বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

এক দুপুরে

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান sagor the gangster of king is here (crush) (০ পয়েন্ট)

X এক দুপুরে আমাদের এক খালু আমাকে আর তোদের ঝুনু খালাকে প্রায়ই তাদের বাড়িতে বেড়াতে নিতে চাইতেন। বেড়াতে যাবার কথা বলতে গিয়ে খালু বলতেন, যেতে চাইছিস না তো, কিন্তু একবার গেলে আর ফিরতেই চাইবি না। কী সুন্দর একটা জায়গায় আমাদের নতুন বাড়িটা বানিয়েছি, না দেখলে বিশ্বাস হবে না। নৌকায় করে গেলে নদীর পাড়ে নামতে হবে। নদীর পাড় দিয়েই শহরের দিকে চলে গেছে ইট বিছানো পথ। সেই পথ ধরে রিকশা করেও আমাদের বাড়িতে যাওয়া যায়। রাস্তা থেকে মিনিট দশেক হেঁটে গেলে আমাদের বাড়ি। ঝুনুকে সবাই বলত ঠোঁটকাটা। কোনো কথা আটকায় না ওর মুখে। ছোটবেলা থেকেই যে কোনো কিছুতে আমার চেয়ে ওর উৎসাহ বেশি। খালুকে ও বলল, শুনেছি আপনারা যেখানে বাড়ি তুলেছেন, অন্তত তার আধমাইলের ভেতরে নাকি আর কোনো বাড়িঘর নেই। হ্যাঁ, ঠিক শুনেছিস তুই। খালু বললেন। ওমা, রাতের বেলা ভয় করে না আপনাদের? ঝুনু জানতে চাইল। কীসের ভয়? কত কিছুর ভয় আছে! এই যে বললেন, আপনাদের বাড়িটা নদীর পাড়ে। শুনেছি নদীর ধারের বাড়িগুলোতে ডাকাত পড়ার ভয় বেশি। ঝুনুর কথা শুনে হো হো করে হেসেছিলেন খালু। হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ডাকাত এসে আমার বাড়ি থেকে কী নেবে? দামি কিছু নেই আমার বাড়িতে। সোনাদানার কথা বলছিস? ওসব বেচেই তো অত সুন্দর করে বাড়িটা বানালাম। ঝুনু বলল, আচ্ছা ডাকাতের কথা না হয় বাদ দিলাম। জায়গাটাও তো বেশ নিরিবিলি। খালু সায় দিলেন ঝুনুর কথায়। হ্যাঁ, তা ঠিক বলেছিস। বাড়িটা নিরিবিলি জায়গায় বলেই তো সুন্দর। আমি আরো নিরিবিলি করে তুলেছি। সে কারণেই তো বলছি, তোদের ভালো লাগবে। ঝুনু বলল, অত নিরিবিলিতে আমার ভয় করবে। বোকা মেয়ে, ভয় কীসের! শোন, বাড়ির পেছনে বিশাল এক পুকুর কাটিয়েছি। দেখে অনেকটা দিঘির মতো মনে হতে পারে। সেই দিঘির চারপাশ ঘিরে নানা রকম ফলের গাছ লাগিয়েছি। আর দিঘির পুবপাশে আছে বিশাল বাগান। সেই বাগানে শুধু ফলের গাছ না, অনেক বনজ গাছও লাগিয়েছি। তিন বছর হলো বাড়িটার বয়স। এই ক বছরে বাগানের গাছগুলো বেশ বড়োসড়ো হয়েছে। তাই বাগানে বেড়াতে ভালো লাগবে। এত কিছুর শুনেও তেমন উৎসাহ পেল না ঝুনু। কিন্তু আমি বেশ খুশি। খালুকে বললাম, তাহলে একবার আপনাদের বাড়িতে যাব খালু। খালু বললেন, যাব কীরে, আজই চল না আমার সঙ্গে। তোদের পেলে তোদের খালা আর তোদের খালাতো বোন আঁখি, দুজনই খুশি হবে। ছাড়তেই চাইবে না তোদের। ঝুনুর দিকে তাকালাম। ঝুনু নির্বিকার। আমি ওকে উৎসাহ দিলাম, চল ঝুনু। একবার গিয়েই দেখি না। তাছাড়া খালু এত করে বলছেন। শেষে খালুর সঙ্গেই আমরা গেলাম। গিয়ে সত্যি চোখ জুড়িয়ে গেল। ঝুনুর যে এত অনাগ্রহ, সেই ঝুনুও মুগ্ধ। এই দেখে গর্বের হাসি হাসেন খালু। আমাদের দেখে খালা এবং আঁখি বেশ খুশি হলো। প্রথম দিন বাড়ির উঠোন আর ওই দিঘির মতো পুকুর পর্যন্তই পা রাখতে পারলাম আমরা। কারণ খালুবাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা পড়ে গিয়েছিল। পুকুর পাড়ে গিয়ে পুব দিকের বাগানের দিকে তাকিয়ে ঝুনু বলল, দেখেছিস আপা, বাগানের ভেতরটা কেমন অন্ধকার! এই পড়ন্ত বিকেলে অন্ধকার দেখাবে না তো কি আলোয় চকচক করবে! আমি বললাম। ঝুনুর যেন ভয় একটু বেশিই। সন্ধ্যাবেলা আমরা সবাই উঠোনে বসে গল্প করছি, ও ঘরের ভেতর বসে আছে। গ্রাম বলে যদিও চারপাশ অন্ধকারে ডুবে আছে, কিন্তু উঠোনের ঠিক মধ্যখানে একটা বাঁশের মাথায় ঝোলানো বাল্বের আলোতে ভরে উঠেছে উঠোনটা। সেই আলোতে বসে আছি আমরা সবাই, তবু ঝুনু আসবে না। খালা বললেন, ও শুধু শুধু ভয় পায়। আমরা আছি, তবু কীসের এত ভয়? এত ভয় ভয় করলে, ভয় সরতে চায় না মন থেকে। আঁখি বলল। খালুবাড়িতে দুদিন কেটে গেল। আমাদের দুবোনের সময় কাটে না। সকাল হলেই খালু তার জমিতে চলে যান চাষাবাদের তদারক করত। আঁখি চলে যায় স্কুলে। অত বড় বাড়িতে খালা আর আমরা দু বোন। খালা রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। আমরা দুজন উঠোন আর পুকুর পাড় এইটুকুর মধ্যে ঘুরে বেড়াই। এতে কার ভালো লাগে? দুপুরবেলা ঝুনুকে বললাম, চল, পুকুর পাড়ের বাগানটায় ঘুরে আসি। ঝুনুরও বোধহয় এভাবে ভালো লাগছিল না। এককথায় রাজি হয়ে গেল ও। দূর থেকে বাগানটাকে দেখে আমাদের ভেতরে যে ভয় ভয় কাজ করত, বাগানে ঢুকে তা কোথায় যেন উবে গেল! আসলে বাগানটা এত চমৎকার, যে কারো ভালো লাগবে। সুন্দর সারি সারি করে গাছ লাগানো। নানা বৈচিত্রের গাছও দৃষ্টি কেড়ে নেয়। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছিল সূর্য। রোদের ঝিকিমিকি গাছের ছায়ায়। বাগানে হাঁটতে কী যে ভালো লাগছিল আমার! হঠাৎ ঠাস করে গালে চড় মারার শব্দ কানে এলো। শব্দটা কোনদিক থেকে এলো প্রথমটায় বুঝে উঠতে পারলাম না। বাগানের এদিক-ওদিক দৃষ্টি ঘোরাতে ঘোরাতে- পেছনে তাকাতেই অবাক হলাম। মাটিতে পড়ে আছে ঝুনু! আনমনে হাঁটতে হাঁটতে আমি কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিলাম। ঝুনু কিছুটা পেছনে পড়ে গিয়েছিল। ঝুনুকে ওভাবে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে এক চিৎকার মেরে ওর কাছে ছুটে এলাম। ওর শরীরে নাড়াচাড়া দিয়ে বুঝলাম অজ্ঞান হয়ে গেছে। তখনো বুঝে উঠতে পারিনি চড়ের শব্দটার সাথে ঝুনুর