বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
দিন বদল।
-মুহিত আলম।
===========
ওসি মারুফ বাসায় যাওয়ার তোড়জোড় করছেন। আজকে সারাদিন খুব ধকল গিয়েছে। অনেক জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে। বাসায় গিয়ে শান্তিমত একটা ঘুম দিতে হবে। তার আগে একটু ভাল খাওয়া দাওয়া করতে হবে। বাইরে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। বিকেল থেকেই টিপটিপ করে বৃষ্টি হচ্ছে। এখন তা মুষলধারায় পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যায় তিনি বাসায় ফোন দিয়ে তার স্ত্রীকে খিচুড়ি আর গরুর মাংস রাঁধতে বলেছেন। সারাদিন দৌড়াদৌড়ির কারণে ঠিকমত খাওয়া হয়নি। থানায় বসেই তার মনে হল তিনি যেন গরুর মাংসের গন্ধ পাচ্ছেন। ওসি মারুফ রাত পৌনে এগারোটায় থানা থেকে বের হলেন। মাথার উপরে একটা ছাতা ধরে রেখেছেন। তার বাসা থানার একদম কাছে। হেটে যেতে দশ-বারো মিনিট লাগে। তবে এই প্রচন্ড বৃষ্টিতে ছাতা মাথায় হেঁটে গেলেও তিনি ভিজে যাবেন। মারুফ সাহেব কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে খালি রিকশা খুঁজলেন। কিন্তু একটাও পেলেন না। মারুফ সাহেব রাস্তা পার হলেন। ফুটপাতে উঠে তিনি দেখলেন এক বৃদ্ধ এই প্রচন্ড বৃষ্টির মাঝে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছে। এতক্ষণ তিনি লোকটাকে দেখেননি। একে তো প্রচন্ড বৃষ্টি, তার ওপর রাস্তার সোডিয়াম লাইটটা নষ্ট হয়ে গেছে। জায়গাটা তাই অন্ধকার। আশপাশ থেকে কিছু আলো এসে যা একটু আলোকিত করছে জায়গাটা। মারুফ সাহেব কিছুটা অবাক হলেন। এই রাতে প্রচন্ড বৃষ্টিতে এভাবে ভেজার মানে কি! পাগল নাকি লোকটা? লোকটা এতক্ষণ তাদের থানার দিকে তাকিয়ে ছিল, এখন মারুফ সাহেবের দিকে তাকাল। -কে আপনি? এখানে ভিজছেন কেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে? প্রশ্ন করলেন মারুফ সাহেব। লোকটা একটু এগিয়ে আসল মারুফ সাহেবের দিকে। তারপর খসখসে গলায় বলল – আপনাগো তামাশা দেখি। ওসি মারুফ অবাক হলেন। -মানে? -মানে আবার কি! বললাম না আপনাগো তামাশা দেখি। -তো এই বৃষ্টির মাঝে তামাশা কি দেখলেন? -কত তামাশা চলে আপনেগো থানায়! তাই দেখি দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া। -কি তামাশা চলে? -হে তো আমার চেয়ে আপনে ভাল জানেন ওসি সাব। মারুফ সাহেবের মেজাজ কিছুটা খারাপ হল। তিনি কিছুটা রেগেই প্রশ্ন করলেন –কি তামাশা দেখছেন স্পষ্ট করে বলেন দেখি। আমি শুনি। লোকটা কিছু বলল না। অট্টহাসি হাসল। মারুফ সাহেবের মেজাজ আরো খারাপ হল। বাতাসের ধাক্কায় ছাতার এক কোণা ভেঙ্গে গেছে। তার পিঠ ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ ভিজে গেছে। তার ওপর লোকটার কথাবার্তার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছেন না। লোকটার আচরণ সন্দেহজনক। দেশের পরিস্থিতি খুব একটা ভাল না। লোকটাকে সন্দেহজনক আচরণের