বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ম্যাকবেথের তরোয়াল—০১

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X "ম্যাকবেথের তরোয়াল" -------------------- ( ১ ম পর্ব) ( লেখক : মানবেন্দ্র পাল) --------------------- * * * দুপুর রাতে কলিংবেল * * * অনেক রাতে সুধীনবাবুর ঘুমটা আচমকা ভেঙে গেল। কলিংবেল বাজছে....কিরিং. ...কিরিং....কিরিং। নিঝুম গোয়ালপাড়ার বিরাট বাঁশবাগানের শুকনো পাতা আর রাতজাগা পাখিদের চমকে দিয়ে শব্দটা যেন দূরে মাঠের দিকে মিলিয়ে গেল। পাশের ঘর থেকে জুলি আর তার মা'ও এসে পড়েছে। বেলটা ততক্ষণে থেমে গেছে। অন্য একটা ঘর থেকে চোখ রগড়াতে রগড়াতে বেরিয়ে এল অভিজিৎ। " কেউ বেল বাজাচ্ছিল না?" সুধীনবাবুই উত্তর দিলেন, " হ্যাঁ।" " এত রাত্তিরে কে আসবে?" বললেন অভিজিতের মা। " যে-ই আসুক দেখতে তো হবে"....সুধীনবাবু বললেন। " বেলটা তো আর বাজছে না। দরজা খোলার দরকার কি?" এতক্ষণ জুলি একটা কথাও বলে নি। গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়েছিল। এবার সে বলল, " বেল আর বাজবেও না।" বোনকে ধমক দিয়ে অভিজিৎ তার বাবার মতোই বলল, " তবু তো দেখতে হবে।" " তা দেখ গে না। কাউকেই দেখতে পাবে না".....থমথমে মুখে জুলি বলল। অভিজিৎ পায়জামাটা টাইট করে পরে দরজার দিকে এগোচ্ছিল, মা বললেন, " খালি হাতে যাস নে। ঐ লাঠিটা নিয়ে যা। বলা যায় না তো........" অভিজিৎ মায়ের কথা শুনল না। লাইট জ্বেলে শুধু টর্চ হাতে দরজার দিকে এগোল । পিছনে পরিবারের বাকি সদস্যরা। দরজাটা খুলতেই একটা হাওয়া ঢুকে দরজার পর্দাটাকে দুলিয়ে দিল। " নাহ, কেউ নেই বাইরে।" অভিজিৎ তবু টর্চ জ্বেলে বাঁশপাতা মাড়াতে মাড়াতে বাগানটা দেখতে যাচ্ছিল, জুলি বলল, " ফিরে আয় দাদা। কাউকে পাবি না।" তবু সে বাঁশবাগানের মধ্যে ঢুকে টর্চের আলো ফেলে দেখল, নারকেল গাছগুলোর মাথাতেও টর্চের আলো ফেলল। শেষে হতাশ হয়ে ফিরে এল। বাড়িতে ঢুকে ভাল করে দরজায় খিল বন্ধ করে সবাই বসল সুধীনবাবুর ঘরে। সবার মুখে একটাই কথা, এত রাতে কে বাজাল বেলটা? অভিজিৎ আলিস্যি ভেঙে বলল, " কোনও চোরছ্যাঁচড়ের কাজ। একবার ধরতে পারলে.........." জুলি গম্ভীর হয়ে গেল। এবার বলল, " চোরই হোক বা যে-ই হোক পালাতে গেলে তো শুকনো পাতা মাড়াবার শব্দ হবে। কোনও শব্দ পেয়েছ কি?" কেউ এর উত্তর দিতে পারল না। জুলিই ফের বলল, " আমি জানি কে বেল বাজিয়েছিল।" " কে?" বাবা-মা দুজনেই ব্যস্তভাবে জিজ্ঞেস করলেন। " বেলটা ক'বার বেজেছিল মনে আছে?" সুধীনবাবু বললেন, " বোধহয় দু'বার।" " না, তিনবার।" জুলির মা অর্থাৎ সুধীনবাবুর স্ত্রী ও বললেন, " হ্যাঁ তিনবার।" জুলি বলল, " পরপর তিনবার কে বেল বাজাতে পারে?" সবাই চুপ। জুলি