বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
গল্প/কবির মৃত্যু
মুহাম্মাদ হাফীজুর রাহমান
********************
চারদিকে গোলাগুলি হচ্ছিলো। এর মাঝখান থেকে জান বাজি রেখে ছুটতে হচ্ছে। টেনশনে মরে যাচ্ছি। অথচ সঙ্গী দুজনের যন্ত্রণায় অস্থির। সারাক্ষণ বক বক করেই চলেছে।
- এভাবে পালানো একদম উচিত হচ্ছেনা।
মুজাহিদ গর্জে উঠলো।
- ওহ হ্যাঁ তাইতো। চেষ্টা করলে এক কোম্পানি সৈন্য কে আমরা মারতেই পারি।
কাতেবও সমান জোরে মুখ ভেংচে বলল। মুজাহিদ জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকালো কাতেবের দিকে।
- শোভনের উচিত আমার সাথে যাওয়া।
- হ্যাঁ। তোমার কথা শুনে আত্মহত্যা করুক।
- আত্মহত্যা! ও শহীদ হবে।
- শহীদ? এটা কি ধর্ম যুদ্ধ হচ্ছে নাকি?
- নিজেকে বাঁচাতে যেয়ে মারা গেলেও শহীদ- যদি কেউ অন্যায় ভাবে মারতে আসে। আর এটা তো পুরো দেশকে বাঁচানো।।
- দেশ মারছে কে? কারা? বিদ্রোহীরা। বিদ্রোহীরাইতো ধ্বংস করছে দেশটা। ট্রেন লাইন খুলে ফেলছে- অস্ত্রাগারে হামলা করছে- থানা থেকে অস্ত্র নিচ্ছে।
- না নিয়ে যাবে কোথায়? সরকার কি শুরু করেছে দেখছোনা?
- কি শুরু করেছে শুনি? একদল লোক ক্ষমতায় আছে ব্যাস। কাউকে না কাউকে তো ক্ষমতায় থাকতেই হবে তাইনা? তোমার ওদের থেকে কোন দিক দিয়ে বেশী যোগ্য?
- আমরা সংখ্যা গরিষ্ঠ।
- সংখ্যাগরিষ্ঠ একপাল ছাগল।
- আর পশ্চিমের ওরা কি?
- ওরা কি বলো। তুমি ই বলো ওরা কি?
- ওদের কথা হচ্ছেনা। আমি বলছি মার্শাল আইনের কথা।
- এই সব বেশী বোঝো বলেইতো সমস্যা। খুন করছ আসলে তোমরা, যা বাঁচাবার সরকার বাঁচাচ্ছে।
- সরকার বাঁচাচ্ছে? পাইকারি হারে নারী শিশু খুন করে?
- কোথায় পাইকারি হারে নারী শিশু খুন হচ্ছে? ওগুলো মুক্তিযোদ্ধা নামের কাপুরুষ বিদ্রোহীগুলোর কাজ। ফালতু সন্ত্রাসীরা দেশটার বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে।
- শালা কে কাপুরুষ তা সবাই জানে। কোন রকম অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া ট্রেনিং প্রাপ্ত অফিসারদের সাথে লড়তে হচ্ছে। খাবার নাই, যান বাহন নাই।
- ভারত মাতাজীতো সাথে আছে। ওতেই চলবে।
- ভারত কিভাবে সাথে? বর্ডারের ওপার থেকে ওরা কি এমন করার সুযোগ পাচ্ছে? কত মানুষ অসহায়ের মতো ধুকছে। কোটি কোটি মানুষ খাওয়াতে হচ্ছে ওদের।
- ওপার থেকে যা করার ঠিকই করছে। দেশটা ভাগ করার কাজ ঠিকই করে ফেলেছে। ডাইনী বুড়িটা ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ বাধিয়েছে।
- ভাইয়ের সাথে লাগুক আর বাবার সাথেই লাগুক এখন তো বাঁচতে হবে- বাঁচাতে হবে। আগে পরিস্থিতি সামলাই। পরে দেখা যাবে কার দোষ। আর দেশ ভাগ? সেতো অনেক আগে থেকেই হয়ে আছে। ইংল্যান্ডই করেছে যা করার- এভাবে কোন দিন এক দেশ থাকা সম্ভব?
- সম্ভব না কেন? আরেক মহাদেশ থেকে ইংরেজরা আমাদের শাসন করেছে- পাকিস্তানীরা কি দোষ করলো? ওরা তো আমাদের কাছেই।
- আমরাই বা কি দোষ করলাম? আমাদের শাসনে সমস্যা কি?
