বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"কাউন্ট ড্রাকুলা"
লেখক : ব্রাম স্টোকার
অনুবাদক: তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
--------------------------
পর্ব ৬
মীনার ডায়েরী
২৩ শে সেপ্টেম্বর।।
জোনাথন ভাল আছে। সংসারের কাজকর্ম সেরে এতক্ষণ আমি জোনাথনের দিনলিপি লেখা ডায়েরী পড়ছিলাম। ট্রানসিলভ্যানিয়ায় কাউন্টের নির্জন প্রাসাদে তার ভয়াবহ দিনগুলির বিবরণ পড়ে ভয়ে আমার গা ছমছম করছিল। জোনাথনের মানসিক অসুস্থতার কারণ বুঝতে পারছি। সে লিখেছে..." ভয়াবহ কাউন্ট ড্রাকুলা লন্ডনে আসছে....!"
হাউড পার্কের অস্বাভাবিক লম্বা ঐ লোকটি কে?
২৪ শে সেপ্টেম্বর।।
আজ হেলসিংয়ের একটা চিঠি পেলাম। তিনি লিখেছেন....
সবিনয় নিবেদন
লুসিকে লেখা আপনার চিঠিগুলি বিশেষ একটি কারণে পড়তে বাধ্য হয়েছি, সেজন্য ক্ষমা চাইছি। আপনার প্রিয় বান্ধবীর মৃত্যু স্বাভাবিক বলে মনে হয় না। তাই রহস্যানুসন্ধানে আপনার সহযোগিতা কামনা করি। আপনার চিঠিতে জোনাথন কত কষ্ট করেছেন, তাও জেনেছি। সব কিছুর ভেতরে কেমন একটা নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে হয়।
আপনার সঙ্গে তাই দেখা করতে চাই। অনুমতি পেলে যাব।
একান্ত বিশ্বস্ত
ভ্যান হেলসিং।
হেলসিংকে টেলিগ্রাম করলাম.." আজই সকাল এগারোটার ট্রেনে চলে আসুন।"
জোনাথন বিশেষ কাজে বাইরে গেছে। জানি না কখন ফিরবে। প্রয়োজনবোধে জোনাথনের দিনলিপি হেলসিংকে দেখাব স্থির করেছি।
২৫ শে সেপ্টেম্বর।।
নির্দিষ্ট সময়েই হেলসিং এসেছিলেন, চলেও গিয়েছেন। তাঁকে দেখে শ্রদ্ধা জাগে, ভারী ভাল মানুষ তিনি। হুইটবাইয়ে লুসিদের বাড়ি যখন ছিলাম তখন রাতের আঁধারে লুসিকে একদিন পার্কের বেঞ্চে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখেছিলাম, একটা অস্বাভাবিক লম্বা লোককে তার ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম এবং লুসিকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলাম, এ ব্যাপারে হেলসিং আমায় খুঁটিনাটি অনেক প্রশ্ন করেছিলেন।
আমি তাঁকে সবকিছু বলেছি এবং শর্টহ্যান্ডে লেখা জোনাথনের ডায়েরী হেলসিংয়ের হাতে তুলে দিলাম।
দু এক পাতা উল্টিয়ে অসহায়ভাবে তিনি বলে ওঠেন, " আমি যে শর্টহ্যান্ড জানি না।" লজ্জিত হয়ে আমি শর্টহ্যান্ডে লেখা জোনাথনের দিনপঞ্জির টাইপ কপি তাঁকে এনে দিলাম। হেলসিং বললেন, " জোনাথনের দিনলিপি বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি। বাড়ি ফিরে পড়ব।"
বাড়ি ফিরে হেলসিং জোনাথনের দিনলিপি পড়ে তাঁর অভিমত জানিয়েছেন....
প্রিয় মীনা,
জোনাথনের দিনলিপি পড়েছি। অবিশ্বাস্য এবং অদ্ভুত মনে হলেও তার লেখার এক বর্ণও মিথ্যে নয়। জোনাথনের সঙ্গে কথা বলতে চাই।
ঈশ্বর তোমাদের মঙ্গল করুন।
.... হেলসিং।
জোনাথনের দিনলিপি
২৫ শে সেপ্টেম্বর।।
ভেবেছিলাম দিনলিপি লেখার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। অধ্যাপক হেলসিং মীনাকে একটি চিঠিতে লিখেছেন, " অবিশ্বাস্য এবং অদ্ভুত মনে হলেও লেখার একটি বর্ণও মিথ্যে নয়।"
হেলসিং পুনরায় আজ আসবেন। তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে কর্তব্য স্থির করব।
হেলসিংয়ের ব্যবহারে আমি মুগ্ধ হলাম।।আমি যেন তাঁর কতকালের পরিচিত। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, " কেমন আছো?"
