বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

একটু সেমাই

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X . একটু সেমাই - শাহীন আলম . অন্তুর বয়স খুব বেশি নয় এই এগারো কি বারো। তবু ওর কাঁধে সংসার নামক পাহাড় সমান দায়িত্বের জোয়াল। বাবা ছটকু মিয়া আর মা করিমন বানু সাভারের সেই ধসে পরা রানা প্লাজায় কাজ করত। বাবা ৩য় ফ্লোরে মা ৭ম। সেদিন সকাল বেলা মা যাবার সময় বলেছিল, সময়মত স্কুলে যেও মানিক আমার, তোকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন। তুই লিখাপড়া শিখে বড় চাকরি করবি, তখন আমাদের আর কোন অভাব থাকবে না। যাবার সময় মা দু ভাই-বোনকে আদর করে চুমু দিয়ে যায়। হঠাৎ দেশময় শোকের ছায়া নেমে এল, সবার চোখে অশ্রু ঢেউ খেয়ে গেল। ওরা দুটি ভাই-বোন, বাবা-মায়ের ছবি হাতে দাড়িয়ে আছে। চোখের লোনা সাগর শুকিয়ে গেছে, গলা থেকে পাখির ছানার মত চি চি অওয়াজ পর্যন্ত বের হয় না। তিন দিন পর মাকে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেল, তবে কোন কথা বলে না। কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে। বাবাকে পাওয়াই গেল না। তারপর থেকে ও বাদাম বিক্রি করে রাজধানির নানা জায়গায়। সামনে ঈদ আসতে খুব বেশি দিন বাকি নেই, কেনা-কাটার ধুম পড়েছে চারদিকে। শপিংকমপ্লেক্সের সামনে দাড়িয়ে যখন সে বাদাম বিক্রয় করে তখন লক্ষ করে, দামী গাড়িতে করে এসে সবাই হাত ভর্তি করে কেনা কাটা করে নিয়ে যায়। ওর ইচ্ছে হয় এই ঈদে মায়ের জন্য একটি শাড়ি আর ছোট বোনটির জন্য সুন্দর দেখে একটি জামা কিনে নিয়ে যাবে। সে খাবার দোকানের সামনে দিয়ে হেটে যাবার সময়, নাকে ভেষে আসে কি অপূর্ব মোহনীয় গন্ধ, যেন প্রাণটা জুড়িয়ে আসে। ও ভাবে পোশাক না, এবার মা বোনকে ভাল খাবার খাওয়াবে। ও বাদাম বাদাম বলতে বলতে আরো এগিয়ে যায়। ইদানিং লোকজন খুব একটা বাদাম খায় না, আগে যেখানে বন্ধু মহলে এক পোয়া বাদাম হলে আর কিছুই লাগত না, এখন সেখানে টাইগার আথবা স্পিডের ক্যান না হলে নাকি ভাব আসে না। ঈদের আগের দিন সন্ধায় সে বাড়ি ফিরে আসছে, এমন সময় খাবারের গন্ধ নাকে যেতেই তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। আজও সে ভাল খাবার কিনতে পারেনি, দু কেজি মোটা চাউল আর এক কেজি আলু ছাড়া। ভোরে ঘুম থেকে উঠে ছোট বোনটিকে গোসল করিয়ে মায়ের জন্য পানি তুলে দিয়ে, চাউলের সাথে আলু চুলায় চড়িয়ে, আগুন জ্বালায় অন্তু। নামাজে যাবার সময় মায়ের পা ছুয়ে সালাম করে সে। মা শুধু চেয়ে থাকে। মা আগের মত মাথা নেড়ে কিংবা চুমু খেয়ে আদর করে না। ও চোখ মুছতে মুছতে নামাজ পড়তে যায়।নামাজ পড়ে আসার সময় রাস্তার পাশের দোকান থেকে লাল টুকটুকে দেখে চুড়ি কিনে আনে বোনটির জন্য। চুড়ি পেয়ে বোনটির আনন্দ দেখে কে! মনে হয় কোটি টাকার জিনিস সে পেয়েছে। ওদের খুপরি ঘরটি, তিন তলা বিল্ডিং এর দেয়াল ঘেষে, সামনে দিয়েই রেললাইন বয়ে গেছে ধনুকের মত বাক নিয়ে। অন্তু মায়ের কাছে বসে বসে ভাবছে, গত ঈদে ওরা কত আনন্দই না করেছিল, বাবা ছিল, মা রান্না করে খাইয়েছিল, কত মেহমান এসেছিল আর এবার তার কিছুই নেই। অন্তুর বোনটি একাই পুতুলের বিয়ে দিচ্ছিল, কেন