বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
কালাপানির আন্দামানে
চ্যাপ্টার- ৪
৪
হারবারতাবাদ ছোট্ট উপকূলীয় শহর। পোর্ট ব্লেয়ার থেকে সোজা পশ্চিমে আন্দামানের একেবারে পশ্চিম উপকূলে ওয়েষ্ট বে’র পানি ঘেঁষে দাঁড়ানো শহরটি।
আন্দামানের একমাত্র হাইওয়ে পোর্ট ব্লেয়ার থেকে শুরু হয়ে সাউথ আন্দামান দ্বীপটির দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দ্বীপের উত্তর প্রান্তে এগুবার সময় একটা হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করেছে হারবারতাবাদ শহরকে।
হারবারতাবাদের প্রতিষ্ঠা পোর্ট ব্লেয়ার এর অল্প পরে। হারবারতাবাদের তিরিশ মাইল দক্ষিণে একটি শহর নাম ডেলিগঞ্জ। আর চল্লিশ মাইল উত্তর পূর্বে আরেকটি শহর আছে। নাম উইমবারলীগঞ্জ। এই দুশহরে বাংলাসহ পূর্ব ভারতীয় লোকের আধিক্য বেশি। কিন্তু হারবারতাবাদে উত্তর ভারতীয় লোক বেশি দেখা যায়। এই শহরটির প্রতিষ্ঠা করেন আন্দামানে কয়েদী হয়ে আসা মোঘল শাহজাদা ফিরোজ শাহ।
ফিরোজ শাহ বৃটিশ বিরোধীয় যুদ্ধ সংগঠক শীর্ষ ব্যক্তিদের একজন ছিল। বৃটিশ রাজের বিরুদ্ধে দেশীয় রাজা ও আঞ্চলিক জমিদারদের সংগঠিত করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সে পালন করে। দিল্লীর পতনের পর মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর বার্মার রেংগুনে নির্বাসনে যাবার আগে পলাতক ও একমাত্র জীবিত মোঘল শাহজাদা হিসেবে ফিরোজ শাহকে গোপনে ডেকে উত্তরাধিকারের দায়িত্ব তার কাঁধে অর্পণ করাসহ কিছু গোপন দলিল ও বংশীয় গোপন কিছু তথ্য তার হাতে দিয়ে যায়। এর অনেক পর ফিরোজ শাহ ধরা পড়ে। দিল্লীতে অপ্রকাশ্য এক বিশেষ বিচারে তাকে দ্বীপান্তর দেয়া হয় আন্দামানে।
আন্দামানের বৃটিশ কর্তৃপক্ষ শাহজাদা ফিরোজ শাহকে ভয়ংকর কয়েদীদের স্থান ‘ভাইপার জেলখানা’ কিংবা সাধারণ কয়েদীদের রাখার জায়গা ‘আবরডীন জেলখানা’ কোনটাতেই রাখতে ভরসা পায়নি। কয়েদী বিদ্রোহের আশংকায়। বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে পোর্ট ব্লেয়ার থেকে ৬০ মাইল পশ্চিমে পাহাড় ঘেরা পশ্চিম উপকূলীয় এক উপত্যকার ছোট্ট একটা স্থাপনা গড়ে সেখানে ফিরোজ শাহকে বিচ্ছিন্নভাবে রাখার ব্যবস্থা করে। অনেক পরে আন্দামানের কয়েদী জীবনের নিয়ম অনুসারে কাশ্মীরে এক হিন্দুরাজাকে হত্যাকারিনী সদ্য কয়েদী হয়ে আসা এক কাশ্মীরী শিক্ষিকা মহিলাকে সে বিয়ে করে। যুবক ফিরোজ শাহ একদিন বৃদ্ধে পরিণত হয়। তাকে বন্দী করে রাখার স্থানটিতেই একদিন সে স্বাধীনভাবে বসতি গড়ে তোলে। সে যখন প্রথম এই উপত্যকায় আসে, তখন সে এর নাম দেয় ‘হায়রতাবাদ’ বা আশ্চর্য আবাস। তখন এখানে তার বাড়ি ছাড়া আর কোন বাড়ি ছিল না। তার চারপাশের পাতার ঘরে বাস করা কিছু আদিবাসী ছাড়া আর কোন মানুষ ছিল না। বৃটিশদের অর্থ দিয়ে কেনা এই আদিবাসীরা ছিল তার পাহারাদার। কথা বলার কোন লোক ছিল না। জায়গাটা দিনের বেলাতেও ছিল একটা নিঝুম পুরী। রাতের বেলা তা হয়ে দাঁড়াত ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছাওয়া নিঃশব্দ মৃত এক জাহান্নাম। তাই ‘হায়রতাবাদ’ নামটা খুই যথার্থ ছিল। কিন্তু ফিরোজ শাহ যখন স্বাধীনভাবে এখানে বাস করতে লাগল, আদিবাসীরা যখন তার ভক্ত হয়ে গেল এবং তার চারপাশে বসতি গড়ে তুলল, তার সাথে ধীরে ধীরে ভারতীয় স্বাধীন কয়েদীরাও যখন সেখানে আবাস গড়ে তুলল, তখনও আগের সেই ‘হায়রতাবাদ’ নামটাই রয়ে গেল। সেই নামটাই ইংরেজদের কল্যাণে বিকৃত হয়ে ‘হারবারতাবাদ’ হয়ে গেছে।
হারবারতাবাদ শহরে এখন সাত হাজার লোকের বাস। সোনা ফলা সুন্দর উপত্যকার কয়েকটি প্রশস্ত অনুচ্চ টিলায় বাড়িগুলি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।
আহমদ মুসার গাড়ি হারবারতাবাদ উপত্যকায় প্রবেশ করল।
বাড়ি শোভিত উপত্যকার টিলার দিকে তাকিয়ে চমৎকৃত হলো আহমদ মুসা। সবুজের ফাঁকে ফাঁকে সাদা লাল বাড়িগুলো অপরূপ মনে হচ্ছে।
রাস্তার দুপাশের সবুজের দেয়াল পেছনে ফেলে এগুলো আহমদ মুসার গাড়ি।
টিলায় উঠছে তারা।
টিলায় উঠার আগে আহমদ মুসা ঘোড়ার পরিচর্যারত এক বৃদ্ধের কাছ থেকে আহমদ শাহ আলমগীরের বাড়ি কোথায় তা জেনে নিয়েছে। বাড়িটার নামও জেনে নিয়েছিল ‘শাহ বুরুজ’।
সর্ব পশ্চিমে অপেক্ষাকৃত বড় ও প্রশস্ত টিলাটার শীর্ষে নীলের বুক ফেঁড়ে একটা মিনার মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। ওটা মসজিদ। মসজিদের পাশেই আহমদ শাহ আলমগীরের বাড়ি।
মসজিদের মিনার লক্ষ্যে গাড়ি চালিয়ে অল্পক্ষণের মধ্যেই ‘শাহ বুরুজ’ বাড়িটার গেটে গাড়ি দাঁড় করাল গংগারাম।
বাড়িটা প্রাচীর ঘেরা। বাড়িতে প্রবেশের দৃশ্যত এই একটাই গেট।
গেটের সামনে আগে থেকেই একটা মাইক্রো দাঁড়িয়ে ছিল।
আহমদ মুসাদের গাড়ি পাশে একটু দূরত্ব রেখে দাঁড়াল।
আগে থেকে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটিতে কোন লোক নেই।
বাড়িতে ঢোকার দরজা বন্ধ। দরজায় কোন কলিং বেল নেই।
দরজার লকের সাথে কোন ব্যবস্থা থাকতে পারে।
দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে নারী কণ্ঠের চিৎকার ও কান্নার আওয়াজ শুনতে পেল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার দুহাত দ্রুত গিয়ে দরজায় চাপ দিল।
দরজা খুলে গেল।
লক করা ছিল না দরজা।
দরজা পুরোটা খুলে ফেলল আহমদ মুসা।
খোলা দরজা পথে আহমদ মুসা দেখতে পেল ছয়জন লোক একজন তরুণী ও একজন চল্লিশোর্ধ মহিলাকে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে আসছে। অসহায় মহিলা দুজন চিৎকার করছে, কাঁদছে।
আহমদ মুসার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল গংগারাম। বলল সে দ্রুত কণ্ঠে, ‘স্যার, ঐ তরুণী আহমদ শাহ আলমগীরের বোন, আর উনি তাঁর মা। ওদেরকেও ধরে নিয়ে যাচ্ছে।’
আহমদ মুসা গংগারামের সবটা কথা শোনার জন্যে অপেক্ষা করেনি। দৌড় দিয়েছিল ওদের লক্ষ্যে।
আহমদ মুসা লোকগুলোর সামনা-সামনি হয়ে প্রচ- ধমকের সুরে বলল, ‘কে তোমরা? ওদের ছেড়ে দাও।’
ওরা থমকে দাঁড়াল।
ওরা ছয়জন।
তরুণীকে দুজনে হাত ও পা ধরে চ্যাংদোলা করে নিয়ে আসছিল। অন্য দুজনে মহিলার দুহাত ধরে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে আসছিল। অন্য দুজন তাদের পাশে পাশে আসছিল।
আহমদ মুসার কথা শুনে ওরা থমকে দাঁড়ালেও তরুণী ও মহিলাকে ওরা ছেড়ে দেয়নি। দুজন যাদের হাত খালি, তারা তেড়ে এল আহমদ মুসার দিকে। তাদের দুজনের হাতেই দুটি রিভলবার উঠে এসেছে।
ওরা দুজন আহমদ মুসার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসার দিকে রিভলবার তাক করে বলল, ‘এই মুহূর্তে পালাও, নইলে..............।’
তাদের কথা শেষ হলো না, আহমদ মুসার মাথাটা অকস্মাৎ নিচে নেমে গেল। আর তার দুই পা তীর বেগে ছুটে গিয়ে লোক দুজনের দুপায়ের টাখনুর উপরে প্রচ- আঘাত হানল।
লোক দুজন গোড়াকাটা গাছের মত সবেগে পড়ে গেল।
আহমদ মুসা পড়েছিল চিৎ হয়ে। আর ওরা আহমদ মুসার দুপাশে পড়েছিল উপুড় হয়ে।
আহমদ মুসা পড়েই উঠে বসেছিল।
ওরা দুজন পড়ে যাবার পর সামলে উঠার আগেই আহমদ মুসা ওদের দুজনের হাত থেকে রিভলবার কেড়ে নিল।
লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
ওদিকে ওরা চারজন তরুণী ও মহিলাকে ছেড়ে দিয়ে পকেট থেকে রিভলবার বের করতে যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা সুযোগ দিল না ওদের। তার দুহাতের দুই রিভলবার নিখুঁত লক্ষ্যে চারটি গুলি করল। ওদের চার জনের গুলী বিদ্ধ হাত থেকে রিভলবার খসে পড়ল। ওরা নিজেদের হাত চেপে ধরে কঁকিয়ে উঠল।
এদিকে এরা দুজন ভূমিশয্যা থেকে উঠে দাঁড়াচ্ছিল।
আহমদ মুসা দুজনের দিকে দুহাতের রিভলবার তাক করে বলল, ‘কোন চালাকির চেষ্টা করলে ওদের মত আর হাতে নয় মাথার খুলি উড়িয়ে দেব।’
আহমদ মুসা যখন এ দুজনের দিকে মনোযোগ দিয়েছিল, তখন ওরা চারজন আহত হাত চেপে ধরে মাথা নিচু করে ভোঁ দৌড় দিয়েছে গাড়ির লক্ষ্যে গেটের দিকে।
গংগারাম চিৎকার করে উঠল, ‘স্যার, ওরা পালাচ্ছে। আহমদ মুসা তাকাল ওদের দিকে। এই সুযোগে এরা দুজন আহমদ মুসার হাত থেকে রিভলবার কেড়ে নেবার জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল আহমদ মুসার উপর।
কিন্তু আহমদ মুসার চোখ ভিন্ন দিকে সরে গেলেও দুরিভলবারের ট্রিগার থেকে দুতর্জনি একটু সরেনি। সুতরাং ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ার সাথে সাথে তর্জনি ঠিক সময়েই ট্রিগার টিপে দিয়েছিল। দুজনেই বুকে গুলীবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেল।
আহমদ মুসা ছুটে গেল মহিলার দিকে। মাটিতে লুটানো দুটি ওড়নার একটি তরুণীর দিকে ছুড়ে দিয়ে অন্যটি মহিলাটির মাথা ও গায়ে জড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘মা, আপনি ভাল আছেন তো? কিছু হয়নি তো?’
মহিলার চোখে-মুখে বিস্ময়, আনন্দ ও বেদনার প্রকাশ। ‘মা’ ডাক শুনেই বোধ হয় পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল আহমদ মুসার দিকে মহিলাটি। তারপর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
তরুণীটি এগিয়ে এসে মহিলার পাশে দাঁড়াল।
মহিলাটি এক হাত দিয়ে তরুণীকে কাছে নিয়ে বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘আল্লাহর ফেরেস্তা হয়ে এসে আমাদের রক্ষা করেছ। কে তুমি বাবা?’
‘আল্লাহ আপনাদের রক্ষা করেছেন। মানুষ মানুষকে বাঁচাতে পারে না মা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তুমি একজন বড় ঈমানদারের মত কথা বললে। কে তুমি বাবা?’ মহিলাটি বলল।
‘বলছি মা। আগে বলুন এ লাশগুলোকে লুকানোর কোন জায়গা আছে কি না? ঝামেলা এড়াবার জন্যে এ লাশগুলোকে লুকানো দরকার।’
মহিলা কিছু বলার আগেই তরুণীটি বলে উঠল, ‘আছে জনাব। আমাদের বাড়ির পেছনের প্রাচীরে একটা দরজা আছে। এরপর জংগল। নিচে পাহাড়ের গোড়া দিয়েই সাগর। জংগলের মধ্যে দিয়ে পায়ে চলার রাস্তা আছে।
আহমদ মুসার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
তরুণীটির উদ্দেশ্যে ‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসা গংগারামের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘গংগারাম, তোমার গাড়ি লক করেছ?’