" আমার দিনলিপির একটি বর্ণও মিথ্যে নয়, আপনার এই স্বীকৃতিইই আমায় সুস্থ করে তুলেছে", আমি উত্তর দিই।
তিনি বললেন, " মিলেমিশে আমাদের কাজ করতে হবে। আমি জানি অনেক দু:খকষ্টের ভেতর দিয়ে রহস্যের জট একদিন খুলবে।"
সকাল দশটা তিরিশের ট্রেনে হেলসিং ফিরে গেলেন। যাবার সময় প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্র তাঁর হাতে দিলাম। আজ সকালের এবং গতকালের ' দি ওয়েস্ট মিনস্টার গেজেট' এর শিশু অপহরণ বিষয়ক দুটি খবরের প্রতি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে হেলসিং চমকে উঠে বললেন " কি সর্বনাশ, এত তাড়াতাড়ি! "
২৬ শে সেপ্টেম্বর।।
অধ্যাপক হেলসিং আর ডাঃ সিউয়ার্ডের মধ্যে বাদানুবাদ শুরু হল। টেবিলের ওপর ' দি ওয়েস্ট মিনস্টার গেজেট' এর খোলা পাতায় শীতের হাওয়া কাঁপন জাগায়।
হেলসিং বললেন, " অপহৃত শিশুদের গলায় দুটি করে ছোট ছিদ্র। এই ছিদ্র আমরা লুসির গলাতেও দেখেছিলাম। এর থেকে কি মনে হয় না, উভয় ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ এক?"
ডাঃ সিউয়ার্ড বললেন, " তা নাও হতে পারে। "
একটু থেমে হেলসিং বললেন , " এমন অনেক কিছুই ঘটে বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলে না। অনাবিষ্কৃত আর অপ্রমাণিত অনেক কিছুই আছে যেগুলোকে আমরা রহস্য বলে থাকি। মেথুসেলা নয়শ বছর আর বৃদ্ধ পার একশ ঊনসত্তর বছর বেঁচেছিলেন অথচ চারজনের রক্তেও হতভাগিনী লুসিকে একদিনও বাঁচিয়ে রাখা গেল না....কেন বলতে পার?.জীবন মৃত্যুর সব রহস্য তুমি জান? তুমি কি জান পম্পাস এবং অন্যান্য স্থানে এক ধরনের বাদুড় আছে যারা রাতের অন্ধকারে লোকালয়ে প্রবেশ করে এবং গরু ছাগলের গলা ফুটো করে রক্ত খায়? তুমি কি জান, পশ্চিম সমুদ্রের তীরে এক ধরনের বাদুড় আছে যারা দিনের বেলায় বড় বড় বাদামের মতো গাছের ডগায় ঝুলে থাকে আর গ্রীষ্মের নিশুতি রাতে ক্লান্ত নাবিকদের রক্তশোষণ করে....সকালে রক্তশূন্য নাবিকদের মৃতদেহগুলি জাহাজের এখানে সেখানে পড়ে থাকে?"
ডাঃ সিউয়ার্ড বিস্ময় বিহ্বল হয়ে হেলসিংয়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, " ঊনবিংশ শতকের জ্ঞানী বৈজ্ঞানিক হয়েও কি আপনি বলতে চান ঐ ধরনের বাদুড়ই লুসির রক্ত শুষে, অবশেষে তাকে মেরে ফেলেছে?"
ডাঃ সিউয়ার্ডের কথায় কান না দিয়ে হেলসিং পুনরায় বলতে শুরু করলেন, " বলতে পারো, মানুষের চেয়ে কচ্ছপ বেশীদিন বাঁচে কেন? তুমি কি বলতে পারো ভারতের অনেক যোগী মহাপুরুষ মৃত্যুর পরও আবার কি করে বেঁচে ওঠেন? অব্যক্ত এই জীবনের সন্ধান কি বিজ্ঞান দিতে পারবে?"
বিজ্ঞান যার ব্যাখ্যা দিতে পারেনি, এমন সব বিচিত্র তথ্য জেনে অবাক হলেন ডাঃ সিউয়ার্ড। তিনি বললেন, " অধ্যাপক হেলসিং, আমি আপনার ছাত্র। না জেনে, না বুঝে অনেক সময় অনেক কথা আপনাকে বলে ফেলেছি....সেজন্য ক্ষমা চাইছি।"
হেলসিং বললেন, " তুমি কোনও অন্যায় কর নি সিউয়ার্ড। বিজ্ঞানের সাধনা কর তুমি, তাই যুক্তি ছাড়া কোনও কিছু বিশ্বাস করতে মন চায় না।"
একটু থেমে তিনি ফের ডাঃ সিউয়ার্ডকে প্রশ্ন করেন, " আচ্ছা বলতো, লুসির গলায় যে ক্ষত সৃষ্টি করেছিল, অপহৃত শিশুদের গলায় কি সে-ই ক্ষত সৃষ্টি করেছে?"
ডাঃ সিউয়ার্ড জবাব দেন, " আমার তো সেরকমই মনে হয়।"
হেলসিং বললেন, " না, তা নয়। অপহৃত রক্তশূন্য শিশুদের গলায় ছিদ্র সৃষ্টি করার জন্য এখন লুসি দায়ী। শিশুদের টাটকা রক্তে লুসি নিজের অস্বাভাবিক তৃষ্ণা নিবারণ করছে।"
ডাঃ সিউয়ার্ড বললেন, " ক্ষমা করবেন হেলসিং, আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন?"
" যদি পাগল হতে পারতাম, শোন সিউয়ার্ড, আজ রাতে আমার পরীক্ষা-লব্ধ সিদ্ধান্তের অকাট্য প্রমাণ দেব। তুমি কি আমার সাথে যেতে রাজি আছ?"
" কোথায়?"
" প্রথমে আমরা ডাঃ ভিনসেন্টের হাসপাতালের গিয়ে শিশুদের মৃতদেহগুলো দেখব। তারপর কবরখানায় যাব আর লুসির শব পরীক্ষা করব।"
ডাঃ সিউয়ার্ড রাজি হলেন।
রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে গীর্জাটি দাঁড়িয়ে আছে। কত কান্না, কত সুখ, কত কোলাহল, কত ব্যথা, কত মৃত্যু, কত আনন্দের সাক্ষ্য দিচ্ছে এই প্রাচীন গীর্জা। হেলসিং আর ডাঃ সিউয়ার্ড মোমের আলোয় অতি সন্তর্পণে পথ চলেছেন তাঁরা।
" আমরা লুসির সমাধির কাছে এসে গিয়েছি"....নির্জনতা ভঙ্গ করে হেলসিং বলে উঠলেন। অত:পর হেলসিং তাঁর ব্যাগ থেকে যন্ত্রপাতি বের করলেন এবং কফিনের ঢাকনা খুলে ফেললেন।
ডাঃ সিউয়ার্ডের এবার বিস্মিত হবার পালা। তিনি দেখলেন, কফিন শূন্য....লুসির মৃতদেহ সেখানে নেই।
কফিনের ঢাকনা বন্ধ করে, যন্ত্রপাতি ব্যাগে পুরে মৃদু হেসে হেলসিং বললেন, " এদিকে এসো, তোমায় আরও প্রমাণ দিচ্ছি। "
মন্ত্রমুগ্ধের মতো হেলসিংকে অনুসরণ করলেন ডাঃ সিউয়ার্ড।
মেঘাচ্ছন্ন রাত, হাহাকার করছে রাতের বাতাস। প্রতি পদক্ষেপেই গা ছমছম করছে। হেলসিং হঠাৎ কিসে হোঁচট খেলেন। টর্চের আলোয় নিচু হয়ে দেখলেন একটি শিশুর দেহ।
" শিশুটি এখানে এল কোথা থেকে?", ডাঃ সিউয়ার্ড জিজ্ঞেস করলেন।
হেলসিং বললেন, " চলো, রক্তশূন্য, মৃত এই শিশুটির একটা ব্যবস্থা করা আমাদের আশু কর্তব্য। একে ল্যাম্পপোস্টের তলায় শুইয়ে দিয়ে আসি। নাইট ওয়াচম্যানদের নজরে পড়লে ওরাই তুলে নিয়ে যাবে।"
