ইচ্ছা করে না।এই লোকটাকেও কেন জানি আমার একদমই পছন্দ হল না।যদিও আমার সাথে তেমন কোন কথা হয়নি।মুরুব্বীরা আমাকে ভালমন্দ দুই একটা কথা জিঙ্গেস করে নিজেদের মধ্যে আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে গেলেন।কিছুক্ষণ বসে থেকে আমি আমার ঘরে চলে এলাম।পরের আধ ঘণ্টা আরো কি কি কথা বার্তা বলে তারা বিদায় নিলেন।
আর তার একটু পরেই আমার চাচাতো বোন ফারিয়া এসে আমাকে বলল,
-মিষ্টি আপু!তোমার বিয়ে তো ঐ ভ্যাবদামার্কা ভাইয়াটার সাথে ফাইনাল হয়ে গেছে!
বলেই সে কি হাসি!আমার ইচ্ছে হচ্ছিল চড়িয়ে ওর সবগুলো দাঁত ফেলে দেই।
কিন্তু ঠিক তখনই চাচা-চাচী এসে পড়ায় আর কিছু বললাম না।চাচা অনেক এদিক সেদিক কার কথা বলে শেষে বললেন যে,
-মিষ্টি মারে!তোর বিয়ে যে শেষ পর্যন্ত এমন ভাল একটা ছেলের সাথে দিতে পারছি ভাবতেই ভাল লাগছে।
আমি মনে মনে বললাম,
-ভাল না ছাই!ফারিয়াটাও পর্যন্ত বুঝতে পেরেছে যে ছেলে ভ্যাবদা মার্কা।
আমাকে চুপচাপ দেখে চাচা আবার বলা শুরু করলেন,
-ছেলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে।সিগারেট খায় না।কত বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে। চেহারাও সুন্দর আর আদব লেহাজও জানে।আমাকে পা ছুঁয়ে সালাম করল।খুব বিনয়ী আর ভদ্র।
এই বলে সমর্থনের জন্য চাচীর দিকে তাকালেন।আমার চাচী জোরে জোরে মাথা নেড়ে সায় জানালেন।ভরসা পেয়ে চাচা আমাকে বললেন যে,
-তাহলে মা তুই ছেলের সাথে কথা বল।এখনকার দিনে তো আবার কথা বার্তা ছাড়া কিছু হয় না। ছেলে তোর ফোন নাম্বার চেয়েছিল।তোকে জিজ্ঞেস না করে কিভাবে দেই?তুই বললে দিয়ে দিব।দিব?
একবার ভাবলাম বলি যে দরকার নেই ছেলে আমার পছন্দ হয়নি।কিন্তু সবার এত পছন্দ হয়েছে যে কিছু বলাও যাচ্ছে না।চাচীর ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে যে আমার মত একটা মেয়েকে যে ঐ ছেলের পছন্দ হয়েছে এটাই বেশি!চাচাকেও নিরাশ করতে মন চাইল না।দুনিয়াতে এই একটি মানুষকে আমি কষ্ট দিতে পারব না।তাতে আমার যত কষ্টই হোক না কেন! তাই আমার ফোন নাম্বারটা মারুফ নামের ছেলেটাকে দিয়ে দিতে বললাম।এটা একধরনের সম্মতি প্রকাশ বিয়েতে।তারমানে ছেলে আমার পছন্দ-এরকমটা ভেবে চাচা চাচী খুশি হয়ে চলে গেলেন।আর আমি সেদিন রাতে কেঁদে বালিশ ভিজিয়ে ফেললাম।
৩.
পরের দিন আমার বন্ধুরা এ খবর শুনে বলল,
-তুই যেসব ছেলেদেরকে পিটিয়ে হাড়গোড় ভেঙেছিস তাদের অভিশাপ মনে হয় লেগেছে।
এই বলে একেকজন বত্রিশ দাঁত বের করে হাসতে লাগল।আর আমি মুখটাকে বাংলার পাঁচ বানিয়ে বাসায় এলাম।
রাত দশটার দিকে একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন এলো।আমি রিসিভ করে হ্যালো বললাম কিন্তু ঐ পাশ থেকে কোন সাড়াশব্দ নেই।আমি যখন রেখে দেয়ার চিন্তা করছিলাম তখনই শুনলাম দুর্বল গলায় কে যেন হ্যালো বলছে। আমি বেশ রেগে গিয়ে বললাম,
-কথা বলছেন না কেন?
-না মানে আরকি!তুমি কি মিষ্টি বলছ?
-হ্যাঁ কিন্তু আপনি কে?
