বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

এলিয়েন

"রহস্য" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান জিহান সরকার (০ পয়েন্ট)

X বেঁচে থাকতে হলে খুন করতে হয়। তাবৎ প্রাণিকুলের দিকে তাকালে এই সত্য আরও বেশি করে চোখে পড়ে। নিজেকে আরও একবার আশ্বস্ত করল আহাব। আর মাত্র একটি খুন তাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে আরও এক শতাব্দী! কোমরে হাত বুলিয়ে স্মার্ট-গ্লকটা আরও একবার টের পেল সে। কখনো ভাবেনি এ রকম জিনিস সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়াবে। অথচ আজ তিন দিন ধরে জিনিসটা তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। প্রথম দিনেই প্রথম খুনটা করতে পেরেছিল পরিত্যক্ত সংসদ ভবন এলাকায়। ভবঘুরে ছিল লোকটা। ভেবেছিল বাকি দুদিনে অনায়াসে খুঁজে পাবে আরেকজনকে, কিন্তু গতকাল থেকে আজ পর্যন্ত শত শত মানুষজনকে টার্গেট করলেও সবগুলোই বাতিল করা হয়েছে। হয় তারা ফাউন্ডেশনের ক্লায়েন্ট, নয়তো সেই ক্লায়েন্টের পরিবার-পরিজন। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার ভেতর থেকে। আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাল। রাতের কালো আকাশ ফ্যাকাসে করে দিয়েছে ঢাকা শহরের শতসহস্র হলোগ্রাফিক প্রজেকশন। তবে সে নিশ্চিত, আকাশজুড়ে তারার মেলা আছে। আরও আছে পুলিশের সার্ভিলেন্স ড্রোন। বহুকাল আগেই টহল পুলিশ উঠে গেছে। হাজার হাজার ড্রোন এখন পৃথিবীর শহরময় উড়ে বেড়ায়। তীক্ষ্ণ নজরদারি করে জনগণের ওপর। পুব আকাশের বিশাল হলোগ্রাফিক ঘড়িটা রাতের আকাশে জ্বলজ্বল করে একটা সংখ্যা দেখাচ্ছে: ২০৯৯। আর মাত্র এক ঘণ্টা পরই সংখ্যাটি বদলে যাবে, পৃথিবী প্রবেশ করবে নতুন শতকে। সেই সঙ্গে কি শেষ হয়ে যাবে তার দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার পাগলামিটাও? আবারও হাঁটতে শুরু করল আহাব। দুদিন ধরে তার চোখ টার্গেট খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত। তার সমবয়সী যার দিকেই ফোকাস করেছে, কয়েক সেকেন্ড পর চোখের সামনে ভেসে উঠেছে একটি অসহ্য-বাক্য: যোগ্য টার্গেট নয়। ঠিক তার সমবয়সী আরেকজনকে খুঁজে বের করতে হবে। সমলিঙ্গেরও হতে হবে। থার্টি ফার্স্ট নাইটে শহরের এই প্রাণকেন্দ্রে জড়ো হওয়া প্রচুর মানুষজনের ভেতর থেকে এমন একজন মানুষ অনায়াসে বেছে নিতে পারবে সে—একটু আগে তাকে এমনই বলা হয়েছে ফাউন্ডেশন থেকে। ইদানীং এত মানুষ ফাউন্ডেশনের দ্বারস্থ হচ্ছে বলে অবাকই হলো সে। সারা দুনিয়ার কেউ বুঝি বাকি নেই। তাহলে গুজবটাই সত্যি। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ফাউন্ডেশন নীরবে কাজ করে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। মানুষের আয়ুষ্কাল তিন গুণ বাড়িয়ে দেওয়ার কাজটি নাকি বেশ সফলভাবেই করতে পারে তারা। তবে সরকারের কাছ থেকে অনুমতি পায় না বলে আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ করে। নিজেদের ক্লায়েন্টের ব্যাপারে ফাউন্ডেশন বেশ দায়িত্বশীল। তারা নানা রকম শর্ত জুড়ে দেয়—শিশু, বিপরীত লিঙ্গ, ক্লায়েন্ট, ক্লায়েন্টের পোষ্য আর সমাজে অত্যধিক মেধাবী হিসেবে পরিচিত ব্লু কার্ডধারীদের কোনোভাবেই টার্গেট করা যাবে না। এ কারণে চারপাশে অসংখ্য মানুষজন থাকলেও আহাবের পক্ষে হুট করে স্মার্ট-গ্লকটা ব্যবহার করা হয়ে উঠছে না। অথচ প্রথম যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করবে তখন ভাবতে পারেনি কাজটা তার জন্য কতটা কঠিন হতে পারে। ফাউন্ডেশনের কাজকারবার সম্পর্কে একটা গুঞ্জন অনেক দিন ধরেই শুনে আসছিল, কিন্তু ওয়ার্ল্ড-ওয়াইড-ওয়েবে তাদের কোনো টিকিও খুঁজে পায়নি। অবশেষে তার বন্ধু সঞ্জয় জানায়, ফাউন্ডেশন যেহেতু বেআইনি একটি প্রতিষ্ঠান তাই সরকারের কোপানল থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য ডার্ক-ওয়েব ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যাবে না তাদের। তো, ডার্ক-ওয়েব জিনিসটাও তো গোপন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই ওটা পৃথিবীর সবগুলো সরকারের কড়া নজরদারির মধ্যেও টিকে আছে। দিন দিন ভীষণ জনপ্রিয়ও হয়ে উঠছে। সব ধরনের বেআইনি জিনিস আর সেবা পাওয়া যায় ওখানে। সরকারগুলো ডার্ক-ওয়েবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও দিনে দিনে সেই সব পদক্ষেপ দুর্বল হয়ে পড়ছে। তারা এখন ব্যস্ত হলিয়েনদের নিয়ে। কীভাবে তাদের চিহ্নিত করবে, বিতাড়িত করবে সেটা মস্ত এক প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। হলিয়েনরা নাকি ধীরে ধীরে সমস্ত পৃথিবী গ্রাস করে নেওয়ার দুরভিসন্ধি করছে! আহাব জানে, সারা বিশ্বের রাজনীতিকেরাই নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য এমন ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব কপচায়, আর জনগণের বিরাট অংশ এটা বিশ্বাসও করে। অথচ আজ থেকে ষাট বছর আগে যখন মঙ্গল গ্রহে অণুজীবের উপস্থিতির প্রমাণ মিলল, সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা আনন্দে মেতে উঠেছিল। তারা ধারণা করেছিল, নিকট ভবিষ্যতে বহির্জীবদের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করতে সক্ষম হবে মানুষ, আর সেটাই হয়েছিল দশ বছর পর—দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে পৃথিবীর মানুষ অপার্থিব জীবদের দেখা পায়। অবাক করা বিষয় হলো, শত বছরের হাজার হাজার কল্পকাহিনিতে বর্ণিত অদ্ভুত, কিম্ভুতকিমাকার