বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

যেখানে ঘোড়াটাকে বেঁধে রেখেছ

"ওয়েস্টার্ন গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান নাসরুল্লাহ (০ পয়েন্ট)

X বাদুড়-ডানা দরজার ওপর দিয়ে ইয়োলো জ্যাকেট সালুনের ভেতরটা একটুক্ষণ জরিপ করার পর সরে এল ওরিন। নিঃসন্দেহে একটা চক্রান্ত চলছে অন্য কোথাও। এই শহরের ভাগ্যবিধাতাদের কাউকে দেখা যাচ্ছে না। দ্বিধায় পড়ল সে, বিষয়টার তাত্পর্য বিবেচনা করল মুহূর্তের জন্য। তারপর ঘুরে এগোল একটা অন্ধকার গলিপথ ধরে, জীর্ণ একটা তারকাঁটার বেড়ার সামনে এসে থামল। ওয়াগনের চাকায় দেবে যাওয়া একটা মেঠোপথের কিনার ঘেঁষে অনেকদূর অবধি চলে গেছে বেড়াটা। ওটার পাশ দিয়ে এগোল সে, একটা কটনউডের ঝাড় অতিক্রম করল। একটু বাদে একটা খড়ের গাদার দেখা পেল সে। ওটার কাছাকাছি এসে ডানে ঘুরল ওরিন, আগাছায় ছাওয়া একটা রাস্তা ধরে অনতিদূরের অ্যাডৌবিটার দিকে এগিয়ে গেল। বাড়িটার জানালায় সন্ধেবাতির টিমটিমে আভা। অ্যাডৌবির দরজায় নক করল সে। ছিটকিনি খোলার আওয়াজ হলো ভেতরে, তারপর কপাটের পাশ দিয়ে অল্পবয়সী এক তরুণী উঁকি মারল। মেয়েটার চেহারায় ইন্ডিয়ার রক্তের ছাপ, গায়ের রঙ কালচে। ওরিন সাবলীল সপ্যানিশে বলল, সে আলভিতোর সঙ্গে দেখা করতে চায়। খানিক দ্বিধার পর, চওড়া হলো দরজার ফাঁক এবং ওরিন ভেতরে ঢুকল। বেশ সুপরিসর কামরা। এক পাশে কালির ঝুল পড়া ফায়ারপ্লেস, যেখানে ছোট্ট একটা আগুন জ্বলছে। ঘরের মাঝখানে অয়েল ক্লথে ঢাকা টেবিল, ওটার ওপর দাঁড়িয়ে একটা লণ্ঠন। টেবলের আরেক পাশে, দেয়ালের ধারে, বিছানায় মনের সুখে নাক ডাকছে এক যুবক। খেলা থামিয়ে কালো চোখের দুটো ছেলেমেয়ে তাকাল ওর দিকে। গলা চড়িয়ে হাঁক পাড়ল মেয়েটা, থেমে গেল নাক ডাকার আওয়াজ, কম্বল সরিয়ে বিছানায় উঠে বসল যুবক। ‘সেনিয়র আলভিতো আলভারেজ? আমি ওরিন ওসমান।’ ‘আমি তোমার কথা শুনেছি, সেনিয়র।’ ওখানে ওর আসার উদ্দেশ্য সংক্ষেপে বলল ওরিন। মন দিয়ে শুনল আলভিতো, তারপর এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়াল। ‘আমি ঠিক জানি না, সেনিয়র। গ্র্যান্টটা অনেক পুরোনো। আমরাও আর ধনী নই। আমার বাবা,’ কাঁধ ঝাঁকাল সে, ‘যৌবনে টাকা ওড়াতে পছন্দ করত।’ একটু ইতস্তত করল সে, মন্তব্যটা নিয়ে ভাবল একটুক্ষণ, তারপর দায়সারাভাবে বলল, ‘আমিও ওড়াতে পছন্দ করি। টাকা তো খরচ করার জন্যই, না কি? না, সেনিয়র, আমার মনে হয় না কোনো দলিলপত্র আছে। বাবা আমাকে গ্র্যান্টের কথা বলেছিল, কিন্তু দলিলের কথা বলেনি। আর এটা কোলাসো, মানে আমার বাবার পালক বাবার কাছে কোনো কিছু থাকার প্রশ্নই আসে না।’ ‘পরে তোমার যদি কিছু মনে পড়ে, জানাবে নিশ্চয় আমাদের?’ জিজ্ঞেস করল ওরিন। তারপর হঠাত্ একটা ভাবনা খেলল তার মাথায়। ‘তুমি তো একজন ভাকেরো, না? কাজ চাও?’ ‘কাজ?’ আলভিতো চোখ ছোট করে তাকাল। ‘কোথায়? সেনিয়ওরা কার্টিসের রাঞ্চে?’ ‘হ্যাঁ। বুঝতেই পারছ, বিরাট কাজিয়া লাগতে যাচ্ছে। আমি ওখানে কাজ করছি। আজ রাতে আরেকজনকে নিয়ে যাচ্ছি সঙ্গে করে। তুমি যদি রাজি থাক, কাজটা তোমার।’ শ্রাগ করল আলভিতো। ‘কেন নয়? বুড়ো সেনিয়র কার্টিস আমাকে আমার প্রথম ঘোড়া উপহার দিয়েছিলেন। রাইফেলও দিয়েছিলেন একটা। খুব ভালো মানুষ ছিল; তার ছেলেও।’ ‘তাহলে শহরের বাইরে যোগ দাও আমার সঙ্গে, ট্রেইলটা যেখানে দুই টিলার মাঝ দিয়ে গেছে। চেন জায়গাটা?’ ‘সি, সেনিয়র। আমি থাকব ওখানে।’ আপনমনে পিয়ানো বাজাচ্ছিল কিথ যখন বাদুড়-ডানা ঠেলে সালুনে ঢুকল ওরিন। দ্রুত চোখ বুলিয়ে সবার অবস্থান মাথায় গেঁথে নিল সে। কিথকে প্রথমেই দেখেছে, ড্যানি বারে, কেভিন পিটার্সন একটা টেবিলে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে, আরও জনা ছয়েক লোক গুলতানি মারছে এখানে-সেখানে। বারের কাছাকাছি পৌঁছেছে সে, এমন সময়ে পেছন দিককার একটা দরজা খুলে কামরায় পা রাখল কার্ল রৌভ। লোকটাকে আগে দেখেনি ওরিন, তা সত্ত্বেও ডেভিডসনের নির্ভুল এবং সযত্ন বিবরণ থেকে সহজেই চিনতে পারল। ওরিনের মতো অত লম্বা না, তবে আরও ছিপছিপে। পাকানো দড়ির মতো গড়ন, ক্ষিপ্র গতি আর সাবলীল আঙুল চালনার জন্য আদর্শ। ওর সমস্ত পেশি শিথিল, কিন্তু এ ধরনের লোকদের ক্ষমতা ভালোই তার জানা বলে মুহূর্তে সতর্ক হয়ে গেল ওরিন। ঘরে ঢুকেই রৌভ দেখতে পেয়েছিল ওকে, কাছেই বারের একটা জায়গায় অবস্থান নিল। সব চোখ এ মুহূর্তে এই দুজনের দিকে। হার্ডিকে কীভাবে নাস্তানাবুদ করেছে ওরিন, তারপর রাঞ্চ থেকে কার্যত একাই তাড়িয়ে দিয়েছে প্যালেন্স আর তার চামচাদের—এসব খবর এখন শহরের লোকের মুখে মুখে। ওর দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসল রৌভ। ‘একটা ড্রিংক চলবে?’ জিজ্ঞেস করল ওরিন। মাথা ঝাঁকাল রৌভ। ‘আমার কোনো আপত্তি নেই।’ তারপর ওরিনের চোখে চোখ রেখে নিচু স্বরে বলল, ‘যাকে আমি হত্যা করতে যাচ্ছি, তার সঙ্গে গলা ভেজাতে আমার আপত্তি নেই।’ ওর হলদেটে চোখে ব্যঙ্গ। ওরিন কাঁধ উঁচু-নিচু করল। ‘আমারও না।’ রৌভের অকপট স্বীকরোক্তি তার পছন্দ হয়েছে। ‘যদিও একটা তফাত আছে। আমি নিজেই আমার ড্রিংক করার কিংবা কাউকে খতম করার সময় ঠিক করি। কিন্তু তোমাকে আরেকজনের হুকুমের অপেক্ষায় থাকতে হয়।’ ভেস্টের পকেট থেকে কাগজ আর তামাক বের করে একটি সিগারেট বানাতে শুরু করল কার্ল রৌভ। ‘কিন্তু আমার জন্য তুমি অপেক্ষা করবে, কমপাদ্রে। আমি জানি তোমার রগ।’ একে অপরের উদ্দেশে গ্লাস উঁচু করল ওরা, এক চুমুকে সবটুকু পানীয় শেষ করল। বারের ওপর গ্লাস নামিয়ে রাখছে ওরা এমন সময়ে একটা দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল জ্যাক প্যালেন্স। ওদের দুজনকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ড্রিংক করতে দেখে রাগে কালো হয় গেল তার চেহারা। নীরবে সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল লোকটা, হঠাত্ কী মনে হতে থেমে ঘুরে দাঁড়াল। ‘আমি ভাবছি,’ ঘরের সবাইকে শুনিয়ে বলল সে, ‘মোনা কার্টিস কী বলবে, যখন জানবে, তার এই নতুন কর্মচারীই হচ্ছে সেই লোক, যে তার স্বামীকে খুন করেছে?’ প্রতিটা মাথা ঘুরে গেল বারের দিকে। সাদা হয়ে গেল ওরিনের মুখ। মুহূর্তেক আগেও মিত্রভাবাপন্ন কিংবা নিরপেক্ষ ছিল সবার চেহারা, কিন্তু এখন সবাই সতর্ক, মনোযোগী। মোনাকে পছন্দ করে সবাই, সে জানে, ঠিক যেমন করত ওর স্বামী কার্টিসকেও। এখন এই লোকগুলো ওর শত্রুতে পরিণত হবে। ‘তুমি এখানে কেন এসেছ, ওসমান, এটাই আমার মাথায় ঢুকছে না। মেয়েটার স্বামীকে খুন করার পর তার রাঞ্চে কেন আসবে তুমি? আরও ফায়দার জন্য কি? মেয়েটার যেটুকু সম্বল আছে, সেটাও লুট করতে চাইছ? নাকি তোমার চোখ বিধবা মেয়েটার ওপরেই?’ অতি কষ্টে রাগ দমন করল ওরিন। হালকা সুরে বলল, ‘প্যালেন্স, রাঞ্চ দখল করতে তুমিই গিয়েছিলে। আমি তোমাকে তাড়িয়েছি। আমি এখানে আছি শুধু একটা কারণে, মহিলা রাঞ্চের মালিকানা রাখতে পারছে, কায়োটের দল কেড়ে নিচ্ছে না—এটা নিশ্চিত করার জন্য।’ প্যালেন্স দাঁড়িয়ে রইল পাথরের মতো, ওরিনের মুখোমুখি। রাগে কাঁপছে রাঞ্চার, ফোঁসফোঁস নিঃশ্বাস নিচ্ছে। নিজের গায়ে লোকটার তপ্ত নিঃশ্বাসের ঝাপটা অনুভব করল ওরিন। পাশেই দাঁড়িয়ে কার্ল রৌভ। প্যালেন্স যদি বন্দুক বের করতে নেয়, ওরিনের বাঁ হাতে আচমকা ঝটকা মেরে তার ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে পারে রৌভ। তবে সেই অবস্থার জন্যও প্রস্তুত আছে ওরিন। টের পাচ্ছে, আবার একটা বুনো হিংস্রতা জেগে উঠছে তার ভেতরে, যেটা তাকে উদ্বুদ্ধ করে হানাহানিতে। আবার মুখ খুলল সে, কণ্ঠস্বর মোলায়েম কিন্তু কথাগুলো কাটা কাটা। ‘কই, সিদ্ধান্ত নাও, প্যালেন্স। যদি মরতে চাও, এখুনি তা পার। ফের একটা বাজে মন্তব্য করেছ কি, প্রতিটা শব্দ তোমার গলা দিয়ে নামাব। পিস্তলের দিকে হাত বাড়ালে খুন করব তোমাকে। রৌভ যদি এর মধ্যে আসতে চায়, আসতে পারে, আমার কোনো আপত্তি নেই।’ ফুট কাটল কার্ল রৌভ, সেও আস্তে করেই। ‘আমি এর ভেতর নেই, ওসমান। আমি শুধু নিজের জন্য লড়ি। যখন আসব তোমাকে হত্যা করতে, একাই আসব।’ ইতস্তত করে জ্যাক প্যালেন্স। রৌভের ভরসায়, ক্ষণিকের জন্য সাহসী হয়ে উঠেছিল সে। কিন্তু এখন দোটানায় পড়ে গেছে; এবং আচমকা ঘুরে বেরিয়ে গেল কামরা থেকে। স্যালুনের সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। রৌভকে ভাবনা থেকে খারিজ করে দিল ওরিন, সোজা হেঁটে গেল কেভিন পিটার্সনের দিকে, কাঁধে ধরে ঝাঁকাল। ‘ওঠ, কেভিন, তোমাকে বিছানায় শুয়ে দিচ্ছি।’ নড়ল না পিটার্সন। ঝুঁকে ওর বগলের নিচে দিয়ে একটা হাত গলিয়ে দিল ওরিন, টেনে তুলল বিশালদেহী ইংরেজকে। পা বাড়াল দরজার উদ্দেশে। দরজার কাছে গিয়ে ঘাড় ফেরাল সে। ‘দেখা হবে, রৌভ।’ গ্লাস উঁচু করল কার্ল, ওর হ্যাট পেছনে ঠেলে দেওয়া। ‘নিশ্চয়,’ বলল। ‘আমি একাই থাকব।’ কথাটা শেষ করার পরপরই টমাস হার্ডিকে মনে পড়ল তার; মনে পড়ল, কী পরিকল্পনা হয়েছে পেছনের কামরায়। ঈষত্ কালো হয় গেল ওর মুখ, হুইস্কিটা সহসাই বিস্বাদ ঠেকল। আস্তে করে গ্লাসটা বারে নামিয়ে রাখল সে, ঘুরে পেছনের দরজা দিয়ে অদৃশ্য হলো। একলা তাস খেলছিল প্রিন্স ময়নিহান, মুখে চুরুট। ‘আমি পারব না, প্রিন্স,’ ধোঁয়ার এপাশ থেকে বলল রৌভ। ‘এই খুনের ব্যাপারটা তোমাকে আমার ওপর ছেড়ে দিতে হবে। শুধু আমার ওপরে।’ দুই টিলার মধ্যবর্তী অন্ধকার জায়গায় আলভিতোর সঙ্গে যোগ দিয়েছে ওরিন। আরেকটা ঘোড়ার পিঠে অঘোরে ঘুমোচ্ছে পিটার্সন। যাতে পড়ে না যায়, স্যাডলের সঙ্গে দড়ি দিয়ে ওকে বেঁধে রেখেছে ওরিন। গাঢ় অন্ধকারের ভেতর একটা ঝোপের আড়ালে অপেক্ষা করছিল আলভিতো। সে-ই আগে দেখতে পায় ওরিনকে। মৃদু শিস দিয়ে দৃষ্টিআকর্ষণ করে। ওরিন সাড়া দিতেই ঘোড়ায় চেপে বেরিয়ে এসেছে মেক্সিকান, চকিতে একবার পিটার্সনকে দেখে নিয়েই, বিনা বাক্যব্যয়ে, ওদের সহযাত্রী হয়েছে। পরদিন সকালে বেশ বেলায় পিভটরকে পৌঁছাল ওরা। ইতিমধ্যে নেশা কেটে গেছে কেভিন পিটার্সনের, গাল বকছিল। ‘হুম!’ হুঙ্কার ছাড়ল সে। ‘তোমার সাহসের বলিহারি, ওসমান। আমাকে ছেড়ে দাও, যাতে ফিরতে পারি। আমি এ সবের মধ্যে নেই।’ ওর বেহাল অবস্থা দেখে একগাল হাসল ওরিন। ‘অবশ্যই ছেড়ে দেব, কেভিন। কিন্তু তুমিই না সেদিন বলছিলে শহর ছাড়তে। এভাবে না হলে আর কীভাবে সম্ভব হতো, বল।’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল বটে কিন্তু ওর চোখে উপচে পড়ছে কৌতুক। ‘তোমার মঙ্গলের জন্যই করেছি এমন। পাহাড়ের তাজা বাতাস, ঠান্ডা দুধ খাও দু-চার দিন…’ ‘দুধ?’ বোমার মতো ফেটে পড়ল পিটার্সন। ‘আমি কি দুধের খোকা নাকি, যে দুধ খাব? আমাকে ছেড়ে দিয়ে একটা বন্দুক দিয়েই দ্যাখ, তোমার চামড়া দিয়ে আমি ডুগডুগি বাজাব!’ ‘আর এই রাঞ্চটা প্যালেন্সের হাতে তুলে দেবে? প্যালেন্স আর ময়নিহানের হাতে?’ রক্তজবা চোখে ওর দিকে চেয়ে থাকল পিটার্সন, সহসা ধারালো হয়ে উঠেছে দৃষ্টি। ‘ময়নিহান নামটা শুনলাম মনে হলো? এর মধ্যে সে আসছে কোত্থেকে?’ ‘যদি জানতাম, তাহলে ভালোই হতো। তবে আমার ধারণা, সব চক্রান্তের পেছনে আসল মাথা ওই লোক। প্যালেন্সের লাটাইও তার হাতেই।’ সম্ভাবনাটা নিয়ে একটু সময় ভাবল পিটার্সন। ‘হতে পারে।’ ওরিন ইতোমধ্যে খুলতে শুরু করেছে ওর বাঁধন। ‘এই দিকটা আমি ভেবে দেখিনি। কিন্তু কেন?’ ‘ওকে তুমি চেন আমার আগে থেকে। কেউ একজন কার্টিসের পেছনে লোক লাগিয়েছিল তাকে মেরে ফেলার জন্য। আমার মনে হয় না, কাজটা প্যালেন্সের। তাহলে আর কে হতে পারে?’ ‘হুম।’ দোল খেয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামল পিটার্সন। টলে উঠল সামান্য, চট করে রেকাবের দড়িটা ধরে টাল সামলাল। লাজুক দৃষ্টিতে ওরিনের দিকে তাকাল সে। ‘আমার অবস্থা কাহিল।’ একটা বিস্ময়ের ভাব খেলে গেল ওর চেহারায়। ‘খিদে পেয়েছে! তাজ্জব ব্যাপার, কতকাল আমার খিদে পায় না।’ বাড়তি চারটা হাত পেয়ে পিভটরকে কাজ এগিয়ে চলল ঝড়ের বেড়ে। কিন্তু ওরিনের মন বিশ্রাম নেয় না। পাঁচ হাজার ডলারের রহস্যভেদ বাকি। জমির মালিকানার ব্যাপারটাও আছে। রাতের পর রাত আলভিতোকে উত্সাহিত করে চলল সে স্মৃতির পাতা হাতড়ে ওর বাবা আর দাদুর কথা মনে করতে। ওর বর্ণনা থেকে একটু একটু করে মানুষগুলোকে জানছে সে। আস্তে আস্তে মাথার ভেতর একটা আইডিয়া দানা বাঁধছে, তবে সেটাকে দাঁড় করাবার মতো যথেষ্ট মজবুত ভিত্তি এখনো পায়নি। বেশ কয়েক দিন কেটে গেছে এর মাঝে। কিন্তু প্যালেন্সর ছায়াও চোখে পড়েনি। দু-দফা জনাকয়েক ঘোড়সওয়ারকে দেখা গেছে, দৃশ্যত জরিপ করছিল চারপাশ। পাহাড়ের কিনার থেকে তাড়িয়ে আনা হয়েছে গরুর পাল, বেড়ার ভেতর ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ইয়োলো জ্যাকেটে যাওয়ার দিন দলছুট যেসব গরু-বাছুর দেখেছিল সে, তার প্রায় সবই ধরে আনা হয়েছে। ওরিন অস্থির। জানে, যখন বিপদ আসবে, তা আসবে আচমকা। এভাবেই চেষ্টা নেবে প্যালেন্স। এত দিনে সে নিশ্চয়ই পিভটরক রাঞ্চ রস্টারে কেভিন পিটার্সন আর আলভিতো আলভারেজের যুক্ত হওয়ার খবর জেনেছে। ‘বেইকার বিউটে কিছু গরু-বাছুর দেখেছি,’ একদিন সকালে বলল কেভিন। ‘কেমন হয়, আমি ওদিকে গিয়ে একবার দেখে এলে?’ ‘চল, দুজনাই যাই,’ জবাব দিল ওরিন। ‘আমি নিজেও ও-দিকটা একবার দেখতে চাইছিলাম ঘুরে। কিন্তু সময় করে উঠতে পারছিলাম না।’ উজ্জ্বল সকাল। ক্ষিপ্রগতিতে মাইলের পর মাইল পেছনে ফেলে ছুটে চলেছে ওরা, সতর্ক নজর রাখছে মাথার ওপরে পাহাড়ি এলাকার দিকে। এত সতর্কতার পরও অশ্বারোহী দলটাকে যখন দেখতে পেল, তারা বড় জোর একশ গজ দূরে। পাঁচজনের একটা পসি। সবার আগে টমাস হার্ডি এবং সাদা-গোঁফঅলা এক আগন্তুক। নজর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আগুয়ান অশ্বারোহী দলটার দিকে এগিয়ে গেল ওরা। নবাগতেরা ইতোমধ্যে থেমে গেছে ওদের আসতে দেখে। ওরিনকে দেখে বিজয়ের হাসি ফুটল টমাস হার্ডির তোবড়ানো মুখে। ‘এই যে, এই লোককেই তুমি খুঁজছিলে, মার্শাল!’ উল্লসিত কণ্ঠে বলল সে। ‘কালো হ্যাট পরা লোকটাই ওরিন।’ ‘কী ব্যাপার?’ শান্তস্ব্বরে জিজ্ঞেস করল ওরিন। আগন্তুকের ব্যাজ ইতোমধ্যে চোখে পড়েছে তার। কিন্তু আরও একটা বৈশিষ্ট্য লক্ষ করেছে সে। ভদ্রলোককে দেখে যোগ্য-সত্ অফিসার মনে হচ্ছে। ‘এল পাসোতে হুলিয়া জারি হয়েছে তোমার নামে। আমি রড মার্শ, ডেপুটি ইউএস মার্শাল। আমরা টনি কার্টিসের হত্যার তদন্ত করছি।’ শক্ত হয়ে গেল কেভিনের ঠোঁট দুটো, তীক্ষ চোখে তাকাল ওরিনের দিকে। প্যালেন্স যখন সালুনে তথ্যটা ফাঁস করে, পিটার্সন বেহুঁশ মাতাল ছিল। ‘ওটা ন্যায়সঙ্গত লড়াই ছিল, মার্শাল। কার্টিসই ঝগড়া বাধিয়ে ড্র করেছিল।’ ‘আমাদেরকে কথাটা বিশ্বাস করতে বলছ তুমি?’ একরাশ ব্যঙ্গ ঝরে পড়ল হার্ডির কণ্ঠে। ‘একটা ইঁদুরের সাহসও ছিল না ওর! কেন, এর কদিন আগেই রৌভ চ্যালেঞ্জ করেছিল ওকে, টনি পিছিয়ে যায়। দুটো হাত আছে, এমন কারও বিরুদ্ধে কার্টিস ড্র করবে না।’ ‘আমার বিরুদ্ধে করেছিল।’ ওরিন উপলব্ধি করে এখানে দুটো যুদ্ধ লড়ছে সে—এক, গ্রেফতার এড়ানো এবং দুই, পিটার্সনের শ্রদ্ধা ও সাহায্য লাভ। ‘আমার ধারণা, সে ইচ্ছে করেই রৌভের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেনি, কারণ তার একটা কাজ বাকি ছিল এবং সে জানত, রৌভ তাকে হত্যা করবে, ফলে কাজটা অসমাপ্ত থেকে যাবে।’ ‘আষাঢ়ে গল্প!’ ঠোঁট ওল্টাল হার্ডি। ‘ওই তোমার আসামি, মার্শাল, এখন যা করার তুমিই কর।’ মার্শকে সপষ্টত বিরক্ত দেখায়। বোঝা যায়, হার্ডিকে তার আদৌ পছন্দ না। কিন্তু তাকে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে। সে মুখ খোলার আগেই, ওরিন কথা বলল আবার। ‘মার্শাল, আমার এমন বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে, এখানে আমার সুনাম হানির একটা চক্রান্ত চলছে। এর লক্ষ্য, আমাকে কিছু সময়ের জন্য এখান থেকে সরিয়ে দেওয়া। আমি তোমাকে ওয়াদা করছি, মার্শাল, এখানকার ঝামেলা মিটলেই আমি নিজে এল পাসো গিয়ে তোমার কাছে রিপোর্ট করব। আমাকে তুমি বিশ্বাস করতে পার, ওসমানরা কেউ ওয়াদার বরখেলাপ করে না, টেনেসির সবাই এ কথা জানে; এল পাসোতেও কারও কারও অজানা নয়।’ ‘দুঃখিত।’ মার্শের কণ্ঠে আফসোস। ‘আমার একটা দায়িত্ব আছে। আমি হুকুমের চাকর।’ ‘বুঝতে পারছি সেটা,’ বলল ওরিন। ‘কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, আমারও একটা দায়িত্ব আছে। মোনা কার্টিসকে যেন কেউ পিভটরক থেকে উচ্ছেদ করতে না পারে, তা দেখা। আমি সেটা নিশ্চিত না করে নড়ছি না।’ ‘তোমার দায়িত্ব?’ মার্শের চাহনি শীতল কিন্তু দৃষ্টিতে কৌতূহল। ‘ওর স্বামীকে হত্যা করার পরও?’ ‘ওটাই যথেষ্ট কারণ, স্যার,’ সোজা-সাপটা জবাব দিল ওরিন। ‘বোঝার চেষ্টা কর, লড়াইটা আমার ইচ্ছায় হয়নি। কার্টিস গায়ে পড়ে শুরু করেছিল। ভীষণ উত্তেজিত, উদ্বিগ্ন হয়েছিল সে। আবেগতাড়িত হয়েছিল। মারা যাওয়ার আগে আমাকে ডেকে বলল, একটা প্যাকেজ ওর স্ত্রীকে পৌঁছে দিতে। বলল, ওটা পেলে তার উপকার হবে। সেই দায়িত্বটাই, স্যার’ মার্শের চোখে চোখ রাখল ওরিন, ‘সবার আগে আসে।’ ‘তোমার দায়িত্বটাকে সম্মান করতে পারলে আমি খুশিই হতাম,’ স্বীকার করল মার্শ। ‘তোমাকে দেখে একজন ভালো মানুষই মনে হচ্ছে, আজকাল যেটার খুব অভাব। তা ছাড়া, টেনেসির ওসমানদের কথা আমিও শুনেছি। কিন্তু আমি নাচার। আমার ওপর নির্দেশ আছে। তবে, ডুয়েলটা যদি সত্যিই ন্যায়সঙ্গতভাবে হয়ে থাকে, পুরো ঝামেলাটা মিটে যেতে বেশি সময় লাগবে না।’ ‘কয়েকটা দিনই যথেষ্ট,’ জবাব দিল ওরিন, ‘এই ইঁদুরগুলোর জন্য।’ যুক্তি নিষ্ফল এখানে, বুঝতে পারছে সে। তার ঘোড়াটা দ্রুতগামী। সামনে ঘন পাইন বন। এখন দরকার একটা সুযোগ। যেন অন্তর্যামী সে, ওর মনের কথা পড়তে পেরেছে, আচমকা তার ধূসর ঘোড়াটা ওরিন আর মার্শালের মাঝখানে এনে দাঁড় করাল কেভিন পিটার্সন। আর প্রায় ঠিক এক ইসময়ে পা ছুঁড়ল ওরিন, বুটের ডগা দিয়ে হার্ডির ঘোড়ার পাঁজরে খোঁচা মারল। ক্ষিপ্ত হয়ে চিঁহি করে উঠল ব্রংকোটা, চার পায়ে লাফাতে শুরু করল। চকিতে নিজের ঘোড়া ঘুরিয়ে নিল ওরিন, সপার ছোঁয়াল পেটে, দুই লাফে অন্যদের অতিক্রম করে ঘোড়াটা ঢুকে পড়ল পাইন বনে, সন্ত্রস্ত হরিণের মতো ছুটছে। একটা গুলির আওয়াজ হলো ওর পেছনে, তারপর আরেকটা। মাথার ওপর গাছের পাতা ঝরাল দুটোই, কিন্তু রৌনটা ছুটতেই থাকল। শুরুতে বনানীর উদ্দেশে সমকোণে এগিয়েছিল সে, কিন্তু দ্রুত রাস্তা