‘জি স্যার।’
‘তাহলে তুমি গেটটা লক করে দিয়ে তাড়াতাড়ি এস।’
‘আচ্ছা স্যার’ বলে ছুটল গংগারাম গেটের দিকে। গেটটা লক করে দিয়ে আবার ছুটে এল সে আহমদ মুসার কাছে। এসেই বলল, ‘স্যার, সাহসী বলে আমার সুনাম আছে। কিন্তু আমার গা এখনও কাঁপছে স্যার। আপনি খালি হাতে কি করে ওদের মোকাবিলা করে চারজনকে আহত এবং দুজনকে হত্যা করে যুদ্ধজয় করলেন। কোন সিনেমাতেও স্যার আমি এখনও এমন কোন দৃশ্য দেখিনি।’
‘বাস্তব সব সময় কল্পনার চেয়ে বড় হয়। রাখ এসব কথা। লাশ সাগর পর্যন্ত নিতে সাহায্য কর। তুমি একজনকে নাও। আরেকজনকে আমি নিচ্ছি।’ বলে আহমদ মুসা তাকাল মহিলার দিকে, তারপর তরুণীর দিকে। বলল তরুণীকে লক্ষ্য করে, ‘শোন, আমরা না ফেরা পর্যন্ত বাইরের দরজা কারও কথাতেই খুলবে না। যদি দরজা ভেঙে ফেলছে দেখল, তাহলে মাকে নিয়ে পেছন দরজা দিয়ে জংগলে প্রবেশ করবে।’
মেয়েটি এমনিতেই এখনও স্বাভাবিক হতে পারেনি। আহমদ মুসার কথা শুনে মেয়েটি ভয়ে চুপসে গেল। কাঁপতে শুরু করল আবার।
এটা দেখে আহমদ মুসা মেয়েটি ও মহিলা উভয়কে লক্ষ্য করে বলল, ‘কেউ আসবে না আমি মনে করি। আমি বলছি সাবধান থাকার কথা। আর ভয় নেই আপনাদের।’
‘বরং আমরাও তোমাদের সাথে যাই বাবা।’ বলল মহিলাটি।
‘প্রয়োজন নেই মা। আমাদের ফিরতে দেরি হবে না।’
বলে আহমদ মুসা একটি লাশ কাঁধে তুলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল।
গংগারামও তার পেছনে পেছনে চলল, ‘মিনিট বিশেক পরেই আহমদ মুসারা ফিরে এল।
ফিরে এসে দেখল উঠানে রক্তের কোন চিহ্ন নেই। ওরা মা ও মেয়ে দুজনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।
আহমদ মুসারা পেছন দরজা দিয়ে এসে উঠানে প্রবেশ করতেই মহিলারা উঠানে নেমে এল। বলল, ‘বাবা, তোমরা এস। বসবে চল।’
‘চলুন’ বলেই আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল, ‘রক্ত আপনারা মুছে ফেলেছেন মা?’
‘হ্যাঁ বাবা। শাহ বানু ওগুলো মুছে ফেলেছে। লাশ যেমন গেছে, লাশের চিহ্নও মুছে ফেলা দরকার।’ বলল মহিলাটি।
আহম মুসা মুখ ফিরাল তরুণীর দিকে। বলল, ‘ধন্যবাদ।’
‘চল বাবা, বসবে।’ বলে মহিলাটি আবার তাড়া দিল আহমদ মুসাকে।
‘চলুন মা।’
‘এস’ বলে হাঁটতে লাগল মহিলাটি।
ঘরটিতে প্রবেশ করেই আহমদ মুসা দেখল মোঘল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবর-এর ছবি। তার পাশের ছবিটিকে চিনতে পারলো না আহমদ মুসা। ছবির মানুষটি একজন সুদর্শন যুবক। তার পরনে কয়েদীর পোশাক। যুবকের চোখে কয়েদীর অপরাধবোধ নেই, বরং আছে উন্নত শির এক আভিজাত্য। ইনিই কি ‘ফিরোজ শাহ’, ভাবল আহমদ মুসা।
মহিলা ঘরে ঢুকে সবাইকে বসার জন্যে আহ্বান জানাল।
আহমদ মুসা বসতে বসতে দেয়ালের ছবির দিকে ইংগিত করে বলল, ‘তৈলচিত্রের ছবি সম্রাট বাবরের, ফটোর ছবি কি বন্দী মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহের মনোনীত মোঘল সম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী ফিরোজ শাহের?’
মহিলার চোখে-মুখে কিছুটা বিস্ময় ফুটে উঠল। বলল, ‘তুমি এদের সবাইকে চেন দেখছি বাবা!’
‘তা নয়। সম্রাট বাবরকে তো সকলেই চিনবে। ফটোর নামটা বলেছি আমি অনুমান করে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তোমার অনুমান ঠিক বাবা। উনিই মোঘল সম্রাজ্যের শেষ উত্তরাধিকারী যাবত-জীবনের জন্যে দন্ডপ্রাপ্ত, আন্দামানে নির্বাসিত এবং আন্দামানে আমাদের প্রথম পূর্ব পুরুষ ফিরোজ শাহ।’ বলল মহিলাটি।
‘টাঙানোর জন্যে ছবির চমৎকার সিলেকশন মা। বাবর ভারতে মোঘল বংশের প্রতিষ্ঠাতা আর ফিরোজ শাহ আন্দামানে মোঘল বংশের প্রতিষ্ঠাতা। চমৎকার মিল দুইয়ের মধ্যে।’
‘কিন্তু অমিলই বেশি জনাব। সম্রাট বাবর ভারতে এসেছিলেন বিজয়ীর বেশে। আর জনাব ফিরোজ শাহ আন্দামানে আসেন বন্দী বেশে। অন্যদিকে বাবর ভারতে একটা সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন, আর ফিরোজ শাহ যাপন করেছেন বন্দী প্রজার জীবন।’ মহিলাটি কিছু বলার আগেই বলে উঠল মেয়েটি।
আহমদ মুসা তাকাল তরুণীর দিকে। এই প্রথম তার মুখের উপর চোখ পড়ল আহমদ মুসার। অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। তার সাথে সেখানে আভিজাত্যের যোগ। বয়স উনিশ-বিশের বেশি হবে না। রংয়ের দিক দিয়ে জীবন্ত একটা ইরানী ফুল।
আহমদ মুসা বলল, ‘সুন্দর পার্থক্য দেখিয়েছ তুমি। কিন্তু যে দিকটা ভাল নয়, তা সামনে না আনার মধ্যেই কল্যাণ বেশি।’
কিছু বলতে যাচ্ছিল তরুণীটি। কিন্তু তার মা বাধা দিয়ে বলল, ‘চুপ, কথার পিঠে কথা সব সময় বলতে নেই।’
কথা শেষ করেই মহিলাটি তাকাল আহমদ মুসার দিকে। তারপর সোফায় সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘বেটা, তুমি বলেছ আল্লাহ মানুষকে রক্ষা করে। কিন্তু সেটা করেন তিনি কোন উপলক্ষের মাধ্যমে। সেই উপলক্ষ তুমি বাবা। আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি, ঠিক সময়ে তিনি তোমাকে পৌছিয়েছেন। তুমি নিজের জীবনের পরোয়া না করে আমাদের বাঁচিয়েছো।’
কণ্ঠ ভারী, চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠেছে মহিলার। একটু থামল সে।
মুখ নিচু করে নিজেকে সম্বরণ করে নিল। বলল আবার, ‘আমাদের তুমি জান কিনা, কতটুকু জান আমি জানি না। বেটা, আমি এক হতভাগ্য মা। আমার ছেলে কিছু দিন আগে হারিয়ে গেছে। তার জন্যে কিছুই করতে পারছি না আমরা। এ আমার একমাত্র মেয়ে শাহ বানু। এই মেয়ে এবং আমি কত বিপদে আছি তা তুমি দেখলে।’
‘আমি এত কিছু জানতাম না মা। শুধু জানি আহমদ শাহ আলমগীরের বিষয়টা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তুমি কে বাবা? নিশ্চয় আন্দামানে তোমার বাড়ি নয়, হয় তো ভারতেও নয়।’
‘ভারতেও নয় এ কথা কেমন করে বললেন মা?’