কোনো প্রাণী নয়, পৃথিবীতে পা রাখে মানুষসদৃশ বহির্জীবেরা। দেখতে হুবহু মানুষের মতো এসব অপার্থিব প্রাণী বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু এরপরই তাদের পথ ধরে চলে এল হলিয়েনরা। দেখতে মানুষের মতো হলে কী হবে, প্রচণ্ড শত্রুভাবাপন্ন এসব বহির্জীব শুরু থেকেই মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে ইচ্ছুক ছিল না। সে জন্যই মানুষজন তাদের ‘হস্টাইল-এলিয়েন’ নামে ডাকতে আরম্ভ করে। কালক্রমে সংক্ষিপ্ত হয়ে হলিয়েন শব্দটি জনপ্রিয় হয়ে যায়। আজকাল মা-বাবারা সন্তানদের হলিয়েনের গল্প শুনিয়ে ভয় দেখায়, ঘুম পাড়ায়। প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় হলিয়েন ধরা পড়ে। অবৈধভাবে পৃথিবীতে থাকার জন্য বিচারও করা হয় তাদের, কিন্তু ফৌজদারি কোনো মামলায় জড়ানো যায় না। এর কারণ জন্মগতভাবে খুন করার মতো নার্ভ নিয়ে জন্মায় না হলিয়েনরা। মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমত্তা থাকলে কী হবে, এই এক জায়গায় ভীষণ দুর্বল তারা। মানুষের সঙ্গে কোনো রকম যুদ্ধে না জড়িয়ে তারা মিশে যাওয়ার চেষ্টা করে। আর মানুষের মতো দেখতে বলে খুব সহজে তাদের চিহ্নিতও করা যায় না। এর ফলে সারা পৃথিবীতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে তারা। বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে পৃথিবীর সরকারগুলো তাদের চিহ্নিত করার কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছে। মানুষের তৈরি অত্যাধুনিক রাডার ফাঁকি দিয়ে সবার অলক্ষ্যে প্রতিদিন শত শত হলিয়েন-শিপ অবতরণ করে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। মানুষজন থেকে হলিয়েনদের খুঁজে বের করাটা তাই খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। গুজব আছে, সরকারের ভেতরেই নাকি ঘাপটি মেরে আছে অসংখ্য হলিয়েন! আর মিডিয়ার প্রায় পুরোটাই দখল করে নিয়েছে তারা। যা হোক, এসব অপার্থিব মানবদের বিরুদ্ধে অভিযানে ব্যস্ত থাকলেও পৃথিবীর প্রগতি থেমে থাকেনি। বরং ধৃত হলিয়েনদের কাছ থেকে তাদের উন্নত প্রযুক্তি আর বিজ্ঞান ব্যবহার করে দিন দিন মানবসভ্যতা উন্নতির শিখরে পৌঁছাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করে দেখেছে, একজনের সঙ্গে আরেকজন মানুষের জেনেটিক্যালি সর্বোচ্চ প্রভেদ হচ্ছে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ, আর মানুষের সঙ্গে শিম্পাঞ্জির প্রভেদ মাত্র ১ দশমিক ১২ শতাংশ। সেদিক থেকে দেখলে হলিয়েনরা বেশ এগিয়ে আছে। মানুষের চেয়ে তারা ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ উন্নত। সংখ্যাটা সাধারণ মানুষের কাছে নেহাত কম মনে হলেও