বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"ম্যাকবেথের তরোয়াল"
---------------------
( শেষ পর্ব)
( লেখক : মানবেন্দ্র পাল)
---------------------
জঙ্গল....ঘন দুর্ভেদ্য জঙ্গল। এই জঙ্গল সুন্দরবনের জঙ্গল নয়। পাহাড়ি জঙ্গল। পদে পদে পাথরের ঠোক্কর। সূর্য ক্রমশ মাথার ওপর উঠল। জঙ্গল যেখানে পাতলা, সেখানেই রোদের দেখা মেলে। নইলে অন্ধকার। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একসময় জুলির মনে হলো, তারা যেন অন্য পথে চলে এসেছে। কিন্তু এটাও বুঝল সে ইচ্ছে করে অন্য পথে আসেনি। কেউ যেন নিজেকে লুকিয়ে রেখে আগে আগে চলেছে পথ দেখিয়ে। কে নিয়ে যাচ্ছে? কেন নিয়ে যাচ্ছে? কোথায়.....কোন সর্বনাশের মুখে নিয়ে যাচ্ছে? যেই নিয়ে যাক, সেই আকর্ষণ থেকে নিজেকে সরিয়ে আনা যে কিছুতেই সম্ভব নয় ওরা তা ভালো করেই বুঝতে পারছে।
আর একটা আশ্চর্যের ব্যাপার....জুলি আর অভিজিৎ পাশাপাশি হেঁটে চলেছে, অথচ কেউ কোনও কথা বলছে না। মুখ যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। শুধু লতাপাতা, বনঝোপ ঠেলে তারা হাঁটছে তো হাঁটছেই। একধরনের বুনো গন্ধ নাকে আসছে। কখনওবা কোন ফুলের তিক্ত কষা গন্ধ।
চলতে চলতে তারা একটা ফাঁকা জায়গায় এসে পড়ল। যেন অন্ধকার থেকে আলোর দেশে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। রোদের রঙ বুঝিয়ে দিলো বেলা এখন দুপুর। একটু দূরেই দেখা গেল নুড়িবিছোন সরু জলস্রোতের ধারা। আর তার ডানদিকে হাতিছড়া, দলু ও দামছাড়ার ঘন দুর্ভেদ্য জঙ্গল যেন গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে মাইলের পর মাইল জুড়ে কালো পাঁচিলের মতো দাঁড়িয়ে। অরণ্যের সেই স্তব্ধ ভয়ঙ্কর চেহারা দেখলে ভয় পায় না এমন মানুষ বোধহয় নেই।
ওরা গোড়ালিডোবা জল স্বচ্ছন্দে পেরিয়ে ওপারে চলে গেল। ঠিকানা জানা নেই, সঙ্গে ম্যাপ নেই তবু ওরা আন্দাজে নাক-বরাবর সোজা এগিয়ে চলল। আবার শুরু হলো বন। তবে এ বন ওপাশের বনগুলোর মতো তেমন গভীর নয়। এখানে ঢুকতেই আশ্চর্য, কেমন হিমেল বাতাস বইতে শুরু করল। বেশ শীত করতে লাগল।
" বড্ড শীত করছে না? অভিজিৎ যেন নিজের মনেই বলল।
" হ্যাঁ, বোধহয় আমরা মৃতের দেশে এসে পৌঁছলাম", জুলিও আনমনা ভাবে উত্তর দিল।
" ঐদিকটা তাকিয়ে দেখ," অভিজিৎ বলল।
জুলি দেখল বাঁ দিকে পাহাড়ের একটা খাঁজকাটা অংশ যেন খাঁড়ার মতো ঝুলছে। আর তার পেছনে কুয়াশা। অথচ এখানে কুয়াশার চিহ্নমাত্র নেই।