সেইমতো তাই করা হল।
বুটের শব্দ থেকে মনে হল, ওয়াচম্যানগুলো এদিকেই আসছে। একসঙ্গে অনেকগুলো টর্চের আলো পড়ল মৃত শিশুটির সুপ্ত মুখে। তারা নিজেদের মধ্যে কি যেন বলাবলি করল, তারপর শিশুটিকে তুলে নিয়ে গেল।
ভোরের ঠাণ্ডা হাওয়ায় শ্রান্ত দেহে অধ্যাপক হেলসিং আর ডাঃ সিউয়ার্ড ফিরে গেলেন।
দুপুরে আবার তাঁরা সমাধিভূমিতে এলেন। অনেকক্ষণ তাঁদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল। দুটোর সময় একদল লোক একটি মেয়েকে কবর দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল। হেলসিং আবার তাঁর যন্ত্রপাতি বের করলেন। কফিনের ঢাকনা খোলা হলো। কি আশ্চর্য! লুসির মৃতদেহ যথাস্থানেই রয়েছে। সদ্য ফোটা একটি রক্ত গোলাপের চেয়েও যেন সে সুন্দর। এতটুকু বিকৃতি হয় নি, শরীরের কোথাও। সামান্য পচনও ধরেনি। কে বলবে, লুসি মৃত? যেন ঘুমিয়ে রয়েছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, মৃত লুসির ঠোঁটের কষ বেয়ে নেমে এসেছে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের ধারা।
হেলসিং লুসির ঠোঁটদুটি ফাঁক করলেন। দাঁতগুলি দেখে ভয় হয়, সেগুলো অস্বাভাবিক শাণিত আর সাদা!
ডাঃ সিউয়ার্ডের বুকের স্পন্দন এত দ্রুত হচ্ছিল যে তাঁর ভয় হল, তিনি হার্টফেল না করে বসেন! বুকের ভেতর যেন হাজারটা হাতুড়ি পিটছে তাঁর। এ কি দেখছেন তিনি চোখের সামনে?
হেলসিং গভীর চিন্তার মাঝে ডুবে রয়েছেন। লুসির মস্তক ছেদন তাঁর লক্ষ্য। এক সময় তিনি বললেন, " আজ আর কিছু করে লাভ নেই। আর্থারকে আসতে লিখেছি। সে আসুক, তাকে সব জানিয়ে তারপর চিন্তা করা যাবে কি করব। সিউয়ার্ড, তুমি আজকের মতো তোমার নার্সিংহোমে ফিরে যাও। আগামীকাল রাত দশটায় আমার সঙ্গে বার্কলে হোটেলে দেখা করবে। আর মরিসও আমাদের সঙ্গে দেখা করবে।"
বক্তব্য শেষে হেলসিং কফিনের ঢাকনা বন্ধ করলেন। ডাঃ সিউয়ার্ড হেলসিংয়ের কাছে বিদায় নিয়ে নিজের আস্তানার দিকে ফিরে গেলেন।
পরদিন সকালে হেলসিংয়ের কক্ষে হেলসিং, আর্থার এবং মরিস আলোচনারত.... এমন সময় ডাঃ সিউয়ার্ড প্রবেশ করলেন। তাঁকে দেখে সকলেই আনন্দিত হল। হেলসিং বললেন, " রাতে আমরা সমাধিভূমিতে যাব এবং কফিনের ঢাকনা খুলে লুসির মৃতদেহ পরীক্ষা করব।"
আর্থার বললেন, " লুসি আর নেই। তার মৃতদেহ পরীক্ষা করে কি হবে?"
হেলসিং বললেন, " যদি সে মৃতই হয়, তাহলে কফিনের ঢাকনা খুলতে আপত্তি কোথায়? অবশ্য যদি সে মৃত না হয়......"
আর্থার চিৎকার করে ওঠেন, " আপনি কি বলতে চান? তাকে কি জীবিত অবস্থাতেই কবর দেওয়া হয়েছে?"