বদলে পিভটরকে ফেরার পথ ধরল। বাঁয়ে কর্ডুরয় ওয়াশ ঝরনাটা দেখা যেতেই, রৌনের মুখ ঘুরিয়ে পানিতে নেমে গেল ওরিন। ঝরনাটা ধরে প্রায় মাইল খানেক উজাল সে, তারপর ডাঙায় উঠে ছোট্ট একটা রিজের মাথায় ঝোপঝাড়ের ভেতর থামল কিছু সময়ের জন্য। নজর ফেরাল পেছনে। একদল ঘোড়সওয়ার লেগে রয়েছে ট্রেইলে। ছড়িয়ে পড়ে ওর ট্র্যাক খুঁজতে ব্যস্ত ওরা। এই দলটার সামান্য তফাতে আরেকজন অশ্বারোহীকে দেখা যাচ্ছে, নীরবে লক্ষ করছে লোকগুলোর গতিবিধি। কানো সপর্শ করল ওরিনের হাসি। ওই নিঃসঙ্গ ঘোড়সওয়ার নিশ্চয়ই কেভিন পিটার্সন। ঘোড়া ঘোরাল ওরিন, পাহাড়ি একটা থাকের শেষ মাথা অবধি এগোল, তারপর একটা গোড়ালি ঢাকা শুকনো বালিয়াড়ি পেরিয়ে পাইন বনে প্রবেশ করল। নরম পাইন পাতার কার্পেটে মোড়া পথ, বলতে গেলে ওর কোনো ট্র্যাকই রাখছে না পেছনে। সিঞ্চ হুক বিউট ওর বাঁয়ে এবং আরেকটু কাছে, ডানে, টুয়েন্টি নাইন মাইল বিউট। টিলা দুটোকে দু-পাশে রেখে ছুটল সে, সোজা উত্তর-পশ্চিমে হর্সট্যাংক ওয়াশ লাগোয়া ভাঙাচোরা, দুর্গম ক্যানিয়নের দিকে এগোল। ক্যানিয়নে নেমে উত্তর-পশ্চিমে গেল খানিক দূর, তারপর চক্রাকারে দক্ষিণে ঘুরে আরও গভীরে, কাফপেন ক্যানিয়নে ঢুকে গেল। এখানে একঝাঁক বোল্ডারের মাঝে একটা ঘেসো জমিতে ঘোড়াটাকে স্টেইক করল সে। রাইফেল হাঁটুর ওপর আড়াআড়ি রেখে বিশ্রাম নিতে বসল। এক ঘণ্টা পর চড়াই বেয়ে উঠে গেল ক্যানিয়নের মাথায় একটা কার্নিসের ওপর, পেছনে উঁকি দিল। পসি বাহিনীর চিহ্নমাত্র দেখতে পেল না কোথাও। এমনকি, ঘোড়ার খুরের আওয়াজও শুনতে পেল না। কাফপেনের তলদেশে যেখানে ঘোড়াটাকে বেঁধে রেখেছ, সেখান থেকে বেশি দূরে না, পানি মিলবে। কিন্তু খাবার? খোসা ছাড়িয়ে এক মুঠো চিয়া বীজ খেল সে, কয়েকটা পাইন বাদাম গালে পুরল। এই গ্রেফতার-চেষ্টার হোতা জ্যাক প্যালেন্স, নয়তো প্রিন্স ময়নিহান, ভাবল সে। দ্বিতীয় জন হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, কেননা লোকটাকে তার সাপের চেয়েও খল মনে হয়েছে। ঘটনা যা-ই হোক, এ মুহূর্তে সে ফেরারি। পসি যদি রাঞ্চে যায়, মোনা কার্টিসকে সব খুলে বলার সুযোগ পাবে রডনি মার্শ। ওরিনই তার স্বামীর হত্যাকারী, মেয়েটাকে এ কথা জানাচ্ছে মার্শাল ভাবতেই জীবনটা ওর বিষময় মনে হলো। সে বোঝে, দু-দিন আগে বা পরে মোনা ঠিকই জানতে পাবে। কিন্তু ওরিন নিজেই সব কথা খুলে বলবে ঠিক করেছিল, উপযুক্ত সময়ে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ যেখানে ঘোড়াটাকে বেঁধে রেখেছ

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now