বিজ্ঞানীদের কাছে এটা রীতিমতো মাউন্ট এভারেস্টতুল্য পার্থক্য। ধৃত হলিয়েনদের ইন্টেরোগেট করে তাদের অগ্রসর চিন্তাভাবনা জেনে নেয় মানুষ। হলিয়েনদের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে বিরাট বড় বড় আবিষ্কারও করা হয়েছে। ক্যানসার বলে কিছু নেই এখন। এইডস রোগ হয়ে গেছে সর্দি-কাশির মতো সাময়িক ভোগান্তি। অঙ্গহানি নিয়ে মানুষের দুশ্চিন্তার দিন শেষ হয়েছে আরও দশ বছর আগে। কেটে যাওয়া অঙ্গ ধীরে ধীরে গজাতে শুরু করে এখন। দৃষ্টিশক্তি হারানোর ভয় চলে গেলেও প্রচুর মানুষ চশমা নামক বস্তুটা আঁকড়ে আছে, কারণ স্মার্ট-গ্লাস জীবনযাত্রার অনেক কিছুই সহজ করে দিয়েছে। এ রকম উল্লম্ফন যখন চলছে তখন ‘ফাউন্ডেশন’ নামের একটি গুপ্ত সংস্থার কথা শোনা যেতে শুরু করে। তারা নাকি হলিয়েনদের কাছ থেকে বহু কাঙ্ক্ষিত অমৃতের সন্ধান পেয়ে গেছে। মানুষকে পুরোপুরি অমর করতে না পারলেও বেঁচে থাকার আয়ু প্রায় তিন গুণ করার কাজটি সফলভাবে করতে সক্ষম তারা। তারা এমনও দাবি করছে, আজ যে মানুষটি তাদের কাছ থেকে অমৃতের স্বাদ নেবে, সে তার জীবৎকালের দুই-তৃতীয়াংশ শেষ করার আগেই ফাউন্ডেশন প্রযুক্তিটির উৎকর্ষ আরও বাড়াতে সক্ষম হবে। তখন হয়তো দ্বিতীয়বারের মতো অমৃতের সেবা পেয়ে মানুষ আরও একবার নিজের আয়ুষ্কাল পুনরায় কয়েক গুণ বাড়িয়ে নিতে পারবে। এভাবে চলতে থাকলে অমরত্বের দেখা পাওয়াটা অসম্ভব কিছু হবে না। তো, অনেক কষ্টে ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর আহাব খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল। কাজটা এত সহজে হয়ে যাবে, ভাবতেও পারেনি। একদম বিনা খরচে নির্বাচিত কিছু মানুষ এ সেবা পাবে যদি তারা ফাউন্ডেশনের অদ্ভুত আর যৌক্তিক শর্তটা মেনে নেয়। তুমি তিন গুণ সময় বাঁচতে চাও, ভালো কথা, কিন্তু পৃথিবীর রিসোর্স খুবই সীমিত। লক্ষ-কোটি মানুষ তিন-চার গুণ আয়ু নিয়ে বেঁচে থাকলে সমস্ত পৃথিবীর রিসোর্সের ওপরে বিরাট প্রভাব ফেলবে, সুতরাং তিন গুণ আয়ু চাইলে কমপক্ষে দুজন মানুষকে সরিয়ে দিতে হবে দুনিয়া থেকে। আর কাজটা করতে হবে তোমাকেই। সহজ সমাধান। একদম যৌক্তিক। অন্তত ফাউন্ডেশনের মোটিভেশন ক্লাস করার সময় তেমনই মনে হয়েছিল তার। কিন্তু দু-দুটো খুন করা এখন আর সহজ কোনো কাজ নয়, বিশেষত ফাউন্ডেশনের ক্লায়েন্টের সংখ্যা যখন হু হু করে বেড়ে চলেছে। এই দুই দশকে তারা ঠিক কী পরিমাণ মানুষকে এই সেবা দিয়েছে সেটা জানা না গেলেও আহাব এখন বুঝতে পারছে, সংখ্যাটা গুজবের চেয়ে অনেক অনেক বেশিই হবে। এই বাংলাদেশেও যে তাদের এত ক্লায়েন্ট থাকতে পারে, তার জানা ছিল না। তার নাকের ওপরে চেপে বসা চশমাসদৃশ স্মার্ট-গ্লাস প্রতিটি টার্গেটের ফেশিয়াল রিকগনিশন করে ফাউন্ডেশনে