হেলসিং বললেন, " শান্ত হও আর্থার। আমি ভাবতে পারি না যে লুসি জীবিত। তবে মৃত বলে সে নিষ্ক্রিয় নাও হতে পারে। আজ রাতে আবার আমরা সমাধিভূমিতে যাব। আর সেখানেই আশা করি তোমার চক্ষু-কর্ণের বিবাদভঞ্জন হবে।"
নৈশ নির্জনতায় আবার তাদের অভিযান শুরু হল। হেলসিং আর্থারের কাছে লুসির শিরচ্ছেদের অনুমতি চাইলেন। শিউরে ওঠেন আর্থার। বললেন, " লুসির সমাধি রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব আমার ওপর অর্পিত হয়েছে। পৃথিবীর একচ্ছত্র সম্রাট করে দিলেও আমি অনুমতি দেব না। "
হেলসিং বললেন, " আমরাও লুসিকে ভালবেসেছি, তাঁকে বাঁচাবার জন্য রক্ত দিয়েছি, রাতের পর রাত তার রোগশয্যার পাশে থেকেছি....জীবন দিয়েও যদি বাঁচাতে পারতাম, তো জীবনও দিতাম। লুসির সমাধির ওপর তোমার মতো তাই আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে।"
লুসির সমাধির কাছে এসে আগের দিনের মতো কফিনের ঢাকনা খুলে দেখা গেল, কফিন শূন্য। হেলসিংয়ের আদেশে ডাঃ সিউয়ার্ড গত রাতের অভিজ্ঞতার কথা বর্ননা করলেন। মরিস অধৈর্য হয়ে বলে উঠল, " ক্ষমা করুন হেলসিং, এ কি আপনারই কারসাজি?"
হেলসিং উত্তেজিত হলেন না। তিনি বললেন, " এমন অনেক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে যেগুলিকে আমরা কারসাজি বলেই মনে করি। আমায় মিথ্যাই সন্দেহ করছ। আমি ভোজবাজি জানি না। লুসির রহস্যময় মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে আমরা গত রাতে এখানে এসেছিলাম। দেখেছিলাম কফিন শূন্য, কিছুটা এগিয়ে একটা অস্পষ্ট মেয়ের ছায়াও দেখেছিলাম। পরদিন দুপুরে এসে আবার লুসির মৃতদেহ যথাস্থানেই দেখেছিলাম। "
ডাঃ সিউয়ার্ড বললেন, " হেলসিংয়ের উক্তি ও বিবরণ এক বর্ণও মিথ্যে নয়।"
চারদিকে অসীম নির্জনতা। আকাশে মেঘ জমেছে। অজানা কোনও ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে। আর্থার এবং সিউয়ার্ড চুপ করে রয়েছেন।
বেপরোয়া অভিযাত্রী। মরিস ঘন ঘন ধূমপান করে, কিন্তু এ হেন পরিবেশে, হেলসিংয়ের ভয়ে সিগারেট টানতে পারছে না, তাই মাঝেমাঝে সিগারেটের মশলা চর্বণ করছে। হেলসিং চারদিকে সাদা মতো কি যেন ছড়িয়ে দিয়েছে।
সহসা সকলে চেয়ে দেখে, অন্ধকারের বুক চিরে একটি মেয়ে এগিয়ে আসছে। আলোতে গড়া মূর্তির মতো তার দেহ। বুকের কাছে একটি শিশুকে চেপে ধরেছে সে। শিশুটি অসহ্য যন্ত্রণায় পরিত্রাহি কাঁদছে।
" লুসি!" আর্থারের মুখ থেকে আপনা থেকেই বেরিয়ে এল।
অন্ধকারে ধ্বক ধ্বক করে জ্বলছে লুসির চোখ। ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে তার মুখ, মনে হচ্ছে সে যেন ভয় দেখানো একটা জাপানী মুখোস পড়েছে।
শিশুটির বুকফাটা আর্তনাদে উপস্থিত সবার মধ্যে সহানুভূতির সঞ্চার হল। কিন্তু নিরুপায় হয়ে তাঁরা দাঁড়িয়ে রইলেন।
আর্থার হাত দিয়ে চোখ ঢেকে বলল, " না, এ কিছুতেই লুসি হতে পারে না। এই পিশাচী কিছুতেই আমার লুসি হতে পারে না।"
একসময় শিশুটিকে নিয়ে লুসি তাঁদের দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল।
হেলসিং বললেন, " আমি কি আমার কাজ শুরু করব?"
