বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"ম্যাকবেথের তরোয়াল"
-------------------
( ৫ ম পর্ব)
( লেখক : মানবেন্দ্র পাল)
--------------------
* * * ম্যাকবেথের তরোয়াল * * *
গভীর বন আর পাহাড়ে ঘেরা আসামের এই অঞ্চলটা। চারদিকে যেন সবুজের মেলা। আসামের একটি জেলা এই উত্তর কাছাড়। পার্বত্য জেলাটির সদর শহর হাফলং। সামনে হেমপট্টপেট পাহাড়। দক্ষিন প্রান্তে বরাইল পর্বতশ্রেণী। মাঠে মাঠে কমলালেবু, আনারস আর পানের চাষ।
একশো বছরেরও আগে এইসব জনবসতিহীন দূর্ভেদ্য জঙ্গলে বড়ো বড়ো মশা, জোঁক, বিষধর সাপ, হিংস্র দাঁতাল শুয়োর, চিতা আর বুনো হাতির পালের সাথে লড়াই করে জীবনের বড়ো রকম ঝুঁকি নিয়ে কিছু সাহেব ইংলন্ড থেকে এখানে এসেছিল চা-বাগান করতে। তাদের সে প্রচেষ্টা সফল হয়েছে। আসামের চা-বাগানের চা-এর নাম আজ ভারতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে।
ট্রেন, বাস, কখনও দুর্গম জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বিষাক্ত সাপ আর রক্তচোষা জোঁকের হাত থেকে বাঁচতে ওরা এক জায়গায় এসে দাঁড়াল। জায়গাটার নাম বোধহয় দামছাড়া। দুর্গম অঞ্চলে ঢাকা এই দামছাড়া গ্রাম।
সারা পথে সাহেব দূরে দূরে ছিল। ট্রেনে ছিল অন্য কমপার্টমেন্টে। একটি কথাও বলেনি। অস্বাভাবিক গম্ভীর হয়ে ছিল। এমন ভাব যেন এদের চেনেই না। তার জন্য জুলিরা অবশ্য কিছু মনে করেনি। তারা ছিল নতুন জায়গা দেখার আনন্দে বিভোর হয়ে।
এইবার তারা তিনজনে এসে দাঁড়াল একটা ছোট টিলার ওপর।
এতক্ষণে সাহেব কাঁধ থেকে পোঁটলাটা নামিয়ে রেখে কথা বলল। বলল, " এখান থেকেই আমরা আলাদা হয়ে যাব।"
" কিন্তু আমরা থাকব কোথায়?" জুলিরা জিজ্ঞেস করল।
সাহেব বলল, " সেটা তোমরাই ঠিক করবে। তোমরা কোথায় থাকবে তার ব্যবস্থা করা আমার কথা নয়। তবু আমি তোমাদের হেল্প করছি....সোজা চলে যাও কিছুদূর। আমি শিলচরে নেমে জেনেছি, বেশ কিছুদূরে লারসিংগার চা-বাগান। সেখানে একটা বাংলো রয়েছে। সেখানেই থাকার ব্যবস্থা করে নাও।"
" আর তুমি?"
