বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

জল ও জীবনের গল্প

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান নাসরুল্লাহ (০ পয়েন্ট)

X বেদনার স্বরূপ উন্মোচনে জলকে উপমা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর যৌক্তিক কারণ আছে কি না, তা না ভেবেই আমরা জলের প্রেমে পড়ি। সেই সঙ্গে বেদনারও। দুঃখের ঢেউ আছে বলেই তা আমাদের জলের নিকটবর্তী করে। কেবলই কি দুঃখের ঢেউ? আনন্দও কি কখনো কখনো ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে না? জলের সঙ্গে দুঃখ কিংবা আনন্দ নয়, জীবনেরই একটা যোগসূত্র আছে-যা কেবলই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমাদের গেছে যে দিন, তা একেবারেই গেছে। এবার কৃষ্ণের হাত ধরে যমুনার জলে নেমে পড়া যাক। আমাদের কণ্ঠে থাক সেই আনন্দসংগীত : ‘আমার যমুনার জল দেখতে কালো/ স্নান করিতে লাগে ভালো/ যৈবন মিশিয়া গেল জলে।’ এই যমুনার সঙ্গে পৃথিবীর সমুদয় নদীরই একটা আত্মীয়তা আছে, যে রকম আত্মীয়তা পৃথিবীর তাবৎ প্রেমিকের সঙ্গে কৃষ্ণের। রাধার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতেও কোনো বাধা নেই। যদিও প্রেম নিবেদনে রাধা-কৃষ্ণের শরণ নিতে আমরা এখন স্বস্তি বোধ করি না। যা বলার সরাসরি বলতে শিখেছি আমরা। মেনে নিতে রাজি আছি। কিন্তু জেনে রাখা ভালো, প্রেমের ঘাটে পাড়াপাড়িতে দরাদরির ব্যাপার নেই, সেখানে মনের বদলে মন দিতে হয়। আমি আসলে মন দেওয়া-নেওয়ার কথাই বলতে চাই। তবে এই আদান-প্রদানের পর্বটি নদীর ঘাটে সম্পন্ন করা গেলে মন্দ হয় না। জলের প্রবহমানতার মতোই সময়ের অথবা জীবনের প্রহরগুলোও কারও জন্য অপেক্ষা করতে রাজি নয়। ভাটিয়ালি গানের ভেতর তাই যে বিরহ মূর্ত হতে দেখি, তার সঙ্গে এ কথাও তো যুক্ত থাকে যে ‘যে সময় যায়- চলে যায়, বসে রবে না।’ অর্থাৎ সময়ের দিকে যত্নবান হতে হবে, সময় গেলে সাধন হবে না। নদীর জলে ভাসমান নৌকার মতোই ভেসে চলে আমাদের জীবন। মহাকালকে যদি নদীর রূপকল্প হিসেবে ধরি, তাহলে জীবন তো নদী ও জলের তুলনায় নির্বিঘ্নে ভাসমান কিংবা ঝড়-ঝাঁপটায় দোদুল্যমান ছোট্ট নৌকার মতোই। তাই যখন লোকগানে আমরা শুনি, ‘নদীর কূল নাই কিনার নাইরে/ আমি কোন কূল হইতে কোন কূল যাব/ কাহারে শুধাই রে।’-তখন জীবনের অস্থিরতা ও অসুস্থতায় বিহ্বল মানুষের হাহাকারই মূর্ত হয়ে ওঠে। একই অভিব্যক্তি ধরা পড়ে এই লোকগানে : ‘ঢেউ উঠছে সাগরে রে/ কেমনে পাড়ি ধরি রে/ দিবানিশি কান্দি রে নদীর কূলে বইয়া।’ এই নদী যে জীবনেরই প্রতিভূ তা যে কোনো পাঠক-শ্রোতাই অনুধাবন করতে পারেন। বাংলাদেশের সমুদয় মানুষের বাস নিশ্চয়ই নদীর পাড়ে নয়, কিন্তু নদীর সঙ্গে সবার জীবনের সম্পর্কই অবিচ্ছেদ্য। পদ্মা মেঘনা যমুনা যেখানেই হোক, নদী থেকে বিচ্ছিন্ন নয় তারা। তাই বলা যায়, এই পদ্মার জল পৃথিবীর সব নদীর জলে মিশে গেছে। নদী তো কেবল জীবনের বহমানতার রূপকল্পেই সীমাবদ্ধ নয়, প্রিয় মানুষ থেকে দূরবর্তী থাকার দুঃখও ধারণ করতে হয় নদীকে। বাংলা গানের নদী গ্রাম্য বাঙালি রমণীর কি হৃদয়বিদারক বেদনার সাক্ষী হয়ে আছে : ‘কে যাস রে ভাটির গাঙ বাইয়া/ আমার ভাইধনরে কইয়ো নাইয়র নিত বইলা/ তোরা কে যাস? কে যাস?’ এ তো গেল সংসারের আনন্দ-বেদনার চালচিত্র। সংসার নামক উত্তরমেঘে পৌঁছানোর আগে পূর্বমেঘের কিছু গল্প ও ঘটনা আমাদের বিবেচনা করতে হবে এবং এই গল্পের বিরাট অংশ তো নদীর জলেই প্লাবিত। নজরুলের হৃদয় থেকে উৎসারিত অঞ্জনা নদীতীরে কতজনের প্রেমপদ্ম পাপড়ি, মিলেছে তার হিসাব মেলানো কঠিন। প্রেমের সঙ্গে জলের সম্পর্ক নিবিড়-এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যাবে। নদীর জলের অভাব যেখানে, সেখানে বৃষ্টির জল হলেও চলবে। তাই আমাদের চলচিত্রের নায়ক-নায়িকাদের আমরা নদীর জলে সাঁতার কাটতে দেখি অথবা কারণে-অকারণে তারা বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। ‘জল ভরো সুন্দরী কন্যা জলে দিছ ঢেউ/ হাসিমুখে কওনা কথা সঙ্গে নাই মোর কেউ।’-মৈমনসিংহ গীতিকায় এভাবেই নারী-পুরুষের প্রেমনিবেদনের দৃশ্য চিত্রিত হয়েছে। বেদের মেয়ে জোসনা চলচ্চিত্রের জোসনাও প্রেমিক রাজপুত্রের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য ভরা কলসির জল ফেলে দিয়ে শূন্য কলসি নিয়ে অর্থাৎ জল ভরার অছিলায় নদীর ঘাটে ছুটে যায়। এ তো গেল ভালোবাসার কথা। যার জীবনে ভালোবাসা নেই, জীবনের গতি ও গন্তব্য বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তেই যে পৌঁছাতে পারছে না, জীবনের ঘাটে ঘাটে নোঙর করে কেবলই শূন্যতার হাহাকারে দগ্ধ হচ্ছে যে, তার গানও কি নদীর জলে আবর্তিত হয় না? ‘নদীর কূলের লাগি আমি কান্দি বন্ধুরে/ আমার লাগি কেউ কান্দে না/ সারা জীবন বৈঠা টানলাম তবু কূল পাইলাম না।’ ঘরছাড়া মানুষের অপরিমেয় বেদনার দোসর হিসেবে নদীর ভূমিকা বাংলা লোকগানে বিশেষ তাৎপর্যে উদ্ভাসিত। যার কথা কেউ শুনতে চায় না, কারও জীবনেই যে অপরিহার্য নয়, সেও নদীর সঙ্গে নিবিড় বন্ধুত্বে জড়াতে চায়। নদীর জলের মতোই সে গড়িয়ে যেতে চায় কোনো অচিহ্নিত গন্তব্যে। নদী কেবলই ছুটে চলে। কারও জন্য অপেক্ষা করার অবসর নেই তার। নদী যেন সংকীর্ণ ও সংক্ষিপ্ত জীবনের বিপুলায়তন বেদনাকে বিস্তীর্ণ সাগরের কাছে পৌঁছে দেয়। তাই কি অন্তরঙ্গ মুহূর্তের আরাম ও আনন্দ, দুঃখ ও দীর্ঘশ্বাসকে আমরা নদীর সমান্তরালে প্রবাহিত দেখতে ভালোবাসি? ভাটিয়ালি গানের গভীরে কেবল সময়ের স্রোতে ভেসে চলা মানুষের কথাই থাকে না, কৌতূহলী মানুষের জিজ্ঞাসু দৃষ্টিও কখনো কখনো নদীর জলে ছড়িয়ে পড়তে চায়। ছড়িয়ে জড়িয়ে মানুষ কোন দূরে যায়, কেউ জানে না। শুধু জানে, তাদের যেতে হবে বহুদূর। জীবনের বেদনা ও বিষণ্নতা, নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা, হতাশা ও হাহাকারকে আমরা কূল-ভাঙা নদীর রূপকল্পে হাজির করি। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আমরা যখন সৃষ্টিকর্তার করুণা প্রার্থনা করি, তখনো যাপিতজীবনকে নৌকায় তুলে দিয়ে নৌকার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্রষ্টার হাতে ছেড়ে দিতে চাই : ‘কী বলিব মুর্শিদ চানরে কী বলিব রে আর/ এই যে নৌকা ডুবুডুবু এই নৌকা তোমার।’ আবার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ব্যর্থ হলে কোনো এক মহাশক্তিধর মাঝির কথা মনে পড়ে, যিনি আমাদের জীবন-নৌকা গন্তব্যে পৌঁছে দেবেন। প্রবল প্রতাপশালী প্রভুর হাতে নিজেকে সমর্পণ করে আমরা পরম বিশ্বাসে গেয়ে উঠি : ‘মাঝি বাইয়া যাও রে/ অকূল দরিয়ার মাঝে আমার ভাঙা নাও।’ নদী কেবল মানুষের কল্পনার প্রবাহকেই সচল রাখে না, বাস্তব নদীর নিষ্ঠুরতায় সবকিছু হারানোর হাহাকারও কোনো কোনো লোকগানে ধরা পড়ে। জীবনের ভাঙাগড়ার গল্পে নদী-নৌকা-বইঠা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। জীবনের সঙ্গে নদীর সাদৃশ্য ব্যাপক হলেও এ দুয়ের ব্যবধানের দিকটিও মনে রাখা দরকার। ভাঙাগড়ার খেলায় আমরা কেবলই ধ্বংসের দিকে ধাবিত হই, কিন্তু নদী এ কূলের ঐশ্বর্যে অন্য কূলকে সমৃদ্ধ করে : ‘নদীর এক কূল ভাঙিয়া গেলে কী আর এমন যায় আসে/ হাসিয়া হাসিয়া নদীর আর এক কূল ভাসে।’ বাউল সাধক লালনের আধ্যাত্মসাধনাও কখনো কখনো নদীর জলে ভেসে যায়। অতৃপ্ত লালন মেঘনা নদীর কাছে থেকেও পিপাসায় হাকাকার করেন : ‘ফকির লালন মরল জল পিপাসায়/ কাছে থাকতে নদী মেঘনা।’ এমন সৃষ্টিশীল সম্ভাবনাদৃপ্ত মানুষও তো আছেন যাঁরা নিজের মনের গভীরে অসংখ্য নদীর প্রবহমানতা অক্ষুণ্ন রাখতে ভালোবাসেন। কেউ হয়তো তার খবর রাখে না, কিন্তু কবরে অর্থাৎ পরপারে যাওয়ার আগে সবাইকে তাঁর বলতে ইচ্ছে করে : ‘নদীর জল ছিল না কূল ছিল না ছিল শুধু ঢেউ/ আমার একটা নদী ছিল জানল না তো কেউ।’ কেউ না জানুক, এ তো সত্য, ‘নদীর কূল নাই কিনার নাইরে’ শীর্ষক গানের মতোই বাংলা গানে ব্যবহৃত নদীরও কোনো কূল-কিনারা নিরূপণ করা অসম্ভব।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -৩৩
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -৩২
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প-৩১
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -৩০
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২৯
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২৮
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২৭
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২৬
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২৫
→ শেষ জীবনের গল্প - (পর্ব-১২)
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২৪
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২৩
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২২
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২১
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২০

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now