বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আলো আঁধারির এই খেলার মধ্যে কতক্ষণ বসেছিলাম মনে নেই। ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর উঠে দাঁড়ালাম।
এতক্ষণ ঠিক কোথায় বসে আছি জানিনা। শুধু জানি, চোখ মেলে তাকানোর পর থেকে আমার সামনে কয়েকটা চেয়ার একটি টেবিলকে ঘিরে নিশ্চুপভাবে বসে আছে। তাদের একটির কোলের উপরে বসে আছি আমি।
ঘরটিতে আলোর কোনো উৎস ছিল না। তবু ঘরটি আলোকিত। ঘরটি বললে ভুল হবে কেননা চেয়ার, টেবিল আর আমি ছাড়া অন্য কিছু দেখা যাচ্ছে না। দেয়ালগুলোও না। চারদিকে শুধু নিকষ কালো অন্ধকার।
যতক্ষণ এখানে বসে ছিলাম ততক্ষণ কোনো রঙ দেখিনি, সবই সাদাকালো। আমার গায়ের নীল শার্টটিকে যেমন রাতের বেলা জ্যোৎস্নার আলোয় কালো দেখায় আর আমাকে দেখায় সাদা ঠিক সেইরকম।
চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ানোর পর ঘরটির দেয়াল আবিষ্কার করার জন্য হাতড়তে হাতড়াতে এগিয়ে চললাম। বেশ কিছুক্ষণ অন্ধের মতো হাঁটার পরও কোনো দেয়ালের হদিস পেলাম না। সামনের দিকে আরো এগোচ্ছি আর ভাবছি, এটা হয়তো কোনো গুদামঘর হবে। কেননা স্বাভাবিক কোনো ঘর হলে এর পরিধি কখনোই এতো বড় হবে না৷ তাছাড়া এতোটা পথ হাঁটার পরও অন্য কোনো আসবাবের চিহ্নও পেলাম না।
হাঁটার দূরত্ব যখন গুদামঘরের পরিধিকেও হার মানায় তখন একটু ঘাবড়ে গেলাম। এটা আদৌ কোনো ঘর তো!
পেছনের দিকে তাকালাম। চেয়ার টেবিলগুলোকে অনেক ছোট দেখাচ্ছে। যা আমায় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, যথেষ্ট হাঁটা হয়েছে বাপু, এবার ফিরে চলো। অজানা ভয়ে বুকের মধ্যে ধুকধুকানি বেড়ে গেছে। তবুও ঘামে ভেজা ভয়াবহ পানসে মুখে শুকনো ঢোক গিলে আবারও সামনের দিকে হাঁটা দিলাম। উদ্দেশ্য, আমার মনের ভাবনা ভুল হোক।
আবার পেছনের দিকে তাকালাম। এবার আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। চেয়ার টেবিলগুলোকে একটা বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে। যেন সেখানে সার্কাস শো হচ্ছ, আর আমি একমাত্র দর্শক যাকে কিনা দর্শকের খেতাব না দিয়ে জোকার বানানো হয়েছে৷
ভয় হল, সামনে এগোলে হয়তো এই ক্ষুদ্র আলোটুকুও হারিয়ে অনন্তকাল এই অন্ধকারের মধ্যে আটকা পড়ে থাকতে হবে। তাই আর সামনে এগোলাম না। দ্রুত পায়ে হেঁটে এসে টেবিলের ওপর হাত দুটো ভাজ করে রেখে সেখানে মাথা গুঁজে বসে রইলাম।
হঠাৎই টেবিলের উপর পাঁচ আঙুল দিয়ে খটখট শব্দ করার মতো শব্দ শুনলাম। পিলে চমকানির মত চমকে উঠলাম, কান খাড়া করে আবার শোনার চেষ্টা করলাম। হ্যা, হ্যা, ওইতো, ঠিক শুনেছি। ধরে আমার প্রাণ ফিরল যেন৷
মুখটা তুলে সামনের দিকে চেয়ে যা দেখলাম তাতে আমার আত্মা শুকিয়ে এতোটুকু হয়ে গেল। চোখ দুটো বিস্ফোরিত। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এযে আমার সামনে বসে আছি আমি নিজেই!
ধাতস্থ হতে কতক্ষণ লেগেছিল কি জানি। যতক্ষণ পর্যন্ত এই অতিনাটকীয়তা মস্তিষ্ক ধারণ করতে পারছিল না ততক্ষণ আমার মুখভঙ্গি বার বার পাল্টেছে। উথাল পাথাল করেছে মন, থর থর করে কেঁপেছে শরীর। তবু আমার সামনে বসা আমির কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
এতোক্ষণ বসে আছি, তবু কোনো কথা নেই। আমি এদিক সেদিক তাকাই আবার সামনে বসা আমির দিকেও। আমার সামনে বসা আমি সেই তখন থেকে শুধু আমার দিকেই চেয়ে আছে। বুঝতে পারছিনা কি হচ্ছে। এই পরিস্থিতে আমাকে কি করতে হবে তাও চিন্তা করতে পারছি না।
মনে অতি সাহস যুগিয়ে একটা প্রশ্ন করেই ফেললাম,
-'তুমি কে?'
খুব নির্লিপ্তভাবে উত্তর এলো,
-'তোমার অন্তর সত্ত্বা।'
অবাক হলাম ঠিকই তবে আবার আর ঘাবড়ে গেলাম না। আবার জিজ্ঞেস করলাম,
-'তুমি আমার অন্তর সত্ত্বা। তাহলে তুমি এখানে কেন? আমার নিজের মাঝে নেই কেন? না, না, তা কি করে হয়? আমি তো আমার মাঝেও আছি। কিন্তু তুমি বাইরে গেলে কেমন করে?'