" আরও একটু জোরে হাঁট, বোন, আমরা বোধহয় এসে পড়েছি", জুলিকে উদ্দেশ্য করে অভিজিৎ বলল।
জুলি বলল, " আমার পা দুটো কেমন অবশ হয়ে আসছে।"
" তা হোক। এত দূর এসেছি যখন তখন শেষ না দেখে ছাড়ব না," অভিজিৎ তাড়া লাগাল।
অভিজিৎ যেন হঠাৎ প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী হয়ে উঠেছে। জুলিও জোরে হাঁটবার চেষ্টা করছে।
খাঁড়ার মতো পাহাড়টাকে বাঁ দিকে রেখে মোড় বেঁকতেই ঘন কুয়াশার মধ্যে দেখা গেল অনেকখানি পাঁচিল ঘেরা জায়গা। নামেই পাঁচিল। আসলে জীর্ণ ভাঙা কতগুলো ইঁট পরপর সাজানো।
ওরা পাঁচিলের কাছে আসতেই দেখল অনেকগুলো দীর্ঘ সুপারিগাছ.....আর তারই আড়ালে দোতলা একটা বাড়ি.....যে বাড়িটার ছাদ দু'দিকে এমনই ঢালু যেন মনে হয় কচ্ছপের পিঠ।
সেই চঞ্চল জুলিকে যে রহস্যময় বাড়ির ছবিটা দিয়ে গিয়েছিল হুবহু সেই বাড়িটা আজ তাদের চোখের সামনে!
জুলির হাত এমনই কাঁপতে শুরু করল যে যতক্ষণ পর্যন্ত না অভিজিৎ তার হাতটা নিজের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল ততক্ষণ জুলির কাঁপুনি থামল না।
অভিজিৎ বলল, " আমরা তাহলে সেই ছবির বাড়িটা খুঁজে পেলাম। ঐ দ্যাখ......"
জুলি দেখল, বাড়ির গায়ে সেই অবিকল একটা বিকট মুখ বসানো। মুখটার মাথার দুপাশে দুটো শিং। ভয়ঙ্কর দুটো চোখ....যেদিক দিয়েই দেখ না কেন মনে হবে তারই দিকে তাকিয়ে আছে। বিকট হাঁ এর মধ্যে বড়ো বড়ো বাঁকান দাঁত।
" দাদা, ফিরে চল। অনেক রাস্তা হাঁটতে হবে", জুলি তাগাদা দিয়ে বলল।
অভিজিৎ বলল, " এতদূর এলাম। ভেতরটা দেখব না?"
" বাড়িটা তো দেখা হলো"....
" কিন্তু ম্যাকবেথের তরোয়াল দেখব না? দেখব না দোতলায় কে থাকে?"
" দাদা, ভেতরে ঢোকা মানেই মৃত্যু। একবার মা-বাবার কথা মনে করে দ্যাখ।"
সে কথার উত্তর না দিয়ে অভিজিৎ বলল, " ঐ দিকে তাকা। ঐ দ্যাখ, দোতলার একটা ঘরের জানলার দুটো পাট খোলা। হুবহু সেই ছবিটা। চলে আয়।"
অভিজিৎ বোনের হাত ধরে ভাঙা পাঁচিলের এক পাশ দিয়ে বাড়িটার সিঁড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। চওড়া সিঁড়ি। সিমেন্ট বালির চিহ্নমাত্র নেই। তবু ওরা আট ধাপ সিঁড়ি পার হয়ে বন্ধ দরজার সামনে পা রাখল।
" দরজাটা ঠেলব?" ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল অভিজিৎ।
উত্তর না দিয়ে মরিয়া হয়ে জুলি নিজেই দরজাটা ঠেলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে একটা উৎকট শব্দ করে বিরাট দরজাটা খুলে গেল।
দুজনেই অবাক হলো। দরজাটা শুধু ভেজানোই থাকে নাকি?