-আমি মারুফ।
আমার মেজাজটা একটু গরম হল।প্রথমে বললেই হতো।নাম বলতেই এতক্ষণ লাগল!
-ও আচ্ছা!ভাল আছেন?
-আছি ভালই। তুমি কেমন আছ?
-হুম ভাল আছি।
তারপর কিছুক্ষণ কারণ ছাড়াই নীরবতা পালন।আমি তখন একটু অধৈর্য হয়ে বললাম,
-আর কিছু বলবেন?
-না মানে!
-না মানে কি?
-মানে আসলে কালকে কি তুমি ফ্রি আছ?
এইতো এতক্ষণে লাইনে এসেছে।আমি বললাম,
-হ্যাঁ আছি!কেন বলুন তো?
-না মানে!যদি তোমার আপত্তি না থাকে তাহলে কালকে একটু দেখা করতাম।
-ঠিক আছে।কোথায় কখন দেখা করবেন?
-চারুকলার সামনে কাল বিকাল চারটায়?
-ওকে।আমি চলে আসব।
তারপর ফোন রেখে দিলাম।প্রথমে ভেবেছিলাম যে দরকার নেই দেখা সাক্ষাতের।কিন্তু পরে মনে হল ছেলে কেমন ঐটা একটু দেখতে হবে না?দুইদিন পরে তো ওকেই বিয়ে করতে হবে।মনে ক্ষীণ আশা যেরকমটা ভেবেছি হয়তো ওরকম না!
পরদিন চাচী যেই শুনল যে মারুফের সাথে দেখা করতে যাব তখন আমাকে এমন সাজ সাজাল যে আমাকে দেখে আমিই অবাক হয়ে গেলাম!মারুফের সাথে দেখা হওয়ার পর ওর অভিব্যক্তি দেখে বুঝতে পারলাম সাজ মনে হয় বেশি হয়ে গেছে।প্রথমে আমরা কেউই কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।মারুফের কর্মকান্ড দেখে এমনিতেই মেজাজ খারাপ।এত লজ্জা পাচ্ছে কেন!অনেকক্ষণ পর মিনমিন করে বলল,
-তোমার কি খেতে ভাল লাগে?
মনে মনে না বলে পারলাম না,‘গাধা কোথাকার!’কিন্তু মনের কথা মুখে প্রকাশ না করতে পারাটা মানবজাতির অন্যতম প্রধান দুর্বলতা।তাই আমি বললাম,
-অনেক কিছুই ভাল লাগে।খেতে আমার কখনোই খারাপ লাগে না।কেন?
-না মানে!ফুচকা খাবে?
-ফুচকা আবার কে না খায়।এইটা তো আমার ফেবারিট।
-ঠিক আছে।চল তাহলে ফুচকা খাই।
ফুচকা খেয়ে রিকশা নিয়ে একটু ঘুরে আমাকে বাসায় পৌছে দিয়ে মারুফ চলে গেল।আমার মন মেজাজ দুটোই তখন বেশ খারাপ।ছেলেটাকে যেরকম ভেবেছিলাম সে ঠিক ঐরকমই।একে তো আমার পছন্দই হচ্ছে না।বিয়ে করা তো অসম্ভব মনে হচ্ছে।সারা রাত এই ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করলাম।মারুফ ফোন করেছিল কিন্তু রিসিভ করিনি।ওর সাথে কথা বলার মত মন মানসিকতা ছিল না।
৪.
কি কারণে জানি না সকালে জ্বর এল।ভেবেছিলাম সেরে যাবে।কিন্তু জ্বর বাড়তে থাকল।বিকালের দিকে মারুফ আমাকে দেখতে এল।তখন মনে হল যে জ্বর না আসলেই ভাল হত।মারুফ এসেছে তো এসেছে একগাদা ফলমূল সাথে করে এনেছে।এমন একটা ভাব যেন হাসপাতালে রোগী দেখতে এসেছে।আমি গভীর ঘুমের ভান করে শুয়ে রইলাম।ফারিয়া আমাকে ডেকে উঠানোর চেষ্টা করল কিন্তু মারুফ বাংলা সিনেমার নায়কের মত বলল,
-থাক ঘুমাতে দাও ওকে।
আমার তখন একটু হাসিই পেয়ে গেল।চাচাকে কি বলব যে এই ছেলে আমার পছন্দ না?কিন্তু কেন পছন্দ না জিজ্ঞেস করলে কি বলব!কি যে ঝামেলায় আছি আমি নিজেই জানি।কি এমন পাপ করেছি যে আমার কপালেই এত ঝামেলা!