সাহেব মুখ কঠিন করে বলল, " শর্ত মেনে চলো, নইলে আমার হাতেই বিপদে পড়বে।"
অভিজিৎ বলল, " সরি সাহেব। তুমি যেখানে খুশি যাও। আর কোনও কথা জিজ্ঞেস করব না।"
সাহেব তখনিই টিলা থেকে নেমে চলে যাচ্ছিল, জুলি ব্যস্ত হয়ে ডাকল, " সাহেব! "
সাহেব ঘাড় বেঁকিয়ে তাকাল।
" তোমার পোঁটলাটা ফেলে যাচ্ছ।"
" ওটার আর দরকার নেই।"
জুলি অবাক হয়ে বলল, " সেকি! এতেই যে তোমার সব আছে।"
সাহেব এবার পায়ে পায়ে এগিয়ে এল তাদের কাছে। বলল, " হ্যাঁ, এতে আমার অনেক কিছু আছে। কিন্তু তার আর দরকার নেই। আমি ঠিক জায়গায় পৌঁছে গেছি। শুধু সেই বাড়িটা খুঁজে বের করা বাকি। সে বাড়িতে ঢুকতে গেলে কোনও বাড়তি বোঝা নিয়ে ঢোকা যাবে না।"
সাহেবের সব কথাই বরাবর অদ্ভুত। এ কথাটা শুনেও তারা অবাক হয়ে গেল।
সাহেব তার বড়ো হলদে বিশ্রী দাঁতগুলো বের করল। বোধহয় হাসবার চেষ্টা করল। বলল, " তোমরা কিছু জানতে চেয়েছিলে, তা আগে বলিনি। এখন বলতে পারি। কারণ এই মূহুর্তে নির্জন এই টিলার চারিদিকে জনমানবের চিহ্নও নেই। তোমাদের সঙ্গে আমার আর দেখাও হবে না। কলকাতায় ফিরে তোমরা যদি সেই গোপন জিনিসটির কথা ফাঁস করে দাও তাহলেও আমার ক্ষতি নেই। ততক্ষণে সেই মহামূল্যবান জিনিসিটি আমার মুঠোয় চলে আসবে।"
" কি সেই মহামূল্য জিনিস, বলবে কি?" জিজ্ঞেস করল অভিজিৎ।
" শয়তান ম্যাকবেথের মন্ত্রপূত তরোয়াল।"
" ম্যাকবেথের তরোয়াল!" জুলি আর অভিজিৎ অবাক হল, " সে তো কবেকার কাহিনী। যদি ম্যাকবেথ নামে সত্যিই কেউ থেকেও থাকে তাহলে তার তরোয়াল এতদিন পর......."
" হ্যাঁ, সম্ভব ", সাহেব তাদের বাধা দিয়ে বলল, " ভুলে যেও না ওটা ছিল ডাইনীদের মমন্ত্রপূত তরোয়াল। ঐ তরোয়াল যার মুঠোয় থাকবে, পৃথিবীতে কোনও শক্তি তাকে মারতে পারবে না। সে তরোয়াল কোনওদিনই নষ্ট হবে না।"
জুলি জিজ্ঞেস করল, " তাহলে জনতার হাতে ম্যাকবেথ মরল কি করে?"
সাহেব বলল, " তার আগে তার তরোয়ালটা চুরি করে অন্য তরোয়াল রাখা হয়েছিল। নিরুপায় শয়তানটা নিজের তরোয়াল না পেয়ে বাধ্য হয়ে অন্য তরোয়াল নিয়ে লড়াই করেছিল। তাই তাকে খুব সহজেই মরতে হয়েছিল।"
জুলি অবাক হয়ে বলল, " আমি খুব ভালো করে শেক্সপীয়রের 'ম্যাকবেথ' টা পড়েছি। এসব তো লেখা নেই।"
" কোনো বইতেই লেখা নেই। আছে শুধু আমার পুরনো পুঁথিতে। নইলে অকারণে জীবনের সুখ, ঐশ্চর্য, আনন্দ ছেড়ে সেই স্কটল্যান্ড থেকে আসামের এই জঙ্গলে ছুটে আসি?"
" তুমি কি বলতে চাইছ ম্যাকবেথের সেই তরোয়াল ঐ রহস্যময় বাড়িতেই আছে?" জুলি জিজ্ঞেস করল।
" হ্যাঁ, আমার পুঁথি তাই বলছে। আর দুষ্প্রাপ্য পুঁথি মিথ্যে বলে না," সাহেব বলল।
জুলি বলল, " কিন্তু ম্যাকবেথকে মাটি দেওয়া হলো সেই স্কটল্যান্ডে, তার নিজের দেশে, আর তার তরোয়াল পড়ে রইল আসামে! এ তো অবাক কান্ড!"