বলল, " এরই মধ্যে ভুলে গেলে?" অস্ফুট স্বরে জুলির মা বললেন, " চঞ্চল। " জুলি বলল, " তোমরা আরও ভুলে গেছ গত তিন বছরের মধ্যে গভীর রাতে আরও দু-বার এমনিভাবে বেল বেজেছিল। আর আমার যদি ভুল না হয়...... বলতে বলতে জুলি পাশের ঘরে চলে গেল। তারপরইই চাপা উত্তেজনা-ভরা গলায় ডাকল, " মা, দেখে যাও।" সুধীনবাবু আর তাঁর স্ত্রী ছুটে পাশের ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। " দ্যাখো। " দুজনেই অবাক হয়ে দেখলেন, আলমারির মধ্যে চঞ্চলের যে বাঁধানো ছবিটা ছিল তার কাঁচটায় চিড় ধরেছে। " ও মা!" আঁৎকে উঠলেন জুলির মা। বললেন, " এর আগেও তো দু'বার এই ফটোর কাঁচ এইভাবেই ফেটে গিয়েছিল।" জুলি বলল, " আর সেই দুবারই আমরা কিভাবে বিপদের মুখ থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম মনে আছে তো? ঘটনার আগে এমনিভাবেই বেল বাজিয়ে চঞ্চল দু'বারই আমাদের সাবধান করে দিয়েছিল। একটু থেমে জুলি বলল, " আজ আবার তিনবার বেল বাজল। জানি না নতুন কোনও বিপদ থেকে সাবধান করার জন্য চঞ্চল এসেছিল। জুলির কথায় সকলের মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেল। * * * * চঞ্চল, ঠাকুরমশাই কথা * * * * জায়গাটার নাম গোয়ালপাড়া। কালনা থেকে নবদ্বীপ, কৃষ্ণনগর কিংবা পূর্বস্থলী, চুপি যাবার বাসরুটে ছোট্ট একটা স্টপেজ এগোলেই সমুদ্রগড় রেল বাজার। গোয়ালপাড়া গ্রামই বলা যায়। জুলিদের একতলা বাড়িটার পেছনেই বিশাল বাঁশবাগান। তার পেছনে মাঠ। মাঠের ধারে দাঁড়ালে কাটোয়া লাইনের ট্রেন দেখা যায়। জায়গাটার এখন উন্নতি হয়েছে। ইলেকট্রিক লাইট এসেছে, দু-একটা অবস্থাপন্ন বাড়িতে টেলিফোনও বসেছে। কিন্তু ঢের আগে যখন সন্ধে হলেই বাঁশবাগানে শেয়াল ডেকে উঠত, চোর-ডাকাতের ভয়ে সূর্য ডোবার সাথে সাথ্র দরজায় দরজায় খিল পড়ত, ভূতের ভয়ে সবাই তটস্থ হয়ে থাকত সেই সময়ে এখানে বাস করতেন সুধীনবাবুর বাপ-ঠাকুর্দা। সুধীনবাবুরা অবশ্য বেশিরভাগ সময় থাকতেন কলকাতায়। অভিজিৎ আর জুলির পড়াশোনা কলকাতাতেই। এখন রিটায়ার করে সুধীনবাবু তাঁর এই পৈত্রিক বাড়িটাকে হাল ফ্যাশনের করে নিয়ে এখানেই থাকছেন। অনেকগুলো ঘর, ভালো বাথরুম। পাড়াগাঁয়ের এই সবুজ গাছ-গাছালি, খোলা মাঠের হাওয়া, শান্ত পরিবেশ সুধীনবাবুর খুব ভালো লাগে। কিন্তু জুলি আর তার দাদা অভিজিৎ বেশির ভাগ সময়েই থাকে কলকাতায় মামার বাড়িতে। জুলি এম.এ-পরীক্ষা দিয়েছে। খুব স্মার্ট, বুদ্ধিমতী আর সাহসী মেয়ে। চাকরী করবার জন্য কলকাতার বাইরে যে কোনও জায়গায় তো বটেই, সুযোগ পেলে আমেরিকা পর্যন্ত চলে যাবার ইচ্ছে আছে। অভিজিৎ কলকাতায় থেকে খবরের কাগজে শখের সাংবাদিকতা করে। মাঝেমধ্যে চলে আসে গোয়ালপাড়ায় নিজের বাড়িতে। এদের বাড়ি থেকে অল্প দূরে চঞ্চল থাকত তার পিসেমশায়ের কাছে। বি.