জ্বর সারতে সারতে তিনদিন লাগল।তারপর সকালে বারান্দায় বসে দিনের প্রথম চায়ে আয়েশ করে চুমুক দিতে না দিতেই এমন এক খবর শুনলাম যে আর একটু হলে চায়ের মগ হাত থেকে ফেলেই দিচ্ছিলাম!চাচী মস্ত বড় হাসি দিয়ে আমাকে বললেন,
-মিষ্টি!তোকে মারুফের সাথে ওর গ্রামের বাড়িতে যেতে হবে।
আমি এতই স্তম্ভিত হলাম যে কেন যেতে হবে তাও জিজ্ঞেস করতে পারলাম না।চাচীর পরের কথাতেই সব বুঝতে পারলাম।
-মারুফের দাদা দাদি তোকে দেখতে চেয়েছে।বুঝলি?
-কেন তারা বিয়েতে আসবেন না?তখন দেখলেই তো হবে!
-এত কথা বলছিস কেন?যেতে হবে যাবি।বুড়ো মানুষ দেখতে চেয়েছে নাত বউকে।ওদের গ্রামের বাড়ি যশোর।কাল সকাল নয়টায় বাস।রাতে কাপড় গুছিয়ে রাখিস।
আমি মুখ শুকনো করে বসে আছি দেখে চাচী ভাবলেন যে আমার মনে হয় আবার জ্বর এসেছে।কপালে হাত দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে চলে গেলেন।এদিকে তো আমার তখন মনে হচ্ছে জ্বরটা সারল কেন!এক বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে না পেতেই আবার আরেক মুসিবতে পড়লাম!তার ওপর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিতে ফারিয়া এসে মুচকি হেসে বলল,
-আপু তুমি কত লাকি।হবু জামাইয়ের সাথে ঘুরতে যাবে তাদের গ্রামের বাড়িতে।রাতে থাকবে।ঈশ মজাই মজা!
-থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিব।যা ভাগ সামনে থেকে।
ফারিয়াকে যেভাবে ভাগিয়ে দিলাম মারুফকেও একিভাবে ভাগাতে পারলে কাজ হত!কিন্তু হায়!মানুষ হয়ে জন্ম গ্রহণ করে কয়টা কাজই আমরা ইচ্ছেমত করতে পারি!
৫.
দিগন্ত বিস্তৃত ধান ক্ষেত কথাটা শুধু বইয়েই পড়েছিলাম।বাস্তবে দেখার সৌভাগ্য হয়নি।কালকে বাস থেকে দেখেই অনেক ভাল লেগেছে।মনে হচ্ছিল যদি ওর ভিতর দিয়ে হাঁটতে পারতাম!আর এখন সত্যি সত্যি হাঁটছি ধান ক্ষেতের ভিতর দিয়ে।কি যে অদ্ভূত লাগছে! জুতো খুলে হাতে নিলাম।পা ধুলোতে মাখামাখি হয়ে গেল।তাও মজা লাগছে।গান গাইতে জানলে এখন অব্যশই গান গেয়ে উঠতাম!আমি আর মারুফ ছাড়া আশেপাশে দুই মাইলের মধ্যে কেউ।মারুফ আমার কর্মকান্ড দেখে বিস্তর মজা পেয়ে একা একাই হাসছে।
কালকে মারুফের গ্রামের বাড়িতে এসে পৌঁছেছি প্রায় রাত আটটায়।এখানে দাদা দাদি ছাড়া মারুফদের দূরসম্পর্কের এক আত্মীয় আর তার পরিবার থাকে।সারাদিন জার্নি করে ক্লান্ত ছিলাম বলে তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। দাদুর সাথে দেখা হয়নি রাতে।তার শরীর বেশি ভাল না।দাদীর সাথে অবশ্য অনেক কথা হয়েছে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আশেপাশে সব প্রতিবেশীরা মারুফের বউ দেখতে এসেছে।সে যে কি একটা ঘটনা!অনেক কষ্টে তাদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে দাদুর সাথে দেখা করলাম।আমি এমনিতে খুব ভাব নেই যে আমি একটুও আবেগপ্রবণ নই। কিন্তু যখন দাদু আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন তখন আমার চোখে পানি আসি আসি করছিল।আর বেশিক্ষণ ওখানে থাকলে কি হত বলতে পারি না।
তারপর আমি আর মারুফ ঘুরতে বের হয়েছি আর এখন এত সৌন্দর্য দেখে মাথা খারাপ হয়ে গেছে!মারুফ আমাকে কি যেন বলল!কিন্তু ওর কাছ থেকে একটু দূরে চলে এসেছি তাই শুনতে পেলাম না।আমি চেঁচিয়ে বললাম,
-কি বলছেন শুনতে পাইনি।
ও একটু এগিয়ে এসে বলল,
-তুমি এখনো আমাকে আপনি আপনি করছ কেন?বিয়ের পরে কি করবে?