" যা খুশি তাই করুন ", আর্থার উত্তর দেন।
ফটো তোলার সময় যে ধরনের শব্দ হয় ঐ ধরনের শব্দ হল এবং হেলসিংয়ের হাতের কালো লণ্ঠন আলোকিত হয়ে উঠল।
লুসি শিশুটিকে মাটিতে ফেলে দিয়ে সংকীর্ণ এক সুড়ঙ্গপথে সমাধিতে গিয়ে ঢুকল।
হেলসিং বললেন, " আজ এই পর্যন্তই। আগামীকাল দিনের আলোয় আমরা সবাই আসব, আবার। লুসিকে এই অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি দিতে হবে।"
পরদিন বেলা বারোটার একটু আগে আর্থার, হেলসিং, সিউয়ার্ড আর মরিস একসঙ্গে আবার এলেন সেই সমাধিভূমিতে। সকলেই আজ হেলসিংয়ের নির্দেশমতো কালো পোশাক পরে এসেছেন। হেলসিংয়ের হাতে তাঁর সেই বিচিত্র ব্যাগটি।
কফিনের ভেতর এখন যথাস্থানেই রয়েছে লুসির দেহ। হেলসিং একটি বাতি জ্বালালেন। দীপালোকে তিনি একটি লৌহ কিলক ধরে রইলেন। ক্রমে সেটি লাল হয়ে উঠল। ডান হাতে তাঁর একটা ছোট হাতুড়ি। তিনি বললেন, " আমরা প্রস্তুত। এখন শোন, যাঁরা দীর্ঘদিন পিশাচবাদ নিয়ে গবেষণা করছেন, তাঁদের মতে, এক ধরনের পিশাচিনী আছে, যাদের বিশেষ একটি সময় মৃত মনে হলেও রাতের অন্ধকারে সজীব হয়ে কবর থেকে বেরিয়ে আসে এবং জীবিত প্রাণীর উষ্ণ রক্ত পান করে শতাব্দীর পর শতাব্দী বেঁচে থাকে। অনেককিছুর ওপর তারা প্রভাব বিস্তার করে। লুসি এই ধরনের পিশাচিনীতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই মূহুর্তেই তাকে বধ করতে হবে। প্রকৃত মৃত্যুতেই তার মুক্তি। এই মহৎ কাজ করার জন্য প্রয়োজন দুটো শক্ত হাতের। এখন বল, কে এই কাজের দায়িত্ব নেবে?"
সকলেই আর্থারের দিকে তাকালেন।
হেলসিং বললেন, " অসংখ্য ধন্যবাদ আর্থার। এ কাজ এমন কিছু কঠিন নয়। মানসিক ধৈর্য হারাবে না শুধু। তপ্ত এই লৌহকিলক তোমার বাঁ হাতে রাখ আর ডান হাতে ধর এই হাতুড়ি। কিলকের ছুঁচালো মুখটা লুসির হৃদপিন্ডে রেখে হাতুড়ির ঘা দেবে। তুমি কাজ করে যাও। আমরা প্রার্থনা করব।"
নিতান্ত অল্প সময়ে আর্থার হেলসিংয়ের নির্দেশমতো কাজটি সেরে ফেললেন। লুসির ঠোঁটের পাশ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ল। ক্রমে তার দেহটি কুঁকড়ে যেতে লাগল। কফিন কমলা রঙের ফেনায় ভরে গেল।
কাজ শেষ হয়েছে। বিজয়ী আর্থারের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে।
হেলসিং বললেন, " আর্থার, এখন বল, তুমি আমায় ক্ষমা করেছ তো?"
আর্থার বললেন, " ক্ষমা! আমারই বরং আপনার কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। লুসির আত্মা যে আজ চিরশান্তি লাভ করল, সে তো আপনারই কৃপায়।"
হেলসিং বললেন, " শোন আর্থার, আমাদের কাজ এখনো শেষ হয় নি। যার প্রভাবে লুসি পিশাচীতে রূপান্তরিত হয়েছিল, জীবন বিপন্ন করেও তাকে আমাদের বধ করতে হবে। তোমরা সবাই লুসির পবিত্র সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা কর, শেষ পর্যন্ত আমার সঙ্গে সহযোগিতা করবে।"
সকলেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন। পালের গোদা কাউন্ট ড্রাকুলাকে শেষ না করা পর্যন্ত তাঁরা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন।
হেলসিংয়ের মুখে বিকেলের রোদ পড়েছে। স্বস্তির নিশ্বাস ত্যাগ করে বললেন, " পরশুদিন বার্কলে হোটেলে আমার সঙ্গে দেখা করবে।"
অত:পর যে যার বাসস্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল।
শয়তান কাউন্ট ড্রাকুলা ইংলন্ডের বুকে একের পর এক নারকীয় লীলা চালিয়েই চলেছে, অথচ এখনো পর্যন্ত কেউ তার কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারছে না।
( ক্রমশ)
-------------
।। একাকী কন্যা ।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now