এ. পাশ করে বসে ছিল। চাকরী -বাকরী পায়নি। তার মা ছিল না, বাবা ছিল না। পিসেমশায় আর পিসিমা বেকার ছেলেটার ওপর খুব চটা ছিলেন। কিন্তু এই আশ্রয়টুকু ছেড়ে সে যেতই বা কোথায়? গোয়ালপাড়ায় চঞ্চলের একমাত্র আনন্দের জায়গা ছিল অভিজিৎদের বাড়ি। অভিজিতের সাথে ওর বন্ধুত্ব ছিল। অভিজিৎ ছাড়াও এই বাড়ির সকলে চঞ্চলকে খুব ভালবাসত। চঞ্চলের মস্ত গুন ছিল গল্প বলা....বিশেষ করে ভূতের গল্প। জুলি কলকাতা থেকে এখানে এলেই ডেকে পাঠাত চঞ্চলকে। প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় চঞ্চল এ বাড়িতে এসে ভূতের গল্প শোনাত। ও বলত, সবই ওর নিজের চোখে দেখা ঘটনা। সত্যি-মিথ্যে ভগবান জানেন। কিন্তু বানিয়ে বানিয়ে এমনভাবে গল্প বলত, মনে হতো যেন সত্যিই তা ঘটেছে। শুনতে শুনতে জুলির মতো মেয়েও ভয়ে কাঁটা হয়ে যেত। যদি কেউ জিজ্ঞেস করত, " সত্যি ঘটনা?" চঞ্চল গম্ভীর হয়ে বলত, " আলবাৎ। এ তো আমার নিজের চোখে দেখা।" ব্যস, এর ওপর আর তর্ক চলত না। কত কথাই মনে পড়ে আজ জুলির। কম সাহসী ছিল ছেলেটা! একবার হলো কি, গোয়ালপাড়া থেকে মাইল সাত-আট দূরে এক বাড়িতে এমন ভূতের উপদ্রব হলো যে ভাড়াটে বিধবা মহিলা তাঁর মেয়েকে নিয়ে সে-বাড়ি ছেড়ে অন্য বাড়ির সন্ধানে পাগলের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কথাটা চঞ্চলের কানেও এল। কালনা তো রীতিমতো শহর। সেখানে তিন-চারটে স্কুল আছে, কলেজ আছে, সাবডিভিশনাল পুলিশ অফিসার আছে.....সেখানে ভূতের উপদ্রব! চঞ্চল ঠিক করল ব্যাপারটা জানতে হবে। জুলির মা বারবার নিষেধ করলেন। কিন্তু চঞ্চল শুনল না। সে কালনায় গিয়ে খোঁজ নিয়ে সেই বিধবা মহিলার সঙ্গে দেখা করল। ওদের কাছে সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা শুনে চঞ্চল এক রাত্তিরের জন্য সেখানে থাকতে চাইল। সে একা থাকবে শুনে তাঁরা বারণ করলেন। কিন্তু চঞ্চল শুনল না। ওঁদের কাছ থেকে চাবি নিয়ে সন্ধে থেকেই রয়ে গেল সেই ঘরে। পরদিন চঞ্চল ফিরে এল গোয়ালপাড়ায়। এসেই পিসেমশায়ের বাড়ি না গিয়ে সোজা চলে এল জুলিদের বাড়ি। তাকে নিরাপদে ফিরতে দেখে সবাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু এ কি চেহারা হয়েছে তার! দু'চোখ লাল, চুল উস্কোখুস্কো, মুখে কথা নেই। সবাই তার অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইল। কিন্তু আশ্চর্য, যে ছেলে এত গল্প করে সে একটি কথাও বলল না। বারবার জিজ্ঞেস করার পর শুধু একটি কথাই বলল, " ও কিছু না।" সবাই বুঝল যে ও অনেক কিছু চেপে যাচ্ছে। তারপর থেকেই চঞ্চলের মধ্যে কেমন একরকম পরিবর্তন দেখা গেল। উদাস হয়ে পুকুরপাড়ে না হয় খাঁ খাঁ মাঠে একা বসে থাকে। ক্রমে সবাই ওকে এড়িয়ে চলতে লাগল.....