বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ঘরে ফেরার গান
---অরিন বাশিরা
মনের মাঝে এক চরম অস্থিরতা নিয়ে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল রকিব সাহেবের। ধীর পায়ে বারান্দায় ইজি চেয়ারে এসে বসলেন। কেমন যেন অস্বস্তি লাগছিল, বুকের ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। মনে হচ্ছে দুঃস্বপ্নের কথাটা কাউকে বলতে পারলে ভাল লাগত।কী করবেন তিনি? স্ত্রী কে ঘুম থেকে ডেকে তুলবেন? নাহ থাক,এই অসুস্থ মানুষটা সারাদিনের খাটাখাটুনি সেরে ঘুমাতে যায়,ঘুমাক বেচারি। ছেলেটাকে ফোন দিবেন কিনা সেটাও ভাবলেন। ছেলে চাকরী,সংসার নিয়ে ভাল আছে জানতে পারলে একটু ভাল লাগত। পরক্ষণেই মনে পড়ল অনেক রাতে বাড়ি ফেরে ছেলে,এই ভোরবেলা ফোন দেয়াটা ঠিক হবে না। ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দিলেন রকিব সাহেব। রিটায়ার্ড জীবন্ শুরু হবার পর থেকে এভাবেই দিনগুলো কেটে যাচ্ছে। সামান্য আয়ের সংসারে ছেলেকে বড় করেছেন। ছেলে নিজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত;এরচেয়ে বড় সুখ আর কি হতে পারে। নিজের ভাইবোন-স্ত্রী-সন্তানের দায়িত্ব পালন শেষে এমন অবসরের জন্যই তো কতদিন অপেক্ষা করেছেন তিনি। নিজের মনকে এমন মিথ্যা স্বান্তনা দিতে দিতে চোখ বুজে এল।
রাতুল চটজলদি রেডি হচ্ছে। আজ অফিসে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিং আছে। বিদেশী ক্লাইন্টরা আসবে। আজকের মিটিং এর উপর ওদের কোম্পানির একটা বিশাল এগ্রিমেন্ট নির্ভর করছে।হাতে একটুও সময় নেই। তার ছয় বছরের ছেলে অন্তুকে স্কুলে রেখে তাকে অফিস যেতে হবে। এই তাড়াহুড়োর মাঝে ওর সেলফোনটা বেজে উঠল। এক প্রকার বিরক্ত নিয়েই ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল বাড়ি থেকে বাবার কল।
-হ্যালো,বাবা,আসসালামু আলাইকুম
-ওয়ালাইকুমুস সালাম,বাবা,কেমন আছিস তোরা?
-এইতো বাবা,আমরা ভাল আছি। তোমরা কেমন আছ? মায়ের শরীর এখন কেমন?
- তোর মা আছে আগের চেয়ে একটু ভাল। তোর অফিস কেমন চলছে?
-আর বলো না,এত কাজের চাপ। সারাদিন মিটিং,কনফারেন্স...ছেলেটাকে ঠিক মত সময় দিতে পারিনা
- সামনে গ্রীষ্মের ছুটি হচ্ছে, বউমা আর অন্তুকে নিয়ে দুদিনের জন্য ঘুরে যা না বাড়ি থেকে। কতদিন দাদু ভাইকে দেখি না। বাগানের আম কাঁঠাল পাকার সময় হয়ে এল
- না, বাবা এবার আর সময় হবেনা। ভাবছি ওদের নিয়ে এবার একটু দার্জিলিং থেকে ঘুরে আসব। বাচ্চাটার একটু চেঞ্জ দরকার।
-আসলে আজ ভোরে একটা স্বপ্ন দেখে………
-আচ্ছা,বাবা তুমি একটু ফোন রাখো তো। একটা ইমপর্ট্যান্ট কল আসছে। আমি তোমাকে পরে ফোন দিচ্ছি।
রকিব সাহেবের কথাটা অসম্পূর্ণ থেকে গেল।ছেলে অনেক ব্যস্ত। দীর্ঘশ্বাস গোপন করে মনে মনে বললেন “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে”।
রাত প্রায় এগারোটা। ক্লান্তি নিয়ে গাড়িতে এসে বসল রাতুল।সারাদিনের এত পরিশ্রমের পরেও তার ঠোঁটে যুদ্ধজয়ের হাসি। তার হাসিই বলে দিচ্ছে তার মিটিংটা সফল হয়েছে। ফোনে রিং বেজে উঠল।
-বাবা,তুমি কখন আসবে? তুমি এলে আমি ঘুমাতে যাব ফোনের ওপারে অন্তুর অভিযোগের সুর
-এইতো বাবা,আর কিছুক্ষণ। তুমি ঘুমিয়ে পড়। কাল না তোমার সকালে স্কুল আছে?