সাহেব বলল, " অবাক হবার কিছু নেই। ম্যাকবেথের তরোয়াল আগেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তারপর তা একজনের হাত থেকে অন্যজনের হাতে হাতে ঘোরে। সে তরোয়াল যোগ্য লোক ছাড়া যার হাতেই যায় তার সর্বনাশ হয়। শেষপর্যন্ত তোমাদের এই ভারতবর্ষের কোনও সাধুই একজন পাদ্রীকে বলে দেয়, এই তরোয়ালের হাত থেকে বাঁচতে হলে কোথাও গোপনে লুকিয়ে রাখো।"
অভিজিৎ বলল, " কেন? তরোয়ালটা ভেঙে ফেলে দিলেই হতো?"
সাহেব বললে, " ও তরোয়াল ভাঙা যায় না, আগুনে পোড়ে না, সমুদ্রে ডোবে না। তাই পাদ্রীর নির্দেশে এটাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। আর ম্যাকবেথের প্রেতাত্মা তার প্রিয় তরোয়ালটাকে আগলে রাখার জন্য সেই বাড়িতে আজও রয়েছে। বহুকাল পর আমি আর একবার সেই শয়তানটার মুখোমুখি হতে চাই।"
জুলি বলল, " তরোয়ালটা যে রাখবে তারই যদি সর্বনাশ হয় তাহলে কোন সাহসে সেটা নিতে চাইছ? ম্যাকবেথের প্রেতাত্মাও কি সহজে নিতে দেবে তোমায়?"
" দেবে না তা জানি ", সাহেব বলতে লাগল, " তবু ম্যাকবেথের সঙ্গে আমায় শেষ লড়াই করতেই হবে। দেখব আজ সে কি করে আমায় খতম করে। পথের মাঝে অন্ধকারে একলা পেয়ে অতর্কিতে আক্রমণ করা এক কথা আর মুখোমুখি লড়াই করা অন্য কথা।"
এ কথায় জুলি চমকে উঠল। বলে কি লোকটা? অন্ধকারে একলা পেয়ে লোক লাগিয়ে কাকে খুন করতে চেয়েছিল ম্যাকবেথ? সে তো আর এক মহাযোদ্ধা, রাজা ডানকানের সেনাপতি, ম্যাকবেথেরই একান্ত বন্ধু ব্যাংকোকে!
মুখে বলল, " তুমি কার কথা বলছ সাহেব? বইয়ে পড়েছি ম্যাকবেথ তো ঐভাবে মেরেছিল তারই বন্ধু ব্যাংকোকে?"
সাহেব বলল, " হ্যাঁ, সেই ব্যাংকোকেই আজ প্রতিশোধ নেবার জন্য এতদূর ছুটে আসতে হয়েছে মানুষের রূপ ধরে। যদি ম্যাকবেথের দেখা পাওয়া যায় ভালো। লড়াই হবে। যদি দেখা না হয় তার তরোয়ালটা নিয়ে আসব। এইভাবেই প্রতিশোধ......... "
বলতে বলতে হঠাৎ সাহেবের সর্বাঙ্গ থরথর করে কেঁপে উঠল। তারপর সে যেন কেমন অস্পষ্ট থেকে অস্পষ্টতর হয়ে গেল। তারপর সেই ছায়াদেহ নিয়ে টিলা থেকে নেমে সামনের গভীর জঙ্গলে মিশে গেল।
স্তম্ভিত জুলি কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, " কি দেখলাম রে দাদা? স্বচক্ষেই তো দেখলাম।"
অভিজিৎ বললে, " এখানে আর এক মূহুর্ত নয়। সন্ধে হয়ে আসছে। তার আগেই বাংলোটা খুঁজে বের করতে হবে।"
* * * * রহস্যপুরী * * * *
" ব্যাপারটা তাহলে কি?" বাংলোর একটা বারান্দায় বসে জিজ্ঞেস করল জুলি।
" ঠিক বুঝতে পারলাম না", কেমন ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল অভিজিৎ।
" এই ক'দিন যে সাহেবটার সাথে এত মিশলাম, এত কথা বললাম, সে আদতে মানুষই নয়?"