কি জানি বাবা! একমাত্র ও জুলিদের বাড়িতে যায়। জুলিরা ওকে আদর করে বসতে দেয়। আগের মতোই গল্প করে। কিন্তু চঞ্চলের গল্প বলা হঠাৎই যেন বন্ধ হয়ে গেছে। চঞ্চলের আর একটা খেয়াল জাগল, এ বাড়ির সবাইকে নিয়ে প্ল্যানচেট করা। এই প্ল্যানচেট নিয়ে ওদের বাড়ির কৌতূহলের সীমা ছিল না। শুধু জুলির মা বলতেন, " কি দরকার বাবু, ওসব আত্মাটাত্মাকে ডেকে আনা! ওরা যেখানে শান্তিতে আছে, সেখানেই থাকুক। " তারপর এই যে কলিং বেল....যেটা নিয়ে এই গভীর রাতে এত দূর্ভাবনা, সেটার ব্যবস্থা তো ঐ চঞ্চলই করেছিল। ঘুম আসছিল না জুলির। শুয়ে শুয়ে চঞ্চলের ব্যাপারে এসবই ভাবছিল। তখন সবে গোয়ালপাড়ায় ইলেকট্রিক এসেছে। চঞ্চল হাঁকডাক করে বাড়ি ফিরল। " কি ব্যাপার?" জুলির মা জিজ্ঞেস করলেন। চঞ্চল বলল, " আর চেঁচামেচি, কড়া নাড়া, শেকল নাড়ার দরকার নেই মাসিমা। বোতামটা বাইরে থেকে টিপবে আর ভেতরের লোক জানলা দিয়ে উঁকি মেরে বলবে--কে?" জুলির মা হাসলেন। বললেন, " এত পাগলামিও তোমার মাথায় আসে?" " পাগলামি কেন বলছেন মাসিমা? জানলা থাকলে যেমন পর্দার দরকার, তেমনি দরজা থাকলে কলিং বেলের দরকার।" জুলির মা বললেন, " কোনও দরকার ছিল না।" " হ্যাঁ ছিল," চঞ্চল বলল, " আমি লাগিয়ে দিচ্ছি। কেউ না বাজাক, আমি বাজাব।" এরপর চঞ্চল যখন -তখন আসে আর কলিং বেল টেপে। ছেলেমানুষের মতো তার কি আনন্দ! কয়েক মাস পর এ বাড়িতে যারাই আসে তারাই বেল বাজিয়ে ঢুকতে লাগল। এটা আবার চঞ্চলের বিশেষ পছন্দ হলো না। সবার মতো সে বেল বাজাবে না। জানিয়ে দিল সে যখন বেল বাজাবে, একসঙ্গে তিনবার বাজাবে। এই এমনি করে, বলে তিনবার বেল টিপল চঞ্চল। বলল, " ব্যস, আপনাদের আর জিজ্ঞেস করতে হবে না, বুঝে নেবেন আমি এসেছি। " এরপর থেকে চঞ্চল যখনিই আসত ঐভাবে বেল বাজাত। সবাই বুঝে নিয়েছিল, আর কেউ নয়, চঞ্চল এসেছে। রাত এখন তিনটে বাজে। গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে বাঁশবনটা স্তব্ধ বিভীষিকার মতো থমথম করছে। দূরের মাঠ আর আকাশ যেন অন্ধকারে এক হয়ে গেছে। বাড়ির সকলে দিব্যি ঘুমিয়ে পড়েছিল, এরই মধ্যে এই যে রাত-দুপুরে কলিং বেলটা তিনবার বেজে উঠল, কে বাজাল তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না। কিন্তু জুলি অত সহজে ব্যাপারটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছে না। সে জানে এটা একটা অশুভ সঙ্কেত। কিছু একটা ঘটবেই। তাই তার চোখে ঘুম নেই। কেবলই চঞ্চলের কথা মনে পড়ছে। জুলির মনে পড়ে সেদিনের কথা। চঞ্চল পুরনো ইংরেজি পত্রিকার একটা ছেঁড়া পাতা কোথা থেকে নিয়ে এল। " জুলি....