বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

একটু ভালো মদ পেলেই খুশি

"ওয়েস্টার্ন গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান নাসরুল্লাহ (০ পয়েন্ট)

X সারা সকাল রাঞ্চে ঘুরে ঘুরে কাজ করল ওরিন। কাজ করল মূলত বহু কিছু করার আছে বলে; তা ছাড়া, এর ফলে চিন্তা করার জন্য সময়ও পেল। আস্তাবলে রাখা হয়েছে সব ঘোড়া। দেখে বোঝা যায়, নিয়মিত যত্ন নেওয়া হয় ওগুলোর। কোনো কোনোটা সাধারণ রাঞ্চ হর্সের চেয়ে উন্নতমানের; কয়েকটা মর্গ্যান জাতের। আস্তাবলের দরজার হুড়কো মেরামত করল সে, ঘুরে ঘুরে দেখল বাথানের সব জায়গা, বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে প্রবেশপথগুলো পযর্বেক্ষণ করল। দুরবিন দিয়ে জরিপ করল পাহাড়-পর্বত; ক্যানিয়নগুলো খুঁটিয়ে দেখল। দুরবিনের আওতায় যত দূর দেখতে পেল, সব কিছুর ছবি গেঁথে নিল মাথায়। ডেভিডসন আর নাটো ফিরতে ফিরতে মাঝ বিকেল হয়ে গেল। ওরিন ওদের দেখতে পাওয়ার আগেই মোনার সঙ্গে কাউহ্যান্ড দুজনের কথা হয়েছিল। ‘হাউডি,’ ডেভিডসনের গলায় বন্ধুতার সুর, কিন্তু চোখজোড়া তীক্ষ, মাপছে ওরিনকে। ‘মিজ মোনা বলল, তুমি প্যালেন্সকে তাড়িয়ে দিয়েছ। বলল, তুমি এখানে থাকার কথা ভাবছ।’ ‘ঠিক। ওর বিপদ শেষ হওয়া পর্যন্ত থাকব, যদি আমাকে রাখে সে। আমি কারও হম্বিতম্বি পছন্দ করি না।’ ‘আমিও না।’ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল ডেভিডসন, তারপর সরাসরি তাকাল ওরিনের দিকে। ‘মিজ মোনার ওপর চোখ দিয়ো না কিন্তু। ও খুব ভালো মেয়ে।’ রাগতভাবে চোখ তুলল ওরিন। ‘তুমিও উল্টোপাল্টা কিছু ধরে নিয়ো না,’ বলল শীতল কণ্ঠে। ‘তুমি যে রকম, আমিও ঠিক তেমনি ওকে সাহায্য করছি। আমরা সবাই মিলেমিশে কাজ করব। ব্যক্তিগত ব্যাপারগুলো ব্যক্তিগতই থাক। আমি শুধু এটুকু বলব, এই লড়াই শেষ হওয়ামাত্র আমি আবার ট্রেইলে নামছি।’ ‘বেশ,’ মৃদু কণ্ঠে বলল ডেভিডসন। ‘আমাদেরও সাহায্য দরকার।’ তিন দিন কেটে গেল নির্বিঘ্নে। রাঞ্চের কাজে নিজেকে সঁপে দেয় ওরিন, ভূতের মতো পরিশ্রম করে চলে। এমনকি তার নিজেরও কোনো ধারণা নেই, কেন সে এত কঠোর পরিশ্রম করছে। রেঞ্জের পাদদেশে, পাথর-চোঁয়ানো ঝরনার অদূরে খুঁটি গাড়ার গর্ত খোঁড়ে সে, অনেকটা জায়গাজুড়ে বেড়া দেয়। তারপর নাটোকে সঙ্গে করে তাড়িয়ে আনে পাহাড়ের কিনারে চরে বেড়ানো গরু-মোষগুলোকে, বেড়ার পেছনে ঠেলে দেয়। ক্যানিয়নের অনেক দূর অবধি বিস্তৃৃত তৃণপ্রান্তরের ওই জায়গায় ঘাস ঘন