- বাঙালীরা করবে শাসন! তাহলেই হয়েছে। চোরা বাঙালী শাসনের কি বোঝে? দেশের নব্বই ভাগই চোর।
- তাও ভালো। অন্যান্য দেশের তো শত ভাগই চোর। তারা কি নিজেদের নিজেরা শাসন করছে না?
- তা করুক। বাঙালী পারবেনা।
- পারতে হবে না। আমরা এখন আগে ওদের মোকাবেলা করি- প্রতিশোধ যা নেবার নেই। তারপর দেখা যাবে কে কি পারে আর না পারে।
- শোভনের আমার সাথেই যাওয়া উচিত।
- না। চেষ্টা করলে শোভন অনেক বড় লেখক হতে পারবে।
- ঘোড়ার ডিমের লেখক হবে। লেখালিখির ও জানেই বা কি পারেই বা কি?
- কিছু পারুক আর না পারুক ওর আগ্রহ আছে এই লাইনে। এইটাই অনেক।
- বাঁচলে লেখক হওয়া যাবে। আগে যুদ্ধে যাক। আল্লাহ ওকে শুধু লেখক হবার জন্য বানায় নি।
- এটা যুদ্ধ না। এটা আত্মহত্যার প্যাকেজ প্রোগ্রাম। শোভনের সামনে অনেক উজ্জ্বল সম্ভাবনা।
- দেশই থাকছেনা- উজ্জ্বল সম্ভাবনা। শোভনতো বাংলায় লেখে কিন্তু পশ্চিমের পিশাচরা আমাদের ঘাড়ে উর্দু চাপাচ্ছে।
- মোটেও উর্দু চাপাচ্ছে না। ফালতু কথা বলো না। অলিখিত ভাবে সব জায়গায় ইংরেজি হয়ে আছে। সেখানে উর্দু বসবে স্রেফ।
- সেখানে বাংলা বসবে। বাংলাভাষীর সংখ্যা উর্দুর উপরে।
- সেখানে বাংলা বসবে? কোন বাংলা শুনি? বরিশালের বাংলা নাকি সিলেটের?
- প্রমিত বাংলা।
- দেখো আমার থেকে ভালো বাংলা তুমি নিশ্চয়ই বোঝোনা। তুমি বোঝো কোস্তাকুস্তি। প্রমিত বাংলা মানে কলকাতার বাংলা, সেটা কি করে আমাদের মায়ের ভাষা হল? যদি মায়ের ভাষা দিতেই হয় তাহলে বরিশাল, সাতক্ষিরা, চিটাগাং এসবও দিতে হয় রাষ্ট্রভাষা। এই গুলি হল ফাইজলামী। কেউ কিছু বুঝবে না। দেশের সর্বত্র তখন বহু ভাষাবিদ রাখতে হবে। হিন্দুরাও লেখালিখির জন্য সাধু ভাষা আলাদা করে নিয়েছে। উর্দু হলে সমস্যা কোথায়?
- উর্দু হলে সমস্যা আছে। এজন্য আমাদের ছাত্ররা জীবন দিয়েছে।
- তাতে ছাগলের ডিম হয়েছে। এই আরেকটা ফাইজলামী। ধর্মীয় উস্কানি। দাঙ্গা বাধাবার আরেকটা ভারতী চেষ্টা। জানে এইভাবে ফুলাফুলি করলে ধর্মভীরু মুসলমান বিভ্রান্ত হয়ে যাবে। এইগুলা সব হিন্দুদের চাল।
- আমি ফুলের কথা বলছি না। আমি বলছি তাদের কথা যারা শহীদ হয়েছে।
-
- মোটেও শহীদ হয়নি। .. পাকা ছাত্ররা কিছু একটা পেলেই লাফায়। ভাষা নিয়ে লাফানোর কি ছিলো? শুধু শুধু লাফাতে যেয়ে গুলি খেয়েছে। এটা ছাত্রদের কোন কিছু না।
- তুমি একটু খেতে গুলি- দেখি না কেমন পারো। ঐ দিনটা আমাদের সামনে শিক্ষণীয়।
- শোনো যা করার করেছে পুলিশ। এটা শহীদ দিবস না হয়ে খুনি দিবস হওয়া উচিত। সবাই সরকারী পা চাঁটা পুলিশের জন্য ঝাড়ু মিছিল করতো। প্রভাতফেরীতে ফুল না নিয়ে ঝাড়ু নিয়ে থানার সামনে দিতো, তাহলে ঐ দিনের শিক্ষা কাজে লাগতো।
- শহীদ দিবস বলে পার পাচ্ছেনা, খুনি দিবস বানালে ওরা চুমু খেয়ে যাবে?