মাটিতে পড়ে থাকার কোনো সম্পর্ক রয়েছে। ঝুনুর মুখের দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম। ওর ডান গালে চড়ের দাগ। লাল হয়ে আছে জায়গাটা। পাঁচটা আঙ্গুল বসে গেছে গালে। দেখে বুক কেঁপে উঠে আমারও জ্ঞান হারানোর অবস্থা। এরমধ্যে আমার চিৎকার শুনে খালা দৌড়ে এলেন। আমরা দুজন ঝুনুকে ধরে-টরে ঘরে নিয়ে গেলাম। রাস্তা দিয়ে একজন লোক যেতে দেখে খালুকে খবর দিতে বললেন খালা। খালু এলেন। এক গ্রাম্যডাক্তারকে আনা হলো। ঝুনুর জ্ঞান ফিরল, কিন্তু থেকে থেকে চিৎকার করে উঠছে ও। কাউকে দেখলেই ভয় পাওয়ার মতো কুঁকড়ে যায়। ঝুনুর এমন অবস্থা দেখে যতটা না অবাক হচ্ছি, ততটা ঘটনাটার কথা ভেবে শিউরে উঠছি। মুহূর্তে কী যে ঘটে গেল বোঝা গেল না! ঝুনুর গালে থাপ্পড়ের দাগ দিনকে দিন আরো গাঢ় হচ্ছে। ক্ষতের মতো হয়ে উঠেছে। দুচার দিনে সেই ক্ষতের কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় ঝুনুকে নিয়ে ঢাকায় ফিরলাম আমরা। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে নেয়া হলো। পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলো। ডাক্তার ওষুধ দিলেন। বললেন অল্প কদিনের মধ্যে ভালো হয়ে উঠবে। ডাক্তারের কথায় সবাই কিছুটা সাহস ফিরে পেল। কিন্তু আমার মনের ভেতরে নানা কথা ঘুরপাক খেতে থাকল। সেদিন বাগানে হাঁটতে হাঁটতে ঝুনুকে পেছনে ফেলে একটু এগিয়ে না গেলে হয়তো অমন অবস্থায় পড়তে হতো না ওকে! কিন্তু চোখের পলকে এত বড় একটা ঘটনা কেমন করে ঘটে গেল? একটা থাপ্পড়ে অমন অদ্ভুত ক্ষতইবা সৃষ্টি হবে কেন? ভেবে কূলকিনারা পাই না। এদিকে ঝুনুর অবস্থার কোনো পরিবর্তন নেই। ওর গালের ক্ষত অদ্ভুত রূপ ধারণ করছে। গালে যে আঙুলের ছাপ বসে গেছে, প্রথম দিকে সেগুলোতে দগদগে ঘা সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকায় এনে ডাক্তার দেখানোর পর ওষুধে ঘা কিছুটা শুকালেও সেরে উঠছে না পুরোপুরি। ক্ষতের জায়গায় আঙুলের ছাপ বসে যাওয়া জায়গাগুলো কখনো কুচকুচে কালো, কখনো তামাটে, কখনো টকটকে লাল, কখনো হলদেটে রং ধারণ করছে। ওকে বেশ ভয় লাগত। রাতে আমি শুতাম ওর সঙ্গে। কখনো কখনো ঘুম ভেঙে যেত আমার। অথচ ঘুম ভাঙার কোনো কারণ খুঁজে পেতাম না। না কোনো দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙত না। ঝুনুর নড়াচড়ার কারণে আলগোছে ঘুম ভেঙে যেত। একদিন এমন করে ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে অন্ধকার ঘরের এদিক-ওদিক দৃষ্টি ঘুরিয়ে পাশে শোয়া ঝুনুর দিকে তাকালাম। তাকিয়ে বুকের ভেতর ছ্যাৎ করে উঠল। ঝুনুর চোখ দুটো অন্ধকারে বেড়ালের চোখের মতো জ্বলছে, নিভছে। যখন থেকে এমনটা শুরু করল, তখন থেকে ঝুনুর গালের