বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
একজন ভাল মানুষ
মঞ্জুর চৌধুরী
১.
জহির সাহেব অবিশ্বাসী কন্ঠে জানতে চাইলেন, "কী বলছেন এসব! কখন ঘটলো? কিভাবে?"
ফোনের ওপাশ থেকে কেউ কিছু বলছে, এপাশ থেকে রেহানা কিছু শুনতে পারছেন না। তিনি শুধু স্বামীর দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর দৃষ্টিতে উৎকণ্ঠা। নিশ্চই কোন দুঃসংবাদ। তাঁর শ্বশুরবাড়ির দিক থেকেই হবার সম্ভাবনা বেশি। তাঁর বাপের বাড়ির দিক থেকে দুঃসংবাদ এলে তাঁর স্বামী এতটা দুঃখিত হতেন না।
মেয়ে মানুষ কখনই ধৈর্য্যশীল নয় - এটা পরীক্ষিত সত্য। তাই তিনি স্বামীর ফোন রাখা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন না। জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, "কী হয়েছে? এই, বল না কী হয়েছে?"
জহির সাহেব ওপাশের কথা শুনছিলেন। স্ত্রীর ক্রমাগত প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে ল্যান্ড ফোনের রিসিভার থেকে মুখ সরিয়ে বললেন, "এনায়েত সাহেব মারা গেছেন।"
তারপর তিনি আবার ফোনের কথা শোনায় ব্যস্ত হয়ে গেলেন।
রেহানা ঠিকই আঁচ করতে পেরেছিলেন, দুঃসংবাদই, তবে এনায়েত সাহেবের মৃত্যু সংবাদ আশঙ্কা করেননি। তাই খবরটা শুনে তাঁর মুখ একদম শুকিয়ে গেল।
বিরবির করে জানতে চাইলেন, "কিভাবে?"
স্বামী তখনও ফোনে, চোখ বড় বড় করে বুঝাতে চাইলেন তিনি কথা শুনছেন। রেহানা কথা বাড়ালেন না।
তাঁর চোখে ভেসে উঠলো ভদ্রলোকের হাসি হাসি মুখ। তাঁর ছোট ছোট দুইটা বাচ্চা আছে, একটা ক্লাস টুতে পড়ে, আরেকটা বোধয় সিক্সে। আহারে! এইটুকুন বয়সেই মাথার উপর থেকে বটের ছায়া সরে গেল। বাইরের পৃথিবীর রোদ ঝড় বৃষ্টি যে বড্ড নিষ্ঠুর!
ভাবিও অনেক মিশুক। পাড়ার অন্যান্য মহিলাদের মতন এর কথা ওর কানে পৌছে দেয়ার স্বভাবমুক্ত একজন নারী। সবসময়েই মুখে হাসি লেগেই থাকে। ওদের যে এখন কী হবে!
তিনি বিরবির করে পড়লেন, "ইন্নালিল্লাহে ওয়াইন্না ইলাইহে রাজিউন।"
ফোন রাখার পর জহির সাহেব শুকনো মুখে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। রেহানা এইবার আবারও একই প্রশ্ন করলেন, "কিভাবে হলো?"
"রোড এক্সিডেন্ট করেছেন। একটা গাড়ি তাঁকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে গেছে। হাসপাতালে নিতে নিতেই শেষ।"
রেহানা আবারও বিরবির করলেন, "ইন্নালিল্লাহে ওয়াইন্না ইলাইহে রাজিউন। বড় ভাল মানুষ ছিলেন।"
"হু।"
"আমাদের যাওয়া উচিৎ।"
স্ত্রীর কথায় জহির সাহেব বললেন, "হু। লাশ এখনও বাড়িতে এসে পৌছায়নি। তুমি রেডি হয়ে নাও।"
রেহানা বললেন, "জাহিদকে নিব?"
জহির সাহেব স্ত্রীর চোখের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, "নিতে চাও? নেয়াটা কি ঠিক হবে? ওর এত কম বয়স। এক্সিডেন্টের মৃত্যু দেখে ভয় পাবে নাতো?"
"বুঝতে পারছি না। ওর এত ক্লোজ ছিলেন। শেষ দেখা দেখবে না?"