-ও আচ্ছা!সেটা বিয়ের পরে দেখা যাবে।এখন চলুন ঐ গাছটার নিচে দাঁড়াই।প্রচন্ড রোদ।
৬.
রাত হয়ে গেছে!গ্রামের সবাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে বলে এখানে রাত দশটা মানেই গভীর রাত।আমি বারান্দায় বসে আছি।মারুফ কোথায় কে জানে!একটু আগে শুনলাম কে যেন গান গাইছে।কি অপূর্ব গলা আর এত দরদ দিয়ে গাইছিল!শুনতে শুনতে আমি অন্য কোন জগতে হারিয়ে গিয়েছিলাম।দাদীর গলার স্বরে ঘোর কাটল!
-কিরে তুই এইখানে বসে কি করছিস?
-কিছু না দাদী!একটু আগে কে যেন গান গাইছিল।কি সুন্দর গায়!কে জানো?
দাদী একটু হেসে বললেন,
-মারুফ তোকে কিছু বলে নাই?
-কি বলবে?
-ছেলেটা অনেক লাজুক।ও যে কত ভাল গান গায় এই কথা কাউকে বলে না!
আমি গভীর বিস্ময়ে বললাম,
-একটু আগে গান তাহলে ও গেয়েছে?
দাদী মাথা নেড়ে সায় জানালেন।আরো কিছুক্ষণ কথা বলে দাদী চলে গেলেন আর আমি স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম!
নতুন জায়গা।তাই অনেক রাত অব্দি ঘুম আসছিল না।জানালা খোলা ছিল।আকাশে বিশাল চাঁদ।ওদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজের অজান্তেই দীর্ঘনিঃশ্বাস উঠে আসল।কখন যে চোখ লেগে এসেছিল টের পাইনি।হঠাৎ কেন জানি ঘুম ভেঙে গেল!জানালার দিকে তাকিয়ে বেশ ভয় পেয়ে গেলাম।এতরাতে কে ওখানে!একটু পরে বুঝলাম ওটা মারুফ।কিন্ত ও এখানে চোরের মত কি করছে!ডেকে কথা বলব কিনা বুঝতে পারলাম না।চোখ বন্ধ করে পড়ে রইলাম!একটু পরে তাকিয়ে দেখি সে একইভাবে এখনও দাঁড়িয়ে আছে।প্রিয় পাঠক বিস্ময়কর হলেও সত্যি সেদিন সারা রাত মারুফ আমার মাথার কাছে জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল!
যশোর থেকে বাসে আসার সময় পুরোটা রাস্তা আমরা পাশাপাশি বসে ছিলাম।কিন্তু কথা তেমন বলিনি।আমি মারুফের দিকে না তাকিয়েও বুঝতে পারছিলাম যে ও আমার দিকে তাকিয়ে আছে।আর কেমন এক ভাল লাগা আমাকে ঘিরে ধরছে!একেই কি প্রেম বলে?
৭.
আমরা ঢাকায় চলে আসার পরে মারুফ সম্বন্ধে আমার চিন্তাধারায় বড় ধরনের পরিবর্তন হল।আমি অবাক হয়ে খেয়াল করলাম ওর কথা চিন্তা করতে আমার ভালো লাগে।ওর কথা চিন্তা করে হাসতে ভাল লাগে!ওর সাথে কপট অভিমান করতে ভাল লাগে।আর ও যখন এটাকে সত্যি ভেবে আমার রাগ ভাঙাতে আসে তখন আরো বেশি ভাল লাগে!সারাদিন আমি ওর ফোনের অপেক্ষায় থাকি!কিন্তু ফোন দিলে এমন একটা ভাব নেই যেন কথা বলার কোন ইচ্ছাই আমার নেই।কেন এই কাজ করি আমি নিজেও জানি না!কাজটা যে আমি কতটা ভুল করেছি তা কিছুদিন পরেই বুঝতে পারলাম!সাধে কি আমি ওকে গাধা বলি!