‘তোমার ইংরেজী বলাটা ভারতের মত নয়। তাছাড়া তোমার চেহারাও সাধারণ ভারতীয়ের মত নয়।’
‘ধন্যবাদ মা, ঠিকই ধরেছেন আপনি।’
বলে একটু থামল আহমদ মুসা। তারপর আবার বলা শুরু করল। গংগারামকে দেখিয়ে বলল, ‘ইতিমধ্যে নাম জেনেছেন। এ হলো গংগারাম। আমি আন্দামানে আসার পর তার ক্যাবেই ঘুরছি। সে আমার সাথী এবং গাইড দুটোই।’
মহিলা মানে শাহ বানুর মার মুখে এবার একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল। বলল, ‘এ আবার গংগারাম হলো কবে থেকে? একে তো আমরা চিনি। এতো আন্দামান ষ্টেট কলেজের ছাত্র গাজী গোলাম কাদের।’
বিস্ময় ফুটে উঠল আহমদ মুসার চোখে-মুখে। তাকাল সে গংগারামের দিকে। বলল, ‘কথা বল গংগারাম, মিথ্যা পরিচয় কেন দিয়েছ?’
‘স্যরি স্যার। আমি আপনাকে মিথ্যা পরিচয় দেয়নি। এ পরিচয়টা আমি অনেক আগেই নিয়েছি। ডিগ্রী পাশ করার পর আন্দামানে চেষ্টা করেছি ভাল চাকুরি হয়নি। তারপর কোলকাতা ও মাদ্রাজেও গেছি, কিন্তু চাকুরি মেলেনি। পরে হোটেল সাহারার মালিক হাজী আবদুল আলী আবদুল্লাহ নিজে জামানত দিয়ে কিস্তিতে আমাকে একটা ট্যাক্সি ক্যাব পাইয়ে দেন এবং পরামর্শ দেন যে, মুসলিম না নিয়ে আমি যেন ট্যাক্সি ক্যাব না চালাই। কারণ তাতে ব্যবসা কম হবে, যে কোন সময় বিপদও হতে পারে। তিনি আমাকে নতুন নাম দেন গোপী কিষণ গংগারাম। সেই থেকে আমি গোপী কিষণ গংগারাম। আমার নতুন বাড়ির প্রতিবেশীরাও আমাকে আজ গংগারাম বলেই জানে। এতে আমি দেখেছি আমার বিরাট উপকার হয়েছে। আমি মুসলিম নামে থাকলে আমার লাশ হয় তো এতনি সাগরকূলে পাওয়া যেত। আমরা মোপলা মুসলিম ছেলে যারা এক সঙ্গে কলেজে পড়তাম, তাদের কেউই বেঁচে নেই। আমার মনে হচ্ছে মোপলা যুবকরাই আজ প্রধান টার্গেট হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে হয়, আমার মোপলা পরিচয় নেই বলেই আমি এখনও বেঁচে আছি আল্লাহর ইচ্ছায়।’
থামল গংগারাম।
আহমদ মুসার ভ্রুকুঞ্চিত হয়ে উঠেছে গংগারামের কথা শুনে। গংগারাম থামতেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘গংগারাম, না না গাজী গোলাম কাদের, কেন তুমি বললে, মোপলা মুসলিম যুবকরাই চলমান রহস্যজনক মৃত্যুর প্রধান টার্গেট?’
‘স্যার, নিহত ৩৬ জন যুবকের মধ্যে ২৫ জনই মোপলা বংশোদ্ভুত মুসলিম যুবক, ৬ জন ভারতীয় ওয়াহাবী বংশোদ্ভুত তরুণ এবং অবশিষ্ট ৫ জন মালয়ী, কারেন এবং অন্যান্য। সর্বশেষ আপনি যাকে বাঁচাতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু সম্ভব হয়নি, সেই ইয়াহিয়া আবদুল্লাহও মোপলা বংশোদ্ভুত।’ বলল গংগারাম।
অবাক বিস্ময়ে আহমদ মুসার দুচোখ স্থির হয়ে গেছে। গংগারাম থামলেও আহমদ মুসা মুহূর্ত কয়েক কথা বলতে পারলো না।
একটু পর অনেকটা স্বগত কণ্ঠে আহমদ মুসা বলল, ‘মোপলারা একটু সাহসী, প্রতিবাদী এই কারণেই হয় তো।’ তারপর বলল, ‘তোমার কথা ঠিক। কিন্তু আরও কথা আছে গংগারাম।’
‘সেটা কি স্যার?’
‘মোপলাদের অতীত।’
‘কি অতীত?’
‘কেন মোপলাদের ইতিহাস জান না?’
‘গত শতাব্দীর শুরুতে ভারতের মালাবারে (আজকের কেরালায়) মোপলারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়েছিল, বহু খুনোখুনি তাতে হয়েছিল এই কথা জানি।’
‘তুমি ভুল জেনেছ গংগারাম। তুমি যেটা পড়েছ, জেনেছ ওটা রূপকথা, ইতিহাস নয়। মোপলারা কোন দিন কোথাও এ ধরনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধায়নি।’
‘কিন্তু আমরা ইতিহাসে পড়েছি এটা।’ বলল গংগারাম জোর দিয়ে।
‘ইতিহাস ওখানে মিথ্যা কথা বলেছে। সত্য গোপন করেছে।’
‘সেই সত্যটা কি?’ জিজ্ঞেস করল গংগারাম।
‘সেটা অনেক কথা। সংক্ষেপে কথা হলো, মোপলারা ভারতের সংগ্রামী জনগোষ্ঠী। অষ্টম শতাব্দীতেই আরব বণিক ও মুসলিম মিশনারীদের মাধ্যমে ইসলাম ভারতের মালাবার উপকূলে প্রবেশ করে। স্থানীয় মানুষ ব্যাপকহারে ইসলাম গ্রহণ করে। পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে যেমন হয়েছে, তেমনি আরব বণিক ও মিশনারীদের অনেকেই বসতি গড়ে এখানে থেকে যায়। তারা স্থানীয়দের সাথে বৈবাহিত সম্পর্কের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের সাথে একাকার হয়ে যায়। এভাবে ভারতের দক্ষিণ উপকূলের মালাবার অঞ্চলে একটা মুসলিম জনগোষ্ঠী গড়ে উঠে। এরাই মোপলা নামে পরিচিত হয়। এরা বিশ্বাসে যেমন ছিল অবিচল, তেমনি সাহসেও অপ্রতিরোধ্য ছিল এরা। এদের আরেকটা বৈশিষ্ট্য ছিল- এরা স্বাধীনচেতা ও সংগ্রামী। ভারতের মুসলিম শাসনের পতনের পর পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হবার জন্যে এরা বার বার সংগ্রাম ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ১৮৪৯, ১৮৫১, ১৮৫২ ও ১৮৫৫ সালে এদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ গোটা ভারতবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অমানবিক হত্যা-নির্যাতনের মাধ্যমে এদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বৃটিশরা এতে সফল হয়নি। প্রতিটি সুযোগেই এরা বিদ্রোহ করেছে ও স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সর্বশেষ এদের বড় ধরনের স্বাধীনতা যুদ্ধ সংঘটিত হয় ১৯২১ সালে। হাজার হাজার সৈন্য লেলিয়ে দিয়ে এই বিদ্রোহ দমন করে বৃটিশরা। এই যুদ্ধে ২২২৬ জন মোপলা শহীদ হয়, এছাড়া ১৬১৫ জন আহত হয় এবং বন্দী ৫৬৮৮ জন এবং বিচারের প্রহসন চলে মামলা নিয়ে। ১৯২২ সালে হাজার হাজার মোপলা মুসলিমকে আন্দামানে নির্বাসিত করা হয়। গংগারাম, তুমি যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা বললে ওটা কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছিল না। সেটা ছিল বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে মোপলাদের ১৯২১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম। এই স্বাধীনতা সংগ্রামকেই তোমরা পড়েছ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হিসাবে।’
থামল আহমদ মুসা।
বিস্ময়ে হা হয়ে গিয়েছিল গংগারামের মুখ।
অবাক-বিস্ময় শাহ বানু এবং শাহ বানুর মা’র চোখে-মুখেও।
কথা বলল প্রথমে গংগারাম। বলল, ‘স্যার, একজন ট্যুরিষ্ট বেভান বার্গম্যান এসব কথা বলতে পারেন না। বহু ট্যুরিষ্ট আমি পেয়েছি স্যার, কিন্তু কাল থেকে আপনাকে যতটা জেনেছি, তাতে কোন ট্যুরিষ্টের সাথেই আপনার মিল খুঁজে পাইনি। সন্ত্রাস দেখে ট্যুরিষ্টরা পালায়, কিন্তু আপনি কালকে বন্দরে নেমেই একজনকে বাঁচাবার জন্যে সন্ত্রাসীদের পিছু নিয়েছেন। একজন ট্যুরিষ্টের এমন আচরণ হতেই পারে না।’
গংগারাম থামল।
গংগারাম থামতেই শাহ বানু বলে উঠল, ‘কিছুক্ষণ আগে এখানে যে অবিশ্বাস্য ও অভূতপূর্ব ঘটনায় আমরা মুক্তি পেলাম, সেটা নিছক কোন ট্যুরিষ্টের কাজ নয়। অত্যন্ত প্রতিভাবান প্রফেশনাল হলেই শুধু কেউ এই পরিস্থিতিতে লড়াই করতে পারে, জেতার আশা তো আরও বড় যোগ্যতার ব্যাপার! তিনি লড়াই করেছেন এবং জিতেছেনও। বিভিন্ন পেশার লোক ট্যুরিষ্ট হন। সুতরাং দুনিয়ার ট্যুরিষ্টদের মধ্যে এমন যোগ্যতার ট্যুরিষ্ট থাকতেও পারেন, কিন্তু জনাবের মধ্যে যে অবগতি ও আবেগ দেখেছি তাকে কাকতালীয় ঘটনা বলা যায় না। সুতরাং জনাবের পরিচয় সম্পর্কে প্রশ্ন থেকেই যায়।’
‘তুমি বুদ্ধিজীবর মত কথা বলেছ শাহ বানু। তা হবে। জান তুমি, ঐতিহাসিক কোন মহিলার নামের সাথে শাহ বানু নাম জড়িত?’ শাহ বানুর দিকে মুখটা একটু ফিরিয়ে জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
‘জানি। সম্রাট শাহজাহানের পত্নী সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহলের বাল্যনাম শাহ বানু।’ শাহ বানু বলল।
‘ধন্যবাদ।’ উত্তরে বলল আহমদ মুসা।
‘তোমার নাম কি বাবা? তোমার পরিচয় তো এখনও তুমি দাওনি।’ জিজ্ঞাসা করল শাহ বানুর মা।
গম্ভীর হলো আহমদ মুসা।
ধীরে ধীরে বলল, ‘মা, পাসপোর্টে আমার নাম লিখা আছে বেভান বার্গম্যান। হোটেলেও এ নাম লিখা হয়েছে। গংগারামরাও আমার এ নামই জানে। কিন্তু আপনার কাছে এ নামটা আমি বলতে পারবো না মা। কারণ আমার নাম এটা নয়। কিন্তু আমার আসল নামটাও আপনাকে এখন আমি বলতে পারবো না। আরও পরে হয়তো বলা যাবে।’
শাহ বানু, শাহ বানুর মা সবারই বিস্ময়দৃষ্টি আহমদ মুসার মুখের উপর আছড়ে পড়েছে। আর সত্যিই বিস্ময়ে হা হয়ে গেছে গংগারামের মুখ।
কারও মুখেই কোন কথা নেই।
এবার শাহ বানুর মা বলল, ‘তুমি আমাদের বিশ্বাস করতে পারছ না বাবা?’
‘অবিশ্বাস নয় মা, এটা আমার সাবধানতা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কেন সাবধানতা?’ বলল শাহ বানুর মা।
‘এই ‘কেন’-র উত্তর দিতে হলে সব কথা বলতে হয়। বলব আমি। কিন্তু এই মুহূর্তে বলতে পারছি না।’
‘স্যার, আমি বাইরে যাচ্ছি। তবু বলুন।’ বলল গংগারাম।
‘তোমাকে আমি অবিশ্বাস করি না গংগারাম। তুমি মুসলমান না হলেও তোমার প্রতি আমার আস্থা থাকতো।’
বলে একটু থামল আহমদ মুসা।
ভাবল একটু। তারপর তাকাল শাহ বানুর মায়ের দিকে। বলল, ‘মা, আমি আন্দামানে এসেছি আহমদ শাহ আলমগীরের সন্ধান করার জন্যে। আর এসেছি এ পর্যন্ত যে তিন ডজন মুসলিম যুবকের রহস্যজন মৃত্যু হয়েছে তার কারণ সন্ধানের জন্যে। আমার নাম যেমন ছদ্ম, তেমনি আমার ট্যুরিষ্ট পরিচয়ও ছদ্মবেশ।’ থামল আহমদ মুসা।
আনন্দ-বিস্ময় ঠিকরে পড়ছে শাহ বানু ও শাহ বানুর মায়ের চোখ-মুখ থেকে। বোবা বিস্ময় গংগারামের চোখে-মুখেও।
আনন্দ-বিস্ময়ে আচ্ছন্ন শাহ বানুর মা এক সময় দুহাত উপরে তুলে কেঁদে উঠল, ‘হে আমার রব, আমার দুকান এইমাত্র যা শুনল তা যেন স্বপ্ন না হয়, এই যুবক যেন স্বপ্ন না হয়। আন্দামানে আজ কেউ নেই তোমার অসহায় বান্দাদের সাহায্য করার। তোমার সাহায্যই আমাদের সম্বল। এই যুবকের কথা যেন সত্য হয়। এই যুবক যেন সত্য হয়।’
মায়ের সাথে সাথে শাহ বানুর দুগ- বেয়েও গড়িয়ে পড়ছিল নীরব অশ্রুর দুটি ধারা।
শাহ বানুর মা ওড়না দিয়ে চোখ মুছে বলল, ‘তোমাকে আল্লাহ সাহায্য করুন বেটা। কিন্তু তুমি এ সব জানতে পারলে কি করে? কোন আন্তর্জাতিক, এমনকি এখানকার মিডিয়াতেও তো এ খবর যায়নি!’