"ঠিক আছে। ওকে রেডি হতে বলো।"
রেহানা জাহিদের ঘরে গেলেন। জাহিদ তখন ডেস্কটপ কম্পিউটারে গেম খেলছে। তিনি খুবই বিরক্ত হলেন। এই এক বাজে স্বভাব হয়েছে ছেলেটার। কিছুতেই বাইরে খেলতে যাবেনা। সারাদিন ঘরে বসে কম্পিউটারের সামনে বসে থাকবে। বাইরের কারোর সাথেই মেলামেশাই করতে চায়না। এখনই যদি খেলাধুলা না করে এমন ঘরকুনো স্বভাবের হয়ে যায়, তাহলে শরীর সুস্থ থাকবে কিভাবে?
"জাহিদ, বাবা এখন গেম বন্ধ করতো!"
"কেন মা?"
"একটা ব্যাড নিউজ দিব তোমাকে।"
"এমনিই দাও। গেমটা অনেক ক্রিটিকাল সিচুয়েশনে আছে মা, এখন বন্ধ করতে পারবো না।"
রেহানা একটু গলা চড়ালেন, "একবার বললাম না গেম বন্ধ করতে? বন্ধ করো!"
জাহিদ পজ দিয়ে মায়ের দিকে ফিরে বলল, "কী ব্যাড নিউজ?"
"তোমার এনায়েত আঙ্কেল মারা গেছেন।"
"ও। এখন কী গেম খেলতে পারি?"
জাহিদের কন্ঠস্বরে কোনই আবেগ নেই। ছেলেটা এমন হয়ে যাচ্ছে কেন দিন দিন? একদম ইমোশনলেস। সব এই টেকনোলজির দোষ। মানুষকে যন্ত্রে পরিনত করছে। একজন শত্রু মারা গেলেওতো মানুষের মনে রেখাপাত করে। অথচ সদ্য প্রয়াত লোকটা কত আদর করতেন তাকে! যতবার এই বাড়িতে আসতেন, কিছু না কিছু নিয়ে আসতেন। তাঁর মৃত্যুতে এই ছেলের কিছুই যায় আসে না?
রেহানা বললেন, "তোমার একটুও কষ্ট লাগছে না তোমার একজন এত ক্লোজ আঙ্কেল মারা গেছেন?"
জাহিদ মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলো। কিছু বলল না।
"তারপরেও তুমি গেম খেলতে চাও?"
জাহিদ চুপ করে রইলো। উত্তর দিয়ে মাকে সে রাগাতে চায় না।
রেহানা নির্দেশ দিলেন, "Get ready. আমরা এখন ওঁদের বাড়িতে যাব। পাঞ্জাবি পড়বে।"
জাহিদ অনিচ্ছার সাথে চেয়ার ছাড়তে ছাড়তে বলল, "পাঞ্জাবির সাথে টুপিও পড়তে হবে?"
রেহানা একটু ভেবে বললেন, "পকেটে রেখো, দরকার হলে যাতে বের করে মাথায় দিতে পারো।"
তিনি নিজের ঘরে ফিরে এলেন।
জহির সাহেব বললেন, "জাহিদের রিঅ্যাকশন কী?"
রেহানা আলমারি থেকে সূতির শাড়ি বের করতে করতে বললেন, "ছেলে তোমার স্বভাব পেয়েছে, একটুও ফিলিংস নাই। পুরাই পাথর।"
জহির সাহেব স্ত্রীর কাছে এসে বেশ গাঢ় স্বরে বললেন, "তাই নাকি? আমার অন্তরে কোনই 'ফিলিংস' নাই?"
বলতে বলতে তিনি স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরলেন।
রেহানা কপট তিরষ্কারের স্বরে বললেন, "আহ! এইটা একটা সময় হলো এসব করার? ছাড়োতো!"
জহির সাহেব সাথে সাথে স্ত্রীকে ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন, "আর তুমি বলছো ছেলে বুঝি আমার স্বভাব পেয়েছে!"
২.
যেই অনুষ্ঠানের যেই রীতি আর কি।
গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে গেলে যেমন দেখা যায় একটি ব্যান্ডদলকে প্রস্তুত থাকতে গান গেয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জন করতে, মরা বাড়িতেও তেমনি একদল মানুষকে পাওয়া যায়, মৃতের ঘনিষ্ঠজনদের জড়িয়ে ধরে মরা কান্না জুড়ে দিতে। ওদের কান্নাকাটি দেখে সেই আত্মীয়ই বিভ্রান্তিতে পরে যান। মনে মনে অনুশোচনাও করেন। মৃতের মৃত্যুতে এমন অপরিচিত মানুষও এমন দুঃখিত হচ্ছে, অথচ তিনি এত আপন হয়েও যথাযথ দুঃখ প্রকাশ করতে পারছেন না!