জুলি, দেখে যাও।" না জানি কি মহামূল্যবান জিনিস মনে করে জুলি চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতেই এসে দাঁড়াল। জিনিসটা কিছুই না। একটা ছবি। অদ্ভুত ছবিটা। গভীর জঙ্গলের মধ্যে একটা বিশাল দোতলা বাড়ি। জানলাগুলো বন্ধ। বাড়িটা পুরনো। চারিদিকে পাঁচিল ঘেরা। ভেতরে নানারকম বড় বড় পাথরের মূর্তি। কিন্তু বাড়িটার সামনের দিকে দোতলার জানলার ঠিক নিচে বোধহয় পাথরেরই একটা ভয়ঙ্কর মুখ। সে মুখ মানুষের তো নয়ই, গল্পে পড়া রাক্ষস -দৈত্য-দানবেরও নয়। ছবিতেও মনে হচ্ছে সেটা কোনও অলৌকিক জীবের মুখ। চঞ্চলের দারুণ উৎসাহ। ছবিটা দেখতে দেখতে তার মুখচোখ কেমন হয়ে যাচ্ছিল। জুলি জিজ্ঞেস করল, " এই বাড়িটা কার? মুখটাই বা অমন কেন?" চঞ্চল হতাশ হয়ে বলল, " এর ইতিহাস সবই লেখা ছিল। কিন্তু ছিঁড়ে গেছে। ইস! কিছুই জানা গেল না।" " পত্রিকাটা তুমি পেলে কোথায়?" চঞ্চল বলল, " কলকাতায় গিয়েছিলাম। রিপন স্ট্রিটে একটা কাগজের দোকানে পুরনো পত্রিকা বিক্রি হচ্ছিল। হঠাৎ এটা চোখে পড়ল। ওটা চাইলাম, তা দিল না। বলল, একটাকা লাগবে। কি আর করি! একটাকা নিয়ে ছবিটা কিনে ফেললাম। " " তুমি কি চঞ্চলদা?" জুলি এবার তাকে ভর্ৎসনা না করে পারল না। " কেন?" চঞ্চল অবাক হয়ে বলল। " নেহাতই একটা পুরনো ছবি," জুলি বলতে লাগল, " ইংরেজি ম্যাগাজিনে অমন কত ছবি বেরোয়। তা নিয়ে এত মাথা ঘামাবার কি আছে?" চঞ্চল এবার একটু হাসল। বলল, " এ ছবিটা সাধারন ছবি নয় জুলি। এই যে ছবির বাড়িটা.....দেখলেই বোঝা যায় এর মধ্যে কোনও অজানা রহস্য লুকিয়ে আছে। নয় কি?" "আমি কিছুই বুঝতে পারছি না," জুলি বলল, " আর্টিস্টরা মনের কল্পনায় তাদের খেয়ালমত ছবি আঁকে। তা নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাবার কি আছে?" চঞ্চল বলল, " আছে। মনে রাখতে হবে এই ধরনের ছবি কোন আর্টিস্ট শুধু শুধু কল্পনা করে আঁকে না। হয় কোনও একসময় সে বাড়িটা দেখেছিল কিংবা কারোর কাছ থেকে বাড়িটার কথা শুনেছিল। ব্যাপারটা তার মনে এমনই গেঁথে গিয়েছিল যে, শুধু একজন আর্টিস্ট বলেই সে ছবিটা না এঁকে পারেনি। আর বাড়িটা আর তার কাহিনী একজন ইংরেজ সম্পাদকের এতই ভাল লেগেছিল যে তিনি সেই কাহিনী ছবিসহ না ছাপিয়ে পারেন নি। আমার দূর্ভাগ্য, ছবিটাই পেলাম, কাহিনীটা পেলাম না। সেটা ছিঁড়ে গেছে।" জুলি বলল, " একটা পুরনো বাড়ি ছাড়া এর মধ্যে আর কি আছে তা তো বুঝতে পারছি না। হ্যাঁ, বাড়িটা অবশ্য একটু অন্য ধরনের। ছাদটা কচ্ছপের পিঠের মতো ঢালু হয়ে গেছে। এই পর্যন্ত। এর বেশী বোঝার দরকারও নেই। আর্টিস্টের খেয়াল।" চঞ্চল বলল, " দেখলে মনে হয় বহু পুরনো এই বাড়িতে কেউ থাকে না।" জুলি বলল, " এই পুরনো বাড়িতে কে থাকবে? বন্ধ জানলাগুলো দেখলেই তা মনে হয়।" চঞ্চল হাসল একটু। বলল, " সব জানলাই বন্ধ নয়। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখো, বাঁদিকে একটা জানলা খোলা। দেখেছো? " " হ্যাঁ।" " হঠাৎ একটা জানলা খোলা কেন?" জুলি বলল, " ঝড়-বাতাসে খুলে যেতেই পারে।" " ঝড়-বাতাসে দু-পাটই এমন সমানভাবে খোলা থাকে? ভালো করে দ্যাখো। " জুলি বলল, " তা বটে। কেউ যেন ইচ্ছে করে একটা জানলা খুলে রেখেছে।" " এই কথাটাই তোমাকে এতক্ষণ বোঝাতে চাইছিলাম ", চঞ্চল বলল, " ছবিটা যে এঁকেছিল, কি অসাধারণ তাঁর হাতের কাজ। শুধু তাই নয় জুলি, আমার দৃঢ় বিশ্বাস আর্টিস্ট নিজে কোনওদিন বাড়িটা দেখেছিল। " একটু থেমে চঞ্চল আবার বলল, " বাড়ির সামনে আবার সার সার সুপারি গাছ.....যেন বাড়িটাকে আড়াল করে রেখেছে। সবকিছু মিলিয়ে বাড়িটা কেমন রহস্যময়, তাই না?" " তাই তো মনে হচ্ছে।" জুলি বলল। " সবচেয়ে রহস্যজনক হচ্ছে এই বাড়িতে কেউ একজন থাকে। আর সে থাকে দোতলার একটা ঘরে। কিন্তু সে কে? কেনই বা ঐরকম বাড়িতে একা থাকে?" এই বলে চঞ্চল ছবিটার ওপর ঝুঁকে পড়ে নিবিষ্ট মনে আরও কি যেন দেখতে লাগল। " কি দেখছ অমন করে?" জুলি জিজ্ঞেস করল। " দেখছি বাড়িটা কোথায় হতে পারে?" জুলি বলল, " বাড়িটার গঠন দেখে মনে হচ্ছে সে আমলের সাহেবদের বাড়ি।" " তা ঠিক", চঞ্চল বলল, " কিন্তু জায়গাটা কোথায়? পেছনে দ্যাখো আবছা পাহাড় দেখা যাচ্ছে। আর্টিস্ট জঙ্গলের মধ্যে পাইন গাছ দেখাতেও ভোলেননি। আমার মনে হয় দার্জিলিঙের কাছাকাছি কোনও জায়গা।" " কিন্তু দার্জিলিঙের কাছে হলে তো আরও পাহাড় দেখা যেত," জুলি বলল। "ঠিকই বলেছ, তবে নর্থ বেঙ্গলের কোনও জায়গা হতে পারে। ঐ বাড়িটা দেখতে আমায় যেতেই হবে।" তারপরইই আরও ভালো করে দেখে চঞ্চল বলল, " না, না, নর্থ বেঙ্গল নয়। ছবির কোণে ছেঁড়া জায়গাটা ভালো করে লক্ষ্য করো। কি দেখছ?" জুলি ঝুঁকে পড়ে দেখতে লাগল। " হ্যাঁ......হ্যাঁ......এই যে......As.....N....ar"। চঞ্চল বলল, " তাহলে বলো কোন জায়গার প্রথম কথাটা 'As' দিয়ে? " জুলি বলল, " প্রথমেই তো আসাম নামটা মনে পড়ে।" " ঠিক বলেছ.......তারপর 'N'.....আচ্ছা ওটা থাক। শেষেরটা ধরো 'ar'। কি হতে পারে?" জুলি তখনই আসামের ম্যাপটা খুলে দেখতে বসল। বলল, " একটাই জায়গা পাচ্ছি। কাছাড়। " চঞ্চল উৎসাহে লাফিয়ে উঠে বলল, " ব্যস, ঠিকানা মিল গিয়া। জায়গাটা হচ্ছে কাছাড় ...নর্থ কাছাড়। " জুলি এবার হেসে বলল, " তুমি সত্যিই পাগল। বাড়িটা আছে কিনা তার ঠিক নেই, হয়তো সবটাই আর্টিস্টের মনের কল্পনা, আর তুমি তাই খুঁজতে বেরোবে।" চঞ্চল হাসল না। গম্ভীর ভাবে বলল, " আমি বুঝতে পারছি ও বাড়ি আর্টিস্টের কল্পনা নয়, সত্যি সত্যিই আছে। আর আমি তা খুঁজে বের করবোই......."