অভিজিৎ বলল, " তাই তো দেখলাম। কিন্তু এও কি বিশ্বাস করতে হবে? বিশ্বাস করতে হবে একটা জলজ্যান্ত ভূতের সাথে গোয়ালপাড়ায় বাস করেছি? তারই সঙ্গে অজানা অচেনা অসমের এই জঙ্গলে বেড়াতে এসেছি?"
" শুধু ভূতই নয় দাদা, বলে গেল ও নাকি নিজেই ব্যাংকো! অথচ এর আগে আমাদের বুঝিয়েছে ও ব্যাংকোর বংশধর! "
" যাই হোক, এই অসম্ভব ঘটনা জীবনে কোনওদিন ভুলব না।"
আসল অসমের চায়ের লিকার থেকে চমৎকার গন্ধ বেরোচ্ছিল। পেয়ালায় শেষ চুমুক দিয়ে অভিজিৎ বলল, " আর এখানে থেকে কি লাভ? চল, কালই আমরা বাড়ি ফিরে যাই।"
জুলি বলল, " বারে! এত খরচ করে এখানে এলাম। কিছু না দেখেই ফিরে যাব? এখানে আসার উৎসাহ তোরই তো বেশী ছিল।"
" তা ছিল। কিন্তু সাহেবের ঘটনা দেখার পরই মনটা কিরকম হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে আর না থাকাই ভালো।"
" দাদা, তুই একজন ইয়ং সাংবাদিক! খবর খোঁজার জন্য কোথায় না যেতে হয় তোকে, এডভেঞ্চার করতে ভালোবাসিস......তুই কিনা ভয় পেয়ে কালই ফিরে যেতে চাইছিস? আমিও তো তোর পাশে দাঁড়িয়ে ঐ দৃশ্য দেখলাম। কই আমার তো ভয় করছে না? আমি ঠিক করে ফেলেছি, টাকা-পয়সা খরচ করে যখন এতদূর এসেছ, দু'দিন ঘুরে বেড়িয়ে তবে ফিরব। " একটু থেমে জুলি বলল, " চা-টা কি ফার্স্ট ক্লাস.....দাঁড়া, বাবুর্চি রাতে কি খাওয়াবে খোঁজ নিয়ে আসি।"
বাংলোটা এমনিতে ভালোই। তবে বড্ড নিরিবিলি। বাংলোর মাঝখান দিয়ে চওড়া সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলার বারান্দা পর্যন্ত। বারান্দার একপাশ ঘেঁষে সার সার রুম। বেশির ভাগ ঘরই ফাঁকা। নিচে ছোট ঘরে থাকে বয়-বাবুর্চি-কেয়ারটেকাররা। বাড়ির তিন দিকে গা-ছমছম করা ঘন জঙ্গল। দূরে পাহাড়ের হাতছানি।
এত অল্প লোক কেন জিজ্ঞাসা করায় বুড়ো কেয়ারটেকার বলল, " এখন তো অফ সিজন। অগস্ট থেকে অক্টোবর -এই সময়টা হচ্ছে মেঘ, বৃষ্টি, কুয়াশা আর দূর্যোগের সময়। যখন জাটিঙ্গা উপত্যকায় গভীর রাতে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি এসে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে সেই রহস্যময় দৃশ্য দেখার জন্য কিছু ট্যুরিস্ট আসে এখানে।
জুলি কলকাতায় মামার বাড়িতে জাটিঙ্গার পাখিদের দলে দলে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে মরার রহস্যজনক কাহিনী শুনেছিল। কিন্তু এটা তার কাছে নতুন কিছু বলে মনে হয়নি। আমাদের পশ্চিমবাংলাতেও কার্তিক মাসে দেওয়ালি পোকারা আলো দেখলেই কোথা থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে এসে ঝাঁপ দিয়ে মরে। সেও তো এক রহস্য!