পাঠিয়ে দিচ্ছে, আর সেখান থেকে তাকে অবিরাম জানান হচ্ছে, টার্গেটকে ‘ইগনোর’ করার জন্য। এভাবে শত শত টার্গেট ইগনোর করা হয়েছে বিগত দুদিনে। যোগ্য টার্গেট দেখা পাওয়ামাত্রই তার চোখে ভেসে উঠবে ‘গো’ লেখাটা। সঙ্গে সঙ্গে অ্যাক্টিভেট হয়ে যাবে স্মার্ট-গ্লক। তারপর টার্গেটের দিকে সেটা তাক করে শুধু ট্রিগার চেপে দিলেই হবে—এমন ইন্সট্রাকশনই সবাইকে দেওয়া হয়। কিন্তু আহাব এখন বুঝতে পারছে, এই মিশনে ব্যর্থ হবে সে। দুনিয়া ভরে গেছে ফাউন্ডেশনের ক্লায়েন্ট আর তাদের পোষ্যদের দিয়ে। এটা কীভাবে সম্ভব? এত ক্লায়েন্ট তো হওয়ার কথা নয়। তাহলে পৃথিবীর সীমিত রিসোর্সের ওপরে ভীষণ চাপ পড়বে না? মোটিভেশন ক্লাসের কথাগুলো মনে পড়ে গেল তার। ফাউন্ডেশনের কথা আর কাজে মিল পাচ্ছে না। এ নিয়ে ভাবতে ভাবতে উত্তরার পুরোনো এয়ারপোর্টের কাছে চলে এল। জায়গাটা এখন সুবিশাল একটি স্কয়ার। সেই স্কয়ারের চারপাশে তৈরি করা হয়েছে নতুন চারটি উপশহর। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছে স্কয়ারে। আর মাত্র কিছুক্ষণ পরই নতুন শতকের আগমন উদ্যাপন করবে তারা। এমন সময় তার মাথার ভেতরে একটা কণ্ঠস্বর বলে উঠল: মনে হচ্ছে না তুমি সফল হবে। সময় কিন্তু ফুরিয়ে যাচ্ছে। আহাব বুঝতে পারল ফাউন্ডেশনের সেই লোকটা তাকে কল করেছে তার নিউরো-ফোনে। মস্তিষ্কে ছোট্ট চিপসের মাধ্যমে এটি ইম্প্ল্যান্ট করা, মুখ ফুটে কিছু না বলেই কথাবার্তা চালিয়ে নেওয়া যায়। ‘হুম। মনে হচ্ছে আমার কপাল খারাপ।’ এখনো হাতে কিছুটা সময় আছে। তুমি চাইলে আমরা তোমাকে সাহায্য করতে পারি। ‘কীভাবে?’ শর্তগুলো শিথিল করে দিতে পারি তোমার জন্য। আমরা চাই না আমাদের কোনো ক্লায়েন্ট ব্যর্থ হোক। এখন যেকোনো একজন হলেই হবে। লিঙ্গ-বয়সের কোনো বাধা নেই। একটু ভাবল আহাব। ভাবার মতো সময় নেই তোমার কাছে। আহাব জানে, এর অর্থ নারী-শিশু কিংবা যেকোনো বয়সী টার্গেট হলেই হবে। দ্বিধা এসে ভর করলেও সে রাজি হয়ে গেল। তাকে বাঁচতে হবে। অনেক বছর! বুদ্ধিমানের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছ। এগিয়ে যাও তাহলে। সময় নষ্ট কোরো না। উধাও হয়ে গেল কণ্ঠ। আহাব কথামতোই এগিয়ে যেতে শুরু করল স্কয়ারের দিকে, কিন্তু নতুন একটি দ্বিধা ভর করল তার মধ্যে। ফাউন্ডেশন শর্ত শিথিল করে দিয়েছে—কিন্তু কেন? কোথায় গেল তাদের সেসব নীতিবাক্য? মোটিভেশন! স্মার্ট-গ্লাসের ভেতর দিয়ে এক যুবকের দিকে নজর দিতেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল কাঙ্ক্ষিত সেই লেখাটি: যোগ্য টার্গেট! তার সমবয়সী চশমা পরা এক যুবক পথের পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে সামনের স্কয়ারটা দেখছে। সেই যুবক থেকে কয়েক হাত দূরে