‘মা, আমি এ সংবাদ কোন কাগজ থেকে জানিনি। দুমাস আগে আমি তখন আমেরিকায়। মক্কা থেকে একটা ইসলামী সংগঠন ই-মেইল করে আমাকে সব ঘটনা জানায়। আমি তখনই সিদ্ধান্ত নেই এখানে চলে আসার।’
‘তুমি কি আমেরিকায় থাক? আমেরিকার নাগরিক?’ বলল শাহ বানুর মা।
‘হ্যাঁ মা, আমি আমেরিকারও নাগরিক। কিন্তু আমেরিকা আমার দেশ নয়। ওখানে আমি থাকিও না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে দেশ কোনটা?’ জিজ্ঞাসা শাহ বানুর মার।
আহমদ মুসা একটু ম্লান হাসল। বলল, ‘কি বলব মা। আমি সব মুসলিম দেশকেই আমার দেশ বলে মনে করি। সব মুসলিম দেশই আমাকে নাগরিকত্ব দিয়েছে। সব দেশেই আমি যেতে পারি, ও থাকতে পারি। কিন্তু বিশেষ কোন দেশকে আমি আমার দেশ বলে এখনো ভাবিনি।’
অবাক বিস্ময়ে ছেয়ে গেছে শাহ বানুর মা এবং গংগারামের মুখ। আর ভ্রু-কুঞ্চিত হয়ে উঠেছে শাহ বানুর। তার তীক্ষè সন্ধানী দৃষ্টি আহমদ মুসার মুখের উপর।
একটু নীরবতা ভেঙে শাহ বানুর মা বলে উঠল, ‘বেটা, তুমি অবাক করলে। এমন দেশহীন এবং সর্বদেশীয় নাগরিক কেউ হতে পারে?’
হঠাৎ মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল শাহ বানুর। দ্রুত কণ্ঠে সে বলল, ‘পারেন মা, শুধু একজন পারেন।’
কথা শেষ করেই ‘আসছি মা’ বলে শাহ বানু ছুটে গিয়ে বেরিয়ে গেল বৈঠকখানা থেকে।
সিঁড়ি দিয়ে দুতালায় উঠে গেল। ঢুকল তার ভাই আহমদ শাহ আলমগীর-এর ঘরে। খুলল আহমদ শাহ আলমগীরের ফাইল ক্যাবিনেট।
ফাইল ক্যাবিনেটের একটা ড্রয়ার থেকে একটা ফাইল বের করে আনল। ফাইলে নাম লেখা ‘আহমদ মুসা’। ফাইলে অনেকগুলো নিউজ ক্লিপিং এবং কয়েকটা ম্যাগাজিন।
সবগুলো নিউজ ক্লিপিং আহমদ মুসা সম্বন্ধীয় এবং সবগুলো ম্যাগাজিনেই আহমদ মুসা সম্পর্কে ষ্টোরি আছে। তার মধ্যে একটা ম্যাগাজিনে রয়েছে কভার পেজে বিরাট ফটোসহ বিশাল কভার- ষ্টোরি।
ম্যাগাজিনটি শাহ বানু সামনে নিয়ে এল। অপার বিস্ময়-আনন্দ-আকুলতার সাথে চেয়ে আছে কভার ষ্টোরির আহমদ মুসার দিকে। ছবির এই আহমদ মুসা এবং যিনি এসেছেন একই লোক, এক চেহারা। সামান্য পার্থক্য কোথাও নেই। তবে ছবির চেয়ে বাস্তবের আহমদ মুসা আরও মধুর।
অনেকক্ষণ ছবি থেকে চোখ তুলতে পারলো না শাহ বানু। স্বপ্নের মানুষ এই মানুষ তার কাছে। আর তার ভাই আহমদ শাহ আলমগীরের কাছে আহমদ মুসা একজন মুকুটহীন শাহানশাহ। আহমদ মুসা সম্পর্কে কোথাও কোন তথ্য বা লেখা উঠলে, যে ভাবেই হোক সে তা সংগ্রহ করবেই। এই ভাবেই আহমদ শাহ আলমগীর ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছে এই ফাইল। এই কাজে শাহ বানু ছিল তার সাথী। ভাইয়ের কাছে গল্প শুনে শুনেই শাহ বানু আকৃষ্ট হয় আহমদ মুসার প্রতি। তারপর আহমদ মুসা সম্পর্কে পড়ে পড়ে সে তার স্বপ্নের মানুষে পরিণত হয়।
সেই স্বপ্নের মানুষ আজ তাদের বাড়িতে! শুধু কি আসা? একেবারে রূপকথার রাজকুমারের মত পংখীরাজ ঘোড়ায় চড়ে এসে দৈত্যের গ্রাস থেকে তাদের উদ্ধার করেছে! আকুল করা এক অপার্থিব শিহরণ জাগল তার গোটা দেহে।
ম্যাগাজিনটা হাতে নিয়ে ফাইল বন্ধ করে এক হাতে ম্যাগাজিন, অন্য হাতে ফাইল নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল ফিরে আসার জন্যে। কিন্তু সামনে পা বাড়াতে গিয়ে যে উচ্ছাস নিয়ে ছুটে এসেছিল, সেই উচ্ছাসের শক্তিকে সে আর খুঁজে পেল না। রাজ্যের জড়তা এসে তার দুপা যেন জড়িয়ে ধরল। এক মহাসাগরের সামনে ঝর্নার এক ছোট ধারা কি করে গিয়ে দাঁড়াতে পারে! তবু যেতেই হবে।
এক পা দুপা করে গিয়ে শাহ বানু প্রবেশ করল বৈঠকখানায়।
সবাই তাকাল শাহ বানুর দিকে।
সংকোচের প্রাচীর ডিঙিয়ে শাহ বানুর চোখও ছুটে গিয়েছিল আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসা চোখ নামিয়ে নির। শাহ বানুও চোখ রাখতে পারল না আহমদ মুসার উপর। সে চোখ নামিয়ে নিয়ে তাকাল মায়ের দিকে। মায়ের পাশে বসে ম্যাগাজিন ও ফাইলটা তার হাতে তুলে দিতে দিতে বলল, ‘কোন দেশের না হয়েও যিনি সব দেশের নাগরিক হতে পারেন, তাঁকে দেখ মা।’
ম্যাগাজিন ও ফাইল হাতে নিয়ে ম্যাগাজিনের কভারে আহমদ মুসার নাম ও বিরাট ছবিটার দিকে তাকিয়ে ভূত দেখার মত চমকে উঠল তার মা। তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বিস্ময় বিস্ফোরিত তার দৃষ্টি। বাকহীনভাবে তাকিয়ে থাকল আহমদ মুসার দিকে। এক সময় তার মুখ ফুঁড়ে বেরিয়ে এল, ‘সত্যিই কি তুমি আহমদ মুসা বেটা?’