তবু জায়গাটা একবার দেখার ইচ্ছে হলো। কিন্তু সে তো অক্টোবর মাসের ব্যাপার।
বুড়ো কেয়ারটেকারের সঙ্গে জুলি খুব তাড়াতাড়ি ভাব জমিয়ে ফেলল। কোথায় কি দেখবার ইচ্ছে আছে তাও জেনে নিল। কেয়ারটেকার সবশেষে বলল, " বেশী জঙ্গলে আর্মস ছাড়া না যাওয়াই ভালো"।
রাত ন'টার মধ্যে গরম গরম মাংস ভাত খেয়ে ওরা যে যার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ল। পাশাপাশি সিঙ্গেল সীটেড রুম। দুজনেই খুব খুশী। বেশ যে যার মতো থাকতে পারবে।
রাত দশটা বাজল। চারিদিক স্তব্ধ নিঝুম। জুলি রাতের পোশাক পরে আলো নিবিয়ে মশারির মধ্যে ঢুকে পড়ল। মাথার কাছে রাখল টর্চটা। কি মনে হলো আবার উঠে পড়ল। তারপর এটাচড বাথরুমটা ভালো করে দেখে নিয়ে আবার শুয়ে পড়ল।
" দাদা, ঘুমিয়ে পড়েছিস নাকি?", শুয়ে শুয়েই জুলি জিজ্ঞেস করল।
পাশের ঘর থেকে অভিজিৎ উত্তর দিল, " না। নতুন জায়গা। ঘুম আসছে না।"
" বাথরুমটা ভালো করে দেখেছিস?"
" হ্যাঁ। টর্চটা হাতের কাছে রাখিস।"
"একেবারে বালিশের পাশে রেখেছি। তুই ভোরবেলা বেরোবি নাকি?"
অভিজিৎ বলল, " পাগল! ভোরবেলাতেই তো আসল ঘুম। " বলতে বলতে সে যে হাই তুলল সে শব্দটুকুও জুলি এই ঘরে শুয়ে শুনতে পেল।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল জুলি টের পায়নি। হঠাৎ একসময় ঘুমটা ভেঙে গেল। টর্চ জ্বেলে দেখল, ঘড়িতে রাত দুটো বাজে। এরকম মাঝরাতে তার ঘুম ভাঙে না বড় একটা। ভেঙেছিল ক'মাস আগে বাড়িতে তিনবার কলিং বেলের শব্দে। বেশ কিছুদিন পরে, চঞ্চলের কথা মনে পড়ল, যে প্ল্যানচেটে সাবধান করে দিয়েছিল। কোথায় গেলল ছেলেটা? সে কি সত্যিই আসামে এসেছিল?
হঠাৎ জুলি চমকে উঠল, কিসের শব্দ?
জুলি কান পেতে রইল। কে যেন খুব জোরে ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে! কয়েক মূহুর্তে শব্দটা কাছে এসে পড়ল, একেবারে বাংলোটার কাছে। তারপর শব্দটা এগিয়ে গেল গভীর জঙ্গলের দিকে। ক্রমে মিলিয়ে গেল। অবাক হলো জুলি। এত রাতে ঘোড়ায় চড়ে কে ঘুরে বেড়াচ্ছে জঙ্গলের মধ্যে?
শব্দটা আর শোনা গেল না।
জুলি আবার ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে চা খেতে খেতে অভিজিৎকে জিজ্ঞেস করল, " কাল রাতে কোনও শব্দ শুনেছিলি?"
অভিজিৎ জেলি মাখান টোস্টে কামড় দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে বলল, " নাহ। এক ঘুমে রাত কাবার।"
জুলি ভাবল, তাহলে কি তারই শোনার ভুল?
