বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
হাওলাদার বাড়ির নাম শুনে স্বপন ডাক্তারের চোখ জ্বল জ্বল করে উঠল
X
শহরের অদূরেই বেশ পুরোনো একটি ডিসপেনসারি।
প্রায় তিন দশক ধরে এই স্থানেই স্বপন ডাক্তার এই এলাকার
হাজারো মানুষের চিকিৎসা করে যাচ্ছেন।
স্বপন ডাক্তারের বহু পুরোনো রোগী আছে। সে তার
পুরোনো রোগীদের আলাদাভাবে দেখভাল করতেন। নতুন
রোগীদের সে ডাক্তারখানায় বসে চিকিৎসা দিলেও
পুরনোদের প্রয়োজনে রাত বিরাতে তাদের বাসায়
যেয়ে উপস্থিত হতেন।
পৌষ মাসের এক ঠাণ্ডা রাতে স্বপন ডাক্তারের সাথে
অদ্ভুত
এক ঘটনা ঘটে গেল। সেদিন মাঝারী ধরনের বৃষ্টিপাত
হচ্ছিল। শীতকালে সাধারণত এমন দিন খুব কমই পাওয়া যায়।
ঠাণ্ডা সহ্য করতে না পেড়ে স্বপন ডাক্তার
সন্ধ্যে না নামতেই ডিসপেনসারি বন্ধ করে দিলেন। তাদের
বুড়ো আর বুড়ির ছোট্ট সংসার। ছেলেপুলের মুখ
তারা দেখেনি। এই বৃদ্ধ বয়সেও এ জন্য
বুড়িকে সে মাঝে মধ্যে বকা ঝকা করে। কিন্তু
বুড়িকে ভুলে গিয়ে অন্য কারো সাথে সংসার পাতার ইচ্ছেও
তিনি করেননি।
সেদিন ডিসপেনসারি বন্ধ করে ঘরে এসেই
বুড়িকে চায়ের অর্ডার দিয়ে লেপের তলায়
যেয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়লেন তিনি। শীতে তার হাত
পা কাঁপছিল।
চায়ের আশায় বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরেও যখন
চা নিয়ে কেউ আসলনা, তখন তার মেজাজ বিগরে গেল।
দেরী করার জন্য বুড়িকে গাল মন্দ করতে থাকলেন। কিন্তু
অন্য দিনের মত আজ আর বুড়ি তার কথায় উত্তর দিচ্ছিলেন না।
এতে মেজাজ আরও বিগড়ে গেল। রাগের মাথায়
ঠাণ্ডা উপেক্ষা করেই রান্না ঘরের দিকে হাঁটা দিলেন।
সেখানে যেয়ে দেখলেন তার স্ত্রী সেখানে নেই।
চুলোয় পানি গরম হচ্ছে ঠিকই।স্বপন
ডাক্তার স্ত্রীর নাম ধরে ডাকতে লাগলেন।
আশে পাশে কোন সাড়া শব্দ পাওয়া গেলনা। স্বপন ডাক্তার
ভাবলেন তাকে না বলেই বাইরে কারো উপকার
করতে চলে গেছেন। তাই
তিনি রাগে গজরাতে গজরাতে নিজের খাটের
পাশে গিয়ে বসলেন। সাথে সাথেই বাইরে থেকে অদ্ভুত
এক কণ্ঠে কেউ তাকে ডেকে উঠল। ডাক শুনে স্বপন
ডাক্তারের সারা শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেল। মাঝ
রাতেও তাকে অনেকে ডেকে নিয়ে যায়। কিন্তু আজ
এই সন্ধ্যে বেলাতেই এক ডাকে তাকে ভয়
পাইয়ে দিয়েছে। স্বপন ডাক্তার উত্তরে বলল,
“বাইরে কে ডাকে রে?”