না ওর সাথিরা সবাই বাবা মার সাথে বেড়াতে গিয়েছে। হঠাৎ তিন তলার ছাদের দিক থেকে কিছুটা সেমাই এসে পরল ওর সামনে। মনে হয় কোন শিশুকে খাওয়ানোর সময় বেচে গিয়েছিল, তাই ফেলে দিয়েছে। সেমাই দেখে ও অন্তুর কাছে গিয়ে বায়না ধরে, ভাইয়া সেমাই খাব। সেমাই কোথায় দেখলি? ওই যে ওরা উপড় তলা থেকে ফেলেছে। আমরা সেমাই কোথায় পাব বল? আমাদের তো আর অত টাকা নেই। জানিনা তুমি সেমাই এনে দাও! অন্তু একটু রাগ করল ঐ বড়লোকদের উপরে, খেলি আবার নিচে ফেলার কি দরকার ছিল! সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ করে খুপরি থেকে বের হয়ে যায়। সে ভাবছে ঈদের দিন তার বোনটি সেমাই খেতে চেয়েছে, যদি তাকে সে সেমাই খাওয়াতেই না পারে, তবে কিসের ভাই সে! ও রেল লাইনের ধার ধরে হাটছে, পাশ দিয়ে বিকট শব্দে ট্রেন চলে গেল সেদিকে খেয়াল নেই। ও কি করবে ভেবে পায় না। ছোট বলে রিক্সার মালিকেরা রিক্সা দেয় না, তাই বাদাম বিক্রি করে। আজ রিক্সা চালকেরা সবাই বাবা-মা, বউ-ছেলে, নিয়ে ঈদ করতে গ্রামে চলে গেছে, ফলে রিক্সা গ্যারেজেই আছে। এক বেলা ৫০ টাকা মিটিয়ে রিক্সা পাওয়া গেল। শহরে খুব বেশি একটা রিক্সা নেই, দশ টাকার ভারা কেউ ৪০ টাকায় আপত্তি করে না। সে শিশু পার্কের সামনে দিয়ে যায়, আর ওর বয়সি ছেলেদের আনন্দ আর হই-হুল্লোড় দেখে ওর চোখ জোড়া জলে ছলছল করে উঠে। ইস বড়লোকের ঘরে যদি জন্ম নিতাম তবে আজ সেমাই কেনার জন্য রিক্সা চালাতে হত না। রাস্তাঘাট একেবারেই ফাকা রিক্সা চালাতে একেবারেই বেগ পেতে হল না। দুপুরের আযান দিয়েছে, বেশ কিছু টাকাও জমেছে, আর না, এ ভেবে রিক্সা ফেরৎ দিয়ে হাটতে থাকে। তখনও ফুটপাতে দু’একটি কাপড়ের দোকান বসে আছে। অন্তু ভাবছে বোনটির জন্য জামা কিনবে আবার ভাবছে কি জানি চিনি সেমাইয়ের কতই বা দাম, যদি না কেনা হয়! সে চিনি, সেমাই, দুধ কিনেছে তবুও কিছু টাকা বাঁচল। সে ভাবছে বিকেলে তারা দু ভাই-বোন মিলে চিড়িয়াখানায় যাবে। চোখে আনন্দের বন্যা, পায়ে কঠিন ছন্দ। দ্রুত হেটে চলেছে আশপাশের কোন কিছুতেই ওর নজর নেই, শুধু মাঝে মাঝে সেমাই চিনির দিকে একটু তাকিয়ে দেখে আর ভাবে মা-বোনকে আজ সেমাই খাওয়াব। কি যে আনন্দ তার মনে! মন কৃষ্ণচুড়ার রঙ্গে রঙ্গিন হয়ে উঠল। ঐতো ঘর দেখা যাচ্ছে, বোনটি পাশেই খেলা করছে, তার চোখ জোড়া প্রশস্ত হল। হঠাৎ চিৎকার শোনা গেল, কে যেন পিছন থেকে আচমকা ধাক্কা দিল। এক দিকে রক্ত মাটি লাল করে ভেষে চলেছে অন্যদিকে দুধের সাদা আস্তরণ গড়িয়ে ঢালুর দিকে নেমে যাচ্ছে। সেমাই চিনি সবই মাটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে, তখনও পিপড়ার নাকে গন্ধ পৌঁছায়নি। ছোট বোনটি ছুটে এল, দুখন্ড ভাইয়ের লাশ পরে আছে, যে তার জন্যে সেমাই আনতে গিয়েছিল। সে চিৎকার করে বলছে, ভাইয়ারে আমি সেমাই চাই না, তুই ফিরে আয়। প্রতিবেশিরা লাশ ধোয়াচ্ছে, মা তখনও ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে, তার চোখে শোক নেই, দুঃখ নেই, আছে শুধুই এক রাশ শুন্যতা।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৬ জন


এ জাতীয় গল্প

→ একটু সেমাই
→ একটু সেমাই

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now