অবশ্য কিছুক্ষণের মধ্যেই মনোযোগ অন্যদিকে সরে গেলে অতি শোকগ্রস্থ দলটিকেই দেখা যায় হাসিমুখে অন্যের সাথে গল্প করতে। হাসিঠাট্টা করতে। চা নাস্তা দিতে এত দেরী হচ্ছে কেন সেই কৈফিয়ত জিজ্ঞেস করতে।
তারপরে আবারও মৃতের ঘনিষ্ঠ নতুন কোন আত্মীয়কে সামনে পেলে জড়িয়ে ধরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতে।
তেমনি একজন জহির সাহেবকে জড়িয়ে ধরে কান্না জুড়ে দিয়েছিলেন। জহির সাহেব যখনই বললেন তিনি একজন প্রতিবেশী, কোন রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় নন, অমনি ম্যাজিকের মতন ভদ্রলোকের কান্না হাওয়া! এবং সেই মুহূর্তেই তাঁকে ফেলে অন্যপাশে সরে গেলেন। প্রতিবেশী টাইপের ফালতু মানুষের সামনে চোখের পানি ফেলা অপচয় বোধয়।
জহির সাহেব চারপাশ দেখতে লাগলেন। মহিলাদের হাউমাউ কান্নার শব্দ এবং পুরুষদের অতিরিক্ত গম্ভীর মুখ। মাঝেমাঝে দুয়েকটা পুরুষকে চোখের পানি ফেলতে দেখা যাচ্ছে। তবে বেশিরভাগই এখনও থমথমে চেহারায় বসে আছেন। লাশ এখনও এসে পৌছায়নি। লাশ আসলে পরে কাঁদবে বোধয়।
তাঁর খারাপ লাগছে ভদ্রলোকের ছোট ছোট দুটি বাচ্চার জন্য। পিতার মৃত্যুশোক এরা কাটিয়ে উঠবে দ্রুত। সময় সাথে সাথেই মৃত মানুষের স্মৃতির দেয়ালে চুনকাম করতে শুরু করে দেয়। অতি দ্রুত পলি জমে স্বজন হারানোর শোকে। কিন্তু বাচ্চা দুটি এখনই তাদের অতি নিকট আত্মীয়দের সবচেয়ে কুৎসিত রূপটির সাথে পরিচিত হবে। মুখোশহীন মানুষের চেয়ে কদাকার প্রাণী পৃথিবীতে আর দুইটি নেই। বড্ড দুঃসময় তাঁদের সামনে।
"কিভাবে হলো ভাই?"
জহির সাহেবের প্রশ্নটাই আরেকজন করলেন। তাই তিনি উত্তরের জন্য আগ্রহ নিয়ে কান পাতলেন।
এনায়েত সাহেবের কোন এক নিকটাত্মীয় মধ্যবয়ষ্ক পুরুষ বেশ ভারী গলায় বললেন, "বাসের সাথে ধাক্কা খেয়েছেন। রাস্তা পেরুচ্ছিলেন, বাস এসে ধাক্কা দিয়ে দিল। এক ধাক্কাতেই শেষ।"
তিনি এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
শ্রোতাদের একজন বললেন, "হ্যা, আজকালক যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে। একমাস বাসের হেল্পারি করেই ড্রাইভার হয়ে যাচ্ছে সবাই!"
আরেকজন বললেন, "আর এখন লাইসেন্স পাওয়া কোন ব্যপার? পয়সা দিলেই যে কেউ লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছে। সব জায়গায় দুর্নীতি!"
প্রথমজন বললেন, "এমনভাবে বললেন যেন গত সরকারের আমলে কোন দুর্নীতি ছিল না? ভুলে যাবেন না, পরপর পাঁচ বছর দেশ দূর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন ছিল।"
এবার দ্বিতীয়জন বললেন, "তা এই সরকারও কি দুধে ধোয়া তুলসী পাতা নাকি? অবৈধ নির্বাচনের অবৈধ সরকার! প্রতিবেশীর কাছে দেশটা অলিখিতভাবে বেঁচেই দিয়েছে। এখন শুধু "বন্দে মাতরম" গাওয়াটাই বাকি!"
"চুপ থাকেন! যুদ্ধাপরাধী!"
লেগে গেল গন্ডগোল!
