বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
৫.
সান্দ্রার ঐদিন রাতে ঘুমানোর আগে আবার লিওর কথা মনে পড়লো। ছেলেটার ভিতরে কি যেন একটা আছে। অনেক প্রাণশক্তিতে ভরা একজন যুবক। গ্যারেজে কাজ করলেও কথাবার্তা পুরোই স্মার্ট ধরণের। আর সে লাইব্রেরীতে গিয়ে বইও পড়ে! সচেতন মানুষ। এসব ভাবতে ভাবতে সান্দ্রা ঘুমিয়ে পড়ে।
পরদিন লাইব্রেরীতে যাওয়ার আগে লিওর জন্য জীবনানন্দ দাশের কবিতা সমগ্র বইটা কিনে নিলো। আসলে যারা বই পড়ে (বিশেষ করে লিওর মতো কষ্ট করে বই পড়ে) তাদের জন্য সান্দ্রার আলাদা একটা মায়া কাজ করে। ছোটবেলা থেকে বাবার আদরে মানুষ হলেও অন্য মানুষের অনুভূতি সে ভালোভাবেই অনুভব করতে পারে।
লিও বই পেয়ে জিজ্ঞেস করলো
-এটা কিসের জন্য?
-ইয়ে ঐদিন আপনাকে বইয়ের দোকানে দেখেছিলাম বইটার জন্য।
-ওহ!
লিওর মনে পড়ে গেল দোকানদারের ব্যবহার। তার চেয়ে বেশি অবাক হলো সান্দ্রার কার্যক্রমে। কোথাকার কোন ভদ্র পরিবারের মেয়ে এসে ওর মতো ছেলের সাথে নিজে থেকে পরিচিত হল। আজ দেখি আবার বইও গিফট করছে। কাহিনী কি?
-স্যরি। আমি আপনার উপহার নিতে পারবো না। আমাকে মাফ করবেন। বলেই লিও চলে গেল।
এদিকে সান্দ্রার মন খুব খারাপ হয়ে গিয়েছে। সে খুব জেদী মেয়ে। আজ পর্যন্ত তাকে না করেছে এমন লোকের সংখ্যা খুব কম।
কাল শুক্রবার। লাইব্রেরী বন্ধ।
তাই সে লিওর গ্যারেজে যাবে বলে ঠিক করলো।
৬.
সান্দ্রা পনেরো মিনিট হলো লিওর জন্য বসে আছে খোকার গ্যারেজে। গ্যারেজের মালিক তার খাতির করার কোনো ত্রুটি রাখেনি। কারণ তার গ্যারেজে এই প্রথম কোনো বড় লোকের মেয়ে গাড়ি নিয়ে এসেছে। কিন্তু পরে জানতে পারলো সে এসেছে লিওর জন্য।
লিও আসতে দেরী করছে। এদিকে গ্যারেজের মালিক, হানিফ মিয়া চিন্তায় পড়লেন। লিও কোনো সমস্যা করেনি তো। তাই নতুন ম্যাডামের সামনে লিওর গুণগাণ করা শুরু করলেন।
-বুঝলেন ম্যাডাম, লিওর মতো ছেলে হয় না। ও একা পুরো একটা গাড়ি খুলে আগের মতো জোড়া লাগিয়ে দিতে পারে। যা দেখে সব মনে থাকে ওর। এইতো সেদিন একটা অনেক মূল্যাবান গাড়ির পার্টস নষ্ট হওয়ার পথে ছিলো। কেউ ধরতে সাহস পাচ্ছিলো না। ও ম্যানুয়েলটা একবার পড়েই ঠিক করে দিয়েছে।
-ও কতোদূর পর্যন্ত পড়েছে?