জন্য গ্রেফতার করা যায়। কিংবা এখানে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে না ভিজে বাসায় চলে যাওয়া যায়। তবে কেন জানি মারুফ সাহেব এগুলোর কোনোটাই করলেন না। কোন এক বিচিত্র কারণে লোকটার সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছে। লোকটাকে আরেকটু বাজিয়ে দেখতে ইচ্ছা করছে। -আপনার বাসা কই? -আমার বাসা নয়াপাড়া। -তা এইখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বাসায় যান। বৃষ্টিতে ভিজে তো ঠান্ডা বাঁধিয়ে ফেলবেন। পরে না আবার নিউমোনিয়া হয়। -আমার নিউমোনিয়া হইলে আপনের সমস্যা আছে? পাল্টা প্রশ্ন করে লোকটা। -আপনের বাসায় কে কে থাকে? ছেলেমেয়ে কয়জন? -এক ছেলে। -ছেলের সাথে রাগ করে এখানে দাঁড়িয়ে আছেন নাকি? ছেলে আপনার সাথে কি কোনো বেয়াদপি করেছে? লোকটা এতক্ষণ অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বলছিলো। এখন মারুফ সাহেবের দিকে তাকাল। মারুফ সাহেব এই প্রায়ান্ধকার অবস্থায়ও লোকটার চোখ দুটো দেখতে পেলেন। তীব্র দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে মারুফ সাহেবের দিকে। ওসি মারুফ এই দৃষ্টির সামনে কিছুটা মিইয়ে গেলেন। আবার জিজ্ঞেস করলেন – কি, ছেলের সাথে রাগ করেছেন? আপনার সাথে বেয়াদপি করেছে? -আমার ছেলে আমার সাথে কখনি বেয়াদপি করে না। আমার ছেলে একটা সোনার টুকরা ছেলে। -তা ঐ সোনার টুকরা ছেলেকে বাসায় রেখে আপনি এখানে ভিজছেন কেন? বাসায় গিয়ে ছেলের সাথেই সময় কাটান। -আমার ছেলে বাসায় নাই। -ও। কই গেছে? -আমার ছেলে মারা গেছে। খুন করা হইছে তাকে। ওসি মারুফ প্রচন্ড রকম চমকে উঠলেন। বলে কি লোকটা! -খুন? কবে? কোথায়? -গতকাল দুপুর একটায়। নয়াপাড়া বাজারে। ওসি মারুফ বজ্রাহতের মত লোকটার দিকে তাকিয়ে আছেন। গতকাল নয়াপাড়ায় তরুণ ব্যবসায়ী সাজ্জাদ খুন হয়। কে খুন করে তাও তার অজানা নয়। সন্ত্রাসী মিজানকে চাঁদা না দেওয়ায় গতকাল ভরদুপুরে সাজ্জাদ তার দোকানে খুন হয়। মারুফ সাহেব যতটুকু জানেন খুনটা মিজানই করেছে। কিন্তু উপরের মহলের চাপের কারণে তাকে ধরা হয়নি। সে এখন গা ঢাকা দিয়েছে। লোকটা মারুফ সাহেবকে জিজ্ঞেস করল – কি ওসি সাব, কথা কন না যে! কথা সব ফুরাই গেলো? মারুফ সাহেবের লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা করছে। তিনি কি বলবেন ভেবে পেলেন না। নিজের উপরি এখন তার রাগ লাগছে। এখানে খামোখা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির মধ্যে ভিজে লোকটার সাথে ভ্যাজর ভ্যাজর করার কি দরকার ছিলো? লোকটা আবার বলল – আমি জানি আপনের কথা ফুরাইয়া গেছে। আপনেরা হইলেন কতগুলা শয়তানের কেনা চামচা। আপনেগোরে টেকা দিয়া ওরা পুশে। আপনেরাও ওগো পা চাটেন। আপনেরা মানুষ না, আপনেরা হইলেন সাক্ষাৎ শয়তানের চামচা। মারুফ সাহেবের লজ্জা লাগছে, প্রচন্ড লজ্জা লাগছে। কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। তার