বেশ কিছুক্ষণ কোন সাড়াশব্দ মিলল না। তারপর খুব রুগ্ন
কণ্ঠে কারো ডাক শুনল। সে কান পেতে শুনল। কেউ
তাকে বলছে, “ডাক্তারবাবু বাসায়? এখুনি একটু হাওলাদার
বাড়ী চলেন না”।
হাওলাদার বাড়ির নাম শুনে স্বপন ডাক্তারের চোখ জ্বল
জ্বল
করে উঠল। হাওলাদার মশায় অনেক দিন ধরেই অসুস্থ। তার
কাছে রাত বিরাতে গেলে একটু কষ্ট হয় বটে, কিন্তু
তিনি হাজার টাকা হাতে গুজে না দিয়ে তাকে আসতে দেন
না।
সাথে ফ্রী গরম চা সিগারেটতো আছেই। হাওলাদার মশাই
তার পুরনো রোগী। আবার বুড়ির উপর একটু রাগ হচ্ছে।
এই সুযোগে বউকেও একটা উচিত শিক্ষা দেয়া যাবে। তাই
তিনিও ধুলো পড়ে যাওয়া রেইন
কোটটা গায়ে চাপিয়ে বুড়িকে না বলেই হাওলাদার বাড়ির
উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। পেছনে দরজা খোলাই থাকল।
হাওলাদার বাড়ি তার বাড়ি থেকে খুব বেশী দূরের পথ না।
আধা কিলোর কম হবে। রাস্তায় অন্ধকার। তাই বৃষ্টিতে টর্চ
জ্বেলেও হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। টর্চের চার্জও শেষের
দিকে। কে জানত তাকে এমন
দিনে বাইরে বেরুতে হবে। বেশ কিছুদূর যাবার পর তার
মনে হল
যে তাকে ডেকেছে সে লোকটিকে একবারের
জন্যও তিনি দেখতে পাননি। এতে খুব অবাক লাগল তার ।
কি এমন তাড়া ছিল যে লোকটি তাকে না বলেই
চলে গেছে? স্বপন ডাক্তার একবার ভাবলেন
ফিরে চলে যাবেন। কিন্তু বুড়ির উপর জেদের
কাছে পরাজিত হলেন। তারপর প্রায় বিশ মিনিট অনেক কষ্ট
করে হেঁটে অবশেষে হাওলাদার বাড়িতে পৌঁছুলেন।
হাওলাদার সাহেবের প্রকাণ্ড বাড়ি। বাড়িতে থাকবার
জায়গার অভাব
না থাকলে কি হবে, থাকার মানুষ নেই। তার স্ত্রী গত
হয়েছেন দেড় বছর আগে। দুই ছেলেই যুক্তরাষ্ট্র
প্রবাসী। মেয়েটিও পরিবার নিয়ে কানাডা থাকে।
স্ত্রী মারা যাবার পর মেয়ের কাছে বেশ কয়েক মাস
ছিলেন। মেয়েটিও তাকে দেশে রেখে আবার বিদেশ
চলে গেছে। যাবার আগে বলে গেছে, তার
বাবাকে সেখানে দেখবার কেউ নেই। তারা স্বামী-
স্ত্রী দুজনেই চাকুরী করে। তার মা মারা যাবার পর
সে নাকি বেশ পাগলামো করতে শুরু করে দিয়েছিল।
সেদেশের আইন কানুন অনেক কড়া। কোন অঘটন
ঘটলে তাদের আর সেখানে থাকবার উপায় থাকবেনা।
অনেকেই তার মেয়ের এই যুক্তিগুলো মেনে নিলেও
এলাকার বেশিরভাগ মানুষই হাওলাদার সাহেবের
ছেলে মেয়েদের প্রচুর সমালোচনা করে। হাওলাদার
সাহেব আগা গোরাই খিট খিটে মেজাজের হওয়ায় কেউ
তাকে পছন্দ করত না। লোকজন বাড়ির আশে পাশেও খুব
একটা আসত না। দুই জন কাজের লোক দিন রাত তার দেখ
ভাল করত।
বাড়িতে প্রবেশ করে স্বপন ডাক্তার কাজের লোক দুটির
কাউকেই দেখতে পেলেন না। বেশ পুরনো বাড়ি। হিন্দু
