বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
একটি মেয়ের কাহিনী- দেখুন মনটাকে শান্ত করতে পাপবেন না
X
আরমেরো’ ছিলো কলাম্বিয়ার পশ্চিমে অবস্থিত এক ছোট্ট শহর। এই শহরের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল ‘নেভাদো দেল রুইজ’ নামক এক পাহাড়। সেই শহরেই কৃষক বাবা-মায়ের ঘরে খেলে বেড়িয়ে দিন কাটাচ্ছিলো সদ্য শৈশব পেরোনো এক কিশোরী। নাম তার ‘ওমায়রা স্যাঞ্চেজ’। কতই বা হবে বয়স তার? ১২-১৩? দারিদ্র্য তাদের ছোট্ট কুটিরে প্রায়ই হানা দেয়। কিন্তু ছোট্ট মেয়েটাকে যেন কিছুতেই দমাতে পারে না। কিশোরীটা প্রায়ই ছুটে যেতো শহরের বাইরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়টায় বেড়াতে। কে জানে? সেখানে ঘাসের উপরে শুয়ে পড়ে হয়তো আকাশে মেঘেদের খেলা দেখতো সে!
.
ছোট্ট ওমায়রার সেই খেলার সঙ্গী ‘নেভাদো দেল রুইজ’ পাহাড়টা হঠাৎ একদিন ফুঁসে উঠলো। ১৯৮৫ সালের ১৩ নভেম্বর ভীষণভাবে কেঁপে উঠলো আরমেরো নামক ছোট্ট শহরটা। মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো আরমেরো। ২৩,০০০ মানুষ চোখের নিমিষেই স্রেফ লাশ হয়ে গেলো। নেভাদো দেল রুইজকে, যেটা ছিলো এক সক্রিয় আগ্নেয়গিরি, সেই ১৮৪৫ সালের পরে আর কেউ তেমন এভাবে ফুঁসতে দেখেনি। পুরো কলাম্বিয়া প্রচণ্ড আতংক নিয়ে দেখছিলো পাহাড়টার এমন ধ্বংসযজ্ঞ। কিন্তু আরমেরোর মানুষদের এভাবে জমে কাঠ হয়ে এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখার সুযোগ নেই। যারা বেঁচেছিলো, তারা পালাতে শুরু করলো দিগ্বিদিক। কিন্তু আমাদের ছোট্ট ওমায়রা আটকা পড়ে গেলো তার ঘরে। অগ্ন্যুৎপাতের প্রথম দফাতেই তার বাবা, ভাই আর এক আন্টি মারা গিয়েছিলো। ওমায়রার মা এবং আরেক ভাই কোনোরকমে পালিয়ে যেতে পেরেছিলো। কিন্তু ঘরে আটকা পড়ে গেলো ওমায়রা।
.
উদ্ধার কর্মীরা যখন এলো, তখন তারা দেখলো - অগ্ন্যুৎপাতের পরবর্তী ধেয়ে আসা থকথকে কাদামাটির স্রোতে ওমায়রার ঘর ভেঙ্গে গেছে। ঘরের ছাদ এবং অন্যান্য ধ্বংসস্তূপের নিচে ওমায়রার কোমর হতে পা পর্যন্ত আটকা পড়ে গেছে। ঊর্ধ্বাংশ কোনোরকমে বেরিয়ে আছে। শরীরের যেটুকু অংশ বেরিয়ে আছে, সেটাও ভাসছে পানি ও থকথকে কাদামাটির মধ্যে। উদ্ধার কর্মীরা তাকে বের করতে গিয়েই বুঝলো, ওমায়রাকে বের করতে হলে তার পা কেটে নিতে হবে। পা কাটা ছাড়া এই ধ্বংসস্তূপ হতে তাকে বের করা সম্ভব না। তাকে নড়াচড়া করানোও যাচ্ছিলো না। নড়াতে গেলেই সে উলটো আরো বেশি করে কাদাপানিতে ডুবতে শুরু করে। পরে তাকে আর না নড়িয়ে স্থির থাকার জন্যে একটা টায়ার দেয়া হলো, যেটা ধরে সে ভেসে থাকতে পারে।
.
এক পর্যায়ে সার্জন নিয়ে আসা হলো। সার্জন অবস্থা দেখে বললেন, আগে ওমায়রা যে কাদাপানিতে ভাসছে, সেটা সরানোর ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু ১৯৮৫ সালের কলাম্বিয়ার উদ্ধার কর্মীদের সাজসরঞ্জামের এতোই দুরবস্থা ছিলো যে, একটা বৈদ্যুতিক পানির পাম্প তারা পেলো না হাতের কাছে। কে একজন খবর পাঠালো - দূর গ্রামে এমন এক পাম্প আছে। কিন্তু সেখানে যেতে-আসতে দুই দিন লেগে যাবে। তা হোক! ছুটলো কয়েকজন সেই পাম্প আনতে।
.
ওমায়রাকে সাহস দেয়ার চেষ্টা করতে লাগলো সবাই। কিন্তু সাহস দেবে কী? উলটো দেখলো ছোট্ট ওমায়রা তাদের থেকেও বেশি শান্ত হয়ে আছে। সবার সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলে যাচ্ছে। এক সাংবাদিককে সে ঐ অবস্থাতেই সাক্ষাৎকার দিতেও রাজি হলো। সেই সাক্ষাৎকারে সে জানালো, তার সেই মৃত আন্টি এখনো তার পা ধরে আছে। কাদাপানি আর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া পায়ে সে এখনো বেশ টের পাচ্ছে তার মৃত আন্টির শক্ত হয়ে চেপে ধরা হাত!
.