- তাই খেতো। তুমি তো ধর্মের বাইরে চলে গেলে। জায়গায় বেজায়গায় একটা শহীদ মিনার! এটা তো লাশ পূজা। মিনার পূজা। অথচ ঐ দিনের কোন নায়ক নেই, ছিলো শুধু কিছু ভিলেন। তাদের শাস্তি দেয়া উচিত। আর মারা যেয়ে বদমাশ ছাত্ররা শুধু টাকাপয়সা- আর গুলির অপচয় করেছে। ওদেরও শাস্তি হওয়া উচিত।
- নেশাখোরও তো এভাবে কথা বলে না?
- তুমি যুক্তিতে আসো। ধার্মিক হলে ধার্মিক হও- নাস্তিক হলে নাস্তিক। এই সব ফোলাফুলি করে কোন কিছুই হচ্ছেনা।
- আমি শোভনকে ফুল দিতে বলছি না। আমি শোভনকে যুদ্ধ করতে বলছি।
- কোথাও কোন যুদ্ধ নেই।
- কাতারে কাতারে বুদ্ধিজীবী মারা যাচ্ছে।
- মিথ্যা। ভারতীয় অপপ্রচার। ওরা আমাদের ক্ষেপীয়ে তুলছে। দেশ ভাগ হলে সবচাইতে লাভ বেশী ভারতের।
- এখন কার বেশী লাভ তা গোনার সময় নেই। বুদ্ধিজীবীরা সব শেষ হয়ে গেলে আমাদের তখন আর কিছুই থাকবেনা। আমরা পিছিয়ে পড়বো শত বছর।
- কিছুই পিছাবে না। বরঞ্চ শোভন তখন ফাঁকা মাঠে গোল দেবে।
- যে পারবে সে সর্বত্রই পারবে। ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে কিসের গৌরব। ও কে আল্লাহ যদি শুধু লেখকই বানাতো তাহলে গোলগাল থলথলে হোঁৎকা করে বানাতো ওকে। যার বিরাট একটা পশ্চাৎ থাকতো বসার সুবিধায়- মোটামোটা আঙ্গুল থাকতো লেখার সুবিধায়।
- রোগা টিংটিং তাল পাতার সেপাই বানিয়েছে যুদ্ধের জন্য? লোক হাসিও না মুজাহিদ মিয়া। ও তো রাইফেলই উঁচু করতে পারবেনা।
- উঁচু না করতে পারলে মাটিতে রেখে গুলি করবে। ও হালকা পাতলা এবং সেই মাপের চটপটে। যুদ্ধে ও কাজে লাগবে।
- ঘোড়ার ডিমের চটপটে। দৌড়াতেই পারেনা। ওর চাইতে ভুঁড়ি নিয়ে আমি জোরে দৌড়াই।
- তোমার সাথে তুলনা? তুমি লাফাতে পারো? গাছে চড়তে পারো? দেয়াল বাইতে পারো?
- শোভনও গাছে চড়তে পারেনা।
- আমার সাথে কয়দিন থাকলেই পারবে। থাকে তো তোমার সাথে- তাই তোমার মতো আরাম প্রিয় হয়ে গেছে।
- আমার মতো হলেই তো ও উঠে গেল জাতে। সেরা সাহিত্যিক।
- জাতেই তবে বেজাতে। ও একজন যোদ্ধা।
- আরে কোথায় কি যুদ্ধ যে তুমি যোদ্ধা বানাচ্ছ ওকে? কিছু লাঠিয়ালের হইচই? এটা যুদ্ধ?
- মরণপণ লড়ছে আমাদের ছেলেরা। পাকিস্তানীরা কিচ্ছু পারছেনা।
- পাকিস্তানীরা আমাদের ভাই।
- আমিও তাই বলি। কিন্তু এখানে যারা নারী শিশু হত্যা করছে তারা আমাদের কিছু নয়। ওদের ঠেকাতে হবে।
- নারী শিশু যা হত্যা করছে ভারত করছে। গোপনে স্পাই পাঠিয়ে........