সূদীর্ঘ ১৫ বছরের চাকরি জীবনে তিনি এত লজ্জা কখনো পাননি। পুলিশে চাকরি করলে লজ্জা থাকলে চলে না। লজ্জার চাদরকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে হয়। এই ১৫ বছরের চাকরি জীবনে তিনি এটা নিপুণভাবে শিখেছেন। আজ কোত্থেকে এই লজ্জার চাদর এসে তাকে ঢেকে ফেলতে চাইছে তা তিনি বুঝতে পারছেন না। বৃদ্ধ আবার বলল – আপনের লগে দাঁড়াইয়া কথা বলাই উচিৎ না। আপনের শরীর থেকে গন্ধ আসতাছে। পাপের গন্ধ। আমার গা গুলাইয়া উঠতাছে। বমি আসতাছে, বলেই বৃদ্ধ হড়বড় করে বমি করে বসল মারুফ সাহেবের সামনে। বমি রাস্তা থেকে ছিটকে তার প্যান্টেও কিছুটা লাগল। ওসি মারুফের ঘেন্না লাগছে না। বৃদ্ধের কথাটাই তার মাথায় বাজছে –“আপনের শরীর থেকে গন্ধ আসতাছে। পাপের গন্ধ”। মারুফ সাহেবের মনে হচ্ছে বৃদ্ধের বমিও মনে হয় তার শরীর থেকে পবিত্র! নিজের বাবার কথা মনে পড়ল মারুফ সাহেবের। অত্যন্ত সৎ আর ধর্মপ্রাণ একজন মানুষ ছিলেন তার বাবা। মারুফ সাহেব যখন পুলিশে যোগ দেয়, তখন তার বাবা খুব খুশি হয়। তার ছেলে দেশের সেবা করবে, মানুষের সেবা করবে –এটাই তো তিনি চেয়েছেন। মারুফ সাহেবও অনেক স্বপ্ন নিয়ে পুলিশে যোগ দেন। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন প্রবল ধাক্কা খায়। উপরের মহলের চাপ, রাজনৈতিক চাপ, দুর্নীতি –সবকিছুর মাঝে তার স্বপ্ন হারিয়ে যায়, তার বাবার স্বপ্নও হারিয়ে যায়। পুলিশে যোগ দেয়ার এক বছরের মাথায় তার বাবা মারা যায়। আজ বাবার কথা মারুফের খুব মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে তার বাবাই যেন আজ তার সামনে বমি করছে! মারুফ সাহেব হাঁটা শুরু করলেন। কিন্তু তিনি বাসার দিকে যাচ্ছেন না, উল্টা দিকে যাচ্ছেন। মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। কাজটা তাকে একাই করতে হবে। কাউকে সাথে নিতে তিনি ভরসা পাচ্ছেন না। মারুফ সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন একটা দোতলা বাড়ির সামনে। রাত সাড়ে বারোটা বাজে। উনি নিশ্চিত এই বাড়িতেই মিজান আছে। তার কাছে রিভলবার ছাড়া আর কিছু নেই। তিনি একা একাই মিজানকে গ্রেফতার করতে এসেছেন। তিনি জানেন এক্ষেত্রে তার জীবনের ঝুঁকি আছে। তারপরও তিনি ঝুঁকিটা নিবেন। মিজান সাজ্জাদকে খুন করে পার পাবে, কিন্তু একজন ওসিকে খুন করে পার পাওয়া সহজ হবে না। মারুফ সাহেবের ধারণা মিজান তাকে খুন করে এত বড় বোকামি করবে না। স্ত্রীকে ফোন দিলেন মারুফ সাহেব। তাকে জানালেন একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে তিনি আটকা পড়েছেন। আজকে রাতে বাসায় ফিরতে পারবেন না। ছেলেমেয়েকে নিয়ে খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঘুমিয়ে পড়তে বললেন। মারুফ সাহেব সামনের বাড়িটায় ঢুকার আগে আল্লাহ্র কাছে মুনাজাত করলেন – হে আল্লাহ্! আমি জীবনে অনেক খারাপ কাজ করেছি। আজকে একটা ভাল কাজ করতে যাচ্ছি। তুমি আমাকে