বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
খেলা শেষ
- একলা কিশোর
অনেক্ষন ধরেই বসে আছি রেস্টুরেন্টে| খাওয়ার টাকা নাই তাই কিছু অর্ডার করতে পারছি না। তবে এমন ভাব নিয়ে বারবার ঘড়ি দেখছি যেন কারও জন্য অপেক্ষা করছি। এলেই বিশাল মাপের একটা অর্ডার করে বসবো। ওয়েটাররা ঘুরঘুর করছে কিন্তু আমার হাবভাব দেখে কিছু বলতে পারছে না।
অবশ্য সত্যি বলতে অপেক্ষাই করছিলাম আমি। এতোক্ষনে তো চলে আসার কথা মেয়েটার। কিছুক্ষন পরেই ফোনটা গোঁ গোঁ করে উঠলো পকেটের ভেতরে। মিসড কল। একটু পরেই কচুপাতা রঙের একরঙা শাড়ি পড়া একটা মেয়ে ঢুকলো। আমাকে বলে দিতে হলোনা , এই মেয়ের নামই এলিনা। মেয়েটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে এদিক সেদিক তাকাতে লাগলো আর বাম হাত দিয়ে বারবার চুল ঠিক করতে লাগলো। ইদানিং বাম হাতে চুল ঠিক করাও এক ধরনের ফ্যাশন। আগে ডান হাতেই চুল ঠিক করার কাজ চালাতো মেয়েরা। তবে ইদানিং এই প্রাচীন ফ্যাশনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন ডান হাতে পার্স ধরে থাকতে হবে এবং চুল ঠিক করতে হবে বাম হাত দিয়ে। মেয়েটা অনেকক্ষন খোজাখুজি করে কাঙ্খিত ব্যাক্তিকে খুজে না পেয়ে একটা ফাকা টেবিলে বসে পড়লো। এবারে আমি আমার কাজ শুরু করলাম। পকেট থেকে একটা সেন্টার ফ্রেস বের করে মুখে পুড়লাম। সেন্টার ফ্রেশ মুখে দেয়ার যথেষ্ট কারন আছে। কোনও একটা গল্পে পড়েছিলাম মুখে চালবাজ লুক আনতে চুয়িংগামের চেয়ে ভালো আর কোনও দাওয়াই নেই। আর আমি এখন যে কাজটা করতে যাচ্ছি তাতে চালবাজ লুকটার অত্যন্ত প্রয়োজন। আমি চুয়িংগাম চিবুতে চিবুতে নিজের টেবিল ছেড়ে মেয়েটার টেবিলে গিয়ে বসে পড়লাম। মেয়েটা দরজার দিকে মুখ ঘুড়িয়ে ছিলো। মুখ ঘুড়িয়ে আমাকে দেখেই আঁতকে উঠলো
- একি ! আপনি এখানে বসে পড়লেন কেন?
মেয়েটার আঁতকা উতকিতে না গিয়ে আমি ইতিউতি তাকাতে তাকাতে বলে উঠলাম
- আমার নাম শুভ্র। আপনার নাম কি?
- আমি আপনাকে আমার নাম বলতে যাবো কেন? ভ্রু কুচকে পাল্টা প্রশ্ন করলো মেয়েটা।
- আহা বলুনই না। বললে কোনও ক্ষতি আছে কি? যাহোক না বললে না বলবেন। অপেক্ষা করছেন কারও জন্যে? কে আসবে বান্ধবী বুঝি?
মেয়েটা আমার কথায় কুচকানো ভ্রু আরও কুচকে ফেললো। কিছুক্ষন পর হঠাৎ করেই মুখটা জ্বলজ্বল করে উঠলো যেন কিছু বুঝে ফেলেছে। আমি ঘাবড়ে গেলাম ধরে ফেললো নাকি রে বাবা। অবশ্য বেশীক্ষন অন্ধকারে থাকতে হলোনা। মেয়েটা নিজেই বলে উঠলো
- আপনি কি আমার সাথে ফ্লার্ট করার চেষ্টা করছেন? তাহলে শুনুন মিস্টার হোয়াটএভার আমি আমার বয়ফ্রেন্ডের জন্যে ওয়েট করতেসি। কাজেই আপনি আপনার রাস্তা মাপতে পারেন। আমি ফিতে টিতে আনিনি। কাজেই রাস্তা মাপায় কোনও আগ্রহ প্রকাশ করলাম না। আবার একটা চালবাজ টাইপের হাসি দিয়ে বলে উঠলাম
- আমিও আমার গার্লফ্রেন্ডের জন্যে ওয়েট করতেসি। আসছেই না তাই ভাবলাম আপনার সাথে একটু গল্প করি। কতদিনের রিলেশন আপনাদের?
মেয়েটার সন্দেহ তাও দূর হলোনা - অনেক দিনের। রিলেশনটার ব্যাপারে বাসাতেও জানিয়েছি। আজকে ওকে বাবার সাথে মিট করাতে নিয়ে যাবো।
- আপনার বাবা এতো সহজে মেনে নিলেন? খুব সহজ সরল লোক বুঝি? কি করেন উনি?
এবারে মেয়েটা একটা চালবাজ টাইপের হাসি দিলো - আমার বাবা আর্মিতে আছেন। কর্নেল পজিশনে।
কর্নেল শুনেই আমার চালবাজি গায়েব হয়ে গেলো। চুইংগামটা কোত করে গিলে ফেললাম। গলায় আটকে গেলো। গ্লাস থেকে জল গিলে তবেই সেটা পেটে চালান করা গেলো। আমার দিকে তাকিয়ে মেয়েটা আবার চালবাজি হাসি দিলো - কি হলো শুভ্র সাহেব কর্নেল শুনেই গলা শুকিয়ে গেলো?
দেখলাম আমাকে ভীরু বলে অপমান করা হচ্ছে। একটা যোগ্য উত্তর দেয়া উচিত। বললাম - জ্বি না| আমার চুয়িংগামটা শুকিয়ে গেছে তাই পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিলাম।
বলেই ফাকা মুখটাই নাড়াতে লাগলাম। চুয়িংগাম ভিজিয়ে চাবাতে দেখে মেয়েটা এমনভাবে তাকালো যেনো আমি কাচা গু জলে ভিজিয়ে চিবুচ্ছি। আমি ব্যাপারটা গায়ে মাখলাম না। কাচা গু গায়ে না মাখাই ভালো। আবার বলে উঠলাম
- আচ্ছা চলুন একটা খেলা খেলি।
- কি খেলা? সন্দিগ্ধ চোখে প্রশ্ন করলো মেয়েটা।
- তেমন কিছু না। আমি আপনি এভাবেই বসে থাকবো। যার লাভার আগে আসবে তার সামনে আমরা এক্স বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ডের অভিনয় করবো। দেখি আজ কার ব্রেকাপ হয়?
- আমি আপনার সাথে এসব আজগুবি খেলা খেলবোনা।
- কেন? ভয় পাচ্ছেন?
- জ্বি না ভয় পাচ্ছি না। আর তাছাড়া আমার বয়ফ্রেন্ড আমাকে অনেক বিলিভ করে।
উত্তরে কিছু না বলে আমি শুধু মুচকি হাসলাম। যার অর্থ ঐরাম কত বিলিভ দেখলাম ! মেয়েটা রীতিমত ক্ষেপে গেল - আপনি কি ভাবেন নিজেকে? ওকে ডান।
আমি এবারেও কিছু বল্লাম না। মুচকি হেসে পকেট থেকে দামী মোবাইলটা বের করলাম। মোবাইলটা আমার না কৌশিকের। আজকে একটু দরকার ছিল তাই এনেছি। একটু আগে একটা মিসড কল এসেছিল। আমি নাম্বারটায় পাল্টা মিসকল দিলাম। মিসকলে মিসকলে কাটাকাটি। একটু পরেই দরজা দিয়ে একটা ছেলে প্রবেশ করলো। আমাকে এবারেও বলে দিতে হলোনা এই ছেলের নাম নাঈম এবং ইনিই এলিনার উড বি ফিয়ান্সি। ছেলেটা আমাদের টেবিলের সামনে দাড়াতেই এলিনা আমার দিকে আকুতি নিয়ে তাকালো। আমি মুচকি হেসে খপ করে এলিনার হাতটা ধরে বলে উঠলাম
- তুমি প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেওনা। আমি তোমায় আজও ভালোবাসি।
এলিনা এতটা আশা করেনি| বেচারি কেপে উঠলো। কিছু বলার সুযোগই পেলোনা। তার আগেই নাঈম চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠলো - ওহ্ সরি এলিনা। তোমাদের মধ্যে আমি ভুল করে এসে পড়েছি। আমাদের মধ্যে কিন্তু কোনও রিলেশন নাই ভাইয়া।
শেষ কথাটা আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো নাইম। বলেই চলে গেলো। ও চলে যেতেই আমি হাতটা ছেড়ে দিলাম। এলিনার চোখে জল চলে এসচে। প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠলো
- কেন করলেন এইটা?