সম্পত্তি কিনেছিলেন হাওলাদার সাহেব। বাড়ির
এখানে ওখানেই মানুষের মূর্তি এখনো অক্ষত আছে।
বাইরে ঘন অন্ধকার। চারদিকে বৃষ্টির আওয়াজ ছাড়া কিছুই
স্বপন
ডাক্তার এর কানে যাচ্ছিলোনা। বেশ অস্বস্তি লাগছিল তার।
এমন
ছমছমে পরিবেশে সে কখনো এ বাড়িতে আসেনি।
সে খুব সাবধানে পা টিপে টিপে বাড়ির
আঙ্গিনা পেড়িয়ে বারান্দায় উঠতে যাবে ঠিক তখনই হঠাৎ
করে বাইরে মৃদু বিজলী চমকাল। আঁতকে উঠে স্বপন
ডাক্তার সামনে চেয়েই ভয় পেয়ে গেলেন। তার মনে হল
ঠিক তার সামনে একটি প্রকাণ্ড মূর্তি তার দিকে তীক্ষ্ণ
দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। তার বুকটা ধক করে উঠল।
আসলেই সেটা কি বুঝে উঠবার আগেই আকাশের
আলো গায়েব হয়ে গেছে। সে নিজের টর্চ
জ্বালালো। সামনে যেতে যেতে মুর্তিটিকে পার
হয়ে গেছে ততক্ষনে। কি মনে করে আবারো সেই
মুর্তিটির দিকে টর্চের আবছা আলো ফেললেন। কিন্তু
সাথে সাথেই টর্চ নিভিয়ে ফেললেন।
আবারো তিনি যা দেখলেন তা আর দেখতে চাননা। এতক্ষণ
যা তার কাছে শুধু অদ্ভুত মনে হয়েছিল, এখন সেটা বাস্তব
মনে হল। কারণ মুর্তিটি তখনো তার
দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়েছিল।
তাড়াহুড়ো করে সামানে এগুতে যেয়ে বৃষ্টিভেজা
বারান্দায়
তিনি পিছলে পড়ে গেলেন। স্বপন ডাক্তারের তখন
মনে হল, আজ বুঝি তার আর রক্ষা নাই। ভীত
কন্ঠে সে কাজের লোকের নাম
ধরে ডাকতে যাবে ঠিক তখনই একটা ঘরের ভেতর
থেকে কাউকে ডাকতে শুনলেন, “ডাক্তার মশাই,
বাইরে দাঁড়িয়ে কি করেন? ভেতরে আসেন”।হাওলাদার সাহেবের গলার আওয়াজ
শুনে তিনি অনেকটা স্বস্তি পেলেন।
ভয় পাবার লোক সে নয়। কিন্তু আজ বেশ ভয় পাচ্ছেন।
যে ঘর থেকে হাওলাদার সাহেব ডেকেছিলেন,
সে ঘরে প্রবেশ করে দেখলেন,
ঘরে কেউই নেই। জানালা খোলা, সেখান দিয়ে অনবরত
বৃষ্টির ছাট ঘরে প্রবেশ করছে। বোঝাই গেল
অনেকক্ষণ ধরেই এই ঘরে কেউ আসেনি।
তাহলে তাকে ডাকল কে? কথাটা ভেবে তার
শরীরে শিহরন এল। এই ঘরে হাওলাদার সাহেব থাকতেন
না কখনোই। তিনি উপরের তলায় থাকেন। কাজের
লোকদের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে স্বপন ডাক্তার
দোতালায় উঠে এলেন। উপরেও ঘন অন্ধকার। নিচে তাও
কাজের লোকদের ঘরের বাতি থকে কিছু
আলো পাওয়া যাচ্ছিল। উপরে এর ছিটা ফোটাও নেই। স্বপন
ডাক্তার এইবার ভড়কে গেলেন।এতক্ষণ
ধরে ডাকাডাকি করেও কাউকেই তিনি দেখছেন না।
একেতো লোকজনের কোন হদিস নেই,
অপরদিকে যার ডাকে এখানে এসেছেন তার দেখাও
মিলছেনা। শুধু অদ্ভুত এক কন্ঠে কেউ
তাকে নির্দেশনা দিচ্ছে।
নানা কথা চিন্তা করে তিনি সামনে না এগিয়ে এক জায়গায়