- খামোখা হাসাচ্ছিস কেন? এতো গুলো জেনো-সাইড করছে ভারতীয় স্পাইরা? বাহ, তাহলে ধরতে হয় তোমাদের পাকিস্তানীরা হয় তাদের সাহায্য করছে, নয়তো তারা আগাগোড়া অযোগ্য। অস্ত্রধারী একপাল গাধা।
- দেখ মুজাহিদ তুই কি আলেম সমাজের চেয়ে বেশী বুঝিস? আলেম সমাজ পাকিস্তানের পক্ষে।
- আমিও পাকিস্তানের পক্ষে। আমিও চাই আমাদের দেশ পাক থাকুক। নাপাক না হোক। কিন্তু শাসন করবো আমরা। ওরা এমন কোন আলেম নয় যে ওদের শাসন মানতে হবে। আর কখনই সব আলেম ওদের পক্ষে নেই। থাকলেও বা কি? ওরাতো আমাদের মাশরেকে পাকিস্তানের নামে বলে মুশরিকে পাকিস্তান।
- মুশরিকইতো। ওদের তুলনায় আমরাতো হিন্দুবাদী। অল্প যা কিছু আলেম আছে সব পাকিস্তানের পক্ষে।
- মাওলানা ভাসানীই যখন নেতৃত্ব দিচ্ছে তখন কিভাবে বলিস আলেমরা ওদের পক্ষে? গ্রাম গঞ্জে হয়তো কিছু থাকতে পারে যারা দেশের প্রকৃত অবস্থা জানেনা। যাদের বিশ্বাস মুক্তিযোদ্ধারা সব সন্ত্রাসী- নাস্তিক।
- আসলেও তো তাই।
- আসলেও তো তাই? কারা কারা মুক্তিযুদ্ধে গেছে জানিস- খবর রাখিস?
- না খবর রাখিনা। এসব আজেবাজে খবর রেখে আমার কি লাভ?
- তাহেরপুরে পুরো মাদ্রাসা ধরে সবাই গেছে মুক্তিযুদ্ধে। শেরখালিতে এক মুক্তিযোদ্ধাদের টিম লিডার হাফেজ সাহেব। হানাদাররা সেখানে মাদ্রাসা পুড়িয়ে দিয়েছে।
- আমাদের শোভন আলেম ও না, নাস্তিক ও না। ও যাবে কেন? ও সাধারণ মানুষ।
- ও সাধারণ না। এই মুহূর্তে কেউ সাধারণ না। আমাদের সবাইকেই লেগে পড়তে হবে।
- লেগে পড়ে কি হবে?
- একটু বাধাও বাধা। একটা গুলি হজম করতে পারলে শত্রুদের একটা গুলি কমে।
- সরকারের বিপক্ষে যাওয়া উচিত হবেনা।
- এই সরকার আমাদের না। পাকিস্তানী সরকার।
- তুমি কথায় কথায় পাকিস্তান পাকিস্তান করছো। বর্ণবৈষম্যের কথা বলছো। এভাবে বললে আমরা কেন যশোরের হয়ে বগুড়ার জিয়ার পক্ষে লড়বো। এমনতো না যে ওরা আমাদের দই ফ্রি দেয়।
- ঠিক আছে। এই সরকার আমাদের না। পাকিস্তানীদেরও না। এটা অবৈধ অত্যাচারী সরকার।
- তারপরও বৈষম্যের গন্ধ পাচ্ছি। ওরা সাদা আমাদের থেকে বেটার বলেই হিংসায় জ্বলছো?
- হিংসায় না আগুনেই জ্বলছি। ঐ দেখো।
মুজাহিদ কি দেখালো দেখার জন্য এবার আমিও তাকালাম। একটা বাড়িতে আগুন জ্বলছে। কালো ধোয়া গোত্তা খেয়ে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে।
- চলো ওদিকেই যাই। কেবলই পুড়িয়ে দিয়ে গেছে। ওখানে এখন কেউ নেই। জায়গাটা নিরাপদ।
মুজাহিদ আলোচনা অসমাপ্ত রেখে যেতে চাচ্ছিলো না। তারপরও কি মনে করে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালো।
আমরা তিনজনেই দৌড় দিলাম ওদিকে। ছোট্ট মতন জঙ্গুলে জায়গা পার হয়ে একে বাড়ে বাড়িটার উঠোনের সামনে পড়লাম। যেয়ে স্থির হয়ে গেলাম আমি। বাড়ির সামনে তিনটা লাশ। দুটো মেয়ে, একটা কিশোর। হঠাৎ এক কোণে দেখতে পেলাম একটা বাচ্চাকে। ছটফট করছে। দৌড়ে গেলাম ওদিকে তিনজনই। ভুঁড়িওয়ালা কাতেবই আগে পৌছালো। আলতো করে কোলে তুলে নিলো বাচ্চাটাকে। কোল তুলতেই শক্ত করে ওর জামার কলার ধরল বাচ্চাটা। বুকে গুলি লেগেছে বেচারির। ফুসফুসে। নাকমুখ দিয়ে রক্ত বের হয়ে আসছে। বাতাসের অভাবে খাবি খাচ্ছে। গর্জে উঠলো মুজাহিদ,
- এর কি অপরাধ ছিলো? এটাকে না মারলে হতোনা?