। তারপরই একদিন চঞ্চল ছবিটা বাঁধিয়ে নিয়ে এল। জুলির হাতে দিয়ে বলল, " এটা তোমায় দিলাম।" জুলি অবাক হয়ে বলল, " আমায় কেন?" চঞ্চল গম্ভীর ভাবে বলল, " এই ছবিটা নিয়ে সব আলোচনা একমাত্র তোমার সাথেই হয়েছে। এর মর্ম আর কেউ বুঝবে না।" অগত্যা জুলিকে ছবিটা টাঙিয়ে রাখতে হলো। আর কিছু না হোক, পুরনো বাড়ি হিসেবে এর একটা আকর্ষণ আছে। তাছাড়া, এতই সুন্দর ছাপা যে বাড়িটা পুরনো হলেও চকচক করছে। এইসমস্ত ঘটনা কালনার সেই ভূতুড়ে বাড়ি দেখতে যাবার আগের ঘটনা। কালনার সেই বাড়িতে একরাত্তির কাটিয়ে আসার পর থেকে সেই চঞ্চলদাই কেমন যেন হয়ে গেল। উদভ্রান্ত, অন্যমনস্ক। জুলিদের বাড়িও কম আসত। যে জুলি তার বোনের মতো, বন্ধুর মতো, তার সঙ্গেও কম কথা বলত। সে একরকম ভালোই হয়েছিল। দিনরাত শুধু ভূত....ভূত.....ভূত আর প্ল্যানচেট করা, এসব তার মায়ের মতো জুলিরও ভালো লাগত না। আগে জুলি কলকাতায় মামার বাড়ি চলে গেলে চঞ্চল রোজ একবার করে এসে জুলির মায়ের কাছে খবর নিয়ে যেত, জুলি কবে গোয়ালপাড়া আসবে, কিন্তু এবার যখন গেল, চঞ্চল একবারও খোঁজ নিতে আসেনি। ভালোই। মাস তিনেক পর জুলি গোয়ালপাড়ায় এসে শুনল, চঞ্চল কোথায় চলে গেছে। নিরুদ্দেশ। ওর পিসেমশায় একবার জুলিদের বাড়িতে খোঁজ নিতে এসেছিলেন, জুলির মা-বাবাকে চঞ্চল কিছু বলে গেছে কিনা। সেই যে চঞ্চল নিরুদ্দেশ হয়ে গেল, আর ফেরেনি আজ পর্যন্তও। কি হলো ছেলেটার? অন্তত জুলি খুব ভাবত ওর কথা। তারপর ধীরে ধীরে চঞ্চল সবার মন থেকে দূরে সরে গেল। এরপর হঠাৎ একদিন রাতদুপুরে কলিং বেলটা বেজে উঠল.....পরপর তিনবার। সেদিনও চমকে উঠেছিল সবাই। চঞ্চল ফিরে এসেছে! তারপর যখন দরজা খুলে কাউকে দেখতে পেল না তখনিই এ বাড়ির সকলের বুকটা হাহাকার করে উঠল। বুঝল, চঞ্চল আর এ জগতে নেই। কোথায় কোন অজানা জায়গায়, নি:স্ব অবস্থায় ঘুরতে ঘুরতে বেঘোরে প্রাণটা হারিয়েছে! চঞ্চল এই বাড়ির সবাইকে এতই ভালোবাসত যে নিজের একটা বাঁধানো ছবি এদের বাড়িতে রেখে গিয়েছিল। বলেছিল, " যেদিন আমি থাকব না, তখনও যদি আমার কথা মনে পড়ে তোমরা আমার এই ছবিটা দেখো। আমি তোমাদের কাছেই থাকব।" সেদিন সকালবেলা জুলি বিমর্ষমনে যখন চঞ্চলের কথা ভাবছিল, হঠাৎ লক্ষ্য পড়ল চঞ্চলের ছবিটার দিকে। কাঁচটায় কিরকম চিড় ধরে গেছে। ও খুন আশ্চর্য হয়েছিল, আলমারীর ভেতরে থাকা ছবিতে চিড় ধরল কি করে! তারপর জুলির কি মনে হল, প্ল্যানচেট করতে বসেছিল......