পরে দুপুরবেলা কেয়ারটেকারকে জিজ্ঞেস করল, " কাল রাতে ঘোড়ায় চড়ে এদিকে কে এসেছিল? " কেয়ারটেকার তখনি তার কথার উত্তর দিল না। কয়েক মূহুর্ত জুলির মুখের দিকে চেয়ে রইল। তারপর শুধু বলল, " ও কিছু না"।
উত্তরটা শুনে জুলি খুশী হলো না। যেন সত্যিই কেউ এসেছিল। কিন্তু সে কথাটা লোকটি যেন চেপে গেল।
পরদিন দুপুরে জুলি অভিজিৎকে বলল, " চল, একটু ঘুরে আসি।"
অভিজিৎ আলিস্যি ভেঙে বলল, " দূর! জঙ্গলের মধ্যে কোথায় ঘুরব? তার চেয়ে ঘুমুলে কাজ দেবে।"
অভিজিতের কথায় জুলি অবাক হলো। এখানে এসে পর্যন্ত দাদার কেমন যেন পরিবর্তন হয়েছে। তার যেন মোটেই ভালো লাগছে না। শেষে জুলি একাই বেরিয়ে পড়ল।
বেলা দেড়টা। জুলি প্রথমে বাংলোর পেছনের দিকে খানিকটা ঘুরল। তারপর জঙ্গলের পথ ধরল। এ এমন ঘন জঙ্গল যে রোদ পর্যন্ত ঢোকে না। জুলির লক্ষ্য মাটির দিকে। খুঁজছে ঘোড়ার খুরের ছাপ চোখে পড়ে কিনা। কিন্তু শুকনো পাতা আর কয়েকটা জোঁক ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ল না। সরু বনপথ ধরে এগিয়ে চলল জুলি। কোথায় যাচ্ছে তা নিজেও জানে না। তার মনে হতে লাগল একটা অদৃশ্য শক্তি তাকে টেনে নিয়ে চলেছে। কেবলই মনে হতে লাগল আর একটু এগোন যাক। আর একটু.....তাহলেই যেন দেখতে পাবে ছবির সেই রহস্যময় বাড়িটাকে। আবার মনের জোরে জুলি এগোতে লাগল। হঠাৎ কোথা থেকে একঝাঁক মাছি এসে মাথার ওপর ভনভন করে উড়তে লাগল। চোখে মুখে ঢুকতে লাগল। এ তো মহাজ্বালা!
অগত্যা ফিরতে হলো। কিন্তু এরই মধ্যে জঙ্গল অন্ধকার হয়ে এসেছে। রিস্টওয়াচটা দেখল জুলি। সবে বেলা তিনটে। এরই মধ্যে অন্ধকার হয়ে এল! তা তো হবেই। একে জঙ্গলের পথ, তার ওপর সূর্য পাহাড়ের আড়ালে নেমে যাচ্ছে। জুলির ভয় করল। পথ চিনতে পারবে তো? তাড়াতাড়ি যেভাবে এসেছিল ঠিক সেইভাবেই হাঁটতে লাগল।
বাংলোয় যখন পৌঁছল তখন সন্ধে। দেখল দাদা বাংলোর সামনের রাস্তায় অধৈর্য হয়ে ঘুরছে। জুলিকে দেখে ধমক দিয়ে বলল, " কোথায় গিয়েছিলি একা একা? "
"সব বলছি, ওপরে চল", জুলি বলল।
চা খেতে খেতে অভিজিতকে সব বলল জুলি। তারপর দুজনে গেল কেয়ারটেকারের ঘরে। যেতেই বৃদ্ধ বলল, " কোথায় গিয়েছিলে দিদি? একা একা হাতে অস্ত্র না নিয়ে কখনো জঙ্গলে যেও না। এখানে হিংস্র লেপার্ড আছে। তারা ডোরাকাটা বাঘের চেয়েও ভয়ঙ্কর। "
কিন্তু জুলি বাঘের কথা শুনতে চায় না। শুনতে চায় অন্য কিছুর কথা.....আরও ভয়ঙ্করের কথা। জানতে চায় কে তাকে আকর্ষণ করে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল গভীর থেকে গভীর জঙ্গলের পথে?......কেন নিয়ে যাচ্ছিল?
এক সময়ে নিরিবিলিতে জুলি কেয়ারটেকারকে জিজ্ঞেস করল, " আঙ্কল, শুনেছি এখানে কোথায় যেন একটা পুরনো বাড়ি আছে। সেখানে কেউ যেতে সাহস করে না?"