আমি কিছু না বলে উঠে দাড়ালাম। কুচকানো ফতুয়াটা টানতে টানতে বললাম
- ইট ওয়াজ জাস্ট এ গেইম। তবে মনে রাখবেন আল্লাহ যা করে মঙ্গলের জন্যেই করে।
বলেই আর দাড়ালাম না বেরিয়ে এলাম। নীচে নামতেই দেখলাম নাঈম দাড়ায়ে আছে। আমকে দেখতেই একগাল হাসি নিয়ে এগিয়ে এলো
- থ্যাঙ্কস ব্রো। ওয়েল ডান।
- থ্যাঙ্কস কেন? আমি তো টাকার জন্যে কাজটা করেছি। টাকাটা প্লিজ।
- ওহ ইয়েস। এই নিন।
বলেই তিনটা ৫০০ টাকার নোট এগিয়ে দিলো নাঈম। নোট তিনটা নিয়ে পকেটে পুরে হাটা ধরলাম। নাঈম ছেলেটার সাথে পরিচয় হয়েছে গতকাল। স্টলে বসে বসে সিগারেট দিয়ে চা খাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম - কালকেই কেন চিত্রার বার্থডে হতে হবে? পকেটে একশ টাকার মত আছে। মেয়েটা গিফটে একটা বড়সর টেডি চেয়ে বসেছে। নির্ঘাত সাত আটশ টাকার মামলা। এতো টাকা কোথ্থেকে আসবে? আমি বেশী ভাবতে পারিনা। আবার সিগারেট দিয়ে চা খাওয়ায় মনোনিবেশ করলাম। সিগারেট দিয়ে চা খাওয়ার এই ব্যাপারটা হুমায়ূন স্যারের বইয়ে পেয়েছি। বেশ ইন্টারেস্টিং একটা পদ্ধতি। প্রথমে সিগারেটে কয়েকটা টান দিয়ে ছাই ফেলানো যায় এমন অবস্থায় আনতে হবে। তারপর ছাইটুকু সহ সিগারেটটা চায়ের মাঝে ফেলে দিতে হবে। চায়ে সিগারেট সিগারেট একটা গন্ধ চলে আসবে। এই হল সিগারেট চা। আমি এর সাথে আরেকটু সংযোজন করেছি। সিগারেট ফেলে আবার একটা সিগারেট জ্বালিয়ে সিগারেট চা ও সিগারেট খাই। যাহোক আমি আয়েশ করে সিগারেট চা খাচ্ছি এমন সময় কৌশিক এলো। সাথে এই নাঈম ছোকরা। আমাকে নাঈমের সমূহ বিপদ সম্পর্কে জানানো হলো। ছেলেটা প্রেম করে ফেসে গেছে। মেয়েটা নাকি বিয়ে করার জন্যে পীড়াপিড়ি করছে। তার বাড়িতেও জানিয়েছে। তাকে ঘাড় থেকে নামাতে হবে। নাঈম সবকিছু বলার পর কৌশিক আবার বলে উঠলো
- দেখ দোস্ত তুই পারিস নাঈমের হেল্প করতে।
ভেবে দেখলাম সত্যিই তো এ ভারী অন্যায়। ছেলের অমতে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। এ তো ঠিক না। একদম ঠিক না। আরে বাবা প্রেম করেছিস করেছিস তা বলে বিয়ে করতে হবে? প্রেম থাকবে প্রেমের জায়গায় বিয়ে থাকবে বিয়ের জায়গায়। আমি রাজী হয়ে গেলাম। বললাম
- ফাও ফাও করতে পারবো না। আমার টাকার খুব দরকার।
- কত টাকা? মরিয়া হয়ে বলে উঠলো নাঈম।
আমি ভাবলাম ৮০০ টাকা চাইলে দরকষাকষি হয়ে ৫০০ তে নেমে যাবে। ওতে আমার কাজ হবেনা। কিছুটা বাড়িয়ে চাওয়া উচিত। তাই বললাম - ১০০০ টাকা। পারবেন দিতে?
ছেলেটা বাকা একটা হাসি দিয়ে বললো
- আমি আপনাকে ১৫০০ দেবো। আপনি তাও কাজটা করুন।
আমি কিছু বললাম না। শুধু একটা হাসি দিলাম। বাইরে সে হাসি কেমন ছিলো জানিনা তবে ভেতর থেকে কেন জানি মনে হল তিক্ত হাসি বেরুচ্ছে।
পকেটে এখন অনেক টাকা। একটা রিক্সা নেওয়াই যায়। অবশ্য অনেক সময় আছে। হাটাটাই উত্তম হবে। আমি হাটতে লাগলাম। হেটে হেটে সিটি সেন্টারে পৌছে গেলাম। এখানেই ভালো মানের পুতুল টুতুল পাওয়া যায়। আমি ভেতরে ঢুকলাম। পুতুলের দোকানেও এসি চলছে। এটাও এখানকার পুতুলের দামের একটা কারন হতে পারে। অনেক পুতুল সাজানো রয়েছে। আমি পুতুল দেখলাম আর প্রাইজ ট্যাগগুলো দেখতে লাগলাম। আমার একটাও পছন্দ হলোনা। অবশ্য না হওয়ারই কথা। যে রোজ ঠিকমত খেতে পারেনা তার. এতো দামী পুতুল পছন্দ হবে কেন? তার পছন্দ হবে খাবার দাবার। আমি পুতুল না কিনেই বেরিয়ে এলাম। আবার হাটতে লাগলাম হাটতে হাটতে পৌছে গেলাম চিত্রার বাড়িতে। বাড়িটা শুধু চিত্রারই। তার বাবা মা থাকে অন্য বাড়িতে। বাড়িতে অথিতিরা চলে এসচে। আমিও ঢুকে পড়লাম। আমি ঢুকতেই দেখলাম চিত্রাকে ঘিরে তার বন্ধু বান্ধবীরা দাড়িয়ে আছে। আমার চোখ আটকে গেলো দুজনের উপরে। একজনের নাম চিত্রা অন্যজনের নাম এলিনা। আমি এগিয়ে যেতেই চিত্রা বলে উঠলো
- আমার গিফট কই?
আমি কিছু বলার সুযোগ পেলাম না। তার আগেই এলিনা আমার পাশে চলে এলো। খপ করে হাত দুটো ধরে ফেললো।
- জান তুমি এখানে আসবা জানতাম না তো? চিত্রা তোমার কেমন বোন হয়?
এবারেও কিছু বলতে পেলাম না। যা বলার চিত্রাই বলে উঠলো - বেরিয়ে যা শয়তান কোথাকার।
আমি বেরিয়ে এলাম।
শুভ্র বেরিয়ে যেতেই চিত্রা এলিনাকে বলে উঠলো
- বড় বাচা বাচাইলি দোস্ত।
- তুই জানতি আমি মিথ্যে বলছি?
এলিনার চোখেমুখে বিস্ময়।
- আরে জানবো না ক্যান? ঐ হাভাইত্যা ছেলের সাথে কে প্রেম করবে। আমি তো টাইম পাস করতেসিলাম। আর তাছাড়া আমার নতুন বয়ফ্রেন্ড হইছে। ছেলেটার নাম সাগর। dslr ও আছে জানিস? আর এইটারে দেখ হাভাইত্যা। বার্থডে গিফটও আনেনাই। খালি গিলতে আসচে।
সব শুনে এলিনা একটা হাসি দিলো। তিক্ত হাসি। বেরিয়ে এলো বাইরে। শুভ্র ছেলেটা সবে গেটের কাছে পৌছেছে। ডাক দিলো এলিনা।
- শুভ্র সাহেব !
সবে গেটের কাছে পৌছেছি , পেছন থেকে ডাক শুনে থমকে গেলাম। ঘুরে দেখি এলিনা আসছে। কাছে আসতেই বলে উঠলো
- আপনার খেলাও তো শেষ হয়ে গেল শুভ্র সাহেব।
একটা হাসি দিয়ে আমিও বলে উঠলাম
- তা চিত্রা কত দিলো আপনাকে?
মেয়েটা থমকে গেলো। আমি হাটতে থাকলাম। হাটতে হাটতে যেখানে থামলাম সেই জায়গাটা আমার মেস। ব্যাচেলর মেস। আমি ভেতরে ঢুকলাম। আমার রুমমেট দিলদার ভাই এগিয়ে এলো।
- কই ছিলেন ভাই? আপনে কি দুপুরের মিল দিয়াই রাইতে চালাই দিবেন নাকি?
বলেই দিলদার ভাই হাসতে লাগলেন। আমিও হাসতে লাগলাম।
- দিলদার ভাই। আজকে একজনের উপকার করছি। সে মিলাদের জন্যে টাকা দিছে। কাল সকালে মিলাদ হওয়া চাই। দোয়া পড়া হবে তার উদ্দেশ্যে।
- কত টাকা ভাই এইবারে?
- ১৫০০। কাল গোস্ত আর বিরিয়ানি করার ব্যাবস্থা করবেন।
- জ্বী ভাইজান করবো। আপনে মাঝেমধ্যেই এমন ভালা কাম করেন ক্যামনে? লোকে ট্যাকাও দেয়। সব বড় বড় পার্টি আপনের ভাই।
আমি কিছু বললাম না। একটা শুকনো হাসি দিলাম শুধু।
পরিশিষ্ট :
মিলাদ শেষ। এবার আল্লাহকে শুকরিয়া করে মেসের সবাই খেতে বসবে। বহুদিন পর বিরিয়ানি আর গোস্তের ব্যাবস্থা হয়েছে। বহুদিন পরে সবাই আয়েশ করে খাবে। আমিও শুকরিয়া করতে লাগলাম। কারন আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যেই করেন।
দোয়া শেষে সবাই মিলে খেতে বসলাম। মুখে খাবার দেবো এমন সময় মেসের দরজা থেকে ডাক এলো
- শুভ্র সাহেব !