তারপর মুখ উপরে তুলে বলল, ‘হে আল্লাহ, তুমি সবই করতে পারো। যে জিজ্ঞাসা আমি করলাম, তার উত্তর তুমি ‘হ্যাঁ’ কর। এক অসম্ভবকে তুমি সম্ভব কর প্রভূ।’ শাহ বানুর মার কণ্ঠে আকুল কান্নার সুর। বিস্ময়ের এক আকস্মিক ধাক্কায় দেহ শিথিল ও কম্পমান হয়ে পড়ল আর শিথিল হাত থেকে ফাইল ও ম্যাগাজিনটা পড়ে গেল।
আহমদ মুসাও বিস্মিত হয়ে পড়েছিল শাহ বানুর কথা এবং শাহ বানুর মার মুখে নিজের নাম শুনে।
ফাইল ও ম্যাগাজিনটা পড়ে গেলে আহমদ মুসা বলল, ‘শাহ বানু ও দুটো আমাকে দাও দেখি।’
শাহ বানু যন্ত্র চালিতের মত উঠে ফাইল ও ম্যাগাজিন নিয়ে তুলে দিল আহমদ মুসার হাতে। কাঁপছিল শাহ বানুর হাত।
‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসা শাহ বানুর হাত থেকে ম্যাগাজিন ও ফাইলটা গ্রহণ করল।
ম্যাগাজিনটা দেখেই আহমদ মুসা চিনতে পারল। বেশ পুরানো। আহমদ মুসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সুরিনামে যায়, সে সময় ম্যাগাজিনটি তাকে নিয়ে এই কভার ষ্টোরি করে।
শাহ বানু ও তার মার ব্যাপারটা বুঝল আহমদ মুসা। ফাইল খুলে আহমদ মুসা ক্লিপিংগুলোর দিকে চোখ বুলাল। নিউজ আইটেমগুলোর দুএকটা ছাড়া সবই তার অদেখা। বিস্মিত হলো তার সম্পর্কিত নিউজের কালেকশান দেখে। মনে হয় সংগ্রহ শুরুর পর কোন একটি নিউজও বাদ দেয়নি। নিউজের মধ্যে ইন্টারনেট রিপোর্টও রয়েছে। কার ফাইল এটা? কে সংগ্রহ করল এগুলো? শাহ বানু? ফাইল কভারের উপর নজর বুলাল আহমদ মুসা। সেখানে কারও নাম নেই। আহমদ মুসা তাকাল শাহ বানুর দিকে। বলল, ‘ধন্যবাদ শাহ বানু! আমার মত একজনকে নিয়ে এত বড় ফাইল করতে এ পর্যন্ত কাউকে আমি দেখিনি। অকাজের এই কাজ কে করল শাহ বানু?’
‘ভাইয়া করেছেন। কিন্তু তিনি কোন অকাজ করেননি? ভাল কাজের রেকর্ড সংগ্রহ অবশ্যই একটা ভাল কাজ। কিন্তু পানির মধ্যে যিনি ডুবে আছেন, তিনি পানির আলাদা মূল্য অনুভব নাও ............।’
শাহ বানুর কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে তার মা বলে উঠল, ‘শাহ বানু, কথা না বলে তুমি থাকতেই পার না। কথার পিঠে কথা তোমার না বললেই যেন নয়। এখন থাম তুমি।’ বলে শাহ বানুর মা তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি বেটা। ছোট্ট এবং একেবারেই অনুল্লেখযোগ্য আন্দামানে এবং তার চেয়েও অজ্ঞাত ও অসহায় এই পর্ণ কুটিরে আল্লাহ তোমাকে নিয়ে এসেছেন। এ যেন অখ্যাত এক দেশের, অজ্ঞাত এক গ্রামের নামহীন এক হতভাগ্যের অন্ধকার কুটিরে স্বয়ং চাঁদের নেমে আসা। আমরা আমাদের হৃদয়ের সবটুকু আবেগ ও আকুতিসহ তোমাকে স্বাগত জানাচ্ছি বেটা। ‘যাদের কেউ নেই, তাদের আল্লাহ আছেন’, এই মহাসত্যের জীবন্ত এক রূপ হিসাবে তুমি এসেছ বাবা। এখন বল বেটা, আমরা তোমার জন্যে কি করব, আর তুমি আমাদের জন্যে কি করবে?’ আবেগ জড়িত কান্নারুদ্ধ কণ্ঠে বলল শাহ বানুর মা।
‘আমি এই ব্যাপারে আপনাদের সাথে কথা বলার জন্যেই এসেছি মা। আমি আহমদ শাহ আলমগীর সম্পর্কে জানতে চাই।’
‘কি জানতে চাও বাবা? বল?’
‘আহমদ আলমগীরের নিখোঁজ হওয়ার সাথে দুটি পক্ষ জড়িত হতে পারে। এক. ছত্রিশ জন যুবকের মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী তারা, দুই. গভর্নর বালাজী বাজী রাও এর লোকরা। কারা জড়িত থাকতে পারে আপনারা কিছু বলতে পারেন কিনা?’ বলল আহমদ মুসা।
শাহ বানু ও তার মা পরষ্পরের দিকে চাইল। তাদের চোখে কিছুটা বিস্ময়! এরপর শাহ বানুর মা বলল, ‘গভর্নরের লোকরা হবে কেন বেটা?’
‘গভর্নরের মেয়ে সুষমা রাওয়ের সাথে আহমদ আলমগীরের একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এটার চিরতরে ইতি ঘটানোর জন্যে গর্ভনরের লোকরা এটা করতে পারে।’
শাহ বানুর মা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। বলল, ‘এই সর্বনাশের পথ থেকে আমি আমার ছেলেকে সরাতে চেষ্টা করেছি, পারিনি। মেয়েটা খুব বেশি এগিয়ে এসেছিল। আর ওরা আন্দামানের বাইরে চলে যাবার পর আমাদের চেষ্টা আর কার্যকরী হয়নি।’
‘ও বিষয়টা থাক মা। গভর্নরের লোকরা তাকে কিডন্যাপ করতে পারে কিনা এটা জানা দরকার।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এটা বলা মুষ্কিল। ওদের কোন প্রতিক্রিয়া আমরা কখনই জানতে পারিনি।’ বলল শাহ বানুর মা।
‘সুষমা রাও কি কখনও এখানে এসেছে?’
‘এসেছে। দুবার। সে খুব ভাল মেয়ে। কিন্তু তার বাবা-মা সম্পর্কে আলোচনা আমরা কখনও করিনি, সেও কখনও তোলেনি।’
‘তার কাছ থেকে কোন সাহায্য পাওয়া যাবে?’
‘তাকে পাবে কোথায়। ঘটনার পর কয়েকদিন টেলিফোন করেছে। তবে প্রায় সাতদিন যাচ্ছে তার কোন টেলিফোন পাওয়া যায়নি। আমরা কখনও তার সাথে যোগাযোগ করিনি।’ শাহ বানুর মা বলল।
‘সুষমা রাওয়ের নাম্বার কি আমি পেতে পারি?’ বলল আহমদ মুসা।
‘অবশ্যই বেটা’ বলে শাহ বানুর মা শাহ বানুকে বলল, ‘তুমি নাম্বার লিখে দাও।’
সংগে সংগে শাহ বানু উঠে গেল।
‘স্যার, আমি একটা কথা বলি?’
‘অবশ্যই গংগারাম।’
‘ছয়জন, যারা ম্যাডামদের কিডন্যাপ করতে এসেছিল, তারা কেউ আন্দামানের লোক নয় স্যার।’ গংগারাম বলল।
‘কি করে বুঝলে?’