এই বিদ্যেটা চঞ্চলের কাছ থেকেই শেখা। চোখ বুজে একমনে চঞ্চলের কথা ভাবতে ভাবতেই প্ল্যানচেটের চাকাটা সাদা কাগজের ওপর নড়তে শুরু করল। পেন্সিলে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা ফুটে উঠল, " যেও না"। আশ্চর্য! জুলিদের যে এবার দূর্গাপূজোর ছুটিতে গ্যাংটক যাবার ঠিক হয়েছে, চঞ্চল জানল কি করে? যে ভাবেই জানুক, এই প্ল্যানচেটে তাদের স্পষ্ট যেতে বারণ করা হয়েছে। বাড়ির সবাই দূর্ভাবনায় পড়ল। জুলির দাদা অভিজিৎ বলল, " ও সব গাঁজাখুরি কথা ছাড়ো তো। চঞ্চলের খেয়ে দেয়ে কাজ নেই যে এখন ভূত হয়ে এসে রাতদুপুরে কলিং বেল বাজাবে, প্ল্যানচেটে সাবধান করে দেবে। " কাজেই যেতেই হলো। কিন্তু গ্যাংটক থেকে গাড়িতে ছাঙ্গুলেক দেখতে গিয়ে কিভাবে যে খাদে পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়েছিল, তা আজও ভাবলে ওদের বুক কাঁপে। এর কিছুকাল পর আবার একদিন রাতে তিনবার কলিং বেল বাজল। অথচ দরজা খুলে কাওকে দেখা যায়নি। আবার চঞ্চলের ছবির কাঁচে চিড়। আবার প্ল্যানচেট নিয়ে বসা......আবার নিষেধ..... ভুল করছ.......বিপদ...... ' সেবার জুলি কয়েকজন বান্ধবীর সাথে চাকরীর জন্য চন্ডীগড়ে ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছিল। বাড়িতে সবাই বাধা দিয়েছিল। চাকরী হলে তো সেই সূদূর চন্ডীগড়ে থাকতে হবে। একজন অল্পবয়সী মেয়ের পক্ষে একা বিদেশে, মা -বাবাকে ফেলে রেখে থাকা সম্ভব? কিন্তু জুলি অন্য প্রকৃতির মেয়ে। বড্ড বেশী সাহসী আর জেদি। সে বলল, " গিয়েই দেখি না। সেরকম বুঝলে চাকরী ছেড়ে দিয়ে চলে আসব। " কেবল দাদা অভিজিৎই বলল, " যদি এখনই চাকরী করতে চাস, না হয় ঘুরেই আয়। পশ্চিমবাংলায় পড়ে থাকলে কোনওদিন চাকরী হবে না। তাছাড়া, এডভেঞ্চার হবে। একলা, একলা স্বাধীন জীবন......দারুণ! " যাওয়া যখন স্থির তখন হঠাৎ জুলির কিরকম মাথা ঘুরতে লাগল। উঠতে গেলেই মাথা ঘুরে পড়ে যায়। শুয়ে শুয়েও মনে হয় ছাদটা যেন দুলছে। আশ্চর্য, সেই মাথা ঘোরাটা রইল সারাদিন! ডাক্তার ওষুধ দিয়ে গেলেন। বললেন, " এখন ক'দিন বাড়ির বাইরে যাওয়া একেবারে বন্ধ। " অথচ আজ পর্যন্ত জুলির মাথা ঘোরেনি। এ যেন যাওয়াটা পন্ড করার জন্যই এই ঘূর্ণি রোগ....... যাওয়া হয়নি, মঙ্গল। যে কম্পার্টমেন্টে জুলিদের রিজার্ভেশন ছিল, সেই কম্পার্টমেন্টেই বড় রকম ডাকাতি হয়ে গেল। জুলির বন্ধুরা কাঁদতে কাঁদতে কোনওরকমে ফিরে এসেছিল। দু-দুবার এইরকম হওয়ায় জুলির কেমন বিশ্বাস জন্মে গেছে অলৌকিক ব্যাপারে। তার মনে হয়, চঞ্চলদা সত্যি তাদের ভালোবাসে বলেই মৃত্যুর পরও ভুলতে পারেনি। বিপদের ঝুঁকি থাকলে সাবধান করে দেয়। এইবার তৃতীয় বার এই রাতদুপুরে বেল বাজা আর চঞ্চলের ছবিতে চিড়। কিন্তু কেন? এটা কি সবাইকে জানানো যে চঞ্চল সত্যিই এসেছিল? আবার কোন নতুন বিপদ থেকে সতর্ক করতে এল চঞ্চল? ( চলবে) -------------


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৪১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ম্যাকবেথের তরোয়াল—০১

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now