এবং গভীর, ফলে গবাদিপশুর খাবারের অভাব হবে না দীর্ঘ দিন। সব সময় সঙ্গে একটা রানিং আয়রন রাখছে সে; যেখানে প্রয়োজন হচ্ছে, ব্র্যান্ড করছে গরু-মোষ। বহু দিন যাবত রাঞ্চে লোক নেই, ফলে প্রচুর কাজ পড়ে ছিল। সন্ধ্যায় সাজ-সরঞ্জাম মেরামত করে সে, আর রাতে নিঃসাড়ে ঘুমোয়। এই কদিন মোনা কার্টিসের ছায়াও দেখতে পায়নি। তবে মেয়েটাকে দেখতে না পেলেও, তার চিন্তায় সে সর্বদা রয়েছে। ওদের প্রথম সাক্ষাতের কথা স্মরণ করে ওরিন। বৈঠকখানায় দাঁড়িয়ে কথা শুনছিল মেয়েটা, ডাগর কালো চোখ দুটো তার ওপর স্থির রেখে। সিঁড়ির মাথা থেকে জ্যাক প্যালেন্স ও তার দলবলকে কীভাবে মোকাবেলা করেছিল মোনা, সে কথা মনে পড়ল। মেয়েটার কাছে নিজেকে সে দায়বদ্ধ মনে করে। এ জন্যেই এখানে রয়ে গেছে কি? নাকি ওই মেয়েটিই তার রয়ে যাওয়ার মূল কারণ? রাঞ্চের এখানে-সেখানে কার্টিসের অদৃশ্য হাতের ছোঁয়া দেখতে পায় সে। ওগুলো থেকে অনুমান করা যায় আসল মানুষটাকে। ডেভিডসন পছন্দ করত ওকে। দোআঁশলাটাও তা-ই। ঘোড়ার সঙ্গে তার আচরণ ছিল মানবিক। সব বিষয়ে মানুষটা সুবিবেচক ছিল। কিন্তু হিংসাত্মক কাযর্কলাপকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করত, সব সময় তা এড়াতে সচেষ্ট থেকেছে। ধীরে ধীরে তার মনের পর্দায়, সেটা ঠিক কি বেঠিক সে জানে না, একজন মার্জিত রুচিশীল যুবকের ছবি ফুটে উঠল; যে যুবক একেবারেই বেমানান তার সময়ের জন্য। পশ্চিমে জন্ম হলেও, স্বভাবগতভাবে মানুষটা ছিল শান্তিপূর্ণ, নিরুপদ্রব সময়ের উপযোগী। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে জড়িয়ে পড়েছিল রেঞ্জ ওয়রে এবং নিজের সীমাবদ্ধতার কথা তার জানা ছিল। কাঁচা চামড়া দিয়ে একটা ল্যাসো বানাতে বানাতে এসব কথাই ভাবছিল ওরিন, যখন মোনা হাজির হলো সেখানে। ওকে আসতে দেখেনি ওরিন, তবে দেখলে এড়িয়ে যেত। কিন্তু এখন সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর সামনে এসে দাঁড়াল মেয়েটা। ‘তুমি ভীষণ পরিশ্রম করছ, মিস্টার ওসমান।’ ‘বেতন হালাল করছি, ম্যাম। দেখলাম, অনেক কাজ। তা ছাড়া, আমি ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করি।’ ল্যাসোটা ঘুরিয়ে পরখ করল সে। ‘তোমাকে একটা কথা বলব বলব ভাবছিলাম, যদিও এটা আমার বিষয় না, তবে জুনিয়র কিন্তু বড় হয়ে উঠছে এবং একদিন তোমাকে তার বাবার কথা জিজ্ঞেস করবে। তুমি ওকে বোকা বানাতে পারবে না। তুমি হয়তো আঁচ করে থাকবে ব্যাপারটা, আবার এটা আমার কষ্টকল্পনাও হতে পারে, কিন্তু আমার বিশ্বাস, টনি কার্টিস এল পাসোয় গিয়েছিল তোমার জন্য টাকার জোগাড়ে।’ ‘সম্ভবত সে বুঝতে পেরেছিল তাকে দিয়ে লড়াই হবে না, তাই টাকার ব্যবস্থা করে পেশাদার বন্দুকবাজ ভাড়া করতে চেয়েছিল। ও যা করেছে, সে জন্য সাহস লাগে। তাই রৌভ সুযোগটা দেওয়ামাত্র লুফে নিয়েছিল। কারণ ও জানত, রৌভ যদি হত্যা করে ওকে, তুমি টাকা জোগাড় করতে পারবে না। ‘আর এসব করতে গিয়েই হয়তো কোনো এক সময়ে নিজেকে যাচাই করার ইচ্ছে হয় তার। হয়তো বুঝতে চাইছিল, তার সাহস আছে কি না বন্দুকের মুখোমুখি হওয়ার এবং সে জন্যই এল পাসোয় ঝগড়াটা বাধিয়েছিল গায়ে পড়ে।’ কোনো জবাব দেয় না মেয়েটি, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকে। দেখে, কীভাবে দক্ষ হাতে একটা চামড়ার রিয়াটা তৈরি করছে ওরিন। ‘হ্যাঁ,’ এক সময়ে বলল মোনা। ‘আমিও ভেবেছি কথাটা। কিন্তু টাকা কোত্থেকে পেল, কিছুতেই মাথায় আসছে না। আবার না জেনে খরচ করতেও বাধছে।’ ‘বোকার মতো কথা বল না,’ ঝাঁঝাল স্বরে বলল ওরিন। ‘কাজে লাগাও। তোমার দরকার ওই টাকা। বন্দুক ধরতে জানে, এমন লোক ভাড়া করতে হবে।’ ‘কিন্তু আমার জন্য কাজ করবে কে?’ স্বগতোক্তির ঢঙে বলল মোনা, কণ্ঠে তিক্ততা। ‘কেউ যাতে আমার এখানে কাজ না করে, জ্যাক প্যালেন্স তার ব্যবস্থা করে রেখেছে।’ ‘দেখি, আমি শহরে গেলে হয়তো পাব কিছু লোক।’ কেভিন পিটার্সনের কথা ভাবছে ওরিন। লোকটা ইংরেজ, কথায় কথায় শেক্সপিয়র থেকে উদ্ধৃতি দেয়। ‘আমার বিশ্বাস এক জনকে পাব।’ ‘অনেক কিছু করতে হবে। জিম অবশ্যি আমাকে বলেছে—তুমি একাই তিনজনের কাজ করছ।’ উঠে দাঁড়াল ওরিন। এক কদম পিছু হঠল মোনা। সহসা বুঝতে পারছে, সামনে দাঁড়ানো লোকটা কত লম্বা। একজন মেয়ের অনুপাতে তাকে দীর্ঘাঙ্গিনীই বলা চলে, কিন্তু তার পরও উচ্চতায় ওরিনের ঠোঁট ছাড়ায়নি। কথাটা ভেবে একটু বিব্রত বোধ করে মোনা। চকিতে তাকায় ওরিনের কোমরে ঝোলান পিস্তল দুটোর দিকে। সব সময় লোকটা পরে থাকে ওগুলো, নিচু করে বেঁধে রাখে। ‘ডেভিডসন বলছিল, পিস্তলে তোমার হাত খুব চালু। বলছিল, তোমার মধ্যে… একজন বন্দুকবাজের সব চিহ্ন আছে।’ ‘সম্ভবত।’ কথাটায় এতটুকু অখুশি হয় না ওরিন। ‘বন্দুক ব্যবহার করেছি আমি। বন্দুক, ঘোড়া, সারাজীবন এগুলো নিয়েই কাটিয়েছি।’ কথাটা মিথ্যে না। টেনেসিতে চেরোকি ইন্ডিয়ানদের মাঝে বড় হয়েছে ওসমানরা। তীরন্দাজি যেমন জানে, তেমনি জানে গুলি চালাতে। তবে অস্ত্র নিয়ে কখনো খেলা করে না ওরা; গোলাবারুদের অপচয় একদন বরদাস্ত করতে পারে না। চালাঘরের ভেতরটা অন্ধকার হয়ে আসিছল, যেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছে ওরা। বাইরের আলো-আঁধারিতে বেরিয়ে এল ওরিন। দুটো-একটা তারা বেরিয়েছে এরই মধ্যে; পশ্চিমে, পাহাড়ের ওপাশে, লাল আভার শেষ চিহ্নটুকু মুছে যাচ্ছে। ‘কাল,’ বলল ওরিন, ‘আমি শহরে যাচ্ছি। তুমি সবাইকে কাছে-পিঠেই রেখ।’ কাকভোরে ওকে পাওয়া গেল ইয়োলো জ্যাকেটের ট্রেইলে। দীর্ঘ পথ, বেশির ভাগ সময় মূল রাস্তা এড়িয়ে চলছে সে সাবধানীর মার নেই বলে। গুমোট, উজ্জ্বল আবহাওয়া। এখানে-সেখানে পিভটরকের কিছু বাছুর চোখে পড়ল তার। সেদিনের রাউন্ডআপের সময়ে দৃষ্টি এড়িয়ে গিয়েছিল ওগুলো। বিপদের জন্য তৈরি হয়ে পথ চলছে সে, স্যাডলের ওপর উইনচেস্টার আড়াআড়িভাবে রাখা, সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ। গাছপালার আড়ালে ঘোড়া হাঁকাচ্ছে, চিরসবুজ পাইনপাতার পুরু কার্পেটের ওপর দিয়ে যাতে খুরের শব্দ ঢাকা পড়ে। পথ চলতে চলতে, জমির মূল মালিকানার সমস্যাটা নিয়ে ভাবে ওরিন। মোনাকে যদি ওই জমি দখলে এবং নিজেকে ঝামেলামুক্ত রাখতে হয়, মালিকানার নাড়ি-নক্ষত্র জানতে হবে। বের করতে হবে, বুড়ো কার্টিস জমিটা কেনার আগে ওটার মালিক কে ছিল—আলভারেজ না কোলাসো। এরপর, অবশ্যই জানতে হবে, যদি সম্ভব হয়, কীভাবে পাঁচ হাজার ডলার জোগাড় করেছিল টনি কার্টিস। কেউ কেউ হয়তো ভাবতে পারে টাকাটা ওর কাছে ছিল এবং এখন ওর স্ত্রীর কাছে আছে—এটুকু তথ্যই যথেষ্ট। কিন্তু বিষয়টা এত সরল থাকে না, যদি রাঞ্চের পানি অথবা জমির কোনো অধিকার বিক্রি করে দিয়ে থাকে টনি কিংবা এমন কোনো উপায়ে অর্থ সংগ্রহ করে থাকে, যা মোনা বা তার সন্তানের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া করতে পারে। এই রহস্যগুলো ভেদ করার পর নিজের ব্যাপারে মাথা ঘামানোর সময় পাবে সে, কেননা তত দিনে জ্যাক প্যালেন্স নামক সমস্যারও একটা সুরাহা হয়ে যাবে। পিভটরকে এই কদিনের বসবাসেই জায়গাটাকে ভালোবেসে ফেলেছে সে। যদিও মোনাকে এড়িয়ে চলেছে সযত্নে, জুনিয়রকে এড়ায়নি। ছোট্ট ছেলেটা নিজেকে সুন্দর মানিয়ে নিয়েছে ওরিনের সঙ্গে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার পাশে থেকেছে। ছেলেটাকে ব্যস্ত রাখার জন্য, ওরিন ওকে শেখাতে শুরু করেছে কীভাবে র-হাইডের বিনুনি বাঁধতে হয়। ফলে, ও যখন রিয়াটা রিপু করেছে বা লাগাম মেরামত করেছে, ছেলেটা ওর পাশে বসে চেষ্টা করেছে