- এর বাবা-মাকে মেরে একে বাঁচিয়ে রাখা একটা যন্ত্রণা না? শুধু শুধু আরো বিদ্রোহীর জন্ম। তবে বাচ্চাটা সত্যিই কিউট। এটাকে না মারলেও চলতো।
- এরা এভাবেই দেশ শাসন করছে। ষড়যন্ত্রই হোক আর যাই হোক যুদ্ধ বেধেই গেছে। এই যুদ্ধ এখন আমাদেরই শেষ করতে হবে।
- হ্যাঁ। আসলে ঠিকই বলেছো তুমি। তবে আমাদের যুদ্ধ হবে বুদ্ধি দিয়ে। কাগজে কলমে। আমরা এই নিয়ে গল্প লিখবো, কবিতা লিখবো, গান গাইবো- নাটক করবো। প্রত্যেকে প্রত্যেকের মতো চেষ্টা করে যাবো।
বাচ্চাটিকে আমার হাতে দিয়ে পাঞ্জাবীর পকেট হাতড়ে কলম বের করলো কাতেব।
- নাও শোভন ধরো, কলম ধরো। তোমার এখনকার আবেগ খাতায় তোলো....। যুদ্ধ যদি করতেই হয় তা হবে কবির মতো। ওঠো। ধরো কলম। এইতো এইযে বাচ্চাটা মরেই গেছে। ফেলে দাও ওটাকে। খাতা ধরো। শোককে শক্তিতে পরিণত করো।
আমি বাচ্চাটাকে মুজাহিদের কাছে দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। মুজাহিদ ঝরঝর করে কাঁদছে। চোখের পানি ওর দাড়ি আটকে যাচ্ছে মুক্তোর মতো। কলমটা নিলাম আমি। খুব দামী কলম। সোনালী রংয়ের, পুরোটাই পিতলের। অনেক শক্ত। বাচ্চাটাকে জড়িয়ে ধরেছে মুজাহিদ। ওর চোখে একই সাথে আগুন আর পানি।
- নাও কাগজগুলো বের করো পকেট থেকে। লেখো।
- লিখবো?
মৃদু স্বরে জানতে চাইলাম আমি বোকার মতো,
- হ্যাঁ। লেখো, কবিতা লেখো। শুরু করো এভাবে,
তব দুঃসহ সময়ের সাথে
বেদনার সাথে নিয়ে যাচ্ছি রক্তমাখা স্মৃতি
আমার জন্য যুদ্ধ নয়।
আমি কবি...
কাতেব কথা শেষ করতে পারলো না। থুতনির নিচ থেকে কলম বিধিয়ে দিয়েছি আমি। উপরে দিকে জিহ্বা ফুড়ে তালুতে যেয়ে ঠেকেছে ওটা। ঘো-ঘোৎ করে একটা শব্দ করে চুপ হয়ে গেছে কবি কাতেব।
জান্তব উল্লাস ছেড়ে মুজাহিদ ছুটে এলো একটা মোটা বাঁশের গোড়া নিয়ে। আমার হাতে তুলে দিলো সেটা। ইঙ্গিত স্পষ্ট। নিচ থেকে কলমের গোড়ায় মারলাম যতক্ষণ না কবির তালু ফুড়ে কলমের নিবটা বেড়িয়ে আসে। লম্বা কলমটা এক সময় উকি মারলো মাথা চিড়ে। হতভম্ব কবি মাটিতে পড়ে যাবার সুযোগও পেলনা।
দাঁতে দাঁত চেপে মুজাহিদের তাকিয়ে বললাম,
- চলো। পথ দেখাও। সিস্টেম দেখাও। এই বাচ্চার মৃত্যুর প্রতিশোধ না নিয়ে আমার বেঁচে থাকা চলবেনা।
মুজাহিদ খুশীতে চিৎকার দিয়ে আযান দিতে আরম্ভ করলো। বাচ্চাটিকে সে কোল থেকে নামায় নি।
দাফন শেষ হতে সময় লাগলো খানিকটা। ঘরের ভিতর থেকে দাঁ নিয়ে বের হয়েছি। মুজাহিদ পথ দেখাতে আগে আগে যাচ্ছে। পিছনে তাকিয়ে দেখলাম আমাদের অনুসরণ করছে মৃত কবির লাশ।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now