আমি একটু হেসে খাবার মুখে দিলাম আর ভাবতে লাগলাম এই দুনিয়ায় কি আসলেই কোনও খেলা শেষ হয়ে যায়? নাকি চলতে থাকে অনন্তকাল। ঘুরে ফিরে আমরাও বারবার হয়ে যাই খেলার অংশীদার অথচ বুঝতেও পারিনা এ খেলার শুরু শেষ কোথায়? এ খেলায় আমি কিকরে এলাম? কেউ একজন হয়তো বুঝতে দিতে চায়না। আমিও বুঝতে চাচ্ছিনা। থাক প্রকৃতির কিছু রহস্য অমিমাংসিত থেকেই যাক। আমরা শুধু রয়ে যাই কিছু শেষ না হওয়া খেলার অংশীদার হয়ে।=খেলা শেষ=
অনেক্ষন ধরেই বসে আছি রেস্টুরেন্টে| খাওয়ার টাকা নাই তাই কিছু অর্ডার করতে পারছি না। তবে এমন ভাব নিয়ে বারবার ঘড়ি দেখছি যেন কারও জন্য অপেক্ষা করছি। এলেই বিশাল মাপের একটা অর্ডার করে বসবো। ওয়েটাররা ঘুরঘুর করছে কিন্তু আমার হাবভাব দেখে কিছু বলতে পারছে না।
অবশ্য সত্যি বলতে অপেক্ষাই করছিলাম আমি। এতোক্ষনে তো চলে আসার কথা মেয়েটার। কিছুক্ষন পরেই ফোনটা গোঁ গোঁ করে উঠলো পকেটের ভেতরে। মিসড কল। একটু পরেই কচুপাতা রঙের একরঙা শাড়ি পড়া একটা মেয়ে ঢুকলো। আমাকে বলে দিতে হলোনা , এই মেয়ের নামই এলিনা। মেয়েটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে এদিক সেদিক তাকাতে লাগলো আর বাম হাত দিয়ে বারবার চুল ঠিক করতে লাগলো। ইদানিং বাম হাতে চুল ঠিক করাও এক ধরনের ফ্যাশন। আগে ডান হাতেই চুল ঠিক করার কাজ চালাতো মেয়েরা। তবে ইদানিং এই প্রাচীন ফ্যাশনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন ডান হাতে পার্স ধরে থাকতে হবে এবং চুল ঠিক করতে হবে বাম হাত দিয়ে। মেয়েটা অনেকক্ষন খোজাখুজি করে কাঙ্খিত ব্যাক্তিকে খুজে না পেয়ে একটা ফাকা টেবিলে বসে পড়লো। এবারে আমি আমার কাজ শুরু করলাম। পকেট থেকে একটা সেন্টার ফ্রেস বের করে মুখে পুড়লাম। সেন্টার ফ্রেশ মুখে দেয়ার যথেষ্ট কারন আছে। কোনও একটা গল্পে পড়েছিলাম মুখে চালবাজ লুক আনতে চুয়িংগামের চেয়ে ভালো আর কোনও দাওয়াই নেই। আর আমি এখন যে কাজটা করতে যাচ্ছি তাতে চালবাজ লুকটার অত্যন্ত প্রয়োজন। আমি চুয়িংগাম চিবুতে চিবুতে নিজের টেবিল ছেড়ে মেয়েটার টেবিলে গিয়ে বসে পড়লাম। মেয়েটা দরজার দিকে মুখ ঘুড়িয়ে ছিলো। মুখ ঘুড়িয়ে আমাকে দেখেই আঁতকে উঠলো
- একি ! আপনি এখানে বসে পড়লেন কেন?
মেয়েটার আঁতকা উতকিতে না গিয়ে আমি ইতিউতি তাকাতে তাকাতে বলে উঠলাম
- আমার নাম শুভ্র। আপনার নাম কি?
- আমি আপনাকে আমার নাম বলতে যাবো কেন? ভ্রু কুচকে পাল্টা প্রশ্ন করলো মেয়েটা।
- আহা বলুনই না। বললে কোনও ক্ষতি আছে কি? যাহোক না বললে না বলবেন। অপেক্ষা করছেন কারও জন্যে? কে আসবে বান্ধবী বুঝি?
মেয়েটা আমার কথায় কুচকানো ভ্রু আরও কুচকে ফেললো। কিছুক্ষন পর হঠাৎ করেই মুখটা জ্বলজ্বল করে উঠলো যেন কিছু বুঝে ফেলেছে। আমি ঘাবড়ে গেলাম ধরে ফেললো নাকি রে বাবা। অবশ্য বেশীক্ষন অন্ধকারে থাকতে হলোনা। মেয়েটা নিজেই বলে উঠলো
- আপনি কি আমার সাথে ফ্লার্ট করার চেষ্টা করছেন? তাহলে শুনুন মিস্টার হোয়াটএভার আমি আমার বয়ফ্রেন্ডের জন্যে ওয়েট করতেসি। কাজেই আপনি আপনার রাস্তা মাপতে পারেন। আমি ফিতে টিতে আনিনি। কাজেই রাস্তা মাপায় কোনও আগ্রহ প্রকাশ করলাম না। আবার একটা চালবাজ টাইপের হাসি দিয়ে বলে উঠলাম
- আমিও আমার গার্লফ্রেন্ডের জন্যে ওয়েট করতেসি। আসছেই না তাই ভাবলাম আপনার সাথে একটু গল্প করি। কতদিনের রিলেশন আপনাদের?
মেয়েটার সন্দেহ তাও দূর হলোনা - অনেক দিনের। রিলেশনটার ব্যাপারে বাসাতেও জানিয়েছি। আজকে ওকে বাবার সাথে মিট করাতে নিয়ে যাবো।
- আপনার বাবা এতো সহজে মেনে নিলেন? খুব সহজ সরল লোক বুঝি? কি করেন উনি?
এবারে মেয়েটা একটা চালবাজ টাইপের হাসি দিলো - আমার বাবা আর্মিতে আছেন। কর্নেল পজিশনে।
কর্নেল শুনেই আমার চালবাজি গায়েব হয়ে গেলো। চুইংগামটা কোত করে গিলে ফেললাম। গলায় আটকে গেলো। গ্লাস থেকে জল গিলে তবেই সেটা পেটে চালান করা গেলো। আমার দিকে তাকিয়ে মেয়েটা আবার চালবাজি হাসি দিলো - কি হলো শুভ্র সাহেব কর্নেল শুনেই গলা শুকিয়ে গেলো?
দেখলাম আমাকে ভীরু বলে অপমান করা হচ্ছে। একটা যোগ্য উত্তর দেয়া উচিত। বললাম - জ্বি না| আমার চুয়িংগামটা শুকিয়ে গেছে তাই পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিলাম।
বলেই ফাকা মুখটাই নাড়াতে লাগলাম। চুয়িংগাম ভিজিয়ে চাবাতে দেখে মেয়েটা এমনভাবে তাকালো যেনো আমি কাচা গু জলে ভিজিয়ে চিবুচ্ছি। আমি ব্যাপারটা গায়ে মাখলাম না। কাচা গু গায়ে না মাখাই ভালো। আবার বলে উঠলাম
- আচ্ছা চলুন একটা খেলা খেলি।
- কি খেলা? সন্দিগ্ধ চোখে প্রশ্ন করলো মেয়েটা।
- তেমন কিছু না। আমি আপনি এভাবেই বসে থাকবো। যার লাভার আগে আসবে তার সামনে আমরা এক্স বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ডের অভিনয় করবো। দেখি আজ কার ব্রেকাপ হয়?
- আমি আপনার সাথে এসব আজগুবি খেলা খেলবোনা।
- কেন? ভয় পাচ্ছেন?
- জ্বি না ভয় পাচ্ছি না। আর তাছাড়া আমার বয়ফ্রেন্ড আমাকে অনেক বিলিভ করে।
উত্তরে কিছু না বলে আমি শুধু মুচকি হাসলাম। যার অর্থ ঐরাম কত বিলিভ দেখলাম ! মেয়েটা রীতিমত ক্ষেপে গেল - আপনি কি ভাবেন নিজেকে? ওকে ডান।
আমি এবারেও কিছু বল্লাম না। মুচকি হেসে পকেট থেকে দামী মোবাইলটা বের করলাম। মোবাইলটা আমার না কৌশিকের। আজকে একটু দরকার ছিল তাই এনেছি। একটু আগে একটা মিসড কল এসেছিল। আমি নাম্বারটায় পাল্টা মিসকল দিলাম। মিসকলে মিসকলে কাটাকাটি। একটু পরেই দরজা দিয়ে একটা ছেলে প্রবেশ করলো। আমাকে এবারেও বলে দিতে হলোনা এই ছেলের নাম নাঈম এবং ইনিই এলিনার উড বি ফিয়ান্সি। ছেলেটা আমাদের টেবিলের সামনে দাড়াতেই এলিনা আমার দিকে আকুতি নিয়ে তাকালো। আমি মুচকি হেসে খপ করে এলিনার হাতটা ধরে বলে উঠলাম
- তুমি প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেওনা। আমি তোমায় আজও ভালোবাসি।
এলিনা এতটা আশা করেনি| বেচারি কেপে উঠলো। কিছু বলার সুযোগই পেলোনা। তার আগেই নাঈম চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠলো - ওহ্ সরি এলিনা। তোমাদের মধ্যে আমি ভুল করে এসে পড়েছি। আমাদের মধ্যে কিন্তু কোনও রিলেশন নাই ভাইয়া।
শেষ কথাটা আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো নাইম। বলেই চলে গেলো। ও চলে যেতেই আমি হাতটা ছেড়ে দিলাম। এলিনার চোখে জল চলে এসচে। প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠলো
- কেন করলেন এইটা?
আমি কিছু না বলে উঠে দাড়ালাম। কুচকানো ফতুয়াটা টানতে টানতে বললাম
- ইট ওয়াজ জাস্ট এ গেইম। তবে মনে রাখবেন আল্লাহ যা করে মঙ্গলের জন্যেই করে।
বলেই আর দাড়ালাম না বেরিয়ে এলাম। নীচে নামতেই দেখলাম নাঈম দাড়ায়ে আছে। আমকে দেখতেই একগাল হাসি নিয়ে এগিয়ে এলো
- থ্যাঙ্কস ব্রো। ওয়েল ডান।
- থ্যাঙ্কস কেন? আমি তো টাকার জন্যে কাজটা করেছি। টাকাটা প্লিজ।
- ওহ ইয়েস। এই নিন।
বলেই তিনটা ৫০০ টাকার নোট এগিয়ে দিলো নাঈম। নোট তিনটা নিয়ে পকেটে পুরে হাটা ধরলাম। নাঈম ছেলেটার সাথে পরিচয় হয়েছে গতকাল। স্টলে বসে বসে সিগারেট দিয়ে চা খাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম - কালকেই কেন চিত্রার বার্থডে হতে হবে? পকেটে একশ টাকার মত আছে। মেয়েটা গিফটে একটা বড়সর টেডি চেয়ে বসেছে। নির্ঘাত সাত আটশ টাকার মামলা। এতো টাকা কোথ্থেকে আসবে? আমি বেশী ভাবতে পারিনা। আবার সিগারেট দিয়ে চা খাওয়ায় মনোনিবেশ করলাম। সিগারেট দিয়ে চা খাওয়ার এই ব্যাপারটা হুমায়ূন স্যারের বইয়ে পেয়েছি। বেশ ইন্টারেস্টিং একটা পদ্ধতি। প্রথমে সিগারেটে কয়েকটা টান দিয়ে ছাই ফেলানো যায় এমন অবস্থায় আনতে হবে। তারপর ছাইটুকু সহ সিগারেটটা চায়ের মাঝে ফেলে দিতে হবে। চায়ে সিগারেট সিগারেট একটা গন্ধ চলে আসবে। এই হল সিগারেট চা। আমি এর সাথে আরেকটু সংযোজন করেছি। সিগারেট ফেলে আবার একটা সিগারেট জ্বালিয়ে সিগারেট চা ও সিগারেট খাই। যাহোক আমি আয়েশ করে সিগারেট চা খাচ্ছি এমন সময় কৌশিক এলো। সাথে এই নাঈম ছোকরা। আমাকে নাঈমের সমূহ বিপদ সম্পর্কে জানানো হলো। ছেলেটা প্রেম করে ফেসে গেছে। মেয়েটা নাকি বিয়ে করার জন্যে পীড়াপিড়ি করছে। তার বাড়িতেও জানিয়েছে। তাকে ঘাড় থেকে নামাতে হবে। নাঈম সবকিছু বলার পর কৌশিক আবার বলে উঠলো
- দেখ দোস্ত তুই পারিস নাঈমের হেল্প করতে।
ভেবে দেখলাম সত্যিই তো এ ভারী অন্যায়। ছেলের অমতে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। এ তো ঠিক না। একদম ঠিক না। আরে বাবা প্রেম করেছিস করেছিস তা বলে বিয়ে করতে হবে? প্রেম থাকবে প্রেমের জায়গায় বিয়ে থাকবে বিয়ের জায়গায়। আমি রাজী হয়ে গেলাম। বললাম
- ফাও ফাও করতে পারবো না। আমার টাকার খুব দরকার।
- কত টাকা? মরিয়া হয়ে বলে উঠলো নাঈম।
আমি ভাবলাম ৮০০ টাকা চাইলে দরকষাকষি হয়ে ৫০০ তে নেমে যাবে। ওতে আমার কাজ হবেনা। কিছুটা বাড়িয়ে চাওয়া উচিত। তাই বললাম - ১০০০ টাকা। পারবেন দিতে?
ছেলেটা বাকা একটা হাসি দিয়ে বললো
- আমি আপনাকে ১৫০০ দেবো। আপনি তাও কাজটা করুন।
আমি কিছু বললাম না। শুধু একটা হাসি দিলাম। বাইরে সে হাসি কেমন ছিলো জানিনা তবে ভেতর থেকে কেন জানি মনে হল তিক্ত হাসি বেরুচ্ছে।
পকেটে এখন অনেক টাকা। একটা রিক্সা নেওয়াই যায়। অবশ্য অনেক সময় আছে। হাটাটাই উত্তম হবে। আমি হাটতে লাগলাম। হেটে হেটে সিটি সেন্টারে পৌছে গেলাম। এখানেই ভালো মানের পুতুল টুতুল পাওয়া যায়। আমি ভেতরে ঢুকলাম। পুতুলের দোকানেও এসি চলছে। এটাও এখানকার পুতুলের দামের একটা কারন হতে পারে। অনেক পুতুল সাজানো রয়েছে। আমি পুতুল দেখলাম আর প্রাইজ ট্যাগগুলো দেখতে লাগলাম। আমার একটাও পছন্দ হলোনা। অবশ্য না হওয়ারই কথা। যে রোজ ঠিকমত খেতে পারেনা তার. এতো দামী পুতুল পছন্দ হবে কেন? তার পছন্দ হবে খাবার দাবার। আমি পুতুল না কিনেই বেরিয়ে এলাম। আবার হাটতে লাগলাম হাটতে হাটতে পৌছে গেলাম চিত্রার বাড়িতে। বাড়িটা শুধু চিত্রারই। তার বাবা মা থাকে অন্য বাড়িতে। বাড়িতে অথিতিরা চলে এসচে। আমিও ঢুকে পড়লাম। আমি ঢুকতেই দেখলাম চিত্রাকে ঘিরে তার বন্ধু বান্ধবীরা দাড়িয়ে আছে। আমার চোখ আটকে গেলো দুজনের উপরে। একজনের নাম চিত্রা অন্যজনের নাম এলিনা। আমি এগিয়ে যেতেই চিত্রা বলে উঠলো
- আমার গিফট কই?
আমি কিছু বলার সুযোগ পেলাম না। তার আগেই এলিনা আমার পাশে চলে এলো। খপ করে হাত দুটো ধরে ফেললো।
- জান তুমি এখানে আসবা জানতাম না তো? চিত্রা তোমার কেমন বোন হয়?
এবারেও কিছু বলতে পেলাম না। যা বলার চিত্রাই বলে উঠলো - বেরিয়ে যা শয়তান কোথাকার।
আমি বেরিয়ে এলাম।
শুভ্র বেরিয়ে যেতেই চিত্রা এলিনাকে বলে উঠলো
- বড় বাচা বাচাইলি দোস্ত।
- তুই জানতি আমি মিথ্যে বলছি?
এলিনার চোখেমুখে বিস্ময়।
- আরে জানবো না ক্যান? ঐ হাভাইত্যা ছেলের সাথে কে প্রেম করবে। আমি তো টাইম পাস করতেসিলাম। আর তাছাড়া আমার নতুন বয়ফ্রেন্ড হইছে। ছেলেটার নাম সাগর। dslr ও আছে জানিস? আর এইটারে দেখ হাভাইত্যা। বার্থডে গিফটও আনেনাই। খালি গিলতে আসচে।
সব শুনে এলিনা একটা হাসি দিলো। তিক্ত হাসি। বেরিয়ে এলো বাইরে। শুভ্র ছেলেটা সবে গেটের কাছে পৌছেছে। ডাক দিলো এলিনা।
- শুভ্র সাহেব !
সবে গেটের কাছে পৌছেছি , পেছন থেকে ডাক শুনে থমকে গেলাম। ঘুরে দেখি এলিনা আসছে। কাছে আসতেই বলে উঠলো
- আপনার খেলাও তো শেষ হয়ে গেল শুভ্র সাহেব।
একটা হাসি দিয়ে আমিও বলে উঠলাম
- তা চিত্রা কত দিলো আপনাকে?
মেয়েটা থমকে গেলো। আমি হাটতে থাকলাম। হাটতে হাটতে যেখানে থামলাম সেই জায়গাটা আমার মেস। ব্যাচেলর মেস। আমি ভেতরে ঢুকলাম। আমার রুমমেট দিলদার ভাই এগিয়ে এলো।
- কই ছিলেন ভাই? আপনে কি দুপুরের মিল দিয়াই রাইতে চালাই দিবেন নাকি?
বলেই দিলদার ভাই হাসতে লাগলেন। আমিও হাসতে লাগলাম।
- দিলদার ভাই। আজকে একজনের উপকার করছি। সে মিলাদের জন্যে টাকা দিছে। কাল সকালে মিলাদ হওয়া চাই। দোয়া পড়া হবে তার উদ্দেশ্যে।
- কত টাকা ভাই এইবারে?
- ১৫০০। কাল গোস্ত আর বিরিয়ানি করার ব্যাবস্থা করবেন।
- জ্বী ভাইজান করবো। আপনে মাঝেমধ্যেই এমন ভালা কাম করেন ক্যামনে? লোকে ট্যাকাও দেয়। সব বড় বড় পার্টি আপনের ভাই।
আমি কিছু বললাম না। একটা শুকনো হাসি দিলাম শুধু।
পরিশিষ্ট :
মিলাদ শেষ। এবার আল্লাহকে শুকরিয়া করে মেসের সবাই খেতে বসবে। বহুদিন পর বিরিয়ানি আর গোস্তের ব্যাবস্থা হয়েছে। বহুদিন পরে সবাই আয়েশ করে খাবে। আমিও শুকরিয়া করতে লাগলাম। কারন আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যেই করেন।
দোয়া শেষে সবাই মিলে খেতে বসলাম। মুখে খাবার দেবো এমন সময় মেসের দরজা থেকে ডাক এলো
- শুভ্র সাহেব !