বৃদ্ধ কেয়ারটেকার আঙ্কল চমকে উঠে বলল, " চুপ, চুপ, ও বাড়ির নাম উচ্চারণ কোরো না।"
" কেন?"
" ওখানে ভয় আছে দিদি। কত বিদেশী কত কাল ধরে ও বাড়িটাকে দেখার জন্য গিয়েছিল, তারপর তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় নি।"
" কি আছে ওখানে?"
" লোকে বলে, কোনো খুনে সাহেব রাজার প্রেতাত্মা। সন্ধেবেলা ও বাড়ির নাম উচ্চারণ কোরো না।" একটু থেমে ফের বলল, " তুমি ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনেছ। তা মিথ্যে নয়। সেদিন বলিনি। আজ বলছি, ঐরকম শব্দ প্রায়ই শোনা যায়। লোকে বলে, সাহেব রাজা টহল দিয়ে বেড়ায়। তখন যদি কেউ চোখের সামনে পড়ে তাহলে পরের দিন তার লাশ পড়ে থাকে জঙ্গলের মধ্যে। যাও, তোমরা ঘরে যাও। আর যত শিগগীর সম্ভব পার দেশে ফিরে যাও। " একটু থেমে এবার জিজ্ঞেস করল, " তুমি কি আজ ঐদিকেই গিয়েছিলে নাকি?"
জুলি বলল, " বাড়িটা কোন দিকে তা তো জানি না। এমনি হাঁটছিলাম। মনে হচ্ছিল, কেউ যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।"
বুড়ো বলল, " হ্যাঁ, সব্বোনাশের পথেই চলেছিলে। খুব ভাগ্য আর এগোওনি। রাগ কোরো না দিদি আসলে তোমাদের বয়স অল্প, মতিগতি ভালো নয়। বিপদে পড়তে পারো।"
মতিগতি সত্যিই ভালো নয় ওদের। নইলে বুড়ো আঙ্কলের কাছে সব শুনেও দুই ভাইবোন পরের দিনই কেন বেরিয়ে পড়বে সেই রহস্যময় বাড়ির সন্ধানে। অভিজিৎ প্রথমে রাজি হয়নি। জুলিই ওকে জোর করে রাজি করাল। বলল, " তুই না যাস, আমি একাই যাব।"
অগত্যা অভিজিৎ কেও যেতে হলো।
আজ বেলা দশটার মধ্যে লাঞ্চ খেয়ে ভাইবোন বেরিয়ে পড়েছে। বুড়ো আঙ্কলের কথায় বুঝেছে যে পথে গতকাল গিয়েছিল, সেই পথটাই ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেবে ওদের।
( চলবে)
---------------
।। একাকী কন্যা ।।
Feb 4 at 7:35pm · Public · in Timeline Photos
View Full Size · Send as Message · Report
LikeLoveWow192
Write a comment...
Attach a Photo · Mention Friends
সাগর হালদার
Khub sundor
Like · 1 · Reply · Report · Feb 4 at 8:55pm
হিম্বুনীল হিমান্দ্র হিমেন্দ্রীকালো
Nice.next?
Like · 1 · Reply · Report · Feb 4 at 81pm
কাল্পনিক সৌরভ
শেষ পর্বটা দেবেন কি না?আমরা সবসময় এই পেজ এ লাইক কমেন্ট করি কিন্তু আপনারা একটা গল্প শেষ করতে ৩,৪দিন লাগিয়ে দেন।এভাবে চলতে থাকলে আমরা দর্শকদের পেজ থেকে আগ্রহ অনেকাংশে কমে যাবে।একবার ভেবে দেখুন আগে সকল পোষ্টে ২৫০,৩০০+ লাইক হত কিন্তু এখন ২০০লাইক ও হয় না।দয়া করে বড় গল্পগুলো এতগুলো পর্ব না করে ২পর্বে ভাগ করে পোষ্ট করবেন।২দিনে শেষ করলে আমরা সকল ফ্যানরা আনন্দিত হব।আমরা জানি এবং মানি যে এই পেজটি সকল পেজের মাঝে সেরা। ধন্যবাদ।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now