এক পা এক পা করে তারা ভেতরে ঢুকল। কনকনে মেঝে। এত ঠান্ডা যে পা রাখা যায় না।
বিরাট হলঘর। কিন্তু বসার কোনো ব্যবস্থা নেই। জায়গাটা অবশ্য বসার জন্য নয়। দেওয়ালে টাঙানো নয়, ছাদ থেকে ঝুলছে বিরাট বিরাট জন্তুর কঙ্কাল। কোথাও বাঘের মাথা, কোথাও মোষের বিরাট মাথা। কবে থেকে ঝুলছে কে জানে....কিন্তু দেখলে মনে হয় যেন সেগুলোকে সদ্য বধ করে মুন্ডুগুলো ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। অনেকগুলো দরজা। দোতলায় ওঠার একটা বাঁকানো সিঁড়ি। কিন্তু জনপ্রাণীর সাড়া নেই।
ওরা কিছুক্ষণ এ দরজা ও দরজায় উঁকি মেরে দেখল। তারপর অভিজিৎ চেঁচিয়ে বলল, " কেউ আছেন?"
অভিজিতের গলার স্বর নিস্তব্ধ ঘরে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল।
" কেউ নেই দাদা, চল ফিরে যাই।" জুলি বলল।
" দোতলায় কেউ আছেই। দাঁড়া আর একবার ডাকি", বলে অভিজিৎ ফের ডাকল, " কেউ আছেন?"
উত্তর নেই। কিন্তু থপ করে একটা মোটা টিকটিকি কোথা থেকে মেঝেতে পড়েই ওদের দিকে তেড়ে এল। অভিজিৎ জুলির হাত ধরে টান দিয়ে এক লাফে সরে দাঁড়াল। টিকটিকিটা সিঁড়ির পাশ দিয়ে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
" টিকটিকি আবার মানুষকে তাড়া করে! আর অত মোটা!" জুলি ভয়ে ভয়ে বলল।
" চল ওপরে যাই।"
" আমার যেতে ইচ্ছে করছে না দাদা।"
" বাঃ, এতদূর এসে দোতলাটা দেখে যাব না? দেখব না সত্যিই ম্যাকবেথের তরোয়ালটা আছে কিনা। সাবধানে আমার পিছু পিছু আয়।"
এক ধাপ এক ধাপ করে ওরা উঠতে লাগল। সিঁড়িটা বাঁ দিকে বেঁকে গেছে। বহু পুরনো আমলের নড়বড়ে সিঁড়ি। আর ক'ধাপ উঠতেই ওরা দোতলায় এসে পৌঁছল। এটাও নিচের মতোই হলঘর। ওপরেও অনেকগুলো ঘর। ওরা সামনের দিকে এগোচ্ছিল, হঠাৎ দুজনেই কান খাড়া করল, সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে কেউ যেন উঠে আসছে। খস....খস....খস.....কে আসছে? কোথা থেকে আসছে? কেন আসছে? যেই আসুক ঐ পায়ের শব্দ যে কোনো মানুষের নয় সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু......
সে সব চিন্তার আগে কোথাও লুকনো দরকার। কোথায় লুকনো যায়? সিঁড়ি দিয়ে নামা যাবে না। কারণ ঐ সিঁড়ি দিয়েই কেউ উঠে আসছে।
হঠাৎ লক্ষ্য পড়ল ওদিকে আর একটা সিঁড়ি রয়েছে। তাড়াতাড়ি ঐদিকে ছুটে গেল তারা। সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। কিন্তু সিঁড়িটা মাঝপথেই একটা ঘরের সামনে শেষ হয়ে গেছে। আর পালাবার জায়গা নেই।
ওদিকে সেই খস খস শব্দ আসছেই....আসছেই.
....
উপায় নেই দেখে সামনের দরজায় জোরে ধাক্কা দিল অভিজিৎ। দরজা খুলে গেল। জোরে ধাক্কা দেওয়ায় দুজনেই ছিটকে ভেতরে পড়ে গেল। কোনওরকমে উঠে দাঁড়াতেই যে দৃশ্য চোখে পড়ল তাতে তারা আঁৎকে উঠল। পরপর ঝুলছে মানুষের কঙ্কাল। কোনটারই মাথা নেই। পশ্চিম দিকের একটা ঘুলঘুলি দিয়ে এক ফালি পড়ন্ত বেলার রোদ এসে পড়েছে একটা কঙ্কালের ওপর। তাতেই দেখা গেল থিকথিক করছে পোকা কঙ্কালটার গায়ে। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, ঘরে এক ফোঁটা বাতাস নেই। কিন্তু কঙ্কালগুলো দুলছে। কঙ্কালগুলো কি প্রথম থেকেই দুলছিল, না এদের দেখে দুলতে লাগল?