-'এখানে এলে নিজের অন্তর সত্ত্বাকে চোখে দেখা যায়।'
এতক্ষণ যতোটা ভয় পাচ্ছিলাম, এখন আর তেমনটা লাগছে না। ভূত প্রেতে কখনো বিশ্বাস করিনি, তাই ভয় জিনিসটা এমনিতেই কম ছিল। এটা সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা, ঘাবড়ে যাওয়া বা ভয় পাওয়া স্বাভাবিক ছিল। তবে এখন আমার মাঝে যে ব্যপারটি ঘটছে তা হল কৌতূহল। আমি সবসময়ই যেকোনো বিষয়ে বেশ কৌতূহলী। তাই ভয় জিনিসটা ঝেড়ে ফেলে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছি। আর এতো কিছুর মাঝেও আমি মেনেই নিয়েছি যে, আমি স্বপ্নে আছি। তাই যতোটা সম্ভব এটাকে উপভোগ করার চেষ্টা করছি।
-'এখানে এলে মানে? এটা কোন জায়গা? আমি ঘুম থেকে উঠে এখানে একবার আসতে চাই।'
-তুমি ঘুমিয়ে নেই। আর এখানে আসার সৌভাগ্য দ্বিতীয়বার কারো হয়না।'
-'অদ্ভুত! তাহলে এখানে আমায় নিয়ে এল কে? আমি নিজে নিজে তো আসিনি।'
-'এখানে নিজ ইচ্ছেয় কেউ কখনো আসে না। চাইলেও আসা যায় না।'
-'তাহলে তুমি বলছো, ভাগ্যক্রমে আমি এখানে এসে পড়েছি!'
-'ঠিক ভাগ্যক্রমেও বলা যায়না।'
-'কেন?'
-'জীবনে একবার এখানে প্রত্যেককে আসতে হয়।'
-সেটা কখন?'
-'মৃত্যুর পর।'
কথাটা বুলেটের মতো মস্তিষ্কে ঢুকে গেল। মৃত্যু!
তাহলে কি আমি মরে গেছি? কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? আমি এখনো জীবিত আছি। সবকিছু করতে পারছি। আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সব ঠিকই আছে। দেখতে পাচ্ছি, শুনতে পাচ্ছি, অনুভূতি পাচ্ছি সবই করতে পারছি। তাহলে মারা গেলাম কিভাবে? না, না, মারা যাইনি আমি। এটা স্বপ্নই হবে নিশ্চয়। একটু পরেই ঘুম ভেঙে যাবে। দুঃস্বপ্নটাও কেটে যাবে। এরকম সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘামতে শুরু করলাম।
আমার সামনে বসা আমি মনে হয় আমার মনের কথাগুলো বুঝতে পেরেছে। মুচকি একটা হাসি দিয়ে বলল,
-'আচ্ছা ঠিক আছে, ধরলাম এটা স্বপ্নই। কিন্তু মানুষ কি জেগে স্বপ্ন দেখতে পারে?'
প্রচন্ড রাগ হল আমার। এর ঠাট্টা করা কি বন্ধ হবে না? আমায় মৃত প্রমাণ করার এতো শখ কেন এর? চোখজোড়া সরু করে আমার আমির মুখের কাছে মুখটা এনে বললাম,
-'আপাতত এর প্রয়োজন তো দেকছি না।'
-'আলবৎ প্রয়োজন আছে। তা নাহলে যে হিসেব মিলছে না?'
-'কিসের হিসেব?'
-'তুমিই মনে করে দেখো, এখানে আসার আগে তুমি ঠিক কোথায় ছিলে? নিজের ঘরে ঘুমিয়ে? নাকি অন্য কোথাও জাগ্রতকর অবস্থায়।'
এবার আমার একটু খেয়াল গেল বাস্তব দুনিয়া সমন্ধ্যে ভাবার আসলেই তো, ভুলেই গিয়েছিলাম এর বাইরে আমার একটা জীবন আছে। জীবনের এই শেষখন্ডচিত্র আমার ভালই কাটছে।
এইতো আজকেই জামাল ফোন করে ওকে বলল, 'চলে আয় আমার বাসায়। গিন্নি নেই। মতি, গফুর, কবির ওদেরও আসতে বললাম। জমিয়ে আড্ডা দোব আজকে।'
মনটা ফুরফুরেই ছিল। ওড়ার জন্য শুধু পাখা ছিল না। জামাল তারও ব্যবস্থা করে দিল। রিকশায় উঠে উড়তে উড়তে বন্ধুর বাসায় রওয়ানা দিলাম। বুড়ো বয়সে এটাই উড়ার মজা। রিকশা।
গুনগুনিয়ে একটা গানও গাইছিলাম, 'তুমি যে আমার কবিতা...আমারো বাশির রাগিনী...' আবেশে চোখজোড়া বন্ধ হয়ে আসছিল। হঠাৎই গাড়ির হর্ণের বিকট শব্দে সতন্ত্র হলাম। দেখলাম সামনে দিক থেকে একটা ট্রাক দ্রুতগতিতে রিকশা অভিমুখেই ধেয়ে আসছে। আর কিছু চিন্তা করতে পারলাম না। মাথার মধ্যে ঘটাস করে একটা শব্দ হল। সেই শব্দটা প্রতিধ্বনিত হয়ে বর্তমানেও পৌঁছে গেল৷ মাথাটা ধরে চিৎকার করে উঠলাম।
আমার সামনে বসা আমি পৈশাচিক একটা হাসি দিয়ে বলল, 'তুমি মরে গেছো!'
মৃত্যুপুরীতে এই পৈশাচিক হাসি বারবার প্রতিফলিত হয়ে চারিদিকি ছড়িয়ে পড়ল।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now