আমি একটু হেসে খাবার মুখে দিলাম আর ভাবতে লাগলাম এই দুনিয়ায় কি আসলেই কোনও খেলা শেষ হয়ে যায়? নাকি চলতে থাকে অনন্তকাল। ঘুরে ফিরে আমরাও বারবার হয়ে যাই খেলার অংশীদার অথচ বুঝতেও পারিনা এ খেলার শুরু শেষ কোথায়? এ খেলায় আমি কিকরে এলাম? কেউ একজন হয়তো বুঝতে দিতে চায়না। আমিও বুঝতে চাচ্ছিনা। থাক প্রকৃতির কিছু রহস্য অমিমাংসিত থেকেই যাক। আমরা শুধু রয়ে যাই কিছু শেষ না হওয়া খেলার অংশীদার হয়ে।=খেলা শেষ=
অনেক্ষন ধরেই বসে আছি রেস্টুরেন্টে| খাওয়ার টাকা নাই তাই কিছু অর্ডার করতে পারছি না। তবে এমন ভাব নিয়ে বারবার ঘড়ি দেখছি যেন কারও জন্য অপেক্ষা করছি। এলেই বিশাল মাপের একটা অর্ডার করে বসবো। ওয়েটাররা ঘুরঘুর করছে কিন্তু আমার হাবভাব দেখে কিছু বলতে পারছে না।
অবশ্য সত্যি বলতে অপেক্ষাই করছিলাম আমি। এতোক্ষনে তো চলে আসার কথা মেয়েটার। কিছুক্ষন পরেই ফোনটা গোঁ গোঁ করে উঠলো পকেটের ভেতরে। মিসড কল। একটু পরেই কচুপাতা রঙের একরঙা শাড়ি পড়া একটা মেয়ে ঢুকলো। আমাকে বলে দিতে হলোনা , এই মেয়ের নামই এলিনা। মেয়েটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে এদিক সেদিক তাকাতে লাগলো আর বাম হাত দিয়ে বারবার চুল ঠিক করতে লাগলো। ইদানিং বাম হাতে চুল ঠিক করাও এক ধরনের ফ্যাশন। আগে ডান হাতেই চুল ঠিক করার কাজ চালাতো মেয়েরা। তবে ইদানিং এই প্রাচীন ফ্যাশনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন ডান হাতে পার্স ধরে থাকতে হবে এবং চুল ঠিক করতে হবে বাম হাত দিয়ে। মেয়েটা অনেকক্ষন খোজাখুজি করে কাঙ্খিত ব্যাক্তিকে খুজে না পেয়ে একটা ফাকা টেবিলে বসে পড়লো। এবারে আমি আমার কাজ শুরু করলাম। পকেট থেকে একটা সেন্টার ফ্রেস বের করে মুখে পুড়লাম। সেন্টার ফ্রেশ মুখে দেয়ার যথেষ্ট কারন আছে। কোনও একটা গল্পে পড়েছিলাম মুখে চালবাজ লুক আনতে চুয়িংগামের চেয়ে ভালো আর কোনও দাওয়াই নেই। আর আমি এখন যে কাজটা করতে যাচ্ছি তাতে চালবাজ লুকটার অত্যন্ত প্রয়োজন। আমি চুয়িংগাম চিবুতে চিবুতে নিজের টেবিল ছেড়ে মেয়েটার টেবিলে গিয়ে বসে পড়লাম। মেয়েটা দরজার দিকে মুখ ঘুড়িয়ে ছিলো। মুখ ঘুড়িয়ে আমাকে দেখেই আঁতকে উঠলো
- একি ! আপনি এখানে বসে পড়লেন কেন?
মেয়েটার আঁতকা উতকিতে না গিয়ে আমি ইতিউতি তাকাতে তাকাতে বলে উঠলাম
- আমার নাম শুভ্র। আপনার নাম কি?
- আমি আপনাকে আমার নাম বলতে যাবো কেন? ভ্রু কুচকে পাল্টা প্রশ্ন করলো মেয়েটা।
- আহা বলুনই না। বললে কোনও ক্ষতি আছে কি? যাহোক না বললে না বলবেন। অপেক্ষা করছেন কারও জন্যে? কে আসবে বান্ধবী বুঝি?
মেয়েটা আমার কথায় কুচকানো ভ্রু আরও কুচকে ফেললো। কিছুক্ষন পর হঠাৎ করেই মুখটা জ্বলজ্বল করে উঠলো যেন কিছু বুঝে ফেলেছে। আমি ঘাবড়ে গেলাম ধরে ফেললো নাকি রে বাবা। অবশ্য বেশীক্ষন অন্ধকারে থাকতে হলোনা। মেয়েটা নিজেই বলে উঠলো
- আপনি কি আমার সাথে ফ্লার্ট করার চেষ্টা করছেন? তাহলে শুনুন মিস্টার হোয়াটএভার আমি আমার বয়ফ্রেন্ডের জন্যে ওয়েট করতেসি। কাজেই আপনি আপনার রাস্তা মাপতে পারেন। আমি ফিতে টিতে আনিনি। কাজেই রাস্তা মাপায় কোনও আগ্রহ প্রকাশ করলাম না। আবার একটা চালবাজ টাইপের হাসি দিয়ে বলে উঠলাম
- আমিও আমার গার্লফ্রেন্ডের জন্যে ওয়েট করতেসি। আসছেই না তাই ভাবলাম আপনার সাথে একটু গল্প করি। কতদিনের রিলেশন আপনাদের?
মেয়েটার সন্দেহ তাও দূর হলোনা - অনেক দিনের। রিলেশনটার ব্যাপারে বাসাতেও জানিয়েছি। আজকে ওকে বাবার সাথে মিট করাতে নিয়ে যাবো।
- আপনার বাবা এতো সহজে মেনে নিলেন? খুব সহজ সরল লোক বুঝি? কি করেন উনি?
এবারে মেয়েটা একটা চালবাজ টাইপের হাসি দিলো - আমার বাবা আর্মিতে আছেন। কর্নেল পজিশনে।
কর্নেল শুনেই আমার চালবাজি গায়েব হয়ে গেলো। চুইংগামটা কোত করে গিলে ফেললাম। গলায় আটকে গেলো। গ্লাস থেকে জল গিলে তবেই সেটা পেটে চালান করা গেলো। আমার দিকে তাকিয়ে মেয়েটা আবার চালবাজি হাসি দিলো - কি হলো শুভ্র সাহেব কর্নেল শুনেই গলা শুকিয়ে গেলো?
দেখলাম আমাকে ভীরু বলে অপমান করা হচ্ছে। একটা যোগ্য উত্তর দেয়া উচিত। বললাম - জ্বি না| আমার চুয়িংগামটা শুকিয়ে গেছে তাই পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিলাম।
বলেই ফাকা মুখটাই নাড়াতে লাগলাম। চুয়িংগাম ভিজিয়ে চাবাতে দেখে মেয়েটা এমনভাবে তাকালো যেনো আমি কাচা গু জলে ভিজিয়ে চিবুচ্ছি। আমি ব্যাপারটা গায়ে মাখলাম না। কাচা গু গায়ে না মাখাই ভালো। আবার বলে উঠলাম
- আচ্ছা চলুন একটা খেলা খেলি।
- কি খেলা? সন্দিগ্ধ চোখে প্রশ্ন করলো মেয়েটা।
- তেমন কিছু না। আমি আপনি এভাবেই বসে থাকবো। যার লাভার আগে আসবে তার সামনে আমরা এক্স বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ডের অভিনয় করবো। দেখি আজ কার ব্রেকাপ হয়?
- আমি আপনার সাথে এসব আজগুবি খেলা খেলবোনা।
- কেন? ভয় পাচ্ছেন?
- জ্বি না ভয় পাচ্ছি না। আর তাছাড়া আমার বয়ফ্রেন্ড আমাকে অনেক বিলিভ করে।
উত্তরে কিছু না বলে আমি শুধু মুচকি হাসলাম। যার অর্থ ঐরাম কত বিলিভ দেখলাম ! মেয়েটা রীতিমত ক্ষেপে গেল - আপনি কি ভাবেন নিজেকে? ওকে ডান।
আমি এবারেও কিছু বল্লাম না। মুচকি হেসে পকেট থেকে দামী মোবাইলটা বের করলাম। মোবাইলটা আমার না কৌশিকের। আজকে একটু দরকার ছিল তাই এনেছি। একটু আগে একটা মিসড কল এসেছিল। আমি নাম্বারটায় পাল্টা মিসকল দিলাম। মিসকলে মিসকলে কাটাকাটি। একটু পরেই দরজা দিয়ে একটা ছেলে প্রবেশ করলো। আমাকে এবারেও বলে দিতে হলোনা এই ছেলের নাম নাঈম এবং ইনিই এলিনার উড বি ফিয়ান্সি। ছেলেটা আমাদের টেবিলের সামনে দাড়াতেই এলিনা আমার দিকে আকুতি নিয়ে তাকালো। আমি মুচকি হেসে খপ করে এলিনার হাতটা ধরে বলে উঠলাম
- তুমি প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেওনা। আমি তোমায় আজও ভালোবাসি।
এলিনা এতটা আশা করেনি| বেচারি কেপে উঠলো। কিছু বলার সুযোগই পেলোনা। তার আগেই নাঈম চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠলো - ওহ্ সরি এলিনা। তোমাদের মধ্যে আমি ভুল করে এসে পড়েছি। আমাদের মধ্যে কিন্তু কোনও রিলেশন নাই ভাইয়া।
শেষ কথাটা আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো নাইম। বলেই চলে গেলো। ও চলে যেতেই আমি হাতটা ছেড়ে দিলাম। এলিনার চোখে জল চলে এসচে। প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠলো
- কেন করলেন এইটা?