ঘটনার আকস্মিকতা একটু সামলে নিতে না নিতেই আবার একটা ভয়ঙ্কর দৃশ্য। দেওয়ালে ম্লান অক্ষরে বড়ো বড়ো ইংরেজি হরফে লেখা....'SLAUGHTER HOUSE' যার বাংলা অর্থ হলো কসাইখানা। লাল হরফে লেখা....কিন্তু অক্ষর বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে....ও কি লাল কালি? না....
" ঊ মাগো! এত রক্ত!" আর্তনাদ করে উঠল জুলি। " পালিয়ে চল দাদা, পালিয়ে চল"....দুজনে পালাবার জন্য পিছু ফিরতেই থমকে গেল। আপাদমস্তক সাদা চাদরে ঢাকা একটা থুত্থুরে বুড়ো....যার পিঠটা কুঁজো হয়ে গেছে বয়সের ভারে, পাকা ধপধপে দাড়ি লুটোচ্ছে মাটিতে, কুৎকুতে সবুজ চোখে যার সাপের দৃষ্টি.... একটা লাঠি হাতে করে দাঁড়িয়ে আছে দরজা আগলে।
কে এই বুড়ো? শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই-ই কি বাস করে আসছে এই বাড়ির দোতলার ঘরে? এই-ই কি পাঁচশো বছর আগের মৃত ম্যাকবেথ যার মোকাবিলা করতে চেয়েছিল সাহেব? সাহেব কি এখানে পৌঁছতে পেরেছে?
দুজনে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল বুড়োর দিকে। বুড়ো এগিয়ে এল না, তার ঠোঁটদুটো একটি বারের জন্যও নড়ল না। শুধু ঘরের বাইরে শকুনের পায়ের মতো তার দুটো বীভৎস পা রেখে কসাইখানার দরজাটা আস্তে আস্তে বন্ধ করে দিল। অভিজিৎ দরজা খোলবার জন্য প্রাণপনে ছুটে গেল। কিন্তু ততক্ষনে দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। অভিজিৎ দরজাটা খোলার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু শক্ত কাঠের মতো দরজা এতটুকু ফাঁক হলো না। অভিজিৎ মেঝের ওপর আছড়ে পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠল....হায় ভগবান!
কিন্তু আশ্চর্য স্থির হয়ে রইল জুলি। সে বিহ্বল। ভয় পাবার ক্ষমতাটুকুও বুঝি তার নেই। এই কসাইখানার বন্ধ ঘরে এর পর তাদের কি ভয়ঙ্কর পরিণতি হবে তা বুঝতে বাকি নেই।
একটা খটাখট শব্দে দুজনেই চমকে উঠল। দেখল সার সার ঝুলন্ত কঙ্কালগুলো যেন মহা উৎসাহে দুলতে দুলতে একটা অন্যের সঙ্গে ঠোকাঠুকি খেলা শুরু করেছে।
এদিকে বেলা পড়ে আসছে। একটি মাত্র ঘুলঘুলি দিয়ে যে এক ফালি রোদ আসছিল সেটুকুও আর নেই। ঘরে অন্ধকার জমাট বাঁধতে শুরু করেছে।
আর কতক্ষণ তাদের পরমায়ু? কখন কবে তাদের শিরশ্ছেদ হবে? আজ রাত্রেই না কাল সকালে? কোথায় কত দূরে গোয়ালপাড়া গ্রামে মা-বাবার কথা মনে করে জুলির চোখে জল এল।
এমনি সময়ে দরজাটা নিঃশব্দে একটু একটু করে খুলে যেতে লাগল। ঘাতক আসছে তাহলে? মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে অভিজিৎ উঠে দাঁড়াল।
দরজাটা খুলে গেল।
না, সেই বুড়োটা নয়, একটা অস্পষ্ট ছায়ামূর্তি। জুলি আর অভিজিৎ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ছায়ামূর্তিটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল। অমনি দুজনেই চমকে উঠল......চঞ্চল!