এসে থমকে গেল আহাব। ফেশিয়াল রিকগনিশন ছাড়াই টার্গেট বেছে নেওয়া হয়েছে! শর্ত শিথিলের নমুনা? কিন্তু এটা কী করে সম্ভব? এই যুবক ফাউন্ডেশনের ক্লায়েন্ট কি না সেটা তো নিশ্চিত হতে হবে, নাকি? আহাব টের পেল তার কোমরে থাকা স্মার্ট-গ্লকটা অ্যাক্টিভেট হয়ে গেছে, কিন্তু সে সেটা হাতে তুলে নিল না। ফাউন্ডেশনের উদ্দেশ্য নিয়ে তার মনে সংশয় তৈরি হয়েছে, তা-ও আবার শেষ মুহূর্তে এসে। সময় ঘনিয়ে আসছে। নতুন বছর, নতুন আয়ুষ্কাল। আর মাত্র এক ক্লিক দূরে! হঠাৎ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবক ঘুরে দাঁড়াল। চশমার ভেতর দিয়ে ধারালো চোখে তাকাল সে। আহাব কিছু বুঝে ওঠার আগেই কোমর থেকে একটা স্মার্ট-গ্লক বের করল যুবক। ‘আমরা বিরাট বড় ভুল করে ফেলেছি’, আহাব বলল। সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাল যুবক। তার গ্লকটা উঠে আসছে। ‘ফাউন্ডেশন!...ওটা...’ গলা ধরে এল তার। ‘ফাউন্ডেশন কী...?’ যুবকের ভ্রু কুঁচকে গেল। ‘স-সব ভুল! ওরা আমাদের সবাইকে শেষ করে দেবে!’ ‘কাদের কথা বলছ?’ ‘মানুষ! ওরা একটা মানুষও রাখবে না।’ আহাবের ভাবনা দ্রুত খেলে যাচ্ছে এখন। সবটাই বুঝতে পারছে বিদ্যুৎগতিতে। গ্লক ধরা যুবক বুঝতে না পেরে চেয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। ‘ক্লায়েন্ট ক্লায়েন্টকে টার্গেট করতে পারে না! কিন্তু সেটাই হচ্ছে এখন! বুঝতে পারছ?’ যুবকের মধ্যে দ্বিধা দেখা গেল, ‘শর্ত শিথিল করা হয়েছে...যে কেউ হলেই—’ ‘হ্যাঁ!’ কথার মাঝখানেই বলল আহাব, ‘জানি! কিন্তু কেন? ক্লায়েন্ট যদি ক্লায়েন্টকে হত্যা করে তবে বেঁচে থাকবে কে?’ যুবক ধন্দে পড়ে গেল। ‘ফাউন্ডেশনের কোনো ক্লায়েন্টই নিরাপদ নয়! বুঝতে পারছ?’ দাঁতে দাঁত পিষে বলল সে, ‘ওরা মানুষ না!’ ‘মানুষ না?’ মাথা নেড়ে সায় দিল আহাব, ‘ওরা হলিয়েন! আমি নিশ্চিত।’ ‘হলিয়েন?’ যুবক যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। ‘ফাউন্ডেশন...অমরত্ব...আসলে সবটাই ভাঁওতাবাজি!’ যুবক দ্রুত ভেবে যাচ্ছে, ভাঁজ পড়ছে তার মসৃণ কপালে। ‘আমরা সবাই ফাঁদে পড়ে গেছি। পৃথিবী ছেয়ে গেছে হলিয়েনে। খুব কম মানুষই আছে এখন!’ উদ্ভ্রান্তের মতো বলে গেল কথাগুলো। ‘পাগল!’ যুবক বলে উঠল, ‘তুমি আমার সাথে চালাকি করছ। কিন্তু কোনো লাভ নেই। আমি এখনই তোমাকে—’ ‘আমি কীভাবে চালাকি করলাম! আমি তো আমার গ্লকটা হাতেই নিইনি। ইচ্ছে করলে তোমাকে পেছন থেকে খুব সহজেই শেষ করে দিতে পারতাম। পারতাম না?’ যুবক ঢোঁক গিলল। ‘কিন্তু আমি সেটা করিনি। শেষ মুহূর্তে আমি ফাউন্ডেশনের শয়তানিটা ধরে ফেলেছি।’ ‘তুমি যা বলছ তার কী প্রমাণ আছে?’ ‘প্রমাণ! এই যে তুমি-আমি—আমরা দুজনেই ফাউন্ডেশনের ক্লায়েন্ট। আমরা দুজনেই আবার টার্গেট!’ যুবক নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরল। ‘আমার আর মাত্র একটা টার্গেট হলেই হয়ে যেত, কিন্তু আমি বুঝে গেছি...আমি আর এর মধ্যে নেই।’ ‘আমারও একটা টার্গেট বাকি...তুমি হতে পারো আমার সেই দুর্লভ শিকার।’ ‘আর তোমরা হতে পারো আমার দু-দুটো শিকার!’ নতুন একটা কণ্ঠ শুনে আহাব আর যুবক ফিরে তাকাল। তাদের থেকে কয়েক হাত দূরে, ডানদিকে গ্লক তাক করে দাঁড়িয়ে আছে আরেক যুবক। কখন এসে দাঁড়িয়েছে টেরই পায়নি কেউ। সেই যুবকের মুখে বিজয়ীর হাসি। দুজন গ্লকধারী যুবকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আহাব। কিন্তু সে নিরস্ত্র। কোমর থেকে গ্লকটা তুলে নেওয়ার কথা চিন্তাও করছে না এখন। ‘ফাউন্ডেশন আমাদের সবাইকে ফাঁদে ফেলে দিয়েছে!’ কেবল এটাই বলতে পারল সে। একদম শান্ত ভঙ্গিতে। নতুন যুবককে বোঝানোর মতো সময় পাবে কি না জানে না। ‘অমরত্বের ফাঁদে!’ সঙ্গে সঙ্গে স্কয়ার থেকে হইহট্টগোল শোনা গেল। তারা তিনজনেই ফিরে তাকাল সেদিকে। শত শত, হাজার হাজার মানুষ মুখ তুলে তাকিয়ে আছে পুব আকাশের দিকে। বিশাল হলোগ্রাফিক ঘড়িটা কাউন্টডাউন শুরু করে দিয়েছে। ১০... ৯... ‘ফাউন্ডেশন...আসলে ওটা হলিয়েনরা চালায়!’ বেশ শান্ত কণ্ঠে, পরাজিত সৈনিকের মতো বলল আহাব। ভালো করেই জানে, দুজন যুবকের মধ্যে সর্বোচ্চ একজন তার কথাটা বিশ্বাস করবে। ‘হা-হা-হা!’ অট্টহাসিতে ফেঁটে পড়ল একটু আগে আসা যুবক, ‘মৃত্যুমুখে দাঁড়িয়ে মানুষ কত রকমই না চালাকি করে!’ ‘মৃত্যুর মুখে তো তুমিও দাঁড়িয়ে আছো!’ প্রথম যুবক তার গ্লকটা নেড়ে বলল। হাসি থেমে গেল সেই যুবকের। তার চোখে ভীষণ তাড়া। পুব আকাশের দিকে তাকাল চকিতে। আহাব জানে, এখনই ক্লিক করে শব্দটা হবে। কমপক্ষে দুটো। কিংবা তার চেয়েও বেশি। সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার পটকা আর আতশবাজির শব্দে প্রকম্পিত হলো পুরো স্কয়ার। আহাব বুঝতে পারল না তার দুপাশ থেকে ক্লিক করে কোনো শব্দ হয়েছে কি না। সে জানে, স্মার্ট-গ্লকে যে বুলেট ব্যবহার করা হয় সেটা কোনো রকম মৃত্যুযন্ত্রণা দেয় না, আস্তে করে ঘুমে ঢলে পড়ে মানুষ। ঢলে পড়ার আগে পুব আকাশের দিকে তাকাল সে। সেখানে কিছু নেই। কালো। অন্ধকার। জান্তব উল্লাস, আতশবাজি আর পটকার শব্দ হচ্ছে। তারপরই কয়েকটি হলোগ্রাফিক সংখ্যা ভেসে উঠল। ০০০০ নতুন যুগের সূচনা হলো এইমাত্র। কিন্তু সেটা মানুষের যুগ নয়!


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৬ জন


এ জাতীয় গল্প

→ মতির এলিয়েন দেখা
→ চীনের পিরামিড ও এলিয়েন
→ এলিয়েন
→ এলিয়েন
→ জিসান ও এলিয়েনরা,,,,
→ এলিয়েন রহস্য
→ এলিয়েনের আক্রমণ (১ম খণ্ড)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now