আমি কিছু না বলে উঠে দাড়ালাম। কুচকানো ফতুয়াটা টানতে টানতে বললাম
- ইট ওয়াজ জাস্ট এ গেইম। তবে মনে রাখবেন আল্লাহ যা করে মঙ্গলের জন্যেই করে।
বলেই আর দাড়ালাম না বেরিয়ে এলাম। নীচে নামতেই দেখলাম নাঈম দাড়ায়ে আছে। আমকে দেখতেই একগাল হাসি নিয়ে এগিয়ে এলো
- থ্যাঙ্কস ব্রো। ওয়েল ডান।
- থ্যাঙ্কস কেন? আমি তো টাকার জন্যে কাজটা করেছি। টাকাটা প্লিজ।
- ওহ ইয়েস। এই নিন।
বলেই তিনটা ৫০০ টাকার নোট এগিয়ে দিলো নাঈম। নোট তিনটা নিয়ে পকেটে পুরে হাটা ধরলাম। নাঈম ছেলেটার সাথে পরিচয় হয়েছে গতকাল। স্টলে বসে বসে সিগারেট দিয়ে চা খাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম - কালকেই কেন চিত্রার বার্থডে হতে হবে? পকেটে একশ টাকার মত আছে। মেয়েটা গিফটে একটা বড়সর টেডি চেয়ে বসেছে। নির্ঘাত সাত আটশ টাকার মামলা। এতো টাকা কোথ্থেকে আসবে? আমি বেশী ভাবতে পারিনা। আবার সিগারেট দিয়ে চা খাওয়ায় মনোনিবেশ করলাম। সিগারেট দিয়ে চা খাওয়ার এই ব্যাপারটা হুমায়ূন স্যারের বইয়ে পেয়েছি। বেশ ইন্টারেস্টিং একটা পদ্ধতি। প্রথমে সিগারেটে কয়েকটা টান দিয়ে ছাই ফেলানো যায় এমন অবস্থায় আনতে হবে। তারপর ছাইটুকু সহ সিগারেটটা চায়ের মাঝে ফেলে দিতে হবে। চায়ে সিগারেট সিগারেট একটা গন্ধ চলে আসবে। এই হল সিগারেট চা। আমি এর সাথে আরেকটু সংযোজন করেছি। সিগারেট ফেলে আবার একটা সিগারেট জ্বালিয়ে সিগারেট চা ও সিগারেট খাই। যাহোক আমি আয়েশ করে সিগারেট চা খাচ্ছি এমন সময় কৌশিক এলো। সাথে এই নাঈম ছোকরা। আমাকে নাঈমের সমূহ বিপদ সম্পর্কে জানানো হলো। ছেলেটা প্রেম করে ফেসে গেছে। মেয়েটা নাকি বিয়ে করার জন্যে পীড়াপিড়ি করছে। তার বাড়িতেও জানিয়েছে। তাকে ঘাড় থেকে নামাতে হবে। নাঈম সবকিছু বলার পর কৌশিক আবার বলে উঠলো
- দেখ দোস্ত তুই পারিস নাঈমের হেল্প করতে।
ভেবে দেখলাম সত্যিই তো এ ভারী অন্যায়। ছেলের অমতে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। এ তো ঠিক না। একদম ঠিক না। আরে বাবা প্রেম করেছিস করেছিস তা বলে বিয়ে করতে হবে? প্রেম থাকবে প্রেমের জায়গায় বিয়ে থাকবে বিয়ের জায়গায়। আমি রাজী হয়ে গেলাম। বললাম
- ফাও ফাও করতে পারবো না। আমার টাকার খুব দরকার।
- কত টাকা? মরিয়া হয়ে বলে উঠলো নাঈম।
আমি ভাবলাম ৮০০ টাকা চাইলে দরকষাকষি হয়ে ৫০০ তে নেমে যাবে। ওতে আমার কাজ হবেনা। কিছুটা বাড়িয়ে চাওয়া উচিত। তাই বললাম - ১০০০ টাকা। পারবেন দিতে?
ছেলেটা বাকা একটা হাসি দিয়ে বললো
- আমি আপনাকে ১৫০০ দেবো। আপনি তাও কাজটা করুন।
আমি কিছু বললাম না। শুধু একটা হাসি দিলাম। বাইরে সে হাসি কেমন ছিলো জানিনা তবে ভেতর থেকে কেন জানি মনে হল তিক্ত হাসি বেরুচ্ছে।
পকেটে এখন অনেক টাকা। একটা রিক্সা নেওয়াই যায়। অবশ্য অনেক সময় আছে। হাটাটাই উত্তম হবে। আমি হাটতে লাগলাম। হেটে হেটে সিটি সেন্টারে পৌছে গেলাম। এখানেই ভালো মানের পুতুল টুতুল পাওয়া যায়। আমি ভেতরে ঢুকলাম। পুতুলের দোকানেও এসি চলছে। এটাও এখানকার পুতুলের দামের একটা কারন হতে পারে। অনেক পুতুল সাজানো রয়েছে। আমি পুতুল দেখলাম আর প্রাইজ ট্যাগগুলো দেখতে লাগলাম। আমার একটাও পছন্দ হলোনা। অবশ্য না হওয়ারই কথা। যে রোজ ঠিকমত খেতে পারেনা তার. এতো দামী পুতুল পছন্দ হবে কেন? তার পছন্দ হবে খাবার দাবার। আমি পুতুল না কিনেই বেরিয়ে এলাম। আবার হাটতে লাগলাম হাটতে হাটতে পৌছে গেলাম চিত্রার বাড়িতে। বাড়িটা শুধু চিত্রারই। তার বাবা মা থাকে অন্য বাড়িতে। বাড়িতে অথিতিরা চলে এসচে। আমিও ঢুকে পড়লাম। আমি ঢুকতেই দেখলাম চিত্রাকে ঘিরে তার বন্ধু বান্ধবীরা দাড়িয়ে আছে। আমার চোখ আটকে গেলো দুজনের উপরে। একজনের নাম চিত্রা অন্যজনের নাম এলিনা। আমি এগিয়ে যেতেই চিত্রা বলে উঠলো
- আমার গিফট কই?
আমি কিছু বলার সুযোগ পেলাম না। তার আগেই এলিনা আমার পাশে চলে এলো। খপ করে হাত দুটো ধরে ফেললো।
- জান তুমি এখানে আসবা জানতাম না তো? চিত্রা তোমার কেমন বোন হয়?
এবারেও কিছু বলতে পেলাম না। যা বলার চিত্রাই বলে উঠলো - বেরিয়ে যা শয়তান কোথাকার।
আমি বেরিয়ে এলাম।
শুভ্র বেরিয়ে যেতেই চিত্রা এলিনাকে বলে উঠলো
- বড় বাচা বাচাইলি দোস্ত।
- তুই জানতি আমি মিথ্যে বলছি?
এলিনার চোখেমুখে বিস্ময়।
- আরে জানবো না ক্যান? ঐ হাভাইত্যা ছেলের সাথে কে প্রেম করবে। আমি তো টাইম পাস করতেসিলাম। আর তাছাড়া আমার নতুন বয়ফ্রেন্ড হইছে। ছেলেটার নাম সাগর। dslr ও আছে জানিস? আর এইটারে দেখ হাভাইত্যা। বার্থডে গিফটও আনেনাই। খালি গিলতে আসচে।
সব শুনে এলিনা একটা হাসি দিলো। তিক্ত হাসি। বেরিয়ে এলো বাইরে। শুভ্র ছেলেটা সবে গেটের কাছে পৌছেছে। ডাক দিলো এলিনা।
- শুভ্র সাহেব !
সবে গেটের কাছে পৌছেছি , পেছন থেকে ডাক শুনে থমকে গেলাম। ঘুরে দেখি এলিনা আসছে। কাছে আসতেই বলে উঠলো
- আপনার খেলাও তো শেষ হয়ে গেল শুভ্র সাহেব।
একটা হাসি দিয়ে আমিও বলে উঠলাম
- তা চিত্রা কত দিলো আপনাকে?
মেয়েটা থমকে গেলো। আমি হাটতে থাকলাম। হাটতে হাটতে যেখানে থামলাম সেই জায়গাটা আমার মেস। ব্যাচেলর মেস। আমি ভেতরে ঢুকলাম। আমার রুমমেট দিলদার ভাই এগিয়ে এলো।
- কই ছিলেন ভাই? আপনে কি দুপুরের মিল দিয়াই রাইতে চালাই দিবেন নাকি?
বলেই দিলদার ভাই হাসতে লাগলেন। আমিও হাসতে লাগলাম।
- দিলদার ভাই। আজকে একজনের উপকার করছি। সে মিলাদের জন্যে টাকা দিছে। কাল সকালে মিলাদ হওয়া চাই। দোয়া পড়া হবে তার উদ্দেশ্যে।
- কত টাকা ভাই এইবারে?
- ১৫০০। কাল গোস্ত আর বিরিয়ানি করার ব্যাবস্থা করবেন।
- জ্বী ভাইজান করবো। আপনে মাঝেমধ্যেই এমন ভালা কাম করেন ক্যামনে? লোকে ট্যাকাও দেয়। সব বড় বড় পার্টি আপনের ভাই।
আমি কিছু বললাম না। একটা শুকনো হাসি দিলাম শুধু।
পরিশিষ্ট :
মিলাদ শেষ। এবার আল্লাহকে শুকরিয়া করে মেসের সবাই খেতে বসবে। বহুদিন পর বিরিয়ানি আর গোস্তের ব্যাবস্থা হয়েছে। বহুদিন পরে সবাই আয়েশ করে খাবে। আমিও শুকরিয়া করতে লাগলাম। কারন আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যেই করেন।
দোয়া শেষে সবাই মিলে খেতে বসলাম। মুখে খাবার দেবো এমন সময় মেসের দরজা থেকে ডাক এলো
- শুভ্র সাহেব !