-ওহো,কাল না আমার সামার ভ্যাকাশন শুরু। এটাও ভুলে গেছো? তুমি তাড়াতাড়ি আসো। আমি আজ তোমার সাথে ঘুমাতে যাব।
রাতুলের মনে হল সে পারলে সমস্তকিছু ভেদ করে বাড়ি ফিরুক। ছেলের কন্ঠে যখন এমন কিছু আবদার শোনে তখন পৃথিবীর সবকিছু তার কাছে মিথ্যা হয়ে যায়।অথচ এই নাগরিক যন্ত্রণা কিভাবে তার আর তার সন্তানের মাঝে দেয়াল তুলে দিয়েছে।
বাড়ি ঢুকতেই অন্তু কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বাবার হাতে একটা নিজের আঁকা কার্ড দিয়ে বলল "happy father’s day baba"
মুহূর্তে রাতুলের চোখে পানি চলে এল। মনে হল জীবনের সফলতাগুলো এই ছোট্ট কথার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল।সে পরম আদরে ছেলেকে জড়িয়ে ধরল।
রাতে বাবার কোলের মাঝে অন্তু শুয়ে আছে।সে আজ বাবার সাথেই ঘুমাবে। সে প্রশ্ন করল
-বাবা,তুমি আমাকে অনেক ভালবাস তাইনা?
-হ্যাঁ বাবা,অনেক ভালবাসি। রাতুলের গর্বিত উত্তর
-তাহলে দাদুও তোমাকে অনেক ভালবাসে,তাইনা?
- হ্যাঁ,দাদুও আমাকে অনেক ভালবাসে
-তুমিও আমার মত দাদুকে ফাদার’স ডে উইস কর,তাইনা?
রাতুল এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারল না।তার হঠাৎ মনে পড়ল সকালের পর আর বাড়িতে ফোন দেয়া হয়নি। বাবার সাথে কথা শেষ হয়েছিল না তখন। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন।
বিছানায় শুয়ে ছেলের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে আছে রাতুল। ভাবছে ছাত্র জীবনে বন্ধুদের আড্ডায় কতবার বলেছে “আমাদের দেশে বাবা দিবস,মা দিবস এসবের মানে হয়না। আমাদের প্রতিটা দিন বাবা,প্রতিটা মূহুর্ত মায়ের সাথে কাটে”।অথচ বাবার সাথে কতদিন দেখা হয়না,দুমিনিট কথা হয়না।মনের অজান্তেই ফোনের দিকে হাত চলে যাচ্ছে রাতুলের।বাবার নম্বরটা স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে। তার ভেতরের অনুতাপী সন্তান সত্তা তাকে সবুজ বাটনে ক্লিক করতে দিচ্ছে না।সে মনকে মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছে “বাবা ঘুমিয়ে পড়েছে। কাল সকালে কথা হবে”।
পরদিন ফজরের নামায পড়ে রকিব সাহেব বারান্দায় এসে দাড়ালেন। আজ কেন যেন সবকিছু ভাল লাগছে,মনের মাঝে অপার্থিব এক সুখ অনুভব করছেন। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। রাতুলের কল দেখে তার ভাল লাগা আরো বেড়ে গেল। ওপার থেকে রাতুলের গলা,
-বাবা, কেমন আছো?
- আছি বাবা,ভালো। আজ এত সকাল সকাল ফোন করলি যে। সব ঠিকঠাক আছে তো?
-হ্যাঁ বাবা, সব ঠিকঠাক। মাকে বলো আমরা বাড়ি আসছি। এইতো গাড়িতে রওনা দিলাম মাত্র।আড়াই ঘন্টার মাঝে পৌঁছে যাব
-তাই নাকি? আমি এক্ষুনি তোর মাকে বলছি। উত্তেজনায় তাঁর গলা ধরে আসছিল।
-বাবা…রাতুল নিচু কন্ঠে ডাকল
-হ্যাঁ শুনছি,বল
-তুমি খুশি হয়েছ?
- অনেক খুশি হয়েছি বাবা,অনেক খুশি হয়েছি, আয় বাবা,আমি অপেক্ষা করছি…।
রকিব সাহেব কথা বলছেন আর তার গাল বেয়ে চোখের জল নেমে পড়ছে। আজ যে তার ছেলে নাতি বাড়ি আসছে। আজ তার ঘরে চাঁদের হাট। আজ তিনি প্রাণভরে কাঁদতে চান…।।
সবুজ মাঠের ভেতর দিয়ে রাতুলের গাড়ি ছুটে চলছে। তার চোখে পানি টলটল করছে।অন্তুর দাদা বাড়ি যাবার আনন্দের কাছে এই অশ্রুটুকু খুব তুচ্ছ মনে হচ্ছে তার। দাদা বাড়ি আর দার্জিলিং এর মাঝে এই শিশুটা পার্থক্য জানেনা। কিন্তু কাল রাতের মাঝে রাতুল জেনেছে অন্তুর দাদা বাড়ি অন্তুর কত বড় আশ্রয়। ছেলেটা জানালার কাঁচ খুলে মাথা বের করে দিয়েছে। রাতুলের মনে হল ছেলেকে নিষেধ করা উচিত,কিন্তু আজ ইচ্ছা করছে না। লাগুক না ছেলের গালে মুখে তার শেকড়ের ধুলো…আজ যে তার বুকের মাঝে অনবরত বেজে চলেছে ঘরে ফেরার গান।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now