ওমায়রার এমন শান্ত রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলো সবাই! আরেক সাংবাদিক, যে ভলান্টিয়ারের কাজ করছিলো, সে উদ্ধার কাজের ফাঁকে কিছুক্ষণ ওমায়রাকে সঙ্গ দিতে চাইলো। ওমায়রা তাকে তখন তার মিষ্টি গলায় একটা গান শুনিয়েছিলো। তাকে অনেকেই এসে জিজ্ঞেস করছিলো, কিছু লাগবে কিনা? সে শান্ত গলায় মিষ্টি জাতীয় খাবার, পানি ইত্যাদি চেয়ে নিচ্ছিলো। এভাবে পরপর দুইদিন কেটে গেলো। দুইদিন পরে রাতে ওমায়রা উপস্থিত উদ্ধার কর্মীদের বললো, তারা যেন এখন গিয়ে একটু বিশ্রাম করে নেয়। তারা সবাই কাজ করে ভীষণ ক্লান্ত। ওমায়রার এখন তাদের সঙ্গ না হলেও চলবে। আরেক দফা ধাক্কা খেলো উপস্থিত উদ্ধার কর্মীরা। কেউ কেউ অস্থিরতায় উন্মাদ হয়ে খবর নিতে লাগলো, কেন এখনো পাম্প নিয়ে লোকজন উপস্থিত হচ্ছে না? যে করেই হোক বাঁচাতেই হবে এই মিষ্টি মেয়েটাকে!
ঐদিন মাঝ রাতেই ভীষণ হট্টগোল শুরু হয়ে গেলো। পাম্প নিয়ে এসে পড়েছে সেই দলটা। ওমায়রা হয়তো এবারে বেঁচে যাবে! কিন্তু ওমায়রাও তার ধৈর্যের চরম সীমায় এসে পৌঁছেছে। টানা দুইদিন মানসিকভাবে শক্ত থাকার পর সেই দ্বিতীয় রাত হতে ভেঙ্গে পড়েছে সে। পানিতে একটানা থেকে ভীষণ ঠাণ্ডা লাগছে। শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছে আরো। হ্যালুসিনেশান হচ্ছে তার। মৃত আন্টির সাথে কথা বলা শুরু করেছে সে, যে আন্টি তখনো পানি আর ধ্বংসস্তূপের নিচে ডুবে থেকে তার পা আঁকড়ে ধরে আছে। তবুও ডাক্তার আসলো। পাম্প দিয়ে কিছু পানি সরিয়ে নেয়া হলো। ডাক্তার দেখে জানালো ওমায়রার পা এখন আর কেটে ফেলার অবস্থায় নেই। কোমর হতে নিচ পর্যন্ত পুরোটাই গ্যাংগ্রিন ছড়িয়ে গেছে। রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং টানা পানিতে থাকায় কোমর হতে নিচে পচতে শুরু করেছে তার। এখন একটাই উপায় আছে। মেয়েটাকে একটু শান্তিতে মরতে দেয়া!
.
ওমায়রার মৃত্যু নিশ্চিত জেনে চুপ হয়ে গেলো উপস্থিত জনতা। ওমায়রাও তখন আর হুঁশে নেই। মরণ ঘনিয়ে আসছে তার। তখন এগিয়ে এলেন সাংবাদিক ‘ফ্র্যাংক ফুঁরিয়ে’। তুললেন ওমায়রার ফটো। সেই ফটো দেখলেই যে কেউ বুঝবে কীভাবে দু’চোখ জুড়ে ধীরে ধীরে মরণের ঘনকালো আঁধার ছেয়ে আসছে ওমায়রার। অথচ তারপরও কী শান্ত চাহনি তার! ফ্র্যাংক এই ফটো তোলার ঘণ্টা কয়েকের মাঝেই ১৬ নভেম্বর সকাল ১০টায় আস্তে করে নিস্তেজ হয়ে গেলো ওমায়রার ছোট্ট শরীর। ডাক্তার এসে তাকে মৃত ঘোষণা করলো।
.
ওমায়রার এই ফটো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার পর তুলকালাম শুরু হয়ে গেলো। তদন্তে বেরিয়ে এলো, ঐ অঞ্চলে উদ্ধারকাজে সরকারীভাবে তেমন কোনো সহায়তাই ছিলো না। পুরোটাতেই ছিলো অব্যবস্থাপনা এবং অবহেলার ছাপ। সাধারণ শাবল, গাঁইতি, কোদালও ছিলো না পর্যাপ্ত পরিমাণে। তাছাড়া দ্রুত যদি সরকারীভাবে একটা পাম্পের ব্যবস্থা করা যেতো, তবে ওমায়রাকে যথাসময়ে বাঁচানো যেতো। এদিকে ফটো সাংবাদিক ফ্র্যাংককেও আবেগের বশে তুলো ধুনো করতে ছাড়লো না অনেকে। তাকে “শকুন” বলে গাল দিলো তারা। ফ্র্যাংক এই ফটোর জন্যে ১৯৮৫ সালের ‘বর্ষসেরা ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো’-র অ্যাওয়ার্ড পেলেও সারাজীবন এই শকুন গালির বোঝা তাকে বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয়েছিলো।
.
এখন পর্যন্ত ওমায়রা কলাম্বিয়ানদের কাছে ধৈর্য এবং সাহসের প্রতীক হয়ে আছে। তাকে নিয়ে এখনো লেখা হয় গল্প, গান, কবিতা। সেখানে ফুটে উঠে সদ্য শৈশব ছাড়ানো এক কিশোরীর ছবি, যে বয়সে অনেক ছোট হওয়া সত্ত্বেও একটুও ভয় পায়নি মৃত্যুর মুখোমুখিতে পড়ে। বরং শান্তভাবে মেনে নিয়েছিলো মৃত্যুকে।
কার্টেসি; ইতিহাস থেকে নেয়া
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now