আমি একটু হেসে খাবার মুখে দিলাম আর ভাবতে লাগলাম এই দুনিয়ায় কি আসলেই কোনও খেলা শেষ হয়ে যায়? নাকি চলতে থাকে অনন্তকাল। ঘুরে ফিরে আমরাও বারবার হয়ে যাই খেলার অংশীদার অথচ বুঝতেও পারিনা এ খেলার শুরু শেষ কোথায়? এ খেলায় আমি কিকরে এলাম? কেউ একজন হয়তো বুঝতে দিতে চায়না। আমিও বুঝতে চাচ্ছিনা। থাক প্রকৃতির কিছু রহস্য অমিমাংসিত থেকেই যাক। আমরা শুধু রয়ে যাই কিছু শেষ না হওয়া খেলার অংশীদার হয়ে।=খেলা শেষ=
অনেক্ষন ধরেই বসে আছি রেস্টুরেন্টে| খাওয়ার টাকা নাই তাই কিছু অর্ডার করতে পারছি না। তবে এমন ভাব নিয়ে বারবার ঘড়ি দেখছি যেন কারও জন্য অপেক্ষা করছি। এলেই বিশাল মাপের একটা অর্ডার করে বসবো। ওয়েটাররা ঘুরঘুর করছে কিন্তু আমার হাবভাব দেখে কিছু বলতে পারছে না।
অবশ্য সত্যি বলতে অপেক্ষাই করছিলাম আমি। এতোক্ষনে তো চলে আসার কথা মেয়েটার। কিছুক্ষন পরেই ফোনটা গোঁ গোঁ করে উঠলো পকেটের ভেতরে। মিসড কল। একটু পরেই কচুপাতা রঙের একরঙা শাড়ি পড়া একটা মেয়ে ঢুকলো। আমাকে বলে দিতে হলোনা , এই মেয়ের নামই এলিনা। মেয়েটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে এদিক সেদিক তাকাতে লাগলো আর বাম হাত দিয়ে বারবার চুল ঠিক করতে লাগলো। ইদানিং বাম হাতে চুল ঠিক করাও এক ধরনের ফ্যাশন। আগে ডান হাতেই চুল ঠিক করার কাজ চালাতো মেয়েরা। তবে ইদানিং এই প্রাচীন ফ্যাশনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন ডান হাতে পার্স ধরে থাকতে হবে এবং চুল ঠিক করতে হবে বাম হাত দিয়ে। মেয়েটা অনেকক্ষন খোজাখুজি করে কাঙ্খিত ব্যাক্তিকে খুজে না পেয়ে একটা ফাকা টেবিলে বসে পড়লো। এবারে আমি আমার কাজ শুরু করলাম। পকেট থেকে একটা সেন্টার ফ্রেস বের করে মুখে পুড়লাম। সেন্টার ফ্রেশ মুখে দেয়ার যথেষ্ট কারন আছে। কোনও একটা গল্পে পড়েছিলাম মুখে চালবাজ লুক আনতে চুয়িংগামের চেয়ে ভালো আর কোনও দাওয়াই নেই। আর আমি এখন যে কাজটা করতে যাচ্ছি তাতে চালবাজ লুকটার অত্যন্ত প্রয়োজন। আমি চুয়িংগাম চিবুতে চিবুতে নিজের টেবিল ছেড়ে মেয়েটার টেবিলে গিয়ে বসে পড়লাম। মেয়েটা দরজার দিকে মুখ ঘুড়িয়ে ছিলো। মুখ ঘুড়িয়ে আমাকে দেখেই আঁতকে উঠলো
- একি ! আপনি এখানে বসে পড়লেন কেন?
মেয়েটার আঁতকা উতকিতে না গিয়ে আমি ইতিউতি তাকাতে তাকাতে বলে উঠলাম
- আমার নাম শুভ্র। আপনার নাম কি?
- আমি আপনাকে আমার নাম বলতে যাবো কেন? ভ্রু কুচকে পাল্টা প্রশ্ন করলো মেয়েটা।
- আহা বলুনই না। বললে কোনও ক্ষতি আছে কি? যাহোক না বললে না বলবেন। অপেক্ষা করছেন কারও জন্যে? কে আসবে বান্ধবী বুঝি?
মেয়েটা আমার কথায় কুচকানো ভ্রু আরও কুচকে ফেললো। কিছুক্ষন পর হঠাৎ করেই মুখটা জ্বলজ্বল করে উঠলো যেন কিছু বুঝে ফেলেছে। আমি ঘাবড়ে গেলাম ধরে ফেললো নাকি রে বাবা। অবশ্য বেশীক্ষন অন্ধকারে থাকতে হলোনা। মেয়েটা নিজেই বলে উঠলো
- আপনি কি আমার সাথে ফ্লার্ট করার চেষ্টা করছেন? তাহলে শুনুন মিস্টার হোয়াটএভার আমি আমার বয়ফ্রেন্ডের জন্যে ওয়েট করতেসি। কাজেই আপনি আপনার রাস্তা মাপতে পারেন। আমি ফিতে টিতে আনিনি। কাজেই রাস্তা মাপায় কোনও আগ্রহ প্রকাশ করলাম না। আবার একটা চালবাজ টাইপের হাসি দিয়ে বলে উঠলাম
- আমিও আমার গার্লফ্রেন্ডের জন্যে ওয়েট করতেসি। আসছেই না তাই ভাবলাম আপনার সাথে একটু গল্প করি। কতদিনের রিলেশন আপনাদের?
মেয়েটার সন্দেহ তাও দূর হলোনা - অনেক দিনের। রিলেশনটার ব্যাপারে বাসাতেও জানিয়েছি। আজকে ওকে বাবার সাথে মিট করাতে নিয়ে যাবো।
- আপনার বাবা এতো সহজে মেনে নিলেন? খুব সহজ সরল লোক বুঝি? কি করেন উনি?
এবারে মেয়েটা একটা চালবাজ টাইপের হাসি দিলো - আমার বাবা আর্মিতে আছেন। কর্নেল পজিশনে।
কর্নেল শুনেই আমার চালবাজি গায়েব হয়ে গেলো। চুইংগামটা কোত করে গিলে ফেললাম। গলায় আটকে গেলো। গ্লাস থেকে জল গিলে তবেই সেটা পেটে চালান করা গেলো। আমার দিকে তাকিয়ে মেয়েটা আবার চালবাজি হাসি দিলো - কি হলো শুভ্র সাহেব কর্নেল শুনেই গলা শুকিয়ে গেলো?
দেখলাম আমাকে ভীরু বলে অপমান করা হচ্ছে। একটা যোগ্য উত্তর দেয়া উচিত। বললাম - জ্বি না| আমার চুয়িংগামটা শুকিয়ে গেছে তাই পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিলাম।
বলেই ফাকা মুখটাই নাড়াতে লাগলাম। চুয়িংগাম ভিজিয়ে চাবাতে দেখে মেয়েটা এমনভাবে তাকালো যেনো আমি কাচা গু জলে ভিজিয়ে চিবুচ্ছি। আমি ব্যাপারটা গায়ে মাখলাম না। কাচা গু গায়ে না মাখাই ভালো। আবার বলে উঠলাম
- আচ্ছা চলুন একটা খেলা খেলি।
- কি খেলা? সন্দিগ্ধ চোখে প্রশ্ন করলো মেয়েটা।
- তেমন কিছু না। আমি আপনি এভাবেই বসে থাকবো। যার লাভার আগে আসবে তার সামনে আমরা এক্স বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ডের অভিনয় করবো। দেখি আজ কার ব্রেকাপ হয়?
- আমি আপনার সাথে এসব আজগুবি খেলা খেলবোনা।
- কেন? ভয় পাচ্ছেন?
- জ্বি না ভয় পাচ্ছি না। আর তাছাড়া আমার বয়ফ্রেন্ড আমাকে অনেক বিলিভ করে।
উত্তরে কিছু না বলে আমি শুধু মুচকি হাসলাম। যার অর্থ ঐরাম কত বিলিভ দেখলাম ! মেয়েটা রীতিমত ক্ষেপে গেল - আপনি কি ভাবেন নিজেকে? ওকে ডান।
আমি এবারেও কিছু বল্লাম না। মুচকি হেসে পকেট থেকে দামী মোবাইলটা বের করলাম। মোবাইলটা আমার না কৌশিকের। আজকে একটু দরকার ছিল তাই এনেছি। একটু আগে একটা মিসড কল এসেছিল। আমি নাম্বারটায় পাল্টা মিসকল দিলাম। মিসকলে মিসকলে কাটাকাটি। একটু পরেই দরজা দিয়ে একটা ছেলে প্রবেশ করলো। আমাকে এবারেও বলে দিতে হলোনা এই ছেলের নাম নাঈম এবং ইনিই এলিনার উড বি ফিয়ান্সি। ছেলেটা আমাদের টেবিলের সামনে দাড়াতেই এলিনা আমার দিকে আকুতি নিয়ে তাকালো। আমি মুচকি হেসে খপ করে এলিনার হাতটা ধরে বলে উঠলাম
- তুমি প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেওনা। আমি তোমায় আজও ভালোবাসি।
এলিনা এতটা আশা করেনি| বেচারি কেপে উঠলো। কিছু বলার সুযোগই পেলোনা। তার আগেই নাঈম চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠলো - ওহ্ সরি এলিনা। তোমাদের মধ্যে আমি ভুল করে এসে পড়েছি। আমাদের মধ্যে কিন্তু কোনও রিলেশন নাই ভাইয়া।
শেষ কথাটা আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো নাইম। বলেই চলে গেলো। ও চলে যেতেই আমি হাতটা ছেড়ে দিলাম। এলিনার চোখে জল চলে এসচে। প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠলো
- কেন করলেন এইটা?