‘চেহারা দেখে স্যার।’
‘আন্দামানী ও ভারতীয় চেহারার মধ্যে খুব কি পার্থক্য আছে?’
‘সেটা হয়তো নেই। কিন্তু আন্দামানের বাসিন্দা ও আন্দামানে বহিরাগত এদের মধ্যে একটা পার্থক্য অবশ্যই আছে। যেমন স্যার, ওরা চারজন যেভাবে চোরের মত পালাল, আন্দামানীরা হলে পালাত না। আন্দামানীরা সাহসী। ডান হাত আহত হওয়ার পর ওরা বাম হাত দিয়ে গুলী করতো। তাছাড়া সেদিনের ওরা হাফপ্যান্ট ও হাফশার্ট পরা ছিল, এরাও তাই। আর এভাবে দল বেঁধে হাফপ্যান্ট, হাফশার্ট পরার কালচার আন্দামানে নেই।’ থামল গংগারাম।
‘ধন্যবাদ গংগারাম। আমি মনে করি তোমার কথা সত্য। তাহলে এর অর্থ কি এই যে আন্দামানের কোন পক্ষ বা ভারতের কোন পক্ষ বিশেষ মিশনে ভাড়া করা লোক ব্যবহার করছে? সেই পক্ষ কি গভর্নর বালাজী বাজী রাও মাধব হতে পারেন?’ অনেকটা স্বগতকণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
‘গভর্নর হলে আহমদ আলমগীরকে কিডন্যাপের একটা অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু ঐসব হত্যাকান্ডের কি অর্থ? গভর্নরই কি সব কিছু করাচ্ছেন? কেন?’ বলল গংগারাম।
‘এটাও একটা দিক গংগারাম।’ আহমদ মুসা বলল।
ঘরে প্রবেশ করল শাহ বানু। মায়ের হাতে একখ- কাগজ তুলে দিয়ে বসল মায়ের পাশে।
শাহ বানুর মা কাগজখ-ের উপর চোখ বুলিয়ে শাহ বানুর হাতে দিয়ে বলল, ‘ওদের দিয়ে এস।’
মুখটা শাহ বানুর আরক্ত হয়ে উঠল। কাগজখ- সে মায়ের হাতে না দিয়ে আহমদ মুসার হাতে দিয়ে আসতে পারতো। কিন্তু অজানা এক সংকোচে তার পা ওঠেনি। ফাইল দিতে গিয়ে তার হাত একবার কেঁপেছে। এই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি করতে সে আর সাহস পায়নি।
কিন্তু মায়ের নির্দেশে তাকে উঠতে হলো।
নিয়ে গেল কাগজখ- সে আহমদ মুসার কাছে। কাগজের খ-টি ছোট্ট।
কাগজ নেবার জন্যে হাত বাড়াল আহমদ মুসা। শাহ বানু হাত বাড়িয়ে কাগজখ- দিতে গিয়ে আহমদ মুসার হাতের কাছাকাছি হতেই শাহ বানুর হাতের আঙুলগুলো অকস্মাৎ নিঃসাড় হয়ে গেল। হাত থেকে খসে পড়ল কাগজখ-টি।
‘স্যরি’ বলল শাহ বানু কম্পিত কণ্ঠে।
আহমদ মুসা কাগজখ-টি মাটিতে পড়ার আগেই ধরে ফেলেছিল। বলল, ‘ওকে’ শাহ বানু।’
থামল আহমদ মুসা। হাসল। আবার বলে উঠল শাহ বানুকে লক্ষ্য করে, ‘শাহ বানু, কথায় যেমন তুমি বুদ্ধিমান, তেমনি সাহসেও তোমাকে শক্তিমান হতে হবে। কমপক্ষে তোমার ফুফু নুরজাহান ও দক্ষিণ ভারতের চাঁদ সুলতানার ইতিহাস তুমি পড়েছ নিশ্চয়?’
শাহ বানু কোন উত্তর না দিয়ে ছুটে এসে বসল তার আসনে। লজ্জা, সংকোচ ও আনন্দ সব মিলে তার মুখ আরও রাঙা হয়ে উঠেছে।
‘বাছা, সে রাজ্যও নেই, সেই রাজাও নেই, সেই শিক্ষাও নেই।’ শাহ বানুর মা বলল।
‘রাজ্য, রাজা সবই আছে মা। কিন্তু নাম পাল্টেছে, কাজও পাল্টে গেছে। দুনিয়ার অধিকাংশ স্বৈরতন্ত্রী আজ রাজা-বাদশাদের চেয়েও বড়। এমনিভাবে গণতন্ত্রী যারা ৫ বছরের জন্যে ক্ষমতায় বসেন, তারা অনেকেই মিনি রাজা হয়ে বসতে চান।’ বলল আহমদ মুসা।
উত্তরে কোন কথা বলল না শাহ বানুর মা।
তার মধ্যে ভাবান্তর দেখা গেল। গম্ভীর হয়ে উঠল শাহ বানুর মা। বলল ধীরে ধীরে, ‘বেটা, ওরা আহত বাঘের মত পাগল হয়ে উঠবে নিশ্চয়। আল্লাহর সাহায্য হিসেবে এসে একবার তোমরা আমাদের বাঁচিয়েছ। এরপর আমরা কি করব?’
‘আল্লাহ তো সব জায়গায় সব সময়ের জন্যে আছেন মা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তা আছেন। কিন্তু মানুষকে পথ খোঁজার জন্যে উঠে দাঁড়াতে হয়, তারপরই আল্লাহ তার সামনে পথ খুলে দেন।’ শাহ বানুর মা বলল।
গম্ভীর হয়ে উঠেছিল আহমদ মুসার মুখ। বলল, ‘আন্দামানে কি আপনাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন আছে?’
‘নেই বেটা।’ বলল শাহ বানুর মা।
‘আপনি ঠিকই বলেছেন মা, ওরা এখন আহত বাঘের মত। আমার ধারণা আজই তারা যে কোন সময় আক্রমণ করতে পারে। সুতরাং এ বাড়ি ছাড়তে হবে আপনাদের এখনই।’
বলেই আহমদ মুসা তাকাল গংগারামের দিকে। বলল, ‘গংগারাম, আরেকটা গাড়ি যোগাড় করতে পারবে এখন?’
‘অবশ্যই পারতে হবে স্যার। আমি দেখছি।’ কথা বলতে বলতেই উঠে দাঁড়িয়েছে। গংগারাম। মোবাইলটা পকেট থেকে হাতে তুলে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল সে ঘর থেকে।
‘গাড়ি কি করবে বেটা?’ গংগারাম বেরিয়ে যেতেই বলল শাহ বানুর মা।
‘আপনাদের অন্য কোথাও নিতে হবে। সব গুছিয়ে নিন মা।’
‘কোথায়?’ বলল শাহ বানুর মা। কণ্ঠে তার উদ্বেগ।
‘আপনি আমাকে বিশ্বাস করছেন তো?’
‘এটা জিজ্ঞাসা করার কোন বিষয় হলো? আমার ছেলে আমার কাছে এমন প্রস্তাব আনলে আমার মধ্যে দ্বিধার সৃষ্টি হতো। তোমার কথায় তাও হয়নি।’
‘ধন্যবাদ মা।’
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now