মারুফ একদিন ফোন করে অনেক ভনিতা করার পরে বলল যে সে আমার সাথে দেখা করতে চায়!আমি খুশিমনে রাজি হয়ে গেলেও ওকে বুঝতে দিলাম না।হেভি সাজ দিয়ে যখন ওর সাথে দেখা করতে যাচ্ছি তখন আমি মোটামুটি হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছি।বই পত্রে অনেক পড়েছি যে প্রেমে পড়লে এমন লাগে তেমন লাগে!এখন নিজেই ব্যাপারটার ভিতর দিয়ে যাচ্ছি!মাঝে মাঝে মনটা কারণ ছাড়াই উদাস হয়ে যায় আর মাঝে মাঝে একইভাবে খুশিতে ভরে ওঠে!
মারুফের সাথে দেখা হওয়ার পর কিছুক্ষণ প্রথম দিনের মত নীরবতা পালন।কেউই কথা খুঁজে পাই না।কিন্তু আজকে মারুফকে দেখে মনে হচ্ছে ও পুরোপুরি বিধ্বস্ত!আমি আর থাকতে না পেরে বলেই ফেললাম,
-আপনি কি অসুস্থ?
ও একটু চমকে উঠে বলল,
-না তো!কেন?
-আপনাকে দেখে মনে হল!
-গত কয়েকদিন রাতে ঘুমাইনি।তাই হয়তো এরকম দেখাচ্ছে।
-ঘুমাননি কেন?
-থাক সেসব কথা!নিজের সাথে অনেক বোঝাপড়া বাকি ছিল।তোমাকে কিছু কথা বলার জন্য আজকে এখানে আসতে বলেছি!
-কি কথা?
ও একটু ইতস্তত করে বলতে লাগল,
-দেখো মিষ্টি!তোমাকে আমি খুব পছন্দ করি হয়তো ভালও বেসে ফেলেছি।কিন্তু আমার মনে হয় তুমি আমাকে পছন্দ কর না।তাই আমার মনে হয় এ বিয়েটা আমাদের করা উচিত হবে না।মনের বিরুদ্ধে বিয়ে করে সারাজীবন আফসোস করার কোন মানে হয় না।আমি তোমার চাচাকে বলে বিয়ে ভেঙে দিতে পারি।আমার মনে হয় এটাই দুইজনের জন্য ভাল হবে।
আমি তখন অদ্ভূত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছি।একটু পরে বললাম,
-আপনার এত কিছু মনে হওয়ার কারণ?
-না মানে!
-রাখুন আপনার না মানে।এই একটা কথাই আপনি সবচেয়ে বেশি বলেন।আপনাকে কি আমি একবারও বলেছি যে আমি আপনাকে পছন্দ করি না অথবা বিয়ে করতে চাই না?
-বলনি কিন্তু আমার তাই মনে হয়েছে।
-আশ্চর্য!এত মনে হয় কেন আপনার?নিজের মনকে তো আমি নিজেই ভালমতো বুঝতে পারি না।আর আপনি বুঝে গেলেন আমার মনে কি আছে?এত কিছু মনে করেন দেখেই আপনার এই অবস্থা!
মারুফ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।আমি মোটামুটি চিৎকার করেই কথাগুলো বলেছি আর আমার চোখ দিয়ে কেন যে পানি পড়ছে এই বিষয়টা আমি নিজেও বুঝতে পারছি না।মারুফ একটু অসহায়ের মত বলল,
-তুমি কাঁদছ কেন?আমি এমন কিছু তো বলিনি।
আমি ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললাম,
-হ্যাঁ!তুমি তো দুধে ধোয়া তুলসী পাতা!আর কখনো এইসব ফালতু কথা বললে তোমার খবর আছে!
মারুফ আগের থেকেও অবাক হয়ে বলল,
-আর কি কি করলে খবর আছে?
-অন্য কোন মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকালে আর আমার সাথে তেড়িবেড়ি করলে!
এই কথা শুনে মারুফ শব্দ করে হেসে ফেলল।গাধার মত কেঁদে ফেলে এখন লজ্জা পেয়ে আমিও একটু হাসার চেষ্টা করলাম।এই মানুষটাকে যে এইভাবে ভালবেসে ফেলব নিজেও কি ছাই বুঝেছি নাকি!কিন্তু যাই হোক শেষ পর্যন্ত যে বুঝেছি এবং ওকে বোঝাতে পেরেছি এতেই আমি খুশি!
সামনের সপ্তাহে আমাদের বিয়ে।শপিং করতে করতে আমরা ক্লান্ত!তারপরও দিনের শেষে যখন আমার নিজের সংসারের কথা চিন্তা করি তখন অদ্ভূত এক ভাল লাগার শিহরণ এসে ভর করে।মনে হয় জীবন আমাদের অনেক দিয়েছে-আমরাই তা চোখ মেলে দেখি না কিংবা দেখতে চাই না!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now