সান্দ্রা জিজ্ঞেস করল।
-তা তো জানি না ম্যাডাম।
-ও আচ্ছা।
এরপর সান্দ্রা লিও সম্পর্কে অনেক কিছুই শুনতে লাগলো হানিফ মিয়ার কাছ থেকে।
আজ লিওর গ্যারেজে যেতে দেরী হচ্ছে। কারন সকালে গ্যারেজে যাওয়ার পথে ও এক মহিলাকে কিছু খেলনা বিক্রি করতে দেখলো। ওর মনে পড়লো গ্যারেজের মালিক হানিফ মিয়ার ছেলের জন্মদিন আজকে। সেই উপলক্ষে গ্যারেজের সবাইকে নিজের বাসায় দাওয়াত দিয়েছেন তিনি। তার ছেলের জন্য নিজের সাধ্যের মধ্যে একটা খেলনা কেনার চিন্তা করলো।
তাই ঐ মহিলার কাছে গিয়ে লিও খেলনা খুঁজতে লাগলো। বোরকা পড়া মহিলা তার সামনে একটা কাপড় বিছিয়ে খেলনা বিক্রি করছে। সবগুলোই লিগো। লিও একটা বেছে নিয়ে দাম জিজ্ঞেস করলো। তাকে অবাক করে দিয়ে মহিলা অনেক কম দাম বললেন। দাম দিয়ে এতো কম দামের কারণ জিজ্ঞাসা করাতে মহিলা বললেন এগুলো কেউ কিনতে চায় না। কারণ মিলাতেই পারে না কেউ। শুনে লিও খানিকটা অবাক হয়। কেনার পরে এই কথা শুনে তার নিজের কৌতুহল হয়। তাই লিও গ্যারেজে না গিয়ে নিজের মেসে চলে যায় লিগোটা মিলানোর জন্য।
৭.
লিও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে লিগোটার দিকে। তার যতদূর মনে আছে এরকম একটা লিগোমানব তার ছিল। আরো অবাক হওয়ার ব্যাপার এতো সহজ লিগো সেট কেউ মিলাতে পারেনি বলে।
কিন্তু লিগোটায় একটু খুত আছে মনে হল লিওর কাছে। একটি বিশেষ প্যাটার্ন দেয়া যেতে পারে। এই ভেবে সে লিগোটাকে খুলে নতুনভাবে সাজালো। প্রতিটি পিস যেন একটা করে সংখ্যার মত। আর লিগোমানবটি হল তার সমীকরণ। এসব ভাবতে ভাবতে লিও গ্যারেজে চলে যায়। মালিকের ছেলের জন্য কিছু চকলেট কিনে নেয় ও।
গিয়ে দেখে সান্দ্রা বসে আছে ওর অপেক্ষায়।
-কি জ্বালা! মনে মনে বললো লিও।
সান্দ্রা মেয়ে হিসেবে যথেষ্ট সুন্দরী। তার আকাশী ফ্রেমের চশমাটা তার সৌন্দর্য যেন আরো বাড়িয়ে তুলেছে। এগুলো গতদুইদিন বা তার আগে খেয়াল করেনি লিও। ওর কাজই হলো গ্যারেজে কাজ করে নিজের পেট চালানো আর বই পড়ে মন চালানো! মেয়েদের দিকে তার আকর্ষণ আগে কখনোই ছিল না। আজ যেন তা নতুন করে জন্ম নিল।
সান্দ্রা ওকে নিয়ে বাইরে একটা রেস্টুরেন্টে বসে। লিও চুপচাপ বসে আছে দেখে সান্দ্রা নিজেই কথা বলা শুরু করে। অনেক প্রশ্ন করার পর জানতে পারলো লিওর কাহিনী।
সেই এক্সিডেন্টে হারিয়ে যাওয়ার সময় একটা বাসে ছিলো লিও। ফারদিন হাসান খাবার কিনতে নিচে গিয়েছিলেন। কিন্তু এক্সিডেন্টে সে মারা যাওয়ায় আর তার বাসে ওঠা হয়নি। আর এদিকে লিও চলে যায় সম্পূর্ন অচেনা অজানা এক জায়গায়। সারাদিন না খেতে পেরে সে আশ্রয় পায় হানিফ মিয়ার গ্যারেজে। ও আর ওর মায়ের কাছে ফিরে যেতে পারে না। হানিফ মিয়া যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পরে জানতে পারা যায় লিওর মা, সুমি হাসানকে প্রতিবেশিরা মামলা করে ঐ বাসা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। লাভ ম্যারেজ ছিল বলে নিজের বাসা থেকে কোনো সাহায্য পাননি মিসেস হাসান। তিনি কোথায় চলে গেছেন কেউ বলতে পারে না। তাই লিওকে নিজের কাছে রাখেন হানিফ মিয়া। এখনো ওখানেই আছে ।
লিওর কাহিনী শুনে সান্দ্রার চোখে পানি এসে গেল। সে বুঝতে পারলো লিও বড় ঘরের ছেলে। আর সে লিওকে কথা দিলো ওর মাকে খুঁজে বের করতে সাহায্য করবে। কারণ সান্দ্রা গতরাতেই বুঝতে পেরেছিলো সে লিওর প্রেমে পড়েছে!