সাহায্য করো। আমার ভুলের জন্য তুমি আমাকে ক্ষমা করো। আমি তওবা করছি আর জীবনে আমি অন্যায় করব না। আর আমার যদি কিছু হয় তো আমার স্ত্রী আর সন্তানদের তুমি দেখো। আমি তাদের তোমার হাতেই তুলে দিলাম। মুনাজাত শেষ করে করে মারুফ সাহেব মোবাইল বের করলেন। তার থানার এস আই আমিনকে একটা মেসেজ দিলেন তিনি। তিনি জানেন আমিন এখন ঘুমাচ্ছে। ও খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যায়, আর উঠে অনেক সকালে। মোবাইল বন্ধ করে ওসি মারুফ বাড়িটায় ঢুকল। মারুফ সাহেবের ধারণা ভুল ছিলো। মিজান বোকামি করে বসল। এরপরের ঘটনা খুব দ্রুত ঘটল। সমগ্র পুলিশ ডিপার্টমেন্টে সাড়া পরে গেল। মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ল। সরকারও নড়েচড়ে উঠল। এক সাপ্তাহের মাঝেই মিজান আর তার আরো তিন সঙ্গী পুলিশের হাতে ধরা পড়ল। বিচার হল সন্ত্রাসীদের। মিজান আর তার এক সঙ্গীর ফাঁসির আদেশ হল। অন্য দুজনের যাবজ্জীবন কারাদন্ডের রায় দিলো আদালত। সেই বৃদ্ধ লোকটাকে এখন দেখা যায় নয়াপাড়া বাজারে। সাজ্জাদের দোকনে এখন উনি বসেন। সাজ্জাদ মারা যাওয়ার পর জীবনের উপর উনি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। এখন সেই আগ্রহ আবার ফিরে পেয়েছেন তিনি। নতুন উদ্দ্যমে কাজ করে চলেছেন। মারুফ সাহেবের দুই সন্তানকে তার দেখতে হবে, তাদেরকে একটা সুন্দর ভবিষ্যত উপহার দিতে হবে। তার এখন অনেক কাজ। অনেক অনেক কাজ। বৃদ্ধের মনে হচ্ছে তার বয়স বিশ বছর কমে গেছে। কিছু কথাঃ অনেক আগের কথা, তখন আমি সম্ভবত স্কুলে পড়ি। যতটুকু মনে পড়ে অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচীর প্রাক্তন স্বামী একজন পুলিশ অফিসার ছিলেন। অকুতভয় এক পুলিশ। একা একাই সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করতেন। উনি সম্ভবত বিদেশের কোনো মিশনে যাওয়ার জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিছুদিন পরেই তার ফ্লাইট। তার সব অস্ত্রশস্ত্র থানায় জমা দিয়ে দিতে হয়েছিল। এই রকম অস্ত্রশস্ত্রবিহীন অবস্থায় একদিন তিনি একাই কিছু সন্ত্রাসীকে ধাওয়া করেন। সন্ত্রাসীরা তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। এদেশ হারায় অসাধারণ এক সেবককে। আমি স্বপ্ন দেখি এদেশের সব পুলিশ অকুতভয় হবে। তারা অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। সরকারও এ ব্যাপারে সচেতন হবে। দুর্নীতিকে ঝেটিয়ে এদেশ থেকে বের করে দিবে। পাবলিক পরীক্ষায় নকল যেভাবে ভোজবাজির মত উধাও হয়ে গেছে, সরকার চাইলে পুলিশের দুর্নীতিও সেভাবে ভোজবাজির মত উধাও হয়ে যাবে। আমি ঐ দিন বদলের স্বপ্ন দেখি। আমার চাওয়া কি খুব বেশি? উৎসর্গঃ এদেশের পুলিশকে। মহানবীর (সঃ) বলেছেন -দেশ রক্ষায় সীমান্তে বিনিদ্র রজনী যে কাটায়, তার স্থান জান্নাত। আপনারা কি সেই জান্নাতের আশা করেন না?
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now