দাঁড়িয়ে থেকে টর্চ লাইটের নিভু নিভু
আলো মেরে চারদিক দেখতে লাগলেন। কে জানত এই
অন্ধকার বাড়িতে রাত বিরাতে এসে তাকে এমন
বিপদে পড়তে হবে। এখন তার নিজের উপরেও খুব রাগ
হচ্ছে। রাগের মাথায় কিছু না ভেবেই চলে এসেছেন।
মোবাইলটাও সাথে আনতে ভুলে গেছেন।
একসাথে এতগুলো ভুল তার হয়না। আজ দিনটাই বুঝি অশুভ। হঠাৎ করেই স্বপন ডাক্তার আবার তার নাম
ধরে কাউকে ডাকতে শুনলেন। ততক্ষণে টর্চের চার্য
একেবারেই শেষ। বুঝার উপায় নেই কে তাকে ডাকছে।
মনে হচ্ছে দূর থেকে কেউ তাকে হাওলাদার সাহেবের
মত করে ডাকছে, “ডাক্তার মশাই এইদিকে আসেন”। চারদিক
থেকে এই ডাক প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। অথচ বাইরের বৃষ্টির
আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই কানে আসছেনা। কারো পায়ের
আওয়াজও না। সেই ডাক বার কয়েক শোনার পর আর
তা শোনা যাচ্ছেনা। তবে সে তার ঘাড়ের
উপরে অজানা কোন শক্তির প্রভাব অনুভব করতে শুরু
করেছে। সেটি তাকে তার ইচ্ছার
বিরুদ্ধে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। স্বপন ডাক্তারের
গলা দিয়েও কোন আওয়াজ বেরুচ্ছে না। চারদিকে পিনপতন
নীরবতা। বাইরে বৃষ্টির আওয়াজও আর শোনা যাচ্ছেনা।
ততক্ষণে তিনি একটি পচা দুর্গন্ধময় ঘরে এসে প্রবেশ
করেছেন। এরপরে কি ঘটবে সে অপেক্ষাতেই
তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। প্রতিটি সেকেন্ড যেন তার
কাছে এক একটি মিনিট মনে হচ্ছে। হঠাৎ করেই
হালকা আওয়াজে বজ্রপাত হল।
জানলা দিয়ে যে আলো ঘরে এল তাতে তিনি স্পষ্ট
দেখতে পেলেন পচা গলা হাওলাদার সাহেবের লাশ বিছানার
উপরে পড়ে আছে। আর সেই মুর্তির মত তীক্ষ্ণ
দৃষ্টিতে লাশটির চোখদুটি ঠিক স্বপন ডাক্তারের দিকেই
চেয়ে আছে। লাশ দর্শনের পর কিভাবে যেন সেই শক্তিটি তার ঘাড় থেকে সরে গেছে। সুযোগ
পেয়ে স্বপন ডাক্তারও গলা ফাটিয়ে চিৎকার
করতে করতে অজানা অন্ধকারে ছুটলেন।
পরদিন সকালে স্বপন ডাক্তারের আধা মৃত দেহ সেই
মুর্তিটির কাছেই পাওয়া গেল। পুলিশ এলে আরও জানা গেল
হাওলাদার সাহেবের দুই চাকরের কুকর্মের কথা।
তারা দুজনেই চেলাই মদ আনতে গিয়ে পুলিশের
কাছে ধরা খেয়ে আজ সাত দিন ধরে হাজত বাস করছে।
সবাই ভেবেছিল এখানেই বুঝি ঘটনার শেষ। কিন্তু স্বপন
ডাক্তারের ঘটনা আরও রহস্যময় হয়ে পড়লো।কারন কেউ তার স্ত্রীর কাছে দুর্ঘটনার খবর নিয়ে গেলে তিনি বললেন যে, তার স্বামী যদি হাওলাদার
বাড়িতে যেয়ে থাকে, তাহলে সারা রাত ধরে তার
পাশে লেপের তলায় কে শুয়ে ছিল? (সমাপ্ত)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now