আমি কিছু না বলে উঠে দাড়ালাম। কুচকানো ফতুয়াটা টানতে টানতে বললাম
- ইট ওয়াজ জাস্ট এ গেইম। তবে মনে রাখবেন আল্লাহ যা করে মঙ্গলের জন্যেই করে।
বলেই আর দাড়ালাম না বেরিয়ে এলাম। নীচে নামতেই দেখলাম নাঈম দাড়ায়ে আছে। আমকে দেখতেই একগাল হাসি নিয়ে এগিয়ে এলো
- থ্যাঙ্কস ব্রো। ওয়েল ডান।
- থ্যাঙ্কস কেন? আমি তো টাকার জন্যে কাজটা করেছি। টাকাটা প্লিজ।
- ওহ ইয়েস। এই নিন।
বলেই তিনটা ৫০০ টাকার নোট এগিয়ে দিলো নাঈম। নোট তিনটা নিয়ে পকেটে পুরে হাটা ধরলাম। নাঈম ছেলেটার সাথে পরিচয় হয়েছে গতকাল। স্টলে বসে বসে সিগারেট দিয়ে চা খাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম - কালকেই কেন চিত্রার বার্থডে হতে হবে? পকেটে একশ টাকার মত আছে। মেয়েটা গিফটে একটা বড়সর টেডি চেয়ে বসেছে। নির্ঘাত সাত আটশ টাকার মামলা। এতো টাকা কোথ্থেকে আসবে? আমি বেশী ভাবতে পারিনা। আবার সিগারেট দিয়ে চা খাওয়ায় মনোনিবেশ করলাম। সিগারেট দিয়ে চা খাওয়ার এই ব্যাপারটা হুমায়ূন স্যারের বইয়ে পেয়েছি। বেশ ইন্টারেস্টিং একটা পদ্ধতি। প্রথমে সিগারেটে কয়েকটা টান দিয়ে ছাই ফেলানো যায় এমন অবস্থায় আনতে হবে। তারপর ছাইটুকু সহ সিগারেটটা চায়ের মাঝে ফেলে দিতে হবে। চায়ে সিগারেট সিগারেট একটা গন্ধ চলে আসবে। এই হল সিগারেট চা। আমি এর সাথে আরেকটু সংযোজন করেছি। সিগারেট ফেলে আবার একটা সিগারেট জ্বালিয়ে সিগারেট চা ও সিগারেট খাই। যাহোক আমি আয়েশ করে সিগারেট চা খাচ্ছি এমন সময় কৌশিক এলো। সাথে এই নাঈম ছোকরা। আমাকে নাঈমের সমূহ বিপদ সম্পর্কে জানানো হলো। ছেলেটা প্রেম করে ফেসে গেছে। মেয়েটা নাকি বিয়ে করার জন্যে পীড়াপিড়ি করছে। তার বাড়িতেও জানিয়েছে। তাকে ঘাড় থেকে নামাতে হবে। নাঈম সবকিছু বলার পর কৌশিক আবার বলে উঠলো
- দেখ দোস্ত তুই পারিস নাঈমের হেল্প করতে।
ভেবে দেখলাম সত্যিই তো এ ভারী অন্যায়। ছেলের অমতে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। এ তো ঠিক না। একদম ঠিক না। আরে বাবা প্রেম করেছিস করেছিস তা বলে বিয়ে করতে হবে? প্রেম থাকবে প্রেমের জায়গায় বিয়ে থাকবে বিয়ের জায়গায়। আমি রাজী হয়ে গেলাম। বললাম
- ফাও ফাও করতে পারবো না। আমার টাকার খুব দরকার।
- কত টাকা? মরিয়া হয়ে বলে উঠলো নাঈম।
আমি ভাবলাম ৮০০ টাকা চাইলে দরকষাকষি হয়ে ৫০০ তে নেমে যাবে। ওতে আমার কাজ হবেনা। কিছুটা বাড়িয়ে চাওয়া উচিত। তাই বললাম - ১০০০ টাকা। পারবেন দিতে?
ছেলেটা বাকা একটা হাসি দিয়ে বললো
- আমি আপনাকে ১৫০০ দেবো। আপনি তাও কাজটা করুন।
আমি কিছু বললাম না। শুধু একটা হাসি দিলাম। বাইরে সে হাসি কেমন ছিলো জানিনা তবে ভেতর থেকে কেন জানি মনে হল তিক্ত হাসি বেরুচ্ছে।
পকেটে এখন অনেক টাকা। একটা রিক্সা নেওয়াই যায়। অবশ্য অনেক সময় আছে। হাটাটাই উত্তম হবে। আমি হাটতে লাগলাম। হেটে হেটে সিটি সেন্টারে পৌছে গেলাম। এখানেই ভালো মানের পুতুল টুতুল পাওয়া যায়। আমি ভেতরে ঢুকলাম। পুতুলের দোকানেও এসি চলছে। এটাও এখানকার পুতুলের দামের একটা কারন হতে পারে। অনেক পুতুল সাজানো রয়েছে। আমি পুতুল দেখলাম আর প্রাইজ ট্যাগগুলো দেখতে লাগলাম। আমার একটাও পছন্দ হলোনা। অবশ্য না হওয়ারই কথা। যে রোজ ঠিকমত খেতে পারেনা তার. এতো দামী পুতুল পছন্দ হবে কেন? তার পছন্দ হবে খাবার দাবার। আমি পুতুল না কিনেই বেরিয়ে এলাম। আবার হাটতে লাগলাম হাটতে হাটতে পৌছে গেলাম চিত্রার বাড়িতে। বাড়িটা শুধু চিত্রারই। তার বাবা মা থাকে অন্য বাড়িতে। বাড়িতে অথিতিরা চলে এসচে। আমিও ঢুকে পড়লাম। আমি ঢুকতেই দেখলাম চিত্রাকে ঘিরে তার বন্ধু বান্ধবীরা দাড়িয়ে আছে। আমার চোখ আটকে গেলো দুজনের উপরে। একজনের নাম চিত্রা অন্যজনের নাম এলিনা। আমি এগিয়ে যেতেই চিত্রা বলে উঠলো
- আমার গিফট কই?
আমি কিছু বলার সুযোগ পেলাম না। তার আগেই এলিনা আমার পাশে চলে এলো। খপ করে হাত দুটো ধরে ফেললো।
- জান তুমি এখানে আসবা জানতাম না তো? চিত্রা তোমার কেমন বোন হয়?
এবারেও কিছু বলতে পেলাম না। যা বলার চিত্রাই বলে উঠলো - বেরিয়ে যা শয়তান কোথাকার।
আমি বেরিয়ে এলাম।
শুভ্র বেরিয়ে যেতেই চিত্রা এলিনাকে বলে উঠলো
- বড় বাচা বাচাইলি দোস্ত।
- তুই জানতি আমি মিথ্যে বলছি?
এলিনার চোখেমুখে বিস্ময়।
- আরে জানবো না ক্যান? ঐ হাভাইত্যা ছেলের সাথে কে প্রেম করবে। আমি তো টাইম পাস করতেসিলাম। আর তাছাড়া আমার নতুন বয়ফ্রেন্ড হইছে। ছেলেটার নাম সাগর। dslr ও আছে জানিস? আর এইটারে দেখ হাভাইত্যা। বার্থডে গিফটও আনেনাই। খালি গিলতে আসচে।
সব শুনে এলিনা একটা হাসি দিলো। তিক্ত হাসি। বেরিয়ে এলো বাইরে। শুভ্র ছেলেটা সবে গেটের কাছে পৌছেছে। ডাক দিলো এলিনা।
- শুভ্র সাহেব !
সবে গেটের কাছে পৌছেছি , পেছন থেকে ডাক শুনে থমকে গেলাম। ঘুরে দেখি এলিনা আসছে। কাছে আসতেই বলে উঠলো
- আপনার খেলাও তো শেষ হয়ে গেল শুভ্র সাহেব।
একটা হাসি দিয়ে আমিও বলে উঠলাম
- তা চিত্রা কত দিলো আপনাকে?
মেয়েটা থমকে গেলো। আমি হাটতে থাকলাম। হাটতে হাটতে যেখানে থামলাম সেই জায়গাটা আমার মেস। ব্যাচেলর মেস। আমি ভেতরে ঢুকলাম। আমার রুমমেট দিলদার ভাই এগিয়ে এলো।
- কই ছিলেন ভাই? আপনে কি দুপুরের মিল দিয়াই রাইতে চালাই দিবেন নাকি?
বলেই দিলদার ভাই হাসতে লাগলেন। আমিও হাসতে লাগলাম।
- দিলদার ভাই। আজকে একজনের উপকার করছি। সে মিলাদের জন্যে টাকা দিছে। কাল সকালে মিলাদ হওয়া চাই। দোয়া পড়া হবে তার উদ্দেশ্যে।
- কত টাকা ভাই এইবারে?
- ১৫০০... কাল গোস্ত আর বিরিয়ানি করার ব্যাবস্থা করবেন।
- জ্বী ভাইজান করবো। আপনে মাঝেমধ্যেই এমন ভালা কাম করেন ক্যামনে? লোকে ট্যাকাও দেয়। সব বড় বড় পার্টি আপনের ভাই।
আমি কিছু বললাম না। একটা শুকনো হাসি দিলাম শুধু।
পরিশিষ্ট :
মিলাদ শেষ। এবার আল্লাহকে শুকরিয়া করে মেসের সবাই খেতে বসবে। বহুদিন পর বিরিয়ানি আর গোস্তের ব্যাবস্থা হয়েছে। বহুদিন পরে সবাই আয়েশ করে খাবে। আমিও শুকরিয়া করতে লাগলাম। কারন আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যেই করেন।
দোয়া শেষে সবাই মিলে খেতে বসলাম। মুখে খাবার দেবো এমন সময় মেসের দরজা থেকে ডাক এলো
- শুভ্র সাহেব !
আমি একটু হেসে খাবার মুখে দিলাম আর ভাবতে লাগলাম এই দুনিয়ায় কি আসলেই কোনও খেলা শেষ হয়ে যায়? নাকি চলতে থাকে অনন্তকাল। ঘুরে ফিরে আমরাও বারবার হয়ে যাই খেলার অংশীদার অথচ বুঝতেও পারিনা এ খেলার শুরু শেষ কোথায়? এ খেলায় আমি কিকরে এলাম? কেউ একজন হয়তো বুঝতে দিতে চায়না। আমিও বুঝতে চাচ্ছিনা। থাক প্রকৃতির কিছু রহস্য অমিমাংসিত থেকেই যাক। আমরা শুধু রয়ে যাই কিছু শেষ না হওয়া খেলার অংশীদার হয়ে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now