জহির সাহেব বাঙ্গালির রাজনৈতিক সচেতনতায় মুগ্ধ হয়ে গেলেন। এরা পারেও বটে! তিনি সরে এলেন।
এনায়েত সাহেবের ছোট ভাইও এসেছেন। জহির সাহেব তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন।
কিন্তু একজন "ক্রন্দন-পটিয়সী" ব্যক্তি তাঁর আগে ভাইয়ের কাছে পৌছায় জড়িয়ে ধরে হাউমাউ কান্না জুড়ে দিলেন।
"এইটা কী হইলো! আল্লাহর এ কেমন বিচার!! ভাই!!!"
মৃতের ভাইকে উল্টা দেখা গেল ভদ্রলোককে সান্তনা দিতে।
"দোয়া করবেন ভাই। দোয়াতেই কাজ হবে।"
"দোয়াইতো করতেছি ভাই! দোয়াই করতেছি!"
জহির সাহেব অপেক্ষা করলেন। তারপর ক্রন্দনবীর প্রস্থান করলে পরে ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন, "ড্রাইভার ধরা খেয়েছে?"
তিনি খুব আহত চেহারায় মাথা নেড়ে বললেন, "শুনেছি পুলিশ কেস নিতে রাজি হচ্ছে না। প্রভাবশালীর ছেলে। ছেলের বাবা সচিব।"
জহির সাহেব অবাক হয়ে বললেন, "সচিবের ছেলে বাস ড্রাইভ করছিল কেন?"
এনায়েত সাহেবের ভাই আরও অবাক হয়ে বললেন, "বাস ড্রাইভ করছিল মানে?"
"উনি বাসের আঘাতে মারা যাননি?"
"নাতো। প্রাইভেট কার ধাক্কা মেরেছে। টয়োটা প্রিমিও।"
জহির সাহেব আর কথা বাড়ালেন না। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে দুইজনের মুখ থেকে দুইরকমের ঘটনা শুনলেন।
বাঙ্গালির এই প্রতিভায়ও তিনি মুগ্ধ হলেন।
জাহিদ বাবার পাঞ্জাবি টেনে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, "আমরা কখন যাব?"
জহির সাহেব বললেন, "দেরী আছে বাবা।"
"কত দেরী?"
"আহ! এরকম বলে না। তুমি যাও, দেখো তোমার কোন ফ্রেন্ডকে পাও কিনা। খবরদার, গেটের বাইরে যাবে না।"
জাহিদ চলে গেল। প্রায় দুইবছর পর এলো এই বাড়িতে। তেমন কিছুই পরিবর্তন ঘটেনি। কয়েকটা নতুন গাছ লাগানো হয়েছে। অথবা আগের চারাগুলোই বড় হয়েছে। দোলনাটা এখনও আছে আগের মতই। নতুন রং করায় বরং আরও সুন্দর হয়েছে দেখতে। সে বাগানের দোলনায় গিয়ে একা একা দোল খেতে লাগলো। তবে একদৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে রইলো। যাতে ভিড়ের মধ্যে বাবা হারিয়ে না যায়। বা প্রয়োজনে ডাকলে বাবা যেন শুনতে পান।
জহির সাহেবের খুব চায়ের তৃষ্ণা পেয়েছে। সকালে চা খাওয়া হয়নি। এখন মাথা ধরেছে। কোন কোন মরাবাড়িতে চুলা জ্বালায় না, এতে নাকি কবর গরম হয়ে যায়। কেউ কেউ আবার এসব মানেন না। এরা কোন দলের?
একটু পরপর পকেটে হাত দিয়ে দেখছেন খামটা ঠিক আছে কিনা। খামের ভিতর পাঁচ হাজার টাকা আছে। মরা বাড়িতে এলে টাকা পয়সা সাথে নিয়ে আসা ভাল। কখন দরকার পরে যায়! দেখা গেল কবরের জমি কেনায় কিছু টাকা শর্ট পড়েছে। তখন এই সামান্য কটা টাকার জন্য কোথায় হাতড়ে ফিরবে?
লোকজনের ভিড় বাড়ছেই। ভদ্রলোক বেশ জনপ্রিয় ব্যক্তি ছিলেন বোঝাই যায়।
জহির সাহেবের সাথে এনায়েত সাহেবের সম্পর্ক একজন প্রতিবেশী হিসেবে। এত ভাল একটা মানুষ! প্রায় প্রতিদিন তাঁদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিতেন সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা। কোন সমস্যা হলেই যেন তাঁকে বলা হয়।
প্রথম প্রথম তাঁদের খুব বিরক্ত লাগতো। মনে হতো মতলববাজ কোন মানুষ। নাহলে এযুগে এভাবে কেউ প্রতিদিন প্রতিবেশীদের খোঁজ খবর নেন?