৮.
লিও সেইদিন রাতে মেসে ফিরলো জীবনানন্দ দাশের কবিতা সমগ্র হাতে। রুমের আলো জ্বালাতেই সে একটা বিস্ময়ের ধাক্কা খায়। লিগোমানবটিকে সে যেখানে রেখে গিয়েছিলো সেটা সেখানে নেই। কিছুদূরে আছে আর অবাক করার ব্যাপারটি হলো সেটি নড়াচড়া করছে, সোজা কথায় বলা যায় হাঁটাচলা করছে।
লিওকে দেখে লিগোমানবটি দৌড়ে ওর কাছে আসে। লিও প্রবৃত্তির বশেই খানিকটা পিছিয়ে যায়। কিন্তু লিগোমানবটি ওর আরো কাছে এসে পড়ে। তারপর ওর জামা(প্যান্ট) ধরে টানতে থাকে। লিও বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে পারে না। সে বুঝতে পারে লিগোমানবটি তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু আকারে অনেক ছোট বলে নিতে পারছে না। লিও দরজায় তালা মেরে লিগোমানবটির পিছনে পিছনে চলতে থাকে। রাত তখন একটা বাজে বলে রাস্তায় মানুষ নেই বললেই চলে। তাই এই দুই জনের অদ্ভুত দলটিকে কেউ দেখতে পেল না।
লিগোমানবটি লিওকে একটি বাসার সামনে নিয়ে যায়। বাসাটি ছিলো শহরের একটি বস্তির খুব কাছেই। লিওকে বাসাটির ভিতরে ঢুকাতে চেষ্টা করে লিগোমানবটি। কিন্তু লিও জানালায় আলো দেখে ওখানে উকি দেয়। ভিতরের মানুষটিকে দেখে তার চোখ থেকে অঝোর ধারায় অশ্রু বর্ষন হতে থাকে। চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ পড়লেও নিজের মার চেহারা চিনতে ভুল হয়নি লিওর। মিসেস হাসান তখন আপন মনে তার আগামী দিনের বিক্রির জন্য লিগোগুলোকে মুছে রাখছিলেন। তার স্বামীর এককালের কাজের জিনিস আজ তার জীবিকা অর্জন করতে সাহায্য করছে!
পরের কাহিনী সংক্ষিপ্ত। লিগোমানবের কারণে লিও তার মাকে ফিরে পায়। আর সান্দ্রার সাহায্যে সে পড়ালেখা শেষ করে আজ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীতে পরিণত হয় লিগোয়েশন এর মাধ্যমে। সান্দ্রাও তার প্রথম প্রেমের মানুষটিকে স্বামী হিসেবে পায়।
লিও নিজের অজান্তেই ফারদিন হাসানের অসমাপ্ত কাজ লিগোয়েশন এর সাহায্যে নিম্নবুদ্ধিমত্তার প্রাণ সৃষ্টি করতে পেরেছিল। কিন্তু ঠিক কি কারণে লিগোমানবটি লিওকে সাহায্য করেছিলো আর কিভাবে করেছিলো তা জানা যায়নি।
আজ লিগোয়েশন মেথড এর তৃতীয় প্রজন্মের লিগোমানবদের হাতে মানব সম্প্রদায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। এর জন্য ফারদিন হাসান নাকি লিওকে, ঠিক কাকে দায়ী করা করা হবে সেটি জানার জন্য একটি মানুষও বেঁচে নেই। প্রকৃতি চায় না প্রাণ সৃষ্টি করার মত ক্ষমতা তারই সৃষ্টি পেয়ে যাক। তাই মানুষের বিলুপ্তি হয়ে আজ পৃথিবীতে বসবাস করছে লিগোমানবরা। যাদের বুদ্ধিমত্তা মানুষের সমপর্যায়ের। লিগোয়েশন মেথড কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। তবে চতুর্থ প্রজন্মের লিগোমানবেরা মনে করে মানবজাতির বিনাসের হোথা ছিল লিও যে নতুন প্যাটার্নে লিগোয়েশন সাজাতে যেয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়েছিলো লিগোমানবদের!
সমাপ্ত।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now