ক্ষতের ওই পরিবর্তন দেখা গেল না আর। কালো, তামাটে, লাল আর হলদেটে রং ধারণ করল না। তারপর থেকে আমার ঘুম আসতে চাইত না। ঝুনুর চোখ দুটো বেড়ালের চোখের মতো কখন জ্বলে উঠবে, তা দেখার অপেক্ষায় থাকতাম। তবে ওই জ্বলে ওঠা পর্যন্তই। একটুক্ষণ জ্বলে-নিভে আবার ঠিক হয়ে যেত। কিন্তু এসব কাউকে বলতে পারিনি আমি। কাউকে বলার কথা মনে হলেই কেন যেন ভীষণ ভয় জড়িয়ে ধরত আমাকে! ঝুনুর গালের ক্ষতের অবস্থা আগের মতো পরিবর্তন হচ্ছিল না দেখে সবাই ভেবেছিল ও বোধ হয় সেরে উঠবে। কিন্তু তা হলো না। আবার ডাক্তারের কাছে নেয়া হলো ওকে। ডাক্তার আবার ওষুধ দিলেন। সেই একই অবস্থা, কিছুতে কিছু হলো না। তারপর একদিন ঝুনুকে খুঁজে পাওয়া গেল না। ঘর থেকে শুরু করে সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজা হলো। পাওয়া গেল না। সবার অস্থির অবস্থা। কান্নাকাটি পড়ে গেল। বাবা থানাপুলিশ করার প্রস্তুতি নিলেন। তিন দিনের মাথায় খালু খবর পাঠালেন ঝুনু তাদের বাড়িতে। সবাই অবাক। অবাক খালুও। ঢাকা থেকে পথ চিনে ঝুনু একা কেমন করে তাদের বাড়ি গিয়ে পৌঁছল এই ভেবে। ঝুনুর গালের ক্ষতটাও আর দেখা গেল না! সেই আগের ঝুনুকেই ফিরে পেলাম আমরা। মাঝের অঘটনগুলো যেন রূপকথার গল্প! সে যাই হোক, সুস্থ-স্বাভাবিক ঝুনুকে ফিরে পেয়ে পেছনের ওসব অঘটনের কথা আর কে ভাবতে চায়?আমাদের এক খালু আমাকে আর তোদের ঝুনু খালাকে প্রায়ই তাদের বাড়িতে বেড়াতে নিতে চাইতেন। বেড়াতে যাবার কথা বলতে গিয়ে খালু বলতেন, যেতে চাইছিস না তো, কিন্তু একবার গেলে আর ফিরতেই চাইবি না। কী সুন্দর একটা জায়গায় আমাদের নতুন বাড়িটা বানিয়েছি, না দেখলে বিশ্বাস হবে না। নৌকায় করে গেলে নদীর পাড়ে নামতে হবে। নদীর পাড় দিয়েই শহরের দিকে চলে গেছে ইট বিছানো পথ। সেই পথ ধরে রিকশা করেও আমাদের বাড়িতে যাওয়া যায়। রাস্তা থেকে মিনিট দশেক হেঁটে গেলে আমাদের বাড়ি। ঝুনুকে সবাই বলত ঠোঁটকাটা। কোনো কথা আটকায় না ওর মুখে। ছোটবেলা থেকেই যে কোনো কিছুতে আমার চেয়ে ওর উৎসাহ বেশি। খালুকে ও বলল, শুনেছি আপনারা যেখানে বাড়ি তুলেছেন, অন্তত তার আধমাইলের ভেতরে নাকি আর কোনো বাড়িঘর নেই। হ্যাঁ, ঠিক শুনেছিস তুই। খালু বললেন। ওমা, রাতের বেলা ভয় করে না আপনাদের? ঝুনু জানতে চাইল। কীসের ভয়? কত কিছুর ভয় আছে! এই যে বললেন, আপনাদের বাড়িটা নদীর পাড়ে। শুনেছি নদীর ধারের বাড়িগুলোতে ডাকাত পড়ার ভয় বেশি। ঝুনুর কথা শুনে হো হো করে হেসেছিলেন খালু। হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ডাকাত এসে আমার বাড়ি থেকে কী নেবে? দামি কিছু নেই আমার বাড়িতে। সোনাদানার কথা বলছিস? ওসব বেচেই তো অত সুন্দর করে বাড়িটা বানালাম। ঝুনু