পরে দেখেন, না, লোকটা আসলেই ভাল। এলাকার প্রায় প্রতিটা প্রতিবেশীর সাথেই তাঁর সুসম্পর্ক। প্রত্যেকেরই বিপদে আপদে তিনিই প্রথম পাশে এসে দাঁড়ান।
আসলে এখন থেকে 'দাঁড়াতেন' বলতে হবে। এখনতো তিনি অতীত।
এলাকার সব শিশুদের সাথে তাঁর ছিল অসীম সখ্যতা। তাঁর নিজের সন্তানতো ছিলই, সেই সাথে এলাকার সব শিশুদের তিনি বিকালে তাঁর বাগানে খেলতে নিয়ে আসতেন। শিশুদের ব্যাট, বলের ব্যবস্থা তিনিই করতেন। মাঝে মাঝেই সবার মধ্যে লজেন্স বিতরণ করতেন। অনেক শিশুই তাঁকে তাই লজেন্স আঙ্কেল নামেও ডাকতো।
আহারে! অমন একটা ভাল লোককে কিনা মরে যেতে হলো গাড়ি চাপা পড়ে! আসলে কেউ একজন ঠিকই বলেছেন, ভাল মানুষদের আল্লাহও নিজের কাছে দ্রুত নিয়ে যান।
জহির সাহেব একটি ছোট্ট নিঃশ্বাস বাতাসে মিলিয়ে দিলেন।
যথা সময়ে লাশ এসে বাড়িতে উপস্থিত হয়। বাড়ির ছাদে লাশের গোসল দেয়ানো হয়। এনায়েত সাহেবের ছোট ভাই চাচ্ছেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কবর দিয়ে দিতে। বেশিক্ষণ লাশ কবরের বাইরে রাখলে নাকি লাশেরই কষ্ট হয়।
ভাবি অন্দরমহল থেকে খবর পাঠিয়েছেন আরও কিছু আত্মীয়স্বজন শেষ দেখা দেখতে চাচ্ছেন। একদিন পরে কবর দিলে অসুবিধা হবে কিনা।
ভাই বললেন, "তোমার কী এখন আত্মীয়স্বজন প্রায়োরিটি, নাকি স্বামী? মুখের দেখা দেখে কী হবে? এরচেয়ে কবরে যাতে আজাব না হয় সেই দোয়া করুক সবাই।"
এরপর আর কোন কথা থাকেনা। ঠিক হলো, বাদ জোহরই গোর হয়ে যাবে।
জহির সাহেব ঘড়িতে দেখলেন এখন মাত্র সাড়ে এগারোটা বাজে। জোহরের ওয়াক্ত হতে এখনও বেশ দেরী আছে। ততক্ষণে কোন এক চায়ের দোকান থেকে এক কাপ চা খেয়ে আসা যাক। সাথে জাহিদকে নিয়ে যাবেন। কারও সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলে যাতে বলতে পারেন, ছেলের খিদে পেয়েছিল বলেই তিনি এসেছেন।
জাহিদকে খুঁজে বের করতে করতে এনায়েত সাহেবের সবচেয়ে বড় ভাইয়ের সাথে দেখা হয়ে গেল। তিনি তাঁর হাত আলতো ঝাকিয়ে বললেন, "আমার ভাই অনেকদিন ধরেই আপনাদের সাথে মেলামেশা করেছে। দোষে গুনেই মানুষ। যদি কখনও কোন ভুল করে থাকে, তবে আপনারা প্লিজ ওকে মাফ করে দিবেন।"
ভদ্রলোকের গলা ধরে এলো। জহির সাহেবেরও চোখে বাষ্প জমলো।
জাহিদ বাবাকে দেখে এগিয়ে এসেছিল। এনায়েত আঙ্কেলের ভাইয়ের কথাটা শুনে তার একটা স্মৃতি মনে পড়ে গেল।
এনায়েত আঙ্কেলকে সে জ্ঞান হবার পর থেকেই চেনে। তাদের বাসায় অবাধে আসা যাওয়া ছিল লোকটার। এবাড়ির বাগানে একটা দোলনা ঝুলে, দোলনার লোভেই এ বাড়িতে সে অগণিতবার এসেছে। দুই বছর আগে একদিন বিকেলে সে যখন দোলনায় দোল খাচ্ছিল, তখন আঙ্কেল তাকে মজার সিনেমা দেখাবেন বলে কোলে তুলে বাড়িতে নিয়ে যান।
আঙ্কেলের বাড়িতে সেদিন কেউ ছিল না। টিভিতে আগে থেকেই সিনেমা চলছিল। কিন্তু এমন সিনেমা জাহিদ কখনই দেখেনি।
"নায়ক নায়িকা ন্যাংটা কেন!"