আনাড়ি হাতে চামড়ার বেনি বুনতে। মোনার সঙ্গে কয়েক মিনিট একান্তে কাটানোর কথা মনে হতেই অস্বস্তি বোধ করে সে। স্যাডলে একটু নড়েচড়ে বসে, ভ্রূকুটি করে। মেয়েটিকে সে কার্টিসের বিধবা স্ত্রী ছাড়া অন্যকিছু ভাবতে পারছে না। যে লোকটাকে সে হত্যা করেছে, ওরিন ভাবল তিক্ততার সঙ্গে, মোনা তার বিধবা স্ত্রী। ঘটনাটা যখন জানবে মেয়েটা, কোন মুখে সে দাঁড়াবে ওর সামনে? ভাবনাটাকে তাড়াতে চেষ্টা করে সে, কিন্তু নাছোড় সেটা ওর মনের মধ্যে গেঁথে থাকে। সজোরে মাথা নাড়ায় ওরিন, ব্যাপারটা ভুলে যেতে চায়। দু-দিন আগে বা পরে, সব জানবে মোনা। সে নিজে যদি খুলে না-ও বলে, প্যালেন্সই নিশ্চিত করবে, খবরটা যেন ওর কানে ওঠে। হার্ডস্ক্র্যাবলের রাস্তা এড়িয়ে, মেসার পুব সীমানা পেরোল ওরিন। পুরোনো একটা ট্রেইল ধরে একে একে হোয়াইটরক এবং পোলস মেসা হয়ে, রক ক্রিকের কাছে ইস্ট ভার্দে অতিক্রম করে ডানে ঘুরল। এরপর বুলসিপ্রংয়ের দিকে ছুটল বোর্ডিংহাউস ক্যানিয়নের বুক চিরে, ট্যাংগল পিকের অদূর দিয়ে ভার্দের মূল স্রোতধারাটা পার হলো। বেশ কয়েক মাইলের ঘুরপথ এটা, কিন্তু তার পরও সতর্ক থাকছে ওরিন, নজর রাখছে চারপাশে। ইয়োলো জ্যাকেটের রোদে চৌচির রাস্তায় যখন রৌনটাকে হাঁটাল সে, তখন পড়ন্ত বেলা। তার মনের ভেতর দানা বেঁধেছে একটা ধারণা। এখন সেই ধারণার ভিত্তিতে এগোবে সে। বাংকহাউসের রাতগুলোয় ডেভিডসনের সঙ্গে বহু কথাই হয়েছে। ওর থেকেই আলভিতো আলভারেজের কথা শুনেছে। বুড়ো কার্টিস যার থেকে জমি কিনেছিল, আলভিতো তার নাতি। লিভারি স্টেইবলে দোল খেয়ে নামল সে, ঘোড়াটাকে হাঁটিয়ে নিয়ে গেল ভেতরে। জনি এগিয়ে এসে মিলিত হলো ওর সঙ্গে, কিছু একটা খুঁজছে ওরিনের মুখে। ‘তোমার সাহসের বলিহারি, বাপু। প্যালেন্স খ্যাপা কুকুর হয়ে আছে। রাগে গরগর করতে করতে শহরে ফিরেছে সেদিন। হার্ডি সবাইকে বলে বেড়াচ্ছে, তোমার কপালে কী আছে!’ লোকটার উদ্দেশে স্মিত হাসল ওরিন। ‘এটাই আশা করছিলাম আমি। তুমি কোন পক্ষে?’ ‘হুম,’ গম্ভীর শোনাল জিমের কণ্ঠ, ‘হার্ডিকে আমি দু-চোখে দেখতে পারি না। শহরে ভীষণ ডাঁট নিয়ে বেড়ায়। আমার বা আমার পরিবারের সঙ্গে কখনো ভালো ব্যবহার করে না। সত্যি বলতে কী, মিস্টার, খুব খুশি হয়েছিলাম সেদিন, তুমি যখন সবার সামনে বুদ্ধু বানালে ওকে। মরে যাওয়াটাও মনে হয় এর চেয়ে ঢের ভালে ছিল ওর জন্য। অবশ্যি সাধ করে বিপদটা ডেকে এনেছিল খচ্চরটা।’ ‘তাহলে আমার ঘোড়াটার একটু যত্ন নিয়ো, আচ্ছা? আর দড়িটা আলগোছে পেঁচিয়ে রেখ টাইরেইলে।’ ‘নিশ্চয়ই। ভূট্টাও পাবে ওটা। আমি মনে করি, তুমি যে ঘোড়া নিয়েই শহরে আস, তার ভূট্টা দরকার হবে।’ রাস্তায় বেরিয়ে এল ওরিন। আজ ওর পরনে কালচে জিন্স আর ধূসর পশমি শার্ট। কালো টুপিটা নিচু করে টেনে দেওয়া। আশেপাশের ছায়ার সঙ্গে সুন্দর মিশে গেছে ওর সুঠাম কাঠামো। প্রথমে আলভিতোর সঙ্গে দেখা করবে সে, তারপর চারপাশে ঘুরে দেখবে। কেভিন পিটার্সনকে একা পেতে চায় সে। কথাটা মনে হতেই আস্তাবলে ফিরে এল সে। জনিকে বলল, ‘পিটার্সনের ঘোড়াতেও স্যাডল চাপিয়ে রেখ। সে-ও যাচ্ছে আমার সঙ্গে।’ ‘পিটার্সন?’ চোখ বড় করল লিভারি মালিক। ‘আরে, সে তো মদে বেহুঁশ কদিন ধরে!’ ‘তৈরি রেখ ওর ঘোড়াটা। ফেরার সময়ে ও থাকবে আমার সঙ্গে। আরও দু-একজনের কথা যদি তোমার জানা থাকে যারা বন্দুক ধরতে জানে, তাদের বলবে, আমি লোক নিচ্ছি, ভালো বেতন দেব। গানফাইটারের বেতন।’ ইয়োলো জ্যাকের পেছনের অফিস কামরায় জ্যাক প্যালেন্সের টেবল ঘিরে তিনজন লোক বসে। প্যালেন্স নিজে, টমাস হার্ডি, এবং প্রিন্স ময়নিহান। ‘কী মনে হয় তোমার, কার্ল পারবে ওকে সামলাতে?’ প্যালেন্স জিজ্ঞেস করল। ‘তুমি লোকটাকে ড্র করতে দেখেছ, প্রিন্স?’ ‘পারবে। তবে হাড্ডাহাড্ডি হবে.. ভীষণ হাড্ডাহাড্ডি! আমি মনে করি, সবচেয়ে ভালো হবে টম যদি কাছে-পিঠে কোথাও ঘাপটি মেরে থাকে।’ ‘আমাকে এর বাইরে রাখ।’ ঘন, রোমশ ভ্রূযুগলের নিচে দিয়ে তাকাল হার্ডি। ‘আমি আর ওই লোকের কোনো ব্যাপারে থাকতে চাই না। কার্ল একাই সামলাক হারামিটাকে।’ ‘ভয় পাচ্ছ কেন,’ শেরিফকে আশ্বস্ত করল ময়নিহান, ‘তোমাকে কেউ দেখতে পাবে না, বিপদও হবে না। তুমি হোটেলের ছাদে থাকবে, উইনচেস্টার নিয়ে।’ চকিতে পলক তুলল হার্ডি, জিভ দিয়ে ওর পুরু ঠোঁটজোড়া ভেজাল। খুন-খারাবি তার জীবনে নতুন কিছু না, কিন্তু সামনে বসা এই লোকটা এত অবলীলায় এগুলো হজম করে যে, নিজের ভেতরেই কেমন অস্বস্তি লাগে। ‘ঠিক আছে,’ রাজি হলো সে। ‘তবে যা বললাম, লোকটাকে আমি মোটেও পছন্দ করি না।’ ‘আমরা ওকে এমন জায়গায় আটকাব, তুমি পাশ থেকে গুলি করার সুযোগ পাবে। ঠিকমতো নিশানা করবে, যাতে এক গুলিতেই সাবাড় হয়। তবে গোলাগুলি শুরু না হওয়া অবধি অপেক্ষা করবে।’ আস্তে করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল রৌভ। একহারা, শ্যামবর্ণ চেহারা, শ্বাপদের মতো চলাফেরা। হাত দুটো বেজায় লম্বা, অস্থির। পরনে জিন্স এবং লাল পালক আর গুঁটিখচিত একটা সাদা বাকস্কিনের ভেস্ট। ‘বস, ব্যাটা শহরে। ওরিন এখানে।’ ওদের শলাপরামর্শ শুনতে পেয়েছে সে। এতক্ষণ হেলান দিয়ে বসে ছিল প্যালেন্স, এবার সামনে ঝুঁকল। ‘এখানে? শহরে?’ ‘ঠিক। আমি মাত্র দেখলাম ইয়োলো জ্যাকেটের বাইরে।’ সিগারেট বানাতে শুরু করে রৌভ। ‘সাহস আছে মানতে হবে। অনেক সাহস।’ ‘মনে পড়েছে, প্রিন্স, এবার চিনতে পেরেছি ওকে,’ বলল রৌভ। ‘ওরিন ওসমান। টেনেসি মাউন্টেনের ওসমান খানদানের বড় ছেলে। বেশ কিছুদিন আগে গোল্ড মাইনিং টাউনের মার্শাল ছিল। একাই মহড়া নিয়েছিল চল্লিশ জনের, সব কটাকে ঘায়েল করেছিল।’ ‘ঠিক!’ তীক্ষ চোখে তাকাল হার্ডি। ‘ওরিন ওসমান! আমার আগে মনে পড়েনি কেন? এখনো লোকে বলে, বয়েডকে সে কীভাবে বাধ্য করেছিল ন্যাড়া হতে।’ ময়নিহানের দিকে দৃষ্ঠি ফেরাল রৌভ। ‘এখুনি সাবাড়াতে চাও?’ একটু দোনামোনা করে ময়নিহান, পলিশ করা বুটের ডগা জরিপ করছে। হার্ডিকে যেভাবে সামলেছিল ওসমান, তাতে শহরে ওর বন্ধু হয়েছে। মোনা কার্টিসের পক্ষ নেয়াতেও লোকটার ওপর মানুষ খুশি। যা-ই ঘটুক, দিনের আলোয় ঘটতে হবে। সে সময় এমন জায়গা প্যালেন্স আর তাকে থাকতে হবে, যেন মানুষ দেখতে পায় এবং মনে করে, ঘটনার সঙ্গে ওদের কোনো সমপর্ক নেই। পাশাপাশি, ওর দুর্বল জায়গায় আঘাত করতে হবে। সব মানুষেরই কোনো না কোনো গোপন দুর্বলতা থাকে, কিছু লুকোছাপা থাকে। সেখানে স্ক্রু টাইট দিতে হয়। দুর্নাম ছড়াতে হয়। ‘না, এখন না। আমরা অপেক্ষা করব।’ হাসল সে। ‘একটা কথা জেনে রাখ, লোকটার যেমন সাহস আর পারিবারিক পরিচয়, চ্যালেঞ্জ করলে ঠিক আসবে।’ কিন্তু কীভাবে আসবে?’ অস্ফূটে মন্তব্য করল কিথ। ‘সেটাই হচ্ছে লাখ টাকার প্রশ্ন।’ বিরক্তিভরে ঘাড় ফেরাল ময়নিহান; অনেক বেশি কথা বলে ফেলেছে সে। কখন নিঃশব্দে কামরায় ঢুকেছে পিয়ানোবাদক কেউ লক্ষ করেনি। ‘ধন্যবাদ, কিথ। এসব নিয়ে তোমার মাথা না ঘামালেও চলবে। আর শোন… তুমি কিছুই শুনতে পাওনি।’ ‘অবশ্যই শুনিনি।’ আকর্ণ হাসল কিথ, পায়ের পাতার ভরে ঘুরল লাট্টুর মতো, দরজা খুলে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। ওর চলে যাওয়া দেখে প্যালেন্স। ‘আমি এই লোকটাকে পছন্দ করি না, প্রিন্স। আমি ওকে বিশ্বাস করব না।’ ‘কিথের কথা বলছ? কিথ পিয়ানো বাজাতে পারলে আর একটু ভালো মদ পেলেই খুশি। জানই তো, গানবাজনার লোক কেমন হয়ে থাকে। ওকে নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭৬ জন


এ জাতীয় গল্প

→ একটু ভালো মদ পেলেই খুশি

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now