বলল, আচ্ছা ডাকাতের কথা না হয় বাদ দিলাম। জায়গাটাও তো বেশ নিরিবিলি। খালু সায় দিলেন ঝুনুর কথায়। হ্যাঁ, তা ঠিক বলেছিস। বাড়িটা নিরিবিলি জায়গায় বলেই তো সুন্দর। আমি আরো নিরিবিলি করে তুলেছি। সে কারণেই তো বলছি, তোদের ভালো লাগবে। ঝুনু বলল, অত নিরিবিলিতে আমার ভয় করবে| বোকা মেয়ে, ভয় কীসের! শোন, বাড়ির পেছনে বিশাল এক পুকুর কাটিয়েছি। দেখে অনেকটা দিঘির মতো মনে হতে পারে। সেই দিঘির চারপাশ ঘিরে নানা রকম ফলের গাছ লাগিয়েছি। আর দিঘির পুবপাশে আছে বিশাল বাগান। সেই বাগানে শুধু ফলের গাছ না, অনেক বনজ গাছও লাগিয়েছি। তিন বছর হলো বাড়িটার বয়স। এই ক বছরে বাগানের গাছগুলো বেশ বড়োসড়ো হয়েছে। তাই বাগানে বেড়াতে ভালো লাগবে। এত কিছুর শুনেও তেমন উৎসাহ পেল না ঝুনু। কিন্তু আমি বেশ খুশি। খালুকে বললাম, তাহলে একবার আপনাদের বাড়িতে যাব খালু। খালু বললেন, যাব কীরে, আজই চল না আমার সঙ্গে। তোদের পেলে তোদের খালা আর তোদের খালাতো বোন আঁখি, দুজনই খুশি হবে। ছাড়তেই চাইবে না তোদের। ঝুনুর দিকে তাকালাম। ঝুনু নির্বিকার। আমি ওকে উৎসাহ দিলাম, চল ঝুনু। একবার গিয়েই দেখি না। তাছাড়া খালু এত করে বলছেন। শেষে খালুর সঙ্গেই আমরা গেলাম। গিয়ে সত্যি চোখ জুড়িয়ে গেল। ঝুনুর যে এত অনাগ্রহ, সেই ঝুনুও মুগ্ধ। এই দেখে গর্বের হাসি হাসেন খালু। আমাদের দেখে খালা এবং আঁখি বেশ খুশি হলো। প্রথম দিন বাড়ির উঠোন আর ওই দিঘির মতো পুকুর পর্যন্তই পা রাখতে পারলাম আমরা। কারণ খালুবাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা পড়ে গিয়েছিল। পুকুর পাড়ে গিয়ে পুব দিকের বাগানের দিকে তাকিয়ে ঝুনু বলল, দেখেছিস আপা, বাগানের ভেতরটা কেমন অন্ধকার! এই পড়ন্ত বিকেলে অন্ধকার দেখাবে না তো কি আলোয় চকচক করবে! আমি বললাম। ঝুনুর যেন ভয় একটু বেশিই। সন্ধ্যাবেলা আমরা সবাই উঠোনে বসে গল্প করছি, ও ঘরের ভেতর বসে আছে। গ্রাম বলে যদিও চারপাশ অন্ধকারে ডুবে আছে, কিন্তু উঠোনের ঠিক মধ্যিখানে একটা বাঁশের মাথায় ঝোলানো বাল্বের আলোতে ভরে উঠেছে উঠোনটা। সেই আলোতে বসে আছি আমরা সবাই, তবু ঝুনু আসবে না। খালা বললেন, ও শুধু শুধু ভয় পায়। খালুবাড়িতে দুদিন কেটে গেল। আমাদের দুবোনের সময় কাটে না। সকাল হলেই খালু তার জমিতে চলে যান চাষাবাদের তদারক করত। আঁখি চলে যায় স্কুলে। অত বড় বাড়িতে খালা আর আমরা দুই বোন খালা রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। আমরা দুজন উঠোন আর পুকুর পাড় এইটুকুর মধ্যে ঘুরে বেড়াই। এতে কার ভালো লাগে? দুপুরবেলা ঝুনুকে বললাম, চল, পুকুর পাড়ের বাগানটায় ঘুরে আসি। ঝুনুরও বোধহয় এভাবে ভালো লাগছিল না। এককথায় রাজি হয়ে গেল ও। দূর থেকে বাগানটাকে দেখে আমাদের ভেতরে যে ভয় ভয় কাজ করত, বাগানে ঢুকে তা কোথায় যেন উবে গেল! আসলে বাগানটা এত চমৎকার, যে কারো ভালো লাগবে। সুন্দর সারি সারি করে গাছ লাগানো। নানা বৈচিত্রের গাছও দৃষ্টি কেড়ে নেয়। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছিল সূর্য। রোদের ঝিকিমিকি গাছের ছায়ায়। বাগানে হাঁটতে কী যে ভালো লাগছিল আমার! হঠাৎ ঠাস করে গালে চড় মারার শব্দ কানে এলো। শব্দটা কোনদিক থেকে এলো প্রথমটায় বুঝে উঠতে পারলাম না। বাগানের এদিক-ওদিক দৃষ্টি ঘোরাতে ঘোরাতে- পেছনে তাকাতেই অবাক হলাম। মাটিতে পড়ে আছে ঝুনু! আনমনে হাঁটতে হাঁটতে আমি কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিলাম। ঝুনু কিছুটা পেছনে পড়ে গিয়েছিল। ঝুনুকে ওভাবে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে এক চিৎকার মেরে ওর কাছে ছুটে এলাম। ওর শরীরে নাড়াচাড়া দিয়ে বুঝলাম অজ্ঞান হয়ে গেছে। তখনো বুঝে উঠতে পারিনি চড়ের শব্দটার সাথে ঝুনুর মাটিতে পড়ে থাকার কোনো সম্পর্ক রয়েছে। ঝুনুর মুখের দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম। ওর ডান গালে চড়ের দাগ। লাল হয়ে আছে জায়গাটা। পাঁচটা আঙ্গুল বসে গেছে গালে। দেখে বুক কেঁপে উঠে আমারও জ্ঞান হারানোর অবস্থা। এরমধ্যে আমার চিৎকার শুনে খালা দৌড়ে এলেন। আমরা দুজন ঝুনুকে ধরে-টরে ঘরে নিয়ে গেলাম। রাস্তা দিয়ে একজন লোক যেতে দেখে খালুকে খবর দিতে বললেন খালা। খালু এলেন। এক গ্রাম্যডাক্তারকে আনা হলো।ঝুনুর জ্ঞান ফিরল, কিন্তু থেকে থেকে চিৎকার করে উঠছে ও। কাউকে দেখলেই ভয় পাওয়ার মতো কুঁকড়ে যায়। ঝুনুর এমন অবস্থা দেখে যতটা না অবাক হচ্ছি, ততটা ঘটনাটার কথা ভেবে শিউরে উঠছি। মুহূর্তে কী যে ঘটে গেল বোঝা গেল না! ঝুনুর গালে থাপ্পড়ের দাগ দিনকে দিন আরো গাঢ় হচ্ছে। ক্ষতের মতো হয়ে উঠেছে। দুচার দিনে সেই ক্ষতের কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় ঝুনুকে নিয়ে ঢাকায় ফিরলাম আমরা। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে নেয়া হলো। পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলো। ডাক্তার ওষুধ দিলেন। বললেন অল্প কদিনের মধ্যে ভালো হয়ে উঠবে। ডাক্তারের কথায় সবাই কিছুটা সাহস ফিরে পেল। কিন্তু আমার মনের ভেতরে নানা কথা ঘুরপাক খেতে থাকল। সেদিন বাগানে হাঁটতে হাঁটতে ঝুনুকে পেছনে ফেলে একটু এগিয়ে না গেলে হয়তো অমন অবস্থায় পড়তে হতো না ওকে! কিন্তু চোখের পলকে এত বড় একটা ঘটনা কেমন করে ঘটে গেল? একটা থাপ্পড়ে অমন অদ্ভুত ক্ষতইবা সৃষ্টি হবে কেন? ভেবে কূলকিনারা পাই না। এদিকে ঝুনুর অবস্থার কোনো পরিবর্তন নেই। ওর গালের ক্ষত