এনায়েত আঙ্কেল হাসতে হাসতে বললেন, "হ্যা! একদম ন্যাংটু! সুন্দর লাগছে না?"
জাহিদ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এর আগে সে কখনও এত বড় কাউকে নগ্ন অবস্থায় দেখেনি।
"ওরা কী করছে?"
"আদর করছে। ওদের দেখ, আদর করতে খুব মজা। এসো তোমাকে আদর করে দেই।"
আঙ্কেল আগে থেকেই খালি গা ছিলেন। কোমরের নিচে শুধুই লুঙ্গি। তার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুতভাবে হাসছেন। জাহিদের কিছু একটা খটকা লাগলো।
"না। আমাকে আদর করতে হবেনা।"
"ওমা! কী বলে ছেলে! এসোই না, আঙ্কেল তোমাকে চকলেট দিব, ডেইরি মিল্ক! এসো।"
আঙ্কেল জাহিদকে কাছে টেনে আনেন। তার ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে চুমু খান। জিভ ঠেলে ঢুকিয়ে দেন মুখের ভিতর। তারপর জোর করে তার কাপড় খুলে ফেলেন।
জাহিদ টিভির দিকে তাকিয়েছিল। দৃশ্যগুলো এত কুৎসিত কেন? এটা কী ধরনের সিনেমা?
বাড়িতে পৌছে দেবার সময়ে সলিমের দোকান থেকে ডেইরি মিল্ক চকলেট কিনে দিতে দিতে আঙ্কেল বলেছিলেন, "খবরদার! আজকে যা হলো, এই কথা কাউকে বলো না!"
জাহিদ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। এই লোকটা ভীষণ খারাপ! খুব পঁচা! বাড়িতে গিয়েই সে মাকে সব কথা বলে দিবে।
"যদি বলে দাও, তাহলে আমি তোমাকে মেরে ফেলবো। যাকে বলবে, তাকেও মেরে ফেলবো!"
সে ভয়ে ভয়ে হাস্যমুখী লোকটার দিকে তাকায়। মাঝে মাঝেই এই পারায় সাপুরির দল সাপের খেলা দেখাতে আসে। ভয়ংকর বিষাক্ত হব সাপ ফণা তুলে মাথা দুলাতে থাকে। লোকটাকে এখন সেইরকমই এক বিষাক্ত সাপের মতন দেখাচ্ছে।
সে ফ্যালফ্যাল করে লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকে। লোকটা বলে, "যদি চুপ থাকো, তাহলে এইরকম আরও অনেক চকলেট খাওয়াবো। চকলেট খাবে?"
"না!"
বলেই জাহিদ দৌড়ে বাড়িতে চলে আসে। মাকে বহুবার বলতে চেয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই তার একটা কথা মনে পড়েছে, "যাকে বলবে, তাকেও মেরে ফেলবো!"
এরপর থেকে সে আর কোনদিন এই লোকটার বাসায় আসেনি। কিন্তু তারপরেও একই ঘটনা তার সাথে আরও চারবার ঘটেছে। প্রতিবারই তার নিজের বাসায়। এই কারনে লোকটা বাড়িতে আসলে সে না পারতে তার সামনে আসতে চাইতো না। কিন্তু সেই বারবার ছুতো বের করে তার কামড়ায় গিয়ে হাজির হয়েছে। বারবার! মা বাবা বাড়িতে থাকার পরেও!
এই লোকটাকে সে কিভাবে ক্ষমা করবে?
লোকটার ভাই যখন বলছে, "আমার ভাইকে মাফ করে দিবেন।"
তখন জাহিদের জোরে জোরে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়েছে, "না! আমি জীবনেও লোকটাকে মাফ করবো না! কখনই না!"
বলা হয় না। ঠিক যেমন আগেও বহুবার সে মুখ ফুটে কিছু কথা বলতে পারেনি, এইবারও পারলো না।
জাহিদের বাবা জহির সাহেব খুবই দুঃখিত গলায় বলেন, "চিন্তা করবেন না ভাই সাহেব। আপনার ভাইয়ের মতন ভাল মানুষ দুইটা হয়না। তিনি যদি বেহেস্তে না যান, তবে আর কেউই যাবে না।"
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now