কিন্তু এ কি চেহারা চঞ্চলের! হাড়সর্বস্ব রোগা! মুখটা ঝাপসা। চঞ্চল হাতের ঈশারায় ওদের বেরিয়ে আসতে বলল। অভিজিৎ আর দেরী না করে জুলির হাত ধরে টেনে নিয়ে দরজার বাইরে এসে দাঁড়াল। দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে গেল।
তারপর তারা চঞ্চলের ছায়ামূর্তির পিছু পিছু যেতে লাগল। কোন ঘরের কোন গোপন দরজা দিয়ে, কোন সুড়ঙ্গপথ ধরে কিভাবে যে তারা রাস্তায় এসে দাঁড়াল তা তারা ভেবে পেল না।
ভাবার সময়ও ছিল না, দরকারও ছিল না। সঙ্গে যে রয়েছে বিশ্বস্ত বন্ধু চঞ্চল। তারই পিছু পিছু তারা চলল মাঠ জঙ্গল পেরিয়ে। তারা কি হাঁটছিল? না উড়ছিল?
একবার অভিজিতের মনে হলো তারা বোধ হয় বেঁচে নেই। শরীরমুক্ত 'আত্মা' হয়ে তারা চঞ্চলের পিছু পিছু হাওয়ায় ভেসে চলেছে। নইলে এত জোরে কেউ হাঁটতে পারে?
চলতে চলতেই অভিজিৎ নিজের হাতে চিমটি কাটল। না, বেঁচেই আছে।
" জুলি হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে?" এতক্ষণে অভিজিৎ কথা বলল।
" না",ছোট্ট উত্তর দিল জুলি। হঠাৎ একসময় তারা লক্ষ্য করল, চঞ্চল নেই। চঞ্চল.... চঞ্চল.... চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল অভিজিৎ, কোথায় তুমি?...... কিন্তু সাড়া পেল না।
এখন এই সন্ধের মুখে কোন দিকে যাবে? লারসিংগার বাংলোটা কতদূর? "
হঠাৎ জুলি আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল, " দাদা, রেলস্টেশন। "
তাই তো। এগিয়ে গেল তারা স্টেশনের দিকে। শিলচর স্টেশন! যাক তবু এখানে জীবন্ত মানুষ আছে।
এখানে যখন এসে পড়েছে তখন আর ভাবনা নেই। একটা ঘোড়ায় টানা টাঙ্গা গোছের গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের দিকে গাড়োয়ান এগিয়ে এল। অভিজিৎ জিজ্ঞেস করল, " লারসিংগার বাংলো কতদূর? "
উত্তর দিল গাড়োয়ান.... " পনের মাইল।"
" ভাড়া যাবে?"
গাড়োয়ান গাড়ির দরজা খুলে দিল। গাড়ি চলতে শুরু করল। বরাইল পাহাড়ের ওপর তখন সূর্য ডোবার লালচে আলো চিকচিক করছে।
"কি ভাবছিস জুলি?" অভিজিৎ জিজ্ঞেস করল।
" চঞ্চলদা এখানেও দেখা দিয়ে গেল", বলতে বলতে জুলির চোখ দুটো জলে ভরে উঠল।
" তাহলে চঞ্চল এখানে ঐ বাড়িতে পৌঁছেছিল?"
জুলি উত্তর দিল না। সূর্য ডুবে যাচ্ছে। অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে চরাচর।
(সমাপ্ত)
----------------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now