অদ্ভুত রূপ ধারণ করছে। গালে যে আঙুলের ছাপ বসে গেছে, প্রথম দিকে সেগুলোতে দগদগে ঘা সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকায় এনে ডাক্তার দেখানোর পর ওষুধে ঘা কিছুটা শুকালেও সেরে উঠছে না পুরোপুরি। ক্ষতের জায়গায় আঙুলের ছাপ বসে যাওয়া জায়গাগুলো কখনো কুচকুচে কালো, কখনো তামাটে, কখনো টকটকে লাল, কখনো হলদেটে রং ধারণ করছে। ওকে বেশ ভয় লাগত। রাতে আমি শুতাম ওর সঙ্গে। কখনো কখনো ঘুম ভেঙে যেত আমার। অথচ ঘুম ভাঙার কোনো কারণ খুঁজে পেতাম না। না কোনো দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙত না। ঝুনুর নড়াচড়ার কারণে আলগোছে ঘুম ভেঙে যেত। একদিন এমন করে ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে অন্ধকার ঘরের এদিক-ওদিক দৃষ্টি ঘুরিয়ে পাশে শোয়া ঝুনুর দিকে তাকালাম। তাকিয়ে বুকের ভেতর ছ্যাৎ করে উঠল। ঝুনুর চোখ দুটো অন্ধকারে বেড়ালের চোখের মতো জ্বলছে, নিভছে। যখন থেকে এমনটা শুরু করল, তখন থেকে ঝুনুর গালের ক্ষতের ওই পরিবর্তন দেখা গেল না আর। কালো, তামাটে, লাল আর হলদেটে রং ধারণ করল না। তারপর থেকে আমার ঘুম আসতে চাইত না। ঝুনুর চোখ দুটো বেড়ালের চোখের মতো কখন জ্বলে উঠবে, তা দেখার অপেক্ষায় থাকতাম। তবে ওই জ্বলে ওঠা পর্যন্তই। একটুক্ষণ জ্বলে-নিভে আবার ঠিক হয়ে যেত। কিন্তু এসব কাউকে বলতে পারিনি আমি। কাউকে বলার কথা মনে হলেই কেন যেন ভীষণ ভয় জড়িয়ে ধরত আমাকে! ঝুনুর গালের ক্ষতের অবস্থা আগের মতো পরিবর্তন হচ্ছিল না দেখে সবাই ভেবেছিল ও বোধ হয় সেরে উঠবে। কিন্তু তা হলো না। আবার ডাক্তারের কাছে নেয়া হলো ওকে। ডাক্তার আবার ওষুধ দিলেন। সেই একই অবস্থা, কিছুতে কিছু হলো না। তারপর একদিন ঝুনুকে খুঁজে পাওয়া গেল না। ঘর থেকে শুরু করে সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজা হলো। পাওয়া গেল না। সবার অস্থির অবস্থা। কান্নাকাটি পড়ে গেল। বাবা থানাপুলিশ করার প্রস্তুতি নিলেন। তিন দিনের মাথায় খালু খবর পাঠালেন- ঝুনু তাদের বাড়িতে। সবাই অবাক। অবাক খালুও। ঢাকা থেকে পথ চিনে ঝুনু একা কেমন করে তাদের বাড়ি গিয়ে পৌঁছল এই ভেবে। ঝুনুর গালের ক্ষতটাও আর দেখা গেল না! সেই আগের ঝুনুকেই ফিরে পেলাম আমরা।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৮ জন


এ জাতীয় গল্প

→ আজ দুপুরে তোমার নিমন্ত্রণ - হুমায়ূন আহমেদ
→ আজ দুপুরে তোমার নিমন্ত্রন
→ এক দুপুরে
→ নিঃসঙ্গ দুপুরের গান
→ দিনদুপুরে।। লেখক-রোদ বৃষ্টি অথবা অন্যকিছু
→ ভরদুপুরে
→ সীমাহীন (দুপুরের গল্প)
→ মেঘলা দুপুরে
→ মধ্যদুপুরের ভালবাসা
→ এক দুপুরে (2)
→ এক দুপুরে (1)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now